Sunday, September 26, 2021

বই না ইন্টারনেট ?

 • এই প্রবন্ধ প্রায় দু'দশক আগে লেখা। সেটা প্রবন্ধটি পড়তে পড়তেই বুঝতে পারা যাবে। ব্লগ তৈরির সুবিধে হ'ল, এখানে যাবতীয় সৃষ্ট লেখালেখি লিপিবদ্ধ করে রাখা যাবে। এটা পড়তে গিয়ে মনে হ'ল যে বিশ বছর আগে, কম্পিউটার এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ব্যাপারে ভবিষ্যতের গতিপ্রকৃতির কথা উল্লেখ করেছিলাম। সেগুলো সত্যি সত্যিই ঘটেছে।


অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ব জন্ম দিয়েছিল একটি বিখ্যাত ধারনার। ধারনাটা এরকম – বিশ্বব্রহ্মান্ডের যেখানেই বস্তু থাকে, সেখানেই চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের ভাঁজ পড়ে। স্পেস অর্থাৎ স্থান এবং টাইম বা কালকে আলাদা করে দেখার কোনও উপায় নেই, মিলেমিশে একাকার হয়ে তাদের নাম হয়েছে স্পেস-টাইম। বিংশ শতাব্দীর যুগান্তকারী দু'টি সৃষ্টিধর্মী কাজের এটি অন্যতম। অন্যটি কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা যা বলে বস্তুকণিকার অস্তিত্ব একই সঙ্গে বস্তু এবং তরঙ্গ। বস্তু কণিকা আসলে তরঙ্গ-কণিকা। কোনোটাই আমাদের  আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এই মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে। আর কয়েকটা মাসের অপেক্ষামাত্র। শুধুমাত্র একটা শতাব্দীই শেষ হবে না। এক ধাপ এগিয়ে বলা যায় যে আধুনিক মানব সভ্যতা  আমাদের জীবনে এই প্রথম মিলেনিয়াম বা সহস্রাবদীর মুখোমুখি হবে। সহস্রাবদীর এই সন্ধিক্ষণে পৌঁছে আমার সাদামাটা বুদ্ধিতে মনে হচ্ছে যে স্পেস জোড়া তথ্যের ভারে মহাকর্ষ আজ কেন্দ্রীভূত হয়েছে ইন্টারনেটের অজস্র তথ্য আর আর কিছুটা তথ্য আবর্জনায়।  স্পেসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে শুধু তথ্য আর তথ্য। আর সেই তথ্য মন্থনের কাজ নাকি কেড়ে নিয়েছে অগুনতি ছাত্র-ছাত্রীর অনেকটা সময়। ইন্টারনেটের হামলায় ছাত্র-ছাত্রীরা নাকি বই-কাগজকে ছুটি দিয়ে সাইবার স্পেসে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। কথাটা অসত্য নয়, আবার, পুরোপুরি সত্যিও নয়। কারণ, বইমেলার ভিড়ের একটা বড় অংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী বলে মনে হয়েছে। সুতরাং এটাও মনে হয়েছে যে চটকদার ইলেকট্রনিক মিডিয়া হানায় মানুষ এখনও অক্ষর ভুলে যায়নি। প্রশ্ন হ'ল বইমেলা না ইন্টারনেট ? না দুটোই ? কিছু তুলনামূলক, থুড়ি, আপাত তুলনামূলক আলোচনাই আমার মূল উদ্দেশ্য। আপাত কথাটা বলছি এই জন্য যে দুটোর উদ্দেশ্য এক নয়। তবুও আলোচনা যেহেতু বিষয় দুটোকে ঘিরে, অবচেতনে তুলনা একটা এসেই যায়।


বইপড়ার অভ্যাসের ব্যাপারটা দিয়েই শুরু করা যাক আলোচনা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বই পড়া আজকাল সাধারণ মানুষ এবং পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা বাহুল্য বলে মনে করে। মন্তব্যের সমর্থনে সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় বইমেলা সম্পর্কিত আলোচনার প্রাসঙ্গিক একটি লাইন তুলে ধরছি – “ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রন্থ মাত্র সাতশো ছাপিয়ে প্রকাশককে বছরের পর বছর বসে থাকতে হয়।“ ইন্টারনেট ইন্টারনেট রব তুলে আধুনিক জগতে সাময়িকভাবে হয়তো একটু এগিয়ে থাকা যায়। তবে তা বই পড়ার ব্যর্থতাকেও আড়াল করে। এটা এক ধরনের মানসিক দেউলিয়াপনা। মনে রাখা দরকার যে বইপড়া সহজাত, ইলেকট্রনিক মিডিয়া যান্ত্রিক। যান্ত্রিক জিনিস আধুনিক সভ্যতার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিফলিত হলেও যান্ত্রিক ব্যাপারস্যাপার গুলো কোনও না কোনও সময়ে বৈচিত্র্যহীন একঘেঁয়ে হয়ে উঠতে বাধ্য। একগুচ্ছ খবরের বোঝা মাথায় ভরে আখেরে কিছু লাভ আছে কি ? পাঠক ভুল বুঝবেন না আশা করি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ভর করে তথ্য সংগ্রহ আর বই-কাগজ পড়ার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। আজকের দিনে বরং একটি অন্যটির পরিপূরক। বহু বিজ্ঞান গবেষকের সঙ্গে পরিচয় থাকার সুবাদে দেখেছি যে ইন্টারনেট হাতড়ে নির্বাচিত প্রাসঙ্গিক তথ্যের অংশটুকু ছাপিয়ে নিয়ে পড়তেই তাঁরা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কিন্ত একই সঙ্গে তথ্য নির্বাচনের ব্যাপারে ইন্টারনেটের সুবিধেগুলোকেও অনস্বীকার্য বলেও মনে করেন। বই কাগজের গন্ধ, নতুন বইয়ের পাতাগুলো, তা সে যত সস্তা কাগজের হোক না কেন- তা উল্টেপাল্টে দেখা আর মাউস ক্লিকে ইন্টারনেটের হালফিল খবরের মধ্যে বিচরণ ঠিক এক ধরনের অনুভূতির উদ্রেক করে না। ইন্টারনেটে পড়ার মধ্যে ডিসিপ্লিনের বাঁধাধরা ব্যাপারটা মগজে পুরে পড়তে হয়। ফলে পড়ার মধ্যে কৃত্রিমতা এসে গিয়ে চিন্তার স্রোতগুলোকে মাঝে মাঝেই ভেঙে দেয়। ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের কথাই ধরা যাক। রঙীন স্ক্রীনের উপর সাজানো রয়েছে রঙ-বেরঙের তথ্যের ডালি। কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরব ! তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া – সবগুলোই তো জানতে ইচ্ছে করছে। যাইহোক, একটাকে নিয়ে শুরু করা গেল। হাইপারটেক্সেটের হাতছানি অবচেতনে নিয়ে চলে গেল অন্য এক তথ্য জগতে। সেখান থেকে আরও একটায়……। তথ্য এনসাইক্লোপেডিয়ায় এই যে ছোটাছুটি, লাফালাফি, বই পড়ায় সেই সুযোগ না থাকার কারণেই মনোনিবেশ হতে বাধ্য। বিষয়ের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ার কোনো উপায় নেই। ব্রাউজিংয়ের সময় এমনও হয় যে, যেটা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল সেটা ভুলেই গেলাম। এ যেন চাল কিনতে বেরিয়ে ডাল কিনে ফিরে আসার মতো। কাজের কাজ বিশেষ কিছু হ’ল না।


“ইন্টারনেট ইজ টু বই ইকুয়্যালস্ টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ ইজ টু মাঠে ঢুকে দেখা ম্যাচ।“ টেলিভিসনের পর্দায় ম্যাচ দেখা আর মাঠে ঢুকে ম্যাচ দেখার তফাত তো থাকবেই। টিভিতে খুঁটিনাটি গুলো তো রিপ্লেতে বারবার দেখতে পাবার সুযোগ আছে। তবু অদৃশ্য অদেখা শূন্যতা কিছু থেকেই যায়। মাঠের ম্যাচ দেখার অনুভূতিতে যে সম্পূর্ণতা তা টিভিতে পাওয়া সম্ভব নয়। 

হাইপারটেক্সট ব্যাপারটা প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি। ক্রস রেফারেন্সের সুবিধের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে তৈরি করা ইন্টারনেটের সংরক্ষিত তথ্যকে হাইপারটেক্সট আখ্যা দেওয়া হয়।


