Wednesday, August 31, 2022

Freebies and doles



Freebies and doles,
these two words are very much prevalent in news media, both print and electronic media these days.

Thanks to the investigative journalism, the cases of corruption are now being featured in the public domain. But hostile press concocted stories after an incident for days together 24x7 and hysterical news anchors on prime Television channels keep juxtaposing controversy among panelists and have a tendency on the lookout for something to spice up their bulletins that turned chatter into news. Now the question is whether freebies are always bad for the society ! You will be surprised to know that Freebies work as wonders during period of recession to boost economic growth. 

The idea was first introduced by the British born economist John Maynard Keynes. His economic model is famously known as Keneysianism. He was the pioneer in Demand driven economy applicable to Macroeconomics. Keynes suggested his economic theory to Roosevelt government when US was going through "Great Depression" in 1920.

                        John Maynard Keynes 

Direct cash was transferred to housewives, unemployed, youth etc that introduced greater spending. So the Market Demand was the immediate effect. Now follow the sequence of events that took place after money was transferred to mass. Their spending power was increased which in turn motivated sellers to produce more goods as there was Market Demand. Increased production would require more working hands and henceforth increasing employment opportunities and thereby GDP. This is known as the multiplier effect. The entire chain of processes seemed so logical that one need not be an economist to understand this. In fact, during lock down period due to Covid-19, Nobel laureate economist Abhijit Vinayak Bandopadhyay's prescription to our government at the Centre was to pay cash to the hands of needy people, mainly the migrant workers. His prescription was corroborated by another famous economist and ex-governor of Reserve Bank of India, Raghuram Rajan. But their suggestions went unheeded. Growth rate was already low after demonetization and ignoring suggestions from experts precipitated a further down turn in India's economic landscape. So it is clear that there is a correlation between Freebies and the economic growth. 

Coming to multiplier effect, it is not difficult to prove that injecting a certain amount say, Rs.10 million i.e Rs one crore will eventually generate a little more than the sum invested if the Market Demand remains in tact. A 12th grade knowledge in mathematics will be good enough to quantify the multiplier effect and is available in any standard graduate level economics text book.

Another real-world example of Keyneysian economics was used by US President Barack Obama in 2009. President Obama implemented significant fiscal policies (direct government. intervention) during the great recession and global financial crisis that began in 2007. In February 2009 he signed the American Recovery and Reinvestment Act, which was a government stimulas package of $787 billion designed to save existing jobs and create new ones. While the opinion was divided as to the Recovery Act's effectiveness, the majority of economists agreed that at the end of 2010, unemployment was lower than it would have been without the stimulus package.

দান-খয়রাতি এবং সরকারি অনুদান 

খয়রাতি এবং সরকারি অনুদান, এই দুটো শব্দই আজকাল প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া, উভয় সংবাদ মাধ্যমে অতি প্রচলিত এবং পরিচিত। অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার সুবাদে দুর্নীতির মামলাগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে। এটা যেমন প্রশংসনীয়, খবরগুলো কেন্দ্র করে দিনের পর দিন খবরের কাগজ ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় একই খবরের পুনরাবৃত্তি এক সময় একঘেঁয়ে ও অসহনীয় হয়ে ওঠে।  একটি ঘটনা ঘটার পরে প্রাইম টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অতি সক্রিয় সঞ্চালকরা গলার শিরা ফুলিয়ে ততোধিক সক্রিয়তা দেখিয়ে প্যানেলিস্টদের মধ্যে  উস্কানিমূলক এবং মশলাদার তথ্য সরবরাহ করে বিতর্ক জিইয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান। আসল ঘটনা ছাড়াও খবরগুুলো কাটাছেঁড়া করে নিন্দনীয় এমন কিছু নেতিবাচক দিক খোঁজার দিকে তাঁদের প্রবণতা দেখা যায় যখন মামুলি আলোচনা একটা বড়সড় খবরে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকারি দান-খয়রাতি কি  সমাজের শুধুমাত্র খারাপ দিকটাই নির্দেশ করে ! দেখা যাক অর্থনীতির তত্ব কী বলে ? জেনে রাখা ভাল যে দেশের অর্থনৈতিক মন্দার সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড  বাড়ানোর তাগিদে সরকারি দান-খয়রাতির এক বিস্ময়কর এবং রীতিমত ইতিবাচক ভূমিকা আছে।

ধারণাটি প্রথম প্রবর্তন করেছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন  মেনার্ড  কেইনস । তাঁর অর্থনৈতিক মডেল কেনিসিয়ানিজম নামে খ্যাতি লাভ করে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাহিদা চালিত অর্থনীতির অগ্রগামী ছিলেন তিনি। ১৯২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন "গ্রেট ডিপ্রেশন" অর্থাৎ চরম অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন কেইনস, রুজভেল্ট সরকারকে তার অর্থনৈতিক তত্ত্বের পরামর্শ দেন।

কেইনস-এর মডেলে গৃহিণী, বেকার, যুবক ~ এঁদের কাছে সরাসরি নগদ হস্তান্তর করা হয়েছিল। ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক চাহিদার বৃদ্ধি ঘটে। এর পরের ঘটনাগুলো ক্রমান্বয়ে একটু স্লো মোশন সিনেমার মত ভাবা যাক। নগদ হস্তান্তরের ফলে  তাঁদের ব্যয় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হবে যেটা বিক্রেতাদের আরও পণ্য উৎপাদন করতে অনুপ্রাণিত করবে। বর্ধিত উৎপাদনের জন্য আরও বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। এই কর্মীদের মধ্যে অনেকেই হয়তো সেই হতভাগ্য যুবক/যুবতীরা যাঁদের নগদ হস্তান্তর করা হয়েছিল। এর ফলে জিডিপি বাড়তে বাধ্য। এই পুরো ব্যাপারটা গুণিতক প্রভাব হিসাবে পরিচিত। প্রক্রিয়ার পুরো শৃঙ্খলটি এতটাই যুক্তিগ্রাহ্য যে এটি বোঝার জন্য একজন অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে, কোভিড-১৯-এর কারণে লকডাউনের সময়, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করার এই পরামর্শই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন অভাবী মানুষ, প্রধানত অভিবাসী শ্রমিকদের হাতে নগদ অর্থ প্রদান করা উচিৎ। অভিজিত বিনায়কের পরামর্শ স্বাগত জানিয়েছিলেন আরও একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। কিন্ত এদেশের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের পরামর্শে কর্ণপাত করেননি। বিমুদ্রাকরণের পরে বৃদ্ধির হার ইতিমধ্যেই কমে গেছিল এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করার ফলে ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তখন আরও নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে Freebies মানে, দান-খয়রাতি এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে।

এবার গুণিতকের প্রভাব ব্যাপারটা কী সেটা দেখা যাক। এটা প্রমাণ করা কঠিন নয় যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোনও একটা শিল্প প্রতিষ্ঠানে লগ্নি করা হ'ল।  ধরা যাক এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হ'ল। বাজারের চাহিদা এবং বিনিয়োগের হার মোটামুটি একই রকম থাকলে দেখা যাবে যে ওই এক কোটি টাকা যথাসময়ে কিছুটা বর্ধিত  হয়ে আবার  বাজারে এসে গেছে। এটাই হ'ল গুণিতকের প্রভাব। ১২ ক্লাসের বিজ্ঞান শাখার ছাত্র/ছাত্রীদের পক্ষে অঙ্ক কষে গুণিতকের প্রভাব পরিমাপ করার দেখানোটা কোনও ব্যাপারই নয়। যে কোনও স্ট্যান্ডার্ড স্নাতক স্তরের অর্থনীতি পাঠ্য বইতে এটা পাওয়া যাবে।

কেনিসিয়ান অর্থনীতির আরেকটি বাস্তব উদাহরণ দেখা যায় ২০০৯ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক  ওবামার সিদ্ধান্তে। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া আর্থিক মন্দাবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা উল্লেখযোগ্য আর্থিক নীতি (সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ) বাস্তবায়ন করেছিলেন। পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বিনিয়োগ আইনের আওতায় ৭৮৭ বিলিয়ন ডলারের একটি সরকারি উদ্দীপক প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এই দৃঢ় এবং সময়োচিত আর্থিক সিদ্ধান্ত, বিদ্যমান চাকরিগুলো বাঁচাতে সাহায্য করা ছাড়াও নতুন চাকরির ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। পুনরুদ্ধার আইনের কার্যকারিতা সম্পর্কে মতামত দ্বিধাবিভক্ত হলেও, অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ একমত যে  উদ্দীপনা প্যাকেজ ঘোষণার ফলে ২০১০ সালে বেকারত্ব কম ছিল।

Sunday, August 28, 2022

শূন্যের কাছাকাছি

   

মহাশূন্যে কান পেতে থাকা বেতার দূরবিনগুলো অতিপরিবাহী-প্রযুক্তির হাত ধরে ক্ষীণতম সংকেত শুনতে প্রস্তুত


                        শূন্যের কাছাকাছি

একটা বিদেশি তথ্যচিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অগভীর একটি জলাধারে সিঙি জাতীয় একটা মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে। পাশেই আরও একটি তরলাধার রাখা আছে। জীবন্ত মাছটাকে জল থেকে তুলে দ্বিতীয় আধারে রাখার কয়েক পলকের মধ্যেই মাছটা সিঁটিয়ে আপাত নিষ্প্রাণ অবস্থায় আধারের তরলে তলিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে মাছের সেই নির্জীব দেহটিকে তুলে এনে আবার ডুবিয়ে দেওয়া হ'ল জলাধারে। দু-চার সেকেন্ডের মধ্যেই সেটা আবার আগের মতোই ঘুরে ফিরে দিব্যি খেলতে শুরু করে দিল জলে। তথ্যচিত্রটি দেখতে দেখতে আন্দাজ করেছিলাম কী ঘটতে চলেছে, আর আমার মন চলে গিয়েছিল রিপভ্যান্ উইংকল্ আর স্লিপিং বিউটির জগতে। আরও মনে হয়েছিল আমার ঘনিষ্ঠ এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের উক্তি। কুশল বিনিময়ের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "একটা বয়সের পর বয়স বাড়া মানে বিদায়ের বিষণ্ণতা। দেখা হবে না ভবিষ্যত পৃথিবীর মাটিতে আরও কত কিছু ঘটবে।" আধুনিক বিজ্ঞানের ভবিষ্যত হয়তো ঘোচাতে পারবে সেই বিষণ্ণতা। পরিপক্ক বয়সে বিদ্বেষ, মারামারি-ভরা পৃথিবী থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষ হয়তো সাময়িক নির্বাসন নেবে এমনই এক ঘুমসাগরে। কয়েক দশক বাদে আবার যখন তাকে তুলে আনা হবে, ফিরে পাবে সে তার চলমান জীবন ; দেখতে পাবে পৃথিবীর তখনকার চেহারা।

