Monday, September 20, 2021

উপাচার্য উপাখ্যান দ্বিতীয় পর্ব

 উপাচার্য উপাখ্যান-কাল, যা দেখেছি।


সময়ের দূরবীন দিয়ে এবার পিছন ফিরে তাকাই। চোখের ওপর ভেসে ওঠে প্রায় সাড়ে সাত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে, ফেলে আসা সুখস্মৃতির কোলাজ। আমার সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর। আমাদের গর্বের জায়গা। ভূ-ভারতের শিল্প-সংস্থা, জাতীয় গবেষণাগার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর সিংহ ভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরা পশ্চিম বাংলার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল। জীবনের ফেলে আসা ওই সাড়ে সাত বছর, আমার স্মৃতিতে আজও চির সবুজ হয়ে আছে। ওই সময়ের মধ্যে তিনজন উপাচার্যকে দেখেছি, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক বিশেষ কালপর্বের উজ্জ্বল প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।   এঁরা হলেন ডঃ ত্রিগুণা সেন, হেমচন্দ্র গুহ এবং গোপাল সেন। শেষ জন অবশ্য কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য ছিলেন, অতি বামপন্থী ছাত্রদের পরীক্ষা বয়কটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সময়ে পরীক্ষা পরিচালনার দায়ভার নিয়ে। সেটাই তাঁর জীবনের অন্তিম কাল ডেকে এনেছিল।  বিস্তারিত বিবরণে পরে আসছি। তবে এই তিনজন  মানুষের অবদান এবং বিপুল বিস্তারের কতটুকুই বা লিখতে পারব! দুই মলাটের মধ্যেই এঁদের বন্দী করা সম্ভব। এই সুবিধা ফেসবুকের দেওয়াল লিখনে সম্ভব নয়।


শুরু করি প্রথম উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা দিয়ে। ১৯৬২ সালে আমরা যখন কলেজে ঢুকেছি তখন উপাচার্য পদটির নাম ছিল ‘রেকটর্'। কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়নি কখনও। তবে ব্যক্তিত্বের সৌম্য দ্যুতি এমনই উজ্জ্বল যে মনে হ'ত, এমন মানুষের ঘরে ঢুকতে গেলে জুতো জোড়া বাইরে রেখে ঢোকা উচিত। এমনই একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর ঠোঁটের ওপর সব সময় স্মিত প্রশান্তির হাসি অথচ চেহারায় একটা অভিজাত রোসনাই।  কখনও সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ না হলেও সব সময়ই মনে হয়েছে যে তিনি এমনই ব্যক্তিত্ব যিনি সাধারণ আর নিজের মধ্যে দুর্ভেদের অলীক দেওয়াল গড়ে তোলেননি অথচ কি অসাধারণ প্রশাসন ক্ষমতা এবং ছাত্রদরদী উপাচার্য। গুগল হাতড়ে একটি ঘটনাই আমার মন্তব্যকে সমর্থন করে।

সালটা ১৯৬৬। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ চলছে। কোনও উপাচার্যই টিকতে পারছেন না। ত্রিগুণা সেন সদ্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ ছেড়েছেন, নীতিগত কারণেই।  শিক্ষা কমিশনে তাঁরই সুপারিশ ছিল, কোনও উপাচার্যেরই দশ বছরের বেশি ওই পদে থাকা উচিত নয়। এবার তাঁর ইচ্ছা, রামকৃষ্ণ মিশনের কোনও স্কুলে পড়াবেন। কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে বিএইচইউ-র দায়িত্ব ভার নেবার অনুরোধ জানায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বেনারস স্টেশনে অপেক্ষা করছে। গণ্ডগোল এড়াতে বিএইচিউ কতৃপক্ষ ওঁকে মোগলসরাই স্টেশনে নামতে অনুরোধ করলেও, উনি নাছোড়। ছাত্রদের ভয় ? ১৯৪৩ সাল থেকে যিনি বর্ষে বর্ষে, দলে দলে ছাত্র সামলেছেন, তিনি কেন ভয় পাবেন? উপাচার্য বেনারসেই গেলেন, ছাত্রদের বললেন, তোমাদের যা কিছু সমস্যা, অভিযোগ যদি শুধু আমাকেই বলবে প্রতিশ্রুতি দাও, বাইরের কাউকে নয়, তাহলেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকব। ছাত্ররা তাঁর কথা মেনে নিয়েছিল। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মী সকলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই সেদিন শান্তি ফিরেছিল বিএইচইউ-তে। পরবর্তী জীবনে উনি কলকাতার মেয়র, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, কত না দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি, কিন্ত তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমে ছিল যাদবপুর। ছাত্রগতপ্রাণ মানুষটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন নিজের আদর্শ আর চরিত্রের দৃঢ়তায়। ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য ছিল তাঁর অবারিত দ্বার। যে খোলা মনে কথা বলার পরিবেশ তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা যাদবপুরের গর্ব। 