প্রতিষ্ঠিত এবং অভিজ্ঞ গবেষক মহলে আড্ডার মেজাজে বিষয়টা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। তাঁদের কথার সারমর্ম ভাষায় ব্যক্ত করলাম, “মানসিক ও দৈহিক গঠনের সঙ্গে বইপড়ার যে মেলবন্ধন, সেটা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে পাওয়া সম্ভব নয়।“ আমার মনে হয় তাঁরা হয়তো বলতে চান যে বই হাতে নিয়ে শুয়ে বসে বা চায়ের টেবিলে পড়ার যে ঘরোয়া বিলাসিতা, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সেটা হয় না। আসলে ডিসিপ্লিনের সঙ্গে আড়ষ্টতার ব্যাপারটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। ইন্টারনেটে পড়া ভীষণভাবে ডিসিপ্লিন্ড। শৃঙ্খলা বস্তুটা সব ক্ষেত্রে কি মানায় ? আরও একজন সুপন্ডিত গবেষকের মন্তব্য, “ওভারহেড প্রোজেক্টার লাগিয়ে বড় পর্দায় সেমিনার শোনার আড়ষ্টতা আর ব্ল্যাকবোর্ড-চক-ডাস্টার ব্যবহার করে ক্লাস করার সহজ পরিবেশের যে তফাত, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে বইয়ের পার্থক্য অনেকটা সেরকম। তবে দুটোরই প্রয়োজন আছে।“


ইন্টারনেটের চটজলদি ব্যাপারটায় সুবিধে-অসুবিধে দুইই আছে। খবরের ক্ষিদেয় মানুষ যখন প্রায় দিশেহারা, অব্যবহিত সেই খবরটা পাওয়ার ব্যাপারে এর আর জুড়ি নেই। কিন্ত এ তো আর লাইফ সেভিং ড্রাগ নয়, যে খবর জেনে মানুষ জীবন ফিরে পাবে। কাজেই চট্ করে পাওয়া বেশিরভাগ খবরের গুরুত্ব চট্ করে ফুরিয়ে যায়। সহজলভ্য সবকিছু পাওয়ার মধ্যে এমনটাই হয়ে থাকে।


ইনফরমেশন টেকনোলজি, সংক্ষেপে আই টির-দাপটে পৃথিবীটা ছোট হতে হতে বৈঠকখানায় ঢুকে গেছে।। একই সঙ্গে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে সব রুচির মসলার খবরে খবরে পৃথিবীটা ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মনের পৃথিবীটা কি বলে ? সমাজবদ্ধতা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক- এগুলো আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। সময় নেই কারোরই, বিশেষ করে পড়ুয়াদের। তারা মনের মতো করে আড্ডা মারতেও ভুলে গেছে। রুচির বেড়াজাল না টপকে আড্ডা চর্চাও তো এক ধরনের শিল্পচর্চা। আমার মনে হয় মনের ঈপ্সিত ইচ্ছেগুলোর উপকরণ, উপযুক্ত বই-কাগজ এবং পারস্পরিক আলোচনাতেই পাওয়া যায়। ছোটবেলায় দেখতাম যে স্কুল বা কলেজ ডিঙোনো ছেলে-মেয়েরা বাড়তি সময়টাকে কাজে লাগাতো টাইপ-শর্টহ্যান্ড স্কুলে ভর্তি হয়ে। বাবা-কাকারাও মনে করতেন যে এটা জানা থাকলে ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। আজকের টাইপ স্কুল আর টাইপ মেশিনের জায়গা নিয়েছে যথাক্রমে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর কম্পিউটার। এটা ভালই এবং সময়োপযোগী। কারণ আর্থসামাজিক দিকটার কথা ভেবে যুগের সঙ্গে কিছুটা তাল মিলিয়ে চলাই ঠিক। এর বেশি কিছু নয়। কম্পিউটার- ইন্টারনেট করতে গিয়ে সেটাই ধ্যানজ্ঞান মনে করে ছাত্র-ছাত্রীরা যেন বুদ্ধিচর্চায় ব্রেক না কষে, সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা না হয়ে যায়, বই-কাগজের ছাপা অক্ষরের সঙ্গে সম্পর্ক যেন ছিন্ন না হয়।


ইলেকট্রনিক মিডিয়া তথা ইন্টারনেটের প্লাস পয়েন্টগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে সাংবাদিকতা। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রভাবে সাংবাদিকতার মান আজ অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। দশ-বারো বছর আগেও বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষাতেও হয়তো দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকাগুলোর তথ্য পরিবেশনের মধ্যে কোনও বৈচিত্র্য থাকতো না। আজ পত্র-পত্রিকার সংখ্যা শুধু যে বেড়েছে, তাই না, উপরন্তু নিয়মিত তথ্য ছাড়াও তাতে পাওয়া যাচ্ছে বিজ্ঞান, সাহিত্য, যাবতীয় শিল্পজগতের আলোচনা এবং সমালোচনা। সুতরাং জেনে নেবার পরিধি এবং লেখাচর্চার সুযোগ বেড়েছে বই কমেনি। বিজ্ঞাপনের জগতেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জুড়ি নেই। সব রুচির জন্যই বিজ্ঞাপনে আজ যে বৈচিত্র্যের ছড়াছড়ি, তা সম্ভব হয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দৌলতে।


কট্টর ইন্টারনেট বিরোধী মানুষজনকে বলতে শুনেছি যে, সাইবারস্পেস নাকি দূষণের দখলে। ইউজনিটের পর্নোগ্রাফিক ছবির ভিড় আর অশ্লীলতার মুখরোচক খবরের দৃষ্টান্ত অস্বীকার করা যায় না ঠিকই। কিন্ত দূষিত বই-কাগজের অভাবও কি কম আছে ? এমনকি ঝকঝকে আধুনিক লেখকের রগরগে ভাষায় মেশানো সাহিত্যকতা মাঝে মাঝেই মিশে যায় নির্ভেজাল অশ্লীলতার সঙ্গে এবং নামী সাহিত্যিকদের সৃষ্ট অশ্লীলতা সাহিত্যগুণেও উত্তীর্ণ হয়। নামী শিল্পীর বিকৃত (আমার মতে) শিল্পকলা শিল্পগুণে বিবেচিত হওয়ার নজির ভুরি ভুরি আছে। নগ্ন নারীদেহের বিকৃত ভঙ্গীর মধ্যে কোথায় যে শিল্প লুকিয়ে আছে, সেটা আমারও জানা নেই। নামী লেখক বা শিল্পীর স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের সৃজনশীলতার স্বাধীনতা এবং মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হয়। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নামী-দামি তকমার লেবেল একবার পড়ে গেলে, বাকিটা ভারে কাটে তা সে যে বিষয়েই হোক না কেন। যাইহোক, ব্যাপারটা আপেক্ষিক এবং বিতর্কিত।


বব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহারকে আমি আদৌ ছোট করে দেখছি না। কারণ, বিজ্ঞান গবেষণায় গবেষকদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় ভৌগোলিক দূরত্ব যাতে বাধা না হয়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যেই এর সৃষ্টি। পরে তার নানাবিধ সুযোগ সুবিধে নিয়ে বানিজ্যিক প্রয়োগক্ষেত্র বিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্রকে বহুগুণ ছাপিয়ে গেছে। সেটা খুবই ভালোর দিক। আমি নিজেও ইন্টারনেটের একজন উৎসাহী ব্যবহারকারী। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের চমক আর ঝলকের দিকটাকে বড্ড বেশি তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ্য করছি।


তাহলে কোনটা ? বই না কম্পিউটা চালিত মিডিয়া ?আমার মনে হয় এখনও পর্যন্ত বই এর বিকল্প নেই।  সুস্থ, সামাজিক  সব স্তরের মানুষের কাছে তা সমাদৃত। বেশ কিছু বছর আগে বইমেলায় বই এর ভূমিকা সম্পর্কে স্বনামধন্য একজন ব্যক্তিত্ব একটি মন্তব্য করেছিলেন। মন্তব্যটা এরকম, “বইমেলার তাৎপর্য এই যে এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা, দু তরফের লাভ। একজনের ব্যবসায়িক সাফল্য অন্যজনের উৎকর্ষের সহায়ক।“ এই মন্তব্যের খেই ধরে কল্পনানেত্রে আরও একটা দৃশ্য ভেসে উঠেছে। বই এর বদলে টার্মিনালে টার্মিনালে ছয়লাপ সাইবার কাফে, তথ্য আর খবরের পশরা সাজিয়ে বসে আছে। এক্ষেত্রেও ক্রেতা এসেছেন গাঁটের কড়ি খরচ করে তথ্য কিনতে, মানে ইন্টারনেট থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে। কাফে মালিকের ব্যবসায়িক সাফল্যে কোনও সন্দেহ নেই। তবে ক্রেতার আত্মিক উৎকর্ষের সঙ্গে যোগ হয়েছে মাউস ক্লিকে ইন্টারনেট হাতড়ানোর পাওনা সময় খরচ হয়ে যাবার মানসিক উৎকন্ঠা।


