Friday, July 30, 2021

লেক বিহার

                            লেক বিহার 

          ভোরের আলো ফুটতেই লেকে ঢুকে পড়লাম 

ভোরের মধুর স্বপ্নটা যখন ভাঙলো,  বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করতে করতে স্বপ্নের স্মৃতিটাকে কিছুটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম। ক্যালেন্ডারের তারিখের পিঠে চেপে আরও একটা নতুন ভোরের সূচনা হ'ল। বরাবরই ভোরে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। এই সময়টা আমার কাছে সব সময়ই মধুর, ঋতু নির্বিশেষে বড্ড তাজা। কৈশোর পার করে যৌবনের ভোরটা কেটেছে বম্বেতে; জীবনযুদ্ধের নানা টানাপোড়েনে। অভাবের সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্ত তার মধ্যেও আশা-আকাঙ্খা, কলকাতা ফেরার ভবিষ্যত ভাবনা- সব মিলিয়ে একটা অন্য রকমের আত্মপ্রত্যয়; অন্য স্বাদ ছিল জীবনের সেই ভোরের দিনগুলোর। যাইহোক,  মনে হ'ল দিনটা আজ অন্যভাবে শুরু হোক। অবসর জীবনে প্রাতর্ভ্রমণের আকর্ষণকে বাদ দিয়ে কী  ভাবেই বা আর দিন শুরু করা যায়! কাজেই শুরুটা প্রাতর্ভ্রমণ দিয়েই হোক। জায়গা পরিবর্তন করা যাক বরং। বাড়ির অনতিদূরে ঢাকুরিয়া লেকে চলে গেলাম। জায়গাটা যে বাড়ির এত কাছে, সেই আন্দাজ ছিল না। ও-পাশে শিয়ালদা-বজবজগামী ট্রেন লাইন, আর এ-পাশে সাদার্ন অ্যাভিনিউ।  মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলাধারের দুপাশে সবুজেভরা চর- গোলপার্ক থেকে শুরু হয়ে এঁকেবেঁকে লেক ক্লাবকে পিছনে ফেলে টালিগঞ্জের রেল ব্রিজ পর্যন্ত চলে গিয়েছে। এটাই ঢাকুরিয়া লেক। এই জায়গাটাই সকালে হাতছানি দিয়ে ডাকাডাকি করে। ঢাকুরিয়া ব্রিজের মাঝখানে পৌঁছে পশ্চিম দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেই ঘন্টার আওয়াজ শোনা যাবে- ঢং ঢং ঢং……., বুদ্ধ মন্দিরের ঘন্টা অনুসরণ করে মিনিট দু'তিন হাঁটলেই পাওয়া যাবে লেকে ঢোকার লোহার গেট। পুরো গেট আদৌ খোলা নয়। মানুষ গলার মতো একটা জায়গা ফাঁক করা আছে। মুখ্যতঃ পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ মানুষেরা ঢুকে পড়ছেন সেই ফাঁক গলে। সংখ্যায় কম হলেও মাঝবয়সী অনেক মানুষজনও আছেন ওই দলে, উদ্দেশ্য প্রাতর্ভ্রমণ। বিস্তীর্ণ জলাধারের দুপাশে মনোমুগ্ধকর শ্যামলিমা পরিবেশ। হাঁটাচলা আর শরীরচর্চার এক আদর্শ আবহ। পথচলতি মানুষজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জেনেছি লেকে আঞ্চলিক মানুষ ছাড়াও দূর থেকেও অনেকে আসেন। লেকে ঢোকার মুখে গাড়ি আর দ্বিচক্রযানের ভিড় দেখেও সেটা বোঝা যায়। এক ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে জানলাম তিনি আসছেন পার্ক সার্কাস থেকে।

শরীর পরিচালনার কত রকম পদ্ধতি। বয়সের ধর্মানুযায়ী শরীর পরিচালনা চলছে। নানান বয়সের নানান ঢং। চরিত্রগুলো যেমন যেমন দেখেছি তেমন ভাবেই আঁকবার চেষ্টা করেছি। স্বাস্থাণ্বেষীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে, গাছগাছালি বেষ্টিত জলাধারের বাতাস থেকে ফুসফুস ভর্তি করে অক্সিজেন নিচ্ছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধ মানুষজনের শরীর পরিচালনার তাগিদ আছে। হাঁটাহাঁটিতে তাঁরা অপারগ। স্বাস্থ্যের উপর বয়সের থাবার চিহ্ন স্পষ্ট। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর সখ্যতাও ঘনীভূত হয়েছে; কাজেই শরীর পরিচালনার কায়দা মাথা খাটিয়ে তাঁরা এমনভাবে বেছে নিয়েছেন যাতে বয়সোপযোগী শরীর অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গেই চলতে পারে ঈশ্বর আরাধনা। অবাঙালি একদল অশীতিপর বৃদ্ধের মধ্যেই সেটা লক্ষ্য করা গেল। দলে যে সবাই অশীতিপর, এমন বলা যাবে না। যাইহোক, লাল সিমেন্টের শান বাধানো বেঞ্চির উপর বসে হাত দুখানি বুকের উচ্চতায় রেখে তালে তালে তালি মেরে চলেছেন আর সেই তালির সঙ্গী হ'ল রামনাম। আমার কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জেগেছিল এই রামনাম জপ কতক্ষণ চলে ? সোজা রাস্তায় হেঁটে বেঞ্চি পার হওয়ার সময় মনে হয়েছিল ওঁরা সমস্বরে রামরাম……………,রামরাম………. করেন। অর্থাৎ, রামরাম কথাটার পরেও কিছু একটা দুর্বোধ্য শব্দ যেন তাঁরা উচ্চারণ করছেন। হেঁটে পার হয়ে গেলাম। মিনিট কুড়ি বাদে একই পথে ফেরার সময় দেখলাম সবাই চুপ করে মুখ বুঝে বসে আছেন। পরের দিন প্রায় একই সময়ে ওই বেঞ্চির কাছাকাছি এসে গতি মন্থর করলাম, শুধুমাত্র শোনার জন্য দুর্বোধ্য শব্দটা কি ? কান দুটো খাড়া ছিল। কানে এল যেন ওঁরা বলছেন রামরাম সাতাশি, রামরাম আটাশি, রামরাম নওআশি……। এদের মধ্যে কয়েকজনের কন্ঠে শানানো সুর। আর বারবার উচ্চারণ করে চলেছেন। কাজেই সবটাই ক্রমশ কর্ণগোচর থেকে মর্মগোচর হয়ে গেল। বুঝলাম ওনারা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায়, হয়তো বা একশ বার রামনাম নেবার পর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি করেন। এই বয়সে ঈশ্বরের নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর নাড়াচাড়ার ব্যাপারটা আমাকে চমৎকৃত করেছিল।

ভোরের প্রথম সাক্ষাতের কুশল বিনিময়ের অভিনব পদ্ধতিগুলোও দেখার মতো। কত রকমের সংস্কার মানুষের।  গুড মর্নিং, সুপ্রভাত, নমস্কার, প্রাতঃপ্রনাম, মর্নিং, রামরাম, জয় গুরু, জয় মা তারা, হাই-হ্যালো- এ তো গেল বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের সংস্কার মতো দেশি-বিদেশি কায়দায় কুশল বিনিময়। প্রতুত্তরও ওই একই। তালিকাটা সম্পূর্ণ হ'ল কিনা জানা নেই। যেগুলো কানে আসে সেগুলোই লিখলাম। কিছু মানুষ নিরুচ্চারে হাত উঠিয়ে বা ঘাড় দুলিয়ে চোখের ভাষায় কুশল বিনিময় করছেন; চোখে স্মিত হাসি। সম্পর্কগুলোও হয়তো ওই হাই-হ্যালো জাতীয় সম্বোধনের মধ্যেই শেষ। ব্যতিক্রম একজন। হ্যাঁ, ওই হাজারো মানুষের মধ্যে শুধুই একজন। উনি ওই পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে জগিং-য়ের কায়দায় ছুটতে ছুটতে চলেছেন আর মিনিট খানেক বাদে বাদেই হাঁক পেড়ে চলেছেন, “বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ।" প্রতুত্তরে তাঁর পরিচিত কিছু মানুষ ওই একই বাণী ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কী জানি কৈশোরে হয়তো স্বদেশী করতেন। হয়তো বা ষাট বছরের স্বাধীনতা পাওয়া দেশের মানুষের চালচলনে বিকৃত সাহেবিয়ানা আবার শিগগিরই পরাধীনতার শিকলে বেঁধে না ফেলে, সেই আশঙ্কায় স্বাধীনতার মন্ত্রোচ্চারণ করে মানুষের মনে অগ্রিম সাড়া জাগাচ্ছেন। লেকে প্রাতর্ভ্রমণে যান, অথচ তাঁর ওই “বন্দে মাতরম" ধ্বনি শোনেননি, এমন লেক-ভ্রমণকারী মানুষ খুঁজে পাওয়া শক্ত। আমি অবশ্য লেকের ঢাকুরিয়া দিকটার কথা বলছি।

অশীতিপর আরও একজন ব্যতিক্রমী মানুষের সন্ধান পেলাম। তিনি শুধু বসেই থাকেন। তাঁকে কখনও বেড়াতে দেখিনি।। ভদ্রলোক বাঙালি না অবাঙালি তাও বুঝতে পারিনি। কারণ হিন্দী এবং বাংলায় কথা আদান-প্রদানে সমান স্বচ্ছন্দ। একটা হজমীর কৌটো হাতে ধরে বসে আছেন। কুশল বিনিময়কারী সবাইকেই দুটি করে হজমীগুলি বিতরণ করছেন। শুধুমাত্র ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমিও একদিন নমস্কার জানিয়ে পাশে বসলাম। বলা বাহুল্য ওঁর প্রসাদে বঞ্চিত হইনি। তখনই  আবিষ্কার করলাম ওগুলো হজমীগুলি। অনেকদিন আগে কোনো এক সোমবারের আনন্দবাজারের কলকাতা কড়চায় পড়া একটি মানুষের কথা মনে পড়ে গেল। উনি প্রাতর্ভ্রমণে আসা সাক্ষাৎকারী সবাইকে এক মুঠো ভিজোনো ছোলা বিতরণ করেন। এটাই নাকি ওনার কাছে ঈশ্বর সেবা। লেকের দেখা বৃদ্ধ মানুষটির চিন্তাতেও হয়তো ওই একই দর্শণ কাজ করে।

লেকের দক্ষিণ পাড় বরাবর পূব থেকে পশ্চিমে ফুট পাঁচ-ছয় চওড়া বাঁধানো রাস্তা। সম্প্রতি কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট  (কে আই টি) লেক-সংস্কার কাজে হাত লাগানোর ফলে পুরো পরিবেশটা অনেকটাই সেজে উঠেছে। টালি বাঁধানো রাস্তা বরাবর কুড়ি-বাইস হাত বাদে বাদেই আছে বেঞ্চির আদলে তৈরি শান বাঁধানো বসার জায়গা। কিছু কিছু বেঞ্চিতে আবার ঠেস দেবার ব্যবস্থাও আছে। শুধু তাই নয়, বেঞ্চিগুলো ও রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য বাঁশের লাঠির ডগায় বাঁধা ঝাঁটা, টুকরো কাপড় আর বোতলে জল নিয়ে, কে আই টি নিয়োজিত চার-পাঁচ জন মহিলা কর্মী এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত তদারকি করে চলেছেন। দু'তিন জন পুরুষ কর্মীকেও দেখেছি লেকের জল পরিষ্কার রাখার জন্য লগি দিয়ে জলে ভাসা প্লাস্টিকের বোতল বা ব্যাগ তুলতে। যাইহোক, টালি বাঁধানো রাস্তাটা প্রস্থে প্রায় সাত-আট ফুট। একেবারে শেষে বেশ চওড়া পিচের রাস্তা, যেটা শেষ হয়েছে মিনি লেকের সীমানা-পাঁচিলের গা ঘেঁষে একটা শীর্ণ ফুটপাতে। ওই শীর্ণ ফুটপাত বরাবর পাঁচিলে পিঠ লাগিয়ে লাইন দিয়ে বসে আছে শীর্ণতর কিছু নারী-পুরুষ, পেশায় ভিক্ষাবৃত্তি। ছন্নছাড়া আয়ের মতো জীবনও এদের ছন্নছাড়া। ঘর-বার বলে কিছুই নেই, কোনো বাঁধা আয় নেই অথচ বাঁধা আছে পেট। লেকে হাজার হাজার ধর্মভীরু মানুষের সমাগম। ভিক্ষুক মানুষগুলোর আশা, লেকের জলের মাছের মতো তাদেরও কিছু জুটে যেতে পারে। জীবনভোর পরের হাতের চাকার মতো এরা গড়িয়ে চলে। টালি বাঁধানো আর পিচের রাস্তার মাঝখানটা অনেক চওড়া। সেখানে শুধুই গাছগাছালি।

শরীর চর্চার আরও এক কৌতুহলোদ্দীপক ভাষার সাক্ষী হয়ে বেশ মজা লাগল। কৃত্রিম হাসি যে শরীর চর্চার অঙ্গ, সেটা কাগজ বা পত্রিকা মারফত জানা ছিল। এই জানা ব্যাপারটার জলজ্যান্ত মহড়া দেখলাম লেকের লাফিং-ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে। দশ-বারো জন দু'টো ভাগে ভাগ হয়ে মুখোমুখি দুটো লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এর পর দু-হাত সামনে প্রসারিত করে সমস্বরে উচ্চারিত হ'ল ‘হাঃ হাঃ, পরক্ষণেই উচ্চারিত হ'ল হোঃ হোঃ'। ছন্দে ছন্দে এই হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ মিনিট দুয়েক চলার পর শুরু হ'ল হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ………। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ……… যেন অট্টহাসি।

শরীরচর্চায় ব্যস্ত আরও একজন মানুষের প্রতি নজর কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তাঁর বয়স যৌবনের সীমানাকে পেছনে ফেলে এসেছে, কিন্ত পরিণত প্রৌঢ়ত্বে প্রবেশ করতে অনেক দেরি। মুখের গঠনের সঙ্গে মানানসই গালপাট্টা গোঁফের দু-প্রান্ত মেহেন্দি করা। কাজেই বোঝা যায় যে যৌবনদৃপ্ততা আদৌ মুছে যায় নি। হাতকাটা কালো গেঞ্জি, কালো ট্রাউজার আর স্নিকার পায়ে শোভা পাচ্ছে। সঙ্গে স্ত্রী আছেন, রয়েছে বুলডগ জাতীয় একটি পোষ্য। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শরীর পরিচালনা করছেন, যাকে বলে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ। শরীরের গঠন দেখলে বোঝা যায় চর্চিত অবয়ব। দেহ সৌধটির ব্যাপারে খুবই সচেতন। পোশাকের রকমভেদ এখানে এলেই বোঝা যায়। বিস্তারিত বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। তবে এক জায়গায় সবাই প্রায় সমান। হ্যাঁ, জুতোর ব্যাপারে প্রত্যেকেই ব্যবহার করছেন স্নিকার। যে কোনও জুতোর দোকানে শো-কেসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, দামের রকমভেদে স্নিকার জাতীয় দিয়েই শো-কেস ভরে আছে। এই জুতোগুলো আসলে পথ চলার পক্ষে খুবই আরামদায়ক। নিজে ব্যবহার করেও দেখছি যে প্রাতর্ভ্রমণে পোশাক বা জুতোজোড়ায় একটা বৈশিষ্ট্য না থাকলে শরীরে স্বচ্ছন্দ ভাবটা জেগে উঠতো না।

যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মানুষও যে যন্ত্র হয়ে গিয়েছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। সময় সঙ্কোচনের নতুন নতুন ভাবনায় মানুষ সর্বদাই সজাগ। সময় সঙ্কোচনের অর্থ হ'ল একই সময়ে একাধিক কাজ কিভাবে করা যায়। এ-ও কি আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্বের প্রয়োগ? কে জানে ! যাইহোক, প্রতিযোগিতার বাজারে সকলেই একটু বেশি ব্যস্ত। কিন্ত এর মধ্যেও সত্যিকারের ব্যস্ত মানুষ স্বাস্থ্য সচেতনতার ভাবনাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। চলা-বলার ঢং, স্বাস্থ্যের উজ্জ্বলতা, ব্যক্তিত্বের ভার দেখে তাঁদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ জাগে না। হাতে গোনা এমন দু-একজনকে দেখেছি। তাঁরা সময় সঙ্কোচনের জন্য হাঁটার সাথে সাথে হাতের দুই তালুর মাঝখানে অ্যাকুপ্রেসারের ছুঁচলো কাঠি গড়িয়ে চলেছেন। ভদ্রলোক সম্বন্ধে আমার অনুমান পরখ করে নেবার জন্য কিছুদিন বাদে ওঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় নামলাম। আলাপের গরজটা অবশ্যই আমার তরফ থেকে শুরু হ'ল। জানলাম তিনি ব্যবসায়ী এবং সারা দিন-রাতের ঐটুকু সময় তাঁর নিজস্ব এবং ভোরের লেকের পরিবেশের মুগ্ধতায় যতটুকু শরীরচর্চা উনি করেন সেটা ঐ সময়। ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও দু-একটা কথা বলার ইচ্ছে ছিল, কিন্ত ওনার ব্যস্ততা অনুমান করে মনে হ'ল না, আমি ওঁর বিরাগভাজন হই। প্রাতর্ভ্রমণের সদস্যদের বেশিরভাগকে দেখলেই মনে হয় তাঁদের জীবনযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত কড়া আইনের শক্ত শৃঙ্খলে বাঁধা। তাঁদের অশন, বসন, চলন, কথন, কর্ম, অবসর- সবটা জুড়ে ডিসিপ্লিন নামক বস্তুটির বিস্তৃত অধিকার। 

প্রাতর্ভমণে রঙ্গপ্রিয় মানুষেরও অভাব নেই। দু'একটা নমুনা দিলেই বুঝতে পারা যাবে। শরীরচর্চার পর বুড়োদের আড্ডা-তামাশার আসর বসে। ফুট দশেক দূরে পাশের বেঞ্চিতে বসেছিলাম বলে কথাগুলো কানে পৌঁছোলো। কথ্য ভাষাগুলো অনুচিৎভাবে অশ্লীল মনে হয়নি বলেই তুলে ধরতে পারছি। পরিচিত সমবয়সীদের মধ্যে এইটুকু হয়তো চলতেই পারে। ওঁদের আড্ডার মধ্যে অন্য ধাঁচের আনন্দের খোরাক পাওয়া গেল। মনে হ'ল অন্তরঙ্গ রসিকতা কিছুটা স্থূল হলেও তার মাধুর্য ভিন্ন। নমুনা: (১)……তোদের একটা সুখবর দিই। সুখবরটা উনি যাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তাঁদেরই একজন প্রত্যুত্তরে বললেন- খাওয়াটা তাহলে পাওনা রইল। - ‘তাই বুঝি ! তাহলে পেছন ফেরো।‘ (২)…. অশীতিপর এক বৃদ্ধ বলে উঠলেন ব্রহ্মান্ড মানে কি, জানেন কেউ ? কেউ জানেন না ! তাহলে শুনুন, ব্রহ্মান্ড হল ব্রহ্মার অন্ড। (৩)…..এক-জোড়া কিশোর-কিশোরী একটু ঘনিষ্ঠভাবে ঘোরাঘুরি করছে। ঠিক প্রাতর্ভ্রমণের ঢঙে নয়। ভোরের লেকে সাধারনত বিরল নজির। একজন মন্তব্য করলেন,- ‘বিয়ে-সাদি করে ফেললেই পারে, বছর ঘুরতে না ঘুরতে এক-আধজন ভারতীয় নাগরিক বেড়ে যাবে।‘ কথাগুলো শুনে বুঝলাম যে, দেহ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও, মনে রস এখনও টইটম্বুর। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কৈশোরের সময়টাকে কী গভীর আবেগে না ধরে রেখেছেন, বিন্দুমাত্র মালিন্য নেই। মনে হ'ল মানুষটির উপস্থিতি এক ঝলক আলোর মতো। কাছে এলে একরাশ গুমোটও আড়ালে সেঁধোয়। বয়স হলেও ভেতরে ভেতরে মানুষটা কোথাও একটু কাঁচা একটু সবুজ রয়ে গেছে। চোখের দিকে ভাল করে তাকালে বোঝা যায় বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার সঙ্গে সেখানে হাসি আর কৌতুক যেন মেশামেশি করে আছে।

বেশ কিছুদিন লক্ষ্য করার পর আরও এক মজার চরিত্রের মানুষের সঙ্গে আলাপ জমালাম। তিনি যোগেন বাবু, (আজও জানা নেই ভদ্রলোকের আসল নামট) বেড়ানো শেষ করে একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে উনি কয়েকটা যোগ ব্যায়াম করেন। বয়স সত্তরোর্ধ বলেই মনে হয়। দেহের গড়ন যথেষ্ট শক্তপোক্ত। চাল-চলনেও বয়সের ছাপের কোনো ইঙ্গিত নেই, একটু বেশি রকমের চটপটে। যোগ ব্যায়ামের গুণেই হয়তো এমন ছটপটে চাঙ্গা ভাব। মাথায় তেলা টাকের শ্রীবৃদ্ধি করেছে এক কানের পাশ থেকে শাড়ির চওড়া পাড়ের মতো পাকা চুলের পটি। বিক্ষিপ্তভাবে গোটাকতক আধপাকা চুল পটির মধ্যে থেকে উঁকি মারছে। বেশ শৌখিন বলেই মনে হ'ল ভদ্রলোককে। ধারনাটা স্পষ্ট হ'ল যখন একদিন দেখলাম যোগেনবাবু (আসলে যোগ ব্যায়াম করা অবস্থায় বেশিরভাগ সময় দেখেছি বলেই, ছাত্রাবস্থার ছেলেমানুষী বা দুষ্টুমি, যাই বলি না কেন, মনকে উস্কে দিয়ে জানালো ওঁর নাম যোগেন হওয়া উচিৎ) পকেট থেকে একখানা চিরুনি সযত্নে বার করে চকচকে টাকে বোলাচ্ছেন। ব্যাপারখানা বেশ মজার ঠেকলো। চুলবিহীন টাকে চিরুনি বোলানোর রহস্যটা জানার কৌতুহল চাপতে পারলাম না। কলেজ জীবনের দুষ্টুমি আরও একবার মনকে নাড়া দিল। উপায় বার করতে হবে। বেশ কিছুদিন ওই একই বেঞ্চিতে বসে মাঝেমধ্যেই দু'একটা মামুলি কথা বলে অপরিচয়ের বাধাটা কাটিয়ে ফেললাম। কথা বলে বুঝলাম ভদ্রলোকের স্বভাবে অসঙ্গত লজ্জা বা অতিরিক্ত সঙ্কোচ নেই। অতএব রসিকতা করার ঝুঁকি নেওয়াই যায়। একদিন জিজ্ঞাসা করে বসলাম,- ‘দাদা আপনার চিরুনি ব্যবহারের রহস্যটা একটু বলবেন ?’ ভদ্রলোক হাঃ হাঃ….. করে  প্রানখোলা হাসিতে আমার প্রশ্নের তারিফ করে বললেন, ‘আরে ভাই জোয়ান বয়সে মাথাভর্তি শুধু ঘন কুচকুচে কালো চুল যে ছিল তাই নয়, রীতিমত কোঁকড়ানো বাহারি চুল ছিল। তখন থেকেই পকেটে চিরুনি রাখার অভ্যেস। সেটা আজও ছাড়তে পারিনি ; অবচেতনে পকেটে হাত চলে যায়।‘ চরিত্রের নিঃসঙ্কোচ ভাবটা ঠাহর করে আমি ওঁকে টাক সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের একটা সরস উদ্ধৃতি গল্পচ্ছলে বললাম। যাঁদের শোনা নেই তাঁদের জন্য  বলছি : এক সময় এক কেশ তৈল প্রস্তুতকারক সংস্থার তরফ থেকে রবি ঠাকুরের কাছে একটি শংসাপত্রের আবেদন আসে, তাঁদের উৎপাদিত বস্তুটির অর্থাৎ তেলের বিপণনের সুবিধার্থে। ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও সংস্থা কর্তাদের বারংবার অনুরোধ গুরুদেব প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে এমন একটি শংসাপত্র লেখেন। মূল বয়ানটা ঠিক মনে নেই, তবে ভাবটা অনেকটাই এরকম : ‘অমুক সংস্থার তেল ব্যবহারের পূর্বে আমার মাথার তালুর দুটি জায়গায় ছোট্ট ছোট্ট দুটি টাকের সম্ভাবনার সন্ধান মিলিয়াছিল। এঁদের কেশতৈলের গুণে ছোট্ট ছোট্ট ওই দুটি টাক একত্রিত হইয়া একটিতে রূপান্তরিত হইয়াছে। সুতরাং অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে টাকের সংখ্যা কমাইতে হইলে এমন তেলের জুড়ি মেলা নিঃসন্দেহে কঠিন।‘ জানা নেই প্রস্তুতকারক সংস্থাটি শংসাপত্রখানি কাজে লাগিয়েছিল কিনা। যাইহোক,  যোগেনবাবু গল্পটা উপভোগ করেছিলেন। 

         পশ্চিম আকাশের  কোলে মেঘের চোখরাঙানি

অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও এক দিনের ঘটনা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। এক ধর্মপ্রাণ মানুষের সংস্কারবোধ। হিসেব মতো বর্ষা তখনও আসেনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনে হ'ল চারিদিকে আবহাওয়া কেমন যেন গম্ভীর। পশ্চিম আকাশে এক ফালি কুচকুচে মেঘ চোখে পড়লো। বৃষ্টি হবে কি হবেনা, এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়েই চলে গেলাম লেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাল্কা বাতাস বইতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম ঘন মেঘের ফালিটা নিজেকে হাল্কা করে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিম থেকে দক্ষিণ পুবে, প্রায় সারা আকাশটাতেই। অহেতুক ঝুঁকি না নিয়ে আমি বাড়িমুখো হলাম। ফিরতে ফিরতে মনে হ'ল এই সাতসকালে মেঘে মেঘে যেন সন্ধ্যে নেমে এল। হঠাৎই আকাশ চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি। লেক থেকে বেরোবার গেটের মুখে প্রায় চলে এসেছি। কানে এল খোলা গলায় সূর্য প্রণাম মন্ত্র-

ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্,

ধন্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পূব আকাশ মুখো হয়ে গাছতলায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোক সূর্য প্রণাম সারছেন। সূর্যদেবকে মেঘ গ্রাস করেছে ঠিকই, কিন্ত মেঘের চূড়ায় চূড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে তার সোনালি স্বাক্ষর। সূর্য প্রণাম বহুশ্রুত। কিন্ত এই পরিবেশে আগে কখনও এমন সুযোগ আসেনি। আপনা হতেই যতি পড়ল আমার গতিছন্দে। আবৃত্তি যে এত মধুর, এমন স্বচ্ছন্দ সুরময়, তার আবেদন যে এত অনায়াসে অন্তরকে স্পর্শ করে, তা জানার সুযোগ এর আগে আর হয়নি। সেই মুহূর্তের পরিবেশ হয়তো আমাকে প্রভাবিত করেছিল। যাইহোক, ভদ্র লোকের বয়সোচিত সংস্কারকে মনে মনে কুর্নিশ জানালাম। এতদিন মনে হতো শুধুমাত্র শরীরচর্চার উদ্দেশ্যেই, শরীর-মন সতেজ রাখার জন্যই প্রাতর্ভ্রমণ। এখন বুঝলাম যে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়ার মধ্যে যে সার্থকতা আছে, তার গুরুত্ব কিছু কম না।