মাছের ঘুমসাগরের তরলটা ছিল বরফের থেকে আরও অনেক  অনেক ঠান্ডা, তরল নাইট্রোজেন। আমাদের স্বাভাবিক চেতনায় শীতলতম বস্তু বলতে আমরা বুঝি বরফ বা বরফ-গলা জল যার তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানুষের লাগাতার অনুসন্ধিৎসা জন্ম দিয়েছে আরও অনেক ঠান্ডা বস্তুর, যাদের তাপমাত্রা আর এক শূন্যের কাছাকাছি ; যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় চরম শূন্য (Absolute Zero)। এই নিবন্ধে আলোচনার বিষয়বস্তু হল শূন্যের কাছাকাছি সেই তাপমাত্রা - যেটা শুধু মানুষেরই সৃষ্টি, যা ব্রহ্মান্ডের দূরতম প্রান্তের শীতলতম বিন্দুর থেকেও শীতল।

সময় ১৯০৮ - ১৯১১ সাল। ডাচ্ পদার্থবিদ্ হাইক ক্যামারলিং ওনস্ (১৮৫৩ - ১৯২৬) লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে আবিষ্কার করলেন হিলিয়াম তরলীকরণের এক অভিনব পদ্ধতি। তরলাবস্থায় পৌঁছানোর সময় যে কোনও গ্যাসের তাপমাত্রা কমে যেতে বাধ্য। হিলিয়াম গ্যাসও তার ব্যতিক্রম নয়। যাইহোক, সাধারণ বায়ুর চাপে তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রা দাঁড়াল ৪.২ ডিগ্রি কেলভিন। ওই তাপমাত্রা ঠিক কতটা ঠান্ডা, সেই আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখছি। সহকর্মীদের নিয়ে ওনস্ শুরু করলেন বিভিন্ন পদার্থকে তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রায়  রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মৌলিক পদার্থ হিসেবে প্রথমে বেছে নিলেন বিশুদ্ধ পারদ। কারণ অন্যান্য ধাতব মৌলের তুলনায় সেই যুগে বিশুদ্ধ পারদ ছিল অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য। তরল হিলিয়ামের পাত্রে খানিকটা জমাটবাঁধা পারদের মধ্যে দিয়ে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় তড়িৎ প্রবাহের ব্যবস্থা করা হ'ল। তাপমাত্রা হ্রাসের ফলে ধাতব পারদের বৈদ্যুতিক রোধ-ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকল। এটা অবশ্য কিছু নতুন ব্যাপার নয়। যাইহোক,  তাপমাত্রা যখন ৪.৩°কেলভিন (- ২৬৮.৭° সেলসিয়াস), তখন পারদের রোধের মান কমে হয়েছে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পারদের রোধের পাঁচশ ভাগের এক ভাগ। তাপমাত্রা আরও নামিয়ে আনা হ'ল ৪.২° কেলভিনে (-২৬৮.৬° সেলসিয়াস)। ক্যামারলিং ওনস্ এবং তাঁর সহকর্মীরা বিস্ফারিত নেত্রে লক্ষ করলেন এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা - জমাটবাঁধা পারদের এক অদ্ভুত আচরণ। ওই তাপমাত্রায় পারদের বৈদ্যুতিক রোধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে এবং বিদ্যুত প্রবাহের পথ হয়েছে সুগম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁরা পদার্থের এই আচরণের নাম দিলেন সুপারকন্ডাকটিভিটি (Superconductivity) বা অতিপরিবাহিতা। হিলিয়ামের তরলীকরণ ও সুপারকন্ডাকটিভিটির আবিষ্কার বিজ্ঞানজগতে উন্মোচিত করল এক নতুন দিগন্ত।  ১৯১৩ সালে ক্যামারলিং ওনস্ সম্মানিত হলেন নোবেল পুরস্কারে।

এম আর আই পরীক্ষায় ব্যবহারের  জন্য  নির্মিত আধুনিক  অতিপরিবাহী-তড়িচ্চুম্বক 

যে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হ'ল, প্রাসঙ্গিক পরিভাষায় সেই তাপমাত্রার নামকরণ হ'ল ক্রিটিক্লাল টেম্পারেচার, Tc (Critical Temperature). সুপারকন্ডাকটিভিটি ধর্মসম্পন্ন  সাধারণ পদার্থগুলোর নাম হ'ল সুপারকন্ডাটার। তাপমাত্রা নামিয়ে আনলে অবশ্য সব পদার্থই সুপারকন্ডাকটারে রূপান্তরিত হয় না। কেন হয় না, সেই আলোচনায় আমরা পরে আসব। যেসব পদার্থের মধ্যে সুপারকন্ডাকটার হবার ধর্ম আছে, তাদের প্রত্যেকের ক্রিটিক্লাল টেম্পারেচার আলাদা। সুপারকন্ডাকটারের চরিত্র অনেকটা আজকের দিনের রাজনৈতিক নেতাদের মতো। দল মত নির্বিশেষে প্রত্যেক নেতার একটি মুখ আর এক বা একাধিক মুখোশ থাকে। ক্রিটিক্লাল টেম্পারেচারের মতো এমন কি প্রত্যেকের মুখোশও আলাদা আলাদা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেতাদের যেমন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বলে মনে হয়, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটারগুলোও সাধারণ পরিবাহীর মতো আচরণ করে। তাপমান কমিয়ে আনলে নির্দিষ্ট তাপমানে সুপারকন্ডাটার তার আসল চেহারা মেলে ধরে এবং অতিপরিবাহী অবস্থা প্রাপ্ত হয়। একাধারে আত্মগোপন ও আত্মপ্রকাশের এ এক অভিনব দৃষ্টান্ত। যাইহোক, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সিসা, অ্যালুমনিয়াম ইত্যাদি কয়েকটি ধাতব মৌলের মধ্যে নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটিভিটির অস্তিত্ব লক্ষিত হ'ল। সুবিধেমতো  চেনা সুপারকন্ডাটারের তার বেছে নিয়ে ওনস্ তড়িঘড়ি শুরু করে দিলেন তারের কুন্ডলী তৈরির কাজ। উদ্দেশ্য শক্তিশালী তড়িচ্চুম্বক তৈরি করা। এখনে বলে রাখা প্রয়োজন যে যে-কোনও তড়িচ্চুম্বকের চৌম্বকীয় ক্ষমতা নির্ভর করে দুটি জিনিসের গুণফলের উপর - (১) কুন্ডলীটি কতগুলো তারের পাক দিয়ে তৈরি এবং (২) সেই তারের মধ্যে দিয়ে কী পরিমাণ বিদ্যুত প্রবাহিত হচ্ছে। সুপারকন্ডাটারের বৈদ্যুতিক রোধ শূন্য হয়ে যেতে দেখে ক্যামারলিং ওনস্ ধারণা করেছিলেন যে তরল হিলিয়ামে চোবানো সামান্য কয়েক পাক তারের কুন্ডলীর মধ্যে যথচ্ছ তড়িৎ চালনা করে তৈরি করবেন আকৃতিতে ছোট, অথচ শক্তিশালী চুম্বক। শক্তিশালী চুম্বকের প্রয়োগক্ষেত্রের আলোচনা আপাতত স্থগিত রেখে দেখা যাক ওনস্-এর তৈরি চুম্বকের পরিণতি। কুন্ডলীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে কুন্ডলীটি চুম্বকের রূপ নিল এবং যে কোনও চুম্বকের ধর্মানুযায়ী নিজের চতুর্দিকে ক্ষমতার জাল বিস্তার করল, যাকে বলে চৌম্বকক্ষেত্র। কিন্ত দেখা গেল যে এই চুম্বকক্ষেত্রের শক্তি একটি নির্দিষ্ট মানে পৌঁছনো মাত্রই কুন্ডলীর অতিপরিবাহী ধর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরল হিলিয়ামের সংস্পর্শে থেকেও পদার্থটি ফিরে এল পূর্বাবস্থায়, অর্থাৎ বৈদ্যুতিক রোধবিশিষ্ট্য সাধারণ পরিবাহীর মতো আচরণ শুরু করল এবং পরিবাহীর রোধ বিদ্যুত প্রবাহের সর্বোচ্চ মাত্রা  বেঁধে দিল। সুতরাং ক্ষুদ্রাকৃতি শক্তিশালী চুম্বক তৈরির কাজে ব্যর্থ হলেন হাইক্ ক্যামারলিং ওনস্। তাই বলে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি তাঁর প্রচেষ্টা। সব ব্যর্থতার পেছনেই থাকে সাফল্যের বীজ। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হ'ল না। ক্যমারলিং ওনস্-এর ঝুলিতে সঞ্চিত হ'ল নতুন অভিজ্ঞতা, সুপারকন্ডাকটারের উপর চুম্বকক্ষেত্রের প্রভাবের উদাহরণ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় চৌম্বকক্ষেত্রের যে সর্বোচ্চ মান অতিপরিবাহিতা ধর্মকে বিনষ্ট করে, তাকে বলা হ'ল ক্রিটিক্লাল ফিল্ড (Critical Field), Bc.  নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চৌম্বকক্ষেত্রের সর্বোচ্চ মান ছাড়াও আর যা সুপারকন্ডাটারের উপর প্রভাব বিস্তার করে তা হ'ল কুন্ডলীর তারের প্রস্থচ্ছেদের প্রতিএকক ক্ষেত্রফলের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত প্রবাহের মাত্রা - যাকে বলা হয় ক্রিটিক্লাল কারেন্ট (Critical Current), Jc. মোদ্দা কথায় দেখা গেল যে, পরস্পর নির্ভরশীল এই তিনটি চরিত্রমানের (Tc, Bc, Jc) একটা ত্রিমাত্রিক গন্ডী আছে এবং সেই গন্ডির মধ্যে থাকলে তবেই কিছু বিশেষ পদার্থের অতিপরিবাহিতা বজায় থাকে।

কিন্ত এই শর্তগুলি পূরণ করলেই কি যে-কোনও পদার্থ সুপারকন্ডাটারে পরিণত হতে পারে ? পদার্থের কোন্ কোন্ ধর্ম চিহ্নিত করবে সুপারকন্ডাকটারকে ? এইরকম নানা প্রশ্ন বিজ্ঞানীকুলকে ভাবালো। আসল কথা ১৯৩৫ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা এমন কোনও তথ্য পরিবেশন করতে পারেননি যা পদার্থের মধ্যে সুপারকন্ডাকটিভিটির অস্তিত্ব ঠাহর করতে পারে। কিন্ত নিষ্ঠাবান বিজ্ঞানীরা জোরকদমে তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেলেন। তাঁদের অনুসন্ধানের ফলে আরও বেশ কয়েকটি মৌলিক পদার্থের মধ্যে অতিপরিবাহী ধর্মের প্রমাণ পাওয়া গেল। এ ব্যাপারে আমেরিকান বেল টেলিফোন গবেষণাগারের বি টি ম্যাথিয়াসের ভূমিকা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাথিয়াস এবং তাঁর সহকর্মী জন হুলম্ ১৯৫০ সালে লাগাতার শ্রমসাদ্ধ পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা হাতে নিলেন। তাঁদের আশা, যদি এই ঘটনার কোনও নিয়ম খুঁজে বার করা যায়। একরকম অজানা অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার মতো প্রায় বাছবিচার না করেই, টানা তিন বছর পরীক্ষা চালিয়ে গেলেন নানাবিধ পদার্থের উপর (মৌলিক, যৌগিক বা মিশ্র ধাতু)। তাঁরা ধারনা করেছিলেন যে অনেক তথ্য থাকলে তাদের মধ্যে হয়তো একটা সম্পর্ক খুঁজে বার করা যাবে। তাঁরা তাঁদের সৃজনীশক্তির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন অসাধারণ ধৈর্য এবং অক্লান্ত দৈহিক পরিশ্রম। বলা বাহুল্য, তাঁদের প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়নি। রাশিকৃত সেই তথ্যের বিশ্লেষণে যে সত্যটি বেরিয়ে এল তা হ'ল এই - কোনও পদার্থের পরমাণুতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ইলেকট্রনের, - বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের  (Valence Electron), গড় সংখ্যার উপর নির্ভর করবে কোনও পদার্থের সুপারকন্ডাকটার হবার যোগ্যতা। পরীক্ষালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা বুঝতে পারলেন যে যেসব পদার্থের পরমাণুতে ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সংখ্যা ২ থেকে ৮, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তাদের সুপারকন্ডাকটার হবার সম্ভাবনা প্রবল। এ ছাড়া ৩, ৫, ৭ অর্থাৎ বিজোড় সংখ্যক ভ্যালেন্স ইলেকট্রনযুক্ত পদার্থগুলোও তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রার তুলনায় অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটিভিটি অবস্থাপ্রাপ্ত হবে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করব যে আজকের উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটার (High Tc Superconductor) গবেষনারও সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৫০ সালে এবং তার জনক হলেন এই বি টি ম্যাথিয়াস। পদার্থের পরমাণুতে ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সঙ্গে সুপারকন্ডাকটিভিটির সম্পর্কের নিয়মটা হুলম-ম্যাথিয়াসের আবিষ্কার। আরও যে বাড়তি তথ্যটি তাঁরা জানলেন তা হ'ল, সুপারকন্ডাকটিভিটি নির্ভর করবে পদার্থের গঠনে পরমাণুগুচ্ছের বিন্যাসের উপর। তথ্যের এইমাত্র পুঁজি নিয়ে তাঁরা দেখালেন যে ৭ ভ্যালেন্স ইলেকট্রন সম্পন্ন টেকনিসিয়াম, ১১ কেলভিন তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটারে রূপান্তরিত হয় অথচ ৮ ভ্যালেন্স ইলেকট্রনযুক্ত রুথেনিয়ামের ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রা মাত্র আধ কেলভিন। আবার মলিবডেনামের ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সংখ্যা ৬ হওয়া সত্ত্বেও তাপাঙ্কের নিম্নতম মানেও তা ওই অবস্থাপ্রাপ্ত হয় না। এক্ষেত্রে পরমাণুগুচ্ছের বিন্যাস ওই ধর্মপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধক। মজা হ'ল এই যে মলিবডেনাম ও রুথেনিয়ামের রাসায়নিক সংমিশ্রণে উদ্ভূত যৌগিক পদার্থটি ১০.৬ কেলভিন তাপমাত্রায় একটি উৎকৃষ্ট সুপারকন্ডাকটার। কারণ যৌগিকটির গঠনে পরমাণুর বিন্যাস শুধুমাত্র অনুকূলই  নয়, পরমাণুর গড়-পড়তা ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সংখ্যা ৭ অর্থাৎ বিজোড় সংখ্যক। হুলম-ম্যাথিয়াসের শ্রমশাদ্ধ পরীক্ষামূলক গবেষণার ভিত্তিতে বহু মৌলিক এবং বিশেষত যৌগিক পদার্থের মধ্যে সুপারকন্ডাকটিভিটির অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া গেল। 

প্রশ্ন হ'ল ভ্যালেন্স ইলেকট্রন কি ইলেকট্রনের একটা বিশেষ জাতি ? পরমাণু গঠনের মোটামুটি কাঠামোটা আলোচনা করলে বুঝতে পারা যাবে কোনগুলো ভ্যালেন্স ইলেকট্রন। পরমাণুর গঠনের মূল উপাদান হ'ল প্রোটন ও নিউট্রনে ঠাসা স্বল্প আয়তনের একটি নিউক্লিয়াস, যার চারপাশে বিভিন্ন কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ঝাঁক ইলেকট্রন। পরমাণুতে প্রোটন বা ইলেকট্রনের আধান মানে ইলেকট্রিক চার্জ সমান এবং বিপরীতধর্মী হবার ফলে সাধারণ অবস্থায় পদার্থ আধান নিরপেক্ষ। যাইহোক, পরমাণুতে ইলেকট্রন বা প্রোটনের সংখ্যা নির্দেশ করে পদার্থের ধর্ম। সেই অনুযায়ী কোনটি হিলিয়াম, বেরিলিয়াম, বা রুপো, তামা, লোহা ইত্যাদি। নিউক্লিয়াসকে ঘিরে যে কক্ষপথগুলো আছে তাদের প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা আছে। নিউক্লিয়াসের নিকটতম কক্ষপথটি ভরে গেলে বাকি ইলেকট্রনেরা পরের কক্ষপথে ভিড় করে। সেটিও পূর্ণ হয়ে গেলে পরেরটি - এইভাবে কক্ষপথগুলো ক্রমশ পরিপূর্ণ হতে থাকে। পরিপূর্ণ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুচ্ছ ও নিউক্লিয়াসের মধ্যে পারস্পরিক প্রীতি একটু বেশিই।  অর্থাৎ তাদের মধ্যে তড়িচ্চুম্বকীয় বলের বাঁধন অপেক্ষাকৃত বেশি মজবুত। যে কক্ষপথ নিউক্লিয়াসের যত কাছাকাছি, বাঁধন তার ততই মজবুত। ব্যাপারটা অনেকটা   'কৃষ্ণাকান্তের উইল' উপন্যাসে ভ্রমর-গোবিন্দলালের উদ্দেশ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের সরস মন্তব্যের সঙ্গে তুলনা করা যায় - "যাহাকে ভালবাস, তাহাকে নয়নের আড় করিও না। যদি প্রেমবন্ধন দৃঢ় করিবে তবে সূতা ছোট করিও।" নিউক্লিয়াসের সঙ্গে অসম্পূর্ণ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলোর বাঁধন সম্পূর্ণ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলোর তুলনায় অনেকটাই আলাদা। খুব অল্প শক্তি খরচ করেই এদের সহজে হঠিয়ে দেওয়া যায়। তবে কল্পনা করা যেতে পারে যে ওই ইলেকট্রনগুলোর যেন হাত আছে। কাজেই একটি পদার্থের অসম্পূর্ণ কক্ষপথের   হাতওয়ালা ইলেকট্রনগুলো অন্য পদার্থের হাতওয়ালা ইলেকট্রনের হাতে হাত মিলিয়ে সম্পূর্ণ নতুন পদার্থ তৈরি করতে সক্ষম। হাতে-হাত মেলানোর প্রক্রিয়াটাকে বলা হয় রাসায়নিক বিক্রিয়া। বিক্রিয়া-প্রবণ, 'হাত' ওলা এই ইলেকট্রনদেরই বলা হয় ভ্যালেন্স ইলেকট্রন। 

জাপানের 'কেক' গবেষণাগারে অতিশীতল প্রযুক্তি বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

একের পর এক পরীক্ষায় অতিশীতল পরিবেশে পদার্থের এক-একটি নতুন ধর্ম যেমন আবিষ্কৃত হচ্ছিল, তেমনি তাগিদ আসছিল সেইসব ঘটনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খোঁজার জন্যও। বৈদ্যুতিক রোধশূন্যতা ছাড়াও মাইসনার এফেক্ট  (Meissner effect)-এর ঘটনা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের ভাবিিয়ে তুলেছিল। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে  ডব্লিউ মাইসনার দেখালেন যে অতিপরিবাহী অবস্থায় কোনও বস্তুকে একটি চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হলে, চৌম্বক বলরেখা বস্তুটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে ( অবশ্যই যদি না চৌম্বকক্ষেত্রের মাত্রা ওই বস্তুর জন্য নির্ধারিত মান Bc অতিক্রম না করে ; সেক্ষেত্রে বস্তুটি আর অতিপরিবাহী থাকবে না)। পরীক্ষাটা দুরকমভাবে করা যেতে পারে - (১) চৌম্বকক্ষেত্রের উপস্থিতিতে বস্তুটিকে ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রায় নামিয়ে এনে ; (২) বস্তুটিকে ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রায় নামিয়ে আনার পর চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করে। দুটি ক্ষেত্রেই একই ফল মেলে, অর্থাৎ চৌম্বক বলরেখাগুলো বস্তুটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। এখন প্রশ্ন হ'ল দুটো পরীক্ষার মধ্যে পার্থক্য কোথায় ! প্রকৃতির সৃষ্টিতে আদর্শ পরিবাহী বলে কিছু নেই। যদি থাকতো, তাহলে শেষোক্ত পরীক্ষার বেলায় চৌম্বক বলরেখা পদার্থের পাশ কাটিয়ে যেত, কিন্ত প্রথমোক্ত ব্যবস্থায় বলরেখার প্রভাব উপেক্ষা করার পরিবর্তে বস্তুটি সেগুলোকে নিজের মধ্যে বন্দি করে ফেলত। কাজেই আদর্শ পরিবাহীর ধর্ম ছাড়াও সুপারকন্ডাকটিভিটির অভিনবত্ব লুকিয়ে আছে মাইসনার এফেক্ট-এ সাড়া দেওয়ার দৃষ্টান্তে। 

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রচেষ্টায় প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ নিলেন ফ্রিৎজ্ লন্ডন। তিনি বললেন যে এক টুকরো সুপারকন্ডাকটারের নমুনা চোখে দেখার মতো বড় মাপের হওয়া সত্বেও অতিপরিবাহী অবস্থায় সেটাকে তুলনা করা যেতে পারে একটা পরমাণুর সঙ্গে। সুতরাং নমুনার আচরণে ফুটে উঠবে কোয়ান্টাম স্বভাব। ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলো চলাফেরা করবে নমুনাটির উপরিতলে এবং পরস্পর হাত ধরাধরি করে। নমুনাতে বিভব প্রভেদ (potential difference) সৃষ্টি করলে একটি ইলেকট্রনের গতি তড়িৎবাহী সব স্বাধীন ইলেকট্রনগুলোকে যুগপৎভাবে সচল করে তুলবে, তা সেগুলো যতদূরেই থাকুক না কেন। শিকলের একটা আংটায় টান পড়লে যেমন দূরের আংটাও একই সঙ্গে সচল হয়ে ওঠে। যাইহোক, এই যুগপৎ সচল হওয়ার প্রক্রিয়াটাই নির্দেশ করে পদার্থের রোধশূন্যতা। লন্ডনের মডেল থেকে মাইসনার এফেক্ট-এর ব্যাখ্যাও পাওয়া গেল। কারণ লেনজ্-এর নিয়মানুযায়ী বহিরাগত চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো আবেশিত (induced) হয়ে প্রতিরোধ করার মতো চৌম্বকক্ষেত্র গড়ে তুলবে এবং বহিরাগত চৌম্বকক্ষেত্রের বলরেখাগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দেবে। লন্ডনের তত্ত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও তাঁর যুক্তি ব্যাখ্যা করতে পারল না, স্বল্প তাপমাত্রায় বড় মাপের নমুনা কেন পরমাণুর মতো আচরণ করবে। 

ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পরবর্তী নায়করা হলেন আমেরিকার পার্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড ফ্রলিক ও বেল টেলিফোন গবেষণাগারের জন্ বার্ডিন। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র (Uncertainty Ptinciple) বলে যে স্বল্পতম তাপমাত্রাতেও পদার্থ কণিকা সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে না, তাদের একটা নির্দিষ্ট কম্পন থাকে, যাকে বলা হয় শূন্যাঙ্ক তাপমাত্রার কম্পন (Zero Point Vibration)। এর মূল কারণ হ'ল অনিশ্চয়তা সূত্রের গাণিতিক চেহারায় প্লাঙ্কের ধ্রুবকের (Planck's constant) উপস্থিতি। এই ধ্রুবকের মান যৎসামান্য হলেও একবারে শূন্য নয়। নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায় পদার্থের প্রতিটি পরমাণুর স্পন্দনের সঙ্গে যুগপৎভাবে তাল মেলায় তড়িৎ বহনকারী ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলো। পরমাণু স্পন্দনের ঢেউ যেন ইলেকট্রনগুলোকে ঝেঁঁটিয়ে নিয়ে চলেছে। সাধারণ তাপমাত্রায় যে সব ধাতব মৌল কুপরিবাহী হিসেবে চিহ্নিত, নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায় তাদের সুপারকন্ডাটারে রূপান্তরিত হয়ে যাবার পূর্ব সংকেত ফ্রলিক-বার্ডিনের তত্ত্বের মধ্যে নিহিত ছিল। তাঁদের কল্পনা অনেকটা এরকম - সাধারণ বা উচ্চ তাপমাত্রায় তড়িৎ কুপরিবাহী পদার্থের ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের উপর পরমাণুর তাপীয় স্পন্দনের প্রভাব প্রবল হওয়ার ফলে ইলেকট্রনগুলো চলার পথে পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে শক্তি অপচয় করে। এই শক্তি অপচয়ের ব্যাপারটাই পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ হিসেবে প্রকাশ পায়। তাপমাত্রা কমতে থাকলে পারস্পরিক এই বিক্রিয়ার প্রবণতা কমতে থাকে এবং নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায়, যাকে বল সুপারকন্ডাকটিং টেম্পারেচার, এই বিক্রিয়া এমনই একটা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় আসে যখন তড়িৎবাহী ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর স্পন্দনের সঙ্গে ছন্দোবদ্ধভাবে ওঠানামা করতে করতে এগিয়ে চলে। সুপারপরিবাহীর ক্ষেত্রে ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলোর পরমাণুর তাপীয় স্পন্দনের প্রভাব এমনিতেই ক্ষীণ হওয়ায় ইলেকট্রন ও পরমাণুর মধ্যে পারস্পরিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কম বা নেই বললেই চলে। সুতরাং কম তাপমাত্রায় সুপরিবাহীর বৈদ্যুতিক রোধ কমে গেলেও তা একেবারে নিঃশেষিত হয় না। এই যুক্তিভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণ পাওয়া গেছে পর্যায় সারণীর (Periodic Table) বেশ কিছ ধাতব মৌলের মধ্যে। মিশ্র ধাতু এবং যৌগিক পদার্থ অপেক্ষাকৃত অধিক তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটিভিটি প্রাপ্ত হওয়ার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় বিতর্কেরও কিছু অবকাশ ছিল। একই বিষয়ে কর্মরত সমকালীন বৈজ্ঞানিকরা বার্ডিন-ফ্রলিক তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারলেন। চেষ্টা চলতে থাকল পুরনো তত্ত্বের ত্রুটিগুলো দূর করার। চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় পদার্থের সুপারকন্ডাকটিভিটি প্রাপ্ত হওয়ার আধুনিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সফলতম তিন মহারথী হলেন জন্ বার্ডিন, লিওঁ কুপার এবং রবার্ট স্রিফার। ১৯৫৭ সালে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাঁরা এই দুরূহ কাজে সফল হন। তবে তাঁদের গবেষণা ত্বরান্বিত হওয়ার পিছনে রিচার্ড ফিলিপস্ ফাইনম্যানের অবদান অনস্বীকার্য। তিনিও এই কাজে লিপ্ত ছিলেন। বি সি এস ত্রয়ী ( 'বি সি এস' হ'ল সফল তিন বিজ্ঞানীর নামের আদ্যক্ষর। তাঁদের তত্ত্ব ওই নামেই প্রসিদ্ধ) জানতেন ফাইনম্যানের দৃষ্টিভঙ্গির অভিনবত্ব এবং বুদ্ধির প্রাখর্য। ছুটি কাটাতে যাবার আগে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তাঁর একটি বক্তৃতায় স্রিফার অভিভূত হন। সেই বক্তৃতায় প্রথমে তিনি বলেছিলেন যে, সব সমস্যাই নির্ভুলভাবে সমাধান করতে পেরেছেন তিনি। কিন্ত শেষে তিনি দেখান কোথায় কোথায় গবেষণায় খামতি আছে এবং আলোচনা করেন অসফল হবার কারণগুলোর যাবতীয় খুঁটিনাটি। বক্তৃতা শেষ করার আগে তিনি বলেন - "...We should not even have to look at the experiments... It is like looking in the back of the book for the answer...The only reason that we cannot do this problem of Superconductivity is that we haven't got enough imagination." তাঁর বক্তৃতার অবিকৃত পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয় বিজ্ঞান পত্রিকায়। পেশার জীবনে প্রাত্যহিক ক্ষুদ্র গন্ডীর মধ্যে যে সবজান্তা বিজ্ঞানীরা বিচরণ করেন তাঁদের পক্ষে এমন ভুল স্বীকার করে নেওয়ার নজিরবিহীন উদাহরণ কল্পনা করাও দুষ্কর। বরং তাঁদের মধ্যে অহরহ কাজ করে চলে এই ভাবনাটা - 'আমি পিছিয়ে পড়ছি, অতএব তুমিও পিছিয়ে পড়।' এই ঘটনা আরও প্রমাণ করে পশ্চিমী বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান মানসিকতার ইতিবাচক দিকটা। যাইহোক, দেখা যাক বি সি এস তত্ত্বের বক্তব্য। 

ধাতব পদার্থের গঠন সাধারণত অসংখ্য স্ফটিকাকার কোষের (Crystalline Unit Cell) সমন্বয়। বস্তুটির মধ্যে যে কোনও দিক বরাবর এই কোষগুলোর পুনরাবৃত্তিতে সামগ্রিকভাবে তৈরি হয় জাফরির মতো একটি পরমাণু-কাঠামো, যার প্রাসঙ্গিক পরিভাষা ল্যাটিস। ত্রিমাত্রিক এই জাফরিতে প্রতিটি পরমাণু নিকটবর্তী পরমাণুর সঙ্গে অদৃশ্য তন্তু দিয়ে রীতিসিদ্ধ জ্যামিতিক নিয়মে গাঁথা থাকে। এই অবস্থায় পরমাণুর ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলোকে কোনও নির্দিষ্ট পরমাণুর অন্তর্গত বলে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। যেন একটা যৌথ তহবিলে পরমাণুরা তাদের ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলোকে দান করে দিয়েছে। ফলে জাফরির গাঁটে গাঁটে প্রত্যেকটি পরমাণু আয়নিত অবস্থায় থাকবে, অর্থাৎ জাফরির গাঁটগুলো ধনাত্মক আধানের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করবে। যৌথ তহবিলের ইলেকট্রনগুলো স্বাধীন এবং একই আধানযুক্ত হওয়ার ফলে পারস্পরিক বিকর্ষিত হওয়ার কথা। বি সি এস তত্ত্ব প্রমাণ করল যে এই স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো অতিপরিবাহী অবস্থায় এক অভিনব কায়দায় পরস্পরকে আকর্ষণ করবে। কৌশলটা কী ? ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন জাফরির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় বিপরীত আধানধর্মী পরমাণুখচিত জাফরিকে আকর্ষণ করব। ফলে ল্যাটিসের গাঁটের পরমাণুগুলো পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসে ল্যাটিসকে সঙ্কুচিত করবে এবং সাময়িকভাবে ধনাত্মক আধানের ঘনত্ব বাড়িয়ে তুলবে ( অপেক্ষাকৃত অল্প জায়গায় ধনাত্মক আধানের সহাবস্থানের ফলে)। সুতরাং নিকটবর্ত আরও একটি ইলেকট্রন ওই দিকেই ধাবিত হবে অর্থাৎ পূর্ববর্তী ইলেকট্রনকে অনুসরণ করবে। এটাকেই বলা হচ্ছে ইলেকট্রনের প্রতি ইলেকট্রনের আকর্ষণ এবং স্পষ্টতই এটা সম্ভব হচ্ছে ল্যাটিসের মধ্যস্থতার ফলে। ল্যাটিস মধ্যস্থিত এই পরোক্ষ আকর্ষণের মাত্রা পারস্পরিক বিকর্ষণের প্রভাবকে অতিক্রম করার ফলে আকর্ষণের দিকেই পাল্লা ঝুঁকবে এবং অতিপরিবাহী অবস্থায় স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো জোড়ায় জোড়ায় ল্যাটিসের ফাঁক-ফোঁকরের মধ্যে দিয়ে অপ্রতিরোধ্যভাবে একে অপরকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলবে। এই জোড়া বাঁধার ব্যাপারটাকে বলা হয় 'ফরমেশন অফ বাউন্ড পেয়ারস্' বা 'কুপার পেয়ারস্' (Cooper Pairs) এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই অবস্থায় ফার্মিয়ন ধর্মাবলম্বী ইলেকট্রনেরা বোসন ধর্মী কণিকার মতো আচরণ করবে। ফার্মিয়ন ও বোসনের চরিত্রগত পার্থক্য আলোচনা করলে বুঝতে পারা যাবে অতিপরিবাহী অবস্থায় পদার্থের ইলেকট্রনগুলো কেন অবাধে চলতে থাকবে। সেই আলোচনায় আসা যাক।

পদার্থ কণিকাদের সাধারণত দু'ভাগে ভাগ করা যায় - ফার্মিয়ন বোসন (যথাক্রমে এনরিকো ফার্মি ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামানুসারে) পদার্থের গঠনে প্রত্যেকটি ফার্মিয়নের নিজস্ব শক্তিস্তর আছে। পক্ষান্তরে সব বোসনরা একই শক্তিস্তরে অবস্থান করার প্রবণতা দেখায়। এখন, বৈদ্যুতিক রোধের উৎসটা কোথায় ? ধাতব পদার্থ নিয়েই আলোচনা করা যাক। বিভব প্রভেদ সৃষ্টি করলে কম শক্তিস্তরে অবস্থিত স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো (সাধারণত ফার্মিয়ন) গতিশীল হবে এবং অপেক্ষাকৃত উচ্চ শক্তিস্তরে পৌঁছবার চেষ্টা করবে, যদি সে শক্তিস্তর অন্য কোনও ইলেকট্রনের দখলে না থাকে। যাইহোক, পদার্থের গঠন সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন না হওয়ার ফলে ইলেকট্রনগুলো তাদের গতিপথে  ল্যাটিসের জায়গায় জায়গায় (যেখানে ত্রুটি আছে) পরমাণুদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে শক্তি অপচয় করবে এবং মন্দগতি বা গতিহীন হয়ে পড়বে। ইলেকট্রনের শক্তি অপচয়ের এই ব্যাপারটাই পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ হিসেবে প্রকাশ পায়। বলা বাহুল্য, অতিপরিবাহী অবস্থায় বোসন ধর্মে রূপান্তরিত সমস্ত ইলেকট্রন জুটির একই শক্তিস্তরে অবস্থানের প্রবণতা থাকায়, বিভব পার্থক্য দেখা দিলে সেগুলি সব একই সঙ্গে গতিশীল হয়। আগে আমরা দেখেছি যে ফ্রিৎজ্ লন্ডনের তত্ত্বে ইলেকট্রনগুলোর এই ধরনের যুগপৎ গতিশীলতার একটা আভাস ছিল। বি সি এস তত্ত্বের মডেল গাণিতিক সিদ্ধতায় পূর্ণতার স্বাক্ষর রাখে। সুপরিবাহীর তুলনায় কুপরিবাহী কেন উৎকৃষ্ট সুপারকন্ডাকটার হতে পারে, এই তত্ত্বের নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তার ব্যাখ্যাও পাওয়া গেল। এই অসামান্য অবদানের জন্য বার্ডিন, কুপার ও স্রিফার নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। পদার্থের সুপারকন্ডাকটিভিটি প্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা এতই জটিল যে আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই ঘটনার সঠিক মৌলিক ব্যাখ্যা খুঁজতে বিজ্ঞানীদের সময় লেগেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। মনে রাখা প্রয়োজন বি সি এস তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুধুমাত্র স্বল্প তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটারগুলোর  ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। 

আলোচনার গোড়ায় তাপমাত্রার চরমশূন্যের উল্লেখ করেছি, শীতলতার মাপকাঠিতে যা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস, - যে তাপমানে জল জমে বরফ হয়, তার থেকেও ২৭৩.১৫ ডিগ্রি নীচে। এই তাপমান থেকে শুরু করে তাপমাত্রার যে নতুন মাপকাঠি তৈরি হয়েছে তাকে বলা হয় কেলভিন স্কেল। কেলভিন স্কেলের হিসেবে জল জমে বরফ হয় ২৭৩.১৫ ডিগ্রি কেলভিনে, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হিলিয়াম - এই গ্যাসগুলি তরলে পরিণত হয় যথাক্রমে ২০, ৯০, ৭৭ এবং ৪.২ ডিগ্রি কেলভিনে। কিন্ত কেন এই মাপকাঠির সর্বনিম্ন বিন্দুটি 'চরম' শূন্য ? এর থেকেও শীতলতর কোনও অবস্থা কি হতে পারে না ?   না পারে না। কেন এই নিষেধ, সেই প্রসঙ্গে পদার্থের আরও একটা ভৌত ধর্মের কথা এখানে টেনে আনতে হবে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় তার নাম এন্ট্রপি (Entropy)। সাধারণভাবে বলা যায় এন্ট্রপি হ'ল কোনও পদার্থসমষ্টির অন্তর্নিহিত বিশৃঙ্খলার মাত্রা। দুটি পদার্থের মধ্যে যেটির তাপমাত্রা বেশি, সেটির এন্ট্রপি বেশি। কারণ তাপমাত্রা বাড়লে পদার্থের অণুগুলি চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাদের বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায।  তাপমাত্রা কমালে এনট্রপি কমে। কিন্ত এই এনট্রপির মান শূন্য হওয়া অসম্ভব - এ কথা পদার্থবিদ্যার অন্যতম সত্য।

অঙ্ক কষে দেখা গেছে এনট্রপির মান শূন্য হবে ওই চরম শূন্যে পৌঁছলে। এ ছাড়া ওই তাপমাত্রাতেও যদি কোনও পদার্থ গ্যাসীও অবস্থায় থাকতে পারে (বাস্তবে সব পদার্থ তার আগেই তরলে পরিণত হয়) তবে চরম শূন্য তাপমাত্রায় তা হবে আয়তনহীন - আরও এক অসম্ভব অবস্থা।

                             