শ্রদ্ধেয় ত্রিগুণা সেনের পরে তাঁর জায়গা অলঙ্কৃত করেন গুহ সাহেব। হেমচন্দ্র গুহ। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং সর্বময় কর্তা, একই সঙ্গে অসাধারণ শিক্ষক। ওঁর ব্যক্তিত্ব ত্রিগুণা সেনের একদম বিপরীত মেরুতে। ক্লাসে ছাত্রদের আকথা-কুকথা বললেও কোনও ছাত্রের সাহস ছিল না যে কোনোদিন তারা ক্লাস ফাঁকি দেয়। ছাত্রদের মাঝেমধ্যে চড়-থাপ্পড় মারতেও দ্বিধা করতেন না। এমনই রাসভারি মানুষ যে মনে হ'ত মুখোমুখি কথা বলতে গেলে ব্যক্তিত্বের বর্মের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হবার সম্ভাবনা আছে। আমার দাদা ১৯৬৩ সালে ওই ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তাঁর কথায়, “ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং যতটুকু শিখেছি তার সিংহ ভাগ ওঁরই অবদান।“ আমাদের সমসাময়িক ওই ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের কাছেও আমার দাদার কথারই অনুরণন শুনেছি। তিরিক্ষে মেজাজের মানুষের ছাত্র দরদের প্রমাণ তাহলে কোথায়! এর চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল মন্ত্রমুগ্ধ করা ক্লাস নেবার ধরনে। এমন নিখুঁত পড়াবার ধরণ যে ছাত্রদের প্রশ্ন করার কোনও জায়গা থাকত না। গুহ সাহেব অবসরের দোরগোড়ায় পৌঁছে উপাচার্য হয়েছিলেন। কাজেই ওঁর উপাচার্যের কার্যকাল সাকুল্যে দু'এক বছরের বেশি নয়। ছাত্ররা ওঁকে ভীষণ ভয় পেত। কিন্ত শ্রদ্ধা মেশানো সেই ভয়ের জাত ছিল অন্য রকম। সেটা অনুভূতির ব্যপার। উল্লেখ্য যে, উপাচার্যের দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গেই উনি নিয়মিত ক্লাস নিতেন। আর একটা ঘটনার উল্লেখ করে গুহ সাহেবের কথা শেষ করব। ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকে সত্যেনদার বিখ্যাত ক্যান্টিন।  গুহ সাহেব ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়া মাত্রই, ক্যান্টিনের হৈচৈ স্তব্ধ হয়ে যেত, যতক্ষণ না উনি দৃষ্টির বাইরে চলে যান। অথচ উনি হাঁটতেন মাথা নিচু করে। উনি ছাত্রদের অসুবিধার কারণ হয়েছেন বলে কখনও শোনা যায়নি।