বিষয়টি আলোচন করতে গিয়ে চার-পাঁচ দশক আগে লেখা যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাস এর একটি লাইনের কথা মনে পড়ছে। “ বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।“ ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আবেগবর্জিত বেগের সুগন্ধ-দুর্গন্ধ দুই-ই আছে বলে আমার মনে হয়। তবে যাযাবরের যুগের সঙ্গে তুলনা করলে আজকের পৃথিবীর চেহারাটা অনেকটাই আলাদা। মানুষকে আজ প্রতিপদে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। কাজেই আধুনিক সাজ-সরঞ্জাম যে প্রয়োজন, তা অনস্বীকার্য। আমার মনে হয়, চিন্তাভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে পারলে আজকের দিনে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে বাড়িয়ে নেবার সুযোগ আছে।


দশ-পনেরো বছর আগেও রেফ্রিজারেটর, রান্নার গ্যাস বা টেলিফোন মধ্যবিত্তের কাছে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। আজকাল সেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। ইন্টারনেটের অবস্থাটা সেরকমই হতে চলেছে। আমার মনে হয় আগামী দশ বছরের মধ্যে মাল্টিমিডিয়ার সুযোগ সুবিধে নিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে আই টি-র লম্বা হাত। দরকার হবে না টিভি কিম্বা টেলিফোন এমনকি সাউন্ড সিস্টেমের, অল ইন ওয়ান। নতুন থেকে নতুনতর প্রজন্মের রুচিও আস্তে আস্তে পরিবর্তন হচ্ছে। স্বাক্ষরতার  চেয়ে বড় হয়ে উঠচে কম্পিউটার লিটারেসি। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা সুকুমার রায়, লুইস ক্যারল পড়েনি, পড়েনি ঠাকুমার ঝুলি কিম্বা সত্যজিত রায়। কিন্ত তারা কম্পিউটার লিটারেট। বিয়ে, জন্মদিন বা পরীক্ষা পাশের জন্য আজকাল বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। বলাই বাহুল্য বই  এর কদর দিনে দিনে কিছুটা কমছে। তাই বলে কি লেখকরা কলম ধরবেন না! নাকি প্রকাশকরা প্রকাশনা বন্ধ করে দেবেন! আমার মনে হয় ধুন্ধুমার এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বই-কাগজের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যত বাঁচিয়ে রাখতে হলে লেখক ও প্রকাশকের অস্ত্রে এখন থেকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে শাণ দিতে শুরু কথা উচিত। সত্যিকারের বই পড়ুয়া মানুষের ভরসা এখনও একটুও কমেনি।


Thursday, September 23, 2021

উপাচার্য উপাখ্যান তৃতীয় এবং শেষ পর্ব

 উপাচার্য  উপাখ্যান – পরশু, যা শুনেছি এবং পড়েছি।


১৯৬৮ সাল। অধ্যাপক সত্যেন সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আমরা তখন যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতকোত্তর পর্বে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করেছি।

*******

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষের দিকে, যখন পশ্চিম বাংলার বামদলের সবে শেষের শুরু হয়েছে, তখন খবরের কাগজের একটি সংবাদ পড়ে বেশ কৌতুক বোধ করলাম। রাজ্যের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সম্মিলিত হয়ে শাসক গোষ্ঠীর সমর্থনে সরব হয়েছেন। উপাচার্য পদাধিকারি অ্যাকাডেমিকস বা শিক্ষাবিদদের এমন আচরণ, এর আগে কখনও দেখা যায়নি বা শোনা যায়নি। আমরা ওই পদমর্যাদার যাঁদের দেখে বেড়ে উঠেছি, এবং যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছি, মনে হ'ল এই ঘটনা তারই মূলে কুঠারাঘাত করল। তখন অবশ্য গণতান্ত্রিক অধিকার বোধে মানুষ এমনই উগ্র সচেতন যে, আমার অনুমান, উপাচার্যকুল ভাবলেন সবাই যদি দল করতে পারে, উপাচার্যরাই বা করতে পারবেন না কেন ? এটাই বোধহয় তখনকার উপাচার্যদের মানসিকতা।

*******

এবার কয়েকটা আশাব্যঞ্জক ঘটনার গল্পে আসি। সেইসব উপাচার্যদের আখ্যানে, যাঁরা নিজেদের যোগ্যতায় কোনও রাজনৈতিক ছত্রছায়া অবলম্বন না করে সম্মানজনক ভাবে নিজেদের অধিকার বলে তাঁদের মেয়াদকাল শেষ করেছেন। বরং বলব রাইটার্স বিল্ডিং-এর কর্তাদের চোখে চোখ রেখে মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সত্যেন সেন মহাশয়ের নামটা নিয়েই সেই কারণে শুরু করেছিলাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপকের সঙ্গে সত্যেন বাবুর ব্যক্তিগত পরিচয় থাকার ফলে, ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। বহুদিন আগে আনন্দবাজারের “সম্পাদক সমীপেষু" কলমে অধ্যাপক মহাশয়ের একটা চিঠির প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে ধরলে সত্যেন বাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারা যাবে। ওঁর কথায়, -"…..একদিন ওঁর (সত্যেন বাবুর) ঘরে গেছি, দেখলাম বেশ বিরক্ত এবং উত্তেজিত। বললেন, ‘দেখেছ কান্ড ! রাইটার্স বিল্ডিং থেকে এডুকেশন সেক্রেটারি ফোন করে বলছেন, কী দরকার আছে, আমি যেন একটু রাইটার্সে যাই। আমি বললাম, ‘ডোন্ট ইউ নো, আই অ্যাম দ্য ভাইস-চ্যান্সেলর অব দ্য ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ? আপনার কোনও দরকার থাকলে মাই রেজিষ্ট্রার উইল গো টু সি ইউ, নট মি।“

জনৈক অধ্যাপক, প্রফেসর সেনের সম্পর্কে আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। উনি দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক নেতার মুখে শুনেছিলেন, - “১৯৭৬-৭৭ সাল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এবং তিনি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। একদিন নাকি মুখ্যমন্ত্রী সত্যেন বাবুকে এক বার দেখা করতে অনুরোধ করেন। সিদ্ধার্থ রায় নাকি কথায় কথায় বলেন, ‘ আপনি মশাই কলকাতার ভাইস-চ্যান্সেলর, এটাও বলতে পারছেন না এমন কিছু একটা।‘ সত্যেন বাবু অসন্তুষ্ট হয়ে কংগ্রেস মহলে কাউকে কাউকে জানান। তাঁরা যথারীতি প্রধানমন্ত্রীর কানে কথাটা তোলেন। ক'দিন পরে রাজ্য কংগ্রেসের একটা মিটিং ছিল ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। মিটিং শেষে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধার্থ বাবুকে বলেন, ‘ মানু, (ওঁর ডাক নাম) হোয়েন ইউ গো ব্যাক টু ক্যালকাটা, ফার্স্ট থিং ইউ ডু ইজ টু অ্যাপোলজাইস টু ডঃ এস এন সেন। ডোন্ট ইউ নো হি ইজ দ্য ভাইস-চ্যান্সেলর অব ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি?’ সিদ্ধার্থ বাবু কলকাতায় ফিরে এসেই সত্যেন বাবুর সঙ্গে দেখা করে দুঃখপ্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নেন। জনৈক অধ্যাপক, উপাচার্য সত্যেন বাবুকে জিজ্ঞাসা করে এই ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই করে নেন। উপাচার্য বলেছিলেন, ‘কথাগুলো একেবারে সত্যি।‘ এটা ছিল সেদিনের উপাচার্যের মর্যাদা।

১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হয় বাম জমানা। কয়েক বছরের  মধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে ‘অনিলায়ন পর্বের' প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে সন্তোষ ভট্টাচার্য মহাশয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়ভার গ্রহণ করেন। সন্তোষ বাবু এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। 

তাঁর উপাচার্য কার্যকাল ঘটনাবহুল। তাঁকে উপাচার্যের পদে বহাল করেছিলেন সেদিনের পশ্চিম বাংলার রাজ্যপাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, এ পি শর্মা। প্যানেলে তিনজনের নাম ছিল। বাকি দু'জন বাম সমর্থিত।  সেই আমলের অনেক পাঠকের মনে থাকার কথা যে শাসক দলের কী প্রচন্ড বিরোধীতা ও বাধাবিপত্তির মধ্যে সন্তোষ বাবু উপাচার্য হয়েছিলেন। কার্যভার গ্রহণ করতে তিনি যে দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিপ্লবী কর্মচারী সমিতির সদস্যরা দ্বারভাঙা বিল্ডিংয়ের দোতলার সিঁড়ি পর্যন্ত সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, ‘সন্তোষ ভট্টাচার্য মুর্দাবাদ’,’সন্তোষ ভট্টাচার্য নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। জনৈক অধ্যাপক তাঁর বিভাগের কাজে ওঁর ঘরে ঢুকে সবে কথাবার্তা শুরু করেছেন। । এমন সময় কর্মচারী সমিতির জনা কুড়ি-পঁচিশ জন সদস্য ঘরে ঢুকে স্লোগান দিতে শুরু করে দিলেন। একজন আবার আধপোড়া বিড়ি ওঁর দিকে ছুঁড়ে দিলেন। উনি সারাক্ষণ নির্বিকার, মুখ নিচু করে বসে রইলেন। এই ছবি কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল। এরকম প্রায় আধঘন্টা চলার পর কমরেডরা ক্লান্ত হয়ে প্রস্থান করলে, অধ্যাপক মহাশয় পুলিশ ডাকার প্রস্তাব দেন ওঁকে। ওঁর উত্তর ছিল, ‘পুলিশ ডাকব, তোমার মাথা খারাপ।‘

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কর্মচারীরা কী প্রচন্ড মানসিক অত্যাচার করেছিলেন, তা কহতব্য নয়। সর্বশেষ সংকট দেখা দেয় যখন ডঃ ভট্টাচার্য পাঁচজন বাম ঘেঁষা  কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এই কর্মচারীবৃন্দ চাকরি বাঁচিয়ে রাখার জন্য জাল প্রমাণপত্র জমা দিয়েছিলেন। বামপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কখনোই এই ধরনের আদেশ অনুমোদন করবে না জেনেই উপাচার্য তাঁর জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সিপিআই (এম) নেতা অনিল বিশ্বাসের গর্জে ওঠা প্রতিক্রিয়া, “বিশ্ববিদ্যালয়টি উপাচার্যের বাবার সম্পত্তি নয়।“ বোঝাই যায় যে অনিলায়ন পর্ব তখন জোরদার শুরু হয়ে গেছে। রাজ্যের তখনকার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী শম্ভু ঘোষ, অনিল বিশ্বাসের মতো  ভাষা সন্ত্রাসের কুৎসিত দিকটা এড়িয়ে বললেন, “ডঃ ভট্টাচার্য ওঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।“ ইউনিভার্সিটি  কাউন্সিল তাঁকে ইস্তফা দেবার জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, কে সি পন্তের স্মরণাপন্ন হয়। সন্তোষ বাবুও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তাঁর পদত্যাগের কোনও ইচ্ছা নেই। ইউনিভার্সিটি সেনেট কাউন্সিলের জেদের উপর জারি করা এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন: “আমি এই অনুমানে ভাইস-চ্যান্সেলর পদটি গ্রহণ করিনি যে, সংকট হলে কেন্দ্র আমার সাহায্যে আসবে।“

 কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সাহা ইনস্টিটিউট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের পদে থাকেন। এটা নিয়ম মাফিক ব্যাপার। আমার দেখা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করলে বোঝা যাবে, যে ব্যক্তি নির্বিশেষে সোজাসুজি কথা বলতে উনি কতটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন, অপ্রিয় সত্যি হলেও।             ডঃ রাজা রামান্না, সাহা ইনস্টিটিউটয়ের রাজাবাজার ক্যাম্পাসের প্রেক্ষাগৃহে লেকচার দিতে এসেছেন। পৌরোহিত্যর দায়িত্বে স্বয়ং ডঃ সন্তোষ ভট্টাচার্য। প্রেক্ষাগৃহ কাণায় কাণায় পূর্ণ। বেশ কিছু শ্রোতা দাঁড়িয়ে লেকচার শুনছেন। উপাচার্য, বক্তার পরিচয় পর্ব শেষ করে রামান্না সাহেবেকে বক্তৃতার সূচনা করার অনুরোধ জানিয়ে নিজের জায়গায় বসলেন। বক্তৃতার বিষয়ের মধ্যে কিছুটা ভেজাল ছিল। রামান্না সাহেবের ব্যক্তিত্বের কাছে এরকম জোলো লেকচার কেউ আশা করেননি, অন্তত সন্তোষ ভট্টাচার্য মহাশয় তো নয়ই। সাধারণত স্পেশাল সেমিনারে প্রশ্নোত্তরের পালা থাকে না। যাইহোক, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে পি এইচ ডি করা এবং বহুদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সন্তোষ বাবু মুচকি হাসির মোড়কে বক্তৃতার পরিসমাপ্তি করলেন এই ভাবে, “Well, we expected a cup of hot aromatic coffee from Dr Ramanna, however, he entertained us with some light tea.” অর্থাৎ ডঃ রামান্নার কাছে আমরা গরম সুগন্ধী কফি আশা করেছিলাম। যাইহোক, উনি আমাদের হাল্কা চায়ে আপ্যায়ন সেরেছেন। এই হলেন সন্তোষ ভট্টাচার্য। 


মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একদিন ওঁকে মহাকরণে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এটা-ওটা কথার পর জ্যোতি বাবু নাকি ওঁকে বলেছিলেন, ‘শুনুন, যা হবার হয়ে গেছে। একটা কথা মনে রাখবেন, বেশি বাড়াবাড়ি কিন্ত করবেন না।‘ প্রচ্ছন্ন এই হুমকির কাছে মাথা নত করা তো দূরের কথা। তাঁর ভাবখানা ছিল ‘ আমি কি ডরাই কভু ভিখারি রাঘবে?’ সন্তোষ ভট্টাচার্য এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, কমিউন-এ থেকেছেন, চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগে তিনি জ্যোতি বাবুকে বলে গেলেন, ‘আমাকে ইট-পাটকেল ছুড়লে আমি কি রসগোল্লা ছুড়ব ? গুড বাই।‘

আলিমুদ্দিন স্ট্রীটের রোষানলের সব রকম নির্যাতন সহ্য করেও তিনি উপাচার্য হিসেবে তাঁর মেয়াদ সম্পূর্ণ করেছিলেন, কোনও দিন পুলিশ ডাকেননি, আর শাসক সরকারের সাহায্য পাওয়া তো ছিল দূর অস্ত। কিন্ত সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। একদিন মেট্রো সিনেমার সামনে ট্র্যাফিক লাইটে তাঁর গাড়ি থেমেছে। ডিউটিরত এক কনস্টেবল হঠাৎই তাঁর গাড়ির সামনে এসে স্যালুট করে বলল, ‘স্যর, আপনি চালিয়ে যান , আমরা আপনার সঙ্গে আছি।‘ এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে। আমার জানা নেই, রাজ্যের শাসক দলের সঙ্গে সারাজীবন লড়াই চালিয়ে, কার্যকালের মেয়াদ সম্পূর্ণ করা, ভারতবর্ষে আর কোনও রাজ্যে, কোনও উপাচার্যকে করতে হয়েছে কিনা। তাঁর লেখা, Red Hammer Over Calcutta University বইতে তাঁর অবস্থান উল্লেখ করে গেছেন। কঠোর অথচ ছাত্র দরদী মাস্টারমশাই সন্তোষ বাবুর আর একটা ঘটনা বলে ওঁর কথায় ইতি টানব।

১৯৮৪ সাল। কলকাতায় খুব লোডশেডিং চলছিল। বিডন রো-র পিজি হস্টেলের আবাসিক ছাত্ররা হস্টেলে একটি জেনারেটর বসানোর দাবি নিয়ে সন্তোষ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল দ্বারভাঙা ভবনে। তাদের আশা সন্তোষ বাবু ছাত্রদের দাবি নিশ্চয়ই পূরণ করবেন। সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনে স্মিত হেসে, তাঁর পরামর্শ, ‘ছাত্র বয়সেই তো কষ্ট স্বীকার করতে হবে। তালপাতার পাখা কিনে নাও সবাই। লোডশেডিং হলে তালপাতার পাখার বাতাস খাবে। আমার বাড়িতেও জেনারেটর নেই। আমিও তালপাতার পাখার বাতাস খাই। যাও ক্লাসে যাও। মন দিয়ে লেখা পড়া কর। ভাল রেজাল্ট করলে পরবর্তী জীবনে অনেক সুযোগসুবিধা পাবে।‘ তাঁর এই কথা শুনে সেদিন ছাত্ররা মাথা নিচু করে দ্বারভাঙা ভবনের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এসেছিল। অলিন্দ জুড়ে তখন চলছে : সন্তোষ ভট্টাচার্য গো ব্যাক।