                                                                                              লিয়ঁ  কুপার    

এখন বুঝতে পারা যাবে শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় পৌঁছানোর জন্য ক্যামারলিং ওনস্ কেন বেছে নিয়েছিলেন হিলিয়াম গ্যাস। সহজেই আন্দাজ করা যায় গ্যাসিও অবস্থায় যে কোনও পদার্থকণিকার গতিপ্রকৃতি এলোমেলো অর্থাৎ এনট্রপি থাকে বেশি। তাই এটাও বোঝা সহজ যে, যে-গ্যাস যত হাল্কা, তার এনট্রপি তত বেশি।সবচেয় হাল্কা গ্যাস হাইড্রোজেনকে বাদ দিয়ে হিলিয়ামকে বেছে নেওয়ার কারণ হ'ল - হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, ক্রিপটন ও জেনন্ - এই গ্যাসগুলো রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়। এদের পরমাণুর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ খুবই ক্ষীণ বা নেই বললেই চলে। আবার হিলিয়াম হাল্কাও বটে। পর্যায় সারণীতে হাইড্রোজেনের পরেই হিলিয়ামের স্থান। সুতরাং হিলিয়ামের এনট্রপি সবথেকে বেশি। উন্নত যান্ত্রিক উপায়ে ধাপে ধাপে হিলিয়াম পরমাণুগূলোকে ক্রমশ কাছাকাছি এনে এনট্রপি কমানো হতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত গ্যাস তরলে রূপান্তরিত হয়। তরলাবস্থায় হিলিয়াম টগবগ করে ফুটতে থাকে এবং তার তাপমাত্রা দাঁড়ায় ৪.২ ডিগ্রি কেলভিন।  যে ধরনের হিলিয়ামের কথা আলোচনা হচ্ছে তাকে বলা হয় হিলিয়াম-৪ অর্থাৎ তাদের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আছে দুটি করে প্রোটন ও নিউট্রন। হিলিয়াম-৪ এর আইসোটোপ (isotope) হিলিয়াম-৩, এটাতে একটি নিউট্রন কম আছে। কাজেই এটি হিলিয়াম-৪ এর থেকে কিছুটা হাল্কা। হিলিয়াম-৩ গ্যাস ব্যবহার করে সর্বনিম্ন যে তাপমাত্রায় পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে তার মান হ'ল ০.৪ কেলভিন। বলা বাহুল্য, প্রকৃতির ভান্ডারে হিলিয়াম-৩ এর উপস্থিতি খুবই কম। এর থেকেও কম তাপমাত্রায় পৌঁছতে হলে পদার্থের এমন কিছু ধর্ম খুঁজে বের করতে হবে যাকে নিয়ন্ত্রণ করে পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। হিলিয়ামের মতো গ্যাসিও পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় ওই পদার্থের বিশৃঙ্খল অণু-পরমাণুগুলোকে যান্ত্রিক উপায়ে পরস্পরের কাছাকাছি এনে এনট্রপি কমানো হতো। এরপর নেওয়া হ'ল ভিন্ন উদ্যোগ।  আয়রন অ্যামোনিয়াম অ্যালাম, ক্রোমিয়াম পটাশিয়াম  অ্যালাম এবং সিরিয়াম ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রেটের মতো কিছু লবণ আছে যেগুলোর প্রতিটি পরমাণুকে ধরা যেতে পারে একেকটি ক্ষুদে চুম্বক। এগুল সাধারণ অবস্থায় এলোমেলোভাবে থাকে। এটাও পদার্থের এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবই এই অবস্থার মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে। তরল হিলিয়ামের পরিবেশে যথোপযুক্ত দুই দেওয়ালবিশিষ্ট আধারে এই জাতীয় লবণ রেখে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে ক্ষুদে চুম্বকগুলো নিজেদের চৌম্বকরেখা বরাবর ঠিকমতো সাজিয়ে ফেলার জন্য যে শক্তি ব্যয় করে, তাতে তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রা সামান্য কিছু বেড়ে যায়। আধারের দুই দেওয়ালের মধ্যে ঠান্ডা গ্যাস প্রবিষ্ট করিয়ে বর্ধিত তাপমাত্রা আবার নামিয়ে আনা হয়। এইবার চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাব সরিয়ে নিলে ক্ষুদে চুম্বকগুলো আবার এলোমেলো হয়ে যেত শুরু করে, কিন্ত তাতে যে শক্তি খরচ হয়, সেটা তরল হিলিয়াম থেকে সঞ্চয় করে। ফলে হিলিয়ামের তাপমাত্রার আরও কিছুটা হ্রাস হয়। এই পদ্ধতি ক্রমান্বয় চালিয়ে গেলে, তাপমাত্রা কমে দাঁড়াতে পারে এক কেলভিনের দশ লক্ষ ভাগের কাছাকাছি। অক্সফোর্ডের ক্ল্যারেনডন গবেষণাগারে প্রায় দুই দশক আগে ফ্রান্সিস সাইমন ও কুর্তি নিম্নতম যে তাপমাত্রা যে তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তার মান ছিল ০.০০০০০১ কেলভিন। পৃথিবীর বিখ্যাত গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা তাপমাত্রার নিম্নতম মানে পৌঁছবার জন্য বহুকাল ধরে যাবতীয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই তীব্র প্রতিযোগিতায় আপাতত সম্মুখবর্তীরা হলেন আমেরিকার কলোরাডোয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি গবেষণাগারের এম এইচ অ্যান্ডারসন, জে আর এনসার, এম আর ম্যাথুজ, সি ই ওয়াইম্যান এবং ই এ কর্নেল। তাঁদের শেষ পরীক্ষায় পাওয়া তাপমাত্রার মান দাঁড়িয়েছে ০.০০০০০০১৭ কেলভিন। বিজ্ঞান পত্রিকা 'সায়েন্স' এর ১৪ জুলাই '৯৫ সংখ্যায় এক বিজ্ঞান পত্রে তাঁরা প্রকাশ করেছেন তাঁদের গবেষণার ফলাফল। তাঁরা সামান্য কিছু রুবিডিয়াম পরমাণুকে ওই তাপমাত্রায় নামিয়ে এনে প্রমাণ করলেন কঠিন, তরল, গ্যাস ও প্লাজমা ছাড়া পদার্থের এক পঞ্চম অবস্থার অস্তিত্ব, মৌলিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন কন্ডেনসেট 

শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রার সামান্য তারতম্যে হিলিয়াম-৪ যে বহুরূপী ধর্ম প্রদর্শন করে সে ব্যাপারে সামান্য কিছু না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমরা দেখেছি যে ফুটন্ত হিলিয়াম-৪ এর তাপমাত্রা ৪.২ কেলভিন। বিশেষভাবে নির্মিত আধারে ওই ফুটন্ত তরলকে রেখে উন্নত ভ্যাকুয়াম পাম্পের সাহায্যে তরলের উপরিস্থিত বাষ্প টেনে সরিয়ে নিলে হিলিয়াম-৪ এর তাপমাত্রা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে। তাপমাত্রা ২.১৯ কেলভিনে পৌঁছলে, ফুটন্ত তরল হঠাৎই শান্ত চেহারা নেবে এবং তরলের উপরিতলকে মনে হবে কাচের মতো মসৃণ। আরও বায়ু টেনে নিতে থাকলে তরলটি আরও ঠান্ডা হবে কিন্ত উপরের তলে কোনোরকম নড়াচাড়া হবে না। এই তাপমাত্রাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'ল্যামডা পয়েন্ট', কারণ ওই তাপমাত্রায় তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটালে তরলটির তাপ ধারণ ক্ষমতার যে পরিবর্তন হয়, তার লেখচিত্রের সঙ্গে গ্রিক অক্ষর ল্যামডার হুবহু মিল আছে। এটা হিলিয়াম-৪ এর একটা বিশেষ অবস্থা। এই অবস্থায় তরলটির পরিবাহিতা অস্বাভাবিক বেশি ( সাধারণ তাপমাত্রায় তামার পরিবাহিতার ২০০ গুণ)। সব তরলের চলার পথে একটা পিছুটান বা বাধা থাকে, যাকে বলা হয় ভিসকোসিটি (Viscosity) বা সান্দ্রতা। যেমন জলের থেকে মধুর সান্দ্রতা অনেক বেশি। নতুন অবস্থার এই হিলিয়াম-৪ এর সান্দ্রতা আদৌ নেই। কাজেই যে পাত্রে রাখা হবে তার গা বেয়ে অনায়াসে উঠে আসবে। এই ঘটনাটাকে বলা হয় সুপারফ্লুয়িডিটি (Superfluidity) বা অতিতারল্য। বিজ্ঞানীরা এই ধরনের (২.১৯ কেলভিনের নীচের তাপমাত্রার) হিলিয়াম-৪ এর নাম দিয়েছেন 'কোয়ান্টাম ফ্লুইড' (Quantum fluid) কারণ কেবল কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকেই এই অচেনা স্বভাব ব্যাখ্যা করা যায়। এই বিষয়ে সফল গবেষণার প্রথম সারির বিজ্ঞানীরা হলেন রুশ বিজ্ঞানী পিটার কাপিৎজা (Peter Kapitza) ও লেও ল্যান্ডাও (Lev Landau) মার্কিন বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman)

৪.২ কেলভিন তাপমাত্রায় তরল হিলিয়ামের সংস্পর্শে সুপারকন্ডাকটার হিসেবে নায়োবিয়াম-টাইটেনিয়াম (NbTi) মিশ্র ধাতুর জুড়ি নেই। কারণ ওই পদার্থটিকে বিদ্যুতবাহী তারের আকার দেওয়ার কাজে প্রযুক্তিবিদরা বিগত এক দশক হ'ল হাত পাকিয়েছেন। কাজেই যথেষ্ট ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ প্রয়োগক্ষেত্রেই নায়োবিয়াম-টাইটেনয়ামের ব্যবহার হচ্ছে। কিন্ত সমাজসচেতন বিজ্ঞানীরা সবসময়ই চিন্তা করেন কীভাবে তাঁদের হিতচিন্তার ফসলকে অর্থনৈতিক অনুকূলতার সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগানো যায়। সেই উদ্দেশ্যেই দেশকালের ভেদাভেদ অগ্রাহ্য করে পৃথিবী জুড়ে গবেষণা চলছে এমন পদার্থ আবিষ্কারের, যা অতীব ব্যয়বহুল এবং দুষ্প্রাপ্য হিলিয়ামের পরিবর্তে অনেক সস্তা ও সহজপ্রাপ্য তরল নাইট্রোজেনের সংস্পর্শে অতিপরিবাহী চরিত্র বজায় রাখবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব যে যে-কোনও সুপারকন্ডাকটারকে তার ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রার দুই-তৃতীয়াংশ তাপমাত্রায় কাজ করানো নিরাপদ। সেই কারণেই নায়োবিয়াম-টাইটেনয়ামের ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রা ৯ কেলভিনের কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও সেটিকে ৪.২ কেলভিনে তরল হিলিয়ামের সংস্পর্শে রাখা হয়। সুতরাং তরল নাইট্রোজেনের (তাপমাত্রা ৭৭ কেলভিন) সংস্পর্শে যে অতিপরিবাহী কাজ করবে তার তাপমাত্রা হওয়া উচিত ১২০ কেলভিন বা তারও বেশি। বেশ কিছু যৌগিক পদার্থ (বিশেষ করে সেরামিক জাতীয়) এই ধরনের উচ্চ তাপমাত্রায় অতিপরিবাহিতার চরিত্র প্রদর্শন করেছে। কিন্ত টেকনোলজির অভাবে তাদের ব্যবহারোপযোগী শিল্প-পণ্য হিসেবে রূপ দেওয়া যাচ্ছে না। উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটার উদ্ভাবনে কৃতিত্বের গবেষণার জন্য ১৯৮৭ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন জোহানস্ গর্গ বেদনোর্জ কার্ল অ্যালেক্স মুলার