কিছু মানুষ মাছের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। আটার রুটি, পাঁউরুটি, বিস্কুট, মুড়ি, মাখা আটা। লেকের পরিস্কার জলে ভেসে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে মাছের দল। মাছ খাওয়ানোর দৃশ্যটা দেখার মতো। ছোট্ট পরিসরের জায়গাটায় কিছুক্ষণের জন্য যেন একটা উৎসবের উল্লাস জমাট বেঁধে ওঠে। পাড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে লোকে খাবার দিচ্ছে। একটি সারমেয় মুখ তুলে লোলুপ দৃষ্টিতে দূরে বসে আছে, কিছু জুটে যাবার আশায়। আশাহত হয় না সে। মাছ খাওয়াতে খাওয়াতে এক আধ টুকরো ঐদিকেও ছুঁড়ে দেয় মানুষ। 

রাস্তার ওপাশে লেকের প্রায় গায়েই রয়েছে আরও একটি ছোট্ট লেক। নাম পদ্মপুকুর। অশীতিপর বৃদ্ধেরা যেখানে বসে হিসেব করে রাম নাম করছেন ঠিক তার উল্টোদিকের উদাসী বিজন সড়ক বরাবর মিনিট দুয়েক হাঁটলেই চোখে পড়বে পদ্মপুকুরে ঢোকার লোহার ফটক। জায়গাটা আমার কাছে বড় লেকের তুলনায় আদৌ আকর্ষণীয় মনে হয়নি। পুরো একটা পাক ঘুরে আসলে প্রায় আধ মাইল পথ হাঁটা হয়ে যায়। গাছগাছালি আছে, বসবার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চির ব্যবস্থাও আছে। তবে বড় লেকের মতো পরিবেশ জমজমাট নয়। প্রাতর্ভ্রমণের কুশল বিনিময় আদান প্রদানের কোনো বালাই নেই। অল্প সংখ্যায় কিছু মানুষ  যান্ত্রিক ভাবে মর্নিং-ওয়াকে ব্যস্ত। বড় লেকের বিশালত্বের পরিবেশে প্রানের স্ফূরণ অনেক স্বতঃস্ফূর্ত। আসলে বিশালত্বের সংস্পর্শে মানুষ অনেক উদারমনা হয়ে যায়, দেহ-মনে প্রশন্নতার সাড়া অনুভব করে। শুধু মানুষই বা বলছি কেন, নির্বাক গাছগুলোও শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মাথা নুইয়েছে লেকের জলের কোলে।

 পূব থেকে পশ্চিমমুখো চলতে চলতে লেক যেখানে প্রথম বাঁক নিয়েছে, যেখান থেকে বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরালে সাউথ সিটি কমপ্লেক্সের গগনচুম্বী ইমারত গুলো দেখা যায়, সেখান থেকে প্রায় দেড়শো মিটার পথে ধূসর রঙের আট-ইঞ্চি বর্গাকার টালি বসানো। এই দৈর্ঘ্যটুকুকে শুধু পথ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। এই জায়গাটায় পথ, বাগান, স্থাপত্য- সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা গাছের গোড়া ঘিরে তৈরি করা হয়েছে ঘাসের বেদি। ঘাসগুলো নিখুঁতভাবে ছাঁটা, মনে হয় ভেলভেটের কার্পেট। সেই কার্পেট, গাছের গোড়া থেকে ঢালু হয়ে নেমে এসে মিশেছে রাস্তার সঙ্গে।

কিছু গাছের গোড়া ঘিরে ভিড় করেছে ছোটো ছোটো পাতাবাহার গাছের জঙ্গল। জঙ্গল বলাটা হয়তো ঠিক হ'ল না। কারণ, জঙ্গল কথাটার সঙ্গে আলগাভাবে একটা বিশৃঙ্খলার ভাব জড়িয়ে আছে। বলা যায় এটা সেই জঙ্গল যেখানে দক্ষ মালীর হাতের যাদু আছে। স্বল্প পরিসরের ওই জায়গাটাতে নানা জাতের সবুজের মাখামাখি রঙের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে নীরবে। গাছে গাছে মিলে কী শোভা! ক্ষণিক আনন্দের ঝলক আমার মনেও রঙ ধরিয়ে দিয়েছিল। ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। ঘড়িতে চোখ পড়তেই সভয়ে প্রত্যাবর্তনের জন্য ছুটতে হ'ল, না হলে ওষুধ খাবার সময় পার হয়ে যাবে। বিচ্ছেদের বেদনা নিয়েই সেদিনের মত ফিরে এলাম। সবুজ যে কত রকমের হতে পারে, চোখে না দেখলে ঠিক ঠাহর করা যায় না। রঙ-বেরঙের সবুজের এই বাহার হয়তো কোনো শিল্পীও কল্পনা করতে পারেন না। আসলে বিধাতার মতো শিল্পী কি আর কেউ আছে! এক কথায় লেকের এই ছোট্ট অংশটুকু দেখে মনে হয় যেন রানির সাজে সেজেছে।

মাঝখানে কিছুদিন ভাটা পড়ল। হঠাৎ পর পর দুদিন রাত্রে বৃষ্টি হওয়ার ফলে ঠান্ডা লেগে জ্বর হয়ে গেছিল। ঝুঁকি নিয়ে বেশি দূরে যেতে ভয় লাগছিল। বাড়ির কাছাকাছি পুরনো জায়গা, যোধপুর পার্কের সীমানার মধ্যে  মিউনিসিপ্যালিটির ছোট্ট পার্কটাতে গিয়ে বসতাম। আসলে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা হচ্ছিল না। তাছাড়া সামান্য শরীর খারাপ হলেও একটু বেশি সচেতন হয়ে পড়ি। যাইহোক, সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর যথারীতি পুরনো রুটিনে ফিরে গেলাম। ইতিমধ্যে বর্ষা এসে গেল। ছাতা হাতে নিয়ে প্রাতর্ভ্রমণ ঠিক জমে না। যাইহোক, বর্ষার মধ্যেই আকাশ বুঝে আবার লেকে যাওয়া শুরু করেছি। গ্রীষ্মের যে দাবদাহ, অজস্র গাছগাছালির সংস্পর্শে না এলে ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। গ্রীষ্মের লেকে গাছগাছালিগুলো চোখে পড়তো ঠিকই, কিন্ত বর্ষায় সেগুলোর চেহারায় ধরা দিয়েছে সদ্যস্নাত নববধূর রূপ। অনন্ত তৃষ্ণা নিবারণের পর যেন নতুন জীবন পেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। লেকের জলের স্তর অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। জনসমাগম কমে গিয়েছে। লক্ষ্য করলাম মাত্র এক-আধজন মানুষ মাছ খাওয়াতে ব্যস্ত। মাসখানেক আগেও যেখানে মাছের ঝাঁক কিলবিল করতো, আর একই সঙ্গে ডজনখানেক মৎস্যপ্রেমিক মানুষের ছড়ানো খাবার এক লহমায় নিঃশেষ হয়ে যেত, সেখানে মাঝেমধ্যে দু'একটা মাছ দেখা যাচ্ছে আর জলে খাবার ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশের বেঞ্চিতে বসা ভদ্রলোককে কথাটা পাড়লাম- এত মাছ গেল কোথায় ? ওঁর লেকের সঙ্গে পরিচয় বিগত বিশ বছর যাবৎ। উনি বললেন, বছরের এই সময়ে একদল লোক ভোর চারটে বা তারও আগে এসে মাছ তুলে নিয়ে যায়। আমি অবাক হয়ে বললাম প্রাইভেট সিকিউরিটি ছাড়া সরকারী পুলিশও তো টহলে থাকে সারারাত ! 

- আরে মশাই বোঝেন না, পুলিসের সঙ্গে হিসেব আছে, গলার স্বরে স্পষ্ট বিরক্তির সুর।

- আপনি কি জাল ফেলে মাছ ধরতে দেখেছেন, না লোকমুখে শুনে বলছেন ? 

- আমি দেখেই বলছি।

- তা আপত্তি করলেন না ?

- অবশ্যই করেছিলাম। কিন্ত ওরা শুধু দলেই ভারি ছিল না, আমাকে গম্ভীরভাবে বলল, ‘নাক গলাবেন না, বেড়াতে এসেছেন, ঘুরে বেড়ান না ? আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন।‘ ভদ্রলোক আরও বললেন যে কথাগুলোর ঢঙে যথেষ্ট হুমকির গন্ধ ছিল এবং যেটা অগ্রাহ্য করা এ বয়সে সাহসে কুলোয়নি। আমি বললাম, আপনি ঠিকই করেছিলেন দাদা, আমি হলেও তাই করতাম। বাড়ি ফেরার পর খাবার টেবিলে পরিবারের সবাইকে জানালাম। আসলে সব শহরেই চিরকাল এক জাতের গুন্ডা-বদমায়েস বেকার ছেলেরা বাস করে। সম্ভবত চিরদিনই থাকবে, যতই সমাজতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন। সৎ উপায়ে খেটে খেতে সকলে চায় না। পরিশ্রমে সকলের রুচি থাকবে, তা বোধহয় আশাও করা যায় না।

লেকের উত্তর  দিকের পাড়টা ভালই সাজানো-গোছানো। সেই তুলনায় দক্ষিণে প্রায় হাত পড়েনি বললেই মনে হয়, শুধুমাত্র পায়ে হাঁটা রাস্তাটুকু ছাড়া। ছাই রঙ আর মেটে লাল রঙের ষড়ভূজাকৃতি টালি লাগিয়ে রাস্তাটা তৈরি হয়েছে; এক লাইন ছাই রঙ, পরের লাইন মেটে লাল রঙ। সমস্ত রাস্তাটা এরই পুনরাবৃত্তি। পূব থেকে পশ্চিমমুখো হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলে চোখে পড়বে প্রায় একশ মিটার মতো রাস্তার টালিগুলো বেশ কয়েক বছর আগে লাগানো হয়েছিল। কারণ কালের ঘায়ের কয়েক পোঁচ পলেস্তারা পড়েছে এই পথটুকুর ওপর। কিছুদূর এগুলি চোখে পড়বে অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য। হ্যাঁ, এইখানেই আমার দেখা হ'ল ইতিহাসের সঙ্গে। জলের ধারে ঝোপের মধ্যে একটা তিন-নলা কামান দেখলাম। ইতিহাস জানা নেই। কোনও এক সময়ে জায়গাটায় হয়তো ফৌজি ব্যারাক ছিল। দক্ষিণের সীমানা পাঁচিলের ধার ঘেঁষে দশ-পনেরো মিনিট অন্তর ভোঁ বাজিয়ে দৌড়ে চলেছে শেয়ালদা-বজবজ লাইনের লোকাল ট্রেন। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা বড় বড় গাছগুলোর পাতা এলোমেলোভাবে জড়াজড়ি করে যে জাল তৈরি করেছে, তার ভেতর দিয়ে ট্রেনের কামরার ওপরের অংশটা দেখা যায়। উত্তর-দক্ষিণ, দু’পাড়েই বিশাল বেশ কিছু গাছের গুঁড়ির ব্যাস আর শাখা প্রশাখা বিস্তারের ব্যাপ্তি দেখে মনে হয় ওগুলো যেন স্তব্ধতার মন্ত্রে মূক, এক একটা যেন কালের প্রহরী।

 নেই মোবাইলের উৎপাত। নিজে তেমন ব্যবহার না করলেও, আজকের ব্যস্ততার যুগে যন্ত্রটির প্রয়োজন কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্ত রাস্তাঘাটে, বাস-ট্রাম-ট্রেন, অটো, বাজার-দোকান – সর্বত্র যখন মানুষের ব্যক্তিগত কথার টুকরোগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তখন মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্তির উদ্রেক হয়। আর যন্ত্রটার অপব্যবহারের খবর মাঝে মধ্যেই সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনামে জায়গা করে নেয়। মোবাইল ব্যবহারকারী বেশ কিছু ব্যস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেও বুঝেছি যন্ত্রটা তাঁদের কাছেও উৎপাতের উৎস। তাঁরা আমার মতো ঘরে বসে থাকা বেকার কেউ নন। - ‘আরে মশাই অন্তত এই সকালটা মোবাইলের বিরক্ত ভাল লাগে না - প্রাতর্ভ্রমণকারী এক ভদ্রলোকের মন্তব্য। এই সময়টুকু একেবারেই নিজস্ব। একই বেঞ্চিতে আরও দু'একজন যাঁরা বসেছিলেন তাঁরাও সমস্বরে মন্তব্যটিতে সায় দিলেন।‘


শীত ঘোষণার হাল্কা হিমেল হাওয়া সবে বইতে শুরু করেছে। এমনই একটা দিন বিকেল থাকতে থাকতেই গেলাম লেকে। জায়গাটা প্রায় জনমানবশুন্য বললেই চলে। দেখলাম ঐ সময়ে লেকের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। সূর্য পশ্চিম দিগ্বলয়ে প্রায় হেলে পড়েছে। চোখের সামনে আকাশটা যেন সোনায় আর আবিরে মাখামাখি হয়ে গেল। মিষ্টি নরম রোদ গাছগাছালির লতায় পাতায় পিছল খেয়ে চলার পথে এক আলো-আঁধারির নক্সা তৈরি করেছে। আর সব রঙের সবুজ মিলেমিশে গিয়ে পরিবেশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক মনোরম সবুজাভা। ঝুপরিঝুপরি পাতার আড়াল দিয়ে পশ্চিমের সিঁদুরে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বিশাল এই সবুজের অঙ্গীভূত ঢেউ-য়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম। সারা লেক জুড়ে শান্ত এক ছায়া ক্রমশ গাঢ় হয়ে এল। সময় গড়াতে গড়াতে রোদের তেজ যখন আরো নরম হয়ে এসেছে, শেষ বিকেলের সেই আলোছায়ায় সবুজাভা গাঢ় হতে হতে কোন সময় সন্ধ্যের হাত ধরাধরি করে মিশে গেল। লেক ক্লাব থেকে বেরোনো দুটো নৌকোকে পাড়ের প্রায় ধার দিয়ে শান্ত জলে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ তুলে ফিরতে দেখলাম। শান্ত জলে কুলকুল করে ঢেউয়ের স্রোত পাড়ে এসে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে। আমার মনের অন্তঃস্রোতও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের সময়ের পুরু আবরণ ভেদ করে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল বেশ কয়েকটা বিকেলের এমন মনোমুগ্ধকর রাঙা অপরাহ্নের স্মৃতিতে। পাখিদের ঘরে ফেরার কিচির মিচির আওয়াজ আমাকে যেন জানান দিল, ‘ফিরে চলো ঘরে।' গেট থেকে বেরিয়ে পিছন ফিরে দেখি গাঢ় অন্ধকারে চরাচর ছেয়ে গেছে।

সুদূর অতীতের বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতির ভান্ডার হাতড়ে কিছুটা উদ্ধার করা গেল পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার এক বিকেলের স্মৃতি। অফিসের কাজে রাশিয়ার দুবনা নামের একটা জায়গায় মাসখানেক ছিলাম। যে জায়গায় থাকতাম, তার অনতিদূরে ভোলগা নদীর দু'ধার দিয়ে গাছের সারি আর বাঁধানো রাস্তার উপর কিছুদূর পরে পরেই বসার ব্যবস্থা করা। কাজের পর প্রায় রোজ বিকেলেই ওই জায়গাটায় বেড়াতাম। বহু দশক আগে দেখা ছোট্ট একটা বিদেশি গ্রামের এক টুকরো ছবি আর আমার দক্ষিণ কলকাতার এই লেকের পরিবেশ আমার অজান্তেই কখনই হঠাৎ মিলেমিশে এক হয়ে গেল। দুটোই ছবির মতো। তফাৎ এক জায়গাতে। ওটা ছিল নিশ্চল ছবি। আর আমার ঢাকুরিয়া লেক হ'ল প্রানৈশ্বর্যের কোলাজে সৃষ্ট এক সচল জীবনের রূপরেখা। যাঁরা পশ্চিমের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের বারবার ছোটো করেন, তাঁরা জেনে রাখুন যে, আমার দেশে, বিশেষ করে আমার এই কলকাতায় ষাটোর্ধো যে সব মানুষের মোটামুটি একটা অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আছে, তাঁরা বেশিরভাগই মানসিক সুখে আছেন। এটা ব্যক্তিগতভাবে একটা অহঙ্কারের জায়গা।

প্রায় শীতের শেষ। লেকে ঢুকলাম। কুয়াশার ওড়না দিয়ে যেন আত্মগোপন করে আছে লেক। আকাশে বর্ণহীন তারাগুলো বিষাদ ম্লান। হাঁটা শুরু করলাম। কুয়াশার আস্তরণ ছিঁড়ে লেক ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। মাঝখানে সবুজ জঙ্গলে ভরা ছোট্ট দ্বীপটার আবছাভাব আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগলো। বেড়াতে ইচ্ছে করছিল না। গা শিরশির করা হিমেল হাওয়া বইছিল। চুপ করে বসে শুনছিলাম গাছের কথা, হাওয়ার কথা, ঘরমুখো পাখিদের কথা। মনে হ'ল আমাদের শহুরে জীবনে গাছ নেই, পাখি নেই, ফুল নেই, নির্জনতা নেই বলেই মানুষ এত মেটেরিয়ালিস্টিক, এত লোভী। একটু বেলা বাড়তেই রোদের ঈষদুষ্ঞ উত্তাপ বন্ধু হয়ে যেন জড়িয়ে ধরল। শীতটা বেশ অন্য রকম আমেজে উপভোগ করলাম। 

খৈনিপ্রসাদ পাঠকের (এটাও কাল্পনিক নাম, পড়লেই বোঝা যাবে) গল্পটাই বা বাদ যায় কেন ? ফেরার সময় গেটের মুখে দরোয়ানজী গোছের একটি লোককে দেখি চায়ের দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের তালুতে রাখা খইনি ডলছেন আর দেশওয়ালি দু'একজনের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। সকালে সব মানুষ যখন স্বাস্থ্যচর্চায় ব্যস্ত, তখন ঐ মানুষটিকে দেখে মনে হয় ওই ব্যাপারে ওঁর কোনো হেলদোল নেই। যাইহোক, মিনিটখানেক বাদে খৈনিটা দু'হাতের এ-তালু ও-তালুতে বদলা-বদলি করে চূণের ধূলোটা উড়িয়ে দিয়ে তলার পাটির দাঁত আর ঠোঁটের মাঝে ফেলে দিয়ে থম মেরে বসে রইল। আসলে নেশার বস্তুর মৌতাতের টান না বোঝে সকাল-বিকেল, না বোঝে স্বাস্থ্য। 

লেক কি মানুষকে শুধুমাত্র আকর্ষণই করে ? লেকের গাছগাছালি, লেকের তিরতিরে জলে খেলে বেড়ানো মাছের ঝাঁক, লেকে ভাষাভাষি নির্বিশেষে সর্বধর্ম মানুষজনের মধ্যে সাক্ষাতের উষ্ণতা – এক কথায় লেকের পরিবেশের মুগ্ধতা কি মানুষকে শুধু আকর্ষণই করে, নাকি বিকর্ষণের উপকরণও কিছু আছে ? আছে, অবশ্যই আছে। সময়ের তারতম্যে চিত্রটা একেবারেই পাল্টে যায়। ভোরের আলোতে লেক মানুষের কাছে যতটা ধর্ম-কর্মের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, সন্ধ্যের পর ঠিক ততটাই বা তারও বেশি অধর্ম-অকর্মের আস্তাকুড়। সম্পূর্ণ অজান্তে অসতর্কে এই অভিজ্ঞতা একবারই হয়েছিল। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, কাজেই প্রায় আতঙ্কতাড়িত হয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবার পথ না পেয়ে সহায়-সম্বলহীন মনে হ'ল, নিজেকে দলিত মনে হ'ল। জায়গায় জায়গায় মানুষের প্রকৃতির স্থূলতম লালসার প্রতিযোগিতা চলছে, চলছে রুদ্ধ কামনা-বাসনার বিদ্রোহ। ন্যুনতম রুচিবোধও যাদের আছে, সেইসব মানুষের পক্ষেও ওই একবারই সাক্ষী হয়ে থাকাটাও, নিজের কাছে হলেও চূড়ান্ত অবমাননা। অন্তত আমাদের মতো মানুষের কাছে তো বটেই। একই দিনে সময়ের তারতম্যে এ এক অন্য লেকের ছবি। যাঁরা এড়িয়ে যেতে চান, তাঁরা বলেন ছেলেমেয়েরা নাকি রোমান্সে মসগুল। এটা রোমান্স? বিতর্কে যেতে চাই না। আমার মনে হয়েছে ইন্দ্রিয়জ ব্যাভিচারের ঢালাও পাসপোর্ট নিয়ে তারা এক অন্য দুনিয়ায়। এ তো রোমান্সকে খুন করা হচ্ছে। এটা রোমান্সের তলানি। এসব দেখলে এমন সব কথা মনে পড়ে যা সামনাসামনি বলা দুষ্কর, আবার লিখতে গেলেও কলম সরে না। পরিবারের নিকটতম মানুষটির সঙ্গে ভাগ করে মনের হতাশা দমন করি। অনেক কথা তাকেও বলতে রুচিতে বাধে, তাই নিজেকেই নিজে অনেক কথা বলে চলেছি নিরুচ্চারে। আর নীতিগতভাবে যা মেনে নিতে পারি না, তার দলিলগত প্রমাণ হিসেবে কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ করে রাখি। লেখার এই অংশটুকু তারই প্রতিফলন। আসলে আজকে সামাজিক, এমনকি পারিবারিক জীবন ধারনের মধ্যে ন্যুনতম রক্ষণশীলতার পরিমন্ডল আদৌ নেই। হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার, যেখানে সেই পরিবেশ আছে, সেখানে আজও ছেলেমেয়েদের মেলামেশাতে রয়েছে গোপনীয়তা। আর সেই গোপনীয়তার কারণেই সত্যিকারের আকর্ষণ। আমার মনে হয় রোমান্টিক প্রেমের সম্পর্ক সেখানে আজও তৈরি হয়। রোমান্স আর গোপনীয়তা সেখানে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। আসলে ভোগবাদের আজকের জীবনে, মোদ্দা কথা, সর্বক্ষেত্রে যা দেখি তা হ'ল একবার লজ্জার খোলসটা খুলে ফেললে, সেটাই নিয়ম হয়ে যায়। শুধু তাই নয় তখন চলতে থাকে নির্লজ্জতার প্রতিযোগিতা। সমাজের এতটা অবক্ষয় দেখে আমার শহুরে সভ্যতাগর্বী মন থমকে গেছিল। ভাবতে গিয়ে সমস্ত মনটা গভীর নৈরাস্যে ভরে উঠেছিল। লজ্জা, দুঃখ, অসম্মান- কী না নিহিত ছিল মনের সেই অবস্থার মধ্যে। মনে হয়েছিল কালস্রোত কী দুর্নিবার বেগে মানুষগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের জীবনধারা গতানুগতিক। চাকুরিজীবি, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বেকার, অবসরপ্রাপ্ত- যাঁরা আরও এক ধরনের বেকার, সবাই ওই একই শ্রেণীভুক্ত। ছকে বাঁধা জীবন। মাঝে মধ্যে যতটুকু বৈচিত্র্য আসে সেটা সারা জীবনের নিরিখে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। বৈচিত্র্য দীর্ঘস্থায়ী হবার কথাও নয়। কাজেই বৈচিত্র্যের রেশ খুব শিগগিরই মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গা নেয় একঘেঁয়েমি। শুধুমাত্র সৃষ্টিধর্মী মানুষজন এই ছকের ব্যতিক্রম। এটা আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত। অবসর জীবনের গতানুগতিকতাকে মানুষ নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। সেখানে সবচেয়ে সুবিধে হ'ল, অখন্ড স্বাধীনতার স্বাদ। আমার এক শুভাকাঙ্খী, আমার স্ত্রীর বন্ধুর বাবা, বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই। আমার কাছে উনি খুবই শ্রদ্ধেয়। চাকরি জীবনে উচ্চ পদাধিকারী ছিলেন। বছর তিরিশেক আগে উনি অবসর নিয়েছেন। আমি তখন যুবক। জিজ্ঞাসা করেছিলাম উনি কীভাবে সময় কাটান। তিনি যে উত্তরটা দিয়েছিলেন, মনে এতটাই ধরেছিল যে স্মৃতিতে আজও সতেজ। কাজেই ওঁর মুখের কথাতেই ব্যক্ত করলাম  -  “জীবনে নিজের ইচ্ছেমতো বিশেষ কিছু করে উঠতে পারিনি। শরীর সুস্থ থাকলে এখন সেগুলো করার চেষ্টা করার ইচ্ছে আছে।“ তাঁর ইচ্ছার খুঁটিনাটি ছকের ব্যাপারে কোনও কথা হয়নি। আজও জানিনা। তবে অবসর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে, সেই ছকের সর্বসম্মত একটা ইচ্ছে বোধহয় ভোরের বেড়ানো। সেটা গতানুগতিক হলেও সেই একঘেঁয়েমির মধ্যে এমন একটা চোরা সুখ আছে, এমন মাদকতা আছে, এমন অদৃশ্য হাতছানি আছে, যে সেই প্রত্যাশার প্রতিক্ষায় বাকি চব্বিশ ঘন্টা অনায়াসে কেটে যায়। আঞ্চলিক অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে দেখেছি তেমন মন ভরেনি। লেকে প্রাতর্ভ্রমণ ওই মাদকতার হাতছানি, সুখ, নেশা যাই বলি না কেন, সেই অনুভূতিতে অনেকগুলো বাড়তি মাত্রা যোগ করে। রোজ অনেকটা হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আসলে পরিবেশের প্রভাব পা-কে থামতে দেয় না। বাড়িতে ফিরে এসে রোজই প্রতিজ্ঞা করি কাল থেকে আর লেকমুখো হ’ব না, লোকালয়ের ছোট্ট পার্কে বেড়িয়ে আসব। খাওয়া-দাওয়ার পরে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পালা। শরীর চাঙা হয়ে ওঠে। কাজে কাজেই বিকেলের দিকে সেই প্রতিজ্ঞার কাঠিন্য কমে আসে, সন্ধ্যায় বিলুপ্ত হয়। অতএব পরের দিন থেকে চলতে থাকে একই রুটিন। এতে কোনও একঘেঁয়েমি বলে বোধ হয় না। লেকের প্রাতর্ভ্রমণ এমনভাবেই মন মজিয়ে ফেলেছে।


Thursday, July 29, 2021

ত্রিপুরায় প্রশান্তকিশোর

 প্রশান্ত কিশোরের আইপ্যাকের ২৩  জনের সমীক্ষক দল এই মুহূর্তে ত্রিপুরায়। সম্ভবত তাঁরা সেখানকার রাজনৈতিক আবহাওয়া ঠাহর করার জন্যই ওখানে হাজির হয়েছেন। কোভিদের সমস্ত সতর্কতা বিধি মেনেই তাঁরা সেখানে পৌঁছেছেন। অথচ স্রেফ সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁদের নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে। আজ সকালের কাগজে খবরটা পড়লাম।  সন্ধ্যের টেলিভিশনের খবরে জানলাম অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাঁরা তখনও গৃহবন্দী। ত্রিপুরা বিধানসভা ভোটের এখনও দু'বছর বাকি। সন্দেহ হচ্ছে, যে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ভোটের অ-ভাবনীয় ফলাফলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কিছুটা দিশেহারা হয়ে আছে। এটা হয়তো তারই প্রতিফলন। এরকম আচরণ বোধহয় যে কোনো দলের দুর্বলতার লক্ষণ। এতটা আগ্রাসী না হয়ে আন্তরিকভাবে একটু মানবিক মুখ দেখালে মনে হয় সেটা ভাল ফল দেবে। না হলে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে বাজপেয়ীজি আদভানিজীরা এক সময় এই দলের মাথা ছিলেন। রাজনৈতিক লড়াই তো রাজনৈতিক ময়দানেই মানায় !

Tuesday, July 20, 2021

আবদুস সালাম

 


                  তৃতীয় বিশ্বের প্রবাদ পুরুষ-

                          আবদুস সালাম 

          



শীতের মাস। ১৯৮১ সাল। ইন্ডিয়ান ফিজিক্স অ্যাসোসিয়েশন  (আই পি এ)-এর আমন্ত্রণে সালাম সাহেব ভারতে এসেছেন ‘ আর ডি বিড়লা মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ‘ গ্রহণ করতে। সেই বছর থেকেই আই পি এ’র তরফ থেকে ওই পুরস্কার দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে। মূল অনুষ্ঠান বম্বেতে অনুষ্ঠিত হলেও, কলকাতার আমন্ত্রণ উনি সাদরে গ্রহণ করেন। একদিনের ঝটিকা সফরে উনি ৪/৫ ঘন্টা কাটিয়েছিলেন  ভেরিয়েবল্ এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার ও সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের সল্ট লেক ক্যাম্পাসে। বক্তৃতা, প্রশ্নোত্তরের পালা এবং ল্যাবরেটরি পরিদর্শনের পর মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতিতে অনেকটা সময়ের জন্য ওঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। চোখাচোখি হতেই ভ্রুকুঞ্চিত করে মুখ নাড়লেন। ভাবটা যেন, “কী কিছু বলবে?"। এরকমই একটা সুযোগই আমি খুঁজছিলাম। জীবনে সফল হলে সাধারণের থেকে দূরে সরিয়ে রাখো- সম্ভবত সেই তত্বে তিনি বিশ্বাস করেন না। যাইহোক, মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন করে ফেললাম, অনেকটা খবরের কাগজের রিপোর্টারের মতো। প্রশ্নটা ছিল আমার এরকম- “আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার, মৌলিক বিজ্ঞান সম্বন্ধে আদৌ বিশেষ কিছু জানা নেই। কিন্ত জানার উৎসাহ আছে। সহজ ভাষায় একটু বলবেন, আপনি কি আবিষ্কার করেছেন?” যে কোনো নামী মানুষের, বিশেষ করে নোবেলজয়ীদের মতো মানুষের সঙ্গে আমাদের মতো অখ্যাত জনের একটুকরো আলোচনার, সামান্য হলেও একটা দলিলগত মূল্য থাকে। জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত স্মৃতি। সে কারণেই এই লেখা।

আমার প্রশ্নের উত্তরে উনি যা বলেছিলেন তার প্রায় অনেকটাই ভুলে গেছি এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরে। আসলে ব্যাপারটা আদৌ বুঝতাম না তখন। যাইহোক, স্মৃতির সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে তাঁর ইংরেজিতে দেওয়া উত্তরের বঙ্গানুবাদ করলে এরকম দাঁড়ায়- “প্রকৃতি দেবীর রঙ্গমঞ্চে অহরহ যে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে তাদের নায়ক-নায়িকারা হ'ল পদার্থের মৌলিক কণিকা। তাদের ছলনাময়ী চাল-চলনের যে অপার রহস্য, তার একটা নিয়ম খুঁজে বার করেছি আমরা। প্রকৃতির অনেক কিছু সত্যির মতো এটাও একটা।“ ঠোঁটের ওপর স্মিত হাসি। আর কিছু না বললেও অনেক কিছু বলার হাসি। হয়তো আশা করেছিলেন আরও কিছু প্রশ্ন। আমার অক্ষমতা বাদ সেধেছিল। শান্ত অথচ চেহারার মধ্যে রাসভারি ভাব, সাজ পোষাকে কেতাদুরস্ত। চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা, চুল কিছুটা পাতলা। জ্বলজ্বল করছে চোখের চাহনি। ঠোঁটের কোলে প্রশান্তির হাসি। সব মিলিয়ে ব্যক্তিত্বের মধ্যে ধরা পড়েছে একটা অভিজাত রোসনাই আর আত্মপ্রত্যয়ের গরিমা। একই সঙ্গে মনে হয়েছে তিনি এমনই ব্যক্তিত্ব, যিনি সাধারণ আর নিজের মধ্যে দুর্ভেদের অলীক দেওয়াল গড়ে তোলেননি। যাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিত্বের বর্মের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হতে পারি, এমন সম্ভাবনা মনের মধ্যে উঁকি দেয় না। হয়তো সেই কারণেই তাঁর সামনে অকপটে এমন প্রশ্ন রাখতে পারা গেছিল। নিজের গণ্ডির বাইরে কাউকে আমল না দেওয়ার স্বভাবটা, যেমন আজকাল স্বঘোষিত বিখ্যাত মানুষজনের মধ্যে দেখা যায়, আদৌ সেরকম নয়।

জন্ম ২৯শে জানুয়ারি, ১৯২৬ সাল, অধুনা পাকিস্তানের ঝাং নামে দারিদ্র কবলিত অঞ্চলে। পিতা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। জীবনের সব পরীক্ষাতেই সালাম নতুন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। ১৪ বছর বয়সী সালাম ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফল জেনে লাহোরের রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময়ে শহরের মানুষজন রাস্তায় নেমে এসে তাঁর প্রতি শুভেচ্ছাবাণী বিতরণ করেছিলেন। সরকারি বৃত্তি নিয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে এম এ শেষ করার পর কেম্ব্রিজের সেন্ট জনস্ কলেজে চলে যান। সেখানে গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানে রেকর্ড নম্বর পেয়ে বি এ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৯ সালে ক্যাভেনডিস ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে তিনি আমন্ত্রিত হন।

কেম্ব্রিজে পল্ ম্যাথুজের অধীনে তিনি গবেষণার কাজ শুরু করেন। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরিতে অসামান্য অবদানের জন্য এক বছরের মধ্যেই, ১৯৫০ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে স্মিথ পুরস্কারে সম্মানিত করে। ১৯৫১ সালে ডক্টরাল থিসিস জমা দেবার সময় “আবদুস  সালাম” আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলে এক অতি পরিচিত নাম। অল্প কিছুদিন আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পর সালাম লাহোরে ফিরে এসে সরকারি কলেজে, যে কলেজে নিজে লেখাপড়া করেছিলেন, সেখানেই গণিত শিক্ষার কাজে যোগ দেন। কিসের টানে তিনি দেশে ফিরছিলেন ? ছাত্রাবস্থায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তৃতীয় বিশ্বে অনেক প্রতিভা আছেন, যাঁরা গবেষণার উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন। তিনি চিন্তা করেছিলেন যে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান লাহোরে তিনি গড়ে তুলবেন, যেখানে তৃতীয় বিশ্বের বিজ্ঞানীরা অগ্রাধিকার পাবেন এবং যোগ্য ও প্রতিভাশালী বিজ্ঞানীরা বছরের অন্তত কিছুটা সময় সুস্থ গবেষণার কাজে আত্বনিয়োগ করতে পারবেন। সেদিন তাঁর আশা পূর্ণ হয়নি। নিজের গবেষণার কাজও ব্যাহত হচ্ছিল। কাজেই ১৯৫৪ সালে কেম্ব্রিজে ফিরে গিয়ে   লেকচারার পদে বহাল হন। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজ তাঁকে অধ্যাপক পদে উন্নীত করে।

পদার্থবিদ্যাকে ঘিরে ২৭৫ খানা গবেষণা পত্রের প্রকাশনা আবদুস সালামের নিরলস কর্মজীবনের সাক্ষী হয়ে আছে। উচ্চ শক্তিতে পদার্থ কণিকার আচরণের গবেষণায় তাঁর অসাধারণ অবদান পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রাখবে। যুগান্তকারী যে কাজের জন্য,  ১৯৭৯ সালে স্টিফেন ওয়াইনবার্গ ও শেল্ডন গ্লাসোর সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছিলেন সে ব্যাপারে যতটুকু ধারণা করতে পেরেছি, তা পাঠকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব। তবে মূল বক্তব্যে যাবার আগে, ভূমিকা হিসেবে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের কিছুটা আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছি। 

মূলত চার রকম বলের আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়েই প্রকৃতির যাবতীয় ঘটনা ব্যাখা করা যায়। বোধহয় বিশেষ কিছু বোঝা গেল না! সাবান মেখে চান করছেন। হঠাৎই হাত পিছলে সাবান আছড়ে পড়ল বাথরুমের মেঝেতে। কেন? উপরের দিকেও তো উঠে যেতে পারতো সাবান ! সাবান কি করে জানল যে তার ঠিকানা নিচের দিকেই। আসলে এটা পৃথিবীর টান- যাকে বলে মহাকর্ষ। মহাকর্ষ ক্ষেত্রের জন্যই সাবান বুঝতে পারল যে ওর কাছাকাছি রয়েছে বিশালবপু পৃথিবী। ওই একই কারণে সূর্যের চতুর্দিকে গ্রহগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাইহোক, মেঝে থেকে সাবান তুলে গায়ে-মুখে মেখে শাওয়ার খুলে দিলেন। কি বিপদ, জল শেষ ! ছাদের ওপর জলের ট্যাঙ্কে এক ফোঁটা জল নেই। কলঘর থেকে চীৎকার করে গিন্নীকে ফরমাস করলেন পাম্প চালাবার। যথারীতি পাম্প চলল। ১৫ মিনিটে ট্যাঙ্কও ভর্তি। আপনার চান সারা হ'ল। মেজাজ এখন বেশ ঠান্ডা। ভাবুন তো পাম্পটা চালালো কে? কেন, ইলেকট্রিক মোটর পাম্পের ইম্পেলার ঘুরিয়ে একতলার কর্পোরেশন থেকে আসা জলের ট্যাঙ্ক থেকে চারতলার ছাদের ট্যাঙ্কে জল তুলে দিল। কিন্ত প্রশ্ন হ'ল মোটর ঘুরলো কি করে ! এ আবার কেমন কথা ! সুইচ টিপলে মোটর চলে, মাথার ওপর পাখা ঘোরে, আলো জ্বলে- আরও কত কিছুই তো হয়- ব্যাপারটা বোধহয় আরও একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার।

 বিজ্ঞান ভিত্তিক শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার গুলোর পরতে পরতে নানান্ জটিলতা। সালাম সাহেবের আবিষ্কার বুঝতে গেলে প্রতিটি ধাপের ব্যাপারগুলো আস্তে আস্তে উন্মোচন করা প্রয়োজন। প্রথম ধাপ থেকে শুরু করা যাক।

বিদ্যুতবাহী তারের কুন্ডলীর  সামনে যদি একটি তারের আংটা রাখা যায়, তাহলে কুন্ডলীর চুম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে আংটা ঘুরতে থাকবে। অর্থাৎ কুন্ডলীর সঙ্গে আংটার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে চুম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে। ইলেকট্রিক মোটর হ’ল, কয়েকশ বা কয়েক হাজার পাক তারের তৈরি  বড়সড় একটা আংটা যাকে ঘিরে আছে তড়িৎবাহী তারের একটা কুন্ডলী। কুন্ডলীতে তড়িৎ চালনার মাত্রা আর আংটার পাকের সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে আংটার ঘুর্ণন গতি। এখন উপযুক্ত যান্ত্রিক কায়দায় আংটার সঙ্গে একটা শক্তপোক্ত ধাতব রড লাগিয়ে সেটা পাম্পের ইম্পেলার রডের সঙ্গে জুড়ে দিলেই তা ঘুরবে এবং যথারীতি পাম্প চলবে। জলও উঠবে। মোদ্দা কথা কুন্ডলীর সঙ্গে আংটার যোগাযোগ হয়েছে চৌম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে। আরও সূক্ষ্মভাবে বলা যায় মাধ্যমটা ছিল তড়িচ্চুম্বকীয়। কারণ, কুন্ডলীতে বিদ্যুৎ পাঠানো হয়েছিল বলেই চৌম্বকক্ষত্র সৃষ্টি হয়েছিল। পুরো ব্যাপারটাই আসলে তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্রের ঘটকালি। ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে তড়িৎবাহী কুন্ডলী আর তারের আংটার মাঝখানে আসলে কিলবিল করছে ঝাঁকেঝাঁকে আলোক কণিকা বা ফোটন, যারা হ'ল এই গাঁটছড়ার যোগসূত্র। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বিদ্যুৎ, চুম্বক, আলো- এগুলো আলাদা আলাদা ব্যাপার নয়; একই সূত্রে বাঁধা। কিন্ত সাবান আর পৃথিবীর মধ্যে কে  মধ্যস্থতা করল? তাদের পারস্পরিক আকর্ষণের বাহনরা হ'ল গ্রাভিটন। মাধ্যাকর্ষণ এবং তড়িচ্চুম্বকীয় বল দূর পাল্লা পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ার ফলে দৃশ্যমান জগতে তাদের প্রভাব আমরা বুঝতে পারি, যেমন উদাহরণে দেখা গেল। আরও অনেক অনেক ছোট পরিসরে, অণু-পরমাণুর জগতে ঢুকলে আমরা বুঝতে পারব যে শুধুমাত্র এই রকমের ক্রিয়া-বিক্রিয়া দিয়ে সব কিছু ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ক্ষুদেদের রাজত্বে মহাকর্ষ বলের অবদান নেই বললেই চলে। পরমাণুর স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে চড়িচ্চুম্বকীয় বল। ধনাত্মক আধানযুক্ত নিউক্লিয়াস আর ঘুর্ণায়মান ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনের টানাপোড়েনে সামাল দিচ্ছে তড়িচ্চুম্বকীয় বল। কিন্ত প্রোটন-নিউট্রনে ঠাসা নিউক্লিয়াসের স্থিতিশীলতার রহস্যটা কি ? নিস্তড়িৎ নিউট্রনের কথা না হয় বাদই দিলাম। সমান আধানের প্রোটন-প্রোটনের বিকর্ষণের যে বল, তাতে হাইড্রোজেন ছাড়া সব নিউক্লিয়াসেরই তো ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যাবার কথা! তা হচ্ছে না কারণ, কয়েক ফার্মি (1 ফার্মি = ১০[-১৩] সেঃ মিঃ, অর্থাৎ, এক সেন্টিমিটারের দশ লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগ) দূরত্বের ব্যবধানে পায়ন কণিকার আদান-প্রদানে নিউক্লিয়নদের (নিউক্লিয়াসের গন্ডীর মধ্যে চরিত্রগত সাদৃশ্য থাকায় নিউক্লয়ন, প্রোটন বা নিউট্রনের সমার্থক) আঁটোসাঁটো করে বেঁধে রাখে নিউক্লিয়ার ফোর্স যেটা এক ধরণের গুরু বলের বা স্ট্রং ফোর্সের প্রকাশ। প্রতিটি প্রোটন বা নিউট্রনকে ঘিরে রেখেছে গুরু বলের ক্ষেত্র বা গুরুক্ষেত্র। দেখা যাক গুরু বলের উৎসটা কোথায় ! নিউক্লিয়নরা আদৌ মৌলিক নয়। কোয়ার্ক কণিকা হ'ল নিউক্লিয়ন গঠনের উপাদান। কোয়ার্কের আধান আছে। এমনকি অনেক জাতেরও কোয়ার্ক আছে। বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে আমরা আপ কোয়ার্ক আর ডাউন কোয়ার্ক- যারা প্রোটন ও নিউট্রনের উপাদান তাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব। প্রোটন ও নিউট্রন বা ব্যারিয়ন গোষ্ঠীভুক্ত যে কোনও যৌগিক কণিকার উপাদান তিনটি কোয়ার্ক। প্রোটনে আছে দু’টি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক। নিউট্রনে ঠিক উল্টো অর্থাৎ দু'টি ডাউন ও একটি আপ কোয়ার্ক। ধনাত্মক আধানযুক্ত আপ কোয়ার্কের আধানের মান +২/৩, আর ঋণাত্মক ডাউন কোয়ার্কের মান -১/৩। এই হিসেব থেকে পরিস্কার যে তড়িতাহত উপাদানে তৈরি হওয়া সত্বেও নিউট্রন কেন নিষ্তড়িৎ। যাইহোক, এই কোয়ার্ক মৌলিক কণিকাদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়াই হ'ল গুরু বলের উৎস এবং এই প্রক্রিয়ায় যে কণিকার লেনদেন চলে তাদের নাম গ্লুয়ন। গ্লুয়নেরও বৈচিত্র্য আছে। তবে সেই আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন।

কিন্ত প্রশ্ন হ'ল সব পদার্থের নিউক্লিয়াসই কি চিরস্থায়ী? না তা তো নয়। তেজস্ক্রিয়তার ব্যাখ্যা করে হেনরি বেকারেল একশ বছর আগেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম ইত্যাদি ভারী মৌলগুলো আপনা আপনি ভেঙে যায়। ছিটকে বেরিয়ে আসে কিছু মৌলিক কণিকা। এই কণা সমূহের স্রোতকেই বলা হয় তেজস্ক্রিয় রশ্মি। কিভাবে এটা ঘটছে ? এটা কি গুরুবলের প্রভাব? না, তা কি করে হবে? কারণ, এইমাত্র দেখলাম যে গুরুবল তো নিউক্লিয়াসকে জুড়ে রাখে। তাহলে নিশ্চয়ই চতুর্থ আরও এক রকম বল আছে তা গুরুবলের মতো আদৌ তেমন জোরালো নয়। কারণ জোরালো হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ তো শিগগিরই উবে যেত। বিজ্ঞানীরা এই বলের নাম দিলেন লঘুবল বা উইক ফোর্স। তেজস্ক্রিয়তার ঘটনা লঘু বলের এক ধরনের প্রকাশ মাত্র। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে আলফা (হিলিয়াম নিউক্লিয়াস) বিটা (ধনাত্মক বা ঋণাত্মক ইলেকট্রন) এবং গামা (উচ্চ কম্পাঙ্কের ফোটন) কণিকা বেরিয়ে আসা সম্ভব। শুধুমাত্র বিটা কণিকাস্রোত বেরিয়ে আসার ঘটনার জন্যই লঘুবল দায়ী। যাইহোক, দেখা গেল যে সব মিলিয়ে চার রকমের বল বস্তু জগতের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। গুরুবল সবচেয়ে জোরদার, তারপর তড়িচ্চুম্বকীয় বল, এর পরে 

লঘুবলের স্থান, সবথেকে দুর্বল মহাকর্ষীয় বল। মনে রাখতে হবে যে লঘুবলের কর্মক্ষেত্রের গন্ডী খুবই সীমাবদ্ধ (১০[-১৫] সেঃ মিঃ) অর্থাৎ গুরুবলের ১০০ ভাগের এক ভাগ পরিসরে। সব বলেরই তো বাহন আছে। সেই নিয়ম তো লঘুবলের ক্ষেত্রেও থাকা উচিৎ। হ্যাঁ, এখানেও ব্যতিক্রম নেই। লঘুবলের বাহনরা হ'ল আধানযুক্ত ডব্লিউ কণিকা (+W,-W)।

ফিরে আসব সালাম প্রসঙ্গে। সালামের অন্যতম অবদানের কথা অবৈজ্ঞানিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যই অনেকগুলো কথা ইতিমধ্যেই খরচ করেছি। আরও দু'চার কথা বলা দরকার। ১৯৬৭ সালের আগে পর্যন্ত তত্বগতভাবে লঘুবলের আচরণ সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা ছিল না। ওই সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টিফেন ওয়াইনবার্গ ও শেল্ডন গ্লাসো এবং লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজে আবদুস সালাম সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যে তত্ব খাড়া করলেন তাতে দেখা গেল যে “উপযুক্ত পরিবেশে" তড়িচ্চুম্বকীয় বল ও লঘু বলকে একই সূত্রে বাঁধা যায়। এর প্রায় ১০০ বছর আগে তড়িৎ ও চুম্বক ধর্মের মিলন ঘটিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল তার আবিষ্কৃত যুগান্তকারী তড়িচ্চুম্বকীয় তত্বে। ওয়াইনবার্গ-সালাম-শেল্ডন ত্রয়ী তাঁদের তত্বে +/-W কণিকার সন্ধান পেয়েছিলেন। উপরন্তু, ওয়াইনবার্গ ও সালাম বললেন যে +/-W ছাড়াও নিস্তড়িৎ আরও একটি কণার লেনদেনের মাধ্যমেও লঘুক্রিয়া চলতে পারে। তৃতীয় কণিকার নাম রাখলেন তাঁরা Z0 (জেড নট)। ১৯৮৩ সালে জেনিভার সার্ন (CERN) গবেষণাগারে কার্লো রুবিয়ার নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়, তাতে +/-W ও Z0 কণিকার সন্ধান মেলে। পদার্থ কণিকার এমন সূক্ষ্ম আচরণের পরীক্ষামূলক পরিকল্পনার সার্থক রূপায়ণের জন্য পদার্থবিদ্ কার্লো রুবিয়া ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সাইমন ভ্যান্ডারমিয়ার- এই দু'জনকেই ১৯৮৪ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভ্যান্ডারমিয়ার কিছুকাল পরে কলকাতার আমাদের সংস্থায় একটি বক্তৃতা দেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে তড়িচ্চুম্বকীয় বল ও লঘু বল কী করে এক হয় ? প্রথমটির বাহন হ'ল ফোটন যার স্থিরভরের মান শুন্য, অথচ +/-W ও Z0 কণিকা, যাদের আরেক নাম ভেক্টর বোসন (বোসন নামটা সত্যেন বোসের নামে), তাদের স্থিরভরের মান অনেক অনেক বেশি। যুক্তিতে কোনো ভুল নেই। মহাকর্ষ ও তড়িচ্চুম্বকীয় বল দূর পাল্লার। পক্ষান্তরে গুরু ও লঘুবলের কার্যকারিতার ক্ষেত্র অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে। তাদের বাহনদের ভরের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাৎ থাকবে তার ইঙ্গিত তো হাইসেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্রই বলে দেয়। সূত্রটি হ'ল dp.dx > h  dp ও dx যথাক্রমে পদার্থের ভরবেগ ও অবস্থানের অনিশ্চয়তার মান এবং h হ'ল প্ল্যাঙ্কের ধ্রুব, অত্যন্ত ছোট একটি সংখ্যা। ফর্মুলা থেকে পরিস্কার যে dx ছোট হলে dp অপেক্ষাকৃত বড় হবে এবং উল্টোটাও। অর্থাৎ dp ছোট হলে dx বড় হবে। ভরবেগ আসলে শক্তিরই নামান্তর। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্বের উপজাত E=mc² অনুযায়ী শক্তি আর ভরের মধ্যে কোনও প্রভেদ নেই। কাজেই অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়াশীল কণাদের মধ্যে যে কণিকা মধ্যস্থতা করবে, তার ভর বেশি হওয়ারই কথা। অনিশ্চয়তা সূত্রের নিশ্চয়তায় কোনও সন্দেহ নেই।

ওয়াইনবার্গ ও সালাম অন্য যুক্তির আশ্রয় নিলেন, সম্পূর্ণ এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করে। তাঁরা বললেন প্রকৃতিদেবীর এমন পক্ষপাতিত্ব করার কথা নয়; একই বাহন ক্ষীণজীবি আর অন্যগুলো হৃষ্টপুষ্ট। এটা নিশ্চয়ই প্রকৃতির ছলনা। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে গাণিতিক নিয়মে তাঁরা প্রতিসাম্য তত্ব খাড়া করলেন যার নাম দিলেন গেজ্ সিমেট্রি (gauge symmetry)। মনে আছে হয়তো যে তাঁরা তাঁদের তত্বে “উপযুক্ত পরিবেশ” কথাটার উল্লেখ করেছিলেন। “উপযুক্ত পরিবেশ” কথাটার  যে ব্যাখ্যা তাঁরা দিয়েছিলেন সেটা এরকম: স্বল্প শক্তিক্ষেত্র সম্পন্ন পরিবেশে W ও Z0 কণিকাদের যে ভারি বলে মনে হয়, সেটা প্রতিসাম্যের পরোক্ষ প্রকাশের জন্য। প্রত্যক্ষ প্রকাশ হলে তাদেরও ফোটনের মতো ভরহীন বলে মনে হতো। প্রতিসাম্যের প্রত্যক্ষ প্রকাশ একমাত্র উচ্চশক্তি সম্পন্ন পরিবেশেই সম্ভব। আজকের ত্বরণ যন্ত্রে (Particle Accelerator) পদার্থ কণিকার যে ধরণের ভরবেগ বা শক্তি তৈরি করা যায়, সেই ভরবেগে গুরুবল (Strong force), তড়িচ্চুম্বকীয় বলের থেকে অনেক অনেক বেশি জোরালো। কিন্ত ভরবেগ যদি ক্রমশ আরও বাড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে দেখা যাবে যে গুরুবলের মান কমছে আর অন্যটির মান বাড়ছে। একটা ভরবেগে দেখা যাবে যে গুরুবল, লঘুবল ও তড়িচ্চুম্বকীয় বলের আচরণের মধ্যে আর কোনও তফাৎ থাকছে না।

এ যেন এমন একটা নাটকের পটভূমি যেখানে নায়ক, ভিলেন বা পার্শ্বচরিত্রের আচরণে বোঝার উপায় নেই যে কে কোন ভূমিকা পালন করছে। দর্শক স্তম্ভিত। এমন একটি বিজ্ঞান নাটকের তাত্ত্বিক পটভূমি রচনা করেছিলেন স্টিফেন ওয়াইনবার্গ, আবদুস সালাম ও শেল্ডন গ্লাসো ত্রয়ী। ম্যাক্সওয়েল ইলেকট্রিক ফোর্স ও ম্যাগনেটিক ফোর্সকে এক সূত্রে বেঁধে সৃষ্টি করেছিলেন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স, ওয়াইনবার্গ-সালাম-গ্লাসো এর সাথে গাঁটছড়া বাঁধলেন লঘুবলের। এই মিলনসূত্রের নামকরণ হ'ল ইলেকট্রোউইক ফোর্স। ইলেকট্রোউইক ফোর্সের তত্ব, আইনস্টাইন কল্পিত গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশনের বা মহামিলন তত্বের কাজ অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে, যদিও মহাকর্ষকে এর আওতায় আনার কাজ এখনও দূর অস্ত।

আবদুস সালাম উঁচু জাতের বিজ্ঞান সাধনার পাশাপাশি সাংগঠনিক ও বিজ্ঞান পরিচালনার কাজ চালিয়ে গেছেন সমান তালে। ১৯৫১ সালে লন্ডন থেকে ফিরে লাহোরে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান নিকেতন তৈরির যে পরিকল্পনা তিনি করেন, তা চরিতার্থ  হয় ১৯৬৪ সালে। ইতালির ত্রিয়েস্ত শহরে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স  (ICTP), তিরিশ বছরেরও বেশি আবদুস সালামের সাংগঠনিক কীর্তির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। নোবেল পুরস্কারের অর্থ ছাড়াও  সারা জীবনে অর্জিত অসংখ্য পুরষ্কারের আর্থিক ভাগের একটি কানাকড়িও তিনি নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেননি। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি আই সি টি পি-র অধিকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পোশাকী প্রধান ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রতিদিনের কাজে জড়িয়ে থাকা সকলের কাছের মানুষ। ভদ্রতা, নম্রতা এবং অলক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার দক্ষতায় মানুষটি সবাইকার সমীহভাজন হয়েছিলেন। তাঁর জীবনীকার, এক সময়ের সহকর্মী মিরিয়াম লুইসের কথায়- “…Inspired by their personal regard for him and encouraged by the fact that he works harder than any of them, the staff cheerfully submit to working conditions that would be unthinkable here at the International Atomic Energy Agency (IAEA) in Vienna. The money he received from the Atoms for peace medal and award, he spent on setting up a fund for young Pakistani Physicists to visit ICTP. He uses his share of the Nobel Prize entirely for the benefit of the Physicists from developing countries and does not spend it on himself or for his family…” জীবনী লেখার সময় মিরিয়াম লুইস আই এ ই এ-তে কর্মরত ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব যে তৃতীয় বিশ্বের যে কোনও প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের কর্মশালা, সেমিনার ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হলে, প্রয়োজনে আই সি টি পি-র অনুদান সহজেই পাওয়া যায়। ভাবা যায়, অসাধারণ দূরদর্শিতা ছাড়াও কী বিচক্ষণ সাংগঠনিক চিন্তাধারা কাজ করেছিল মানুষটির মধ্যে। তৃতীয় বিশ্বের বিজ্ঞান সাধনায় অগ্রগতির প্রচেষ্টায় পৃথিবীতে এমনভাবে আর কেউ ভেবেছেন বলে মনে হয় না। আই সি টি পি'র সৃষ্টি, বিজ্ঞান জগতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। আই সি টি পি, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান সাধনার এক মিলন তীর্থ। 

যথার্থ কর্মযোগী মানুষটিকে পৃথিবীর চুয়াল্লিশটি বিশ্ববিদ্যালয় অনরারি ডি এস সি উপাধিতে সম্মানিত করে। ভারতের হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় আছে। ১৯৫১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান সরকার ও ইউনাইটেড নেশন ছাড়াও সারা পৃথিবীর বহু প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন।

যে সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বাতাবরণে শিশুকাল থেকে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, পরিণত বয়সেও তা অটুট ছিল। কয়েক ঘন্টার কলকাতা সফরের অবসরে একদা লাহোর স্কুলে তাঁর গণিত শিক্ষাগুরু বর্ষীয়ান অনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি ছুটে গিয়েছিলেন তাঁর ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ার বাড়িতে। তিনি ছিলেন ঈশ্বরভক্ত ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান। স্টকহোলমে নোবেল পুরস্কার বিতরণী সভায় সুইডেন সম্রাট ষোড়শ গুস্তাভ আবদুস সালামের শেরোয়ানি-চুড়িদার-পাগড়ি সজ্জিত পেশোয়ারী পোশাক দেখে মুগ্ধ হন। তাঁর একটি মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে কিরকম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল তাঁর ধর্মনিষ্ঠ আচরণ। তিনি বলেছিলেন- “The Holy Quran enjoins us to reflect on the varieties of Allah's created laws of nature; however, that our generation has been privileged to glimpse a part of His design is a bounty and a grace for which I render thanks with a humble heart.” আজীবন মহামিলন তত্বে বিশ্বাসী সালাম সাহেব জীবনের শেষ লগ্নের বেশ কিছুটা সময় নিঃসঙ্গ কাটিয়েছেন তাঁর অক্সফোর্ডের খামারবাড়িতে। বহুদিনের আক্রান্ত পারকিনসন্ ব্যাধি শেষজীবনে তাঁকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতেন। এতটাই অথর্ব হয়ে পড়েছিলেন যে বিজ্ঞানী সঙ্গ,  এমনকি বিজ্ঞান জগৎ থেকেও প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। পাকিস্তান থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসিত হয়েছিলেন তিনি আগেই। ১৯৬১ সাল থেকে দীর্ঘ তেরো বছর পাকিস্তান সরকারের মুখ্য উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ‘আহমদিয়া' সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুসলমান হওয়ার ফলে ভুট্টো সরকারের আমলে তিনি অস্বস্তিতে ছিলেন। ১৯৭৪ সালে শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রিটেনে স্বেচ্ছা নির্বাসিত হন। ঘটনাটা খুবই মর্মান্তিক। রাজনীতিবিদরা বোঝেন না যে বিজ্ঞানী বিজ্ঞানীই, তাঁদের কোনও জাত নেই। আর তাছাড়া আবদুস সালামরা সত্যিই সংখ্যায় লঘু।

১৯৯৬ সালের ২১শে নভেম্বর ভোর রাত্রে তাঁর অক্সফোর্ডের বাসভবনে আবদুস সালাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  তাঁ স্ত্রী, দুই পুত্র এবং চার কন্যা বর্তমান। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী, মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ লন্ডন থেকে উড়িয়ে আনা হয় পাকিস্তানে। ২৩শে নভেম্বর  ১৯৯৬, পাঞ্জাবের রাবওয়াতে তাঁর অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হয়।

১৯৮৮ সালে সালাম সাহেবের সঙ্গে দ্বিতীয় এবং শেষ সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার কথা বলে শেষ করব। কলকাতা ছুঁয়ে বাঙলাদেশ যাবার পথে উনি কয়েক ঘন্টা কাটিয়েছিলেন আমাদের প্রতিষ্ঠানে। কম্পিউটার টার্মিনালের সামনে মুখ গুঁজে কাজ করছিলাম। সংস্থার অধিকর্তার সঙ্গে সেখানে হঠাৎই হাজির হলেন। ৭/৮ বছর আগে দেখা শান্ত সহৃদয় মূর্তিটা তখনও অটুট ছিল। টার্মিনাল পর্দায় ফুটে ওঠা গ্রাফিক্সের নক্সা দেখেই বুঝলেন কী-ধরনের কাজ হচ্ছে। সাইক্লোট্রন ল্যাবরেটরিতে কম্পিউটারের উপযুক্ত ব্যবহারে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।  শেষ বারের সেই সাক্ষাৎ স্মৃতিতে আজও সজীব হয়ে আছে।

দেখেশুনে আজ মনে হয় যে তৃতীয় বিশ্বের বিজ্ঞান-শিক্ষিত বেশিরভাগ মানুষের মানসিক ও সাংস্কৃতিক নাড়ির টান ইংরেজি ভাষী জগতের সঙ্গে। এ-ব্যাপারে বিতর্কে যেতে চাই না, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত। তারই ভিত্তিতে বলতে চাই যে আবদুস সালামের জীবনচরিত আজ শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, তা দৃষ্টির উৎসও বটে।


French poem 1

 কবিতা, বিশেষ করে আধুনিক কবিতা নিয়ে বেশ কিছুদিন পড়াশোনা করে মনে হয়েছে এটা ভাব প্রকাশের একটা বাহন, একই সঙ্গে শিল্পও বটে। ছত্রে ছত্রে ছন্দ মেলানোর কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যে কোনও শিল্পের মতো আধুনিক কবিতা ব্যক্তিবিশেষের কাছে ভিন্ন, ফলে ব্যক্তিস্বাতন্র্রের মধ্যে ভিন্ন আবেদন আনতেই পারে। এই যুক্তিতে বলা যায় যে কবিকে জ্ঞানস্রষ্টা না হলেও চলে। তবে দৃশ্য কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। একই কবিতা বোধহয় একাধিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা যায়।

ভাষার প্রতি আমার একটা দুর্বলতা আছে। চাকরিতে অবসরের পরে পরেই বাড়ির কাছেই রামকৃষ্ণ মিশনে আমি ফরাসী ভাষার কোর্সে ভর্তি হ’লাম। ছ'মাস করে সেমিস্টার, পুরো কোর্সের মেয়াদ তিন বছর। তৃতীয় বর্ষের গোটাটাই একটা সেমিস্টার। ভাষাটা ভাল লেগে গেল। এতটাই ভাল লেগে গেল যে রামকৃষ্ণ মিশনের পাট চুকিয়ে বাড়িতে বসে সপ্তাহে একবার ফরাসী দৈনিকের নির্বাচিত অংশ ডাউনলোড করে অনুবাদ করতাম। রবীন্দ্রনাথকে লেখা রোম্যাঁ রোঁলার দু’খানা চিঠিও অনুবাদ করে ফেললাম। নানান্ দৈর্ঘ্যের দশ-বারোটা ফরাসী কবিতা-ও অনুবাদ করে ফেললাম।  এর পর থেকে চর্চাটা চালু আছে, সপ্তাহে অন্তত ঘন্টাদুয়েক। সেই ধারা গত বারো বছর বজায় রেখেছি। দিন পনেরো আগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে ইংরেজিতে লেখা ন'লাইনের একটা আধুনিক কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে ফেসবুকের দেওয়ালে লাগিয়েছিলাম। ভালই সাড়া পেয়ে মনে হ'ল ফরাসী আধুনিক কবিতার ইংরেজি অনুবাদ তো আমার করাই আছে। কাজেই সেগুলোর থেকে ক্ষুদ্রতম দৈঘ্যের একটা কবিতা বেছে নিয়ে বাংলায় অনুবাদ করলাম। একটা কথা বোধহয় এখন অজানা নয় যে প্রায় সমস্ত ভাষার Translator Google support করে। কিন্ত  ৮/১০ বছর আগে, ফরাসী কবিতা থেকে ইংরেজি অনুবাদ যখন করেছিলাম, তখন অভিধানই ছিল একমাত্র ভরসা। তাছাড়া, তখন স্মার্টফোনের রমরমা আদৌ ছিল না। গুগলের অনুবাদ আমি অবশ্যই দেখেছি। সেগুলো একেবারেই আক্ষরিক। তবে ভাবনা গুলোর সঙ্গে নিশ্চয়ই অনেকাংশে মিল আছে। সেটা আমাকে অবশ্যই ভরসা জুগিয়েছে। এটা একটা পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা। দেখি কেমন সাড়া পাই !!

--------------------

French fable by La Fontaine


J'aime le jeu , l'amour, les livres, la musique/

La ville et la campagne, enfin tout; il ne m'est rien/

Qui ne me soit souverain bien/

Jusqu'au sombre plaisir d'un coeur melancolique/

----------------------

English Translation

I love the game, the romance, the books, the music/

The city and the countryside, well all;  they are nothing to me/

That will not bring my sovereign good/

Till the gloomy pleasure of a pensive heart persists./

-------------------


বঙ্গানুবাদ 

আমি খেলা ভালবাসি, প্রেম, বই সঙ্গীত- এ সবই  ভালবাসি/

শহর এবং গ্রামাঞ্চল, সমস্ত কিছুই  ভালবাসি/

(কিন্ত) এইসব আমার মনে দাগ কাটে না/ 

এগুলোর কোনও কিছুই  আমাকে সার্বভৌম মঙ্গল এনে দেবে না/

যতক্ষণ ভাবুক হৃদয়ের বিষন্ন আনন্দের রেশ থেকে যাবে/



Saturday, July 17, 2021

শশাঙ্কমোহন

বেশ কিছুদিন হ'ল রমা খুকখুক করে কাশছে। সন্ধ্যের দিকে মাঝে মাঝে জ্বরও আসে। চেহারাটা এমনিতেই শীর্ণ। চোখের কোলে কালি পড়েছে। চেহারার মধ্যে কেমন যেন একটা ফ্যাকাশে ভাব। পাড়ার নবীন ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন। নাম যাইহোক, বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় ডাক্তারবাবু বেশ প্রবীন। চেনা মক্কেলদের অভিভাবকও তিনি- ‘হাওয়া বদলের দরকার বউমার  বিশ্রামেরও প্রয়োজন। বেশি দেরি না করাই ভাল।‘

ওকালতিতে শশাঙ্কর তেমন পসার নেই। রাশভারি চেহারা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কোট-প্যান্ট-টাই চড়িয়ে রোজই কোর্টে বেরোয়। বড় মক্কেল তো দূরের কথা, মাঝারি কোনো কিছুই জোটেনি কোনদিন। তবে সৎ মানুষ। খেটেখুটে রোজগারের পথেই বিশ্বাসী। অ্যাফিডেভিট, জমি-বাড়ি রেজিষ্ট্র্রি- এ সব খুচরো কাজ রোজই কিছু না কিছু থাকে,  দু'পয়সা রোজগার হয়। মিতব্যয়ী মানুষ, সংযমীও বটে। স্বচ্ছলতা না থাকলেও অভাবের সংসার বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা নয়। মোটামুটি চলে যায়। মাসের শেষে হাজার খানেক টাকা ব্যাঙ্কেও জমা পড়ে। বছরের কোনো বিশেষ সময়ে বড় উকিল বাবুদের বেশ কিছু খুচরো মক্কেলের ঝক্কি সামলে বাড়তি দুটো পয়সা উপার্জন হয়। সেই মাসগুলোতে ব্যাঙ্কের গর্ভেও বেশি কিছু ঢোকে। বাঘা যতীনে দু-কামরা ঘরে থাকেন। পুরোনো ভাড়াটে, তাই ভাড়াও কম। একমাত্র ছেলে, বাপি যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে।

রমার শরীরের ব্যাপারে শশাঙ্ক বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল। বয়সের সঙ্গে দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পারস্পরিক আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কোর্ট থেকে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শশাঙ্ক বললো হ্যাঁগো নবীন ডাক্তার যা বললেন, শুনলে তো ?’

-‘ডাক্তারবাবু যা খুসী বললেই হ'ল ? উনি বললেন আর আমি ড্যাং ড্যাং করে বেড়াতে বেরিয়ে পড়লাম! বলি ছেলের ইস্কুল তো আর ছুটি দেবে না। তাছাড়া হাওয়া বদলের খরচও তো আছে। দুদিন হাওয়া বদলের জন্য পরে আবার মাসের পর মাস হাওয়া খেয়ে থাকতে হবে না তো ?’

নিজের আর্থিক অক্ষমতার কথা ভেবে রমার কথায় শশাঙ্ক আঘাত পেয়েছিল ঠিকই, কিন্ত ওর অভিমানকে ও খাটো করে দেখেনি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, - ‘খরচের জন্য তুমি চিন্তা করো না গিন্নী। সে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে ছেলেটার ইস্কুলের ব্যাপারটাতো আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বড় দিনের ছুটি পড়তে এখনও হপ্তা দুয়েক বাকি। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও তো আর খুঁজে পাচ্ছি না।‘

বিয়ে হবার পর থেকে সেই যে হেঁসেলে ঢুকেছে, আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি রমার। শরীর খারাপ থাকায় বৈচিত্র্যহীন একঘেঁয়ে জীবনে কিছুটা বিরক্তিও এসেছে। তাই বেড়াতে যাবার নামে মনটা ভরে উঠল। স্বামীকে দু'কথা শুনিয়ে দেবার জন্য মনে মনে একটু কষ্টও পেল। আহ্লাদের সুরে স্বামীকে জিজ্ঞেস করল রমা,- ‘কোথায় বেড়াতে যাব গো আমরা বড়দিনের ছুটিতে ?’

‘হ্যাঁ, সেটাই ভাবছি। কাছে পিঠেই কোথাও যেতে হবে। সাত দিনের ছুটিতে যাতায়াতেই যেন সময় না চলে যায়। আমি বলছিলাম শিমুলতলা জায়গাটা বেশ স্বাস্থ্যকর। কলকাতা থেকে মাত্র ঘন্টা ছয়-সাতের পথ। শুনেছি পাঁচ-সাত দিনের জন্য সস্তায় বাড়ি ভাড়াও পাওয়া যায়। স্টেশনে নেবে স্টেশন মাস্টারের অফিসে খোঁজ করলেই সব জানতে পারা যায়।‘

বেড়াতে যাবার খুসীতে মনে মনে রমা এতটাই ডগমগ যে বলে ওঠে,- ‘কেওড়াতলা নিমতলা বাদে যে তলাতেই তুমি নিয়ে যাবে, সেখানেই যাব।‘ শশাঙ্ক হাঁ হাঁ করে উঠে বলে,- ‘বালাই-ষাট, এমন কথা মুখে আনতে আছে ?’ মা-বাবার আলাপচারিতায় বাড়ির মধ্যে একটা হাল্কা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ছেলে বাপি বড় একটা রাশভারি বাবার কাছে ঘেঁষে না। সে-ও ছুট্টে এসে জিজ্ঞেস করল, -"মা আমরা বেড়াতে যাব” ?’

  -'বাবাকে জিজ্ঞেস করো বাবা’- রমার গলার স্বরে বেশ কিছুটা প্রশ্রয়। অভিমান যে এত মধুর, এই স্বাদ শশাঙ্ক আজ জীবনে প্রথম উপলব্ধি করল। প্রায় বাষ্পরূদ্ধ কন্ঠে শশাঙ্ক বলে উঠল,-‘হ্যা বাপিবাবু, তোমার বড়দিনের ছুটি পড়লেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। খুসী তো ? মা-কে বলো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে। কথায় কথায় অনেকটা রাত হয়ে গেছে।‘ আজ বহুদিন বাদে বৈচিত্র্যহীন দাম্পত্য জীবনে হঠাৎই ফিরে এল ঘনিষ্ঠতার জোয়ার।

দু’সপ্তাহ হৈ হৈ করে কেটে গেল। মনের সঙ্গে দেহের যোগ যে কত নিবিড়, সেটা আজকের রমাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। আজ শিমুলতলা যাবার দিন। দশটা পঞ্চাশের গাড়ি। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রমা দুটো ভাতেভাত ফুটিয়ে নিয়েছিল। আজ ওর শরীরে কোনও ক্লান্তি বোধ নেই। নেই অফিস-ইস্কুলের ভাতের তাড়া। চটপট সবাই তৈরি হয়ে নিয়ে সময় থাকতে স্টেশনে পৌঁছে গাড়িতে উঠে বসল। কাঁটায় কাঁটায় দশটা পঞ্চাশে ট্রেন ছেড়ে দিল। প্যাসেঞ্জার ট্রেন। গতি তার ধিকিধিকি। খারাপ লাগে না ওদের। আজ ওরা সবাই নিয়মছাড়া। ঘন্টা দুয়েক মাত্র কেটেছে। দু’বার চা খাওয়া হয়ে গেছে। শেষবারে মোচার চপও জুটেছিল। যে বাপি বাড়িতে কোনদিন চা ছোয়নি, সে-ই আজ মায়ের চা-তে ভাগ বসিয়েছে। নিষিদ্ধ জিনিসগুলোর প্রতি সব মানুষেরই আকর্ষণ বেশি, শুধুমাত্র সুযোগের অপেক্ষা। চায়ে চুমুক দিয়ে বাপির মনে হচ্ছে সে যেন এক লাফে বড় হয়ে গেছে। সবাই যেন পালন করে চলেছে নিয়ম ভাঙার নিয়ম। কে যেন হঠাৎ চীৎকার করে বলে উঠল,- ‘দেব নাকি দাদারা ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে ?’ কামরাসুদ্ধ লোক হো হো করে হেসে উঠল। শশা ওলা ঝুড়িভর্তি কচি শশা নিয়ে উঠেছে। চাইলেই ছুরি দিয়ে ছাড়িয়ে ঝালনুন মাখিয়ে দেবে। শশা ওলার সেলসম্যানশিপে সবাই মজা পায়। রমা মনে মনে ভাবে বহু সংসারই হকারদের সপ্রতিভ বিচিত্র  সেলসম্যানশিপের ওপর নির্ভরশীল।

সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা নাগাদ গাড়ি শিমুলতলা পৌঁছল। বাইরে বেশ কনকনে ঠান্ডা। ট্রেন থেকে নেমে সামনেই এক টিটি ভদ্রলোককে শশাঙ্ক জিজ্ঞেস করল,- ‘গাড়ি কি লেট আছে ?’

- ‘ও তেমন কিছু নয়, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট হবে।‘

- ‘বাঃ বাঃ এতটা সময় লেট, আর আপনি বলছেন কিনা তেমন কিছুই নয়।‘

- টিটি সাহেব নস্যি নিচ্ছিলেন। রুমাল দিয়ে নাক মুছে নিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন, - ‘আরে মশাই গোটা দেশটাই কয়েক দশক লেট চলছে, আর ট্রেন চল্লিশ মিনিট দেরিতে চললেই যত বিপত্তি !’

শশাঙ্ক অহেতুক আর কথা না বাড়িয়ে স্টেশন মাস্টারের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। ঘরের ঠিক বাইরে কুলির মাথা থেকে মালপত্তর নামিয়ে ভাড়া চুকিয়ে দিল শশাঙ্ক। ঘরের সুইং দরজা ফাঁক করে শশাঙ্ক বিনীত ভাবে ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইল,- ‘আসতে পারি?’ – ‘বলুন।‘ কোট-প্যান্ট-টাই পরা মাঝবয়সী স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোক মুখ গুঁজে কেঠো চেয়ার-টেবিলে বসে জাবদা খাতায় লিখে চলেছেন। টেবিলের ওপর ভিড় করে আছে বেশ কিছু পেপারওয়েট আর টেলিফোন। শশাঙ্ক নমস্কার জানালো। প্রত্যুত্তরে ভদ্রলোক দায়সারা একটা নমস্কার জানিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, - ‘কাজের কথা বলুন।‘

- ‘আচ্ছা এখানে ধারে কাছে দু-চারদিনের জন্য ঘর ভাড়া পাওয়া যাবে ?’ অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার, পরেশবাবু এতক্ষণে খাতা থেকে চোখ তুললেন। শশাঙ্ককে দেখে তাঁর গলার স্বর অনেকটাই নরম হ'ল। চোখের চাহনিতেও কিছুটা জৌলুস দেখা গেল। শশাঙ্কর চেহারা আর সাজ-পোষাকে পরেশবাবুর সন্দেহ থাকল না যে, এ-ই সেই লোক। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,- ‘আপনি এসে গেছেন স্যর ?’

- ‘মানে ?’

- ‘আপনিই চৌধুরী সাহেব তো ?’

- ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি…………’

- ‘দেখুন স্যর দেখেই বুঝতে পেরেছি। মাস্টার মশাই মায়ের অসুখ শুনে হঠাৎই কলকাতা চলে গেছেন কাল। আমাকে সব বলে গেছেন।‘

- দেরি দেখে ইতিমধ্যে রমা আর বাপি আপিস ঘরে ঢুকে এসেছে। ওদের দেখে এ এস এম বাবু জিভ কেটে বললেন-'ছিঃ ছিঃ স্যর, বৌদি-খোকন কে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আপনি, আর বলছেন কিনা আপনি ভাড়া ঘরে থাকবেন !’ শশাঙ্কর বুঝতে অসুবিধে হয় না, যে উনি, মাস্টারমশাই ছুটির থাকার সময়টা, বদলি স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে শশাঙ্ককে গুলিয়ে ফেলেছেন। কিছুটা হতচকিত হয়ে বলে ওঠে,- 'শুনুন মশাই ……।‘

- ‘কিছু শোনার নেই স্যর; অনেকটা জার্নি করে এসেছেন, গাড়িও লেট ছিল, বেশ ঠান্ডাও পড়েছে। ওরে মিন্টু চৌধুরী সাহেবের মালপত্তরগুলো এক নম্বর ঘরে পৌঁছে দে। আপনি যান স্যর ওর সঙ্গে। আমি আপনাদের চা পাঠাগার ব্যবস্থা করছি।‘

বিরক্তির সুরে শশাঙ্ক বলে ওঠে,- ‘কিছু করতে হবে না আপনাকে, শুধু ঘরের চাবিটা দিন আমাকে।‘ শশাঙ্ক মন্টুর পেছন পেছন হন্ হন্ করে হাঁটা দিল। ঘরের সামনে এসে মন্টু শশাঙ্কর হাত থেকে চাবি নিয়ে এক নম্বর রিটায়ারিং রুম খুলে মালপত্তর নামিয়ে রাখল।

মনে মনে শশাঙ্ক ভাবে- কি ফ্যাসাদেই পড়লাম রে বাবা। নিশ্চয়ই অন্য কারুর সঙ্গে লোকটা গুলিয়ে ফেলেছে। আবার এ-ও ভাবে, দিনকাল খারাপ। কোনও মতলোব নেই তো। যাকগে, রাতটা রাতটা তো কাটানো যাক। কাল সকালে দেখা যাবে। সকালেই ঘুম থেকে উঠে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে রমার মতামত জানতে চাইল শশাঙ্ক। রমা বলল,- 'থাকবো তো দু-চারটে দিন, ঘরটা বেশ ছিমছাম। এর মধ্যে স্টেশন মাস্টার ফিরলে ভাল; নয়তো যাবার সময় ভাড়া মিটিয়ে গেলেই হবে। আর তাছাড়া ট্রেনে সঙ্গী ভদ্রলোক, যিনি আমাদের সঙ্গে এখানেই নাহলেন, উনি তো বলছিলেনই যে এখানকার মানুষজন বেশ সাদামাটা। এত ভাববার কিছু নেই। চলো, বরং আশপাশটা বেড়িয়ে আসি।‘

- 'বেশ তাই চলো।‘

মানুষ যখন নতুন পরিবেশে যায়, তখন প্রথমেই সে আকৃষ্ট হয় যা তার পূর্বতন অভিজ্ঞতালব্ধ নয়।, সেই সব দৃশ্যের প্রতি। স্টেশনের ধারেই গড়ে ওঠা স্বাস্থ্য নিকেতনগুলো চোখে পড়ার মতো। শান্ত নির্জন পরিবেশে রোজই ভোরবেলা শশাঙ্ক তার ছোট্ট পরিবারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। লালমাটির পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো টিলাগুলো। রমা যেন রাতারাতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। গেরস্তের সংসারে এমন স্বাধীনতা আর কোথায়! আপিসের ভাতের তাড়া নেই। নেই ছেলেকে ইস্কুলে পাঠাবার তাড়া। রোজই বেড়িয়ে ফেরার পথে একটা মিষ্টির দোকানে ওরা সিঙাড়া-জিলিপি আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট সারে। স্বাস্থ্যকর জায়গা শিমুলতলার প্রধান লাট্টু  পাহাড়ের কথা শশাঙ্কর অজানা নয়। ছেলে-বৌয়ের উৎসাহ দেখে একদিন ওরা চলে গেল লাট্টু পাহাড় দেখতে। রুগ্ন শরীর রমার ক্লান্তি কে যেন কেড়ে নিয়েছে। দিব্যি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে সে। অটোয় চড়ে দূরের হলদি ফলস্ আর লীলাবরণ ফলস্ দেখাও বাকি রইল না। আর তাছাড়া পাহাড় আর শাল-মহুয়ার অরণ্যে ঘেরা মনোরম পরিবেশ, পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখ তুললেই দেখা যায়।

বাড়ি ফেরার দিন চলে এল। ‘নিজের বাড়িটাই ভাল'- রমা মনে মনে আওড়ে চলে। আবার এটাও মনে হয় যে সংসারের নিত্য একঘেঁয়েমির মাঝখানে এরকম অনিয়মেরও একটা আলাদা স্বাদ আছে বৈকি। বাড়তি পড়ার চাপ থেকে ক'দিন রেহাই পাওয়ায় ছেলেটাও আনন্দে ডগমগ ছিল। কিন্ত বাবাই, জিৎ, সানিদের পাবে কোথায় এখানে! বন্ধুদের জন্য মন কেমন করছে ওর বোধহয়। আজ সকালেই জিজ্ঞেস করছিল,- 'মা আমরা বাড়ি যাব কবে ?’ যাইহোক,  রাত পোহালে বাড়ি যাবার কথায় সকলের মধ্যেই একটা আনন্দ-বিষাদ মেশানো ভাব লক্ষ্য করা গেল।

সন্ধ্যের চা সেরে শশাঙ্কমোহন ঘরভাড়া মেটাতে বেরুল। পরেশবাবুর সহাস্য অভ্যর্থনা- 'আসুন স্যর, বসুন; কেমন লাগল আমাদের জায়গা ?’

- ‘ভালই, পাঁচদিনই যথেষ্ট।  কালই রওনা হব। বলুন আপনার ভাড়া কত হ'ল?’

এ এস এম বাবু জিভ কেটে বললেন- ‘ভাড়া কিসের স্যর? আচ্ছা বেশ, আপনি বরং কেয়ার টেকার বাবুকে আপনার যা খুসী দু-দশ টাকা জলপানি হিসেবে দিয়ে দিন স্যর, তাহলেই হবে।‘

বিরক্ত হয়ে শশাঙ্ক ঘরে ফিরে এল। রমাকে বলল,- ‘লোকটা নির্ঘাত আমার সঙ্গে রেল কোম্পানির কোনও হোমরাচোমরা কাউকে গুলিয়ে ফেলেছে। অথচ কিছুতেই শোধরাবার সুযোগ দেবে না।‘

- ‘মরুকগে, তুমি তো সাধাসাধি করেছ ভাড়ার জন্য।  না যদি নেয় তো তুমি কি করবে!’

পরের দিন সকাল ন’টা আটচল্লিশের গাড়িতে শশাঙ্ক কলকাতা রওনা হ'ল। গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্ত তা হবার নয়। কারণ, শশাঙ্ক কি জানতে পেরেছিল, শিমুলতলায় তার ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পাবার কারণ ? পারেনি। আমি জেনেছিলাম। সেটা বলা যাক। ওই সময় শিমুলতলার স্টেশন মাস্টার ছিল আমার এক সময়ের সহপাঠী, রবীন সরকার। রিটায়ার করে ঘটনাচক্রে আমরা দুজনেই আজ একই কো-অপারেটিভের বাসিন্দা, পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকি। রোজই বিকেলে একসঙ্গে দুজনে কিছুটা সময় কাটাই। নানান্ গল্পের মাঝখানে পেশাগত জীবনের পারস্পরিক অভিজ্ঞতার ঘটনা নিয়েও দু-চার কথা হয়। সেই সূত্র ধরেই রবীন আমাকে এই ঘটনাটা বলেছিল। অনেক দিনের কথা, স্মৃতিতে কিছুটা পলি পড়েছে। যতটুকু মনে আছে, সেটাই বলছি।

শশাঙ্ক ফিরে যাবার পরের দিনই রবীন শিমুলতলা পৌঁছোলো। ডিউটিতে আসা মাত্রই পরেশবাবু এক গাল হেসে বললেন- ‘স্যর আপনার অতিথি কালই ফিরে গেলেন। দিল দরিয়া মেজাজ। ভাড়া মেটানোর জন্য ঝুলোঝুলি। দেখুন না স্যর, কেয়ারটেকার বাবুকে এক্কেবারে ১০০ টাকা বখসিস্ দিয়ে গেছেন। রেলের লোক বলে মনেই হয় না।‘

অনেক দিন কামাই-এর পর রবীন লগ বুক খতিয়ে দেখছিল।পরেশ বলে চলে- ‘ঘর ভাড়া না নিতে উনি একটু ক্ষুন্ন মনে হ'ল স্যর।‘ রবীন, পরেশবাবুর স্বভাব ভাল করেই জানে। সাদা মনের মানুষ, বকবক করতে ভালবাসে। সিগারেটের প্যাকেটটা পরেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে রবীন আবার খাতার দিকে নজর দিল। পরেশ থামবার পাত্র নয়। সিগারেটটা ধরিয়ে আবার শুরু করে- ‘বলুন স্যর উনি এস এম, তাছাড়া আপনার বন্ধু। দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছেন। সঙ্গে পরিবার…..’

- দাঁড়াও দাঁড়াও, কি বললে?’ লগবুক থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো, - ‘পরিবার মানে?’

- ‘আজ্ঞে স্যর ওঁর স্ত্রী আর ন-দশ বছরের ছেলে।‘

- ‘বল কি হে!’ – রবীন প্রায় আঁতকে উঠলো। ‘চৌধুরী মশাই তো বিয়েই করেন নি। অন্তত বছর দুয়েক আগে গয়া থেকে মোগলসরাই-এ বদলি হবার আগে ওঁর তো বিয়ে হয়েছে বলে শুনিনি। আর তুমি বলছ কিনা ন-দশ বছরের ছেলে আছে ! না পরেশ, তুমি বকবক করতে করতে আবার কিছু গোল পাকিয়েছ। কতদিন তোমাকে বলেছি, একটু দেখেশুনে কাজ করতে । ওরে মিন্টু, রেজিস্ট্রি বইটা নিয়ে আয় তো বাবা চট্ করে।‘ মিন্টু রেজিস্ট্রি বই নিয়ে আসার অবসরে পরেশ বলল,- ‘আজ্ঞে স্যর আপনি তো এত কথা বলে যাননি। নাম জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন, এস এম চৌধুরী। ব্যস আমিও আপনার কথা মতো কাজ করেছি।‘

- মিন্টু খাতা আনতেই রবীন একরকম ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে খাতাটা ছিনিয়ে নিল। খাতার পাতা খুলে গলার স্বর সামান্য একটু চড়িয়ে বলল- ‘এই দ্যাখো, যা বলেছি ঠিক তাই। উনি তো ওঁর নাম ঠিকই বলেছেন। আরে বাবা, মোগলসরাই-এর স্টেশন মাস্টার, মানে এস এম হ'ল সলিল মোহন চৌধুরী। আর উনি হলেন এস এম দত্ত চৌধুরী। চোখ খুলে দ্যাখো ফুল নেম অ্যান্ড অ্যাড্রেসের কলমে পরিস্কার লিখেছেন শশাঙ্ক মোহন দত্ত চৌধুরী। বুঝলে কিছু ?’


Friday, July 16, 2021

জল

 আমার কলেজের সহপাঠী বিশ্বনাথ অগ্রবাল। ফেসবুকের দৌলতে ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা  এখন আমার অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। আমার বয়সী খুব কম মানুষকে আমি এতটা সক্রিয় দেখেছি। ওর post গুলো খুব সহজবোধ্য এবং অর্থবহ। চুটকি, মজা সব কিছুই আছে। কিন্ত বয়সপোযোগী, সস্তার  কোন গল্প নেই। ফেসবুকে আরও অনেকের অতিসক্রিওতাও চোখে পড়েছে। তবে অন্য জাতের। সেগুলোতে "আমিও আছি" - এই ঘোষণার গন্ধ পাওয়া যায়।

আমি আর বিশু এক সময়ের সহকর্মীও বটে, হায়দ্রাবাদের ECIL-এ। আমাদের overlap মাত্র চার মাসের। পদমর্যাদায় ও আমার থেকে তিন বছর এগিয়ে ছিল, বলতে বাধা নেই,  যোগ্যতাবলেই। ও এমন একজন মানুষ যে মতান্তর থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে ময়লা লাগে না।

সম্প্রতি পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ  বিষয়ে ন'লাইনের একটা আধুনিক কবিতা post করেছিল। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পার হবার পরে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়ে সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। এরপর বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের লেখা এবং তাঁদের নিয়ে লেখা বইগুলো পড়ে, সহজ ভাষায় মৌলিক বিজ্ঞানের রহস্য জেনে এতটাই মুগ্ধ হই, যে পরবর্তীকালে মৌলিক বিজ্ঞানকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রবন্ধ বাংলায় রচনা করি, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে মৌলিক বিজ্ঞানের ফসল পৌঁছে দেওয়া যায়।

আধুনিক কবিতা ব্যাপারটা একদম বুঝতাম না। আজও অনেক কিছুই বুঝি না। তবে বহুদিন আগে 'দেশ' পত্রিকায় বাংলাদেশ বিতাড়িত ডাক্তার, কবি এবং একই সঙ্গে সাহিত্যিক, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, তসলিমা নাসরিনের একটা আধুনিক কবিতা পড়ে শিহরিত হই। স্বদেশের প্রতি হৃদয়ের ব্যাকুলতার দুর্বিষহ প্রকাশ ধরা পড়েছিল সেই কবিতার ছত্রে ছত্রে। এরপর জয় গোস্বামী আর শ্রীজাতর লেখা দু'চারটে কবিতা পড়েছি। আসলে ছন্ধবদ্ধ সুরেলা কবিতা পড়তেই আমি অভ্যস্ত। 

যাইহোক, বিশ্বনাথের পাঠানো ইংরেজিতে লেখা ন-লাইনের অর্থবহ এই কবিতাটা পড়ে মনে হ'ল আধুনিক কবিতা সম্বন্ধে ভাসাভাসা যেটুকু বুঝতে পেরেছি, সেটুকু ভরসা করে এই কবিতাটার একটা বাঙলা তর্জমা করে বোধহয় আধুনিক কবিতার আঙ্গিকে রূপ দেওয়া যায়। হয়তো ব্যর্থ প্রচেষ্টা। পাঠকরা বিচার করবেন।


            Water


Grandfather saw it in the River

Father saw it in the Well

We saw in the Tap

Our children see it in Bottle

Where will our Grandchildren

                         see it ?

In CAPSULE

If we still neglect

It will be seen only in Tears.

______________


             জল


ঠাকুর্দা দেখেছিলেন নদীতে,

বাবা দেখলেন নলকূপে কিম্বা পাতকূয়োতে,

আমরা দেখছি কলে,

আমাদের সন্তানরা দেখছে বোতলে,

আমাদের নাতিপুতিরা কোথায় দেখবে এটা ?

হয়তো ছোট্ট একটা ক্যাপসুলে ।

আমরা কি এখনও অবহেলা করব ?

তাহলে এর পরিণতি হবে কয়েক বিন্দু অশ্রুতে।

Friday, July 9, 2021

আবদুল কালাম

                          

কে তিনি ? 

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা ও তাঁর নাম বহুদিন আগেই সমার্থক হয়ে গিয়েছে। তিনি হলেন ভারতবর্ষের 'মিসাইল মেসায়া'। আবুল পাকির জয়নালাবদীন আবদুল কালাম। ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ছোট্টো টীকা লিখে তুলে ধরব কালাম সাহেবের কর্মব্যস্ত জীবনের বিক্ষিপ্ত কয়েক ঝলক।

ক্ষেপণাস্ত্রের সুবিধেটা হ'ল এই যে, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো জওয়ানকে পাঠানোর দরকার নেই। গোটাকতক বোতাম টিপেই অব্যর্থভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানা যাবে। এক মহাদেশ পার হয়ে আছড়ে পড়বে আরেক মহাদেশে। প্রথাগত বিষ্ফোরক বা পরমাণু অস্ত্র - দু-ধরনের ওয়ারহেডস্ই মজুত রাখা সম্ভব মিসাইলে। টেলিভিসনের দৌলতে আমরা অনেকেই দেখেছি পারস্য উপসাগর থেকে মিসাইলে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র কী ভাবে আছড়ে পড়েছিল অব্যর্থ লক্ষ্য, বাগদাদের তেল শোধনাগারে। কসোভার আকাশ আলোয় আলো হয়ে গিয়েছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ছোটাছুটিতে।

পিতা, তিট্টাকুম্ভীর জয়নালাবদীন, পেশায় ছিলেন জেলে। ধনুষ্কোটি রামেশ্বরমের ঘাটে থাকতো তাঁর নৌকো। সেই নৌকো নিয়ে মাঝে মাঝে চলে যেতেন দূর দরিয়ায় মাছ ধরতে। মাঝে মাঝে বাবার পিছন পিছন জয়নালাবদীন-ও যেত আর তাকিয়ে থাকতো আকাশ আর সমুদ্র মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া দিগন্তে। সেখানে ছোটো ছোটো বিন্দুর মতো ভেসে থাকা পাখির দল স্বচ্ছন্দে উড়ে বেড়াতো । আর একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে ছোট্ট কালাম স্বপ্ন দেখতো যে সে-ও একদিন ওই পাখিদের মতো উড়ে বেড়াবে আকাশে।

আক্ষরিক অর্থে মাদ্রাজের ( এখনকার চেন্নাই ) এম আই টি থেকে পাশ করা তিনি একজন য়্যারনটিক্যাল এঞ্জিনিয়ার। নামী-দামী পুরস্কার-ও পাননি। অথচ পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্য সম্মানের মুকুট তাঁর মাথাব উপর শোভা পাচ্ছে। এ পি জে আবদুল কালাম উপমহাদেশের এক অতি পরিচিত নাম। তাই বা কি করে বলি ? পৃথিবীর নানান্ দেশের কর্ণধাররাও তাঁর নাম সমীহের দৃষ্টিতে স্মরণ করেন।

এয়ার ফোর্সের পাইলট হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এম আই টি থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। পোশাকি ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষার এখানেই ইতি। মনের ইচ্ছে, উড়েউড়ে ঘুরে বেড়াবেন দিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন নীল আকাশের বুকে। বাস্তব তাঁকে অন্য পথে চালিত করল। ভগবৎপ্রেমী কালাম বুঝতে পারলেন যে তাঁর জীবন-দেবতা তাঁকে জনারণ্যে হারিয়ে যেতে দেবেন না বলেই তাঁর স্বপ্নের এই পরিণতি হয়েছে। কিশোর কালামের পেশার জীবন শুরু হ'ল হিন্দুস্তান য়্যারনটিকস্ লিমিটেডের শিক্ষানবিশী হিসেবে। তারপর প্রতিরক্ষা দপ্তরের ডাইরেক্টরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভলপমেন্ট এস্টাবলিসমেন্টে (ADE)। অদম্য উড়ে বেড়াবার ইচ্ছা রূপান্তরিত হ'ল, সেই ওড়ার নেশাকে ঘিরেই। জন্ম হ'ল দেশি প্রযুক্তির ফসল 'নন্দী' হোভারক্রাফট্। সেই সময় মুম্বাইঅয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামন্টাল রিসার্চের (TIFR) তদানীন্তন অধিকর্তা, প্রফেসর এম জি কে মেনন ADE তে এসেছিলেন। তাঁকে যন্ত্রটির মধ্যে বসিয়ে মাটির উপর ভাসিয়ে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছিলেন কালাম। এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই ইন্ডিয়ান কমিশন ফর স্পেস রিসার্চ (INCOSPAR) থেকে রকেট এঞ্জিনিয়ার পদের ইন্টারভিউয়ের ডাক পেলেন। এটিই ছিল তাঁর বৃহত্তম জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করার প্রথম সিংহদুয়ার। INCOSPAR-য়ে যোগদানের অব্যবহিত পরেই তাঁকে ছ-মাসের ট্রেনিং-এ পাঠানো হ'ল স্পেস টেকনোলজির পীঠস্থান, আমেরিকার ন্যাশনাল য়্যারনটিকস্ য়্যান্ড স্পেস য়্যাডমিনিস্ট্রেসনের (NASA) গবেষণাগারে। ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হলেন ত্রিবান্দামের থুম্বায়। বাকিটা ভারতবর্ষের স্পেশ টেকনোলজির ইতিহাস। শুরু হ'ল একের পর এক রকেট ওড়ানোর পালা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছিল এবং এই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে একের পর এক মিসাইল- পৃথ্বী, ত্রিসুল, আকাশ, নাগ, অগ্নি। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা অসীম্মা, সেই সমুদ্র সৈকতেই দু-দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপন করে গিয়েছেন ছেলে। বিক্রম সারাভাই- এর স্বপ্নের স্পেস প্রোগ্রাম, পৃথিবীর স্পেস টেকনোলজির ইতিহাসে ভারতবর্ষকে পাকাপাকিভাবে স্থান করে দিয়েছে, মূলত তাঁরই হাত ধরে। শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারতবর্ষ বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।আজ দেশ স্বাধীনতার ঊনসত্তর বছর কেটে গেলেও, সাদা চামড়ার মানুষদের সিলমোহর না পাওয়া পর্যন্ত যেখানে সাফল্য স্বীকৃতি পায় না, আবদুল কালাম সেখানে এক নজিরবিহীন সাফল্যের প্রতীক। দেশজ প্রযুক্তির ফসলেই একটা দেশের আর্থিক অগ্রগতি হয়, স্বায়ত্ব সভ্যতার অগ্রগতি হয়। এই সরল বিশ্বাসে, আবদুল কালাম দেশজ প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে শাণিত করেছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন স্পেস প্রোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশাল কর্মযজ্ঞে। এমন আত্মসম্মানী, ধর্মনিরপেক্ষ ভরতীয়র নজির বড় একটা চোখে পড়ে না।

 জীবনের শুরুতেই NASA-র গবেষনাগারে ছ-মাসের ট্রেনিংই ছিল কালামের চাকরিজীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা এবং শেষও বটে।আমেরিকাতে ঘাঁটি গেড়ে বসে পড়েননি, যেটা উনি আনায়াসেই পারতেন। ওঁনার সম্বন্ধে এত কথা পড়েছি এবং জেনেছি যে ওঁর একটা আলেক্ষ্যই মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে গেছে। তাঁর সারাজীবনের চালচলনের খতিয়ান বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে যে, জীবনশুরুর গোড়াতেই তিনি বুঝে গেছিলেন যে মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতাবোধ - এই একান্ত নিজস্ব বোধগুলোকে কেড়ে নেবার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তার মুখে টাকা ছুঁড়ে দেওয়া, তাকে এমন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে দেওয়া যা থেকে সে কোনো মতেই বেরিয়ে আসতে না পারে। এ সত্য পৃথিবীর সব প্রান্তের মালিকরা খুব ভালই বোঝেন। এই ব্যাপারগুলো তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। জীবনে কোনোরকম ফাঁদেই তিনি পা দেননি। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা মনে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা যাবতীয় সাফল্যের চাবিকাঠি, ওই ফাঁদ পাতার কৌশলে। সারা পৃথিবীর সাধারণ যোগ্যতার অভিবাসীরা, অর্থাৎ immigrants ( ব্যতিক্রমী অসাধরনের সংখ্যা শতকের হিসেবে প্রায় নগন্য) ওখানে ভিড় করেছে তাদের তৈরি করা পরিকল্পনার রূপায়ণে। মার্কিন মালিকরা বোঝেন, টাকার মতো আঠা আর নেই, সব ছ্যাঁদাই মেরামত হয়ে যায়। ফিরে যাব মূল আলোচনায়।

ভারতীয় স্পেস টেকনোলজির জনক, বিক্রম সারাভাই ছাড়াও, পেশার জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে সংস্পর্শে এসেছেন সতীস ধাওয়ান, ব্রম্ভপ্রকাশের মতো গুণীজনের। কিন্তু কর্মজীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে যে মানুষটির নীরব ভূমিকা ছিল, তিনি হলেন তাঁর পিতা, জয়নালাবদীন। সাফল্য, ব্যর্থতা, বিষাদ - সব পরিস্থিতিতেই তিনি অকপটে স্মরণ করেছেন পিতাকে।আদর্শবাদের যে উত্তরাধিকার ছোটোবেলায় এবং কৈশোরে তিনি পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, তার এতটুকু অমর্যাদা হতে দেননি। পিতার নির্দেশিত পথই যে তিনি বরাবর অনুসরণ করেছেন, তা তাঁর মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। : ............., he adds, " I have throughout my life tried to emulate my father in my own world of science and technology. I have endeavoured to understand the fundamental truths revealed to me by my father, and feel convinced that there exists a divine power that can lift one from confusion, misery, melancholy and failure and guide one to one's place".

কর্মক্ষেত্রে, বিশেষত সরকারি কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারে লাল ফিতের গেরো ছাড়াও প্রধান প্রতিবন্ধক সহ কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত। বিজ্ঞানীদের মধ্যে রেষারেষি নতুন কিছু নয়। কালামের ঘরানাই অন্য ধাঁচের। প্রতিরক্ষা দপ্তরের গবেষনাগার, ডি আর ডি ও-র (DRDO) অধিকর্তা,  কে সন্তনমের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে কালামের কোনোদিন মন কষাকষি হয়েছে, এমন অপবাদ শত্রুতেও দিতে পারবে না, অবশ্য যদি তাঁর শত্রু আদৌ কেউ থাকেন ! কালাম সাহেবের কর্মকুশলতা, বিশেষত দক্ষ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের গুণ, দেশের নামজাদা এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও জাতীয় গবেষণাগারের নবীন ও প্রবীন উজ্জ্বল তারকাদের চিন্তার ফসলকে একত্রিত করতে পেরেছে। নিট ফল - ভারতীয় স্পেস প্রোগ্রামের অভূতপূর্ব সাফল্য, স্পেস টেকনোলজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উল্লেখযোগ্য আরও একটি ঘটনার কথা মনে আসছে। ইসরোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক চুকিয়ে, হতাশা আর ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন কালাম, হায়দ্রাবাদের ডি আর ডি এল গবেষণাগারের ভার গ্রহণ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে এটি আরও একটি গবেষণাগার। পদমর্যাদার দৌলতে শহরতলির কাঞ্চনবাগে একটি সুবিশাল বাংলোয় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলো প্রত্যাখ্যান করে ল্যাবরেটরির মেসে আটখানা কামরার একটিতে তিনি শয্যা পাতলেন। ফৌজি কড়াকড়ির বদ্ধ বাতাস উধাও, বিজ্ঞানীমহলে চলে এল খোলামেলা কাজের পরিবেশ। পরের ঘটনাগুলো প্রায় রূপকথার মতো।

সফল নেতৃত্বের প্রাথমিক সর্ত হওয়া উচিৎ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার ত্বরিৎ রূপায়ণ। দ্বিধাগ্রস্থতা বা দীর্ঘসূত্রীতার কোনো স্থান নেই সেখানে। এই সহজ তত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন সহজ সরল মানুষটি। বাকপটুতায় অনভ্যস্থ কালাম, সব কর্মীদের সঙ্গে টেকনিক্যাল আলোচনায় শুধুমাত্র স্বচ্ছন্দ বোধই করতেন না, সমস্যার গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতার বলে বাদ-প্রতিবাদের জট খুব সহজে ছাড়াতে পারতেন। বই খাতা আর জ্ঞানের স্বচ্ছতাকেই তিনি মনে করতেন আত্মরক্ষার অস্ত্র ।আসলে ভাবনার দৌড়ে বরাবরই সময়ের থেকে এগিয়ে থেকেছেন তিনি। তিনি এটাও বুঝতেন যে বাকসর্বস্ব চতুর মানুষ দৃষ্টি আকর্ষণী ভাষার ব্যবহারে কী ভাবে অসার বক্তৃতার ফাঁকগুলো ভরাট করে আসল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। সেই সব তথাকথিত স্মার্ট মানুষদের সঙ্গ তিনি নিজের চারিত্রিক সরলতা ও ধৈর্যকে হাতিয়ার করে  সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে পারতেন। আমলাদের সঙ্গে মতান্তরে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল চাঁচাছোলা। স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেয়িকল্, এস এল ভি প্রকল্পে কেনাকাটার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস, পায়ে পায়ে নিষেধের বেড়ি- প্রকল্পের কাজে বাধা সৃষ্টি করছিল। কালাম সাহেব নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি। ওপরওয়ালার সামনে নালিস জানিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে মনেও হয়েছিল, সাময়িক হঠকারিতায় মেজাজ হারানো ঠিক হ্য়নি। সারারাত্রি জেগে কাটিয়েছেন। মনকে প্রবোধ দিয়েছেন এই বলে যে " বিচারের শক্তি যাদের আছে, তাদের মধ্যে মতের ঐক্যই অনিয়ম, মতের ঐক্য ব্যতিক্রম "। আসলে তাঁর চিন্তা-ভাবনায় ছিল একটা অখন্ডনীয় যুক্তির স্বচ্ছতা। ঠিক সেই কারণেই তিনি আপসের পথ বেছে নেননি। উদ্যোগী নির্ভীক মানুষকে ঈশ্বর সাহায্য করেন। বলা বাহুল্য, এর পর থেকে এস এল ভি সংক্রান্ত কেনাকাটার ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা।

কুড়ি-বাইশ বছর বয়সে পেশার জীবন সুরু করে দৃষ্টি কেড়েছেন দেশের কর্ণধারদের। দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী ও আমলাদের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্তু কখনই তাঁদের সঙ্গে তিনি অনুচিৎভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি, সম্ভ্রমসূচক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা তাঁকে বিন্দুমাত্র আত্মঅহমিকাবোধে আচ্ছন্ন করতে পারেনি।একের পর এক সাফল্য এসেছে এবং পরিণত বয়সেও সেই সাফল্যকে তিনি সমান উদ্যমে ধরে রেখেছেন।কারণ আত্মতুষ্টির মৌতাতে তিনি কখনও মসগুল হয়ে ওঠেননি অথবা সংবাদ মাধ্যমকে খাতির করে ডেকে ফলাও করে জাহির করেননি। সর্বদাই সংযত থেকেছেন। উচ্চতার শিখরে পৌঁছেও চাল-চলন কথাবার্তায় তাঁর কখনও কতৃত্বের সুর প্রকাশ পায়নি। সাফল্য ধরে রাখার এই ক্ষমতাটাই তাঁকে ফারাক করে দিয়েছে গড়পড়তা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নায়কদের সঙ্গে।i

ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর প্রানের অনেক কাছের মানুষ এবং সব সময়েই তাদের তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সময়টা ঠিক স্মরণে নেই। তবে সেই একবারই, দর্শকের আসন থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের একটি অনুষ্ঠান বিড়লা সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।উনি এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসাবে। ছাত্রদের কৌতুহলী প্রশ্নবাণে তিনি মুগ্ধ। আবেগাপ্লুত কালাম নিরাপত্তা বেষ্টনীর তোয়াক্কা না করে মঞ্চ পরিত্যাগ করে হাজির হলেন ছাত্রদের মাঝখানে।তাঁর প্রচারবিমুখ স্বভাব ফটোগ্রাফারদের ক্যমেরাকে ম্লান করে দিয়েছিল। ছাত্রদের অন্য এক অনুষ্ঠানে কোনো একজন তাঁকে প্রশ্ন করে, " Define birthday " ওঁনার চটজলদি উত্তর, " The only day in your life when your mother smiled when you cried " -.ভাবনার স্বচ্ছতা আর উপস্থিত বুদ্ধির এক অভিনব মিশেল ! 

বাস্থবের মুখোমুখি হয়ে, নিজের ভূত-ভবিষ্যতের কথা ভেবে মূল্যবোধ কথাটির অর্থ এক একজনের কাছে এক একরকম। অতীতের মূল্যবোধ প্রায় লুপ্তপ্রায়। আজীবন কর্মব্যস্ত কালামসাহেবের মূল্যবোধে কখনও টান পড়েনি। কারণ তা তিনি সযত্নে লালিত করে এসেছেন। ব্যস্ততার চরম মুহূর্তেও তিনি মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মূল্যবোধের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি, বরং সাদরে গ্রহণ করেছেন। ভাইঝির বিবাহ, ভগ্নীপতির মৃত্যু, পিতার মৃত্যুর খবর তাঁর দেহ-মনকে ছুটিয়ে এনেছে রামেশ্বরমের গ্রাম্য পরিবেশে। আসলে এমনই একটি পরিবার থেকে উনি ঊঠে এসেছিলেন, যেখানে নিম্নবিত্ত রক্ষণশীলতার গ্রামীন পরিমন্ডল আজও রয়ে গেছে এবং তিনি সব সময়ই সেটাকে সমীহ করে এসেছেন। সাংস্কৃতিক বন্ধন আর পারিবারিক যোগাযোগের মধ্যেই উনি খুঁজে পেয়েছিলেন আত্মিক উন্নতির মূলমন্ত্র। তিনি মনে করতেন যে সব গুরুস্থানীয় ব্যক্তির সস্নেহ ও সযত্ন শিক্ষা তাঁর অধীত জ্ঞানকে সমৃদ্ধি দান করেছে, তাঁরাই তাঁর জীবনে যা কিছু দৃষ্টির উৎস। আজীবন মনে রেখেছেন সেই সব গুরুস্থানীয় মানুষদের। মাদুরাইতে কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রনে সাড়া দিয়েছেন। সেখানে পোঁছেই খুঁজে বার করেছেন তাঁর শিক্ষক আয়াদুরাই সলোমনকে। অশীতিপর বৃদ্ধ সলোমনকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির করেছেন মঞ্চের উপরে। প্রতিরক্ষা গবেষণাগারের কাজের পরিবেশের মধ্যে তিনি এমনই একটি বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে কর্মদীপ্ত নবীনদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রবীনদের অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতাও বটে। আসলে মূল্যবোধকে তিনি মনে করতেন সমাজ ও জীবনচর্চ্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি মনে করতেন মূল্যবোধ আর কিছুই নয়, শুধুমাত্র কতগুলো অগ্রাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। মূল্যবোধ ছিল তাঁর কাছে সহানুভূতি আশ্রিত যেটা ক্রমশ গড়ে উঠেছিল আত্মীয়-স্বজন, গুরুস্থানীয় শিক্ষক এবং ভ্রাতৃবৎ সহকর্মীদের আশ্রয় করে এবং যা অবধারিতভাবে চারিয়ে গেছে তাঁর ভাবনা ও মননের গভীর থেকে আরও গভীরে। ধর্মের গোঁড়ামি তাঁকে কখনও স্পর্শ করেনি। গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন ভাগবত গীতা। কোরান শরিফও। আমার মনে হয় তাঁর ধর্মবোধ এবং পারিবারিক ও বৃহত্তর ক্ষেত্রে, সামাজিক মূল্যবোধের সমবায়েই গড়ে উঠেছে তাঁর দেশাত্মবোধ।

এই বিশাল দুনিয়ায় কতই না বিচিত্র আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে। মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য সম্পদ-সম্ভোগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। শিক্ষিত আধুনিক মানুষের প্রতি তাঁর আবেদন, অহেতুক ভোগবাদে বিরত থাকা। তাঁর মতে বস্তুবাদ আর সম্পদের প্রদর্শন কখনই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। যে কোনো অনুষ্ঠানের গতবাঁধা, নিয়মমাফিক উদ্বোধনী ভাষণের ক্ষেত্রবিশেষে নেতারাও তো বহুকাল যাবৎ এই কথা বলে আসছেন ! তফাৎটা ঠিক কোথায় ? আসলে তফাৎ ব্যক্তিত্বের। তিনি অসার বামপন্থী চিন্তাধারা আর দক্ষিণপন্থী জীবনধারার ভন্ডামিতে আদৌ বিশ্বাস করেননি। এ প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একজন প্রতিভাশালী কলামনিস্টের উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম : ...."  As an Individual, he donated all of his earnings to Providing Urban amenities to Rural Areas, a scheme that is designed to contain migration to urban areas. He donated his salary as President to charity. In a country where parliamentarians shamelessly enjoy all kinds of concessions, including that of  Lok Sabha canteens, here was a man who almost had a disdain for wealth." সাময়িক লাভালাভের প্রশ্নে তিনি কখনও প্রভাবিত হননি। নীতিগতভাবে যেটা সঠিক মনে করেছেন, সেটা অবলম্বন করেই অগ্রসর হয়েছেন। দেশের সর্বোচ্য সম্মানের মুকুট মাথায় নিয়েও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শে বিশ্বাসী অকৃতদার কালাম বহুকাল কাটিয়েছেন বারো ফুট বাই  দশ ফুট একখানি ঘরে। সঙ্গী কিছু বই-কাগজ। দুখানি ইডলি আর ঘোলের সরবৎ সহযোগে সেরেছেন প্রাতরাশ।প্রকৃত অর্থে তিনি ধনী মানুষ নন। আসলে তাঁর ধন-দৌলতের ভান্ডার রয়েছে মনে প্রানে কর্মে আত্মায়।

অবচেতনে তিনি একজন কবিও বটে। তামিল ভাষায় লেখা তাঁর কবিতা এবং সায়েন্স ফিকসান তামিল ভাষীদের কাছে অজানা নয়। কবিতা আসলে মানুষের মন ও তার পারিপার্শ্বিকের ছন্ধবদ্ধতার যোগসূত্র ঘটায়। তাইতো সবার অলক্ষ্যে বারবারই সংবেদিত মনের শুদ্ধ অশ্রুবিন্দুর মতো কালাম সাহেবের হৃদয়ের নির্ঝর থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে কবিতা। ঊনিশশো ঊননব্বই সালের মে মাসে সম্পূর্ণ দেশী প্রযুক্তির ফসল  অগ্নি উৎক্ষেপনের সাফল্যে আবেগঘন মুহূর্তে ডায়রিতে লিখে ফেললেন : 

Do not look at Agni/ as an entity directed upward/ to deter the ominous/ or exhibit your might;/ It is fire/ in the heart of an Indian./ Do not even give it/ the form of a missile/ As it clings to the/ burning pride of this nation/ and thus is bright.

অনিশ্চয়তা আর আর্থিক উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে তাঁর শৈশব। যুদ্ধের সময় রামেশ্বরমে ট্রেন থামতো না। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা খবরের কাগজের বান্ডিল কুড়িয়ে হকারদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আট বছর বয়সের কালাম তার প্রথম পারিশ্রমিক উপার্জন করে। 

একবেলা আধপেটা জেলে পরিবারের সন্তানের মাদ্রাজ এম আই টি তে ভর্তির হাজার টাকার ফি জুগিয়েছেন তারই সহোদর ভগিনী, সামান্য গয়না বিক্রী করে। রামেশ্বরমের পাঠশালা ঘুরে, রমানাথপুরের সোয়ার্জ স্কুল, ত্রিচির সেন্ট জোসেফ কলেজ, মাদ্রাজের এম আই টি- সঙ্কীর্ণ গন্ডী থেকে আস্তে আস্তে উঠে এসেছেন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর জীবনে, প্রানচঞ্চল কর্মব্যস্ত মানুষটি। ঈশ্বরপ্রেমী কালাম পিছনের দিকে তাকিয়ে তাঁর শৈশবের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে প্রান্তিক এবং পরিত্যক্ত জনের উদ্দেশ্যে লিখেছেন :

..........some poor child living in an obscure place, in an unprivileged social setting may find a little solace in the way my destiny has been shaped. It could perhaps liberate themselves from the bondage of their illusory backwardness and helplessness. Irrespective of where they are right now, they should be aware that God is with them and when He is with them, who can be against them ? "

এরই সারমর্ম করেছেন কাব্যে :


God has not promised/ skies always blue/ Flower-strewn pathways/ All our life through;/ God has not ptomised/ sun without rain,/ joy without sorrow,/ peace without pain./ But God has promised strength for the day,/ Rest for the labour/ Light for the way./

এস এল ভি নির্মানের সময় উর্দ্ধতন সহকর্মী প্রায়ই তাড়া লাগাতেন। অধৈর্য উর্দ্ধতনের কাছ থেকে মাঝেমাঝেই শুনতে হ'ত " কালাম তুমি যা চাও তাই পাবে, শুধুমাত্র সময় চেয়ো না "। হাসতে হাসতে কালাম ঊদ্ধৃতি দিয়েছেন ইলিয়ট থেকে - Between the conception/ And the creation/ Between the emotion/ And the response/ falls the shadow./

ক্ষেত্রবিশেষে এমন উদ্ধৃতি তিনি অনেকবারই করেছেন, কখনো নিজের সৃষ্টি থেকে, কখনো বা বিখ্যাত কবির সৃষ্টি থেকে ধার করে। পাঠক মনে করবেন না যেন আমি মোহগ্রস্থ হয়ে শ্রেষ্ঠ রকেট এঞ্জিনিয়ার কালামের উপর শ্রেষ্ঠ কবির শিরোপা আরোপ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমার কাছে অজানা এবং প্রকৃত অর্থে অদেখা। তাঁকে নিয়ে লেখা বই-কাগজ পড়ে এবং পেশার সূত্রে তাঁর কাছে আসা দু-একজন গুনীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তাঁর কবিসত্বার কথা জানতে পেরেছি। আমার ধারনা, কবিত্ব ব্যাপারটা তাঁর শুদ্ধ মনের আবেগ প্রকাশের একটা ভঙ্গিমা।

প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্যবোধও ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছিল পরিবেশ সচেতনতা। রকেট উৎক্ষেপনের পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য উড়িষ্যার বালেশ্বরের কাছে যে জায়গা সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল, সেখানে একটা বার্ড স্যাংচুয়ারি ছিল। সেটিকে বাঁচিয়েই তিনি লঞ্চিং প্যাড নির্মানের পরামর্শ দেন। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে পড়ছে। অগ্নি উৎক্ষেপনের আগের রাত্রে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী,  কে সি পন্থ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, " অগ্নি উৎক্ষেপনের সাফল্য আমরা কী ভাবে উদযাপন করব ? " অকপট, আদর্শবাদী কালামের সহজ সরল উত্তর ছিল, " সহস্রাধিক বৃক্ষ রোপনের মধ্যে দিয়েই  আমরা আনন্দোৎসব পালন করতে পারি। " আবদুল কালাম আসলে দেশ, সমাজ, পরিবেশ- সব ব্যাপারেই আজীবন সজাগ ছিলেন।

প্রকৃতির ভারসাম্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের যে বিশাল ভূমিকা আছে, সে ব্যাপারে উনি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। দু-একটা ঘটনার উল্লেখ করছি। রাষ্ট্রপতি ভবনের ছ-বছর মেয়াদের মধ্যে সংযোজন হয়েছে একটি ভেষজ উদ্যান এবং একটি বায়োদাইভার্সিটি পার্ক। মোগল গার্ডেনের ফুল তাঁর কাছে যতটা প্রিয়, ততটাই প্রিয় পশু-পাখি। রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি হরিণ শাবকের পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। কালাম সাহেব নিজে টানা ন-মাস শাবকটিকে নিয়মিত ফিডিং বোতলে দুধ খাওয়াতেন। ভবন সীমানার মধ্যেই একটি পশু চিকিৎসার হাসপাতাল আছে। সেখানকার ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে পোষ্যদের খবর সংগ্রহ করতেন। পশু-পাখিদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে উনি এতটাই দায়বদ্ধ ছিলেন যে, মোগল গার্ডেনে একটি ময়ূরকে খোঁড়াতে দেখে খবর নিয়ে জানেন যে পাখিটির পায়ে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এবং সেজন্য একটি বিশেষ ট্রেতে পাখিটিকে শোয়াতে হবে। হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকায়, তাঁরই নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে সেটি বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা হয়। দিল্লীর চিড়িয়াখানা সূত্রে খবর পান যে সার্কাশ দলের একটি জলহস্তী চোখে ঝাপসা দেখছে। তৎপর আবদুল কালাম পশুটির ছানি কাটানোর ব্যবস্থা করেন। এই রকমই রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি ঘোড়ার ছানি কাটানো হয় তাঁরই আমলে। এই না হলে আবদুল কালাম !! 


পদমর্যাদা নির্বিশেষে যে কোনো মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা আন্তরিক ছিল, সেটা কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। মৃত্যুর দিন, অর্থাৎ 27 জুলাই, 2015, কালাম সাহেবের শেষ ছ-বছরের ছায়াসঙ্গী এবং তিনটি বইয়ের সহলেখক সৃজনপালের কথাগুলো তুলে ধরছি। " গুয়াহাটি বিমান বন্দর থেকে সড়ক পথে আই আই এম শিলং যাওয়ার পথে কালামের চোখ পড়ছিল তাঁর গাড়ির সামনে 'এসকর্ট'  জিপসিতে মেসিনগান নিয়ে দাঁড়ানো এক জওয়ানের দিকে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওয়্যারলেসে খবর পাঠিয়ে ওঁকে বসতে বলতে। নিয়মের ফাঁদে তা করা যায়নি। শিলং পৌঁছেই ওই নিরাপত্তারক্ষীকে তিনি ডেকে পাঠাতে বলেন। লম্বা, সুঠাম চেহারার কনস্টেবল্, এস এ লাপাং স্যরের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাবড়ে গেছিলেন। ওঁকে অবাক করে হাত সামনে এগিয়ে দিলেন স্যর। করমর্দনের পর বললেন- আমার জন্য আপনাকে এতটা পথ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে। আমার সঙ্গে বসে চা খেয়ে যান। অবাক হয়ে যান জওয়ান। কিন্তু ভ্যাবাচাকা ভাবটা কাটিয়ে লাপাং উত্তর দেন ' স্যর আপনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি '।"

আবদুল কালামের ছাত্র এবং এক সহকর্মী দেবাশিস পালের অভিজ্ঞতার কথায় আসি : " অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায়, এস এল ভি উৎক্ষেপনের কাজে সবাই ব্যস্ত। লঞ্চিংয়ের দিন এগিয়ে আসছে, একদিন ডক্টর কালাম আমাকে বললেন, ' পল, টুমরো ইউ হ্যাভ টু গো টু কার নিকোবর টু কন্ডাক্ট স্যাটেলাইট কমপ্যাটিবিলিটি টেস্ট। ' মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, ' রকেট লঞ্চিং ডেট ইজ নিয়ারিং, স্যর ! ' ওই সময়টাতে যদি থাকতে না পারলাম, তবে তার থ্রিলটা উপভোগ করব কী করে ! উনি শুধু বললেন, ' পল, আই শ্যাল সি দ্যাট ইউ আর ব্যাক বিফোর দ্য রকেট ইজ লঞ্চড্।' পর দিন বেরিয়ে পড়লাম কার নিকোবরের পথে। সব কাজ করলাম। যে দিন ফিরব, দেখি, আমাকে নিতে আসা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের প্লেনটায় আমিই একমাত্র যাত্রী। পাইলট বললেন, ' মিস্টার পল, ক্যান ইউ সি, ইউ আর দি ওনলি প্যাসেঞ্জার, আ ভিআইপি। ' বুঝলাম সবই হয়েছে ডক্টর কালামের নির্দেশে। অত ব্যস্ত একজন মানুষ, কনিষ্ঠ এক ইঞ্জিনিয়ারের আবদার রেখে উৎক্ষেপনের ঠিক একদিন আগে আমাকে শ্রীহরিকোটায় ফিরিয়েএনেছিলেন। দেখা হতে বললেন, ' সো ইউ আর ব্যাক ইন টাইম, এনজয় দ্য থ্রিল নাউ '।"

মূল্য বোধের মাত্রা যে কোন্ উচ্চতায় পৌঁছতে পারে, এই ঘটনা তার সাক্ষী। একত্রিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন, এক সময়ের সহকর্মী ডঃ সুবীর চৌধুরী, কালাম সাহেবের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর বস-এর স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন : " সালটা 2003। ভরদুপুরবেলা। ডঃ কালাম সদ্য রাষ্ট্রপতির আসন অলংকৃত করেছেন। হায়দরাবাদে এক মারাত্মক গাড়ি য়্যাক্সিডেন্টে আমি শয্যাশায়ী। হঠাৎ আমার কোয়ার্টারের বেল বাজলো। দরজা খুলে আমার স্ত্রী দেখে যে, সমস্ত কোয়ার্টারটা ঘিরে নিয়েছে ব্ল্যাক কমান্ডো। আর ওই দশাশই চেহারার মানুষগুলোর ফাঁক দিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন ছোটখাট চেহারার একটি মানুষ। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান, এ পি জে আবদুল কালাম। এর পর কমান্ডোদের বললেন, ' পার্সোনাল ব্যাপারে আলোচনা হবে, তোমরা বাইরে থাক '। বলাই বাহুল্য যে উনি আমার ভয়ংঙ্কর য়্যাক্সিডেন্টের কথা জেনে এতটাই বিচলিত বোধ করেছেন যে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন আমাকে দেখতে। "  ভাবা যায় !!

দেশের নিরাপত্তার ব্যাপারে একই মানুষের অবস্থান একেবারে বিপরীত মেরুতে। তখনও উনি রাষ্ট্রপতি হননি। সংসদে নিউক্লিয়ার বিতর্কের সপ্তাহখানেক আগে ভূতপূর্ব সাংসদ শ্রীমতী কৃষ্ঞা বসু , কোন্  পক্ষ নেওয়া উচিৎ বা কি বলা উচিৎ প্রশ্ন করে কালাম সাহেবের পরামর্শ চান। ওঁনার খুব সহজ উত্তর ছিল " আপনার যা মত তাই বলবেন, শুধু মাথায় রাখবেন, যে শক্তিশালী সকলে তাকে সমীহ করে, দুর্বলকে কেউ পাত্তা দেয় না"। এরও কয়েক বছর আগে রাজস্থানের পোখরাণে, দ্বিতীয়বার পরমাণু পরীক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এক রিপোর্টারের প্রশ্নে শান্তিকামী কালাম যে জবাব দিয়েছিলেন, সেটা অবিকৃত তুলে ধরছি : " Abdul Kalam, a peace loving man, when led the team involved in India's second phase of nuclear explosion in 1998, was asked why he involved himself in the weapons of war. He answered coolly, ' I had no qualms in building such arsenal, I actually ensure peace of my country '."

প্রত্যেক মানুষের কথা বলার একটা ভঙ্গী আছে, কিছু মুদ্রাদোষ আছে, সময় যেটা কেড়ে নিতে পারে না। কালাম সাহেবেরও এমন একটি অভ্যাস ছিল। আবেগ অথবা মৃদু উত্তেজনার মুহূর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় উনি " funny guy ", এই ছোট্ট বাক্য বন্ধটি প্রায়ই ব্যবহার করতেন। 

ভারতবর্ষের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কর্ণধারদের অনেকের ভাষণে, ভাষার অলঙ্কারে সজ্জিত বহু প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ পাওয়া যায়। বাস্তবে সেটা কতটা রূপায়িত হয়, তার হিসেব করা খুবই কঠিন। কালাম সাহেবের বহিরঙ্গে বা ব্যবহারে চকচকে পালিশ ছিল না। তবে বাস্তব জগতের কথা মাথায় রেখে তিনি তাঁর জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছিলেন কিছু অনুশাসনকে কেন্দ্র করে এবং স্বল্পায়তনে সেগুলো প্রকাশ করতেন ছাত্র এবং ছাত্রসম সহকর্মীদের কাছে। এর মধ্যে কিছু কিছু উক্তিতে দার্শনিক কালামকেও খুঁজে পাওয়া যায়। এমনই এক ডজন উক্তির দৃষ্টান্ত পাঠকের কেছে তুলে ধরছি।

প্রথমবারের সাফল্যের পরও থেমে থেকো না কারণ, দ্বিতীয়বার তুমি ব্যর্থ হতেই পার। তখন কিন্তু সবাই অপেক্ষায় থাকবে। বলবে, প্রথমবারের বিজয় ছিল স্রেফ ভাগ্য।

বৃষ্টির সময় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে প্রতিটি পাখি। কিন্তু ঈগল বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পাড়ি দেয় মেঘের উপরে।

সাফল্যের সংজ্ঞা আমার কাছে যত বেশি দৃঢ় হবে, ব্যর্থতাকে ততই আমি পেছনে ফেলে যাব।

সাফল্যের আনন্দ পেতেই মানুষের জীবনে কঠিন সময়ের প্রয়োজন।

যদি তুমি সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে চাও, তাহলে নিজেকে আগে সূর্যের মতো দগ্ধ কর।

কাউকে পরাজিত করা অত্যন্ত সহজ, কিন্তু কঠিন হল কাউকে জিতে নেওয়া।

আমাদের সবার সমান প্রতিভা না থাকতে পারে। তবে প্রতিভার বিকাশ করার সমান সুযোগ আমাদের সকলের আছে।

কাজকে ভালবাসো, সংস্থাকে নয়। কারণ, তুমি জানো না,  তোমার সংস্থা কবে তোমার প্রতি ভালবাসা বন্ধ করে দেবে।

কৃত্রিম আনন্দের পিছনে দৌড়ানোর চেয়ে প্রকৃত সাফল্য পাওয়ার জন্য  নিজেকে উৎসর্গ করা ভাল।

চিন্তাশক্তি সেরা সম্পদ। জীবনের সেই সব উত্থান-পতনকে পাত্তা দিও না, যা তুমি পেরিয়ে এসেছ।

লেগে থাকা ছাড়া তোমার সাফল্য আসবে না। আর লেগে থাকলে ব্যর্থতা তোমাকে স্পর্শ করবে না।

ঘুমিয়ে যেটা দেখ, সেটা স্বপ্ন নয়। যেটা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না সেটাই স্বপ্ন।

মৃত্যুর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ভিতরের মানুষটা আমজনতাকে যে কতখানি ছুঁয়ে গেছিল , সেটা প্রত্যক্ষ  করলাম টেলিভিসনের পর্দায় যখন তাঁর মৃতদেহ দিল্লীতে এসে পৌঁছোলো। শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় অনেক রঙই মিশে গেছিল সেই আবেগভরা জমায়েতে। মনে রাখতে হবে যে পর পর দু-বছর এম টিভির সমীক্ষায় ইউথ আইকন নির্বাচিত হয়েছিলেন এই প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক। দিল্লীতে সেদিনের আবালবৃদ্ধবণিতার আবেগ উন্মাদনার জোয়ারে সেই ইতিহাস যেন প্রাসঙ্গিকতা পেল। প্রবীন রাজনীতিকরা বলেছেন যে মানুষের এই ঢল, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি, বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিনও মৃত্যুর পর জীবন নিয়ে এমন উদযাপন হয়েছিল। 



বিখ্যাত ছাত্র, বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বিখ্যাত শিল্পপতি কোনো কিছুরই দাবিদার নন আবুল পাকির জয়নালাবদীন আবদুল কালাম। বাপ-ঠাকুর্দার নামকে জড়িয়ে এত বড়ই তাঁর নাম। নামের বিশালত্বের সঙ্গে তাঁর কর্মযজ্ঞের বিশালত্বের বিশাল মিল। আসলে তাঁর খ্যাতি প্রতিকী। কিশের প্রতীক ? তপোশ্চর্যার প্রতীক নৈতিকতার প্রতীক মূল্যবোধের প্রতীক দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করার প্রতীক কর্মকুশলতার প্রতীক স্বায়ত্ব প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রতীক ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতীক সততার প্রতীক এবং অবশ্যই সফল নেতৃত্বের প্রতীক।

শেষ করার আগে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। ঊনিশশো আটানব্বই সালের মে মাস। কেন্দ্রে বি জে পি সরকারের নেতৃত্বে অটল বিহারী বাজপেয়ী। ওই মাসের বারো তারিখে রাজস্থানে, পোখরানের মরুভূমিতে একের পর এক পাঁচটি পরমাণু বোমা বিষ্ফোরণের পরীক্ষা চালানো হয়। বিস্ফোরণস্থলে ভাবা পরমাণু কেন্দ্রের পরমাণু বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠীর সঙ্গে কালাম সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। এর পর থেকেই ওনার নামের সঙ্গে পরমাণু বিজ্ঞানীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে উনিও কখনও মুখ খোলেননি। পেশাগত জীবনে পরমাণু সংক্রান্ত বিষয় ওনার গবেষণার অঙ্গ ছিল বলে আমার জানা নেই। এটুকুই জানি যে বাজপেয়ী সরকারের অনুরোধে, পোখরান কর্মকান্ডে পরমাণু বিজ্ঞানী ও এঞ্জিনিয়ারের ওই বিশেষজ্ঞ দলটিকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থে আবদুল কালাম একজন সফল টেকনোক্র্যাট এবং ভারতবাসীর গর্ব।


তথ্যসূত্র ;

Wings of fire- An autobiography, APJ Abdul Kalam with Arun Tiwari

Weapons of peace- Raj Chengappa

গত পনেরো বছরে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠিত বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনের নির্বাচিত অংশ


Tuesday, July 6, 2021

মোবাইল স্মার্টফোন ট্যাব ইন্টারনেট- ফিরে দেখা কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু কথা, কিছু ব্যথা

                              স্বপনকুমার দে


 ' না চাহিলে যারে পাওয়া যায় '- সে যদি আচমকা এসে পড়ে ! বছর কয়েক আগে এমনটাই ঘটেছিল আমার জীবনে। চাকরিতে অবসর নেবার পর কম্পিউটার ব্যবহারের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল। চাকরি জীবনের সিংহভাগ সময়টা এই যন্ত্রটার সঙ্গে ঘর করার পর, তথ্যসমৃদ্ধ দুনিয়ায় এটাকে ব্যবহার করতে না পারাটা যখন সভ্যতার সঙ্কট বলে মনে হয়েছে, ফলে নিজের অস্তিত্বকে কিছুটা অকিঞ্চিৎকর বলেও মনে করতে শুরু করেছি, ঠিক তখনই এমন একটি যন্ত্র আমাকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছিল। একটা ট্যাব। এটা ছেঁটে ফেলা নাম। আসল নাম ট্যাবলেট , শক্তিশালী একটি কম্পিউটার। আমার ছেলে-বৌ এই উপহারটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। হাজারো অপ্রাপ্তির দুঃখবোধ আমাকে কখনও নাড়া দেয়নি। কিন্তু এই পাওয়াটার মধ্যে একটা অন্য স্বাদের আনন্দ অনুভব করেছিলাম। শরীরটা বেশ কিছুদিন ভাল যাচ্ছিল না। যন্ত্রটা হাতে পেয়ে ক্ষণিকের জন্য মনটা রঙ্গিন হয়ে উঠেছিল, হয়তো মুখাবয়বের কিছু ভাবান্তর ঘটেছিল, ভাঙাচোরা মুখের চেহারায় বোধহয় একটা তৃপ্ত খুসীর বলয় তৈরি হয়েছিল। কারণ পরক্ষণেই ছেলে বলল ' অনেকদিন বাদে তোমাকে আজ বেশ চাঙা লাগছে, এখন থেকে তুমি এটা ব্যবহার করবে।'

চাকরিতে অবসরের পর এমনিতেই একটা মুক্তির স্বাদ। সঙ্গে এমন একটা হাইটেক সঙ্গী। মনে হ'ল পৃথিবীই আমার ঘরে, বরং বলব আমার বিছানায়। চাকরির শেষ দশকে মন দিয়ে হাতে কাজ করার সুযোগ ছিল না। পদমর্যাদায় যাঁরা একটা জায়গায় পৌঁছে যান, তাঁদের কারুরই হয় না। যাইহোক, তখন ট্যাবের মত এত উন্নতমানের যন্ত্র ভারতের বাজারে আসেনি। আকৃতিতে অনেক গুণ বড় ছিল। তবে কার্যকারিতার দিক থেকে যন্ত্রগুলোর মৌলিক তফাৎ বিশেষ কিছু ছিল না। সহকর্মীদের কাঁধে ভর করে যন্ত্রটিকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নেওয়া যেত। কাজেই সময়ের অভাবে, বিশেষ করে মনোনিবেশ করার মতো সময়ের অভাবে হাত লাগিয়ে কাজ করার তাগিদও তেমন অনুভব করিনি। কম্পিউটারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সচেতনভাবে একটা অপরাধ বোধও ছিল। অথচ অবচেতনে একটা আকর্ষণও অনুভব করতাম।

অবসর নেবার পর ভেবেছিলাম কম্পিউটার সংক্রান্ত ব্যাপারে নিজেকে আর জড়াবো না। কিন্তু সময়ের চাহিদা আর পরিস্থিতি আমাকে আবার এই জগৎটার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলল। আমলাতান্ত্রিক বা কর্পোরেট কায়দার অনাবশ্যক এবং স্বল্পস্থায়ী উচ্চাভিলাষ না থাকার ফলে চাকরির জীবনটা আমার বেশ শান্তিতেই কেটেছে। সেই কারণেই হয়তো চুলগুলো আজও মাথা ছেড়ে বিদায় নেয়নি আর তাতে তেমন পাক-ও ধরেনি। যাইহোক, চাকরিতে যতটুকু দায়ীত্ব ছিল তার স্বীকৃতি পেয়েছি। চাকরি জীবনটা আমি রীতিমতো উপভোগ করেছি; সহকর্মীদের সান্নিধ্য আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। সাদামাটা আত্মতুষ্ট মধ্যবিত্ত জীবন কাটানোর মধ্যে হঠাৎ এই যন্ত্রটার আবির্ভাবে মনে হ'ল চাকরির জীবনটা আবার ফিরে পেলাম। সবে নাড়াচাড়া শুরু করেছি, তখনও চালু করা হয়নি। প্রশস্থ পর্দার ওপর নিজের মুখের আবছা ছায়াটা দেখে অতীতের দিকে পিছু হেঁটে চললাম। মনে হ'ল দু-দশক আগে আমার চাকরি জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখছি; যখন আমার মতো হাতে গোনা ভাগ্যবান কিছু মানুষের আওতায় এই সুবিধেটা ছিল।

দীর্ঘ তেত্রিশ বছর কম্পিউটার ব্যবহার করেছি। চাকরির জীবনে নানান্ আঙ্গীকে য্ন্ত্রটিকে দেখার এবং ব্যবহার করার সুযোগ হয়েছে। কিন্ত এত ছোট চেহারায় গ্যাজেটটি আমার কাছে আগে ধরা দেয়নি। এতটা নিজের মতো করেও কখনও পাইনি।, যেন একটা চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া, বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার এক অদ্ভুত মিশেল, যেন জীবন্ত মানুষ। ছেলে-বৌ এর দেওয়া অমূল্য এই উপহার আমাকে নতুন অধ্যায় শুরু করতে সাহায্য করেছিল। লাগামছাড়া বিশ্বায়নের সঙ্গে অন্তত কিছুটা তাল রাখতে যন্ত্রটা আজ সকালের চায়ের মতোই অপরিহার্য। শরীর আগের তুলনায় অ-শক্ত হয়ে পড়ার ফলে অনেকটা সময় ধরে বসে কী-বোর্ডের বোতামগুলো টিপতে ধৈর্যচ্যুতি হতো। ক্ষুদ্রাকৃতি যন্ত্রটা বিছানায় শুয়ে বই পড়ার ঢঙে ধরে আঙ্গুল বোলাতে আদৌ তেমন অসুবিধে ছিল না; প্রথমের দিকে সামান্য আড়ষ্টতা থাকলেও, ব্যবহারে অভ্যস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে কবে যে সচ্ছন্দে এসে গেল টেরই পেলাম না। আসলে বহু বছরের অনভ্যাসের আড়ষ্টতা কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে সময় তো লাগবেই, অন্তত এই বয়সে !   কাজেই শরীর যতদিন পুরোপুরি জবাব না দিচ্ছে,  এটা একটা ভাল সঙ্গী হয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়ে যাবে বলে আশা করছি। আপাতত নেটের জানলা দিয়ে চলমান বর্তমানকে দেখতে শুধু ভালই লাগে না, বিছানায় বসেই বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেওয়া ছাড়াও আমার অনেক অফিসিয়াল এবং পছন্দের কাজ করে নিতে পারছি। 

ইন্টারনেট- এক কথায় যার উপস্থিতি ভৌগোলিক পরিসরের সাবেকি ধারনাকে মানুষের মন থেকে মুছে দিতে পেরেছে। এ-ব্যাপারে সামান্য কিছু বলে নিতে চাই। প্রত্যেক সৃষ্টির পেছনে ধ্রুবতারার মতো একটা পথপ্রদর্শক থাকে। তাঁরা নেপথ্যেই থেকে যান। সুদূর জেনিভার সার্ন গবেষণাগারে সেই সময়ে কর্মরত, এই ইংরেজ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, টিম বার্নার্স লী এমনই একজন বিজ্ঞানী , 1989 সালে প্রকাশ করলেন তাঁর গ্লোবাল হাইপারটেক্সট প্রজেক্ট। এখান থেকেই শুরু হ'ল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা www । ওয়েবের হাত ধরে যাবতীয় গবেষণা এখন আর ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে নেই। শুধু তাই নয়, আজ ওয়েবের বানিজ্যিক ব্যবহার নিরানব্বই শতাংশের বেশি। এখানে একটা কথা বলে রাখা খুব জরুরি বলে মনে করছি। কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে এই গূঢ় তত্ত্বটি তলিয়ে দেখার সুযোগ নেই। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মৌলিক আবিষ্কারের ঘটনাগুলোকে অনুধাবন করলে বুঝতে পারা যায় যে, উন্নত টেকনোলজির যে সুবিধেগুলো, ক্ষেত্রনির্বিশেষে আজ আমরা ভোগ করছি, সেগুলো বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণার ফসল। পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীকুল এক লহমায় বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদান করেন ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে। লী সাহেবর মস্তিষ্কপ্রসূত হাইপারটেক্সট্ হ'ল, পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইউনিভার্সিটি এবং বিজ্ঞান গবেষণাগার গুলোর বৈজ্ঞানিকদের প্রাসঙ্গিক তথ্য আদান-প্রদানের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং তথ্য ভান্ডারের পারস্পরিক যৌথ প্রক্রিয়ার এক অভূতপূর্ব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। শুরুতে শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিকদের চাহিদা মেটাবার জন্য সৃষ্টি হলেও, ব্যবহারিক ক্ষেত্রের বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলতে বিশেষ সময় লাগেনি। টিম বার্নার্সের ভাবনার ফসলকে প্রযুক্তির মোড়কে ভরে হাইপারটেক্সটের ব্যবহার আজ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে যে কতটা প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা ইন্টারনেট ব্যবস্থার বাণিজ্যিকরণের সাফল্যে বুঝতে পারা যায়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জাল আজ সারা বিশ্বকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে হাইপারলিঙ্কের সূতো দিয়ে। হাইপারলিঙ্ক ! সেটা কি ?!  হাইপারলিঙ্ক হ'ল একটা বড় টেক্সটের জায়গায় জায়গায় এক একটা শক্তিশালী গ্রন্থী যা চিহ্নিত করার জন্য অন্য বর্ণে রঞ্জিত করে রাখা হয়। এই রাঙা শব্দগুলোর ওপর মাউস ক্লিক করলে বা আঙুলের ডগা দিয়ে স্পর্শ করলে পৃথিবীর যে কোনো সার্ভারে রাখা প্রাসঙ্গিক তথ্যকে, তা টেক্সট্, গ্রাফিক্স, অডিও ভিডিও- যাই হোক না কেন, গেঁথে ফেলে গ্রাহকের কম্পিউটারে পৌঁছে দেয়। কাজেই রাশি রাশি খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার কাজটা অর্থাৎ, যে কোনো তথ্যের যাবতীয় প্রাসঙ্গিক অংশের হদিস পাওয়া আর শ্রমসাধ্য বা সময়সাপেক্ষ বলে মনে হবে না। শুধুমাত্র তথ্যের ব্যাপারে সচেতনতা দরকার। অর্থাৎ কি খুঁজছি, কেনই বা খুঁজছি সেটার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যবহারের অভ্যাসে সেই অভিজ্ঞতা অচিরেই হয়ে যাবে।

কিছুদিন আগেও ইন্টারনেট মানে ছিল কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন, মোডেম জাতীয় বিভিন্ন যন্ত্রের এক বিচিত্র রসায়ণ। কিন্তু আজ স্মার্টফোন আর ট্যাবের মধ্যে দিয়ে বাড়ির বৈঠকখানায় এসে হাজির হয়েছে এবং আগের তুলনায় নামমাত্র খরচে। তার মানে ওইগুলোর কি আজ প্রয়োজন নেই ! না ওই কাজগুলোই হয় না ? সবই হয়, ক্রমবর্ধমান উন্নততর টেকনোলজির ফলে ওই যন্ত্রাংশগুলোকে আর আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। হার্ডওয়্যার এত আঁটোসাটো হওয়ার ফলে হার্ডওয়্যারের বিশ্বস্ততাও এক লাফে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে জুড়ে থাকা হার্ডওয়্যারের প্রত্যেকটা জোড়, বিশ্বস্ততার দিক দিয়ে একেকটি দুর্বল লিঙ্ক। সোজা কথায়, জোড়া দেওয়া কোনো জিনিসই তেমন মজবুত হয় না।

প্রথম যুগের কম্পিউটার থাকতো ঘর জুড়ে। সেখান থেকে জায়গা করে নিল টেবিলে, পরবর্তী ধাপে টেবিল থেকে কোলে, আর আজ কোল থেকে হাতের মুঠোয় উঠে এসেছে। বিছানায় শুয়ে চা খেতে খেতেই দিব্যি কাজ সেরে নেওয়া যায়। আরামবিলাসি বাঙালিদের তো পোয়াবারো। একটা ছোট্ট গল্প মনে পড়ে গেল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এক ইংরেজ মহিলা বাঙলায় পৌঁছে বাঙালিদের ভাবগতি দেখে মন্তব্য করেছিলেন "এদের কাছে দাঁড়ানোর থেকে বসা ভাল, বসার পরেই মনে করে বরং শুয়ে পড়াই শ্রেয়" । কিন্তু বিশ্বনিন্দুকেরাও বাঙালির সৃজণশীলতার গুণকে অস্বীকার করেন না। কাজেই এই ব্যবস্থায় অলস বাঙালি নিশ্চিন্তে খাটে শুয়ে বা বসে চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে স্মার্টফোনের পর্দায় আঙুলের ডগা বুলিয়ে যার সঙ্গে খুসী দেদার আড্ডা জমাতে পারে বা নেট সার্ফ করে প্রয়োজনীয় তথ্যের অনুসন্ধান করতে পারে। কৃপণ বাঙালির সব সময় চেষ্টা, বাজারে গিয়ে সস্তায় কি করে সবচেয়ে ভাল জিনিসটা কিনে নেওয়া যায়। ইন্টারনেটের এই পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা বাঙালির কাছে আজ এক আদর্শ ব্যবস্থা। ইন্টারনেট ব্যবহারে খরচের অঙ্কটা এখন আর হাজার হাজার নয়,  সাধারণ ব্যবহারের জন্য, আমার মতে যেটা যথেষ্টই কম ; কয়েক'শ টাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। কাজেই আজ এই ইঁদুর দৌড়ের যুগে ইন্টারনেটের ব্যবহার, সৃজণশীল অলস এবং আমার মতো কৃপণ বাঙালির কাছে প্রতিযোগিতার বাজারে টিঁকে থাকার একটা বাড়তি সুযোগ বইকি।

গ্লোবালাইজেসন কথাটা গত এক দশকে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। আমার মনে হয় আসল গ্লোবালাইজেসন হয়েছে একমাত্র তথ্যের আধিকারে, ইন্টারনেটের হাত ধরে। হাতের মুঠোয় কম্পিউটার আর অন্তরীক্ষে স্যাটেলাইটের সুবিধে নিয়ে ইন্টারনেটের জাল, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, সারা পৃথীবীকে আজ বেঁধে ফেলেছে। ফলে নেট আজ সবার নাগালে- গণতন্ত্রের এক আদর্শ উদাহরণ। এ গণতন্ত্র, সংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় (!) মানুসের জাত-ধর্ম বিচার করে এবং নিয়মগুলো বাঁকিয়ে চুরিয়ে নিজেদের সুবিধেমতো খোপে ভরে নেওয়া গণতন্ত্র নয়। এ হ'ল সত্যিকারের গণতন্ত্র- তথ্যের অধিকার, তথ্য পাবার গণতন্ত্র। শেষ পর্যন্ত এই পথেই যে মোক্ষলাভ হবে, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না, কারণ নেট ব্যবহারের সামাজিক কুফলের দিকটাও আজ বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে। পরে আলোচনায় আসছি। তবে নেটের গণতান্ত্রিক চরিত্রটা প্রশ্নাতীত।

যে কম্পিউটার যাত্রা শুরু হয়েছিল জটিল হিসেব নিকেশের সুবিধার জন্য, আজ যোগাযোগ, তথ্য বিনিময়, মনোরঞ্জন প্রভৃতি কাজেও এক অপরিহার্য মাধ্যম। এটা এখন আর শুধুমাত্র বিজ্ঞানী বা পেশাদারদের জন্য নয়, আমজনতার জন্যও বটে। আজকের প্রজন্মের কম্পিউটার সিস্টেমগুলো তাই প্রায় জনমুখী। এই প্রচেষ্টার একদিকে যেমন রয়েছে মাউস, টাচস্ক্রীন আর গ্রাফিক্স আইকনের সাহায্যে কী-বোর্ড ছাড়াই সার্ফ্ করার সুবিধে, অন্যদিকে সত্যিকারের জনমুখী করার তাগিদে ভাষা প্রযুক্তির প্রয়োগ। ফলে ইংরেজি ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে আজ। ইউনিভার্সাল কোড বা ইউনিকোড আজ প্রায় সারা পৃথিবী স্বীকৃত। এর আওতায় রয়েছে বাইশটি ভারতীয় বর্ণমালা সহ একশ তেইশটি বর্ণমালা সমেত প্রায় দেড় শতাধিক ভাষা। দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেলকোডও এরই অন্তর্ভুক্ত। এইসব ভাষার জন্য তৈরি হচ্ছে নানান্ ধরনের সাপোর্ট য়্যাপস্ । সেগুলোর সাহায্যে কম্পিউটার ছাড়াও ট্যাবলেট আর স্মার্টফোনেও মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগ খুলে যাচ্ছে অজস্র ব্যবহারকারীর সামনে। তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার তথ্যভান্ডার আর সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁকে নেবার জন্য শক্তশালী সার্চ ইঞ্জিন। তবে মাতৃভাষা ব্যবহার করার প্রযুক্তিগত সুবিধে যখন উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে, তখন শহুরে বা আধা শহুরে নতুন প্রজন্মের মনোভাবে সেটার প্রতিফলন আদৌ দেখা যাচ্ছে না। শুধু নতুন প্রজন্মই বা বলি কেন, আমার প্রজন্মের মানুষরাও কম যান না। কারণটা সহজেই অনুমেয়। প্রথমত, মাতৃভাষায় অক্ষরের সংখ্যা অনেক বেশি। এছাড়া যুক্তাক্ষরের কচকচানি, আ-কার, এ-কার, য-ফলা, রেফ্ ইত্যাদির নানাবিধ ঝামেলা। একটা সঠিক উচ্চারণের জন্য কী-বোর্ডের একাধিক বোতাম টেপা, ফলে ধৈর্যচ্যুতি ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব ঝামেলা মেনে নিলেও, মাতৃভাষায় বানান্ ভুল হবার সম্ভাবনাও প্রবল। আজকের অসহিষ্ণু পৃথিবীতে এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে ভাবার কারো এত সময় নেই। চুলোয় যাক ভাষা। ভাবটা হ'ল রোমান স্ক্রিপ্টে বেশ তো হচ্ছে। নাই বা হ'ল বাংলা বা জার্মানের মতো ফোনেটিক ভাষা। যাইহোক, এসব কারণে রোমান স্ক্রিপ্টে লেখা বাংলায় এক জগাখিচুড়ি শব্দভান্ডার তৈরি হয়েছে। জেন-ওয়াইদের মধ্যে এটা প্রায় একটা স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছে গেছে। একটা কথা বলে এই প্রসঙ্গে ইতি টানবো। আমাদের বাংলা ভাষা রীতিমতো গবেষণা করে তৈরি হয়েছিল বলেই ফোনেটিক। আর মাতৃভাষায় লেখার জন্য একটা প্যাশন থাকে, তাছাড়া মাতৃভাষা সম্বন্ধে গৌরববোধও প্যাশনের একটা অবশ্য সর্ত।

ইন্টারনেট ঘিরে হেনস্থার ঘটনা আজ আর কারো অজানা নয়। নতুন প্রজন্মের কাছে ফেসবুক বা অর্কুট খুবই জনপ্রিয়। এই সোস্যাল  নেটওয়ার্ক সাইটগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতি মানুষের সামাজিক জীবনে বিভীষিকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ পারলে এখন নিজেদের জাগ্রত মুহূর্ত ক্যামেরা বা ফেসবুক বা হোয়াটসয়্যাপ group -এ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আদিখ্যেতা আর কাকে বলে ! ছেলে-মেয়েরা তো বটেই, বুড়ো খোকা-খুকুরাও কম যায় না। সাধারণ মোবাইল, যা হয়তো  দুদিন বাদে মিউজিয়ামের সেলফে থাকবে, সেগুলো ব্যবহার করে যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রেম প্রেম খেলা চলতো, এস এম এস বা মিসড্ কল চালাচালি করে। আজ সেটা আরও জীবন্তভাবে হচ্ছে ফেসবুক ব্যবহার করে। এই পর্যন্ত অন্যায়ের কিছু নেই। বরং বলব এটাই যৌবনের লক্ষণ। মুস্কিল হ'ল যখনই এই প্রেমালাপে তাল কেটে যাচ্ছে, তখনই শুরু হয়ে যাচ্ছে ব্ল্যাকমেল করার পালা। পুরুষ শাষিত সমাজে যা সাধারনত শুরু হয় ছেলেদের তরফ থেকে। মানুষ যতই আধুনিক হোক না কেন, পৃথিবী জুড়ে আজও মেয়েদের কালিমালিপ্ত করা অনেক সহজ। যাইহোক, সাধারণ হুমকির কায়দা হ'ল,  দুর্বল মুহূর্তের কথোপকথন সোস্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া। পরের ধাপ আরও খানিকটা উগ্র, বিকৃত করা ছবি আপলোড করা। এখন তো আবার ফোনের ক্যামেরা চালু করে আত্মহত্যার ছবিও চালাচালি চলছে সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার  করে। এই ধরনের অসভ্যতাগুলোর পোষাকী নাম হ'ল ' সাইবার বুলিয়িং ' এবং এর শিকারের তালিকা দিনে দিনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পরিণতি, কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতীদের মধ্যে আত্মহত্যা ও মানসিক অবসাদের প্রবণতা। সোস্যাল মিডিয়া জন্ম দিচ্ছে হরেক রকমের কু-প্রবৃত্তি। মনে পড়ে যায় শতাধিক বছর আগে করা উইনস্টন চার্চিলের সেই মহামূল্যবান উক্তিটির।ইওরোপের শিল্প বিপ্লবের গতির অভিমুখ দেখে হয়তো তাঁর এমন একটা ধারণা হয়েছিল- " It would be a tragedy if the sunrise of technology were to be the sunset of mankind. " -《প্রযুক্তির বিষ্ফোরণ যদি একদিন মানবজাতির সভ্যতার সংকটের কারণ হয়, তাহলে তার থেকে পরিতাপের আর কিছু নেই》এর কয়েক বছর পরেই আইনস্টাইন  প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন একটু অন্য ভঙ্গিমায়। It has become appalingly obvious that our technology has exceeded our humanity  《প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী ভয়াবহভাবে মনুষ্যতাকে গ্রাস করছে》. আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশে পৌঁছে বুঝতে পারা যাচ্ছে উক্তিগুলোর প্রাসঙ্গিকতা, যা পরিণতি পেয়েছে খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া সামাজিক পরিবেশে। কি অসামান্য অবক্ষয় সমাজের ! খবরের কাগজ আর টেলিভিসনের নিউজ চ্যানেল গুলোই তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। কাজেই স্মার্টফোনের ব্যবহারে আমরা যে খুব ভাল আছি তা বোধহয় নয়। আসলে বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্রমোন্নতি মানুষের মধ্যে কলকব্জার আনুগত্য অজান্তে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে নির্বিকারত্ব, আবেগহীনতা এমন কি নিজের প্রতি ভালবাসাহীনতার প্রকাশ ঘটেছে। ফল, চরম অবসাদের শিকার। স্মার্টফোন বাজারে আসার পর কমবেশি সকলেই, বিশেষ করে জেন ওয়াই গোষ্ঠী মোবাইল জ্বরে আক্রান্ত এবং ভাইরাসের মতো এটা একটা সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মোবাইল মগ্নতায় তারা ট্রামে বাসে লোকাল ট্রেনে, বোধহয় প্লেনেও, এমন কি ঘরে বসে সবাইকার সামনে নিঃশব্দে টাচস্ক্রিনে আঙুল ঠেলাঠেলি করে চলেছে। ফলে মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে অল্প বয়সীদের মধ্যে স্মৃতিশক্তির অভাব দেখা যাচ্ছে। স্মার্টফোনে প্রতিনিয়ত সংবাদ তথ্য রসিকতা অডিও ভিডিও এবং মন্ত্যব্যের ঝড় বোধহয় স্মৃতিশক্তিধারক মস্তিষ্ককোষগুলোকে ব্যস্ত রাখছে। ফলে একদিনের পুরোনো ঘটনাও আর মনে থাকছে না মানুষের। নামী প্রতিষ্ঠানের তৈরি য়্যাপসের বন্যা তাদের স্বপ্নের পণ্য তুলে দিচ্ছে গ্রাহকদের হাতে, যার সিংহভাগই জেন ওয়াই। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আর গুণমানের লাগাতার দৌড়ে পণ্যগুলো হয়ে উঠছে উন্নত থেকে উন্নততর। হোয়াটসয়্যাপ, ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় য়্যাপসগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাতদিন ফরোয়ার্ডেড ম্যাসেজের স্রোত- গুড মর্নিং গুড নাইট ছাড়াও অগণন রঙ্গ রসিকতা অডিও ভিডিও ইত্যাদি ইত্যাদি।

Netiquette - সোজা কথায়, নেট + এটিকেট , অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারে শিষ্টাচারের নিদান বা ইন্টারনেট ব্যবহারে যথেচ্ছাচার না করা। নেটিকেট কথাটা থেকে কিছুটা ধার নিয়ে নিজের মতো করে একজোড়া শব্দবন্ধ ব্যবহার করছি। এটাকে আমি মোবাইলফোন এটিকেট আখ্যা দিচ্ছি।  এ ব্যাপারে দু-চার কথা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর পর যথেচ্ছাচারের ব্যাপারটায় আসব। মোবাইলফোন এবং এটিকেট , দুটোই ইংরেজি শব্দ। প্রথমটির অর্থ 'চলমান ফোন আর দ্বিতীয়টি হ'ল 'শিষ্টাচার'। যন্ত্রের তো আর হাত-পা নেই যে চলতে পারবে। কাজেই এটা ধরে নেওয়া আদৌ অসঙ্গত নয় যে ব্যবহারকারী নিজের সেল ফোনটি তাঁর নিজের কাছে বা কাছাকাছি রাখবেন যাতে বাজলে শুনতে পাওয়া যায়। আশ্চর্য লাগে যখন দেখি বহু মানুষ এ ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তাঁদের ফোন তাঁদের ধারেকাছে থাকে না বা ফোন বাজলেও তাঁরা ধরেন না। এটা এক ধরনের অশিষ্টাচার। আজকের যুগে শহুরে মানুষের প্রায় প্রত্যেকে গড়ে দেড়খানা মোবাইল ফোন রাখে।কিছুদিন আগে খবরের কাগজে পড়লাম ভারতে সেলফোনের সংখ্যা ষাট কোটি, জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। কিন্তু এদেশের চল্লিশ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে। এই তলার কুঠুরির মানুষগুলো , যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা , তাদের মোবাইল না থাকাই স্বভাবিক। দেড়খানা ফোনের হিসেবটা বোঝা গেল তো ? মোবাইল না ধরার কারণই হ'ল, সহজলভ্য যে কোনো জিনিসের শেষমেষ বিশেষ কদর থাকে না। এদিকে যোগাযোগ ব্যাপারটা সহজলভ্য হয়ে যাবার ফলে মানুষের প্রত্যাশাও এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। না হবার বিশেষ কারণ আছে কি ? উচ্চশিক্ষিত দুজন মানুষের মোবাইল বারংবার বেজে গেলেও তাতে গুরুত্ব না দেবার অভ্যেসটা নিজে চোখে দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি। ঘটনার প্রেক্ষিত না বলার লোভটা সম্বরণ করতে পারছি না। একজন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার বাড়ি গেছি। আড্ডা চলছে। দশ হাত দূরে পড়ার টেবিলে রাখা ফোন হঠাৎ বেজে উঠল। প্রায় বার কুড়ি বেজে থেমে গেল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ' ধরলে না? ' - 'এখন ভাল লাগছে না, পরে মিসড্ কলের লিস্ট দেখে কথা বলে নেব'। ' কিন্তু প্রয়োজনটা যদি জরুরি হয় ? বন্ধু কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেল। না শুনতে পেয়ে যাঁরা না ধরেন, তাঁরা ক্যাজুয়াল, তবে এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন নন্। কিন্তু এক্ষেত্রে এটা ছিল সামাজিক অপরাধ। আরও একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ভদ্রমহিলা আমার স্ত্রীর স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তাঁর তিনটি মোবাইল। তিনটিতেই বার কতক চেষ্টা চালিয়ে না পেয়ে হতাশ হলেন আমার স্ত্রী। প্রায় সপ্তাহধিককাল বাদে তিনি ওই মিসড্ কল লিস্ট দেখে, এতবার ফোন করার উদ্বেগে(!) আমাদের কুশল জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। উদ্বেগই বটে ! তাই না ? এই ধরনের ব্যাপারগুলো আমার মতো মানুষের কাছে যতটা বিরক্তিকর ততটাই ব্যাথার। ইচ্ছে সত্বেও, ফোন বাজার শব্দ না পেয়ে ফোন ধরতে না পারার ঘটনা স্মার্টফোনধারীদের অনেকাংশে বেশি। কারণ স্মার্টফোনের আওয়াজ ক্যাবলা ফোনের তুলনায় অনেকটাই ক্ষীণ। কারণটা বলে এই প্রসঙ্গে ইতি টানব।

সুবিধের দিক দিয়ে স্মার্টফোন বা ট্যাব আর সাধারণ মোবাইল ফোনের তফাৎ স্পষ্ট, বরং বলা ভাল কোনো তুলনাই চলে না। তবে শুধুমাত্র কথা বলা বা এস এম এস বা রিমাইন্ডার সেট করা- এইসব মামুলি কাজের জন্য সাধারণ সেলফোনের জুড়ি নেই, অন্ততপক্ষে দুটো কারণে। কথা বলার ব্যাপারে মোবাইলের নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি এবং ঘন ঘন চার্জ দিতে হয় না। একই রকম ব্যবহারের জন্য স্মার্টফোনের চার্জ খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। কারণ স্মার্টফোনে গুগল, ই-মেল, হোয়াটসয়্যাপ, অভিধান, ম্যাপ ইত্যাদি যাবতীয় য়্যাপসের সংখ্যা এত বেশি, যে সেগুলোকে সদাজাগ্রত রাখতে ব্যাটারি থেকে সর্বদাই শক্তিক্ষরণ হয়ে চলেছে। ব্যাটারির  কোনো বিরাম নেই। এছাড়া মাঝে মাঝেই কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া বা ফোন কেটে যাওয়ার ঘটনাও খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, বিশেষ করে অ-নামী কোম্পানির সস্তার স্মার্টফোনগুলোতে। এর কারণ হ'ল অগুন্তি য়্যাপসের দিকে একসঙ্গে নজর দিতে গিয়ে যন্ত্রের সফটওয়্যার গুলিয়ে ফেলে। একে কম্পিউটারের পরিভাষায় বলা হয় সিস্টেম ক্র্যাস্।

