জন্মদিন
স্বপনকুমার দে
অবসর সময়ে অল্প বয়সীদের মতো স্মার্টফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করা অভ্যেস হয়ে গেছে। ফেসবুকের দেওয়াল লিখন, হোয়াটসঅ্যাপের পোস্টিং। গুগল তো আছেই। কয়েকদিন আগে আমার অনুজ প্রতিম শুভাশিস, এক সময়ের সহকর্মী- ওর লেখা দু-দুটো ছোটোগল্প পড়ে বেশ ভাল লাগল। অনেক ভেতো বাঙালির মতো আমিও একজন সাহিত্যানুরাগী। কত সামান্য বিষয়কে ঘিরে অ-সামান্য সাহিত্যের মোড়কে ভরে শুভাশিস গল্পগুলো সৃষ্টি করেছে। আমার স্ত্রী, শিখাকে পড়ালাম। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে খাটের ওপর রাখা আমার নোটবুকে লেখা একটা তারিখ এবং পাশে ছোট্ট এক লাইন লেখা চোখে পড়তেই মনে হ'ল, আরে আজ তো এক জনের এক বছরের জন্মদিন। না, কোনো ব্যক্তি বা বস্তুবিশেষ নয়। একটা মামুলি, কিন্তু জরুরী ঘটনার বর্ষপূর্তি।
সেই দিনটা একটু স্মরণ করার চেষ্টা করা যাক। লেখালেখি আমার প্যাশন। কোনো বিষয় না পেলে, সকাল থেকে কেমন কাটলো তা নিয়েই দু'চার লাইন লিখে ফেলি। তবে ঠিক রোজনামচা নয়। শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
যাইহোক, আজকের এই তারিখটা এমন একটা ঘটনার জন্মদিন,যার সাহিত্যের আঙিনায় আসার কথা ছিল না। গল্প, কবিতা বা নাটকের উজ্জ্বল চরিত্রও নয়। তবে এর সঙ্গে আমার বারো বছরের নাতির জন্মের দিনটা অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে। না, না, আমার নাতির জন্মদিনের গল্পগাথা লিখতে বসিনি। বিষয়টা না হয় আপাতত রহস্যই থাক। সত্যজিৎ রায়ের প্রায় সব গল্পই শেষ পর্যন্ত না পড়লে জট খোলে না। এটা না হয় সেরকমই হ'ল। গল্পের চরিত্র একটা জড় বস্তুকে কেন্দ্র করে, একটা মুঠোফোন, আমার কাছে যার বয়স আমার নাতির বয়সেরই কাছাকাছি, সম্ভবত দু-দিন কম।
মোবাইল ফোনের ব্যবহার আমার নাতি জন্মাবার আগে কখনও অনুভব করিনি। ল্যান্ডফোনেই কাজ চলে যাচ্ছিল। কিন্তু এটা এমন একটা সময়, যখন আমার বাড়ির বৌ, মানে আমার কন্যাসম পুত্রবধূ আমার বাড়ির কাছেই হাসপাতালে সবে ভর্তি হয়েছে সন্তান জন্ম দিতে। ছেলে হাসপাতাল, ব্যাঙ্ক, ওষুধের দোকান, আনুষাঙ্গিক নানান্ জায়গায় দৌড়দৌড়ি করছে। আমরা মিঞা-বিবি আর আমাদের বেয়ান, যিনি আগের দিন চলে এসেছিলেন, বাড়ি বসে প্রহর গুনছি। বারো বছর আগে ল্যান্ডফোন থেকে মোবাইলে যোগাযোগ করাটা বেশ গোলমেলে ব্যাপার ছিল। ছেলে-বৌ ছাড়া আমার ছোট্ট পরিবারে তখনও কেউ সেলফোন ব্যবহার করতো না। কাজেই একটা মুঠোফোনের প্রয়োজন বোধ করলাম। নাতি পৃথিবীর আলো দেখল ২০০৯ সালের পয়লা অক্টোবর, বেলা তিনটে নাগাদ। বাড়ি থেকে নাকে মুখে দুটো গুঁজে হাসপাতালের লেবার রুমের বাইরে অধীর আগ্রহে নাগাড়ে অপেক্ষা করছি আমরা চারজন, সেই বেলা এগারোটা থেকে। সিস্টার মেয়েটি সুখবর নিয়ে বেরিয়ে এল। সদ্য ঠাকুর্দা-ঠাকুমা বা দাদু-দিদিমা হওয়ার সূখানুভূতি বেশ কিছুক্ষণের জন্য আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