যে কোনও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার অনেক ব্যবহারিক দিক। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞান ভিত্তিক কাজের গুরুত্বও বিচার করা হয় সেই কাজ থেকে আরও কত নতুন পথ খুলে যাচ্ছে সেটাকে কেন্দ্র করে। সুপারকন্ডাকটিভিটি এমনই একটি আবিষ্কার। আমরা আলোচনা করব সুপারকন্ডাকটারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে।

আজকের প্রগতিশীল দুনিয়ায় একটা দেশ বস্তু কণা ত্বরণ যন্ত্র (Particle Accelerator) তৈরির কাজে কতটা এগিয়ে আছে, তা দিয়ে মাপা হয় সেই দেশের প্রায়োগিক উন্নয়নের মাত্রা। কারণ ওই যন্ত্র তৈরি করে কাজ করাতে কয়েক হাজার রকমের পরস্পরনির্ভর সূক্ষ্ম এবং জটিল যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। মৌলিক বিজ্ঞান সাধনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই যন্ত্র ব্যবহারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ত্বরণযন্ত্রকে বলা যেতে পারে এমন এক ধরনের মাইক্রোস্কোপ যা ব্যবহার করে অণু-পরমাণু বা তার থেকেও আরও অনেক ক্ষুদ্র কণিকাদের (sub-nuclear particle) আচরণ অধ্যয়ন করা যায়। এ ছাড়া সেমিকন্ডাকটার তৈরির শিল্প , নিউক্লিয়ার মেডিসিন, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ, জীবাণুর, ফরেন্সক তদন্ত (ট্রেস এলিমেন্টের উপস্থিতি), ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ত্বরণযন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে।

উচ্চশক্তিসম্পন্ন বৃহদাকার ত্বরণযন্ত্রের তড়িৎযুক্ত পদার্থকণিকার নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রাখার জন্য কয়েকশ তড়িচ্চুম্বকের প্রয়োজন হয়। চুম্বকের তারের কুন্ডলীতে তড়িৎবাহী তার হিসেবে ব্যবহার করা হয় নায়োবিয়াম-টাইটেনিয়াম সুপারকন্ডাকটার। অপেক্ষাকৃত ছোট চুম্বকে ব্যবহার করা যেতে পারে নায়োবিয়াম-টিনের ( NbSn) টেপ। এই ধরনের বৃহদাকার ত্বরণযন্ত্র ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানে বেশ কিছু আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব দেশীয় প্রযুক্তি প্রয়োগ করে পঞ্চাশের দশকে আমাদের দেশে প্রথম যে ত্বরণ যন্ত্রটি তৈরি হয়, সেটির নির্মাণকার্জে পুরোধা ছিলেন স্বয়ং মেঘনাদ সাহা। সাহা ইনস্টিটিউটের রাজাবাজার ক্যাম্পাসে সেটির এখনও রাখা আছে। পরে তৈরি হয় সল্ট লেকের ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন। এ ছাড়াও মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে উচ্চশক্তিসম্পন্ন বৃত্তাকার একটি ত্বরণযন্ত্র নির্মাণের কাজ চলছে। তবে এগুলোর কোনোটিতেই সুপারকন্ডাকটিং টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়নি।

তাপমাত্রার পরম শূন্যে পৌঁছানো অসম্ভব। কিন্ত সেই তাপমাত্রাথেকে মাত্র এক ডিগ্রির তিরিশ লক্ষ ভাগের ব্যবধানে পৌঁছেছে জার্মানির এই বিজ্ঞানীরা

দেহ অভ্যন্তরস্থ প্রায় যে কোনও ত্রুটি পর্যবেক্ষণের জন্য সবথেকে আধুনিক যে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়, তাকে বলা হয় এম আর আই (Magnetic Resonance Imaging)। যে বৃত্তাকার বস্তুটি রোগীকে বেষ্টন করে থাকে, সেটি একটি শক্তিশালী তড়িচ্চুম্বক, যার কুন্ডলী তৈরি করা হয়েছে সুপারকন্ডাকটার ব্যবহার করে। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে সাধারণ তামার তারের কুন্ডলী ব্যবহার করা হলে একই চৌম্বকশক্তির জন্য কুন্ডলীর আকার হতো অনেক গুণ বড় এবং পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতশক্তিও খরচ হতো অনেকটাই বেশি।

                জন বার্ডিন                       রবার্ট  স্রিফার 

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাপজোখে সুপারকন্ডাকটারের ব্যবহার দিনে দিনে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ: সুদূর গ্রহ-নক্ষত্রের জগতে অনুসন্ধান চালাবার জন্য জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীরা (Astrophysicists) বহুকাল ধরে টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আসছেন। এগুলোকে বলা হয় অপটিক্যাল টেলিস্কোপ। অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্র থেকে ঠিকরে পড়া দৃশ্যমান আলোকের চরিত্র পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ব্রহ্মান্ডের বিবর্তনের ঘটনা জানবার চেষ্টা করেন। কিন্ত যে সমস্ত নক্ষত্রের বিকিরিত আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের থেকে বেশি তাদের ধরার উপায় কী ? উত্তর - রেডিও টেলিস্কোপ। মহাশূন্য থেকে ভেসে আসা রেডিও তরঙ্গগুচ্ছকে কেন্দ্রীভূত করবার ব্যবস্থা আছে এই রেডিও টেলিস্কোপে। অনেকটা স্টার টিভির প্রোগ্রাম দেখার জন্য উপবৃত্তাকার রুফ টপ অ্যান্টেনার। মতো। রেডিও টেলিস্কোপ হ'ল এই ধরনের একাধিক অ্যান্টেনার এক সুসজ্জিত বিন্যাস। প্রতিটি অ্যান্টেনার উপবৃত্তের ফোকাসে অর্থাৎ কেন্দ্রে রাখা থাকে বিকিরণ মাপার একটি ক্ষুদ্রাকার যন্ত্র,  যাকে বলা হয় ডিটেক্টর (detector)। সুদূর নক্ষত্র থেকে বিকিরিত রেডিও সিগন্যালের শক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সুপারকন্ডাকটিং টানেল ডিটেক্টর। বস্তুটির বিবরণ এবং কার্যপ্রণালীর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে প্রসঙ্গে যবনিকা টানব। একটি অত্যন্ত পাতলা (৮ থেকে ১০ অ্যাংস্ট্রম; ১ অ্যাংস্ট্রম = এক মিটারের হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ) অপরিবাহী বস্তুকে দু-টুকরো সুপারকন্ডাকটারের মধ্যে স্যান্ডউইচ করে সম্পূর্ণ জিনিসটাকে একটি বিদ্যুতবাহী বর্তনীতে (Electrical circuit) স্থাপন করা হয়। সাধারণ অবস্থায় বর্তনীতে কোনও বিদ্যুত প্রবাহ হয় না বললেই চলে, কারণ বিদ্যুতপ্রবাহে অপরিবাহীটি বাধা সৃষ্টি করে। কিন্ত বস্তুটির উপর ক্ষীণতম রেডিও সিগন্যাল আপতিত হলেই বিদ্যুতপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রবল হয়। এর মূলে আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম যা আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রেডিও সিগন্যাল আপতিত হওয়ার আগে সুপারকন্ডাকটারের ইলেকট্রনগুলো জোড়ায় জোড়ায় (Cooper pair)  নিজেদের পারস্পরিক বেঁধে রাখায় অপরিবাহীর বাধা ভেদ করার মতো যথেষ্ট স্বাধীন ইলেকট্রনের অভাব থাকে, কিন্ত কুপার পেয়ারের বেঁধে রাখার শক্তি অত্যন্ত কম হওয়ার ফলে ক্ষীণতম শক্তির রেডিও সিগন্যাল কুপার পেয়ারদের বাঁধন মুক্ত করে সুপারকন্ডাকটারে স্বাধীন ইলেকট্রনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। ফলে ইলেকট্রনগুলোর অপরিহার্য বাধা পেরনোর সম্ভাবনা বেড়ে গিয়ে বর্তনীতে বিদ্যুতপ্রবাহ হতে থাকে। বলা বাহুল্য বিদ্যুতপ্রবাহের মাত্রা নির্ভর করে রেডিও সিগন্যালের তীব্রতার উপর। 

অবাক লাগে প্রকৃতির বিশাল কর্মকান্ডে মানুষের অসাধারণ ভূমিকার কথা ভেবে। পৃথিবীর মাটিতে তার জীবন অনতিদীর্ঘ। গতিবিধির সীমানাও তার বাঁধা পৃথিবীতলেই। এমনকি যে পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে সে অভ্যস্ত তারও একটা সীমানা আছে। অথচ তার সন্ধানী মন ছুটে চলেছে স্থান, কাল, তাপমানের সব সীমানা অতিক্রম করে।

E-mail era yet to dawn

 


                 E-mail Era yet to dawn

The incident occurred in a first class air-conditioned train compartment almost a month ago. My fellow passenger happened to be a top executive in one of the most reputed corporate houses of the country.