টেকনোলজি নির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে, যুগপোযোগী করে তুলতে হলে, কম্পিউটারের যথোপযুক্ত ব্যবহার জানা অত্যন্ত জরুরি। আজকের দিনে এর হয়তো কোনো বিকল্প নেই, শহুরে মানুষের জন্য বটেই। ফিউচার ইজ ডিজিটাল- আধুনিকতার অন্যতম প্রধান শর্ত হল গতি। সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই যন্ত্রটিকে দিয়ে সাধারণ কাজ করিয়ে নেওয়া আদৌ এমন কিছু ব্যাপার নয়। শিক্ষিত সমাজের যাঁরা এটা পারেন না, তাঁদের নিজেদেরকে ব্রাত্য মনে করার কোনো কারণ নেই। সাধারণ কাজে ব্যবহারের জন্য মেধার ব্যাপারটা গৌণ; দক্ষতা অর্থাৎ স্কিল অর্জন করা অনেক বেশি জরুরি। অভ্যাসের বা অনুশীলনের ফলেই দক্ষতা তৈরি হয়। কিন্তু আমার প্রজন্মের বহু মানুষের সেই মাইন্ড সেট নেই, তাঁরা অনভ্যাসের আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতে পারেন না। ভাবখানা, কি হবে এ বয়সে, বেশ তো চলে যাচ্ছে গোছের। চাকরিতে অবসরের পর থেকে প্রাতর্ভ্রমন দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিগত চোদ্দ বছরে পদমর্যাদা নির্বিশেষে বহু মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। অবাক লাগে যখন দেখি অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্পোরেট  এক্সিকিউটিভ, যাঁরা মুখেই মারিতং জগৎ- ইনিয়ে-বিনিয়ে চাকরি জীবনের পার্টি করা, ক্লাবে যাবার গল্প ফাঁদেন, তাঁদের কাছে কম্পিউটার ব্যবহার করাটা ভীষণ অস্বস্তির। তাঁরা কেউ কেউ মোটামুটি হোয়াটসয়্যাপে আটকে আছেন, বাকিরা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন স্রেফ কথা বলার জন্য, অনেকে সেটাও করছেন না। আসলে জানার ক্ষিদেটা আমার প্রজন্মের শিক্ষিত সমাজের থেকে মোটামুটি উবে গেছে। মনে রাখতে হবে সময় যতই এগোবে, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, (এ আই) সমেত আরও উন্নত মানের কম্পিউটার উন্নততর য়্যাপসের ডালি সাজিয়ে মানুষের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলবে; কারণ টেকনোলজি স্থবির নয়। অতএব নিজেকে তৈরি করুন বন্ধু। একটা খুব সহজ টিপস্ দিচ্ছি। বিশ্বায়ণ পরবর্তী আগ্রাসী চাহিদার বাজারে, যেখানে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের মেধা তালিকার শেষের দিকের ছাত্র-ছাত্রীরা পাড়ার প্রাইভেট কলেজ থেকে ডিগ্রী নিয়ে দিনরাত এক করে অনুভূতিহীন যান্ত্রিকতার সঙ্গে দেশ-বিদেশের ক্লায়েন্টদের চাহিদা মিটিয়ে চলেছে, সেখানে কি কোনো স্পেশাল এক্সপার্টাইজের প্রয়োজন আছে ! কিছুটা ইংরিজি ভাষা জানাই যথেষ্ট।

যে কোনো চিন্তা মাথায় এলেই একটা সার্চ করে দেখুন। প্রথমবারেই হয়তো নির্ভুল উত্তর পাওয়া গেল না, তবে কিছুটা এগোনো গেল তো বটেই।কারণ অসমাপ্ত উত্তরের মধ্যেই মোটামুটি পরের সার্চের ইঙ্গিত থাকবে। ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে অজানা অনেক জিনিস আঙুলের ডগায় এসে যাবে। কম্পিউটারের দামও যেমন কমে যাচ্ছে, ব্যবহারও দিনে দিনে তেমনই সহজ হয়ে উঠছে। প্রয়োজন শুধুমাত্র একটু জিজ্ঞাসু মনের। হোমরা-চোমরা বরিষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার যথেষ্ট সীমিত, পরিধি আরও ছোটো। এর প্রাথমিক কারণ কালচার শক্।নেট সার্ফিং-য়ে স্বচ্ছন্দ হলে চিন্তাভাবনাগুলো অনেক সচল থাকে। ফলে আজকের টেক-স্যাভিদের যুগে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে নিজেকে সবাক রাখা যায়। আজকের প্রজন্মের কাছে নিত্য নতুন অনেক কিছু জার্গন শুনি, যেগুলো সেই সময় পর্যন্ত আমার কাছে আপরিচিত। সময় করে পরে নেট ঘেঁটে সেগুলোর অর্থ নিজের মতো করে বুঝে নিতে পারি।

ব্যথার জায়গা অনেক। নীল-তিমির (blue whale) মত মারণ খেলা কচি-কাঁচাদের নাগালে। কোকেন ব্রাউন সুগারের নেশার মতো এই খেলা কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গুগলের সমীক্ষা জানাচ্ছে, নীল তিমির আসক্তিতে পৃথিবীর প্রথম পঞ্চাশটি শহরের তেত্রিশটিই ভারতবর্ষে। ভারতের মধ্যে পয়লা নম্বরে কোচি, এর পরেই কলকাতা। এ ব্যাপারে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে অসাড়তা তর্কাতীত। একমাত্র টেলিভিসনের পর্দায় সান্ধ্যকালীন তর্কপ্রতিতর্কের আসরেই এটা সীমাবদ্ধ। এদিকে নীল তিমি কামড়ানোর দগদগে ঘা মিলিয়ে যেতে না যেতেই এসে গিয়েছে মোমো চ্যালেঞ্জ, যেটার  প্রতীক এক কিম্ভূতকিমাকার মুখ। চিন্তার বিষয়, কৈশোরে ছেলেমেয়েদের এতরকম দৈহিক এবং মানসিক পরিবর্তন হয়, যে তারা কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা নানান্ অন্তর্দ্বন্দে ভোগে এবং এগুলোই হ'ল মনস্তাত্বিক ফাঁকের যায়গা। এই ফাঁকের মধ্যে দিয়েই ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা চলে নীল-তিমি বা মোমো জাতীয় মনোবিকলনের খেলা, যার পরিণতি মৃত্যু। নিত্য নতুন য়্যাপস্, হাল আমলের যন্ত্রপ্রযুক্তি আর গতিশীল যোগাযোগ মাধ্যমকে ভর করে কাঁচা বয়সের ছেলেমেয়েদের হাতে চলে এসেছে। সোস্যাল মিডিয়াতে এ কিরকম চূড়ান্ত অসামাজিক এবং অশিষ্ট আচরণ ! অভিভাবকদের বন্ধুভাবাপন্ন  এবং যুগপৎভাবে তীক্ষ্ণ নজরদারি ছাড়া এসব মারণ খেলা থেকে কিশোর-কিশোরীদের মুক্ত করা সম্ভব নয়।

সোস্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় সারাক্ষণ আমরা বসবাস করলেও নিজেদেরই অজান্তে ইন্টারনেটে ক্রমাগত ঘটে চলেছে এক মহাযুদ্ধ। বিস্ময়কর এই মহাজগতের এই সব থেকে সিক্রেট যুদ্ধের নাম ডক্সিং, এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। স্পাই, চোর, সন্ত্রাসবাদী, পারস্পরিক শত্রুরাষ্ট্র, হ্যাকার- এরকম হাজারো চরিত্র এই ডক্সিং মহারণের যোদ্ধা। যখনই কোনো প্রতিপক্ষের গোপন তথ্য, বিশেষ প্রযুক্তি আর হ্যাকিং-য়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁস করে তাকে বিপদে ফেলা হয়, অথবা প্রকৃত পরিচয় কিংবা গোপন কাজকর্ম ফাঁস করে দিয়ে চরম বেইজ্জতি করার কাজে সাফল্য পাওয়া যায়, তাকেই বলা হয় ডক্সিং। সাইবার দুনিয়া জুড়ে দেখা যাবে ছদ্মনাম, ছদ্ম পরিচয়, ছদ্ম য়্যাকাউন্ট ইমপার্সোনেশন ইত্যাদি। ডক্সিং হ'ল বিশ্বের ত্রাস, সন্ত্রাসবাদী সঃস্থা আই এস আই এসের সবথেকে আধুনিক অস্ত্র। 

অনেকটা বলা হ'ল। অনেক ফাঁকফোঁকরও থেকে গেল; কারণ ইনফর্মেশন টেকনোলজি ঘিরে পরিবর্তন অব্যাহত। এখানে বাজারের একটা বিশাল ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজ বাজার যেটা গোগ্রাসে গিলছে, কাল বা পরশু সেটা প্রত্যাখ্যান করতেই পারে। এই ধারাতেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প গত দুদশক ধরে শ্রীবৃদ্ধি করে চলেছে, মানুষের উপকারে আবার অপকারেও। রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন- "To every man is given the key to the gates of heaven. The same key opens the gates of the hell" 《ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে স্বর্গের দুয়ার খোলার জন্য একটি চাবি দিয়েছেন। ঐ একই চাবি নরকের দরজাও উন্মুক্ত করে》। সম্ভবত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে 'ম্যানহাটন য়্যাটম বোমা প্রকল্পে' তিনি ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু জাপানের হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার বিধ্বংসী নারকীয় লীলায় ব্যথিত হন। কারণ মৌলিক বিজ্ঞানের ওই একই আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রিত ফিসন প্রক্রিয়া পরমাণু চুল্লিতে বিপুল শক্তি উৎপাদন করে, যা মানব সভ্যতার অগ্রগতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। মনে রাখতে হবে একটা দেশের উন্নতির প্রধান সূচকটি হ'ল সেই দেশ মাথাপিছু কতটা শক্তি খরচ করে। 

আসলে কোনো কিছুরই বেলাগাম ব্যবহার আদৌ ঠিক নয়। যে স্মার্টফোন নীল তিমির মতো মারণ খেলার উৎস, সেটা ব্যবহার করেই স্কুলের শিক্ষকদের হাজিরা খাতা দৈনিক নিমেষে প্রশাসনের নজরে আনা হচ্ছে। ওই একই স্মার্টফোন আবার বাড়ির বিভিন্ন কলকব্জা বা ব্যবহারযোগ্য গ্যাজেট, যেমন ফ্রিজ, এসি, দরজার ইলেকট্রিক লক, হিটার ইত্যাদি ইন্টারনেটের গেরোয় বেঁধে পরিচালনা করছে। ইন্টারনেট শুধুমাত্র তথ্য আদান-প্রদানেরই বাহন নয়, তা ব্যবহার হচ্ছে জড় বস্তুর নিয়ন্ত্রনের কাজে। দুটো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়ে এ প্রশঙ্গ শেষ করব। প্রচন্ড গরমের দিনে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথেই শোবার বা বসার ঘরের এসি চালু থাকলে মন্দ হয় না। এই ব্যবস্থা আজকে ইন্টারনেট টেকনোলজির আওতায় এবং রীতিমতো বাস্তব। নিউক্লিয়ার পরিবারের যুগে কর্তা-গিন্নি দুজনেই চাকরি করতে বেরোচ্ছেন। তাড়াহুড়োতে বাড়ি থেকে অফিসের পথে বেরোনোর পর মনে হ'ল দরজার ইলেকট্রনিক লকটা হয়তো পড়েনি। কুছ পরোয়া নেই। স্মার্টফোনে ডাউনলোড করা উপযুক্ত য়্যাপস ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে কাজটা তৎক্ষনাৎ সেরে ফেললেন। য়্যালঝাইমার রোগীর সঃখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এমন রোগী বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন, তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। যদি তাঁর দেহের কোথাও একটা জি পি এস সেন্সর লাগানো থাকে এবং ওই যন্ত্রটিকে ইন্টারনেটের অদৃশ্য সূতোর গাঁটছড়ায় বেঁধে দেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজনে মানুষটির নির্ভুল ভৌগোলিক অবস্থান জানা আদৌ অসম্ভব নয়।

ইন্টারনেট টেকনোলজির শুরু থেকেই কম্পিউটার ব্যবহার করে বাঁদরামি শুরু হয়েছে। গোড়ার দিকে সেটা সীমিত ছিল শুধুমাত্র হ্যাকিং-য়ের মধ্যে। অবশ্য এ- ব্যাপারে মানুষের জ্ঞানও ছিল সীমিত। ক্রমে মাত্রা বেড়েছে। আজ নীল তিমির মতো মারাত্মক ঘটনা মানুষকে একটা ঝাঁকুনি দিয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক ছন্দ যে ভাবে ধাক্কা খাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভাবনায় দীর্ঘ ছায়া ফেলছে।

মানুষের সঙ্গে মানুষের খোলামেলা কথাবার্তা, যাকে বলে জমিয়ে আড্ডা- ওই দিনগুলো আজ অতীত। বিশ-পঁচিশ বছর আগেও সস্তার চা-কফির দোকানে বসে সব গোষ্ঠীর সমবয়সীরা আড্ডায় মসগুল থাকতো। নানান্ আলোচনার মধ্যে খবরা-খবর আদান-প্রদান হ'ত। চায়ের দোকানই ছিল সেদিনকার ইন্টারনেট। আজ ফেসবুক টুইটার জাতীয় সোস্যাল মিডিয়া যুবক-যুবতীদের এক ধরনের মনের সাপোর্ট সিস্টেম। ফেসবুকে আলাপ প্রেমালাপে পৌঁছে যাচ্ছে; ফলে অনেক ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাচ্ছে। এইসব মিডিয়া জনপ্রিয় হবার ফলে মানুষের সঙ্গে দুরত্ব বাড়ছে। এটা হামেশাই দেখা যাচ্ছে  যে  একই বাড়িতে দু-তিন জন ভাইবোন থাকা সত্বেও পারস্পরিক মানসিক সাহচর্যের অভাব। একজন নেট সার্ফ করছে তো, অন্যজন ই-মেল করতে ব্যস্ত আর তৃতীয় ব্যক্তি ফেসবুকে নিজের গোষ্ঠীর সঙ্গে খবর চালাচালি করছে।

এখন ভারতবর্ষে চালু মোবাইল ফোনের সংখ্যা পঞ্চাশ কোটির কাছাকাছি। বিখ্যাত তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থা, সিসকোর (CISCO) ভবিষ্যদ্বাণী বলছে যে দুহাজার ঊনিশ সালের মধ্যে এই সংখ্যাটা ছুঁয়ে ফেলবে সত্তর কোটি। এটাকে ঘিরে ইউ কে পোস্ট একটা নতুন শব্দ আমদানি করেছে, 'নোমোফোবিয়া', ( NoMophobia = No Mobile Phone phobia), অর্থাৎ মোবাইল ফোন না থাকার ভীতি। আজকের প্রজন্ম, যাদের বলা যেতে পারে নেট প্রজন্ম, তারা এই মাধ্যমটিকে ব্যবহার করে অনেক কিছু করছে, ভাল এবং খারাপ। একটা মাউসের ক্লিক বা আঙুলের স্পর্শেই পৃথিবী হাতের মুঠোয়। অল্প বয়সীদের পক্ষে এটা মারাত্মক। এমনিতেই আজকাল মানুষের ধৈর্য কম, কুচোকাঁচাদের আরও কম। কাজেই যন্ত্রটি খারাপ হলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে তাদের পক্ষে খুবই অস্বস্থিকর ব্যাপার। আসলে মুখোমুখি বসে কথা বলার ব্যাপারটাতে মানুষ আর মোটেই স্বচ্ছন্দ নয়।

মোবাইল, স্মার্টফোন, ট্যাব- অর্থাৎ কম্পিউটার চিপ নির্ভর এই গ্যাজেটগুলোকে আমরা সমার্থক বলেই মনে করব। যন্ত্রনির্ভর জীবনযাত্রায় আমরা কেমন যেন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের সময় এখন এমনিতেই কম। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেই আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে চাক্ষুষ যোগাযোগের সুযোগ বা দুটো কথা বলার অবকাশ। কিন্তু তার উপায় কোথায় ? সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত; শুধুমাত্র অনুষ্ঠানের কিছু খন্ডচিত্রের চিহ্ন রেখে দেওয়া যে অমুক অমুকদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।- "অমুকের সঙ্গে কথাবার্তা কি হ'ল ?"

- "কথা তো তেমন কিছু হয়নি।"

প্রাতর্ভ্রমনের এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একমাত্র কন্যাকে নিয়ে কর্তা-গিন্নি সিকিম বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে মেয়ের কলেজের দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা। বাবা-মা নিশ্চিন্ত যে মেয়ে ঘুরে ফিরে সব ভাল ভাল জায়গাগুলো দেখে ফিরে আসলে তার বিবরণের ভিত্তিতে ঠিক করবেন ওনারা কোন স্পটগুলো দেখতে যাবেন। সন্ধ্যের প্রাক্কালে কন্যা ফিরতে বাবা জিজ্ঞেস করলেন - 'কি কি দেখলি ?' বন্ধুদের সঙ্গে তোলা কিছু সেলফি দেখিয়ে দিল, পেছনে বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়া। চারদিক বেড়িয়ে ঘুরে দেখা এদের কাছে গৌণ। আসলে প্রকৃতিও এদের মনে দাগ কাটতে পারে না। ভ্রমণ মানে যে মনপ্রান ঢেলে প্রকৃতিকে উপভোগ করা, সেলফিতে ছবি বন্দী করে জায়গা দেখার প্রমান রেখে দেওয়া নয়, সেটা এরা বোঝেই না। আসলে এই ছবিগুলো ফেসবুক গোষ্ঠীতে ছড়িয়ে দেবে। ভাবখানা, দেখ কত জায়গা ঘুরে এলাম। যন্ত্রনির্ভর যুগে মানুষ নিজেকে নিয়ে বড়ই ব্যস্ত। ফেসবুকে লাইকস্ ব্যাপারটা খুবই জনপ্রিয়। আমার মনে হয় আজকের যুগের ডিজিটাল নেটিভরা বাস্তব জগতের প্রশংসা থেকে ভার্চুয়াল জগতের পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। 

বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে সনাতন ধারায় হাতে লেখা চিঠিকে পেছনে ফেলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রথম পরিবর্তন এল ই-মেলের হাত ধরে। অর্থাৎ, কম্পিউটার ব্যবহার করে লেখা চিঠির বাহক ছিল টেলিফোন লাইনের তার। যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রথম আধুনিকীকরণ।ব্যবহার সীমিত ছিল শিক্ষিত মানুষের মধ্যে, যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ। সময়ের গতি এবং চাহিদায় কম্পিউটারের ব্যবহার যতই বাড়তে লাগল, ই-মেলের ব্যবহার ইন্টেলেকচুয়াল এলিট গোষ্ঠীর আঙিনা থেকে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ল আমজনতার মধ্যে। মোবাইল উত্তর যুগে শুরু হ'ল এস এম এস, সীমিত শব্দ ব্যবহার করে ছোটোখাটো খবরের আদান-প্রদান। যোগাযোগ ব্যবস্থায় জোয়ার আনল স্মার্টফোন। এস এম এসের জায়গা নিল হোয়াটসয়্যাপ। ম্যাসেজের দৈর্ঘ্য আদৌ আঁটোসাটো নয়। হোয়াটসয়্যাপ আসলে এস এম এস, তবে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হ'ল ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের গতি অস্বাভাবিক বেশি হবার ফলে, হোয়াটসয়্যাপ ব্যবহারের খরচ অনেকটাই কম। এরপর ফেসবুক, টুইটার, না জানি আরও কত কিছু। এগুলো হ'ল পরিবর্তনের পরিবর্তন।

 ট্যাব বা স্মার্টফোনে য়্যাপস্-এর জোয়ার, বিশেষ করে যোগাযোগের কাজে; কোনটা ছেড়ে কোনটা ব্যবহার করব। ই-মেল বা হোয়াটসয়্যাপের ব্যবহার অনেক সহজ, প্রায় হাতে চিঠি লেখার মতো, বেশ কাছাকাছি। এগুলোর মধ্যে কেমন যেন একটা শান্ত, নিরীহ, নির্ভরযোগ্য ভদ্র ব্যাপার আছে। এই বিশেষণগুলো ব্যবহার করলাম একটাই কারণে। আজকাল ফেসবুক বা টুইটারের ব্যবহার দেখে এবং শুনে  মনে হয়েছে যে এসব প্যাকেজের ব্যবহারে কোনো ব্যক্তিগত  এবং গোপনীয়তার জায়গা নেই। এগুলো সবই দরকার আছে, কিন্তু করুণভাবে যান্ত্রিক, নির্মম পুনরাবৃত্তি। মন বা মানুষের ছোঁয়া, কোনোটাই নেই এগুলোতে। নিজেকে জাহির করার ব্যাপারে ব্যবহারকারীর অপরিমিত মনস্তত্ব কাজ করে। এতটাই করে যে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সেলেব্রেটি, এমন কি মন্ত্রীসান্ত্রীরা পর্যন্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। জানা নেই মানুষের ইতিহাসের কোন অদৃশ্য ধারায় উন্নত টেকনোলজির এমন সব ব্যবহার হচ্ছে।নিজস্বতার অভাব যতই লক্ষিত হচ্ছে, সেলফির, বা নিজস্বীর প্রবণতা ততই বাড়ছে। বিপদও তো কম নয়। বিগত দুবছরের মধ্যে প্রায় জনা কুড়ি তরতাজা যুবক যুবতী শুধুমাত্র এদেশেই মারা গেছে, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সেলফি তুলতে গিয়ে। কি উদগ্র সেলফিবাসনা  ! কেউ কেউ আবার নিজেই নিজের সেলফি তুলছে ; নারসিসাস্ কমপ্লেক্স (Narcissus complex) । যখন তখন, যত্রতত্র কোথায় পাবে আয়না ? আরে বাবা ভাল ব্যবহারও তো নেহাত কম নয়।  বিহারের স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সময়ে উপস্থিত নিশ্চিত করতে বিহার সরকারের তরফ থেকে নোটিস জারি করা হয়েছিল যে, প্রতিদিন সকালে এসে এবং ছুটির ঘন্টায় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে সেলফি তুলে শিক্ষা দপ্তরে পাঠাতে হবে। আসলে সব জিনিস ব্যবহারের সুফল এবং কুফল আছে, ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে তার কার্যকারীতা।

তথ্য-প্রযুক্তি টেকনোলজিতে সত্যিকারের পরিবর্তন এল  'গুগল্'-য়ের হাত ধরে। গুগল্ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন। ইন্টারনেটের ক্ষমতার উৎসই হ'ল এই গুগল্। গূগল্ অনেকটা পাড়ার গেজেটের মত, সব পরিবারের খবর জানে। এটির জন্ম দুটি মানুষের হাত ধরে। এঁরা হলেন ল্যারি পেইজ ও সের্গেই ব্রিন। গুগলের মূলমন্ত্র হ'ল, বিশ্বের প্রায় যাবতীয় সার্ভারের তথ্য সন্নিবেশিত করে তাকে সবার জন্য সহজলভ্য করে দেওয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন তথ্যাগারে অন্তত এক মিলিয়ন বা দশ লক্ষাধিক সার্ভার চলে এবং ঐগুলোতে দৈনিক এক বিলিয়ন বা একশ মিলিয়নের উপর সার্চের অনুরোধ ও প্রায় চব্বিশ পেটাবাইট  তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হয় (**)। এবার দেখা যেতে পারে গুগলের সার্চ ঠিক কিভাবে কাজ করে। প্রাথমিক কাজ হ'ল ওয়ার্লড ওয়াইড ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বের সব ধরনের ওয়েব পেজ পরিদর্শন করা, অবশ্যই যে সাইটগুলো খোলা আছে। প্রত্যেকটি সার্চ ইঞ্জিনের আওতায় বিশাল বিশাল তথ্যসমৃদ্ধ হার্ড-ডিস্কের সমন্বয়ে তৈরি করা সার্ভার আছে। ইন্টারনেটের সব তথ্য ওই হার্ড ডিস্কগুলোতে মজুদ থাকে। এবং সার্চ ইঞ্জিন প্রয়োজন মতো ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। এই কাজ করার জন্য প্রত্যেক সার্চ ইঞ্জিনের বিশেষ সফটওয়্যার রোবট আছে যার পোষাকী নাম ওয়েব ক্রলার। এই ক্রলার সফটওয়্যার তীব্র গতিতে ওয়েবে ঘুরে বেড়িয়ে সব তথ্য লিপিবদ্ধ করে নিয়ে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। মনে রাখা দরকার যে গুগল্ ছাড়াও আরও কয়েকটি সার্চ ইঞ্জিন আছে, যেমন ইয়াহু ডাকডাকগো ইত্যাদি। এগুলো হয়তো স্বকীয়তার জন্য জনপ্রিয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা এবং কার্যকারিতার দিক থেকে গুগলের তুলনা নেই। গুগল্ এতটাই জনপ্রিয় যে, তা অভিধানে জায়গা করে নিয়েছে।

(**) এক পেটাবাইট তথ্য ঠিক কতটা , তার একটা ইঙ্গিত দেওয়া যেতে পারে । তথ্যের মাপের একক হ'ল বাইট। নির্দিষ্ট আকৃতির কাগজে লেখা পাঁচশ পৃষ্ঠার বইকে মাপকাঠি ধরে নিলে এক পেটাবাইটের মাপ কল্পনা করতে সুবিধে হবে।

এক কিলোবাইট (কে বি) ~ 1000 বাইট , 1000 (কে বি)  ~ এক মেগাবাইট (এম বি) ,1000 এম বি ~ এক গিগা বাইট (জি বি) , 1000 জি বি ~ এক টেরাবাইট (টি বি) , 1000 টি বি ~ এক পেটাবাইট (পি বি) । আরও একটা হিসেব জানলে ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যাবে। একখানা A4 মাপের কাগজে মোটামুটি দুই কে বি তথ্য এঁটে যাবে। কাজেই A4 মাপের কাগজে বাঁধানো একটা পাঁচশ পৃষ্ঠার বইয়ের জন্য জায়গা লাগবে এক এম বি। এবারে , এম বি থেকে শুরু করে জি বি , টি বি হয়ে পি বি তে পৌঁছোনোর হিসেবের নিয়মটা খাটালে সহজেই বেরিয়ে আসবে যে , এক পেটাবাইট ~  একশ কোটি বইয়ের তথ্য ( প্রত্যেক বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা পাঁচশ )। কম্পিউটার সংক্রান্ত হিসেবনিকেসে এক কিলোর সঠিক মাপ হ'ল 1024 ; ঠিক সেই কারণেই সমান সমান (=) চিহ্নের বদলে ওই ঢেউ খেলানো প্রতীক (~) ব্যবহার করা হয়েছে।

ইন্টারনেট প্রাঙ্গনের বেশিরভাগটাই সৌন্দর্যের ডালি দিয়ে ভরা। আপত্তিকর য়্যাপসগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঞ্জালের মতো। এগুলো নেহাতই সাময়িক এবং অবশ্যই স্বল্পস্থায়ী । আমি আশাবাদী এবং নিশ্চিত যে, এগুলো কাটিয়ে উঠে মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তবে ইন্টারনেট প্রশাসকরা যদি নিয়ম করে এবং অপরাধীদের দৃষ্টামূলক শাস্তির ভয় দেখিয়ে এই বিকৃত ব্যবহার বন্ধ করতে পারে তাহলে সমাজের মঙ্গল। একই সঙ্গে অভিভাবকদের  একটা বিরাট ভূমিকা আছে। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর সমাজেরও  সচেতন হওয়া প্রয়োজন। 


                                                              স্বপনকুমার দে

০৬/১০/১৮