মোবাইল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমার জানাও নেই কোথায় মোবাইল কিনতে যাব। ছেলে-বৌ আমাদের মনের কথা পড়তে পারে। তিন তারিখ, মানে, তিন অক্টোবর, ছেলে আমাকে এই মোবাইল ফোনটা হাতে ধরিয়ে বললো, এখন এটা তোমার কাজে লাগবে। আবেগাপ্লুত হয়ে ওর হাতটা চেপে ধরে ফেললাম। এই হ'ল গল্পের প্রেক্ষিত। আসল গল্প আরো ছোটো এবং মামুলি।
তারিখগুলো মনে করা যাক। নাতি জন্মালো পয়লা অক্টোবর। সেলফোন আমার হাতে এল তিন অক্টোবর ২০০৯, এখন যেটার বয়স প্রায় ১২ হতে চলেছে। আর আজ হ'ল ২০২১ সালের মে মাসের দশ তারিখ। তাহলে জন্মদিনটা কার, যে আজ সবে এক বছর শেষ করে দুয়ে পা দিল। পাঠক বোধহয় এখনও ধন্ধে। না আর বেশিক্ষণ টেনশনে রাখব না। গত বছর আজকের দিনে এই মুঠোফোনের একটা সুইচের চিড় ধরা একটা টুকরো খসে গিয়ে মোবাইলটা অকেজো করে দিল। কি করা যায় ! এটাকে আমি সহজে হাতছাড়া করব না। এর সঙ্গে আমার একটা অন্য জাতের আবেগ জড়িয়ে আছে। এক টুকরো সেলোটেপ আড়াআড়ি ভাবে দু-পাসের সুইচ পর্যন্ত লাগিয়ে ভাঙা অংশটাকে যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করা গেল। যন্ত্রটা কাজ করতেও শুরু করলো। একই সঙ্গে আমার বুক ধড়ফড়ানিও শুরু হ'ল। ভয় হ'ল, মে মাসের এই কাঠফাটা গরমে একদিন সেলোটেপের আঠা শুকিয়ে টুকরোটা আবার না পড়ে যায়। সারাবার দোকানে যাওয়ারও উপায় নেই। রাজ্য জুড়ে লকডাউন চলছে। ছোট্ট একটা নোটবুকে আমি তারিখ সমেত কিছু তথ্য লিখে রাখি। বাড়ির কাজের মাসিরা, গাড়ির ড্রাইভার ভদ্রলোক মাঝে মধ্যেই আমার থেকে পাঁচ, সাত, দশ এমনকি কুড়ি হাজার টাকা পর্যন্ত ধার নেয়। মাসিক কিস্তিতে বছর খানেকের মধ্যে আবার শোধও করে দেয়। ওই হিসেবগুলো আমি নোটবুকে তারিখ সমেত লিখে রাখি। ওখানেই আমি মোবাইল সারানোর তারিখটা লিখে রাখলাম। প্রথম দিকে মাঝে মাঝেই দেখতাম সারানোর পরে কতদিন ঠিক থাকলো। কয়েক মাস বাদে স্বাভাবিক নিয়মে ভুলেই গেলাম পুরোনো রুটিন। কারণ যন্ত্রটা তো দিব্যি চলছে। আজ ড্রাইভার সাহেব তাঁর গত মাসের ধার নেওয়া পাঁচ হাজার টাকার প্রথম কিস্তি দিতে এসেছিলেন। নোট বইটা খুলে আপডেট করতে গিয়ে দেখলাম যে আগের লাইনে লেখা আছে, "মোবাইলের সুইচটা আজ সারালাম- ১০/০৫/২০২০"। কাজেই আজই হ'ল সারানো মোবাইলের বছরপূর্তী অর্থাৎ জন্মদিন। শুভাশিসের দুটো লেখাই গত দশ দিনের মধ্যেই পড়েছি। সেই স্মৃতিটা আমাকে উস্কে দিল। বুদ্ধদেব গুহ বা নারায়ণ স্যান্যাল, সঠিক খেয়াল নেই, এঁদের মধ্যে একজনের একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম যে একটা প্লট, যত অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন, মাথায় একবার আসলে, আনুষাঙ্গিক অনেক কিছু ঘটনা এসে ভিড় করে। সেগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখলেই একটা প্রবন্ধ লেখা যায়। এই ছোটো গল্পটা সেরকমই একটা। আমার কোনো লেখাই এত ছোটো হয় না। শুভাশিসের লেখা আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবে ওর মতো আমার লেখাটা অতটা ভাল হ'ল না হয়তো।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ডঃ শুভাশিস চট্টোপাধ্যায়।

No comments:
Post a Comment