বাম জমানাতে আরও একজন উপাচার্যের কথাও বলতে হয়। তিনি অত্যন্ত সফল   ডাক্তারবাবু, ডঃ ভাস্কর রায়চৌধুরী, তিনিও নিতান্তই ব্যতিক্রম। তাঁর কাছে খবর এল যে কর্মচারী সমিতির এক নেতা একটা অ্যাকাডেমিক ব্যাপারে ঝামেলা করছে। ভাস্কর বাবু সেই নেতাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘পার্টি করেন বলে আপনারা সবাই নিজেদের ভিসি মনে করেন ? মনে রাখবেন ভিসি একজনই, এবং তাঁর নাম ভাস্কর রায়চৌধুরী।‘


প্রথম পর্ব শুরু করেছিলাম বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুত  বাবুর উপাখ্যান দিয়ে। আজ তৃতীয় এবং শেষ পর্ব যে তাঁকে দিয়েই শেষ করতে হবে সেটা ভাবিনি। কী অদ্ভুত সমাপতন। ফেসবুকে পোস্ট করব করব ভাবছি। আজ সকালের কাগজেই উনি আবার খবরে চলে এসেছেন। উনি পাঁচদিন বিশ্বভারতী থেকে ছুটি নিয়েছেন। নানা মহলে চর্চা চলছে যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তলবে দিল্লি রওনা হয়েছেন উপাচার্য। দু'টি তত্ব চালু হয়েছে। এক, ছাত্রদের একাংশের লাগাতার আন্দোলন, একের পর এক বিতর্ক, অনলাইন বৈঠকে বলা কিছু মন্তব্য-সহ বিভিন্ন বিষয় জানতে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে বলে কিছু কিছু মহল থেকে দাবি করা হয়। দুই, বিশ্বভারতীতে কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাব নিয়ে মন্ত্রকের কাছে নালিশ জানাতে নিজেই দিল্লি যাচ্ছেন উপাচার্য। ভাবছি আমরা কী ছিলাম আর কী হয়েছি !

 


 বিঃ দ্রঃ : তিনটি পর্বের লেখাগুলোর প্রতিটি রীতিমত গবেষণা করে লেখা। কাজেই সব তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। ফলে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।

Monday, September 20, 2021

উপাচার্য উপাখ্যান দ্বিতীয় পর্ব

 উপাচার্য উপাখ্যান-কাল, যা দেখেছি।


সময়ের দূরবীন দিয়ে এবার পিছন ফিরে তাকাই। চোখের ওপর ভেসে ওঠে প্রায় সাড়ে সাত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে, ফেলে আসা সুখস্মৃতির কোলাজ। আমার সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর। আমাদের গর্বের জায়গা। ভূ-ভারতের শিল্প-সংস্থা, জাতীয় গবেষণাগার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর সিংহ ভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরা পশ্চিম বাংলার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল। জীবনের ফেলে আসা ওই সাড়ে সাত বছর, আমার স্মৃতিতে আজও চির সবুজ হয়ে আছে। ওই সময়ের মধ্যে তিনজন উপাচার্যকে দেখেছি, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক বিশেষ কালপর্বের উজ্জ্বল প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।   এঁরা হলেন ডঃ ত্রিগুণা সেন, হেমচন্দ্র গুহ এবং গোপাল সেন। শেষ জন অবশ্য কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য ছিলেন, অতি বামপন্থী ছাত্রদের পরীক্ষা বয়কটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সময়ে পরীক্ষা পরিচালনার দায়ভার নিয়ে। সেটাই তাঁর জীবনের অন্তিম কাল ডেকে এনেছিল।  বিস্তারিত বিবরণে পরে আসছি। তবে এই তিনজন  মানুষের অবদান এবং বিপুল বিস্তারের কতটুকুই বা লিখতে পারব! দুই মলাটের মধ্যেই এঁদের বন্দী করা সম্ভব। এই সুবিধা ফেসবুকের দেওয়াল লিখনে সম্ভব নয়।


শুরু করি প্রথম উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা দিয়ে। ১৯৬২ সালে আমরা যখন কলেজে ঢুকেছি তখন উপাচার্য পদটির নাম ছিল ‘রেকটর্'। কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়নি কখনও। তবে ব্যক্তিত্বের সৌম্য দ্যুতি এমনই উজ্জ্বল যে মনে হ'ত, এমন মানুষের ঘরে ঢুকতে গেলে জুতো জোড়া বাইরে রেখে ঢোকা উচিত। এমনই একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর ঠোঁটের ওপর সব সময় স্মিত প্রশান্তির হাসি অথচ চেহারায় একটা অভিজাত রোসনাই।  কখনও সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ না হলেও সব সময়ই মনে হয়েছে যে তিনি এমনই ব্যক্তিত্ব যিনি সাধারণ আর নিজের মধ্যে দুর্ভেদের অলীক দেওয়াল গড়ে তোলেননি অথচ কি অসাধারণ প্রশাসন ক্ষমতা এবং ছাত্রদরদী উপাচার্য। গুগল হাতড়ে একটি ঘটনাই আমার মন্তব্যকে সমর্থন করে।

সালটা ১৯৬৬। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ চলছে। কোনও উপাচার্যই টিকতে পারছেন না। ত্রিগুণা সেন সদ্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ ছেড়েছেন, নীতিগত কারণেই।  শিক্ষা কমিশনে তাঁরই সুপারিশ ছিল, কোনও উপাচার্যেরই দশ বছরের বেশি ওই পদে থাকা উচিত নয়। এবার তাঁর ইচ্ছা, রামকৃষ্ণ মিশনের কোনও স্কুলে পড়াবেন। কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে বিএইচইউ-র দায়িত্ব ভার নেবার অনুরোধ জানায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বেনারস স্টেশনে অপেক্ষা করছে। গণ্ডগোল এড়াতে বিএইচিউ কতৃপক্ষ ওঁকে মোগলসরাই স্টেশনে নামতে অনুরোধ করলেও, উনি নাছোড়। ছাত্রদের ভয় ? ১৯৪৩ সাল থেকে যিনি বর্ষে বর্ষে, দলে দলে ছাত্র সামলেছেন, তিনি কেন ভয় পাবেন? উপাচার্য বেনারসেই গেলেন, ছাত্রদের বললেন, তোমাদের যা কিছু সমস্যা, অভিযোগ যদি শুধু আমাকেই বলবে প্রতিশ্রুতি দাও, বাইরের কাউকে নয়, তাহলেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকব। ছাত্ররা তাঁর কথা মেনে নিয়েছিল। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মী সকলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই সেদিন শান্তি ফিরেছিল বিএইচইউ-তে। পরবর্তী জীবনে উনি কলকাতার মেয়র, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, কত না দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি, কিন্ত তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমে ছিল যাদবপুর। ছাত্রগতপ্রাণ মানুষটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন নিজের আদর্শ আর চরিত্রের দৃঢ়তায়। ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য ছিল তাঁর অবারিত দ্বার। যে খোলা মনে কথা বলার পরিবেশ তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা যাদবপুরের গর্ব। 


শ্রদ্ধেয় ত্রিগুণা সেনের পরে তাঁর জায়গা অলঙ্কৃত করেন গুহ সাহেব। হেমচন্দ্র গুহ। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং সর্বময় কর্তা, একই সঙ্গে অসাধারণ শিক্ষক। ওঁর ব্যক্তিত্ব ত্রিগুণা সেনের একদম বিপরীত মেরুতে। ক্লাসে ছাত্রদের আকথা-কুকথা বললেও কোনও ছাত্রের সাহস ছিল না যে কোনোদিন তারা ক্লাস ফাঁকি দেয়। ছাত্রদের মাঝেমধ্যে চড়-থাপ্পড় মারতেও দ্বিধা করতেন না। এমনই রাসভারি মানুষ যে মনে হ'ত মুখোমুখি কথা বলতে গেলে ব্যক্তিত্বের বর্মের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হবার সম্ভাবনা আছে। আমার দাদা ১৯৬৩ সালে ওই ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তাঁর কথায়, “ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং যতটুকু শিখেছি তার সিংহ ভাগ ওঁরই অবদান।“ আমাদের সমসাময়িক ওই ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের কাছেও আমার দাদার কথারই অনুরণন শুনেছি। তিরিক্ষে মেজাজের মানুষের ছাত্র দরদের প্রমাণ তাহলে কোথায়! এর চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল মন্ত্রমুগ্ধ করা ক্লাস নেবার ধরনে। এমন নিখুঁত পড়াবার ধরণ যে ছাত্রদের প্রশ্ন করার কোনও জায়গা থাকত না। গুহ সাহেব অবসরের দোরগোড়ায় পৌঁছে উপাচার্য হয়েছিলেন। কাজেই ওঁর উপাচার্যের কার্যকাল সাকুল্যে দু'এক বছরের বেশি নয়। ছাত্ররা ওঁকে ভীষণ ভয় পেত। কিন্ত শ্রদ্ধা মেশানো সেই ভয়ের জাত ছিল অন্য রকম। সেটা অনুভূতির ব্যপার। উল্লেখ্য যে, উপাচার্যের দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গেই উনি নিয়মিত ক্লাস নিতেন। আর একটা ঘটনার উল্লেখ করে গুহ সাহেবের কথা শেষ করব। ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকে সত্যেনদার বিখ্যাত ক্যান্টিন।  গুহ সাহেব ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়া মাত্রই, ক্যান্টিনের হৈচৈ স্তব্ধ হয়ে যেত, যতক্ষণ না উনি দৃষ্টির বাইরে চলে যান। অথচ উনি হাঁটতেন মাথা নিচু করে। উনি ছাত্রদের অসুবিধার কারণ হয়েছেন বলে কখনও শোনা যায়নি।


এরপর আসেন গোপাল সেন। তিনি তখন ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ডীন। পরবর্তী সময় উনি কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য হয়েছিলেন। ওঁর সঙ্গে ১৫ মিনিট মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। মাস্টার্সের থিসিস জমা দেবার আগে ডীনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এটা একটা নিয়ম মাফিক ব্যাপার। ডীনের একটা স্বাক্ষর। আমার থিসিস শিরোনাম ছিল, “ফায়ারিং সার্কিট অফ এ থাইরিস্টার কন্ট্রোলড্ পাওয়ার সাপ্লাই।“ অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকতেই হাত উঠিয়ে চেয়ারে বসবার ইঙ্গিত দিলেন। থিসিসের শিরোনাম দেখে ছদ্ম বিস্ময়ের ভঙ্গীতে ভ্রুকুঞ্চিত করে জিজ্ঞেস করলেন,-”করেছ কি ! নেভালে কী করে!” এরপর থিসিসের সম্বন্ধে দু'চার কথা বলে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দ্বিধায় সই করে দিলেন। পারস্পরিক বাক্যালাপের উষ্ণতায় বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে ওইটুকু সময়ের মধ্যে আমার অল্প জ্ঞানের স্বল্প বাক্য বিনিময়ের আদান-প্রদান আমাদের সম্পর্ককে নৈকট্য দিল। ওইটুকু সময়ের কথোপকথন প্রায় পঞ্চান্ন বছর বাদেও আমার স্মৃতিতে আজও সমান সতেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাটানো ওই সাড়ে সাত বছর আমার জীবনে স্বর্ণযুগ। আমি বি ই, এম ই এবং কলকাতা না ছাড়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়াতে প্রায় মাস ছয়েক গবেষণা সংক্রান্ত কাজে যুক্ত হয়েছিলাম। চাকরির অবস্থা খারাপ হবার ফলে শেষ পর্যন্ত কলকাতা ছাড়তেই হ’ল। 

ছাত্রদরদী অস্থায়ী উপাচার্য কোনো ভাতা নিতেন না; গাড়ি ব্যবহার করতেন না। এমনকি উপাচার্যের চেয়ারেও বসতেন না। সত্তরের দশকের শুরুতেই উগ্র বামদল ফতোয়া দিল, -“বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হোক, পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল হোক।“ শিক্ষককুল সন্ত্রস্ত; অকুতোভয় উপাচার্য নারাজ। প্রাণ নাশের হুমকি সত্বেও, উপাচার্য নির্বিঘ্নে পরীক্ষা নিলেন। পুজোর ছুটি পড়ে যাওয়ায় ছাত্ররা পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট নেবে কী ভাবে ? ওঁর সহজ সমাধান। ছাত্রদরদী উপাচার্য ঘোষণা করলেন ছুটিতে ছাত্ররা উপাচার্যের বাড়িতে এসে প্রভিশনাল সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারে। সেই ছুটিতে সকাল-বিকেল তাঁর বাড়িতে ছাত্রদের ভিড়। উপাচার্য নিজের হাতে বিলি করেছেন সার্টিফিকেট। অবসরের আগের দিন, তিরিশে ডিসেম্বর, ১৯৭০ সাল। ক্যাম্পাসের মধ্যেই বাড়ি ফেরার পথে অতি বাম ধারায় উদ্বুদ্ধ নকশালপন্থী ওঁরই ছাত্ররা নৃশংস ভাবে তাঁকে খুন করে। জনশ্রুতি,  শ্রেণীশত্রু গোপাল সেনকে পিছন থেকে ছুরি মেরেছিলেন যে কমরেড, তিনি নাকি কলকাতার এক বিখ্যাত ডাক্তারের ছেলে; ধরা পড়েনি; তাঁকে রাতারাতি পুঁজিবাদের পীঠস্থান মার্কিন রাজ্যে পাঠিয়ে দেন তাঁর ডাক্তার বাবা। সেই শুরু শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রবেশ। একটা কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানে ব্যাপক পরিকাঠামো অত্যন্ত জরুরী। যে তিনজন যশ্বসী উপাচার্যের সম্বন্ধে আলোচিত হল, তাঁদের সময়ে পরিকাঠামো তৈরি করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, টাকাকড়ির টানাটানি ছাড়াও আরও অনেক প্রতিন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্ত তাঁরাই ছিলেন এই পরিকাঠামো সৃষ্টি করার প্রধান স্থপতি। তাঁদের নিরলস পরিশ্রমের ফসলই আজকের যাদবপুর।

উপাচার্য উপাখ্যান প্রথম পর্ব

 উপাচার্য উপাখ্যান, আজ কাল পরশু/ যা দেখছি, যা দেখেছি, যা শুনেছি।


এই দেওয়াল লিখনটা তিন পর্বে ভাগ করে নিচ্ছি। কারণ এক খন্ডে প্রকাশ করলে অনেকটা বড় হয়ে গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে, অথচ অনেক কিছু তুলে ধরার আছে, বিশেষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের প্রজন্মের কাছে। ফেসবুকে দীর্ঘ লেখা পড়তে আমার ধৈর্য থাকে না। কাজেই এই কৌশল। 


আজকের পর্ব উপাচার্য উপাখ্যান - আজ, অর্থাৎ যা দেখছি।


 শিক্ষাঙ্গনের শিরোনামে এখন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, মাননীয় বিদ্যুত চক্রবর্তী মহাশয়। ৭ই অগাস্ট অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম সার্ধশতবর্ষ কেটে গেল (জন্ম ১৮৭১ সালের ঐ দিনটিতে)। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর শিল্পচর্চার আদিগুরু তথা এক সময়ের আচার্য। তাঁর সার্ধশতবর্ষ এমন মৌনতায় কাটবে, তা ভাবেননি ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর। উপাচার্য মহাশয়ের কোনও হেলদোল নেই। উনি বর্তমান আচার্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কিছুই করেন না। অনলাইনে যখন ক্লাস, মিটিং ইত্যাদি দিব্যি চলছে, তখন প্রতীকি অনুষ্ঠান হিসেবে কিছুই কি করার যেত না ? মাননীয় উপাচার্যের কানেই  হয়তো তিনি কথাটা তোলেননি, যদি চাকরি চলে যায়।

 অথচ, অমর্ত্য সেনের শান্তিনিকেতনের বাড়ির জমির কিছুটা বিশ্বভারতীর সম্পত্তির অংশ বলে দাবি করেছিলেন তিনি এবং নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বিদ্যুৎগতিতে আচার্যের নজরে আনেন। কারণ উনি জানতেন যে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে  অমর্ত্য সেনের সঙ্গে মোদীজীর সম্পর্ক আর যাই হোক মধুর নয়। অমর্ত্য বাবু বৈধ কাগজপত্র দাখিল করে প্রমাণ দিয়েছেন যে ওঁর বাড়ি প্রতিচীর চৌহদ্দি বহু বছরের ইজারায় নেওয়া হয়েছিল যার মেয়াদ শেষ হতে এখনও বহু বছর বাকি।