এরপর আসেন গোপাল সেন। তিনি তখন ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ডীন। পরবর্তী সময় উনি কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য হয়েছিলেন। ওঁর সঙ্গে ১৫ মিনিট মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। মাস্টার্সের থিসিস জমা দেবার আগে ডীনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এটা একটা নিয়ম মাফিক ব্যাপার। ডীনের একটা স্বাক্ষর। আমার থিসিস শিরোনাম ছিল, “ফায়ারিং সার্কিট অফ এ থাইরিস্টার কন্ট্রোলড্ পাওয়ার সাপ্লাই।“ অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকতেই হাত উঠিয়ে চেয়ারে বসবার ইঙ্গিত দিলেন। থিসিসের শিরোনাম দেখে ছদ্ম বিস্ময়ের ভঙ্গীতে ভ্রুকুঞ্চিত করে জিজ্ঞেস করলেন,-”করেছ কি ! নেভালে কী করে!” এরপর থিসিসের সম্বন্ধে দু'চার কথা বলে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দ্বিধায় সই করে দিলেন। পারস্পরিক বাক্যালাপের উষ্ণতায় বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে ওইটুকু সময়ের মধ্যে আমার অল্প জ্ঞানের স্বল্প বাক্য বিনিময়ের আদান-প্রদান আমাদের সম্পর্ককে নৈকট্য দিল। ওইটুকু সময়ের কথোপকথন প্রায় পঞ্চান্ন বছর বাদেও আমার স্মৃতিতে আজও সমান সতেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাটানো ওই সাড়ে সাত বছর আমার জীবনে স্বর্ণযুগ। আমি বি ই, এম ই এবং কলকাতা না ছাড়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়াতে প্রায় মাস ছয়েক গবেষণা সংক্রান্ত কাজে যুক্ত হয়েছিলাম। চাকরির অবস্থা খারাপ হবার ফলে শেষ পর্যন্ত কলকাতা ছাড়তেই হ’ল। 

ছাত্রদরদী অস্থায়ী উপাচার্য কোনো ভাতা নিতেন না; গাড়ি ব্যবহার করতেন না। এমনকি উপাচার্যের চেয়ারেও বসতেন না। সত্তরের দশকের শুরুতেই উগ্র বামদল ফতোয়া দিল, -“বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হোক, পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল হোক।“ শিক্ষককুল সন্ত্রস্ত; অকুতোভয় উপাচার্য নারাজ। প্রাণ নাশের হুমকি সত্বেও, উপাচার্য নির্বিঘ্নে পরীক্ষা নিলেন। পুজোর ছুটি পড়ে যাওয়ায় ছাত্ররা পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট নেবে কী ভাবে ? ওঁর সহজ সমাধান। ছাত্রদরদী উপাচার্য ঘোষণা করলেন ছুটিতে ছাত্ররা উপাচার্যের বাড়িতে এসে প্রভিশনাল সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারে। সেই ছুটিতে সকাল-বিকেল তাঁর বাড়িতে ছাত্রদের ভিড়। উপাচার্য নিজের হাতে বিলি করেছেন সার্টিফিকেট। অবসরের আগের দিন, তিরিশে ডিসেম্বর, ১৯৭০ সাল। ক্যাম্পাসের মধ্যেই বাড়ি ফেরার পথে অতি বাম ধারায় উদ্বুদ্ধ নকশালপন্থী ওঁরই ছাত্ররা নৃশংস ভাবে তাঁকে খুন করে। জনশ্রুতি,  শ্রেণীশত্রু গোপাল সেনকে পিছন থেকে ছুরি মেরেছিলেন যে কমরেড, তিনি নাকি কলকাতার এক বিখ্যাত ডাক্তারের ছেলে; ধরা পড়েনি; তাঁকে রাতারাতি পুঁজিবাদের পীঠস্থান মার্কিন রাজ্যে পাঠিয়ে দেন তাঁর ডাক্তার বাবা। সেই শুরু শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রবেশ। একটা কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানে ব্যাপক পরিকাঠামো অত্যন্ত জরুরী। যে তিনজন যশ্বসী উপাচার্যের সম্বন্ধে আলোচিত হল, তাঁদের সময়ে পরিকাঠামো তৈরি করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, টাকাকড়ির টানাটানি ছাড়াও আরও অনেক প্রতিন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্ত তাঁরাই ছিলেন এই পরিকাঠামো সৃষ্টি করার প্রধান স্থপতি। তাঁদের নিরলস পরিশ্রমের ফসলই আজকের যাদবপুর।

No comments: