Monday, November 22, 2021

হিসেব করার খেলা।

 

 এই প্রবন্ধটা ২০০০ সালে লেখা। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। গত দু-দশকে মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সংখ্যাভিত্তিক যে তথ্যগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। কলকাতায় গাড়ির সংখ্যা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। কুড়ি বছরে জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে, গাড়ির সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। একটা তথ্য থেকেই  বোঝা যাবে, যে শহরে গাড়ির সংখ্যা এখন অনেক। শুধুমাত্র সেক্টর ফাইভ আর নিউ টাউন মিলিয়ে ৫/৬ টা গাড়ির শোরুম আছে। তার মূল কারণ তথ্য-প্রযুক্তি বিস্ফোরণের যুগে তথ্য-প্রযুক্তির সিংহভাগ অফিস ওই এলাকাতেই। আর এই শিল্পে কর্মীদের মাস মাইনে যথেষ্ট বেশি। এছাড়া এখন সহজ কিস্তিতে কম সুদে দীর্ঘকালীন মেয়াদে ব্যাঙ্ক থেকে  ধার পাওয়া যায়। কাজেই এখন হিসেব করলে আরও অনেক কিছু বিবেচনা করতে হবে। ফলে সংখ্যাগুলোর পরিবর্তন হবে। বিশ বছরের পুরোনো লেখা বলেই এতগুলো কথা খরচ করতে হ'ল। 



পেশায় স্কুল শিক্ষক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বি.এস-সি পড়ুয়া এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করে বসলেন - 'আচ্ছা বলতে পার কলকাতা শহরে কতজনের নিজের গাড়ি আছে ?' বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটির চটজলদি উত্তর- 'কত আর হবে, নব্বই লক্ষের বেশি কিছুতেই নয়।' আড়চোখের অর্থপূর্ণ ইঙ্গিতে ছেলেটির উত্তরে তাঁর বিরক্তি বুঝিয়ে গটগট করে প্রত্যাখ্যান করলেন প্রৌঢ়। ভাবটা যেন আজকালকার ছেলেপুলেরা কি ডেঁপোরে বাবা ! আমার নিজের মনে হয় ছাত্রের উত্তরটা ছিল অর্থবহ। আলোচনা চললে তর্কাতর্কি হত ঠিকই, কিন্ত উত্তরটা এমন একটা সংখ্যায় পৌঁছতে পারতো যা সঠিক উত্তরের কম-বেশি কয়েক শতাংশের মধ্যেই। তাহলে তথ্য ছাড়াই মোটামুটি হিসেব করার কি কিছু নিয়ম আছে ? অবশ্যই আছে - যাকে বলা হয় অ্যাপ্রক্সিমেশন (approximation) । বলাই বাহুল্য  যে চাল-ডাল-তেল ময়দার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সাধারণ জিনিসের হিসেবনিকেশ থেকে শুরু করে জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানের আন্দাজ পেতে গেলে অ্যাপ্রক্সিমেশনের একটা বিশাল ভূমিকা আছে। যে-কোনো চালু পেশায় অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ মানুষের আন্দাজ করার ক্ষমতা অনেক সময়ই শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই পদ্ধতিতে হিসেব করলে অন্তত এইটুকু বুঝতে পারা যায় যে চিন্তা-ভাবনাগুলো ঠিক পথে এগোচ্ছে কিনা। কিন্ত প্রশ্ন হ'ল একেবারেই কি কোনও তথ্যের প্রয়োজন নেই ! অবশ্যই আছে। শুরুতে কিছু একটা ধরে নেওয়ার ব্যাপার আছে, যেমন ছাত্রটি ধরে নিয়েছিল ৯০ লক্ষ। যাইহোক ব্যাপারটা মনগড়া বলে মনে হলেও অকাট্য যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

গাড়ির উদাহরণটা নিয়ে দেখা যাক, ছাত্রটির উত্তর কেন অর্থবহ ছিল। কী ভাবে সে এমন একটা যাদু-সংখ্যা বাতলে দিল। সে ধরে নিয়েছিল কলকাতার জনসংখ্যা ৯০ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রত্যেকটি মানুষের গাড়ি আছে।

কিন্ত ৯০ লক্ষ সংখ্যার হিসেবটা একটু বেশি সাদামাটা, যাকে বলে ইমপ্র্যাকটিকাল। বাস্তবকে গুরুত দিলে শুরু হবে কাটছাঁটের পালা। সাধারণ বুদ্ধিতে বলে পরিবারপিছু  একটা গাড়ি থাকা সম্ভব। নিউক্লিয়ার বোমের যুগের  মতো নিউক্লিয়ার পরিবারের সংখ্যাই আজ বেশি। অর্থাৎ পরিবার মানে মিঞা বিবি আর একটি সন্তান।  কাজেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি তিন ধরে নেওয়া যায়, তাহলে হিসেব মতো একলাফে গাড়ির সংখ্যাও নেমে দাঁড়াচ্ছে ৩০ লক্ষ। এবার পরের ধাপ। ধরা যায় যে দশ শতাংশ পরিবারের গাড়ি কেনার আর্থিক সামর্থ্য আছে। সুতরাং তিরিশ লক্ষ গড়ি হয়ে দাঁড়ালো তিন লক্ষে। আরও অনেক কিছু বিবেচনা করার আছে। শুধুমাত্র আর্থিক সামর্থ্যই যথেষ্ট নয়, এমনও তো হতে পারে যে এক-একটি পরিবারের এক এক ব্যাপারে অগ্রাধিকার আছে। কেউ হয়তো টাক খরচ করে দেশ-বিদেশ বেড়ানোর জন্য , কেউ ফ্ল্যাট-বাড়ি কেনার জন্য, কেউ হয়তো ভাল-মন্দ খেয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে চায়, আবার কেউ হয়তো গাড়ি কিনতে। যাইহোক, এই ব্যাপারে সমান সম্ভাবনার কথা ভেবে ধরা যাক গাড়ি কেনার পক্ষপাতি, ওই দশ শতাংশ উচ্চবিত্ত পরিবারের ৫০%। এসব ধরে নিয়ে হিসেব করলে দেখা যাবে যে গাড়ির সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে দেড় লক্ষে। কাজেই শুধুমাত্র লোকসংখ্যার তথ্য থেকে শুরু করে যুক্তিগ্রাহ্য কিছু কিছু ব্যাপার ধরে নিয়ে একটা অনুমানে পৌঁছোনো গেল। হিসেবের মধ্যে ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। ৯০ লক্ষ জনসংখ্যাওয়ালা সব সহরের গাড়ির সংখ্যা কি দেড় লক্ষের আশেপাশে ? শহরটা যদি মুম্বই হয়, তখন অন্যান্য আরও অনেক কিছু বিবেচনা করার আছে। কারণ মুম্বই শহর মূলত শিল্পাঞ্চল বেষ্টিত। আর্থিক সামর্থ্যের লোকের সংখ্যা কলকাতার তুলনায় বেশি। যাইহোক, সেটা আসল কথা নয়। মূল উদ্দেশ্য হ'ল অজানা কোনও কিছুকে কোয়ান্টিফাই করতে হলে যুক্তিপূর্ণ অনুমান ভিত্তিতে কীভাবে এগোনো যায়, সেটা দেখানো। অনুমান ধাপগুলো যথাযথ হলে ফলাফল ক্রমশ সূক্ষ্মতার দিকে যাবে।

অনুমানভিত্তিক বা এই 'মোটামুটি' হিসেবের নিয়মটা স্কুল-কলেজ থেকেই অভ্যাস করা উচিৎ। এতে কল্পনাশক্তি বাড়বে এবং দূরুহ বিজ্ঞান না জেনেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাস্তব জগতকে অনুধাবন করা যাবে। এ ধরনের হিসেব করা একটা খেলা-)ও বটে। আজ ইন্টারনেটের তথ্যবহুল যুগে এক একটি মাউসের ক্লিক ভিডিও স্ক্রিনের ওপর ফুটিয়ে তুলছে পৃথিবীর উজাড় করা তথ্য। গবেষণা বা অন্যান্য কাজে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া আজ অনেকটাই সহজ। কিন্ত বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বিজ্ঞান মনীষীরা সংজ্ঞালব্ধ অনুমানের উপর ভিত্তি করেই তাঁদের গবেষণার কাজে ত্বরান্বিত করতেন। আমি অন্তত পাঁচজন বিজ্ঞান মনীষীর কথা জানি যাঁরা আনুমানিক হিসেবের ব্যাপারটায় প্রভূত গুরুত্ব দিতেন। এঁরা হলেন, স্যর নেভিল মট্, এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান, জর্জ গ্যামো ও ভিক্টর ভাইসকফ। ইতালি বংশোদ্ভূত এনরিকো ফার্মির জীবনের বেশির ভাগ সময়টা কেটেছে আমেরিকার শিকাগোতে। শিকাগো শহরের বেশ কিছু কবি, ফার্মির কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞান-মনস্কতা ব্যাপারটা কী ?প্রত্যুত্তরে ফার্মি বলেছিলেন,- 'আপনারা হিসেব করতে পারেন, শিকাগো শহরে কতগুলো পিয়ানো আছে ?' কবিবররা ভাবলেন ফার্মি হয় তাঁদের নিয়ে মস্করা করছেন অথবা প্রলাপ বকছেন। তখন ফার্মি গাড়ির হিসেবের মতো ব্যাপারটা জলের মতো সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। একটা ব্যাপার ঠিকই যে অনুমানের সঙ্গে সংজ্ঞা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একটা ঘটনা থেকে বোঝা যাবে যে এনরিকো ফার্মির অনুমান ক্ষমতা কত প্রবল ছিল। লস আলামসের অনতিদূরে আলমোগোর্দো-তে প্রথম যখন অ্যাটম বোমার শক্তি পরীক্ষা হচ্ছিল, ন-দশ মাইল দূরের গবেষণাগারে বসে বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট আগে থেকেই টুকরো টুকরো কাগজ মাটিতে ফেলেছিলেন এনরিকো ফার্মি। বিস্ফোরণ মুহূর্তের কয়েক পলক পরেই পড়ন্ত কাগজ টুকরোর বিক্ষেপ থেকে শক-ওয়েভের মাত্রা অনুমান করতে পারেন ফার্মি এবং বলতে সক্ষম হন যে বিস্ফোরণে কী পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়েছিল। বলাই বাহুল্য যে অনুমানের সঙ্গে সঠিক শক্তি উৎপাদনের তফাৎ যৎসামান্যই ছিল। আসলে তিনি যে এনরিকো ফার্মি। সৃষ্টির বেষ্টনী দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছেন আমাদের।

Thursday, November 11, 2021

আত্মবিশ্বাসের অভাব

 সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমায় আজকাল প্রায় সবাই হীনমন্যতার প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাবার এক অদম্য মনোভাব নিয়ে দাপাদাপি করছে। রাজনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করেই এই প্রতিযোগিতা বেশি চোখে পড়ছে। বক্তব্যের মধ্যে না আছে জোরালো যুক্তি, ভাষার প্রয়োগে না আছে নিয়ন্ত্রণ। একটা উদাহরণ বোধহয় যথেষ্ট। অর্ধশিক্ষিত কতিপয় মানুষ স্বজাতির এবং নিজের প্রদেশের মিথ্যে নিন্দা করে তৃপ্ত বোধ করেন। তার কারণ তাঁরা হয়তো ভাবেন তাহলে অন্যের কাছে নিজের অস্তিত্বকে তুচ্ছ বাঙালির তুলনায় স্বতন্ত্র বোঝানো যাবে। আসলে আমার  মনে হয় তাঁদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে এসে ঠেকেছে । এটা এক ধরনের নৈতিক দেউলিয়াপনাও বটে। মিডিয়ার যে খবর গুলো তুলে ধরলে তাদের বদ্ধ ধারণার সঙ্গে মিলে যাবে , নিজের প্রদেশের মানুষ গুলোকে ছোটো করার জন্য highlight করা যাবে  তাঁরা সেগুলোকেই বেছে নেবেন। এটার একটা ইংরিজি প্রতিশব্দ আছে  Confirmation bias. তাও নিজের মতামত নয়, বেশিরভাগই 'সংগৃহীত'। ভুলে যাবেন না যে, যে প্রদেশের মানুষদের  আপনি নিন্দে করছেন, আপনিও তার বাইরে নন।

Fait accompli for state ruling party

 West Bengal bye-poll results is an instance of 'fait accompli' for the State ruling party

-------


West Bengal Assembly bye-poll results, 7/7 shows the strength of only woman chief minister of the country. Mamata Banerjee has shown a spectacular performance and it is indeed an act of sweet revenge on the Central ruling party, which went all out in the recent Assembly polls to dislodge her govt. Three and a half months before the main election had started in 8 phases,  the honourable PM visited West Bengal 17 times and the honourable Home Minister came umpteen number of times holding 67 rallies including so called Road shows. All India party president also paid visits a number of times to influence the local people. But they couldn't make them budge. 

More important is that it was an instance of extreme political excess inflicted in West Bengal trying to push the ruling party at the edge of political starvation, using entire state machinery as far as possible. The local BJP leaders should take lessons from this debacle. They are in complete disarray after this defeat. In fact there's hardly any face of leadership in the local BJP party. The blame game between leaders are in the process.

Sunday, October 31, 2021

Shame to BCCI & Saurabh

 Just a couple of minutes ago I posted a shameful act by a part of obsessed supporters in favour of Indian cricket in Bengali. I try to portray an equivalent English translation.


Three cheers for Virat Kohli and shame to Saurabh Ganguly and BCCI.


INDIA cricket captain Virat Kohli has strongly slammed the abuse hurled at Indian pacer, Mohammed Shami on social media after Pakistan defeated India by 10 wickets in their opening match of ICC Men's T20 World Cup. They have no understanding of the fact that some cricketers like Mohammed Shami has brought win to India in umpteen number of matches in the last few years and has been our primary bowler with Jaspreet Bumrah when it comes to making an impact in the games in Test Cricket. Shami was subjected to vicious online trolling on social media after the match in which he conceded 43 runs in 3.5 overs. In fact some people has termed him as traitor and advised to go back to Pakistan. Kohli termed the trollers as "bunch of spineless people." Rightly said Virat. Kohli also aimed at BCCI office bearers, telling, "Are you listening to it !"

Many former and current cricketers condemned the abuse strongly but unfortunately Board President Saurabh Ganguly never featured in the list. My reaction as an individual is "SHAME TO SAURABH". You may be a great cricketer and a great captain, but certainly NOT a great sportsman. Virat Kohli is rather "ALL IN ONE." After the match, India had conceded defeat and Virat came forward and hugged Mohammed Rizwan. He's indeed a real captain as well as a great cricketer. After all, cricket is a gentleman's game which turned to a trade now.

ছিঃ সৌরভ ছিঃ

 বিরাট কোহলীর জন্য তিনটি চিয়ার্স এবং সৌরভ গাঙ্গুলি আর জয় সাহ-র জন্য ছিঃ ছিঃ ছিঃ


আই সি সি পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে পাকিস্তান ভারতকে ১০ উইকেটে পরাজিত করার পরে সোশ্যাল মিডিয়ার একাংশে মহম্মদ শামির বিরুদ্ধে করা গালিগালাজের তীব্র নিন্দা করেছেন ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি।

গত কয়েক বছরে মহম্মদ শামির মতো কেউ কেউ ভারতকে অসংখ্য ম্যাচে জিতিয়েছে এবং টেস্ট ক্রিকেটে প্রভাব ফেলতে গেলে জসপ্রীত বুমরাহের সাথে আমাদের প্রাথমিক বোলার ছিলেন, তা তাঁরা বুঝতে পারে না। শামির ৩.৫ ওভারে ৪৩ রান দেওয়ার ম্যাচের পরে শামি সামাজিক মিডিয়াতে ভয়ঙ্কর অনলাইন ট্রোলিংয়ের শিকার হন। কিছু মানুষ শামিকে বিশ্বাসাতক বলে অভিহিত করে পাকিস্তানে ফিরে যাবার নিদান দিয়ে ফেলেছেন। কোহলি ট্রোলারদের "মেরুদন্ডহীন মানুষের দল বলে অভিহিত করেছেন।" কোহলি বিসিসি আই-এর পদাধিকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনারা কি এগুলো শুনছেন !" অনেক বর্তমান এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা শামির প্রতি এই অভব্য আচরণের নিন্দা করেছেন। কিন্ত দুর্ভাগ্যবশত, বোর্ড সভাপতি, বঙ্গসন্তান, সৌরভ গাঙ্গুলির সেই তালিকায় নাম দেখা যায়নি। একজন ব্যক্তি হিসেবে সৌরভের প্রতি আমার প্রতিক্রিয়া, "ছিঃ সৌরভ ছিঃ।" আপনি একজন দুর্দান্ত ক্রিকেটার এবং দুর্দান্ত অধিনায়ক হতে পারেন। অবশ্যই আপনি দুর্দান্ত ক্রীড়াবিদ আদৌ নন। মুখ বন্ধ রেখে আপনি খেলোয়াড় সুলভ মনোভাব দেখাননি। বিরাট কোহলি বরং "অল ইন ওয়ান"। ম্যাচের পর ভারত হার মনে নেয় তো বটেই এবং বিরাট,  মহম্মদ রিজওয়ানকে জড়িয়ে ধরেন। এটাই খেলোয়াড় সুলভ মানসিকতা। তিনি সত্যিই একজন সত্যিকারের নায়কোচিত অধিনায়ক।

Thursday, October 28, 2021

আবুল কালাম আজাদ

 



 


  স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, আবুল কালাম আজাদ- দু'চার কথা।


                                      

 "ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখায় ব্রতী আবুল কালামের নাম তেমন শোনা যায় না।" আজ রাজৈনতিক অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের ফলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা যখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে, সেখানে আবুল কালামের নামটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং আজাদের বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানোর তাগিদ অনুভব করছি।

 বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের অবস্থান ছিল ঔপনিবেশিকতার ছত্রছায়ায়। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে আজাদ ঐ দেশগুলোতে যান এবং সেখানে ক্রীস্টান মৌলবাদী সমেত তুর্কী ও আরব জাতীয়তাবাদী যুবসম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আশ্বাস দেন যে ভারত কিভাবে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শরিক হতে পারে। ফিরে এসে ১৯১২ সালে স্বধীন রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে 'আল-হিলাল' নামে তিনি একটি পত্রিকার সৃত্রপাত করেন। দুবছরের মধ্যেই পত্রিকাটি এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে সংখ্যার নিরিখে সেটির প্রচার তিরিশ হাজারে পৌঁছে যায়। ফলে আজাদ ইংরেজ সরকারের চোখ রাঙানির শিকার হন এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত  আইনের উপযুক্ত ধারায় আজাদকে গ্রেপ্তার করে রাঁচি কারাগারে পাঠানো হয়। পত্রিকা প্রচার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার ছাপাখানাটিও বাজেয়াপ্ত করে। রাঁচি কারাগারে তিনি অকথ্য অত্যাচারের শিকার হন।  জেল থেকে মুক্তির পরেই তিনি শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করতে থাকেন। এই প্রবন্ধগুলোর সারাংশই আগে আল-হিলাল পত্রিকার বিভিন্ন সংস্করনের সম্পাদকীয় হিসেবে প্রকাশিত হতো।

আল-হিলাল পত্রিকার ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করার পরেও আজাদ থেমে থাকেননি। 'আল-বালাগ' নামে তিনি আরও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনায় ব্রতী হন। কিন্তু বেশিদিন চালানো সম্ভব হয়নি। ইংরেজ সরকারের কতৃত্ববাদের কদর্য হাত যে কতদূর প্রসারিত হতে পারে, সেটা আজাদ আন্দাজ করতে পারেননি। আজাদ গৃহবন্দী হন এবং খুব শিগগিরি দ্বিতীয় বারের জন্য কারাবরণ করেন । এবারে সুদীর্ঘ চার বছরের জন্য। ১৯২০ সালে, জেল থেকে বেরিয়ে উনি মহাত্মা গাঁধী এবং লোকমান্য তিলকের সাক্ষাৎ পান। এই সাক্ষাৎ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তাঁর চোখে কংগ্রেসের এই দুই নেতা ছিলেন হিমালয় সদৃশ।


ঊনিশশ সাতচল্লিশে দেশভাগের অব্যবহিত পরেই দিল্লীর হাজার হাজার মুষলিমের পাকিস্তানমুখি হবার আঁচ পেয়েই আজাদ জামা মসজিদের প্রাচীর ববাবর সুউচ্চ ঢিবি থেকে যে বক্তৃতা করেন তার জেরে আবেগতাড়িত মুষলমান সম্প্রদায় তল্পিতল্পা গুটিয়ে রাতারাতি ভারতমুখি হয়। এই বক্তৃতা ১৮৮৭ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ বক্তৃতার সঙ্গেই তুলনীয়। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি কতটা আন্তরিক ও দায়বদ্ধ হলে এমন একটা বক্তৃতার পরিকল্পনা করা যায়।

স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সাল থেকে আজাদ ব্রতী হন। প্রথমেই তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্ক মন্ত্রনা পরিষদ্ (ইন্ডিয়ান কাউনসিল অব কালচারাল রিলেশনস্)। ১৯৫৩-৫৪ সালে তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয় তিনটি জাতীয় অ্যাকাডেমি, সঙ্গীত-নাটক, সাহিত্য এবং ললিতকলা অ্যাকাডেমি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্দিষ্টি শিক্ষার মান বজায় রাখতে আর্থিক অনুদান বরাদ্দ করার উদ্দেশ্যে, ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, তাঁরই মস্তিষ্কপসূত।

সামাজিক অবস্থান নির্বশেষে ব্যক্তিগত স্তরে মানুষের প্রতি আবুল কালামের দায়বদ্ধতার একটা নজির দিচ্ছি। দেশ ভাগের সময় ভারতীয় রেলের আবদুর রহিম নামে এক খালাসী, পাকিস্তানে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় এই সর্তে, যে ছ-মাসের মধ্যে ভারতে ফিরলে তার চাকরি বহাল থাকবে। বলাই বাহুল্য যে পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেখে চার মাসের মধ্যেই তার পাকিস্তানে স্থায়ী বসবাস করার স্বপ্ন ভঙ্গ হয় এবং সে ভারতে ফিরে আসে। কিন্তু তার চাকরির সর্ত অস্বীকার করা হয়। সংস্লিষ্ট দপ্তরে বছরখানেক চিঠি চালাচালি করার পরেও সমস্যার কোনো সুরাহা না হওয়ায় আবদুর রহিম আজাদের দ্বরস্থ হন। কাল বিলম্ব না করে আজাদ, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে একটা চিঠি লেখেন এবং লাগাতার প্রয়াস চালিয়ে যান। বেশ কিছু বছর বাদে রহিম চাকরিতে বহাল হন। 

অনাড়ম্বর জীবনদর্শনে বিশ্বাসী আজাদের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহারের দেরাজ খুলে উদ্ধার হয় কয়েকটি সূতির আচকান, গোটাকতক খাদির কুর্তা এবং পাজামা আর পায়ের দুজোড়া চপ্পল। আর পাওয়া যায় সারা জীবনের সংগ্রহ করা বিরল কয়েকশ বই, যেগুলো এখন জাতীয় সম্পত্তি হিসেবে সংরক্ষিত আছে।





Sunday, October 10, 2021

বেশ বেমানান

 বেশ বেমানান


জলখাবারের পরে রোজই একটু হাঁটতে বেরোই। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল আশপাশের ঠাকুর গুলো দেখে আসব। রথ দেখা কলা বেচার মত অনেকটা। ওই এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে যেগুলো পড়ে। বাবুবাগান আমার বাসস্থানের প্রায় দোরগোড়ায়। ওখানেই প্রথমে গেলাম। প্যান্ডেল দেখে চোখ আটকে গেল। গ্রন্থাগারের ধাঁচে তৈরি করা সমস্ত প্যান্ডেলটা, ভাস্কর্য আর শিল্পের এক অভিনব মেলবন্ধন। বাঙালিদের সৃজনশীলতাকে মনে মনে আরও একবার কুর্নিশ জানালাম। প্যান্ডেলের ভেতরে বাইরে, সর্বত্র লাইব্রেরী আর লাইব্রেরির তাকগুলো ভর্তি শুধুই বই। 

মণ্ডপের ভেতরের গ্রন্থাগারের দুই সারিতে দেশপ্রেমিক, সমাজসংস্কারক থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, বিদ্রোহী- বাঙলার মণীশীদের ছবি বেশ যত্ন করে টাঙানো আছে। কয়েকজনের নাম নিলেই বোঝা যাবে কোন্ মাপের মানুষ তাঁরা। যেমন রবিঠাকুর, চিত্তরঞ্জন, নজরুল, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, ব্রজেন্দ্র শীল, স্বামীজী, নেতাজী....। ঘড়ির কাঁটার মতো বাঁ দিক থেকে ডান দিক, চোখ ঘুরছে আমার। উপরের সারি শেষ করে নিচের সারি দেখার পালা এবার। হঠাৎই এক জায়গায় চোখ আটকে ছন্দপতন হ'ল। ছবিটা ছিল এই অঙ্গরাজ্যের দিদির ছবি। পাঁচ-সাতজন ছিল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এটা তো বড্ড বেমানান হয়ে গেল! এক ছোকরা কানের কাছে এসে বলে গেল ঠিক বলেছেন কাকু। বয়স ৭৮ হলেও চুলের রঙে তেমন পাক না ধরার ফলে, কাকুর তকমাতেই এখনও আটকে আছি। যাইহোক, আর একজন প্রৌঢ়ের প্রতিক্রিয়া - কেন উনি তো অনেক বই, কবিতার বই লিখেছেন,  তাহলে অসুবিধে কোথায় ? আমি বললাম, অসুবিধে দৃষ্টিভঙ্গির। আমার নিজের মনে হ'ল এঁদের সঙ্গে ওঁর ছবি ঠিক যায় না। যেমন যায় না, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নামকরণ করা গুজরাতের মোতেরা স্টেডিয়াম, ৮০০ কোটি টাকায় ঝাড়পোঁছ করে ১,৪০,০০০ দর্শক আসনের ব্যবস্থা করে পৃথিবীর বৃহত্তম   স্টেডিয়ামের লেবেল লাগিয়ে নাম বদলে নরেন্দ্র মোদীর নামে করা হয়েছে, সেরকম। এটা তো গণতান্ত্রিক দেশ, অন্তত প্রধানমন্ত্রী বা এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাই বলেন। কাজেই বাকস্বাধীনতায় তো এখনও লাগাম পরানো হয়নি। আপনার যুক্তিটা ভুল নয়। আমার উক্তিও অযৌক্তিক বলে মনে করছি না। আচ্ছা আসি তাহলে। দাঁড়ান দাঁড়ান,  দাদা। ওই ছেলেটি আপনার কানে কানে ফিসফিস করে কী বলে গেল ? ভদ্রলোককে বললাম ওই তো ছেলেটা যাচ্ছে, এখনও দেখা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে নিন্। বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হ'ল সংগঠকরা একটু বেশি স্তাবকতা করে ফেলেছে। মুখ্যমন্ত্রীরও হয়তো তাতে সায় নেই। যদিও উনি স্বয়ং বেশ দিন কয়েক আগে ওই ঠাকুর উদ্বোধন করে গেছেন। জানিনা তখন ছবিগুলো লাগানো ছিল কিনা !!!

Wednesday, October 6, 2021

উপনির্বাচনের ফলাফল

 উপনির্বাচনের কাঙ্খিত ফলাফল।


আমি গত মাসের ১৩ তারিখে, ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হবার ঠিক পরেই এই ফেসবুকের এই দেওয়ালে ফলাফলের একটা আভাস দিয়েছিলাম। সেখানে, দিদি ছাড়া বাকি দুজনের ভবিষ্যৎ আদৌ যে ভাল নয় সেটা ওই লেখাতে প্রকাশ করেছিলাম।  পাঠকদের মনে করিয়ে দেবার জন্য সংক্ষেপে সেটা একটু সেরে নিই। শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রিয়াঙ্কাকে বলেছিলাম যে প্রচারের আগে বাঙলা ভাষাটায় একটু শাণ দিয়ে নিতে। তবে তখন ওঁর ঔদ্ধত্ব মেশানো শরীরী ভাষাটা যে আরও অনেকটাই খারাপ সেটা বুঝতে পারিনি। প্রচার যত বেড়েছে উনি ততই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছেন। তার ফল কি হল ? অবাঙালি অধ্যুষিত ভবানীপুর পাড়ার দুটি ওয়ার্ডেও উনি হেরে গেলেন। আর দিদি ৫৮,৮৩৫ ভোটে নিজের তৈরি আগের রেকর্ড ছাপিয়ে জিতে গেলেন। ভোট পেলেন ৩.৫৬%। রুদ্রনীল শোভনবাবুর কাছেও হেরেছিল। কিন্ত ভোট পেয়েছিল প্রায় সাড়ে চার শতাংশ। মনে রাখা দরকার ভোটের সংখ্যার থেকে শতাংশের হিসেবটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ  এবং বিজ্ঞান সম্মত। আসলে যে দুটি ওয়ার্ডের ওপর ওঁর ভরসা ছিল তাঁরা ওকে ডুবিয়েছে। কারণ, তাঁরা অবাঙালি ঠিকই, কিন্ত বংশ পরম্পরায় কলকাতাবাসী। তাঁরা অনেক নরম স্বভাবের মানুষ। প্রিয়াঙ্কার কাছে আমার অনুরোধ, পরে কোন নির্বাচনে প্রার্থী হলে আপনি সাধন পান্ডে, শশী পাঁজাদের মত বাঙলা শিখে নিন এবং ওঁদের মত শান্ত স্বভাবের ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে যান। কলকাতা বাঙালি-অবাঙালি বিভেদ কোনোদিন করেনি, আজও করেনা। চাকরির সুবাদে, ভারতবর্ষের অনেক রাজ্যে যাতায়াত করেছি। আমার মনে হয়েছে, মহারাষ্ট্র আর পশ্চিমবাঙলা হ'ল সবচাইতে উদার পন্থী রাজ্য। হার স্বীকার করে প্রিয়াঙ্কা, দিদিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলেছেন যে ওঁর সংগঠন কিছুই করেনি আর দিদির সংগঠন ব্যাপক ছাপ্পা ভোট দিয়েছে। কিন্ত একথাও তো ঠিক যে বুথ পিছু অন্তত পাঁচজন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান ছিলেন। আর ওঁরা তো মোটামুটি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আর নির্বাচন কমিশনে উনি যা নালিস জানিয়েছেন, সেগুলোকে কমিশন গুরুত্ব দিয়ে বিচার করেছে। ধাঁধাটা বুঝতে পারলাম না।

আসি বামপন্থী প্রার্থী শ্রীজীবের কথায়। ওঁর ব্যাপারে লিখেছিলাম যে বাম শিবির সত্যিই আশাবাদী। এবং সেই আশার কথা ভেবে মনে হয়েছিল অলৌকিক তো কখনও কখনও ঘটেও থাকে। সেই মতো আমার নিজের মনে হয়েছিল যে উনি যদি এই নির্বাচনে দাগ কাটতে পারেন, তাহলে আমার ভেঙে যাওয়া শরীরটা একদিন জুড়ে যাবে। কিছুই হ'ল না। আমার আশাতেও ঠান্ডা জল ঢেলে দিলাম। এবার সামান্য পরিসংখ্যান দিয়ে শেষ করি। কয়েক মাস আগে জোটের প্রার্থী হিসেবে ভবানীপুরে কংগ্রেসের সাদাব খানের জমানাত বাজেয়াপ্ত হলেও ভোট পেয়েছিলেন ৪.০৯%, যে কারণে কংগ্রেস বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে আর প্রার্থী দেবার দুঃসাহস দেখায় নি। আর শ্রীজীবের জমানাত জব্দ তো হলই, আর ভোট শতাংশও কমে গেল ০.৫৩ শতাংশ। কাজেই এটা বামেদের দূরদর্শীতার অভাব ছাড়া আর কিই বা বলা যায়। ওদের এখনও বহুদিন আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন আছে বলেই মনে হয়।

Sunday, September 26, 2021

বই না ইন্টারনেট ?

 • এই প্রবন্ধ প্রায় দু'দশক আগে লেখা। সেটা প্রবন্ধটি পড়তে পড়তেই বুঝতে পারা যাবে। ব্লগ তৈরির সুবিধে হ'ল, এখানে যাবতীয় সৃষ্ট লেখালেখি লিপিবদ্ধ করে রাখা যাবে। এটা পড়তে গিয়ে মনে হ'ল যে বিশ বছর আগে, কম্পিউটার এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ব্যাপারে ভবিষ্যতের গতিপ্রকৃতির কথা উল্লেখ করেছিলাম। সেগুলো সত্যি সত্যিই ঘটেছে।


অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ব জন্ম দিয়েছিল একটি বিখ্যাত ধারনার। ধারনাটা এরকম – বিশ্বব্রহ্মান্ডের যেখানেই বস্তু থাকে, সেখানেই চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের ভাঁজ পড়ে। স্পেস অর্থাৎ স্থান এবং টাইম বা কালকে আলাদা করে দেখার কোনও উপায় নেই, মিলেমিশে একাকার হয়ে তাদের নাম হয়েছে স্পেস-টাইম। বিংশ শতাব্দীর যুগান্তকারী দু'টি সৃষ্টিধর্মী কাজের এটি অন্যতম। অন্যটি কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা যা বলে বস্তুকণিকার অস্তিত্ব একই সঙ্গে বস্তু এবং তরঙ্গ। বস্তু কণিকা আসলে তরঙ্গ-কণিকা। কোনোটাই আমাদের  আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এই মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে। আর কয়েকটা মাসের অপেক্ষামাত্র। শুধুমাত্র একটা শতাব্দীই শেষ হবে না। এক ধাপ এগিয়ে বলা যায় যে আধুনিক মানব সভ্যতা  আমাদের জীবনে এই প্রথম মিলেনিয়াম বা সহস্রাবদীর মুখোমুখি হবে। সহস্রাবদীর এই সন্ধিক্ষণে পৌঁছে আমার সাদামাটা বুদ্ধিতে মনে হচ্ছে যে স্পেস জোড়া তথ্যের ভারে মহাকর্ষ আজ কেন্দ্রীভূত হয়েছে ইন্টারনেটের অজস্র তথ্য আর আর কিছুটা তথ্য আবর্জনায়।  স্পেসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে শুধু তথ্য আর তথ্য। আর সেই তথ্য মন্থনের কাজ নাকি কেড়ে নিয়েছে অগুনতি ছাত্র-ছাত্রীর অনেকটা সময়। ইন্টারনেটের হামলায় ছাত্র-ছাত্রীরা নাকি বই-কাগজকে ছুটি দিয়ে সাইবার স্পেসে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। কথাটা অসত্য নয়, আবার, পুরোপুরি সত্যিও নয়। কারণ, বইমেলার ভিড়ের একটা বড় অংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী বলে মনে হয়েছে। সুতরাং এটাও মনে হয়েছে যে চটকদার ইলেকট্রনিক মিডিয়া হানায় মানুষ এখনও অক্ষর ভুলে যায়নি। প্রশ্ন হ'ল বইমেলা না ইন্টারনেট ? না দুটোই ? কিছু তুলনামূলক, থুড়ি, আপাত তুলনামূলক আলোচনাই আমার মূল উদ্দেশ্য। আপাত কথাটা বলছি এই জন্য যে দুটোর উদ্দেশ্য এক নয়। তবুও আলোচনা যেহেতু বিষয় দুটোকে ঘিরে, অবচেতনে তুলনা একটা এসেই যায়।


বইপড়ার অভ্যাসের ব্যাপারটা দিয়েই শুরু করা যাক আলোচনা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বই পড়া আজকাল সাধারণ মানুষ এবং পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা বাহুল্য বলে মনে করে। মন্তব্যের সমর্থনে সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় বইমেলা সম্পর্কিত আলোচনার প্রাসঙ্গিক একটি লাইন তুলে ধরছি – “ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রন্থ মাত্র সাতশো ছাপিয়ে প্রকাশককে বছরের পর বছর বসে থাকতে হয়।“ ইন্টারনেট ইন্টারনেট রব তুলে আধুনিক জগতে সাময়িকভাবে হয়তো একটু এগিয়ে থাকা যায়। তবে তা বই পড়ার ব্যর্থতাকেও আড়াল করে। এটা এক ধরনের মানসিক দেউলিয়াপনা। মনে রাখা দরকার যে বইপড়া সহজাত, ইলেকট্রনিক মিডিয়া যান্ত্রিক। যান্ত্রিক জিনিস আধুনিক সভ্যতার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিফলিত হলেও যান্ত্রিক ব্যাপারস্যাপার গুলো কোনও না কোনও সময়ে বৈচিত্র্যহীন একঘেঁয়ে হয়ে উঠতে বাধ্য। একগুচ্ছ খবরের বোঝা মাথায় ভরে আখেরে কিছু লাভ আছে কি ? পাঠক ভুল বুঝবেন না আশা করি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ভর করে তথ্য সংগ্রহ আর বই-কাগজ পড়ার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। আজকের দিনে বরং একটি অন্যটির পরিপূরক। বহু বিজ্ঞান গবেষকের সঙ্গে পরিচয় থাকার সুবাদে দেখেছি যে ইন্টারনেট হাতড়ে নির্বাচিত প্রাসঙ্গিক তথ্যের অংশটুকু ছাপিয়ে নিয়ে পড়তেই তাঁরা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কিন্ত একই সঙ্গে তথ্য নির্বাচনের ব্যাপারে ইন্টারনেটের সুবিধেগুলোকেও অনস্বীকার্য বলেও মনে করেন। বই কাগজের গন্ধ, নতুন বইয়ের পাতাগুলো, তা সে যত সস্তা কাগজের হোক না কেন- তা উল্টেপাল্টে দেখা আর মাউস ক্লিকে ইন্টারনেটের হালফিল খবরের মধ্যে বিচরণ ঠিক এক ধরনের অনুভূতির উদ্রেক করে না। ইন্টারনেটে পড়ার মধ্যে ডিসিপ্লিনের বাঁধাধরা ব্যাপারটা মগজে পুরে পড়তে হয়। ফলে পড়ার মধ্যে কৃত্রিমতা এসে গিয়ে চিন্তার স্রোতগুলোকে মাঝে মাঝেই ভেঙে দেয়। ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের কথাই ধরা যাক। রঙীন স্ক্রীনের উপর সাজানো রয়েছে রঙ-বেরঙের তথ্যের ডালি। কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরব ! তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া – সবগুলোই তো জানতে ইচ্ছে করছে। যাইহোক, একটাকে নিয়ে শুরু করা গেল। হাইপারটেক্সেটের হাতছানি অবচেতনে নিয়ে চলে গেল অন্য এক তথ্য জগতে। সেখান থেকে আরও একটায়……। তথ্য এনসাইক্লোপেডিয়ায় এই যে ছোটাছুটি, লাফালাফি, বই পড়ায় সেই সুযোগ না থাকার কারণেই মনোনিবেশ হতে বাধ্য। বিষয়ের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ার কোনো উপায় নেই। ব্রাউজিংয়ের সময় এমনও হয় যে, যেটা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল সেটা ভুলেই গেলাম। এ যেন চাল কিনতে বেরিয়ে ডাল কিনে ফিরে আসার মতো। কাজের কাজ বিশেষ কিছু হ’ল না।


“ইন্টারনেট ইজ টু বই ইকুয়্যালস্ টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ ইজ টু মাঠে ঢুকে দেখা ম্যাচ।“ টেলিভিসনের পর্দায় ম্যাচ দেখা আর মাঠে ঢুকে ম্যাচ দেখার তফাত তো থাকবেই। টিভিতে খুঁটিনাটি গুলো তো রিপ্লেতে বারবার দেখতে পাবার সুযোগ আছে। তবু অদৃশ্য অদেখা শূন্যতা কিছু থেকেই যায়। মাঠের ম্যাচ দেখার অনুভূতিতে যে সম্পূর্ণতা তা টিভিতে পাওয়া সম্ভব নয়। 

হাইপারটেক্সট ব্যাপারটা প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি। ক্রস রেফারেন্সের সুবিধের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে তৈরি করা ইন্টারনেটের সংরক্ষিত তথ্যকে হাইপারটেক্সট আখ্যা দেওয়া হয়।


প্রতিষ্ঠিত এবং অভিজ্ঞ গবেষক মহলে আড্ডার মেজাজে বিষয়টা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। তাঁদের কথার সারমর্ম ভাষায় ব্যক্ত করলাম, “মানসিক ও দৈহিক গঠনের সঙ্গে বইপড়ার যে মেলবন্ধন, সেটা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে পাওয়া সম্ভব নয়।“ আমার মনে হয় তাঁরা হয়তো বলতে চান যে বই হাতে নিয়ে শুয়ে বসে বা চায়ের টেবিলে পড়ার যে ঘরোয়া বিলাসিতা, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সেটা হয় না। আসলে ডিসিপ্লিনের সঙ্গে আড়ষ্টতার ব্যাপারটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। ইন্টারনেটে পড়া ভীষণভাবে ডিসিপ্লিন্ড। শৃঙ্খলা বস্তুটা সব ক্ষেত্রে কি মানায় ? আরও একজন সুপন্ডিত গবেষকের মন্তব্য, “ওভারহেড প্রোজেক্টার লাগিয়ে বড় পর্দায় সেমিনার শোনার আড়ষ্টতা আর ব্ল্যাকবোর্ড-চক-ডাস্টার ব্যবহার করে ক্লাস করার সহজ পরিবেশের যে তফাত, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে বইয়ের পার্থক্য অনেকটা সেরকম। তবে দুটোরই প্রয়োজন আছে।“


ইন্টারনেটের চটজলদি ব্যাপারটায় সুবিধে-অসুবিধে দুইই আছে। খবরের ক্ষিদেয় মানুষ যখন প্রায় দিশেহারা, অব্যবহিত সেই খবরটা পাওয়ার ব্যাপারে এর আর জুড়ি নেই। কিন্ত এ তো আর লাইফ সেভিং ড্রাগ নয়, যে খবর জেনে মানুষ জীবন ফিরে পাবে। কাজেই চট্ করে পাওয়া বেশিরভাগ খবরের গুরুত্ব চট্ করে ফুরিয়ে যায়। সহজলভ্য সবকিছু পাওয়ার মধ্যে এমনটাই হয়ে থাকে।


ইনফরমেশন টেকনোলজি, সংক্ষেপে আই টির-দাপটে পৃথিবীটা ছোট হতে হতে বৈঠকখানায় ঢুকে গেছে।। একই সঙ্গে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে সব রুচির মসলার খবরে খবরে পৃথিবীটা ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মনের পৃথিবীটা কি বলে ? সমাজবদ্ধতা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক- এগুলো আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। সময় নেই কারোরই, বিশেষ করে পড়ুয়াদের। তারা মনের মতো করে আড্ডা মারতেও ভুলে গেছে। রুচির বেড়াজাল না টপকে আড্ডা চর্চাও তো এক ধরনের শিল্পচর্চা। আমার মনে হয় মনের ঈপ্সিত ইচ্ছেগুলোর উপকরণ, উপযুক্ত বই-কাগজ এবং পারস্পরিক আলোচনাতেই পাওয়া যায়। ছোটবেলায় দেখতাম যে স্কুল বা কলেজ ডিঙোনো ছেলে-মেয়েরা বাড়তি সময়টাকে কাজে লাগাতো টাইপ-শর্টহ্যান্ড স্কুলে ভর্তি হয়ে। বাবা-কাকারাও মনে করতেন যে এটা জানা থাকলে ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। আজকের টাইপ স্কুল আর টাইপ মেশিনের জায়গা নিয়েছে যথাক্রমে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর কম্পিউটার। এটা ভালই এবং সময়োপযোগী। কারণ আর্থসামাজিক দিকটার কথা ভেবে যুগের সঙ্গে কিছুটা তাল মিলিয়ে চলাই ঠিক। এর বেশি কিছু নয়। কম্পিউটার- ইন্টারনেট করতে গিয়ে সেটাই ধ্যানজ্ঞান মনে করে ছাত্র-ছাত্রীরা যেন বুদ্ধিচর্চায় ব্রেক না কষে, সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা না হয়ে যায়, বই-কাগজের ছাপা অক্ষরের সঙ্গে সম্পর্ক যেন ছিন্ন না হয়।


ইলেকট্রনিক মিডিয়া তথা ইন্টারনেটের প্লাস পয়েন্টগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে সাংবাদিকতা। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রভাবে সাংবাদিকতার মান আজ অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। দশ-বারো বছর আগেও বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষাতেও হয়তো দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকাগুলোর তথ্য পরিবেশনের মধ্যে কোনও বৈচিত্র্য থাকতো না। আজ পত্র-পত্রিকার সংখ্যা শুধু যে বেড়েছে, তাই না, উপরন্তু নিয়মিত তথ্য ছাড়াও তাতে পাওয়া যাচ্ছে বিজ্ঞান, সাহিত্য, যাবতীয় শিল্পজগতের আলোচনা এবং সমালোচনা। সুতরাং জেনে নেবার পরিধি এবং লেখাচর্চার সুযোগ বেড়েছে বই কমেনি। বিজ্ঞাপনের জগতেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জুড়ি নেই। সব রুচির জন্যই বিজ্ঞাপনে আজ যে বৈচিত্র্যের ছড়াছড়ি, তা সম্ভব হয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দৌলতে।


কট্টর ইন্টারনেট বিরোধী মানুষজনকে বলতে শুনেছি যে, সাইবারস্পেস নাকি দূষণের দখলে। ইউজনিটের পর্নোগ্রাফিক ছবির ভিড় আর অশ্লীলতার মুখরোচক খবরের দৃষ্টান্ত অস্বীকার করা যায় না ঠিকই। কিন্ত দূষিত বই-কাগজের অভাবও কি কম আছে ? এমনকি ঝকঝকে আধুনিক লেখকের রগরগে ভাষায় মেশানো সাহিত্যকতা মাঝে মাঝেই মিশে যায় নির্ভেজাল অশ্লীলতার সঙ্গে এবং নামী সাহিত্যিকদের সৃষ্ট অশ্লীলতা সাহিত্যগুণেও উত্তীর্ণ হয়। নামী শিল্পীর বিকৃত (আমার মতে) শিল্পকলা শিল্পগুণে বিবেচিত হওয়ার নজির ভুরি ভুরি আছে। নগ্ন নারীদেহের বিকৃত ভঙ্গীর মধ্যে কোথায় যে শিল্প লুকিয়ে আছে, সেটা আমারও জানা নেই। নামী লেখক বা শিল্পীর স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের সৃজনশীলতার স্বাধীনতা এবং মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হয়। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নামী-দামি তকমার লেবেল একবার পড়ে গেলে, বাকিটা ভারে কাটে তা সে যে বিষয়েই হোক না কেন। যাইহোক, ব্যাপারটা আপেক্ষিক এবং বিতর্কিত।


বব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহারকে আমি আদৌ ছোট করে দেখছি না। কারণ, বিজ্ঞান গবেষণায় গবেষকদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় ভৌগোলিক দূরত্ব যাতে বাধা না হয়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যেই এর সৃষ্টি। পরে তার নানাবিধ সুযোগ সুবিধে নিয়ে বানিজ্যিক প্রয়োগক্ষেত্র বিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্রকে বহুগুণ ছাপিয়ে গেছে। সেটা খুবই ভালোর দিক। আমি নিজেও ইন্টারনেটের একজন উৎসাহী ব্যবহারকারী। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের চমক আর ঝলকের দিকটাকে বড্ড বেশি তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ্য করছি।


তাহলে কোনটা ? বই না কম্পিউটা চালিত মিডিয়া ?আমার মনে হয় এখনও পর্যন্ত বই এর বিকল্প নেই।  সুস্থ, সামাজিক  সব স্তরের মানুষের কাছে তা সমাদৃত। বেশ কিছু বছর আগে বইমেলায় বই এর ভূমিকা সম্পর্কে স্বনামধন্য একজন ব্যক্তিত্ব একটি মন্তব্য করেছিলেন। মন্তব্যটা এরকম, “বইমেলার তাৎপর্য এই যে এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা, দু তরফের লাভ। একজনের ব্যবসায়িক সাফল্য অন্যজনের উৎকর্ষের সহায়ক।“ এই মন্তব্যের খেই ধরে কল্পনানেত্রে আরও একটা দৃশ্য ভেসে উঠেছে। বই এর বদলে টার্মিনালে টার্মিনালে ছয়লাপ সাইবার কাফে, তথ্য আর খবরের পশরা সাজিয়ে বসে আছে। এক্ষেত্রেও ক্রেতা এসেছেন গাঁটের কড়ি খরচ করে তথ্য কিনতে, মানে ইন্টারনেট থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে। কাফে মালিকের ব্যবসায়িক সাফল্যে কোনও সন্দেহ নেই। তবে ক্রেতার আত্মিক উৎকর্ষের সঙ্গে যোগ হয়েছে মাউস ক্লিকে ইন্টারনেট হাতড়ানোর পাওনা সময় খরচ হয়ে যাবার মানসিক উৎকন্ঠা।


বিষয়টি আলোচন করতে গিয়ে চার-পাঁচ দশক আগে লেখা যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাস এর একটি লাইনের কথা মনে পড়ছে। “ বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।“ ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আবেগবর্জিত বেগের সুগন্ধ-দুর্গন্ধ দুই-ই আছে বলে আমার মনে হয়। তবে যাযাবরের যুগের সঙ্গে তুলনা করলে আজকের পৃথিবীর চেহারাটা অনেকটাই আলাদা। মানুষকে আজ প্রতিপদে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। কাজেই আধুনিক সাজ-সরঞ্জাম যে প্রয়োজন, তা অনস্বীকার্য। আমার মনে হয়, চিন্তাভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে পারলে আজকের দিনে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে বাড়িয়ে নেবার সুযোগ আছে।


দশ-পনেরো বছর আগেও রেফ্রিজারেটর, রান্নার গ্যাস বা টেলিফোন মধ্যবিত্তের কাছে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। আজকাল সেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। ইন্টারনেটের অবস্থাটা সেরকমই হতে চলেছে। আমার মনে হয় আগামী দশ বছরের মধ্যে মাল্টিমিডিয়ার সুযোগ সুবিধে নিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে আই টি-র লম্বা হাত। দরকার হবে না টিভি কিম্বা টেলিফোন এমনকি সাউন্ড সিস্টেমের, অল ইন ওয়ান। নতুন থেকে নতুনতর প্রজন্মের রুচিও আস্তে আস্তে পরিবর্তন হচ্ছে। স্বাক্ষরতার  চেয়ে বড় হয়ে উঠচে কম্পিউটার লিটারেসি। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা সুকুমার রায়, লুইস ক্যারল পড়েনি, পড়েনি ঠাকুমার ঝুলি কিম্বা সত্যজিত রায়। কিন্ত তারা কম্পিউটার লিটারেট। বিয়ে, জন্মদিন বা পরীক্ষা পাশের জন্য আজকাল বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। বলাই বাহুল্য বই  এর কদর দিনে দিনে কিছুটা কমছে। তাই বলে কি লেখকরা কলম ধরবেন না! নাকি প্রকাশকরা প্রকাশনা বন্ধ করে দেবেন! আমার মনে হয় ধুন্ধুমার এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বই-কাগজের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যত বাঁচিয়ে রাখতে হলে লেখক ও প্রকাশকের অস্ত্রে এখন থেকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে শাণ দিতে শুরু কথা উচিত। সত্যিকারের বই পড়ুয়া মানুষের ভরসা এখনও একটুও কমেনি।


Thursday, September 23, 2021

উপাচার্য উপাখ্যান তৃতীয় এবং শেষ পর্ব

 উপাচার্য  উপাখ্যান – পরশু, যা শুনেছি এবং পড়েছি।


১৯৬৮ সাল। অধ্যাপক সত্যেন সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আমরা তখন যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতকোত্তর পর্বে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করেছি।

*******

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষের দিকে, যখন পশ্চিম বাংলার বামদলের সবে শেষের শুরু হয়েছে, তখন খবরের কাগজের একটি সংবাদ পড়ে বেশ কৌতুক বোধ করলাম। রাজ্যের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সম্মিলিত হয়ে শাসক গোষ্ঠীর সমর্থনে সরব হয়েছেন। উপাচার্য পদাধিকারি অ্যাকাডেমিকস বা শিক্ষাবিদদের এমন আচরণ, এর আগে কখনও দেখা যায়নি বা শোনা যায়নি। আমরা ওই পদমর্যাদার যাঁদের দেখে বেড়ে উঠেছি, এবং যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছি, মনে হ'ল এই ঘটনা তারই মূলে কুঠারাঘাত করল। তখন অবশ্য গণতান্ত্রিক অধিকার বোধে মানুষ এমনই উগ্র সচেতন যে, আমার অনুমান, উপাচার্যকুল ভাবলেন সবাই যদি দল করতে পারে, উপাচার্যরাই বা করতে পারবেন না কেন ? এটাই বোধহয় তখনকার উপাচার্যদের মানসিকতা।

*******

এবার কয়েকটা আশাব্যঞ্জক ঘটনার গল্পে আসি। সেইসব উপাচার্যদের আখ্যানে, যাঁরা নিজেদের যোগ্যতায় কোনও রাজনৈতিক ছত্রছায়া অবলম্বন না করে সম্মানজনক ভাবে নিজেদের অধিকার বলে তাঁদের মেয়াদকাল শেষ করেছেন। বরং বলব রাইটার্স বিল্ডিং-এর কর্তাদের চোখে চোখ রেখে মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সত্যেন সেন মহাশয়ের নামটা নিয়েই সেই কারণে শুরু করেছিলাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপকের সঙ্গে সত্যেন বাবুর ব্যক্তিগত পরিচয় থাকার ফলে, ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। বহুদিন আগে আনন্দবাজারের “সম্পাদক সমীপেষু" কলমে অধ্যাপক মহাশয়ের একটা চিঠির প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে ধরলে সত্যেন বাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারা যাবে। ওঁর কথায়, -"…..একদিন ওঁর (সত্যেন বাবুর) ঘরে গেছি, দেখলাম বেশ বিরক্ত এবং উত্তেজিত। বললেন, ‘দেখেছ কান্ড ! রাইটার্স বিল্ডিং থেকে এডুকেশন সেক্রেটারি ফোন করে বলছেন, কী দরকার আছে, আমি যেন একটু রাইটার্সে যাই। আমি বললাম, ‘ডোন্ট ইউ নো, আই অ্যাম দ্য ভাইস-চ্যান্সেলর অব দ্য ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ? আপনার কোনও দরকার থাকলে মাই রেজিষ্ট্রার উইল গো টু সি ইউ, নট মি।“

জনৈক অধ্যাপক, প্রফেসর সেনের সম্পর্কে আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। উনি দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক নেতার মুখে শুনেছিলেন, - “১৯৭৬-৭৭ সাল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এবং তিনি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। একদিন নাকি মুখ্যমন্ত্রী সত্যেন বাবুকে এক বার দেখা করতে অনুরোধ করেন। সিদ্ধার্থ রায় নাকি কথায় কথায় বলেন, ‘ আপনি মশাই কলকাতার ভাইস-চ্যান্সেলর, এটাও বলতে পারছেন না এমন কিছু একটা।‘ সত্যেন বাবু অসন্তুষ্ট হয়ে কংগ্রেস মহলে কাউকে কাউকে জানান। তাঁরা যথারীতি প্রধানমন্ত্রীর কানে কথাটা তোলেন। ক'দিন পরে রাজ্য কংগ্রেসের একটা মিটিং ছিল ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। মিটিং শেষে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধার্থ বাবুকে বলেন, ‘ মানু, (ওঁর ডাক নাম) হোয়েন ইউ গো ব্যাক টু ক্যালকাটা, ফার্স্ট থিং ইউ ডু ইজ টু অ্যাপোলজাইস টু ডঃ এস এন সেন। ডোন্ট ইউ নো হি ইজ দ্য ভাইস-চ্যান্সেলর অব ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি?’ সিদ্ধার্থ বাবু কলকাতায় ফিরে এসেই সত্যেন বাবুর সঙ্গে দেখা করে দুঃখপ্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নেন। জনৈক অধ্যাপক, উপাচার্য সত্যেন বাবুকে জিজ্ঞাসা করে এই ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই করে নেন। উপাচার্য বলেছিলেন, ‘কথাগুলো একেবারে সত্যি।‘ এটা ছিল সেদিনের উপাচার্যের মর্যাদা।

১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হয় বাম জমানা। কয়েক বছরের  মধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে ‘অনিলায়ন পর্বের' প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে সন্তোষ ভট্টাচার্য মহাশয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়ভার গ্রহণ করেন। সন্তোষ বাবু এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। 

তাঁর উপাচার্য কার্যকাল ঘটনাবহুল। তাঁকে উপাচার্যের পদে বহাল করেছিলেন সেদিনের পশ্চিম বাংলার রাজ্যপাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, এ পি শর্মা। প্যানেলে তিনজনের নাম ছিল। বাকি দু'জন বাম সমর্থিত।  সেই আমলের অনেক পাঠকের মনে থাকার কথা যে শাসক দলের কী প্রচন্ড বিরোধীতা ও বাধাবিপত্তির মধ্যে সন্তোষ বাবু উপাচার্য হয়েছিলেন। কার্যভার গ্রহণ করতে তিনি যে দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিপ্লবী কর্মচারী সমিতির সদস্যরা দ্বারভাঙা বিল্ডিংয়ের দোতলার সিঁড়ি পর্যন্ত সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, ‘সন্তোষ ভট্টাচার্য মুর্দাবাদ’,’সন্তোষ ভট্টাচার্য নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। জনৈক অধ্যাপক তাঁর বিভাগের কাজে ওঁর ঘরে ঢুকে সবে কথাবার্তা শুরু করেছেন। । এমন সময় কর্মচারী সমিতির জনা কুড়ি-পঁচিশ জন সদস্য ঘরে ঢুকে স্লোগান দিতে শুরু করে দিলেন। একজন আবার আধপোড়া বিড়ি ওঁর দিকে ছুঁড়ে দিলেন। উনি সারাক্ষণ নির্বিকার, মুখ নিচু করে বসে রইলেন। এই ছবি কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল। এরকম প্রায় আধঘন্টা চলার পর কমরেডরা ক্লান্ত হয়ে প্রস্থান করলে, অধ্যাপক মহাশয় পুলিশ ডাকার প্রস্তাব দেন ওঁকে। ওঁর উত্তর ছিল, ‘পুলিশ ডাকব, তোমার মাথা খারাপ।‘

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কর্মচারীরা কী প্রচন্ড মানসিক অত্যাচার করেছিলেন, তা কহতব্য নয়। সর্বশেষ সংকট দেখা দেয় যখন ডঃ ভট্টাচার্য পাঁচজন বাম ঘেঁষা  কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এই কর্মচারীবৃন্দ চাকরি বাঁচিয়ে রাখার জন্য জাল প্রমাণপত্র জমা দিয়েছিলেন। বামপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কখনোই এই ধরনের আদেশ অনুমোদন করবে না জেনেই উপাচার্য তাঁর জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সিপিআই (এম) নেতা অনিল বিশ্বাসের গর্জে ওঠা প্রতিক্রিয়া, “বিশ্ববিদ্যালয়টি উপাচার্যের বাবার সম্পত্তি নয়।“ বোঝাই যায় যে অনিলায়ন পর্ব তখন জোরদার শুরু হয়ে গেছে। রাজ্যের তখনকার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী শম্ভু ঘোষ, অনিল বিশ্বাসের মতো  ভাষা সন্ত্রাসের কুৎসিত দিকটা এড়িয়ে বললেন, “ডঃ ভট্টাচার্য ওঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।“ ইউনিভার্সিটি  কাউন্সিল তাঁকে ইস্তফা দেবার জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, কে সি পন্তের স্মরণাপন্ন হয়। সন্তোষ বাবুও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তাঁর পদত্যাগের কোনও ইচ্ছা নেই। ইউনিভার্সিটি সেনেট কাউন্সিলের জেদের উপর জারি করা এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন: “আমি এই অনুমানে ভাইস-চ্যান্সেলর পদটি গ্রহণ করিনি যে, সংকট হলে কেন্দ্র আমার সাহায্যে আসবে।“

 কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সাহা ইনস্টিটিউট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের পদে থাকেন। এটা নিয়ম মাফিক ব্যাপার। আমার দেখা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করলে বোঝা যাবে, যে ব্যক্তি নির্বিশেষে সোজাসুজি কথা বলতে উনি কতটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন, অপ্রিয় সত্যি হলেও।             ডঃ রাজা রামান্না, সাহা ইনস্টিটিউটয়ের রাজাবাজার ক্যাম্পাসের প্রেক্ষাগৃহে লেকচার দিতে এসেছেন। পৌরোহিত্যর দায়িত্বে স্বয়ং ডঃ সন্তোষ ভট্টাচার্য। প্রেক্ষাগৃহ কাণায় কাণায় পূর্ণ। বেশ কিছু শ্রোতা দাঁড়িয়ে লেকচার শুনছেন। উপাচার্য, বক্তার পরিচয় পর্ব শেষ করে রামান্না সাহেবেকে বক্তৃতার সূচনা করার অনুরোধ জানিয়ে নিজের জায়গায় বসলেন। বক্তৃতার বিষয়ের মধ্যে কিছুটা ভেজাল ছিল। রামান্না সাহেবের ব্যক্তিত্বের কাছে এরকম জোলো লেকচার কেউ আশা করেননি, অন্তত সন্তোষ ভট্টাচার্য মহাশয় তো নয়ই। সাধারণত স্পেশাল সেমিনারে প্রশ্নোত্তরের পালা থাকে না। যাইহোক, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে পি এইচ ডি করা এবং বহুদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সন্তোষ বাবু মুচকি হাসির মোড়কে বক্তৃতার পরিসমাপ্তি করলেন এই ভাবে, “Well, we expected a cup of hot aromatic coffee from Dr Ramanna, however, he entertained us with some light tea.” অর্থাৎ ডঃ রামান্নার কাছে আমরা গরম সুগন্ধী কফি আশা করেছিলাম। যাইহোক, উনি আমাদের হাল্কা চায়ে আপ্যায়ন সেরেছেন। এই হলেন সন্তোষ ভট্টাচার্য। 


মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একদিন ওঁকে মহাকরণে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এটা-ওটা কথার পর জ্যোতি বাবু নাকি ওঁকে বলেছিলেন, ‘শুনুন, যা হবার হয়ে গেছে। একটা কথা মনে রাখবেন, বেশি বাড়াবাড়ি কিন্ত করবেন না।‘ প্রচ্ছন্ন এই হুমকির কাছে মাথা নত করা তো দূরের কথা। তাঁর ভাবখানা ছিল ‘ আমি কি ডরাই কভু ভিখারি রাঘবে?’ সন্তোষ ভট্টাচার্য এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, কমিউন-এ থেকেছেন, চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগে তিনি জ্যোতি বাবুকে বলে গেলেন, ‘আমাকে ইট-পাটকেল ছুড়লে আমি কি রসগোল্লা ছুড়ব ? গুড বাই।‘

আলিমুদ্দিন স্ট্রীটের রোষানলের সব রকম নির্যাতন সহ্য করেও তিনি উপাচার্য হিসেবে তাঁর মেয়াদ সম্পূর্ণ করেছিলেন, কোনও দিন পুলিশ ডাকেননি, আর শাসক সরকারের সাহায্য পাওয়া তো ছিল দূর অস্ত। কিন্ত সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। একদিন মেট্রো সিনেমার সামনে ট্র্যাফিক লাইটে তাঁর গাড়ি থেমেছে। ডিউটিরত এক কনস্টেবল হঠাৎই তাঁর গাড়ির সামনে এসে স্যালুট করে বলল, ‘স্যর, আপনি চালিয়ে যান , আমরা আপনার সঙ্গে আছি।‘ এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে। আমার জানা নেই, রাজ্যের শাসক দলের সঙ্গে সারাজীবন লড়াই চালিয়ে, কার্যকালের মেয়াদ সম্পূর্ণ করা, ভারতবর্ষে আর কোনও রাজ্যে, কোনও উপাচার্যকে করতে হয়েছে কিনা। তাঁর লেখা, Red Hammer Over Calcutta University বইতে তাঁর অবস্থান উল্লেখ করে গেছেন। কঠোর অথচ ছাত্র দরদী মাস্টারমশাই সন্তোষ বাবুর আর একটা ঘটনা বলে ওঁর কথায় ইতি টানব।

১৯৮৪ সাল। কলকাতায় খুব লোডশেডিং চলছিল। বিডন রো-র পিজি হস্টেলের আবাসিক ছাত্ররা হস্টেলে একটি জেনারেটর বসানোর দাবি নিয়ে সন্তোষ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল দ্বারভাঙা ভবনে। তাদের আশা সন্তোষ বাবু ছাত্রদের দাবি নিশ্চয়ই পূরণ করবেন। সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনে স্মিত হেসে, তাঁর পরামর্শ, ‘ছাত্র বয়সেই তো কষ্ট স্বীকার করতে হবে। তালপাতার পাখা কিনে নাও সবাই। লোডশেডিং হলে তালপাতার পাখার বাতাস খাবে। আমার বাড়িতেও জেনারেটর নেই। আমিও তালপাতার পাখার বাতাস খাই। যাও ক্লাসে যাও। মন দিয়ে লেখা পড়া কর। ভাল রেজাল্ট করলে পরবর্তী জীবনে অনেক সুযোগসুবিধা পাবে।‘ তাঁর এই কথা শুনে সেদিন ছাত্ররা মাথা নিচু করে দ্বারভাঙা ভবনের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এসেছিল। অলিন্দ জুড়ে তখন চলছে : সন্তোষ ভট্টাচার্য গো ব্যাক।


বাম জমানাতে আরও একজন উপাচার্যের কথাও বলতে হয়। তিনি অত্যন্ত সফল   ডাক্তারবাবু, ডঃ ভাস্কর রায়চৌধুরী, তিনিও নিতান্তই ব্যতিক্রম। তাঁর কাছে খবর এল যে কর্মচারী সমিতির এক নেতা একটা অ্যাকাডেমিক ব্যাপারে ঝামেলা করছে। ভাস্কর বাবু সেই নেতাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘পার্টি করেন বলে আপনারা সবাই নিজেদের ভিসি মনে করেন ? মনে রাখবেন ভিসি একজনই, এবং তাঁর নাম ভাস্কর রায়চৌধুরী।‘


প্রথম পর্ব শুরু করেছিলাম বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুত  বাবুর উপাখ্যান দিয়ে। আজ তৃতীয় এবং শেষ পর্ব যে তাঁকে দিয়েই শেষ করতে হবে সেটা ভাবিনি। কী অদ্ভুত সমাপতন। ফেসবুকে পোস্ট করব করব ভাবছি। আজ সকালের কাগজেই উনি আবার খবরে চলে এসেছেন। উনি পাঁচদিন বিশ্বভারতী থেকে ছুটি নিয়েছেন। নানা মহলে চর্চা চলছে যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তলবে দিল্লি রওনা হয়েছেন উপাচার্য। দু'টি তত্ব চালু হয়েছে। এক, ছাত্রদের একাংশের লাগাতার আন্দোলন, একের পর এক বিতর্ক, অনলাইন বৈঠকে বলা কিছু মন্তব্য-সহ বিভিন্ন বিষয় জানতে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে বলে কিছু কিছু মহল থেকে দাবি করা হয়। দুই, বিশ্বভারতীতে কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাব নিয়ে মন্ত্রকের কাছে নালিশ জানাতে নিজেই দিল্লি যাচ্ছেন উপাচার্য। ভাবছি আমরা কী ছিলাম আর কী হয়েছি !

 


 বিঃ দ্রঃ : তিনটি পর্বের লেখাগুলোর প্রতিটি রীতিমত গবেষণা করে লেখা। কাজেই সব তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। ফলে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।

Monday, September 20, 2021

উপাচার্য উপাখ্যান দ্বিতীয় পর্ব

 উপাচার্য উপাখ্যান-কাল, যা দেখেছি।


সময়ের দূরবীন দিয়ে এবার পিছন ফিরে তাকাই। চোখের ওপর ভেসে ওঠে প্রায় সাড়ে সাত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে, ফেলে আসা সুখস্মৃতির কোলাজ। আমার সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর। আমাদের গর্বের জায়গা। ভূ-ভারতের শিল্প-সংস্থা, জাতীয় গবেষণাগার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর সিংহ ভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরা পশ্চিম বাংলার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল। জীবনের ফেলে আসা ওই সাড়ে সাত বছর, আমার স্মৃতিতে আজও চির সবুজ হয়ে আছে। ওই সময়ের মধ্যে তিনজন উপাচার্যকে দেখেছি, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক বিশেষ কালপর্বের উজ্জ্বল প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।   এঁরা হলেন ডঃ ত্রিগুণা সেন, হেমচন্দ্র গুহ এবং গোপাল সেন। শেষ জন অবশ্য কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য ছিলেন, অতি বামপন্থী ছাত্রদের পরীক্ষা বয়কটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সময়ে পরীক্ষা পরিচালনার দায়ভার নিয়ে। সেটাই তাঁর জীবনের অন্তিম কাল ডেকে এনেছিল।  বিস্তারিত বিবরণে পরে আসছি। তবে এই তিনজন  মানুষের অবদান এবং বিপুল বিস্তারের কতটুকুই বা লিখতে পারব! দুই মলাটের মধ্যেই এঁদের বন্দী করা সম্ভব। এই সুবিধা ফেসবুকের দেওয়াল লিখনে সম্ভব নয়।


শুরু করি প্রথম উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা দিয়ে। ১৯৬২ সালে আমরা যখন কলেজে ঢুকেছি তখন উপাচার্য পদটির নাম ছিল ‘রেকটর্'। কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়নি কখনও। তবে ব্যক্তিত্বের সৌম্য দ্যুতি এমনই উজ্জ্বল যে মনে হ'ত, এমন মানুষের ঘরে ঢুকতে গেলে জুতো জোড়া বাইরে রেখে ঢোকা উচিত। এমনই একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর ঠোঁটের ওপর সব সময় স্মিত প্রশান্তির হাসি অথচ চেহারায় একটা অভিজাত রোসনাই।  কখনও সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ না হলেও সব সময়ই মনে হয়েছে যে তিনি এমনই ব্যক্তিত্ব যিনি সাধারণ আর নিজের মধ্যে দুর্ভেদের অলীক দেওয়াল গড়ে তোলেননি অথচ কি অসাধারণ প্রশাসন ক্ষমতা এবং ছাত্রদরদী উপাচার্য। গুগল হাতড়ে একটি ঘটনাই আমার মন্তব্যকে সমর্থন করে।

সালটা ১৯৬৬। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ চলছে। কোনও উপাচার্যই টিকতে পারছেন না। ত্রিগুণা সেন সদ্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ ছেড়েছেন, নীতিগত কারণেই।  শিক্ষা কমিশনে তাঁরই সুপারিশ ছিল, কোনও উপাচার্যেরই দশ বছরের বেশি ওই পদে থাকা উচিত নয়। এবার তাঁর ইচ্ছা, রামকৃষ্ণ মিশনের কোনও স্কুলে পড়াবেন। কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে বিএইচইউ-র দায়িত্ব ভার নেবার অনুরোধ জানায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বেনারস স্টেশনে অপেক্ষা করছে। গণ্ডগোল এড়াতে বিএইচিউ কতৃপক্ষ ওঁকে মোগলসরাই স্টেশনে নামতে অনুরোধ করলেও, উনি নাছোড়। ছাত্রদের ভয় ? ১৯৪৩ সাল থেকে যিনি বর্ষে বর্ষে, দলে দলে ছাত্র সামলেছেন, তিনি কেন ভয় পাবেন? উপাচার্য বেনারসেই গেলেন, ছাত্রদের বললেন, তোমাদের যা কিছু সমস্যা, অভিযোগ যদি শুধু আমাকেই বলবে প্রতিশ্রুতি দাও, বাইরের কাউকে নয়, তাহলেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকব। ছাত্ররা তাঁর কথা মেনে নিয়েছিল। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মী সকলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই সেদিন শান্তি ফিরেছিল বিএইচইউ-তে। পরবর্তী জীবনে উনি কলকাতার মেয়র, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, কত না দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি, কিন্ত তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমে ছিল যাদবপুর। ছাত্রগতপ্রাণ মানুষটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন নিজের আদর্শ আর চরিত্রের দৃঢ়তায়। ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য ছিল তাঁর অবারিত দ্বার। যে খোলা মনে কথা বলার পরিবেশ তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা যাদবপুরের গর্ব। 


শ্রদ্ধেয় ত্রিগুণা সেনের পরে তাঁর জায়গা অলঙ্কৃত করেন গুহ সাহেব। হেমচন্দ্র গুহ। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং সর্বময় কর্তা, একই সঙ্গে অসাধারণ শিক্ষক। ওঁর ব্যক্তিত্ব ত্রিগুণা সেনের একদম বিপরীত মেরুতে। ক্লাসে ছাত্রদের আকথা-কুকথা বললেও কোনও ছাত্রের সাহস ছিল না যে কোনোদিন তারা ক্লাস ফাঁকি দেয়। ছাত্রদের মাঝেমধ্যে চড়-থাপ্পড় মারতেও দ্বিধা করতেন না। এমনই রাসভারি মানুষ যে মনে হ'ত মুখোমুখি কথা বলতে গেলে ব্যক্তিত্বের বর্মের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হবার সম্ভাবনা আছে। আমার দাদা ১৯৬৩ সালে ওই ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তাঁর কথায়, “ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং যতটুকু শিখেছি তার সিংহ ভাগ ওঁরই অবদান।“ আমাদের সমসাময়িক ওই ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের কাছেও আমার দাদার কথারই অনুরণন শুনেছি। তিরিক্ষে মেজাজের মানুষের ছাত্র দরদের প্রমাণ তাহলে কোথায়! এর চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল মন্ত্রমুগ্ধ করা ক্লাস নেবার ধরনে। এমন নিখুঁত পড়াবার ধরণ যে ছাত্রদের প্রশ্ন করার কোনও জায়গা থাকত না। গুহ সাহেব অবসরের দোরগোড়ায় পৌঁছে উপাচার্য হয়েছিলেন। কাজেই ওঁর উপাচার্যের কার্যকাল সাকুল্যে দু'এক বছরের বেশি নয়। ছাত্ররা ওঁকে ভীষণ ভয় পেত। কিন্ত শ্রদ্ধা মেশানো সেই ভয়ের জাত ছিল অন্য রকম। সেটা অনুভূতির ব্যপার। উল্লেখ্য যে, উপাচার্যের দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গেই উনি নিয়মিত ক্লাস নিতেন। আর একটা ঘটনার উল্লেখ করে গুহ সাহেবের কথা শেষ করব। ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকে সত্যেনদার বিখ্যাত ক্যান্টিন।  গুহ সাহেব ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়া মাত্রই, ক্যান্টিনের হৈচৈ স্তব্ধ হয়ে যেত, যতক্ষণ না উনি দৃষ্টির বাইরে চলে যান। অথচ উনি হাঁটতেন মাথা নিচু করে। উনি ছাত্রদের অসুবিধার কারণ হয়েছেন বলে কখনও শোনা যায়নি।


এরপর আসেন গোপাল সেন। তিনি তখন ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ডীন। পরবর্তী সময় উনি কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য হয়েছিলেন। ওঁর সঙ্গে ১৫ মিনিট মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। মাস্টার্সের থিসিস জমা দেবার আগে ডীনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এটা একটা নিয়ম মাফিক ব্যাপার। ডীনের একটা স্বাক্ষর। আমার থিসিস শিরোনাম ছিল, “ফায়ারিং সার্কিট অফ এ থাইরিস্টার কন্ট্রোলড্ পাওয়ার সাপ্লাই।“ অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকতেই হাত উঠিয়ে চেয়ারে বসবার ইঙ্গিত দিলেন। থিসিসের শিরোনাম দেখে ছদ্ম বিস্ময়ের ভঙ্গীতে ভ্রুকুঞ্চিত করে জিজ্ঞেস করলেন,-”করেছ কি ! নেভালে কী করে!” এরপর থিসিসের সম্বন্ধে দু'চার কথা বলে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দ্বিধায় সই করে দিলেন। পারস্পরিক বাক্যালাপের উষ্ণতায় বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে ওইটুকু সময়ের মধ্যে আমার অল্প জ্ঞানের স্বল্প বাক্য বিনিময়ের আদান-প্রদান আমাদের সম্পর্ককে নৈকট্য দিল। ওইটুকু সময়ের কথোপকথন প্রায় পঞ্চান্ন বছর বাদেও আমার স্মৃতিতে আজও সমান সতেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাটানো ওই সাড়ে সাত বছর আমার জীবনে স্বর্ণযুগ। আমি বি ই, এম ই এবং কলকাতা না ছাড়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়াতে প্রায় মাস ছয়েক গবেষণা সংক্রান্ত কাজে যুক্ত হয়েছিলাম। চাকরির অবস্থা খারাপ হবার ফলে শেষ পর্যন্ত কলকাতা ছাড়তেই হ’ল। 

ছাত্রদরদী অস্থায়ী উপাচার্য কোনো ভাতা নিতেন না; গাড়ি ব্যবহার করতেন না। এমনকি উপাচার্যের চেয়ারেও বসতেন না। সত্তরের দশকের শুরুতেই উগ্র বামদল ফতোয়া দিল, -“বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হোক, পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল হোক।“ শিক্ষককুল সন্ত্রস্ত; অকুতোভয় উপাচার্য নারাজ। প্রাণ নাশের হুমকি সত্বেও, উপাচার্য নির্বিঘ্নে পরীক্ষা নিলেন। পুজোর ছুটি পড়ে যাওয়ায় ছাত্ররা পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট নেবে কী ভাবে ? ওঁর সহজ সমাধান। ছাত্রদরদী উপাচার্য ঘোষণা করলেন ছুটিতে ছাত্ররা উপাচার্যের বাড়িতে এসে প্রভিশনাল সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারে। সেই ছুটিতে সকাল-বিকেল তাঁর বাড়িতে ছাত্রদের ভিড়। উপাচার্য নিজের হাতে বিলি করেছেন সার্টিফিকেট। অবসরের আগের দিন, তিরিশে ডিসেম্বর, ১৯৭০ সাল। ক্যাম্পাসের মধ্যেই বাড়ি ফেরার পথে অতি বাম ধারায় উদ্বুদ্ধ নকশালপন্থী ওঁরই ছাত্ররা নৃশংস ভাবে তাঁকে খুন করে। জনশ্রুতি,  শ্রেণীশত্রু গোপাল সেনকে পিছন থেকে ছুরি মেরেছিলেন যে কমরেড, তিনি নাকি কলকাতার এক বিখ্যাত ডাক্তারের ছেলে; ধরা পড়েনি; তাঁকে রাতারাতি পুঁজিবাদের পীঠস্থান মার্কিন রাজ্যে পাঠিয়ে দেন তাঁর ডাক্তার বাবা। সেই শুরু শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রবেশ। একটা কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানে ব্যাপক পরিকাঠামো অত্যন্ত জরুরী। যে তিনজন যশ্বসী উপাচার্যের সম্বন্ধে আলোচিত হল, তাঁদের সময়ে পরিকাঠামো তৈরি করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, টাকাকড়ির টানাটানি ছাড়াও আরও অনেক প্রতিন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্ত তাঁরাই ছিলেন এই পরিকাঠামো সৃষ্টি করার প্রধান স্থপতি। তাঁদের নিরলস পরিশ্রমের ফসলই আজকের যাদবপুর।

উপাচার্য উপাখ্যান প্রথম পর্ব

 উপাচার্য উপাখ্যান, আজ কাল পরশু/ যা দেখছি, যা দেখেছি, যা শুনেছি।


এই দেওয়াল লিখনটা তিন পর্বে ভাগ করে নিচ্ছি। কারণ এক খন্ডে প্রকাশ করলে অনেকটা বড় হয়ে গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে, অথচ অনেক কিছু তুলে ধরার আছে, বিশেষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের প্রজন্মের কাছে। ফেসবুকে দীর্ঘ লেখা পড়তে আমার ধৈর্য থাকে না। কাজেই এই কৌশল। 


আজকের পর্ব উপাচার্য উপাখ্যান - আজ, অর্থাৎ যা দেখছি।


 শিক্ষাঙ্গনের শিরোনামে এখন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, মাননীয় বিদ্যুত চক্রবর্তী মহাশয়। ৭ই অগাস্ট অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম সার্ধশতবর্ষ কেটে গেল (জন্ম ১৮৭১ সালের ঐ দিনটিতে)। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর শিল্পচর্চার আদিগুরু তথা এক সময়ের আচার্য। তাঁর সার্ধশতবর্ষ এমন মৌনতায় কাটবে, তা ভাবেননি ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর। উপাচার্য মহাশয়ের কোনও হেলদোল নেই। উনি বর্তমান আচার্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কিছুই করেন না। অনলাইনে যখন ক্লাস, মিটিং ইত্যাদি দিব্যি চলছে, তখন প্রতীকি অনুষ্ঠান হিসেবে কিছুই কি করার যেত না ? মাননীয় উপাচার্যের কানেই  হয়তো তিনি কথাটা তোলেননি, যদি চাকরি চলে যায়।

 অথচ, অমর্ত্য সেনের শান্তিনিকেতনের বাড়ির জমির কিছুটা বিশ্বভারতীর সম্পত্তির অংশ বলে দাবি করেছিলেন তিনি এবং নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বিদ্যুৎগতিতে আচার্যের নজরে আনেন। কারণ উনি জানতেন যে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে  অমর্ত্য সেনের সঙ্গে মোদীজীর সম্পর্ক আর যাই হোক মধুর নয়। অমর্ত্য বাবু বৈধ কাগজপত্র দাখিল করে প্রমাণ দিয়েছেন যে ওঁর বাড়ি প্রতিচীর চৌহদ্দি বহু বছরের ইজারায় নেওয়া হয়েছিল যার মেয়াদ শেষ হতে এখনও বহু বছর বাকি।


সাম্প্রতিক কালে বিদ্যুত বাবু অতি সক্রিয়তায় ছাত্র-ছাত্রী সমেত তিনজনকে বহিষ্কার করেছেন। ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে ওঁকে গৃহবন্দী করায় আঞ্চলিক পুলিশ প্রশাসনের নজরে এনেছেন। শেষমেষ উনি আচার্যের স্মরণাপন্ন হয়েছেন। কেবল ছাত্র বহিষ্কারে উনি থেমে থাকেননি। আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ যে সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের আটজনকে বরখাস্ত করেছেন, ঊনিশ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, আট জনের বেতন এবং অবসরকালীন প্রাপ্তি আটকানো ও তিরিশ জনের অধিক কর্মীকে শোকজ নোটিস ধরানো হয়েছে। একাধিক শিক্ষককে সর্বসমক্ষে অশালীন ভাষায় অপমান করারও অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। উপাচার্যকে যেখানে আমরা অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত,বিদ্যুত বাবুর আচরণ সেখানে স্বৈরতান্রিক শাসকের ভূমিকা পালন করছে। অত্যন্ত বেদনাদায়ক।


এবার আসি আরও এক উপাচার্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক সুরঞ্জন দাসের পূর্বসূরি, অভিজিত চক্রবর্তী মহাশয়ের আখ্যানে। কি আশ্চর্য, তিনিও ছিলেন চক্রবর্তী। উনি ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশ ডেকেছিলেন। এই সিদ্ধান্তে  শিক্ষককুলের একাংশের আপত্তিতে উনি কর্ণপাত করেননি। দীর্ঘ চার মাসের টানাপোড়েনে অচলাবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে অনশনরত ছাত্র-ছাত্রীদের অনশন ভঙ্গে অনুরোধ জানাতে প্রায় মাঝরাতে রাজ্যের  মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হয়। শোনা যায় অভিজিত বাবু ছিলেন তৃণমূল ঘেঁষা। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে ওঁকে পদত্যাগ করতে হয়। শিক্ষাঙ্গনে পুলিশের হস্তক্ষেপ শুধু লজ্জার নয়, তা প্রমাণ করে ধামাধরা উপাচার্যদের অক্ষমতাও বটে।


এরই মধ্যে রূপোলি রেখা হলেন বর্তমান উপাচার্য ইতিহাসবিদ, শ্রদ্ধেয় সুরঞ্জন দাস মহাশয়। আগে উনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। শুধু একটা ঘটনাই প্রমাণ করে যে আজকের দিনেও উনি কতটা ছাত্রদরদী। মাত্র বছর দুয়েকের আগের ঘটনা। ধনখড় সাহেব তখন সবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে চেয়ারে বসেছেন। সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী বাবুলসুপ্রিয় এবিভিপি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় অংশগ্রহণে  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। ওঁকে কালো পতাকা দেখানো ছাড়াও ছাত্রদের ওঁর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতেও লিপ্ত হতে দেখা গেছে। এই আচরণ আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়, বরং যথেষ্ট নিন্দনীয়। আচার্য, ধনখড় সাহেব রাজভবন থেকে পুলিশ নিয়ে এসে বাবুলসুপ্রিয়র উদ্ধার কাজে লেগে পড়লেন। মন্ত্রীমশাই উপাচার্যকে ডেকে পাঠালেন এবং উপাচার্য পদমর্যাদার একজনকে অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গীতে, কৈফিয়ত তলব করেন কেন উনি পুলিশ ডাকেননি। উপাচার্য বলেছিলেন, "পুলিশ ডাকার আগে আমি পদত্যাগ করব।" এগুলো শুধু কাগজের খবর নয়, স্বচক্ষে টিভির পর্দায় দেখা। আর একদিকে এবিভিপির নেতা-কর্মীরা ভাঙচুর চালালো। ভাঙচুরের তালিকায় আসবাব ছাড়াও ছিল কিছু শিল্পকর্ম। এরপর অগ্নি সংযোগে লিপ্ত হ'ল। মন্ত্রীমশাই এবং রাজ্যপাল সাহেব উপাচার্যের ওপর বিষোদ্গার করলেও, এবিভিপির নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে একটি কথাও খরচ করলেন না।


শুরু করেছিলাম বিদ্যুত বাবুর কথা দিয়ে। তাঁর  কথা দিয়েই এই পর্বের ইতি টানব। ইতিমধ্যে বহিষ্কৃত ছাত্ররা আইনি লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছিল। সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতিরা উপাচার্যের এই শাস্তি বিধানকে ভর্ৎসনা করে রায় দিয়েছেন, এটা লঘুপাপে গুরুদন্ড দেওয়া হয়েছে এবং ছাত্রদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ সমেত অবিলম্বে ক্লাসঘরে ফিরিয়ে নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়াও, উপাচার্য মহাশয়কে কোনও বিতর্কিত মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের তরফে বিনা পারিশ্রমিকে  আইনজীবী ছিলেন রাজ্যসভার সি পি এমের সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য।  যাইহোক, মোদ্দাকথা, টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোর্ট পর্যন্ত গড়ালো এবং যথারীতি বিদ্যুত বাবুর মুখও পুড়ল। প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে উপাচার্যের ভূমিকা যেখানে সর্বাধিক হবার কথা, সেখানে এটা কি প্রত্যাশিত! বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে এসে আচার্য, মাননীয় নরেন্দ্র মোদী রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে ,"ভয়শূন্য চিত্ত এবং মুক্ত জ্ঞানের কথা বলে গিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেই উনি আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখতে চান।" বদলে দেখা যাচ্ছে যে সেখানে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভয় আর বিশ্বাসহীনতার পরিস্থিতি। শিক্ষক, ছাত্র, কর্মী আশ্রমিক থেকে স্থানীয়দের একাংশ নানা কারণে উপাচার্যের বিরোধিতা করছেন। উনি একটি আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ে নির্দিষ্ট বিভাগের ফ্যাকাল্টিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, "তাঁদের আচরণ কুকুরের মতো।" বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে এই অপসংস্কৃতি আসলে শিক্ষাব্যবস্থার রাজনীতিকরণের ফল, যা সিপিএম সরকারের আমদানি, এবং শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের শুরুতে। সেই ট্র্যাডিসন সমানে চলেছে। আশার কথা, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মাননীয় ধর্মেন্দ্র  প্রধান বিশ্বভারতীর এই অচলাবস্থা কাটানোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছেন, সম্ভবত মোদীজীর পরামর্শে। প্রথম পর্বের আখ্যান এই পর্যন্ত। পরের পর্বগুলো এতটা দীর্ঘ নয় , কারণ সেগুলো আদৌ এরকম ঘটনাবহুল  নয়।

Thursday, September 16, 2021

Pakistan, a parasite

 Pakistan, a parasite state and it's complicity with the Taliban:


Soon after capture of Kabul by the Taliban, on this date of last month, Pakistani PM, Imran Khan's immediate reaction, "Afghan breaks shackles of slavery." A short time later, chief of ISI, the most clandestine organisation of the world, dashed to Kabul on a surprise visit, holding a meeting with his counterparts from countries in the region with the begging bowl. He is the man, orchestrated in the formation of the Taliban led Afghanistan govt. in Kabul as evident from the composition of Afghanistan govt. Concurrently he pledged for Pakistan's support to Afghanistan to get rid of the deepening humanitarian crisis and to take steps to prevent economic meltdown. In a display of solidarity, Pakistan sent three plane loads of relief to Kabul; however, reports indicate these were photo-ops with limited aid.


All political and military entities in Pakistan are singing the same tune of global economic and humanitarian support to Afghanistan. The main reason behind this is that Pakistan itself is  in financial doldrums and facing food shortages. It cannot afford to fund and feed an additional 40 million without global support.


 But when the world was demanding an inclusive govt. in Kabul with emphasis on women and children, in return for financial support, Pakistan was engaged in creating a govt. in Kabul dominated by pro-Pak elements. The current dispensation in Kabul includes 30 Pashtuns, two Tajiks and one Uzbek. Incidentally, the North Western part of Pakistan is often referred to as the PASHTUNISTAN region where 44 million of Pashtuns, almost 20% of Pak population lives. Whereas, the Pashtun population in Afghanistan itself is just about 15 million out of about a total of 40 million people.


Pakistan has always been a parasite state - holding hands of super powers, it's all weather ally China and USA post 9/11. The country has ever acted as a sanctuary of terrorists as evidenced by providing shelter to the world's most wanted terrorist al-Qiada supremo, Osama bin Laden (I put all the the extremist groups like al-Qaida, Taliban, Mujahideen etc. under the same bracket) in Abbotabad for years, on the nose of ISI head quarters, before being located and killed by American Navy SEAL. At the same time it professed to be a US ally in its fight against global terrorism and in the process obtaining substantial aid in terms of dollars, the signs of all parasites that feed on its host.

Sunday, September 12, 2021

ভবানীপুরের উপনির্বাচনের প্রার্থীরা

 


ভবানীপুর কেন্দ্রের ৮-টি ওয়ার্ডের ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আরও একটি সুযোগ আসছে আগামী ৩০ তারিখ। তৃণমূল, বি জে পি এবং সি পি এম দলের প্রার্থী ঘোষণা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।  বলাই বাহুল্য যে তৃণমূল প্রার্থী হলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশ্ন উঠেছিল, আরও কয়েকটা জায়গার উপনির্বাচনও তো হবার কথা। সব বাদ দিয়ে তড়িঘড়ি ভবানীপুরের নির্বাচন আগে কেন ? এক কথায়, সাংবিধানিক সংকট এড়াতে। কারণ তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সীতে, অথচ বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গেছেন। নিয়ম অনুযায়ী,  একজন হেরে যাওয়া প্রার্থীকে ছ'মাসের মধ্যে ভোটে জিতে না আসলে, তিনি বিধান সভার সভ্য থাকতে পারেন না। আর এখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী আর বাংলা ওঁকেই চায় ওই চেয়ারে।ppp

যাইহোক, এবারের প্রার্থীদের মধ্যে এক জায়গায় মিল আছে। তাঁরা তিনজনেই আইনের মানুষ, আমাদের দিদি ছাড়া বাকি দু'জন রীতিমত পেশাদার উকিল। দিদি একবার বলেওছিলেন তিনি নাকি কয়েকবার কেস লড়েছেন ! এল এল বি ডিগ্রি হয়তো আছে একটা। নিশ্চিত ভাবে আমার জানা নেই।

সি পি এম গত পরশু, শ্রীজীব বিশ্বাসকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। সি পি এম এখনও আশাবাদী দেখে আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনুপ্রেরণা পেয়েছি।অনেকটা বয়স হয়ে গেলেও এবং যথেষ্ট সক্রিয় হওয়া সত্বেও সম্প্রতি বেশ কিছুদিন শারীরিক অসুস্থতা আমাকে কাবু করে ফেলেছে। আমার হতাশ হবার কোনও  কারণ নেই যে, আমি আবার স্বাস্থ্যোদ্ধার করতে পারব না।

এবার আসি বি জে পি প্রার্থী, শ্রীমতী প্রিয়াঙ্কা তিবরেওয়ালের কথায়। তিনিও গত বিধানসভার নির্বাচনে এন্টালি কেন্দ্র থেকে পরাজিত প্রার্থী। এর আগে ২০১৫ সালে পুরসভা নির্বাচনেও তিনি হেরে গেছিলেন। গতকাল, গণেশ চতুর্থীর শুভলগ্নে দিদি মনোনয়ন জমা করলেন। বিকেলে বি জে পি প্রার্থী ঘোষণা হ'ল। এখন প্রশ্ন হ'ল, রাজ্য বি জে পি তরফ থেকে অনেক নাম পাঠানো হয়েছিল হাই কমান্ডের কাছে। কিন্ত প্রিয়াঙ্কাকে বেছে নেবার কারণ কি ? অনেকগুলো তত্ব উঠে এসেছে।

(১) দিল্লির কর্তাদের একটাই পথ জানা আছে। রাজ্যে ক্ষমতায় যে সরকার আছে, তাকে যে বা যারা অপদস্থ করতে পারবে সেই পুরস্কৃত হবে। প্রিয়াঙ্কা বি জে পি হাইকমান্ডের নজরে এসেছেন কারণ, ভোট পরবর্তী হিংসার সি বি আই তদন্ত চেয়ে বি জে পি-র পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন পিয়াঙ্কাই। একদম সঠিক পদক্ষেপ। প্রিয়াঙ্কার জন্য শুভেচ্ছা রইল। শুধু একটা উপদেশ। প্রচারের আগে আশা করব প্রিয়াঙ্কা নিজের বাঙলা উচ্চারণে একটু শাণ দিয়ে নেবেন।

(২) রাজ্য সভাপতি দিলীপ বাবুর তত্ব হ'ল, "একজন মহিলার বিরুদ্ধে একজন মহিলাকে সামনে রেখে লড়াই ভাল। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী প্রতিকূলতা দেখলেই নাকি বলেন, মহিলাকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কাজেই মহিলা হিসেবে তিনি যাতে বাড়তি রক্ষাকবচ না পান, তার জন্য একজন মহিলাকে প্রার্থী করা হয়েছে, - একেবারেই জোলো যুক্তি বলেই আমার মনে হয়েছে।

(৩) আমার নিজের যুক্তিটা এরকম- জনবিন্যাসের ভিত্তিতে ভবানীপুরের একটা বড় অংশ অবাঙালী। কাজেই সেখানে হয়তো প্রিয়াঙ্কার একটা বাড়তি সুবিধে পাবার সম্ভাবনা আছে।

সময় কথা বলবে। কাজেই সব সম্ভাবনার অবসান হবে আগামী মাসের তিন তারিখ।

Tuesday, September 7, 2021

INDIA's foreign policy

 


Although I'm anything but expert on commenting on Govt. of India's foreign policy. But, being a very senior and responsible citizen of the country, I've some feel, based mainly on experience, for the safety and security of my motherland.

Presently India is bordered only by the rogue countries with routine skirmishes and cross border firings and substantial fatalities at times. Although our honourable PM made very sincere effort to establish good relations to more or less all the countries on the globe including Pakistan. (surprise visit to Mr.Nawaz Sharif's family occasion on his way back to India from Russia during the early part of his first term.) Pakistan once appeared to be caving in to American pressure, is now strong enough, holding hand of it's all- weather-friend China and now mighty Taliban by it's side. 

Time has now come for India, still considered a US ally, to judge its foreign policy anew, particularly after the American fiasco in Afghanistan. Recently Mr. Modi had one hour long telecon with Mr Putin. He seems to keep also other options open and that's the reason he's slated to meet Mr Biden by the turn of this month. But it's a very humble reminder to Mr. Modi that despite India being actively engaged in QUAD, America only prioritizes its own interest. In Biden's predecessor, Trump's language "AMERICA FIRST" is the American policy.  One should not forget that once Pakistan was the closest non-NATO ally of US. presently US-Pakistan relation is at an ebb.

Under the prevailing circumstances India should not distance itself from her time-tested ally Russia.

অভিষেক প্রেসের মুখোমুখি

 এ বি পি আনন্দ channel-এ এইমাত্র দেখলাম যে, অভিষেক ED-র ৮ ঘন্টা জেরা সামলে PRESS COFERENCE করছে। একটা ব্যাপার appreciate করতেই হচ্ছে। পিসির মতো ওর জোস এবং আত্মবিশ্বাস আছে। আর ইংরেজি, বাংলা এবং হিন্দী ভাষায় ঠান্ডা মাথায় (unlike his aunt) অথচ বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে কথা বলায় সমান স্বচ্ছন্দ। ওর leadership quality আছে বলেই মনে হয়েছে আমার। কোনও বিতর্কে যাচ্ছি না।

Friday, September 3, 2021

Hurricane Ida

 North East part of US has been terribly affected by the hurricane 'Ida'. Newspaper reports 20 dead in flooding in a small Tennessee town (population about 6.7 million). Ida's land fall in Louisiana (population 4.6 million) left 1 million people without power, for weekS, meaning more than at least, 7 days. Yesterday my niece, a resident of DC messaged me that she's receiving calls from friends from different corners of NE of US that they are without power from Monday (she writes since Tuesday which is our Monday) indicating today they're without power for the fifth day. 

With this backdrop,  I come to  one of my experiences during AMPHAN 2020 in West Bengal. Its from one of the very senior CESC personnel, grandson in terms of relation, with distinguished academic profile, the son of my own niece. At that time, I just gave him a call to assess the situation. I write in exact verbatim "Dadu amra khub chape acchi, dudin bari jete parini" , (Grandpa, we're under tremendous pressure, I couldn't go home for two consecutive days) On enquiry I was informed that in one side the pressure from WB ruling party and at the other end the unreasonable and furious local residents. In Kolkata (population almost 14 million and densely dotted with buildings) the power were restored in 4/5 days except in some very specific places in deep south like Behala and Tollygunge who faced  power shedding for a week or so. 

My conclusion is that, we urban people are not only impatient but not amenable to logic how a catastrophic situation impacts the public life from a natural calamity of the magnitude of AMPHAN. The fatality figure in WB(population about 96 million) was 118. Readers are requested to compare with the US data. The problem is that the service providers are always at the receiving end and there's a tremendous trust deficit between the service takers (whose expectation levels are very high) and service givers. Urbanites in this country in particular, should think themselves to be extremely privileged, certainly comparable to the privileges enjoyed by the people of world's most developed countries with most modern infrastructure. At least the data explains that. 

Sunday, August 29, 2021

Biden's surrender to Taliban

 


Just a couple of days ago, news paper hits the headline, that reads "BIDEN SAID NO TO ALLIES & YES TO TALIBAN". Taliban captured Kabul on 15th of August, the Independenc day of my beloved country, India. Soon after, the evacuation of people from different nations including Afghans started taking place more or less on a routine basis, but not without problems. In the mean time the Talibans set the deadline for American troops' complete evacution by 31st August. Mr. Biden kept quite for some 2/3 days and assessing the situation made a statement, that the deadline could be extended. The episode that followed soon, exposed Mr. Biden and America's selfish attitude. On 26th, suicide attackers brutally killed about 170 people including 13 American soldiers. The US said it was the deadliest day for American forces in Afghanistan since August 2011. That forced Mr. Biden's flip-flop and making the statement that took the headline. He virtually surrendered to Taliban diktats ignoring America's allies and ignoring responsibility of millions of  common Afghan nationals. Mr Trump after coming to power had said that "America First". Mr. Biden's statement is no different, but for the wordings. 

I've a habit of penning down important quotes in a personal notebook by distinguished people. Because they have the power of narrating a truth in short sentences with loaded words. I take shelter under one such quote made by British poet and novelist David Holbrook after American debacle in Vietnam War. The quote says, "The world came to know the mind of American in the Vietnam War. It was the true expression of American National defects,  'the culmination of mindless civilization using criminal means to achieve corrupt ends'. Mr Biden are you listening!.

Tuesday, August 24, 2021

Shame to US

 


America's ill planned hasty exit from Afghanistan has diminished her standing in the world as well as to her own countrymen. The utter intelligence failure is unforgettable as it was evident from the manner and speed that the Talibans captured Kabul after two decades. It questions its political wisdom , because the peace talks it arranged with Talibans at Doha has miserably failed. Mr Biden's handling of the crisis in Afghanistan resulted chaotic scenes in airport as thousands of Afghan nationals as well as the foreign nationals trying to flee Kabul following the hard-line Islamist group return to power.

I was watching BBC news last night. Even  America's closest ally in waging war against Saddam Hussain, the former British PM, Tony Blair strongly criticized your move in Afghanistan. 

President Ashraf Ghani fled the country and made his safe passage to UAE as the Talibans closed in to the capital, with four cars and a chopper loaded with money and the government crumbled like house of cards and American soldiers ran away from the battlefield. Withdrawing guns from Afghanistan was perhaps much easier than imposing strict gun control rule on its own soil. Deadly mass shootings are nothing new in USA. There were 19000 gun violence death in 2021only. This is Mr Biden's zero tolerance measure against gun violence. It seems US constitution allows civilians to be in possession of fire arms for personal security. 

I wonder how with only 75000  troops, 

Taliban could capture Afghanistan with about 300000 well equipped Afghan troops ! Impossible. It's either corruption of Ghani regime who allowed siphoning money allocated for training Afghan youths to his own elite group. The number of youths trained was much less than 300000. Or, there was dormant, but strong Taliban grip in the Afghan military, another instance of intelligence failure. It's of course my own surmise based on facts and figures as obtained from both print and electronic media.

By the way, what is the role of UN Security council ? There are four permanent members other than US. They are just acting like fence sitters enjoying the situation which is engendering instability in Afghanistan. 

Now that the Taliban has captured the country again, will the new regime provide gender justice or suppress women ruthlessly as they did in their earlier rule between 1996 through 2001 ? It won't be that easy.

There are streaks of silver lining. I feel delighted to see the Afghan women, cutting across their ethnic identity took to the streets of Kabul with heavy arms on their shoulder. This is indeed a very positive sign. At another remove Northern Alliance, has posed a tough fight against the Talibans and the territory around is still free from them.

Technologically the world has changed in two decades. Power of social media is immense. Revolt and resistance should come from within the society itself and that's exactly what's happening in Panjsheer, the seat of the Northern Alliance

Taliban should not forget that 2021 is not  1996. The world has moved forward, so have the Afghan women.

Wednesday, August 11, 2021

কাল প্রত্যুষে

 


It's an attempt to translate a famous poem by Victor Hugo, both in English and Bengali in my own way. Victor Hugo was a French poet, a writer and a dramatist.  Any problem faced by the reader in comprehending the translation should be considered as my failure. 

এটা ফরাসি কবি , লেখক এবং নাট্যকার ভিক্টর হিউগোর একটি বিখ্যাত কবিতা, ইংরেজি এবং বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার প্রচেষ্টা মাত্র। আমি নিজের মতো করে বুঝে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। কাজেই পাঠকের বুঝতে সমস্যা হলে সেটা আমার ব্যর্থতা বলে ধরে নিতে হবে।

 C'est une tentative de traduction d'un poème célèbre, en Anglais et en Bengali à ma manière, du grand poète, écrivain et dramaturge Victor Hugo. Tout problème de compréhension de la traduction doit être considéré comme mon échec. 


              Demains dès l'aube

              ___________________

             

Demains dès l'aube à 

l'heure où blanchit la campagne, 

Je partirai, Vois-tu, je

sais que tu m'attends. 


J'irai par la fôret, 

J'irai par la montagne, 

Je ne puis demeurer,

Loin de toi

plus longtemps.


Je marcherai les yeux,

Fixés sur mes pensées, 

Sans rien voir au-dehors, 

Sans entendre aucun bruit,

Seul, inconnu, le dos Courbé, 

les mais croises,

Triste, et le jour pour moi

sera comme la nuit.


Je ne regarderai ni l’or, 

du soir qui tombe, 

Ni les voiles au loin

descendant vers Harfleur.

Et quand j’arriverai,  je

mettrai sur ta tombe

Un bouquet de houx vert

et de bruyère en fleur. 

____

Harfleur : petite ville au bord de la Seine entre le port du Havre d'où part le poèt et le village de Villequier où il se rend. 

La poème décrit une visit sur la tombe de sa fille de 18 ans Léopoldine, quatre ans après son mort. Elle est décédée le 4 Septembre 1843, noyée près du village Villequier sur les bords de la Seine lors d'une balade au bateau. 

___________________________________


                   Tomorrow at dawn 

                 ______________________

Tomorrow at dawn 

when the land turns white,

I'll leave, you see 

I know that you’re waiting for me. 


I'll go through the forest, 

I'll go by the mountains, 

I can’t stay far from you any longer.


I'll walk fixing my eyes 

in my thoughts. 

Without seeing anything outside, 

without listening to any noise. 

Stranger, alone, my head bowed ,

 hands folded,

depressed, and the day for me 

will be as good as the night. 


I'll neither look at the 

gold of the falling evening, 

nor the sails in the distance 

descending towards Harfleur.

And, when I'll arrive, 

I'll put on your grave 

a bouquet of green holly 

and heather in bloom. 


Harfleur :  A small town on the banks of the River Seine  between the port of the Havre from where the poet leaves and the village of Villequier where he goes.

The poem describes a visit to his 18 years old daughter LÉOPOLDINE's grave four years after her death. She died on September 4  1843, drowned near the village Villequier on the bank of Seine during a boat trip. 

_______________________________


                          কাল প্রত্যুষে

                          ___________

কাল ভোরের আলো ফুটবে, যে মুহূর্তে

গ্রামাঞ্চল সাদায় সাদায় ব্যাপ্ত হবে,

তুমি দেখো, তখনই আমার যাত্রা শুরু হবে।

আমি জানি তুমি আমার অপেক্ষায় থাকবে।


আমি জঙ্গল পেরিয়ে যাব,

আমি পাহাড় ডিঙিয়ে যাব,

তোমার থেকে আমাকে আর বেশিক্ষণ

দূরে রাখা যাবে না।


দৃষ্টি চিন্তায় স্থির রেখে 

আমি অবিরাম চলতে থাকব। 

বাইরের কোন কিছুই আমাকে

প্রভাবিত করতে পারবে না, 

না কোনও দৃশ্য, না কোনও শব্দ। 

একলা, অপরিচিত, নত মস্তকে, করজোড়ে,

দুঃখকে সঙ্গী করে, দিনরাত এক করে,

আমি চলতে থাকব। 


পড়ন্ত সায়াহ্নের গোধূলিবেলা

আমার নজর কাড়তে পারবে না, 

না পারবে দৃষ্টি কাড়তে 

হরফ্লিউরের দিকে ভেসে আসা

পালতোলা নৌকোর ঝাঁক। 

আর যখনই আমি পৌঁছে যাব, 

তখনই আমি তোমার সমাধিতে রেখে দেব

সজীব, শ্যামল একগুচ্ছ গুল্ম, 

আর প্রস্ফুটিত পুষ্পার্ঘ্যের পরশ।

_______

হরফ্লিউর : হাবরে বন্দরের মাঝখানে সাইন নদীর তীরে একটি ছোট্ট শহর, যেখান থেকে কবির যাত্রা শুরু এবং ভিলিকুইয়ার গ্রাম, তাঁর গন্তব্য স্থল। 

কবিতাটি তাঁর অষ্টাদশী কন্যা, লিওপোল্ডিনের মৃত্যুর চার বছর পরে তার কবর পরিদর্শনের কাহিনী। ১৮৪৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, নৌকা বিহারের সময় সাইন নদীর তীরে ভিলিকুইয়ার গ্রামের কাছে নৌকাডুবি হয়।

Wednesday, August 4, 2021

সারপ্রাইজ

                     


ঘড়ির কাঁটা বেলা ন’টার দিকে গড়িয়ে চলেছে। রান্নাঘর থেকে দালানের দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িতে চোখ পড়তেই কাঞ্চনের খেয়াল হ'ল যে শোবার ঘরে তার ঠাকুর সিংহাসনে রোদ এসে পড়েছে। ফ্ল্যাট বাড়ি। আলাদা ঠাকুর ঘর বলে কিছু নেই। পুবের শোবার ঘরে একটা নিরাপদ জায়গা বেছে নিয়ে কাঞ্চন সেখানেই তার ঠাকুর সিংহাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। সকাল-সন্ধ্যে জল-বাতাসা দিয়ে সে নমস্কার সারে। সকালে স্নান সেরে ঠাকুর নমস্কার করে হেঁসেলে ঢোকার আগে সে রোজই জানলাটা বন্ধ করে আসে। আজ অজয়ের একটু আগে আগেই অফিস বেরোনোর তাড়া ছিল। সময়মতো রান্না শেষ করার তাড়ায় জানলা বন্ধ করার কথা বেমালুম ভুলে গেছে।

গ্যাস নিভিয়ে ঘরে এসে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে কাঞ্চন একটু থতমত খেয়ে গেল। তুষারদা ওদের বিল্ডিং-এর গেটের লাগোয়া রাস্তা দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলেছে। এতটাই অবাক হ'ল কাঞ্চন যে ‘তুষারদা’ বলে ডাকার আগেই তার তুষারদা রাস্তার বাঁকের আড়ালে চলে গেছে। কাঞ্চন মনে মনে ভাবে – ‘আজ তো ছুটির দিন নয়। তার মানে তুষারদা অফিস ছুটি নিয়েছে। মনে সংশয় হ'ল, তাহলে কি আমাদের বাড়িতেই এসেছিলেন উনি? সপ্তাহখানেক ধরে কলিং বেলটা খারাপ হয়েছে। সুখেন ইলেকট্রিসিয়ানকে খবর দিয়েছি। তা-ও দিন তিনেক কেটে গেল। সুখেনের পাত্তাই নেই। পুরোনো লোক হলে হবে কি, আজকাল আর খুচরো কাজ কেউ করতে চায় না। আসলে পড়তায় পোষায় না। তাহলে কি কলিং বেলের সুইচ কয়েকবার টিপে সাড়া না পেয়ে চলে গেল তুষারদা!’ বাইরে ঘরের চেয়ারে বসে খবরের কাগজে চোখ বুলোচ্ছিলেন অভয়বাবু, কাঞ্চনের শ্বশুরমশাই। কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল-'বাবা কেউ কি দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল?’

শ্বশুরমশাইয়ের সবিনয় উত্তর-'কই, না তো মা, তবে মনে হ'ল কে যেন পাশের ফ্ল্যাটের বেল বেশ ক’বার বাজিয়ে দুমদুম করে সিঁড়ি দিয়ে নেবে গেল।‘ পাশের ফ্ল্যাটের মণিকা ছেলেকে স্কুলে দিতে গেছে। ওর তো এখন থাকার কথাও নয়! 

ক'দিন আগেই সন্ধ্যেবেলা বেড়িয়ে ফিরে বাবা বলেছিলেন-'বৌমা, তোমার জামাইবাবুকে দেখলাম মোড়ের রিক্সাস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে। ও এখানে এসেছিল নিশ্চয়ই। তা চা-জলখাবার দিয়েছিলে তো?’

- ‘কই তুষারদা তো আসেনি বাবা!’ 

-'ওঃ, তাহলে আশেপাশে কোন কাজে এসেছিল হয়তো, তাড়া ছিল, তাই বোধহয় আসতে পারেনি।

মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগল কাঞ্চনের। এতটা ভাবতো না সে, যদি না সেদিন ভোর হতে না হতেই ও তুষারদাকে ওদের বিল্ডিং-এর গেট খুলে বেরিয়ে যেতে দেখতো। শুধু কি তাই। পাশের ফ্ল্যাটের ওই ডাইনিটাও তখন বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। ওর কর্তা এবার ছুটি কাটিয়ে যাবার পর থেকেই কাঞ্চন, মণিকার মধ্যে কেমন যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে একলা ছেলে নিয়ে থাকে। কর্তার বদলির চাকরি। আড়াই-তিন মাস অন্তর সপ্তাহখানেকের জন্য আসে। আবার চলে যায়। দিনে অন্তত একবার মণি-কাঞ্চন যোগ হতো। আজকাল মণিকা ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে প্রায় দিনই বেরোয়। কেমন যেন আড়ষ্ট ভাব। মুখ চোখের চেহারায় কাঞ্চন আগের মণিকাকে খুঁজে পায় না। সেদিন টুম্পাকে স্কুলে পৌঁছে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে কাঞ্চন দেখল যে মণিকার দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটি ছেলের সঙ্গে ও কথা বলছে। চোখের ইঙ্গিতে কাঞ্চন জিজ্ঞেস করেছিল – ‘কে রে ?’ 

- ‘আমার পিসতুতো ভাই, চটজলদি উত্তর মণিকার। দ্যাখ না, কাল রাতে এসেছিল। থেকে যেতে বললাম। বাড়িতে ফোন করে দিতে বললাম যাতে চিন্তা না করে। থেকে গেল। অনেক রাত্তির পর্যন্ত গল্প করেছি। উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল। দ্যাখ না, চা না খেয়ে চলে যাচ্ছে।‘

ছেলেটি আর বিলম্ব না করে, চলি, বলে নেবে গেল। আরও একদিনের কথা মনে পড়ল কাঞ্চনের। অজয় অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে বলেছিল-'জানো বাস স্টপে মণিকার সঙ্গে দেখা হ'ল। ওর মামাতো দাদা এসেছিলেন, নতুন জায়গা। আলাপ করিয়ে দিল। বলল, ওঁকে বাসে তুলে দিয়ে বাবলুকে আঁকার স্কুল থেকে নিয়ে ফিরবে। -'তিন-চার বছর পাশাপাশি থাকি, মিঃ দাসের তো তিনকুলে কেউ আছে বলে শুনিনি। এ বাড়িতে অ্যাদ্দিনে কাউকে আসতে দেখেছি বলেও তো মনে হয় না। মণিকার বিধবা মা, দাদার কাছে দুর্গাপুরে থাকেন। নাতির গরমের ছুটিতে বছরে একবার মেয়ের বাড়িতে আসেন। এই ক’বছর তো এই রুটিনই দেখেছি। রাতারাতি পিসতুতো-মামাতো ভাই-দাদারা গজিয়ে উঠল কোত্থেকে, তা তো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। একান্নবর্তী পরিবারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তুতো সম্পর্কগুলো তো এমনিতেই উঠে গেছে। মণিকার মতিগতি মোটেই ভাল বুঝছি না। ছিঃ ছিঃ এটা কি করছে মণিকা।‘

কিন্ত কী করে এটা সম্ভব, কাঞ্চন ভেবে পায় না। গত বছর সুপ্রকাশবাবুর টাইফয়েডের সময় ওর পতিপ্রাণা চেহারাটা তো কাঞ্চনের অজানা নয়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কী সেবাটাই না করেছিল বরের। আবার মণিকার অতীতটাও তো খুব মসৃণ নয়। মণিকা-ই বলেছিল। মণিকা মুখার্জি কুমারী জীবনে বেশ কয়েকবারই দুর্বলতার  প্রশ্রয় দিয়েছিল। শেষ বারে মা-দাদার আপত্তি সত্ত্বেও সুপ্রকাশ দাসকে ও নিজেই পছন্দ করেছে। কুমারী মুখার্জি তো অনেকদিনই হ'ল মারা গেছে। না-কি মণিকা দাসের মধ্যে আবার সে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘এরা সব পারে। কিন্ত তা বলে আমার তুষারদাকে নিয়ে পড়লি কেন বাবা- কাঞ্চনের খেদোক্তি। মণিকার সঙ্গে তুষারদার ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও বেশ ভালই পরিচয় আছে, আমার বাড়িতে যাতায়াতের সূত্রেই তা হয়েছে। দুজনেই কথায় বেশ ওস্তাদ। আর তাছাড়া তুষারদা যা লোক, তাতে যে কোনও মানুষের সঙ্গে অপরিচয়ের বাধা খুব সহজেই ডিঙিয়ে যেতে পারে। কিন্ত তা বলে এতখানি।‘

মণিকা যথার্থ সুন্দরী না হলেও বয়সের ধার এখনও ভোঁতা হয়ে যায়নি। এমনিতেই চেহারাতে একটা ঢলানি ভাব তো আছেই।  

কাঞ্চন নিজের মনেই বলে চলে-'ওর বাড়ি অচেনা লোক যাতায়াতের কথা দিদিকে আমি বলেছিলাম। দিদি হয়তো তুষারদাকে বলেছে। জীবনে চলার পথে কত যে চোরা পথের বাঁক আসে তা তো আগে থেকে জানা থাকে না। নিজের অজান্তেই মানুষ কত কিছুই না করে ফেলে। আর সুযোগ সন্ধানী পুরুষরা তো সুযোগের সন্ধানেই থাকে। তুষারদা সম্পর্কে এ কথা যেন ভাবতেও পারছি না। অনেক ব্যাপার মনে নিতে পারি না, কিন্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেনে নিতে হয়।‘

জানিনা বাবা, কি সম্ভব,  আর কিই বা অসম্ভব। রেডিওর এফ এম চ্যানেলে চব্বিশ ঘন্টা কত বিষয়েই আলোচনা হচ্ছে। এই তো সেদিনই বৈকালিক বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল -"মাঝবয়স"। বক্তা ও শ্রোতাদের কথোপকথনে আজকের সমাজের চালচিত্রটা আন্দাজ করতে পারলাম। ব্যাপারটা তখন পাত্তাই দিই নি। অথচ আমার বর্তমান মানসিক অবস্থার সঙ্গে সেই চালচিত্রের অনেক সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছি মনে হচ্ছে। মাঝবয়সে, বিশেষ করে পুরুষদের মাঝবয়সে যৌবনের দুষ্টুমিগুলো নাকি আরেকবার মাথা চওড়া দেয়। কথায় কথায় সেদিনই দিদি বলছিল, “তোর তুষারদার সবই উল্টো। মানুষের দেখনাই সুন্দর থাকে অল্প বয়সে। ও আবার বয়সে সুন্দর।“

-"আর ভাবতে পারছি না। আর অপেক্ষা করাও চলে না। আজ-কালের মধ্যেই দিদিকে জানাতে হবে। দিদি কি ভাববে জানি না। কিন্ত আমারই বা উপায় কি! এমন জ্বালা হয়েছে যে টেলিফোনেও কথা বলতে পারছি না। কাল থেকে এই এলাকার টেলিফোনের তার পাল্টানোর কাজ শুরু হয়েছে। অন্তত দু’সপ্তাহ লাগবে টেলিফোন ঠিক হতে।‘

-‘দেখে শুনে গ্যাসটাও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। হঠাৎই শেষ হয়ে গেল। কালকে হলেই তো পারতিস বাবা, অর্ডারটা টেলিফোনে দিতে পারতাম। তাই বা জোর করে বলি কি করে। টেলিফোনে অর্ডার দেবার তো আবার নানান্ ফ্যাকড়া - দু'টো থেকে চারটের মধ্যে ফোন করতে হবে। অনেক সময়ই বেজে যায়, কেউ ফোন তোলেও না। যাকগে, সময়মতো গেলেই হবে। যেটা লাগালাম সেটা তো অন্তত মাসখানেক চলবে।‘

-‘এই দেখ, যে কাজে এসে এত বিপত্তি, আগড়ম বাগড়ম ভাবতে ভাবতে সেটাই করা হ'ল না। ঠাকুর আমার রোদে পুড়ে খাক হয়ে গেল।‘

জানলার ছিটকিনি তুলে কাঞ্চন আবার রান্নায় মন দিল। কিন্ত মন সে পুরোপুরি দিতে পারছে কোথায়। খুন্তি নেড়ে চলেছে; কিন্ত গ্যাস জ্বালাবার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। একটা প্রচন্ড মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছে ও। যেটা ভেবে এত উদ্বেগ, কার সঙ্গেই বা আলোচনা করে একটু হাল্কা হবে সে। অজয়ের এমনিতেই সন্দেহ বাতিক। তারপর কি কথা থেকে কি এসে পড়বে। দরকার নেই বাবা। কাঞ্চনের ভয় হয়। যদি অজয় কোনদিন দেখে ফেলে। তুষারদা সম্পর্কে উচু ধারণা থাকলেও মনে মনে হিংসের একটা চোরাস্রোত তো আছেই। কারণ উনি যে যথেষ্ট গুণী মানুষ, ক্ষুদ্র সামাজিক গন্ডীর বাইরেও যে ওঁর একটা মানব দরদী মন আছে তা কারোরই অজানা নয়। নাঃ, দেরি করা আর একেবারেই চলবে না। ঠিক আছে, কাল অজয়ের বোর্ড মিটিং, বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। কালই আমি দিদির কাছে গিয়ে সব বলব। কোনও লুকোছাপা নয়। দিদি যা ভাবে ভাবুক।

অসময়ে কে আবার বেল বাজায় ? হয়তো খবরের কাগজের দাম নিতে এসেছে। কতবার ছেলেটিকে বলেছি যে রোববার তোমার দাদা থাকে, সেদিন এস। কিছুতেই কথা শোনে না। আজ খুব বকুনি দেব।‘ কাঞ্চনের মনটা আজ বিরক্তিতে ভরে উঠেছে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কাঞ্চন সদর দরজা খুলতে যায়।

-কি রে তুই !

-অবাক হবার কি আছে ? মনে হচ্ছে যেন আমাকে চিনিসই না ?

-কত্তা তো এখানে নেই, তা সত্ত্বেও তোর টিকিটিও দেখা যায় না। আর যখন দেখা যায়, তখন তুই তুতোদের নিয়ে ব্যস্ত থাকিস।‘ কাঞ্চনের কথায় বেশ একটা ব্যঙ্গের সুর, কিছুটা খোঁচাও। বেশ ক’সপ্তাই কথাবার্তা না হওয়ায় দুজনের মধ্যেই অভিমান জমেছে। সেটা ভেবেই মণিকা বলে ওঠে, -'অ্যাদ্দিন বাদে গল্প করতে এলাম। ঝগড়া করবি না ঘরে ঢুকতে দিবি?’

- আয় আয় বোস্। দাঁড়া, আমি গ্যাস থেকে কড়াটা নামিয়ে আসছি।‘

গ্যাস বন্ধ করে কাঞ্চন মণিকার কাছে এসে বসে। ওর মনে হয় মণিকা আজ কেমন যেন অন্যমনস্ক। কি ভাবে গল্প শুরু করবে, দুজনেই ভাবছে। যাদের উঠতে বসতে দেখা হ'ত, দু’সপ্তাহের অসাক্ষাৎ, তাদের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছে। গুমোটের হাওয়া কাটিয়ে মণিকা-ই শুরু করল। - ‘হ্যাঁরে, তোর দিদি-জামাইবাবু মানে তুষার দা, অনেক দিন আসেনি, তাই না?’ মনে মনে প্রচন্ড রাগ হয়ে গেল কাঞ্চনের। মনে হ'ল কথার মধ্যে যেন একটা সাফাই-এর সুর আছে। কোথায় নিজেদের ভালোমন্দ দু’চার কথা বলবে। ঢং করে তুষারদার খবর নিচ্ছে ও। ন্যাকা, যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। ওর মুখের ওপর কাঞ্চন যেন একটা অপরাধ বোধের ছাপ লক্ষ করলো। কাঞ্চনের আর বুঝতে বাকি রইল না যে তুষার দা ওর ফাঁদে পড়েছে। মাথায় রক্ত চড়ে গেল কাঞ্চনের। বলতে যাচ্ছিল, -ন্যাকামি আর করিস্ না।‘ – না, পরক্ষণেই ভেবে দেখল যে, সাময়িক ভাল না লাগলে মার্জিত অবহেলার সঙ্গেই সহ্য করতে হয়। কাঞ্চনের মনোভাব বুঝতে মণিকার অসুবিধে হয়নি। মনটা এমনিতেই খারাপ। প্রচন্ড অভিমান হ'ল। কাল বিলম্ব না করে, গ্যাসে ভাত বসানো আছে, এই অজুহাতে মণিকা চলে গেল। কাঞ্চন মনে মনে বলল-'আপদ বিদেয় হ'ল।‘ ঘরে ফিরে এসে মণিকা ভেবে পায় না, কি এমন হ'ল যে কাঞ্চন এমন মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল। ওর স্বগোতোক্তি-'সময়টাই আমার বেশ কিছুদিন ধরে খারাপ চলেছে। জানিনা মেঘ কবে কাটবে।‘

দিনটা কোনও রকমে কেটে গেল কাঞ্চনের। ও আজ এতটাই চিন্তামগ্ন যে, অজয় খেতে চাওয়ার আগে ওর মনে পড়লো রাতের ভাত করা হয়নি। সময় কেনার আশায় অজয়কে জিজ্ঞেস করল,- একটু চা খেতে ইচ্ছে করছিল, তুমি যদি খাও তবে করব।‘

গিন্নির এইটুকু ছোটখাটো আব্দার স্বামীরা রেখেই থাকে। তাছাড়া, নিয়মছাড়া কিছু ব্যতিক্রম ভালই লাগে মাঝে মাঝে। নিয়মের মানুষ অজয়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,-'সাড়ে আটটা বাজে, ও কে, হাফ কাপ চলতে পারে। কালকে তো আর তোমার সান্ধ্য চায়ে যোগ দিতে পারব না, বোর্ড মিটিং আছে, দেরি হবে বাড়ি ফিরতে। কালকে তোমার সঙ্গে          সন্ধ্যের কোম্পানিটা অ্যাডভান্স পূরণ করে দি। ডিনার না হয় ঘন্টাখানেক বাদেই খাওয়া যাবে।‘

রাতে কাঞ্চনের ঘুম হ'ল না। দিদির সঙ্গে কথা না সারা পর্যন্ত ও ঠিক স্বস্তিতে থাকতে পারছে না। ভোরে তাড়াতাড়ি উঠে ও সংসারের কাজকম্ম সব সেরে ফেলল। অজয় অফিস বেরিয়ে গেল, টুম্পাও স্কুলে চলে গেছে। দুপুরের খাবার পালা মিটিয়ে ভাতঘুম দিয়ে একটু তাড়াতাড়িই আজ উঠে পড়েছে কাঞ্চন। পাঁচটায় মেয়ে স্কুল থেকে ফিরলে ওকে জলখাবার খাইয়ে ছ'টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়বে। চা ও দিদির বাড়িতেই সেরে নেবে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে কাঞ্চন চুল বাঁধছে। ‘দেখি কে আবার কলি বেল বাজায়, এমনিতেই বেরোনোর তাড়া আছে।‘

-‘আরে দিদি! এই অসময়ে! তুই ভাল আছিস।?’

মণিমালা, কাঞ্চনের আদরের দিদি বলল-'তোর কোন কথার উত্তর আগে দেব বলতো ? এত উত্তেজিত কেন? অনেক দিন টেলিফোনে কথা হয়নি। তোর তুষারদা-ও এসেছে। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে উঠছে। ওই তো এসে পড়েছে।‘

-'আমিই তো তোর বাড়ি যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম।‘

-'সত্যি?’

-'সত্যি মানে, দেখছিস না চুল বাঁধছিলাম। টুম্পা স্কুল থেকে ফিরলেই বেরিয়ে পড়তাম। যাক, ভালই হয়েছে, তোর সঙ্গে অনেক জরুরি কথা আছে।‘

-‘আমাদেরও অনেক কথা আছে। তোমার দিদির কাছেই শুনো শালীবাবু। আগে চা খাওয়াও, পরে কথা, কাঞ্চনের তুষারদা বলে উঠল।‘

কাঞ্চন তুষারদার কথায় বিশেষ পাত্তা দিলাম না। এমনিতেই মন ববিরক্তিতে ভরে আছে। তার ওপর আদিখ্যেতা করছে। যাইহোক, খবরের কাগজ আর দু'একটা ম্যাগাজিন বাইরে ঘরে দায়সারা ভাবে রেখে, কাঞ্চন তার দিদিকে নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল।

-'উঃ এই কলিং বেলটাও হয়েছে। আবার কে বেল বাজালো!’ ঘড়ির দিকে তাকাতে মনে হ'ল বোধহয় টুম্পা স্কুল থেকে ফিরল। আজ স্কুল বাসটা একটু আগেই চলে এসেছে। তার মানে আজ গড়িয়াহাটে হকার আন্দোলন হয়নি।‘

দিদি বলল-'তুই বোস না, ও তো বাইরে ঘরেই আছে। এই শুনছো দরজাটা খুলে দাও তো, টুম্পা এসেছে।‘

-'আরে মণিকা যে! কি খবর?’

-'ভাল আছেন তুষারদা,  অনেকদিন বাদে আপনার সঙ্গে দেখা হ'ল। দিদি ভাল আছে তো?’

-'আরে এস এস ম্যাডাম। দুই বোনে আমাকে কাগজ ধরিয়ে একা ফেলে ভেতরের ঘরে ঢুকে কেমন গল্প জুড়ে দিয়েছে। তুমি বরং আমার এখানে বস।‘

-'নাঃ, টুম্পা তো নয়, তুষারদা যেন মনে হচ্ছে কার সঙ্গে কথা বলছেরে দিদি; ঘরের ভেতর থেকেই কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল-'তুষারদা কে এল?’

-'দ্যাখো না কে এসেছে, নিজেদের চোখেই দেখে যাও। ‘উঠে এসে মণিকাকে তুষারদার সামনে বসে থাকতে দেখে মনে মনে কাঞ্চন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল।

-'কি রে, তুই কি তুষারদার গন্ধে গন্ধে চলে এলি?’

মণিকা বলে-'এত উত্তেজিত কেন রে, চল ঘরে চল, দিদির সঙ্গে দেখা করি, তারপর সুখবরটা দেব।‘ অনেক দিন বাদে আজ মণিকার চোখে মুখের চেহারায় উচ্ছলতা। ঘরে ঢুকেই বলল-'আরে দিদি, অনেকদিন পরে তোমরা এ বাড়িতে এলে। আজ আমাদের বাড়িতেই তোমাদের চা খাওয়াব।‘

কাঞ্চন অধৈর্য হয়ে উঠে বলে-'ন্যাকামি করিস না মণিকা, কি ধান্ধা বল তো তোর?’

মণিকা বেশ অভিমানের সুরে বলে,-'দ্যাখো না দিদি, কাঞ্চনটা আজকাল আমায় সবসময় কেমন যেন ঠেস দিয়ে কথা বলে। আমার যে কি ভাবে কেটেছে, ভগবানই জানেন। সুখবরটা ওকেই আগে জানাতে এলাম। আর ও কি না আমাকে বলছে ন্যাকামি করিস না। দিদি কাঞ্চনকে কপট শাসন করে থামিয়ে দিয়ে মণিকার কাছে তার সুখবর জানতে চায়।

মণিকা বলে,-'প্রায় একমাস বাদে আজ ওর চিঠি পেলাম। প্রমোশন নিয়ে তিন বছরের জন্য কলকাতায় বদলি হয়ে আসছে। আসলে এবার ফিরে যাবার আগে ছেলের লেখাপড়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে বেশ মন কষাকষি হয়েছিল। ফিরে গিয়ে না চিঠি, না ফোন। কিছুই ভাল লাগত না। কাকেই বা বলব, কাঞ্চনও কেমন যেন হয়ে গেছে আজকাল। ‘

দিদি বলে ওঠে,-‘ও-মা, কাঞ্চনের কাছেই শুনেছি যে সুপ্রকাশ বেশ দায়িত্ববান ছেলে। ছেলে-বৌয়ের ব্যাপারে সব সময়ই চিন্তা করে।‘

-'সে দায়িত্ ও পালন করেছে বৈকি দিদি। চিঠি লিখে ওর পিসতুতো ভাই আর আমার মামাতো দাদাকে পাঠিয়ে আমাদের খবর রেখে গেছে। চিঠি পড়ে ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। ওদের চিঠিতে সুপ্রকাশ আরও জানিয়েছিল যে আমি বা অন্য কেউ যেন সুপ্রকাশের এই পরিকল্পনার কথা জানতে না পারে। কলকাতায় এসে ও ব্যাপারটা খোলসা করবে। ও ভেবেছিল যে একটু রাগের ভাব দেখালে আমি বেশি করে ছেলের দিকে নজর দেব। চিঠিটা পেয়ে আজ শান্তি পেলাম। ও লিখেছে যে এবার থেকে ও নিজেই ছেলেকে দেখবে।‘ কাঞ্চন নির্বাক,  হাঁ করে এক নিঃশ্বাসে বলা মণিকার কথাগুলো শোনে।

 দিদি বলে,-'বিকেলটা আজ কাঞ্চনের সুখবর শোনার বিকেল। আমাদেরও একটা সুখবর নিয়ে কাঞ্চনের কাছেই এসেছি। তোমাদের তুষার দা আর ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতে চাইছে না। বহুদিন ধরে একটা জমির খোঁজ করছিল। সন্তোষপুর বাস স্টপের কাছেই আড়াই কাঠার একটা ছোট্ট কর্ণার প্লট। আজই পাকা কথা হয়ে গেল। জমির মালিক তো তোমাদের পাঁচ’ছ খানা বাড়ির পরেই থাকেন। তোমাদের তুষারদা তো প্রায় একমাস ধরেই এ-পাড়ায় যাতায়াত করছে। দর কষাকষি চলছিল। ও আমাকে প্রায়ই বলে,-'জান তো কাঞ্চনের বাড়ির ওপর দিয়ে পরেশ বাবুর বাড়ি যেতে হয়।‘

দিদি বলে চলে,-'একদিন তো তোমাদের বাড়িতে ঢুকেও পড়েছিল, শালীর হাতে চা খেয়ে যাবে বলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘুম থেকে ওঠেনি ভেবে ঢুকেও বেরিয়ে এসেছে। তাছাড়া অফিস যাবারও তাড়া ছিল।‘

-'কি কান্ড বল দিকিনি দিদি'-মণিকা বলে ওঠে। আমিও তো সেদিন তুষারদাকে আমাদের গেট লাগিয়ে বেরোতে দেখলাম। আমি আবার ভাবলাম, ভোরে ওঠেন, মর্নিং ওয়াক করতে করতে শালীর বাড়ি চলে এসেছে। যা মিশুকে মানুষ।‘

-'কিন্তু যাই বল ভাই, একপক্ষে সেদিন দেখা না হয়ে ভালই হয়েছে। দেখা হলে তো আর সারপ্রাইজ দেওয়া যেত না। কি রে কাঞ্চন তুই তো কোনও কথাই বলছিস না!’

কাঞ্চন মনে মনে এতক্ষণ নিজেকে শাসন করে চলেছে। অস্পষ্ট স্বরে বলে,- ‘হ্যাঁ, সারপ্রাইজই বটে।‘ আদরের ভঙ্গীতে মণিকার চিবুকটা নেড়ে বলে,-'তুই দিদির সঙ্গে গল্প কর। আমি চায়ের জল বসাই। চলে যাস না কিন্তু।‘

চা বসিয়ে কাঞ্চনের মনে হ'ল যে বছরের প্রতিটি দিনই বোধহয় কোনো না কোনো ঘটনার জন্মদিন। আজ যেমন তার নিজের আত্মশুদ্ধির জন্মদিন।  আগড়ম বাগড়ম ভেবেই না মরেছি এই ক'টাদিন !


Tuesday, August 3, 2021

Facets of ISMs

 


A girl named Rumana of Bengal stood first,/ from the community Muslim/ Instead

of being regarded normative by HS  Board, / it's seen as tokenism,/ quite unlike Bengalism./

Still worse are the effort to establish,/ the ethos of pluralism;/ with the idea of parochialism/ that's coming in the way of country's secularism./Added to that are Racism, Casteism, Hinduism and many more ISMs/

Scores of decades passed by, / the world witnessed Hitlerism and Stalinism./ Of late Trumpism/ Then there's Bolsonarism and Modism.

But is it all round sordid pessimism ?/ Oh no! just a century ago,/ this country had witnessed Gandhism./ And a century later we're witnessing Markelism./ The true faces and symbols of Humanism,/ in this chaotic world of inhumanism.

Monday, August 2, 2021

Malicious Pegasus

 


Israeli based company NSO developed the SPYWARE, Pegasus, has already taken the center stage since  the commencement of the Parliament monsoon session. The issue has sent many ripples across the political spectrum. The Indian Parl could function only 18 hrs out of scheduled 107 hours causing a loss of Rs. 133 crore to the exchequer which is again taxpayers' money. The opposition MPs of both the houses said, they won't let the normal proceedings go until there's a full-fledged debate on the Pegasus issue mainly, along with the issue of the impending farm laws. Is it not expected in a Parliamentary democracy ?

A certain level of decorum is expected from the opposition party leaders too. What goes on in the name of protest is like a street fight between the rival groups on the Parliament floor ignoring the honourable Mr. Speaker. 

As an apolitical common Indian citizen a simple solution comes in mind. Why not both honourable PM and honourable Home Minister attend the Parliament session once to clear the air by just explaining that the country is not in possession of the snooping Spyware Pegasus. Because,  as I understand the deal of purchase of this expensive package (~$10 million besides a lump sum as the installation cost) can only take place between two governments for obvious reasons. Also I understand that each installation caters only to 10 devices. The opposition claims that 300 devices have so far been hacked. Just calculate the volume of expenditure incurred in the deal !

Friday, July 30, 2021

লেক বিহার

                            লেক বিহার 

          ভোরের আলো ফুটতেই লেকে ঢুকে পড়লাম 

ভোরের মধুর স্বপ্নটা যখন ভাঙলো,  বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করতে করতে স্বপ্নের স্মৃতিটাকে কিছুটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম। ক্যালেন্ডারের তারিখের পিঠে চেপে আরও একটা নতুন ভোরের সূচনা হ'ল। বরাবরই ভোরে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। এই সময়টা আমার কাছে সব সময়ই মধুর, ঋতু নির্বিশেষে বড্ড তাজা। কৈশোর পার করে যৌবনের ভোরটা কেটেছে বম্বেতে; জীবনযুদ্ধের নানা টানাপোড়েনে। অভাবের সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্ত তার মধ্যেও আশা-আকাঙ্খা, কলকাতা ফেরার ভবিষ্যত ভাবনা- সব মিলিয়ে একটা অন্য রকমের আত্মপ্রত্যয়; অন্য স্বাদ ছিল জীবনের সেই ভোরের দিনগুলোর। যাইহোক,  মনে হ'ল দিনটা আজ অন্যভাবে শুরু হোক। অবসর জীবনে প্রাতর্ভ্রমণের আকর্ষণকে বাদ দিয়ে কী  ভাবেই বা আর দিন শুরু করা যায়! কাজেই শুরুটা প্রাতর্ভ্রমণ দিয়েই হোক। জায়গা পরিবর্তন করা যাক বরং। বাড়ির অনতিদূরে ঢাকুরিয়া লেকে চলে গেলাম। জায়গাটা যে বাড়ির এত কাছে, সেই আন্দাজ ছিল না। ও-পাশে শিয়ালদা-বজবজগামী ট্রেন লাইন, আর এ-পাশে সাদার্ন অ্যাভিনিউ।  মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলাধারের দুপাশে সবুজেভরা চর- গোলপার্ক থেকে শুরু হয়ে এঁকেবেঁকে লেক ক্লাবকে পিছনে ফেলে টালিগঞ্জের রেল ব্রিজ পর্যন্ত চলে গিয়েছে। এটাই ঢাকুরিয়া লেক। এই জায়গাটাই সকালে হাতছানি দিয়ে ডাকাডাকি করে। ঢাকুরিয়া ব্রিজের মাঝখানে পৌঁছে পশ্চিম দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেই ঘন্টার আওয়াজ শোনা যাবে- ঢং ঢং ঢং……., বুদ্ধ মন্দিরের ঘন্টা অনুসরণ করে মিনিট দু'তিন হাঁটলেই পাওয়া যাবে লেকে ঢোকার লোহার গেট। পুরো গেট আদৌ খোলা নয়। মানুষ গলার মতো একটা জায়গা ফাঁক করা আছে। মুখ্যতঃ পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ মানুষেরা ঢুকে পড়ছেন সেই ফাঁক গলে। সংখ্যায় কম হলেও মাঝবয়সী অনেক মানুষজনও আছেন ওই দলে, উদ্দেশ্য প্রাতর্ভ্রমণ। বিস্তীর্ণ জলাধারের দুপাশে মনোমুগ্ধকর শ্যামলিমা পরিবেশ। হাঁটাচলা আর শরীরচর্চার এক আদর্শ আবহ। পথচলতি মানুষজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জেনেছি লেকে আঞ্চলিক মানুষ ছাড়াও দূর থেকেও অনেকে আসেন। লেকে ঢোকার মুখে গাড়ি আর দ্বিচক্রযানের ভিড় দেখেও সেটা বোঝা যায়। এক ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে জানলাম তিনি আসছেন পার্ক সার্কাস থেকে।

শরীর পরিচালনার কত রকম পদ্ধতি। বয়সের ধর্মানুযায়ী শরীর পরিচালনা চলছে। নানান বয়সের নানান ঢং। চরিত্রগুলো যেমন যেমন দেখেছি তেমন ভাবেই আঁকবার চেষ্টা করেছি। স্বাস্থাণ্বেষীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে, গাছগাছালি বেষ্টিত জলাধারের বাতাস থেকে ফুসফুস ভর্তি করে অক্সিজেন নিচ্ছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধ মানুষজনের শরীর পরিচালনার তাগিদ আছে। হাঁটাহাঁটিতে তাঁরা অপারগ। স্বাস্থ্যের উপর বয়সের থাবার চিহ্ন স্পষ্ট। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর সখ্যতাও ঘনীভূত হয়েছে; কাজেই শরীর পরিচালনার কায়দা মাথা খাটিয়ে তাঁরা এমনভাবে বেছে নিয়েছেন যাতে বয়সোপযোগী শরীর অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গেই চলতে পারে ঈশ্বর আরাধনা। অবাঙালি একদল অশীতিপর বৃদ্ধের মধ্যেই সেটা লক্ষ্য করা গেল। দলে যে সবাই অশীতিপর, এমন বলা যাবে না। যাইহোক, লাল সিমেন্টের শান বাধানো বেঞ্চির উপর বসে হাত দুখানি বুকের উচ্চতায় রেখে তালে তালে তালি মেরে চলেছেন আর সেই তালির সঙ্গী হ'ল রামনাম। আমার কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জেগেছিল এই রামনাম জপ কতক্ষণ চলে ? সোজা রাস্তায় হেঁটে বেঞ্চি পার হওয়ার সময় মনে হয়েছিল ওঁরা সমস্বরে রামরাম……………,রামরাম………. করেন। অর্থাৎ, রামরাম কথাটার পরেও কিছু একটা দুর্বোধ্য শব্দ যেন তাঁরা উচ্চারণ করছেন। হেঁটে পার হয়ে গেলাম। মিনিট কুড়ি বাদে একই পথে ফেরার সময় দেখলাম সবাই চুপ করে মুখ বুঝে বসে আছেন। পরের দিন প্রায় একই সময়ে ওই বেঞ্চির কাছাকাছি এসে গতি মন্থর করলাম, শুধুমাত্র শোনার জন্য দুর্বোধ্য শব্দটা কি ? কান দুটো খাড়া ছিল। কানে এল যেন ওঁরা বলছেন রামরাম সাতাশি, রামরাম আটাশি, রামরাম নওআশি……। এদের মধ্যে কয়েকজনের কন্ঠে শানানো সুর। আর বারবার উচ্চারণ করে চলেছেন। কাজেই সবটাই ক্রমশ কর্ণগোচর থেকে মর্মগোচর হয়ে গেল। বুঝলাম ওনারা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায়, হয়তো বা একশ বার রামনাম নেবার পর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি করেন। এই বয়সে ঈশ্বরের নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর নাড়াচাড়ার ব্যাপারটা আমাকে চমৎকৃত করেছিল।

ভোরের প্রথম সাক্ষাতের কুশল বিনিময়ের অভিনব পদ্ধতিগুলোও দেখার মতো। কত রকমের সংস্কার মানুষের।  গুড মর্নিং, সুপ্রভাত, নমস্কার, প্রাতঃপ্রনাম, মর্নিং, রামরাম, জয় গুরু, জয় মা তারা, হাই-হ্যালো- এ তো গেল বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের সংস্কার মতো দেশি-বিদেশি কায়দায় কুশল বিনিময়। প্রতুত্তরও ওই একই। তালিকাটা সম্পূর্ণ হ'ল কিনা জানা নেই। যেগুলো কানে আসে সেগুলোই লিখলাম। কিছু মানুষ নিরুচ্চারে হাত উঠিয়ে বা ঘাড় দুলিয়ে চোখের ভাষায় কুশল বিনিময় করছেন; চোখে স্মিত হাসি। সম্পর্কগুলোও হয়তো ওই হাই-হ্যালো জাতীয় সম্বোধনের মধ্যেই শেষ। ব্যতিক্রম একজন। হ্যাঁ, ওই হাজারো মানুষের মধ্যে শুধুই একজন। উনি ওই পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে জগিং-য়ের কায়দায় ছুটতে ছুটতে চলেছেন আর মিনিট খানেক বাদে বাদেই হাঁক পেড়ে চলেছেন, “বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ।" প্রতুত্তরে তাঁর পরিচিত কিছু মানুষ ওই একই বাণী ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কী জানি কৈশোরে হয়তো স্বদেশী করতেন। হয়তো বা ষাট বছরের স্বাধীনতা পাওয়া দেশের মানুষের চালচলনে বিকৃত সাহেবিয়ানা আবার শিগগিরই পরাধীনতার শিকলে বেঁধে না ফেলে, সেই আশঙ্কায় স্বাধীনতার মন্ত্রোচ্চারণ করে মানুষের মনে অগ্রিম সাড়া জাগাচ্ছেন। লেকে প্রাতর্ভ্রমণে যান, অথচ তাঁর ওই “বন্দে মাতরম" ধ্বনি শোনেননি, এমন লেক-ভ্রমণকারী মানুষ খুঁজে পাওয়া শক্ত। আমি অবশ্য লেকের ঢাকুরিয়া দিকটার কথা বলছি।

অশীতিপর আরও একজন ব্যতিক্রমী মানুষের সন্ধান পেলাম। তিনি শুধু বসেই থাকেন। তাঁকে কখনও বেড়াতে দেখিনি।। ভদ্রলোক বাঙালি না অবাঙালি তাও বুঝতে পারিনি। কারণ হিন্দী এবং বাংলায় কথা আদান-প্রদানে সমান স্বচ্ছন্দ। একটা হজমীর কৌটো হাতে ধরে বসে আছেন। কুশল বিনিময়কারী সবাইকেই দুটি করে হজমীগুলি বিতরণ করছেন। শুধুমাত্র ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমিও একদিন নমস্কার জানিয়ে পাশে বসলাম। বলা বাহুল্য ওঁর প্রসাদে বঞ্চিত হইনি। তখনই  আবিষ্কার করলাম ওগুলো হজমীগুলি। অনেকদিন আগে কোনো এক সোমবারের আনন্দবাজারের কলকাতা কড়চায় পড়া একটি মানুষের কথা মনে পড়ে গেল। উনি প্রাতর্ভ্রমণে আসা সাক্ষাৎকারী সবাইকে এক মুঠো ভিজোনো ছোলা বিতরণ করেন। এটাই নাকি ওনার কাছে ঈশ্বর সেবা। লেকের দেখা বৃদ্ধ মানুষটির চিন্তাতেও হয়তো ওই একই দর্শণ কাজ করে।

লেকের দক্ষিণ পাড় বরাবর পূব থেকে পশ্চিমে ফুট পাঁচ-ছয় চওড়া বাঁধানো রাস্তা। সম্প্রতি কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট  (কে আই টি) লেক-সংস্কার কাজে হাত লাগানোর ফলে পুরো পরিবেশটা অনেকটাই সেজে উঠেছে। টালি বাঁধানো রাস্তা বরাবর কুড়ি-বাইস হাত বাদে বাদেই আছে বেঞ্চির আদলে তৈরি শান বাঁধানো বসার জায়গা। কিছু কিছু বেঞ্চিতে আবার ঠেস দেবার ব্যবস্থাও আছে। শুধু তাই নয়, বেঞ্চিগুলো ও রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য বাঁশের লাঠির ডগায় বাঁধা ঝাঁটা, টুকরো কাপড় আর বোতলে জল নিয়ে, কে আই টি নিয়োজিত চার-পাঁচ জন মহিলা কর্মী এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত তদারকি করে চলেছেন। দু'তিন জন পুরুষ কর্মীকেও দেখেছি লেকের জল পরিষ্কার রাখার জন্য লগি দিয়ে জলে ভাসা প্লাস্টিকের বোতল বা ব্যাগ তুলতে। যাইহোক, টালি বাঁধানো রাস্তাটা প্রস্থে প্রায় সাত-আট ফুট। একেবারে শেষে বেশ চওড়া পিচের রাস্তা, যেটা শেষ হয়েছে মিনি লেকের সীমানা-পাঁচিলের গা ঘেঁষে একটা শীর্ণ ফুটপাতে। ওই শীর্ণ ফুটপাত বরাবর পাঁচিলে পিঠ লাগিয়ে লাইন দিয়ে বসে আছে শীর্ণতর কিছু নারী-পুরুষ, পেশায় ভিক্ষাবৃত্তি। ছন্নছাড়া আয়ের মতো জীবনও এদের ছন্নছাড়া। ঘর-বার বলে কিছুই নেই, কোনো বাঁধা আয় নেই অথচ বাঁধা আছে পেট। লেকে হাজার হাজার ধর্মভীরু মানুষের সমাগম। ভিক্ষুক মানুষগুলোর আশা, লেকের জলের মাছের মতো তাদেরও কিছু জুটে যেতে পারে। জীবনভোর পরের হাতের চাকার মতো এরা গড়িয়ে চলে। টালি বাঁধানো আর পিচের রাস্তার মাঝখানটা অনেক চওড়া। সেখানে শুধুই গাছগাছালি।

শরীর চর্চার আরও এক কৌতুহলোদ্দীপক ভাষার সাক্ষী হয়ে বেশ মজা লাগল। কৃত্রিম হাসি যে শরীর চর্চার অঙ্গ, সেটা কাগজ বা পত্রিকা মারফত জানা ছিল। এই জানা ব্যাপারটার জলজ্যান্ত মহড়া দেখলাম লেকের লাফিং-ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে। দশ-বারো জন দু'টো ভাগে ভাগ হয়ে মুখোমুখি দুটো লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এর পর দু-হাত সামনে প্রসারিত করে সমস্বরে উচ্চারিত হ'ল ‘হাঃ হাঃ, পরক্ষণেই উচ্চারিত হ'ল হোঃ হোঃ'। ছন্দে ছন্দে এই হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ মিনিট দুয়েক চলার পর শুরু হ'ল হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ………। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ……… যেন অট্টহাসি।

শরীরচর্চায় ব্যস্ত আরও একজন মানুষের প্রতি নজর কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তাঁর বয়স যৌবনের সীমানাকে পেছনে ফেলে এসেছে, কিন্ত পরিণত প্রৌঢ়ত্বে প্রবেশ করতে অনেক দেরি। মুখের গঠনের সঙ্গে মানানসই গালপাট্টা গোঁফের দু-প্রান্ত মেহেন্দি করা। কাজেই বোঝা যায় যে যৌবনদৃপ্ততা আদৌ মুছে যায় নি। হাতকাটা কালো গেঞ্জি, কালো ট্রাউজার আর স্নিকার পায়ে শোভা পাচ্ছে। সঙ্গে স্ত্রী আছেন, রয়েছে বুলডগ জাতীয় একটি পোষ্য। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শরীর পরিচালনা করছেন, যাকে বলে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ। শরীরের গঠন দেখলে বোঝা যায় চর্চিত অবয়ব। দেহ সৌধটির ব্যাপারে খুবই সচেতন। পোশাকের রকমভেদ এখানে এলেই বোঝা যায়। বিস্তারিত বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। তবে এক জায়গায় সবাই প্রায় সমান। হ্যাঁ, জুতোর ব্যাপারে প্রত্যেকেই ব্যবহার করছেন স্নিকার। যে কোনও জুতোর দোকানে শো-কেসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, দামের রকমভেদে স্নিকার জাতীয় দিয়েই শো-কেস ভরে আছে। এই জুতোগুলো আসলে পথ চলার পক্ষে খুবই আরামদায়ক। নিজে ব্যবহার করেও দেখছি যে প্রাতর্ভ্রমণে পোশাক বা জুতোজোড়ায় একটা বৈশিষ্ট্য না থাকলে শরীরে স্বচ্ছন্দ ভাবটা জেগে উঠতো না।

যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মানুষও যে যন্ত্র হয়ে গিয়েছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। সময় সঙ্কোচনের নতুন নতুন ভাবনায় মানুষ সর্বদাই সজাগ। সময় সঙ্কোচনের অর্থ হ'ল একই সময়ে একাধিক কাজ কিভাবে করা যায়। এ-ও কি আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্বের প্রয়োগ? কে জানে ! যাইহোক, প্রতিযোগিতার বাজারে সকলেই একটু বেশি ব্যস্ত। কিন্ত এর মধ্যেও সত্যিকারের ব্যস্ত মানুষ স্বাস্থ্য সচেতনতার ভাবনাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। চলা-বলার ঢং, স্বাস্থ্যের উজ্জ্বলতা, ব্যক্তিত্বের ভার দেখে তাঁদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ জাগে না। হাতে গোনা এমন দু-একজনকে দেখেছি। তাঁরা সময় সঙ্কোচনের জন্য হাঁটার সাথে সাথে হাতের দুই তালুর মাঝখানে অ্যাকুপ্রেসারের ছুঁচলো কাঠি গড়িয়ে চলেছেন। ভদ্রলোক সম্বন্ধে আমার অনুমান পরখ করে নেবার জন্য কিছুদিন বাদে ওঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় নামলাম। আলাপের গরজটা অবশ্যই আমার তরফ থেকে শুরু হ'ল। জানলাম তিনি ব্যবসায়ী এবং সারা দিন-রাতের ঐটুকু সময় তাঁর নিজস্ব এবং ভোরের লেকের পরিবেশের মুগ্ধতায় যতটুকু শরীরচর্চা উনি করেন সেটা ঐ সময়। ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও দু-একটা কথা বলার ইচ্ছে ছিল, কিন্ত ওনার ব্যস্ততা অনুমান করে মনে হ'ল না, আমি ওঁর বিরাগভাজন হই। প্রাতর্ভ্রমণের সদস্যদের বেশিরভাগকে দেখলেই মনে হয় তাঁদের জীবনযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত কড়া আইনের শক্ত শৃঙ্খলে বাঁধা। তাঁদের অশন, বসন, চলন, কথন, কর্ম, অবসর- সবটা জুড়ে ডিসিপ্লিন নামক বস্তুটির বিস্তৃত অধিকার। 

প্রাতর্ভমণে রঙ্গপ্রিয় মানুষেরও অভাব নেই। দু'একটা নমুনা দিলেই বুঝতে পারা যাবে। শরীরচর্চার পর বুড়োদের আড্ডা-তামাশার আসর বসে। ফুট দশেক দূরে পাশের বেঞ্চিতে বসেছিলাম বলে কথাগুলো কানে পৌঁছোলো। কথ্য ভাষাগুলো অনুচিৎভাবে অশ্লীল মনে হয়নি বলেই তুলে ধরতে পারছি। পরিচিত সমবয়সীদের মধ্যে এইটুকু হয়তো চলতেই পারে। ওঁদের আড্ডার মধ্যে অন্য ধাঁচের আনন্দের খোরাক পাওয়া গেল। মনে হ'ল অন্তরঙ্গ রসিকতা কিছুটা স্থূল হলেও তার মাধুর্য ভিন্ন। নমুনা: (১)……তোদের একটা সুখবর দিই। সুখবরটা উনি যাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তাঁদেরই একজন প্রত্যুত্তরে বললেন- খাওয়াটা তাহলে পাওনা রইল। - ‘তাই বুঝি ! তাহলে পেছন ফেরো।‘ (২)…. অশীতিপর এক বৃদ্ধ বলে উঠলেন ব্রহ্মান্ড মানে কি, জানেন কেউ ? কেউ জানেন না ! তাহলে শুনুন, ব্রহ্মান্ড হল ব্রহ্মার অন্ড। (৩)…..এক-জোড়া কিশোর-কিশোরী একটু ঘনিষ্ঠভাবে ঘোরাঘুরি করছে। ঠিক প্রাতর্ভ্রমণের ঢঙে নয়। ভোরের লেকে সাধারনত বিরল নজির। একজন মন্তব্য করলেন,- ‘বিয়ে-সাদি করে ফেললেই পারে, বছর ঘুরতে না ঘুরতে এক-আধজন ভারতীয় নাগরিক বেড়ে যাবে।‘ কথাগুলো শুনে বুঝলাম যে, দেহ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও, মনে রস এখনও টইটম্বুর। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কৈশোরের সময়টাকে কী গভীর আবেগে না ধরে রেখেছেন, বিন্দুমাত্র মালিন্য নেই। মনে হ'ল মানুষটির উপস্থিতি এক ঝলক আলোর মতো। কাছে এলে একরাশ গুমোটও আড়ালে সেঁধোয়। বয়স হলেও ভেতরে ভেতরে মানুষটা কোথাও একটু কাঁচা একটু সবুজ রয়ে গেছে। চোখের দিকে ভাল করে তাকালে বোঝা যায় বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার সঙ্গে সেখানে হাসি আর কৌতুক যেন মেশামেশি করে আছে।

বেশ কিছুদিন লক্ষ্য করার পর আরও এক মজার চরিত্রের মানুষের সঙ্গে আলাপ জমালাম। তিনি যোগেন বাবু, (আজও জানা নেই ভদ্রলোকের আসল নামট) বেড়ানো শেষ করে একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে উনি কয়েকটা যোগ ব্যায়াম করেন। বয়স সত্তরোর্ধ বলেই মনে হয়। দেহের গড়ন যথেষ্ট শক্তপোক্ত। চাল-চলনেও বয়সের ছাপের কোনো ইঙ্গিত নেই, একটু বেশি রকমের চটপটে। যোগ ব্যায়ামের গুণেই হয়তো এমন ছটপটে চাঙ্গা ভাব। মাথায় তেলা টাকের শ্রীবৃদ্ধি করেছে এক কানের পাশ থেকে শাড়ির চওড়া পাড়ের মতো পাকা চুলের পটি। বিক্ষিপ্তভাবে গোটাকতক আধপাকা চুল পটির মধ্যে থেকে উঁকি মারছে। বেশ শৌখিন বলেই মনে হ'ল ভদ্রলোককে। ধারনাটা স্পষ্ট হ'ল যখন একদিন দেখলাম যোগেনবাবু (আসলে যোগ ব্যায়াম করা অবস্থায় বেশিরভাগ সময় দেখেছি বলেই, ছাত্রাবস্থার ছেলেমানুষী বা দুষ্টুমি, যাই বলি না কেন, মনকে উস্কে দিয়ে জানালো ওঁর নাম যোগেন হওয়া উচিৎ) পকেট থেকে একখানা চিরুনি সযত্নে বার করে চকচকে টাকে বোলাচ্ছেন। ব্যাপারখানা বেশ মজার ঠেকলো। চুলবিহীন টাকে চিরুনি বোলানোর রহস্যটা জানার কৌতুহল চাপতে পারলাম না। কলেজ জীবনের দুষ্টুমি আরও একবার মনকে নাড়া দিল। উপায় বার করতে হবে। বেশ কিছুদিন ওই একই বেঞ্চিতে বসে মাঝেমধ্যেই দু'একটা মামুলি কথা বলে অপরিচয়ের বাধাটা কাটিয়ে ফেললাম। কথা বলে বুঝলাম ভদ্রলোকের স্বভাবে অসঙ্গত লজ্জা বা অতিরিক্ত সঙ্কোচ নেই। অতএব রসিকতা করার ঝুঁকি নেওয়াই যায়। একদিন জিজ্ঞাসা করে বসলাম,- ‘দাদা আপনার চিরুনি ব্যবহারের রহস্যটা একটু বলবেন ?’ ভদ্রলোক হাঃ হাঃ….. করে  প্রানখোলা হাসিতে আমার প্রশ্নের তারিফ করে বললেন, ‘আরে ভাই জোয়ান বয়সে মাথাভর্তি শুধু ঘন কুচকুচে কালো চুল যে ছিল তাই নয়, রীতিমত কোঁকড়ানো বাহারি চুল ছিল। তখন থেকেই পকেটে চিরুনি রাখার অভ্যেস। সেটা আজও ছাড়তে পারিনি ; অবচেতনে পকেটে হাত চলে যায়।‘ চরিত্রের নিঃসঙ্কোচ ভাবটা ঠাহর করে আমি ওঁকে টাক সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের একটা সরস উদ্ধৃতি গল্পচ্ছলে বললাম। যাঁদের শোনা নেই তাঁদের জন্য  বলছি : এক সময় এক কেশ তৈল প্রস্তুতকারক সংস্থার তরফ থেকে রবি ঠাকুরের কাছে একটি শংসাপত্রের আবেদন আসে, তাঁদের উৎপাদিত বস্তুটির অর্থাৎ তেলের বিপণনের সুবিধার্থে। ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও সংস্থা কর্তাদের বারংবার অনুরোধ গুরুদেব প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে এমন একটি শংসাপত্র লেখেন। মূল বয়ানটা ঠিক মনে নেই, তবে ভাবটা অনেকটাই এরকম : ‘অমুক সংস্থার তেল ব্যবহারের পূর্বে আমার মাথার তালুর দুটি জায়গায় ছোট্ট ছোট্ট দুটি টাকের সম্ভাবনার সন্ধান মিলিয়াছিল। এঁদের কেশতৈলের গুণে ছোট্ট ছোট্ট ওই দুটি টাক একত্রিত হইয়া একটিতে রূপান্তরিত হইয়াছে। সুতরাং অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে টাকের সংখ্যা কমাইতে হইলে এমন তেলের জুড়ি মেলা নিঃসন্দেহে কঠিন।‘ জানা নেই প্রস্তুতকারক সংস্থাটি শংসাপত্রখানি কাজে লাগিয়েছিল কিনা। যাইহোক,  যোগেনবাবু গল্পটা উপভোগ করেছিলেন। 

         পশ্চিম আকাশের  কোলে মেঘের চোখরাঙানি

অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও এক দিনের ঘটনা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। এক ধর্মপ্রাণ মানুষের সংস্কারবোধ। হিসেব মতো বর্ষা তখনও আসেনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনে হ'ল চারিদিকে আবহাওয়া কেমন যেন গম্ভীর। পশ্চিম আকাশে এক ফালি কুচকুচে মেঘ চোখে পড়লো। বৃষ্টি হবে কি হবেনা, এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়েই চলে গেলাম লেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাল্কা বাতাস বইতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম ঘন মেঘের ফালিটা নিজেকে হাল্কা করে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিম থেকে দক্ষিণ পুবে, প্রায় সারা আকাশটাতেই। অহেতুক ঝুঁকি না নিয়ে আমি বাড়িমুখো হলাম। ফিরতে ফিরতে মনে হ'ল এই সাতসকালে মেঘে মেঘে যেন সন্ধ্যে নেমে এল। হঠাৎই আকাশ চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি। লেক থেকে বেরোবার গেটের মুখে প্রায় চলে এসেছি। কানে এল খোলা গলায় সূর্য প্রণাম মন্ত্র-

ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্,

ধন্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পূব আকাশ মুখো হয়ে গাছতলায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোক সূর্য প্রণাম সারছেন। সূর্যদেবকে মেঘ গ্রাস করেছে ঠিকই, কিন্ত মেঘের চূড়ায় চূড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে তার সোনালি স্বাক্ষর। সূর্য প্রণাম বহুশ্রুত। কিন্ত এই পরিবেশে আগে কখনও এমন সুযোগ আসেনি। আপনা হতেই যতি পড়ল আমার গতিছন্দে। আবৃত্তি যে এত মধুর, এমন স্বচ্ছন্দ সুরময়, তার আবেদন যে এত অনায়াসে অন্তরকে স্পর্শ করে, তা জানার সুযোগ এর আগে আর হয়নি। সেই মুহূর্তের পরিবেশ হয়তো আমাকে প্রভাবিত করেছিল। যাইহোক, ভদ্র লোকের বয়সোচিত সংস্কারকে মনে মনে কুর্নিশ জানালাম। এতদিন মনে হতো শুধুমাত্র শরীরচর্চার উদ্দেশ্যেই, শরীর-মন সতেজ রাখার জন্যই প্রাতর্ভ্রমণ। এখন বুঝলাম যে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়ার মধ্যে যে সার্থকতা আছে, তার গুরুত্ব কিছু কম না।

কিছু মানুষ মাছের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। আটার রুটি, পাঁউরুটি, বিস্কুট, মুড়ি, মাখা আটা। লেকের পরিস্কার জলে ভেসে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে মাছের দল। মাছ খাওয়ানোর দৃশ্যটা দেখার মতো। ছোট্ট পরিসরের জায়গাটায় কিছুক্ষণের জন্য যেন একটা উৎসবের উল্লাস জমাট বেঁধে ওঠে। পাড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে লোকে খাবার দিচ্ছে। একটি সারমেয় মুখ তুলে লোলুপ দৃষ্টিতে দূরে বসে আছে, কিছু জুটে যাবার আশায়। আশাহত হয় না সে। মাছ খাওয়াতে খাওয়াতে এক আধ টুকরো ঐদিকেও ছুঁড়ে দেয় মানুষ। 

রাস্তার ওপাশে লেকের প্রায় গায়েই রয়েছে আরও একটি ছোট্ট লেক। নাম পদ্মপুকুর। অশীতিপর বৃদ্ধেরা যেখানে বসে হিসেব করে রাম নাম করছেন ঠিক তার উল্টোদিকের উদাসী বিজন সড়ক বরাবর মিনিট দুয়েক হাঁটলেই চোখে পড়বে পদ্মপুকুরে ঢোকার লোহার ফটক। জায়গাটা আমার কাছে বড় লেকের তুলনায় আদৌ আকর্ষণীয় মনে হয়নি। পুরো একটা পাক ঘুরে আসলে প্রায় আধ মাইল পথ হাঁটা হয়ে যায়। গাছগাছালি আছে, বসবার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চির ব্যবস্থাও আছে। তবে বড় লেকের মতো পরিবেশ জমজমাট নয়। প্রাতর্ভ্রমণের কুশল বিনিময় আদান প্রদানের কোনো বালাই নেই। অল্প সংখ্যায় কিছু মানুষ  যান্ত্রিক ভাবে মর্নিং-ওয়াকে ব্যস্ত। বড় লেকের বিশালত্বের পরিবেশে প্রানের স্ফূরণ অনেক স্বতঃস্ফূর্ত। আসলে বিশালত্বের সংস্পর্শে মানুষ অনেক উদারমনা হয়ে যায়, দেহ-মনে প্রশন্নতার সাড়া অনুভব করে। শুধু মানুষই বা বলছি কেন, নির্বাক গাছগুলোও শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মাথা নুইয়েছে লেকের জলের কোলে।

 পূব থেকে পশ্চিমমুখো চলতে চলতে লেক যেখানে প্রথম বাঁক নিয়েছে, যেখান থেকে বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরালে সাউথ সিটি কমপ্লেক্সের গগনচুম্বী ইমারত গুলো দেখা যায়, সেখান থেকে প্রায় দেড়শো মিটার পথে ধূসর রঙের আট-ইঞ্চি বর্গাকার টালি বসানো। এই দৈর্ঘ্যটুকুকে শুধু পথ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। এই জায়গাটায় পথ, বাগান, স্থাপত্য- সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা গাছের গোড়া ঘিরে তৈরি করা হয়েছে ঘাসের বেদি। ঘাসগুলো নিখুঁতভাবে ছাঁটা, মনে হয় ভেলভেটের কার্পেট। সেই কার্পেট, গাছের গোড়া থেকে ঢালু হয়ে নেমে এসে মিশেছে রাস্তার সঙ্গে।

কিছু গাছের গোড়া ঘিরে ভিড় করেছে ছোটো ছোটো পাতাবাহার গাছের জঙ্গল। জঙ্গল বলাটা হয়তো ঠিক হ'ল না। কারণ, জঙ্গল কথাটার সঙ্গে আলগাভাবে একটা বিশৃঙ্খলার ভাব জড়িয়ে আছে। বলা যায় এটা সেই জঙ্গল যেখানে দক্ষ মালীর হাতের যাদু আছে। স্বল্প পরিসরের ওই জায়গাটাতে নানা জাতের সবুজের মাখামাখি রঙের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে নীরবে। গাছে গাছে মিলে কী শোভা! ক্ষণিক আনন্দের ঝলক আমার মনেও রঙ ধরিয়ে দিয়েছিল। ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। ঘড়িতে চোখ পড়তেই সভয়ে প্রত্যাবর্তনের জন্য ছুটতে হ'ল, না হলে ওষুধ খাবার সময় পার হয়ে যাবে। বিচ্ছেদের বেদনা নিয়েই সেদিনের মত ফিরে এলাম। সবুজ যে কত রকমের হতে পারে, চোখে না দেখলে ঠিক ঠাহর করা যায় না। রঙ-বেরঙের সবুজের এই বাহার হয়তো কোনো শিল্পীও কল্পনা করতে পারেন না। আসলে বিধাতার মতো শিল্পী কি আর কেউ আছে! এক কথায় লেকের এই ছোট্ট অংশটুকু দেখে মনে হয় যেন রানির সাজে সেজেছে।

মাঝখানে কিছুদিন ভাটা পড়ল। হঠাৎ পর পর দুদিন রাত্রে বৃষ্টি হওয়ার ফলে ঠান্ডা লেগে জ্বর হয়ে গেছিল। ঝুঁকি নিয়ে বেশি দূরে যেতে ভয় লাগছিল। বাড়ির কাছাকাছি পুরনো জায়গা, যোধপুর পার্কের সীমানার মধ্যে  মিউনিসিপ্যালিটির ছোট্ট পার্কটাতে গিয়ে বসতাম। আসলে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা হচ্ছিল না। তাছাড়া সামান্য শরীর খারাপ হলেও একটু বেশি সচেতন হয়ে পড়ি। যাইহোক, সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর যথারীতি পুরনো রুটিনে ফিরে গেলাম। ইতিমধ্যে বর্ষা এসে গেল। ছাতা হাতে নিয়ে প্রাতর্ভ্রমণ ঠিক জমে না। যাইহোক, বর্ষার মধ্যেই আকাশ বুঝে আবার লেকে যাওয়া শুরু করেছি। গ্রীষ্মের যে দাবদাহ, অজস্র গাছগাছালির সংস্পর্শে না এলে ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। গ্রীষ্মের লেকে গাছগাছালিগুলো চোখে পড়তো ঠিকই, কিন্ত বর্ষায় সেগুলোর চেহারায় ধরা দিয়েছে সদ্যস্নাত নববধূর রূপ। অনন্ত তৃষ্ণা নিবারণের পর যেন নতুন জীবন পেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। লেকের জলের স্তর অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। জনসমাগম কমে গিয়েছে। লক্ষ্য করলাম মাত্র এক-আধজন মানুষ মাছ খাওয়াতে ব্যস্ত। মাসখানেক আগেও যেখানে মাছের ঝাঁক কিলবিল করতো, আর একই সঙ্গে ডজনখানেক মৎস্যপ্রেমিক মানুষের ছড়ানো খাবার এক লহমায় নিঃশেষ হয়ে যেত, সেখানে মাঝেমধ্যে দু'একটা মাছ দেখা যাচ্ছে আর জলে খাবার ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশের বেঞ্চিতে বসা ভদ্রলোককে কথাটা পাড়লাম- এত মাছ গেল কোথায় ? ওঁর লেকের সঙ্গে পরিচয় বিগত বিশ বছর যাবৎ। উনি বললেন, বছরের এই সময়ে একদল লোক ভোর চারটে বা তারও আগে এসে মাছ তুলে নিয়ে যায়। আমি অবাক হয়ে বললাম প্রাইভেট সিকিউরিটি ছাড়া সরকারী পুলিশও তো টহলে থাকে সারারাত ! 

- আরে মশাই বোঝেন না, পুলিসের সঙ্গে হিসেব আছে, গলার স্বরে স্পষ্ট বিরক্তির সুর।

- আপনি কি জাল ফেলে মাছ ধরতে দেখেছেন, না লোকমুখে শুনে বলছেন ? 

- আমি দেখেই বলছি।

- তা আপত্তি করলেন না ?

- অবশ্যই করেছিলাম। কিন্ত ওরা শুধু দলেই ভারি ছিল না, আমাকে গম্ভীরভাবে বলল, ‘নাক গলাবেন না, বেড়াতে এসেছেন, ঘুরে বেড়ান না ? আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন।‘ ভদ্রলোক আরও বললেন যে কথাগুলোর ঢঙে যথেষ্ট হুমকির গন্ধ ছিল এবং যেটা অগ্রাহ্য করা এ বয়সে সাহসে কুলোয়নি। আমি বললাম, আপনি ঠিকই করেছিলেন দাদা, আমি হলেও তাই করতাম। বাড়ি ফেরার পর খাবার টেবিলে পরিবারের সবাইকে জানালাম। আসলে সব শহরেই চিরকাল এক জাতের গুন্ডা-বদমায়েস বেকার ছেলেরা বাস করে। সম্ভবত চিরদিনই থাকবে, যতই সমাজতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন। সৎ উপায়ে খেটে খেতে সকলে চায় না। পরিশ্রমে সকলের রুচি থাকবে, তা বোধহয় আশাও করা যায় না।

লেকের উত্তর  দিকের পাড়টা ভালই সাজানো-গোছানো। সেই তুলনায় দক্ষিণে প্রায় হাত পড়েনি বললেই মনে হয়, শুধুমাত্র পায়ে হাঁটা রাস্তাটুকু ছাড়া। ছাই রঙ আর মেটে লাল রঙের ষড়ভূজাকৃতি টালি লাগিয়ে রাস্তাটা তৈরি হয়েছে; এক লাইন ছাই রঙ, পরের লাইন মেটে লাল রঙ। সমস্ত রাস্তাটা এরই পুনরাবৃত্তি। পূব থেকে পশ্চিমমুখো হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলে চোখে পড়বে প্রায় একশ মিটার মতো রাস্তার টালিগুলো বেশ কয়েক বছর আগে লাগানো হয়েছিল। কারণ কালের ঘায়ের কয়েক পোঁচ পলেস্তারা পড়েছে এই পথটুকুর ওপর। কিছুদূর এগুলি চোখে পড়বে অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য। হ্যাঁ, এইখানেই আমার দেখা হ'ল ইতিহাসের সঙ্গে। জলের ধারে ঝোপের মধ্যে একটা তিন-নলা কামান দেখলাম। ইতিহাস জানা নেই। কোনও এক সময়ে জায়গাটায় হয়তো ফৌজি ব্যারাক ছিল। দক্ষিণের সীমানা পাঁচিলের ধার ঘেঁষে দশ-পনেরো মিনিট অন্তর ভোঁ বাজিয়ে দৌড়ে চলেছে শেয়ালদা-বজবজ লাইনের লোকাল ট্রেন। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা বড় বড় গাছগুলোর পাতা এলোমেলোভাবে জড়াজড়ি করে যে জাল তৈরি করেছে, তার ভেতর দিয়ে ট্রেনের কামরার ওপরের অংশটা দেখা যায়। উত্তর-দক্ষিণ, দু’পাড়েই বিশাল বেশ কিছু গাছের গুঁড়ির ব্যাস আর শাখা প্রশাখা বিস্তারের ব্যাপ্তি দেখে মনে হয় ওগুলো যেন স্তব্ধতার মন্ত্রে মূক, এক একটা যেন কালের প্রহরী।

 নেই মোবাইলের উৎপাত। নিজে তেমন ব্যবহার না করলেও, আজকের ব্যস্ততার যুগে যন্ত্রটির প্রয়োজন কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্ত রাস্তাঘাটে, বাস-ট্রাম-ট্রেন, অটো, বাজার-দোকান – সর্বত্র যখন মানুষের ব্যক্তিগত কথার টুকরোগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তখন মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্তির উদ্রেক হয়। আর যন্ত্রটার অপব্যবহারের খবর মাঝে মধ্যেই সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনামে জায়গা করে নেয়। মোবাইল ব্যবহারকারী বেশ কিছু ব্যস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেও বুঝেছি যন্ত্রটা তাঁদের কাছেও উৎপাতের উৎস। তাঁরা আমার মতো ঘরে বসে থাকা বেকার কেউ নন। - ‘আরে মশাই অন্তত এই সকালটা মোবাইলের বিরক্ত ভাল লাগে না - প্রাতর্ভ্রমণকারী এক ভদ্রলোকের মন্তব্য। এই সময়টুকু একেবারেই নিজস্ব। একই বেঞ্চিতে আরও দু'একজন যাঁরা বসেছিলেন তাঁরাও সমস্বরে মন্তব্যটিতে সায় দিলেন।‘


শীত ঘোষণার হাল্কা হিমেল হাওয়া সবে বইতে শুরু করেছে। এমনই একটা দিন বিকেল থাকতে থাকতেই গেলাম লেকে। জায়গাটা প্রায় জনমানবশুন্য বললেই চলে। দেখলাম ঐ সময়ে লেকের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। সূর্য পশ্চিম দিগ্বলয়ে প্রায় হেলে পড়েছে। চোখের সামনে আকাশটা যেন সোনায় আর আবিরে মাখামাখি হয়ে গেল। মিষ্টি নরম রোদ গাছগাছালির লতায় পাতায় পিছল খেয়ে চলার পথে এক আলো-আঁধারির নক্সা তৈরি করেছে। আর সব রঙের সবুজ মিলেমিশে গিয়ে পরিবেশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক মনোরম সবুজাভা। ঝুপরিঝুপরি পাতার আড়াল দিয়ে পশ্চিমের সিঁদুরে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বিশাল এই সবুজের অঙ্গীভূত ঢেউ-য়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম। সারা লেক জুড়ে শান্ত এক ছায়া ক্রমশ গাঢ় হয়ে এল। সময় গড়াতে গড়াতে রোদের তেজ যখন আরো নরম হয়ে এসেছে, শেষ বিকেলের সেই আলোছায়ায় সবুজাভা গাঢ় হতে হতে কোন সময় সন্ধ্যের হাত ধরাধরি করে মিশে গেল। লেক ক্লাব থেকে বেরোনো দুটো নৌকোকে পাড়ের প্রায় ধার দিয়ে শান্ত জলে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ তুলে ফিরতে দেখলাম। শান্ত জলে কুলকুল করে ঢেউয়ের স্রোত পাড়ে এসে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে। আমার মনের অন্তঃস্রোতও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের সময়ের পুরু আবরণ ভেদ করে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল বেশ কয়েকটা বিকেলের এমন মনোমুগ্ধকর রাঙা অপরাহ্নের স্মৃতিতে। পাখিদের ঘরে ফেরার কিচির মিচির আওয়াজ আমাকে যেন জানান দিল, ‘ফিরে চলো ঘরে।' গেট থেকে বেরিয়ে পিছন ফিরে দেখি গাঢ় অন্ধকারে চরাচর ছেয়ে গেছে।

সুদূর অতীতের বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতির ভান্ডার হাতড়ে কিছুটা উদ্ধার করা গেল পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার এক বিকেলের স্মৃতি। অফিসের কাজে রাশিয়ার দুবনা নামের একটা জায়গায় মাসখানেক ছিলাম। যে জায়গায় থাকতাম, তার অনতিদূরে ভোলগা নদীর দু'ধার দিয়ে গাছের সারি আর বাঁধানো রাস্তার উপর কিছুদূর পরে পরেই বসার ব্যবস্থা করা। কাজের পর প্রায় রোজ বিকেলেই ওই জায়গাটায় বেড়াতাম। বহু দশক আগে দেখা ছোট্ট একটা বিদেশি গ্রামের এক টুকরো ছবি আর আমার দক্ষিণ কলকাতার এই লেকের পরিবেশ আমার অজান্তেই কখনই হঠাৎ মিলেমিশে এক হয়ে গেল। দুটোই ছবির মতো। তফাৎ এক জায়গাতে। ওটা ছিল নিশ্চল ছবি। আর আমার ঢাকুরিয়া লেক হ'ল প্রানৈশ্বর্যের কোলাজে সৃষ্ট এক সচল জীবনের রূপরেখা। যাঁরা পশ্চিমের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের বারবার ছোটো করেন, তাঁরা জেনে রাখুন যে, আমার দেশে, বিশেষ করে আমার এই কলকাতায় ষাটোর্ধো যে সব মানুষের মোটামুটি একটা অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আছে, তাঁরা বেশিরভাগই মানসিক সুখে আছেন। এটা ব্যক্তিগতভাবে একটা অহঙ্কারের জায়গা।

প্রায় শীতের শেষ। লেকে ঢুকলাম। কুয়াশার ওড়না দিয়ে যেন আত্মগোপন করে আছে লেক। আকাশে বর্ণহীন তারাগুলো বিষাদ ম্লান। হাঁটা শুরু করলাম। কুয়াশার আস্তরণ ছিঁড়ে লেক ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। মাঝখানে সবুজ জঙ্গলে ভরা ছোট্ট দ্বীপটার আবছাভাব আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগলো। বেড়াতে ইচ্ছে করছিল না। গা শিরশির করা হিমেল হাওয়া বইছিল। চুপ করে বসে শুনছিলাম গাছের কথা, হাওয়ার কথা, ঘরমুখো পাখিদের কথা। মনে হ'ল আমাদের শহুরে জীবনে গাছ নেই, পাখি নেই, ফুল নেই, নির্জনতা নেই বলেই মানুষ এত মেটেরিয়ালিস্টিক, এত লোভী। একটু বেলা বাড়তেই রোদের ঈষদুষ্ঞ উত্তাপ বন্ধু হয়ে যেন জড়িয়ে ধরল। শীতটা বেশ অন্য রকম আমেজে উপভোগ করলাম। 

খৈনিপ্রসাদ পাঠকের (এটাও কাল্পনিক নাম, পড়লেই বোঝা যাবে) গল্পটাই বা বাদ যায় কেন ? ফেরার সময় গেটের মুখে দরোয়ানজী গোছের একটি লোককে দেখি চায়ের দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের তালুতে রাখা খইনি ডলছেন আর দেশওয়ালি দু'একজনের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। সকালে সব মানুষ যখন স্বাস্থ্যচর্চায় ব্যস্ত, তখন ঐ মানুষটিকে দেখে মনে হয় ওই ব্যাপারে ওঁর কোনো হেলদোল নেই। যাইহোক, মিনিটখানেক বাদে খৈনিটা দু'হাতের এ-তালু ও-তালুতে বদলা-বদলি করে চূণের ধূলোটা উড়িয়ে দিয়ে তলার পাটির দাঁত আর ঠোঁটের মাঝে ফেলে দিয়ে থম মেরে বসে রইল। আসলে নেশার বস্তুর মৌতাতের টান না বোঝে সকাল-বিকেল, না বোঝে স্বাস্থ্য। 

লেক কি মানুষকে শুধুমাত্র আকর্ষণই করে ? লেকের গাছগাছালি, লেকের তিরতিরে জলে খেলে বেড়ানো মাছের ঝাঁক, লেকে ভাষাভাষি নির্বিশেষে সর্বধর্ম মানুষজনের মধ্যে সাক্ষাতের উষ্ণতা – এক কথায় লেকের পরিবেশের মুগ্ধতা কি মানুষকে শুধু আকর্ষণই করে, নাকি বিকর্ষণের উপকরণও কিছু আছে ? আছে, অবশ্যই আছে। সময়ের তারতম্যে চিত্রটা একেবারেই পাল্টে যায়। ভোরের আলোতে লেক মানুষের কাছে যতটা ধর্ম-কর্মের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, সন্ধ্যের পর ঠিক ততটাই বা তারও বেশি অধর্ম-অকর্মের আস্তাকুড়। সম্পূর্ণ অজান্তে অসতর্কে এই অভিজ্ঞতা একবারই হয়েছিল। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, কাজেই প্রায় আতঙ্কতাড়িত হয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবার পথ না পেয়ে সহায়-সম্বলহীন মনে হ'ল, নিজেকে দলিত মনে হ'ল। জায়গায় জায়গায় মানুষের প্রকৃতির স্থূলতম লালসার প্রতিযোগিতা চলছে, চলছে রুদ্ধ কামনা-বাসনার বিদ্রোহ। ন্যুনতম রুচিবোধও যাদের আছে, সেইসব মানুষের পক্ষেও ওই একবারই সাক্ষী হয়ে থাকাটাও, নিজের কাছে হলেও চূড়ান্ত অবমাননা। অন্তত আমাদের মতো মানুষের কাছে তো বটেই। একই দিনে সময়ের তারতম্যে এ এক অন্য লেকের ছবি। যাঁরা এড়িয়ে যেতে চান, তাঁরা বলেন ছেলেমেয়েরা নাকি রোমান্সে মসগুল। এটা রোমান্স? বিতর্কে যেতে চাই না। আমার মনে হয়েছে ইন্দ্রিয়জ ব্যাভিচারের ঢালাও পাসপোর্ট নিয়ে তারা এক অন্য দুনিয়ায়। এ তো রোমান্সকে খুন করা হচ্ছে। এটা রোমান্সের তলানি। এসব দেখলে এমন সব কথা মনে পড়ে যা সামনাসামনি বলা দুষ্কর, আবার লিখতে গেলেও কলম সরে না। পরিবারের নিকটতম মানুষটির সঙ্গে ভাগ করে মনের হতাশা দমন করি। অনেক কথা তাকেও বলতে রুচিতে বাধে, তাই নিজেকেই নিজে অনেক কথা বলে চলেছি নিরুচ্চারে। আর নীতিগতভাবে যা মেনে নিতে পারি না, তার দলিলগত প্রমাণ হিসেবে কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ করে রাখি। লেখার এই অংশটুকু তারই প্রতিফলন। আসলে আজকে সামাজিক, এমনকি পারিবারিক জীবন ধারনের মধ্যে ন্যুনতম রক্ষণশীলতার পরিমন্ডল আদৌ নেই। হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার, যেখানে সেই পরিবেশ আছে, সেখানে আজও ছেলেমেয়েদের মেলামেশাতে রয়েছে গোপনীয়তা। আর সেই গোপনীয়তার কারণেই সত্যিকারের আকর্ষণ। আমার মনে হয় রোমান্টিক প্রেমের সম্পর্ক সেখানে আজও তৈরি হয়। রোমান্স আর গোপনীয়তা সেখানে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। আসলে ভোগবাদের আজকের জীবনে, মোদ্দা কথা, সর্বক্ষেত্রে যা দেখি তা হ'ল একবার লজ্জার খোলসটা খুলে ফেললে, সেটাই নিয়ম হয়ে যায়। শুধু তাই নয় তখন চলতে থাকে নির্লজ্জতার প্রতিযোগিতা। সমাজের এতটা অবক্ষয় দেখে আমার শহুরে সভ্যতাগর্বী মন থমকে গেছিল। ভাবতে গিয়ে সমস্ত মনটা গভীর নৈরাস্যে ভরে উঠেছিল। লজ্জা, দুঃখ, অসম্মান- কী না নিহিত ছিল মনের সেই অবস্থার মধ্যে। মনে হয়েছিল কালস্রোত কী দুর্নিবার বেগে মানুষগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের জীবনধারা গতানুগতিক। চাকুরিজীবি, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বেকার, অবসরপ্রাপ্ত- যাঁরা আরও এক ধরনের বেকার, সবাই ওই একই শ্রেণীভুক্ত। ছকে বাঁধা জীবন। মাঝে মধ্যে যতটুকু বৈচিত্র্য আসে সেটা সারা জীবনের নিরিখে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। বৈচিত্র্য দীর্ঘস্থায়ী হবার কথাও নয়। কাজেই বৈচিত্র্যের রেশ খুব শিগগিরই মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গা নেয় একঘেঁয়েমি। শুধুমাত্র সৃষ্টিধর্মী মানুষজন এই ছকের ব্যতিক্রম। এটা আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত। অবসর জীবনের গতানুগতিকতাকে মানুষ নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। সেখানে সবচেয়ে সুবিধে হ'ল, অখন্ড স্বাধীনতার স্বাদ। আমার এক শুভাকাঙ্খী, আমার স্ত্রীর বন্ধুর বাবা, বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই। আমার কাছে উনি খুবই শ্রদ্ধেয়। চাকরি জীবনে উচ্চ পদাধিকারী ছিলেন। বছর তিরিশেক আগে উনি অবসর নিয়েছেন। আমি তখন যুবক। জিজ্ঞাসা করেছিলাম উনি কীভাবে সময় কাটান। তিনি যে উত্তরটা দিয়েছিলেন, মনে এতটাই ধরেছিল যে স্মৃতিতে আজও সতেজ। কাজেই ওঁর মুখের কথাতেই ব্যক্ত করলাম  -  “জীবনে নিজের ইচ্ছেমতো বিশেষ কিছু করে উঠতে পারিনি। শরীর সুস্থ থাকলে এখন সেগুলো করার চেষ্টা করার ইচ্ছে আছে।“ তাঁর ইচ্ছার খুঁটিনাটি ছকের ব্যাপারে কোনও কথা হয়নি। আজও জানিনা। তবে অবসর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে, সেই ছকের সর্বসম্মত একটা ইচ্ছে বোধহয় ভোরের বেড়ানো। সেটা গতানুগতিক হলেও সেই একঘেঁয়েমির মধ্যে এমন একটা চোরা সুখ আছে, এমন মাদকতা আছে, এমন অদৃশ্য হাতছানি আছে, যে সেই প্রত্যাশার প্রতিক্ষায় বাকি চব্বিশ ঘন্টা অনায়াসে কেটে যায়। আঞ্চলিক অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে দেখেছি তেমন মন ভরেনি। লেকে প্রাতর্ভ্রমণ ওই মাদকতার হাতছানি, সুখ, নেশা যাই বলি না কেন, সেই অনুভূতিতে অনেকগুলো বাড়তি মাত্রা যোগ করে। রোজ অনেকটা হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আসলে পরিবেশের প্রভাব পা-কে থামতে দেয় না। বাড়িতে ফিরে এসে রোজই প্রতিজ্ঞা করি কাল থেকে আর লেকমুখো হ’ব না, লোকালয়ের ছোট্ট পার্কে বেড়িয়ে আসব। খাওয়া-দাওয়ার পরে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পালা। শরীর চাঙা হয়ে ওঠে। কাজে কাজেই বিকেলের দিকে সেই প্রতিজ্ঞার কাঠিন্য কমে আসে, সন্ধ্যায় বিলুপ্ত হয়। অতএব পরের দিন থেকে চলতে থাকে একই রুটিন। এতে কোনও একঘেঁয়েমি বলে বোধ হয় না। লেকের প্রাতর্ভ্রমণ এমনভাবেই মন মজিয়ে ফেলেছে।