সাম্প্রতিক কালে বিদ্যুত বাবু অতি সক্রিয়তায় ছাত্র-ছাত্রী সমেত তিনজনকে বহিষ্কার করেছেন। ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে ওঁকে গৃহবন্দী করায় আঞ্চলিক পুলিশ প্রশাসনের নজরে এনেছেন। শেষমেষ উনি আচার্যের স্মরণাপন্ন হয়েছেন। কেবল ছাত্র বহিষ্কারে উনি থেমে থাকেননি। আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ যে সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের আটজনকে বরখাস্ত করেছেন, ঊনিশ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, আট জনের বেতন এবং অবসরকালীন প্রাপ্তি আটকানো ও তিরিশ জনের অধিক কর্মীকে শোকজ নোটিস ধরানো হয়েছে। একাধিক শিক্ষককে সর্বসমক্ষে অশালীন ভাষায় অপমান করারও অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। উপাচার্যকে যেখানে আমরা অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত,বিদ্যুত বাবুর আচরণ সেখানে স্বৈরতান্রিক শাসকের ভূমিকা পালন করছে। অত্যন্ত বেদনাদায়ক।


এবার আসি আরও এক উপাচার্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক সুরঞ্জন দাসের পূর্বসূরি, অভিজিত চক্রবর্তী মহাশয়ের আখ্যানে। কি আশ্চর্য, তিনিও ছিলেন চক্রবর্তী। উনি ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশ ডেকেছিলেন। এই সিদ্ধান্তে  শিক্ষককুলের একাংশের আপত্তিতে উনি কর্ণপাত করেননি। দীর্ঘ চার মাসের টানাপোড়েনে অচলাবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে অনশনরত ছাত্র-ছাত্রীদের অনশন ভঙ্গে অনুরোধ জানাতে প্রায় মাঝরাতে রাজ্যের  মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হয়। শোনা যায় অভিজিত বাবু ছিলেন তৃণমূল ঘেঁষা। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে ওঁকে পদত্যাগ করতে হয়। শিক্ষাঙ্গনে পুলিশের হস্তক্ষেপ শুধু লজ্জার নয়, তা প্রমাণ করে ধামাধরা উপাচার্যদের অক্ষমতাও বটে।


এরই মধ্যে রূপোলি রেখা হলেন বর্তমান উপাচার্য ইতিহাসবিদ, শ্রদ্ধেয় সুরঞ্জন দাস মহাশয়। আগে উনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। শুধু একটা ঘটনাই প্রমাণ করে যে আজকের দিনেও উনি কতটা ছাত্রদরদী। মাত্র বছর দুয়েকের আগের ঘটনা। ধনখড় সাহেব তখন সবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে চেয়ারে বসেছেন। সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী বাবুলসুপ্রিয় এবিভিপি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় অংশগ্রহণে  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। ওঁকে কালো পতাকা দেখানো ছাড়াও ছাত্রদের ওঁর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতেও লিপ্ত হতে দেখা গেছে। এই আচরণ আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়, বরং যথেষ্ট নিন্দনীয়। আচার্য, ধনখড় সাহেব রাজভবন থেকে পুলিশ নিয়ে এসে বাবুলসুপ্রিয়র উদ্ধার কাজে লেগে পড়লেন। মন্ত্রীমশাই উপাচার্যকে ডেকে পাঠালেন এবং উপাচার্য পদমর্যাদার একজনকে অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গীতে, কৈফিয়ত তলব করেন কেন উনি পুলিশ ডাকেননি। উপাচার্য বলেছিলেন, "পুলিশ ডাকার আগে আমি পদত্যাগ করব।" এগুলো শুধু কাগজের খবর নয়, স্বচক্ষে টিভির পর্দায় দেখা। আর একদিকে এবিভিপির নেতা-কর্মীরা ভাঙচুর চালালো। ভাঙচুরের তালিকায় আসবাব ছাড়াও ছিল কিছু শিল্পকর্ম। এরপর অগ্নি সংযোগে লিপ্ত হ'ল। মন্ত্রীমশাই এবং রাজ্যপাল সাহেব উপাচার্যের ওপর বিষোদ্গার করলেও, এবিভিপির নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে একটি কথাও খরচ করলেন না।


শুরু করেছিলাম বিদ্যুত বাবুর কথা দিয়ে। তাঁর  কথা দিয়েই এই পর্বের ইতি টানব। ইতিমধ্যে বহিষ্কৃত ছাত্ররা আইনি লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছিল। সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতিরা উপাচার্যের এই শাস্তি বিধানকে ভর্ৎসনা করে রায় দিয়েছেন, এটা লঘুপাপে গুরুদন্ড দেওয়া হয়েছে এবং ছাত্রদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ সমেত অবিলম্বে ক্লাসঘরে ফিরিয়ে নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়াও, উপাচার্য মহাশয়কে কোনও বিতর্কিত মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের তরফে বিনা পারিশ্রমিকে  আইনজীবী ছিলেন রাজ্যসভার সি পি এমের সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য।  যাইহোক, মোদ্দাকথা, টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোর্ট পর্যন্ত গড়ালো এবং যথারীতি বিদ্যুত বাবুর মুখও পুড়ল। প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে উপাচার্যের ভূমিকা যেখানে সর্বাধিক হবার কথা, সেখানে এটা কি প্রত্যাশিত! বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে এসে আচার্য, মাননীয় নরেন্দ্র মোদী রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে ,"ভয়শূন্য চিত্ত এবং মুক্ত জ্ঞানের কথা বলে গিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেই উনি আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখতে চান।" বদলে দেখা যাচ্ছে যে সেখানে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভয় আর বিশ্বাসহীনতার পরিস্থিতি। শিক্ষক, ছাত্র, কর্মী আশ্রমিক থেকে স্থানীয়দের একাংশ নানা কারণে উপাচার্যের বিরোধিতা করছেন। উনি একটি আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ে নির্দিষ্ট বিভাগের ফ্যাকাল্টিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, "তাঁদের আচরণ কুকুরের মতো।" বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে এই অপসংস্কৃতি আসলে শিক্ষাব্যবস্থার রাজনীতিকরণের ফল, যা সিপিএম সরকারের আমদানি, এবং শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের শুরুতে। সেই ট্র্যাডিসন সমানে চলেছে। আশার কথা, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মাননীয় ধর্মেন্দ্র  প্রধান বিশ্বভারতীর এই অচলাবস্থা কাটানোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছেন, সম্ভবত মোদীজীর পরামর্শে। প্রথম পর্বের আখ্যান এই পর্যন্ত। পরের পর্বগুলো এতটা দীর্ঘ নয় , কারণ সেগুলো আদৌ এরকম ঘটনাবহুল  নয়।

Thursday, September 16, 2021

Pakistan, a parasite

 Pakistan, a parasite state and it's complicity with the Taliban:


Soon after capture of Kabul by the Taliban, on this date of last month, Pakistani PM, Imran Khan's immediate reaction, "Afghan breaks shackles of slavery." A short time later, chief of ISI, the most clandestine organisation of the world, dashed to Kabul on a surprise visit, holding a meeting with his counterparts from countries in the region with the begging bowl. He is the man, orchestrated in the formation of the Taliban led Afghanistan govt. in Kabul as evident from the composition of Afghanistan govt. Concurrently he pledged for Pakistan's support to Afghanistan to get rid of the deepening humanitarian crisis and to take steps to prevent economic meltdown. In a display of solidarity, Pakistan sent three plane loads of relief to Kabul; however, reports indicate these were photo-ops with limited aid.


All political and military entities in Pakistan are singing the same tune of global economic and humanitarian support to Afghanistan. The main reason behind this is that Pakistan itself is  in financial doldrums and facing food shortages. It cannot afford to fund and feed an additional 40 million without global support.


 But when the world was demanding an inclusive govt. in Kabul with emphasis on women and children, in return for financial support, Pakistan was engaged in creating a govt. in Kabul dominated by pro-Pak elements. The current dispensation in Kabul includes 30 Pashtuns, two Tajiks and one Uzbek. Incidentally, the North Western part of Pakistan is often referred to as the PASHTUNISTAN region where 44 million of Pashtuns, almost 20% of Pak population lives. Whereas, the Pashtun population in Afghanistan itself is just about 15 million out of about a total of 40 million people.


Pakistan has always been a parasite state - holding hands of super powers, it's all weather ally China and USA post 9/11. The country has ever acted as a sanctuary of terrorists as evidenced by providing shelter to the world's most wanted terrorist al-Qiada supremo, Osama bin Laden (I put all the the extremist groups like al-Qaida, Taliban, Mujahideen etc. under the same bracket) in Abbotabad for years, on the nose of ISI head quarters, before being located and killed by American Navy SEAL. At the same time it professed to be a US ally in its fight against global terrorism and in the process obtaining substantial aid in terms of dollars, the signs of all parasites that feed on its host.

Sunday, September 12, 2021

ভবানীপুরের উপনির্বাচনের প্রার্থীরা

 


ভবানীপুর কেন্দ্রের ৮-টি ওয়ার্ডের ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আরও একটি সুযোগ আসছে আগামী ৩০ তারিখ। তৃণমূল, বি জে পি এবং সি পি এম দলের প্রার্থী ঘোষণা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।  বলাই বাহুল্য যে তৃণমূল প্রার্থী হলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশ্ন উঠেছিল, আরও কয়েকটা জায়গার উপনির্বাচনও তো হবার কথা। সব বাদ দিয়ে তড়িঘড়ি ভবানীপুরের নির্বাচন আগে কেন ? এক কথায়, সাংবিধানিক সংকট এড়াতে। কারণ তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সীতে, অথচ বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গেছেন। নিয়ম অনুযায়ী,  একজন হেরে যাওয়া প্রার্থীকে ছ'মাসের মধ্যে ভোটে জিতে না আসলে, তিনি বিধান সভার সভ্য থাকতে পারেন না। আর এখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী আর বাংলা ওঁকেই চায় ওই চেয়ারে।ppp

যাইহোক, এবারের প্রার্থীদের মধ্যে এক জায়গায় মিল আছে। তাঁরা তিনজনেই আইনের মানুষ, আমাদের দিদি ছাড়া বাকি দু'জন রীতিমত পেশাদার উকিল। দিদি একবার বলেওছিলেন তিনি নাকি কয়েকবার কেস লড়েছেন ! এল এল বি ডিগ্রি হয়তো আছে একটা। নিশ্চিত ভাবে আমার জানা নেই।

সি পি এম গত পরশু, শ্রীজীব বিশ্বাসকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। সি পি এম এখনও আশাবাদী দেখে আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনুপ্রেরণা পেয়েছি।অনেকটা বয়স হয়ে গেলেও এবং যথেষ্ট সক্রিয় হওয়া সত্বেও সম্প্রতি বেশ কিছুদিন শারীরিক অসুস্থতা আমাকে কাবু করে ফেলেছে। আমার হতাশ হবার কোনও  কারণ নেই যে, আমি আবার স্বাস্থ্যোদ্ধার করতে পারব না।

এবার আসি বি জে পি প্রার্থী, শ্রীমতী প্রিয়াঙ্কা তিবরেওয়ালের কথায়। তিনিও গত বিধানসভার নির্বাচনে এন্টালি কেন্দ্র থেকে পরাজিত প্রার্থী। এর আগে ২০১৫ সালে পুরসভা নির্বাচনেও তিনি হেরে গেছিলেন। গতকাল, গণেশ চতুর্থীর শুভলগ্নে দিদি মনোনয়ন জমা করলেন। বিকেলে বি জে পি প্রার্থী ঘোষণা হ'ল। এখন প্রশ্ন হ'ল, রাজ্য বি জে পি তরফ থেকে অনেক নাম পাঠানো হয়েছিল হাই কমান্ডের কাছে। কিন্ত প্রিয়াঙ্কাকে বেছে নেবার কারণ কি ? অনেকগুলো তত্ব উঠে এসেছে।

(১) দিল্লির কর্তাদের একটাই পথ জানা আছে। রাজ্যে ক্ষমতায় যে সরকার আছে, তাকে যে বা যারা অপদস্থ করতে পারবে সেই পুরস্কৃত হবে। প্রিয়াঙ্কা বি জে পি হাইকমান্ডের নজরে এসেছেন কারণ, ভোট পরবর্তী হিংসার সি বি আই তদন্ত চেয়ে বি জে পি-র পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন পিয়াঙ্কাই। একদম সঠিক পদক্ষেপ। প্রিয়াঙ্কার জন্য শুভেচ্ছা রইল। শুধু একটা উপদেশ। প্রচারের আগে আশা করব প্রিয়াঙ্কা নিজের বাঙলা উচ্চারণে একটু শাণ দিয়ে নেবেন।

(২) রাজ্য সভাপতি দিলীপ বাবুর তত্ব হ'ল, "একজন মহিলার বিরুদ্ধে একজন মহিলাকে সামনে রেখে লড়াই ভাল। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী প্রতিকূলতা দেখলেই নাকি বলেন, মহিলাকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কাজেই মহিলা হিসেবে তিনি যাতে বাড়তি রক্ষাকবচ না পান, তার জন্য একজন মহিলাকে প্রার্থী করা হয়েছে, - একেবারেই জোলো যুক্তি বলেই আমার মনে হয়েছে।

(৩) আমার নিজের যুক্তিটা এরকম- জনবিন্যাসের ভিত্তিতে ভবানীপুরের একটা বড় অংশ অবাঙালী। কাজেই সেখানে হয়তো প্রিয়াঙ্কার একটা বাড়তি সুবিধে পাবার সম্ভাবনা আছে।

সময় কথা বলবে। কাজেই সব সম্ভাবনার অবসান হবে আগামী মাসের তিন তারিখ।

Tuesday, September 7, 2021

INDIA's foreign policy

 


Although I'm anything but expert on commenting on Govt. of India's foreign policy. But, being a very senior and responsible citizen of the country, I've some feel, based mainly on experience, for the safety and security of my motherland.

Presently India is bordered only by the rogue countries with routine skirmishes and cross border firings and substantial fatalities at times. Although our honourable PM made very sincere effort to establish good relations to more or less all the countries on the globe including Pakistan. (surprise visit to Mr.Nawaz Sharif's family occasion on his way back to India from Russia during the early part of his first term.) Pakistan once appeared to be caving in to American pressure, is now strong enough, holding hand of it's all- weather-friend China and now mighty Taliban by it's side. 

Time has now come for India, still considered a US ally, to judge its foreign policy anew, particularly after the American fiasco in Afghanistan. Recently Mr. Modi had one hour long telecon with Mr Putin. He seems to keep also other options open and that's the reason he's slated to meet Mr Biden by the turn of this month. But it's a very humble reminder to Mr. Modi that despite India being actively engaged in QUAD, America only prioritizes its own interest. In Biden's predecessor, Trump's language "AMERICA FIRST" is the American policy.  One should not forget that once Pakistan was the closest non-NATO ally of US. presently US-Pakistan relation is at an ebb.

Under the prevailing circumstances India should not distance itself from her time-tested ally Russia.

অভিষেক প্রেসের মুখোমুখি

 এ বি পি আনন্দ channel-এ এইমাত্র দেখলাম যে, অভিষেক ED-র ৮ ঘন্টা জেরা সামলে PRESS COFERENCE করছে। একটা ব্যাপার appreciate করতেই হচ্ছে। পিসির মতো ওর জোস এবং আত্মবিশ্বাস আছে। আর ইংরেজি, বাংলা এবং হিন্দী ভাষায় ঠান্ডা মাথায় (unlike his aunt) অথচ বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে কথা বলায় সমান স্বচ্ছন্দ। ওর leadership quality আছে বলেই মনে হয়েছে আমার। কোনও বিতর্কে যাচ্ছি না।

Friday, September 3, 2021

Hurricane Ida

 North East part of US has been terribly affected by the hurricane 'Ida'. Newspaper reports 20 dead in flooding in a small Tennessee town (population about 6.7 million). Ida's land fall in Louisiana (population 4.6 million) left 1 million people without power, for weekS, meaning more than at least, 7 days. Yesterday my niece, a resident of DC messaged me that she's receiving calls from friends from different corners of NE of US that they are without power from Monday (she writes since Tuesday which is our Monday) indicating today they're without power for the fifth day. 

With this backdrop,  I come to  one of my experiences during AMPHAN 2020 in West Bengal. Its from one of the very senior CESC personnel, grandson in terms of relation, with distinguished academic profile, the son of my own niece. At that time, I just gave him a call to assess the situation. I write in exact verbatim "Dadu amra khub chape acchi, dudin bari jete parini" , (Grandpa, we're under tremendous pressure, I couldn't go home for two consecutive days) On enquiry I was informed that in one side the pressure from WB ruling party and at the other end the unreasonable and furious local residents. In Kolkata (population almost 14 million and densely dotted with buildings) the power were restored in 4/5 days except in some very specific places in deep south like Behala and Tollygunge who faced  power shedding for a week or so. 

My conclusion is that, we urban people are not only impatient but not amenable to logic how a catastrophic situation impacts the public life from a natural calamity of the magnitude of AMPHAN. The fatality figure in WB(population about 96 million) was 118. Readers are requested to compare with the US data. The problem is that the service providers are always at the receiving end and there's a tremendous trust deficit between the service takers (whose expectation levels are very high) and service givers. Urbanites in this country in particular, should think themselves to be extremely privileged, certainly comparable to the privileges enjoyed by the people of world's most developed countries with most modern infrastructure. At least the data explains that.