দিন কতক আগে ইংরেজি দৈনিকে পড়া স্পর্শকাতর একটা চিঠি পড়ে বিচলিত হয়েছিলাম। যেহেতু ঘটনাটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটা পুরোনো ব্যাধি, ফলে আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করার (ঠিক আক্ষরিক নয়) তাগিদ বোধ করলাম, যাতে সামাজিক পরিসরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের শিকড়ের গভীরতার ব্যাপারটা ছড়িয়ে যেতে পারে। আজকের দিনে ডিজিটাল সমাজ মাধ্যমকে ব্যবহার করার সার্থকতা এইখানেই।
লিঙ্গ বৈষম্য আরও এক চেহারায়
----------------------------------------
আমরা এমন একটা দেশের নাগরিক, যেখানে সরকারে এসেই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের ((১ বিলিয়ন = ১০০ কোটি ; এক ট্রিলিয়ন = ১০০০ বিলিয়ন, সোজা কথায়, পাঁচ ট্রিলিয়ন হল ৫ লাখ কোটি, তাও আবার ডলারে অর্থাৎ সংখ্যাটা ৭৫ দিয়ে গুণ করলে যা দাঁড়ায়।)) স্বপ্ন দেখানো হয়, যেটা অবিশ্বাস্য। আমাদের মতো দেশে আমি ব্যক্তিগত ভাবে পাঁচ বছরে এতটা উন্নয়নের পক্ষপাতিও নই। এমনিতেই অর্থনৈতিক বৈষম্য দিনে দিনে বাড়ছে। এত অল্প সময়ে এই মাপের উন্নয়ন হলে অর্থনৈতিক বিভেদের ফাটলটা চড় চড় করে আরও বেড়ে যাবে। এ ব্যাপারে অর্থনীতির সামান্য যতটুকু জানা আছে, সেইটুকু ব্যবহার করে ভবিষ্যতে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ রচনা করার ইচ্ছে আছে। যাইহোক, আজকের এই অতিমারির সময়ে, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে দেশজুড়ে অন্য এক বৈষম্যের হাহাকার। আপাতত সে বিষয়েই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
শেষ জনগণনার (Census) তথ্য থেকে উঠে আসে যে আমাদের দেশে নারী/পুরুষের অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ অর্থাৎ শিশুকন্যার জন্মহার শিশুপুত্রের তুলনায় ৮ শতাংশ কম। ২০১১ সালের তুলনায় সংখ্যাটা কম হলেও এখনও উদ্বেগজনক। কাজেই জন্মদানের নিরিখে এ দেশের মেয়েরা আজও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার।
প্রথমেই কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় সারা দেশে গণটিকাকরণের প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই। কিন্ত আধুনিক টেকনোলজির যুগে অনুসন্ধান ভিত্তিক সাংবাদিকতার গুণে লিঙ্গবৈষম্যের আরও এক নগ্ন চেহারা ধরা পড়লো গণটিকাকরণের ক্ষেত্রে এবং সেই বৈষম্য সত্যিই ভয়ঙ্কর। কি বলছে তথ্য !
অন্তত একটি ডোজ-এর টিকাকরণ যাদের হয়েছে, তাদের মধ্যে মহিলাদের তুলনায় প্রায় কুড়ি শতাংশ বেশি পুরুষ, টিকাকরণের আওতায় এসেছেন। এই সংখ্যা জনগণনার বিভেদের সংখ্যার সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রধানত ছোটো শহর এবং গ্রামের পুরুষেরা সুবিধাভোগী। তাঁরা নিজেদের পরিবারকে বোঝাচ্ছেন যে, পুরুষদের যেহেতু বাইরের কাজে বেরোতে হয়, তাঁদের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। যুক্তিটা আপাত দৃষ্টিতে যুক্তিযুক্ত মন হলেও, খুব একটা সারবত্তা নেই। বরং তাঁরাই বাইরে থেকে সংক্রমণ বয়ে নিয়ে এসে বাড়ি ফিরে যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন না করে বাড়ির মানুষের কাছাকাছি আসছেন। আরও মারাত্মক যেটা, তা হ'ল বাড়ির মহিলা সদস্যদের বোঝানো হচ্ছে যে টিকাকরণের ফল তাঁদের মাতৃত্বের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আসলে আমাদের দেশে মহিলারা সব সময়েই উচ্ছিষ্ট এবং শেষপ্রাপ্তির শিকার। কারণ দেখা গেছে যে ডিজিটাল জগতে প্রবেশাধিকারেও এর ব্যতিক্রম নেই। কাজেই, সরকার দেশজুড়ে আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে কাজে লাগিয়ে এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রান্তিক মানুষের কাছে, মহিলাদের টিকাকরণের কুসংস্কারে প্রভাবিত না হয়ে নিশ্চিন্তে টিকা নেবার পরামর্শ দিতে সচেষ্ট হতে পারেন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষে তাঁদের প্রশাসনিক স্তরে তথ্য ও প্রচার মাধ্যমকে জোর কদমে কাজে লাগানোই হবে সঠিক পদক্ষেপ।
1 comment:
খুবই ভাল লাগল লেখাটা ।আমি মনেকরি পশ্চিমবঙ্গের পরিসংখ্যান দিলে বোধহয় একটু অন্য ছবি আসতো, কারণ ভর্তি মহিলাদের জন্য এতো সুযোগ সুবিধা আর কোনও রাজ্যে নেই।
Post a Comment