However, after some initial acquaintances and after knowing about his professional commitments, I got to know that he has to spend a substantial amount of time on business transactions through Telephone, Telex and Fax. In fact, the monthly figure he quoted, were unbelievably large - Rs.60 to 70 lakhs.

I couldn't resist the temptation of suggesting the idea to the "so called" top brash of using of e-mail (electronic mail). But he was not convinced. The debate continued. However, when logic failed, he finally said that the emotion which could be expressed over a Telecon was not possible through any other means. It is unfortunate that corporate executives of our country are yet to realise the full potential of modern communication facilities.

The latest facility for exchanging information by means of a service (e-mail), is available with the Educational and Research Network (ERNET) project launched by the department of electronics (DoE), government of India, in 1988 under the United Nations Development Programme (UNDP).

The project initially linked eight academic institutes of the country including the IITs at New Delhi, Bombay, Madras, and Kharagpur, IISC, Bangalore, National Council of Science and Tecnology, Bombay, and DoE at New Delhi. Today there are about 300 members in the ERNET club throughout the country. However, the eastern region has only 20.

E-mail is a global mailing system, facilitating exchange of information among it's subscribers anywhere in the Network, using worldwide Telephone links and computer as the terminal equipment at the subscriber's end instead of Telephone.

Thanks to the tremendous development of microelectronics that has led to the production of large storage media, high-speed and low-cost desktop computers at one end and high-tech, line- of-sight communication media like microwave and Satellite at the other, besides physical media like copper conductors and fibre optics. The marriage of these two technologies has produced a number services and e-mail is one of them.

What is so great about e-mail? The telephone lines, instead of carrying voice signals, carry computer processed data in the form of digital signals. So, in order to have a mailing facility, one should have a PC/AT running UNIX or XENIX, a compatible MODEM and of course, a pair of Telephone line.

The initial investments would never exceed Rs.30,000. However, addition of a printer 🖨 would cost another Rs.10,000.

It is TRUE that the telephone provides instantaneous access, but studies have shown that about 60 -70 per cent of all business calls fail to reach the intended party in time. As a result, the party, returning to his desk, calls back to have a similar reply. So this unending process goes on.

E-mail is delivered faster than a telephone call. Moreover, it is not necessary that both the concerned parties needed to remain available at the same instant. Here it is the duty of the computer to receive and store the required message for you. You can get your message by keying in appropriate commands when you are back. You can also have a printed copy of the same with the help of appropriate options. You can also send a message in broadcast mode, to a number of persons simultaneously. Presently the Fax has only advantage that it can send hand-written information. But it may also be available on E-mail soon, says experts.

                 Key takeaways from E-mail

A study, based on experience, reveals that the cost of transmission is roughly proportional to the time the communication line is occupied and is independent of of the mode of transmission. It has been estimated that transporting typed information contained in an A4-size paper would require about five minutes over telephone and about two minutes over Fax.

As for E-mail, the time depends mainly on two factors - the electrical condition of the ☎️ telephone link and the kind of medium being used. In addition, noisy telephone lines limit the speed and simple modems do not have all the features for high speed transmission. However, despite such problems, the transmission time for the same length of information through E-mail is not likely to exceed 10 seconds on an average, an order of magnitude faster than the prevailing modes.

The time reduces  by a factor of 15-20 if the transmission is made via a dedicated leased line between the subscriber and the nodal point (that is, the receiver). Communication via Satellite reduces this time by a still larger factor.

For exchanging confidential and classified information for office management, however, the need for telephone cannot be ruled out. But for the routine and  bulk information exchange, there is none to match this modern mailing facility.

The important question however, remains to be answered is, how one can ensure the security of corporate information over E-mail ? As such the information is open to the node manager,  and in such cases non-uniform coding mechanism could be devised to code confidential information. 

DoE has set up a nodal centre for Eastern Region at the Variable Energy Cyclotron Centre (VECC) under Dept. of Atomic Energy, at Salt Lake City, Calcutta. About 20 numbers of academic institutes, including some of those from neighbouring states of Assam, Orissa and Bihar, have access right to the node for exchanging information among themselves as well as rest of the 300 members of the ERNET club.

National Centre for the Software Technology (Bombay) - the Indian "Gateway" for electronic mail has the additional responsibility of exchanging information between the ERNET members and members of any other Network around the globe. It is to be noted here that ERNET, once meant for use only by the academic institutes and government departments, has of late been made available to private customers as well. 

Security of classified information is more important than "emotion". After all, emotions have a very limited place in the business world. Therefore, let us not confine ourselves to our present imagination. We must recognize our ignorance and leave room for doubt.


Thursday, August 25, 2022

Making the world smaller

  Telecommunication is moving 
at a dizzy pace


The word communication is sometimes synonymous with prosperity and civilization. As a matter of fact, the index of prosperity of a nation is perhaps greatly dependent on the communication facilities it offers -- roadways, railways, telecommunication and so on. Civilized people have always communicated. The evolution of the modes of meaningful and long-distance communication started from the prehistoric age when geographically scattered people, communicated through Smoke signals. The different patterns of smoke indicated the message conveyed. Then came Drum beating. Drummers sitting at hilltops relayed intelligence to distant places. The pattern of notes helped discriminate the messages relayed. These went on for centuries until people mastered the art of writing and exchanging information took place by Pigeon post and later through the Postal service.

The dawn of the 19th century suddenly sparkled with the invention of the Telegraph, the first milestone of modern communication, by Samuel Morse. Morse code, a combination of short and long duration electrical signals sent over wire, conveyed meaningful information. This was the starting point of long-distance communication. The human voice, a form of sound energy, was converted into it's electrical counterpart and sent over wires. Over many years, voice communication passed into Telegraph. Other applications followed rapidly; Telex for transport of typed characters, Fax or Facsimile for still images and hand-written texts, Radio broadcasting for speech and music  and Television for moving images and associated sound. Modern communication, the main focus of this article, has taken a dramatic upswing in the late Sixties following significant development of the Digital Computer.

Basically there are two ways in which information or a message of any type, Voice,Texts or Images can be transported between a sender and a receiver through the Telecommunication Network,  using appropriate media : Analog or Digital. Analog means that a continuous range of frequencies is transmitted. The sound one hears and the image one sees consist of such a continuous range. Digital transmission means that a stream of on/off pulses known as bits, short form of binary digits are sent the way, the data travel in computer circuits.

The source (voice microphone or TV camera output) and the destination (hand set, or Radio/TV set at home) of information are predominantly analog by nature and will always have the highest degree of penetration in the human society, that is telephone, Radio and Television users are many times more than the Telex and computer users. At the same time, transportation of information over long distances using digital communication technique is inherently more reliable and superior quality. So, considerable effort went to digital transportation of information to replace analog communication, taking it for granted that techniques existed to code analog information into digital form at source and decode in a reverse at the destination to suit the characteristics of terminal equipments. The technique of coding is broadly known as pulse code modulation.

How does the computer comes so heavily into telecommunication? Let us illustrate by an example: You must have noticed that just a pair of lines goes out of your home telephone set. Yet you can talk to anybody, anywhere you like. This means the Telephone Exchange, the multiway switch, does the switching function depending on the number dialled. Most of the telephone exchanges in our country are still Strowger or Cross-bar exchanges. Whereas the Digital switches of today are highly specialised computer, programmed, specifically for processing of streams of bits. For the most part such switches are neutral to what the streams represent - voice, texts or Images. 

In this case the computer does the switching function,  perhaps most efficiently. This is the real time application of the computer, meaning that the end-to-end connectivity is matured before the telephone conversation begins. The property of programmability, storage and the speed of computer is exploited in non-real time applications.

In electronic mailing, texts in the form of letters or reports are entered into the source computer with the mailing code of the destination. The computer finally takes care of transporting the mail to it's destination. For example,  a message from Calcutta to New York is to be posted. The communication Network is spread between these points with intermediate stations, say, at Bombay, Rome, Amsterdam and London. It is quite likely that the entire link, i.e. Calcutta, Bombay, Rome, Amsterdam, London and New York may not remain free at that instant. The computer keeps hunting the availability of free link and keeps on sending the message in parts for storage at an intermediate node with all the book-keeping of part of the message sent till the entire message finds its intended destination with multiple hops. In computer terminology this is termed as packet switching of message.

The circumstances favouring digital transmission stem mainly from two factors. First, the reliability of high speed digital transmission at reduced cost, second, an unified approach in squeezing voice data and image in digital format will help getting rid of multiple standards of telecommunication. The approach is known as Integrated Services Digital Network (ISDN), a bold and feasible step towards modern communication. It is, of course, recognised that there has already been large investments in existing telecommunication switches and other facilities in many parts of the world, and economic factors would make it impossible to change immediately to ISDN in many areas, particularly in developing countries. But ISDN is definitely going to be the vehicle of communication of the 21st century.

স্মৃতিচারণা


১৯শে জুন, ১৯৯৪, রবিবার রাত ন'টা। টেলিফোনের বেসুরো শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল অঘটনের ইঙ্গিত। খবর পেলাম শ্রীবিধানচন্দ্র রায় আর আমাদের মধ্যে নেই। তাৎক্ষণিক মানসিক প্রতিক্রিয়া ঠিক কী ধরনের হয়েছিল ঠিক মনে নেই। তবে শোকাকুল না হয়েছিলাম যতটা, বিস্মিত হয়েছিলাম তার অনেক বেশি। কারণ ঠিক তার দু'দিন আগেই, মানে শুক্রবার সকাল ১১টা নাগাদ মানুষটিকে দেখেছিলাম অফিসে; জুন মাসের ওই গরমে নিজের অফিস ঘরের সামনের করিডরে সোয়েটার গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে -  দু'একটা কথার আদান-প্রদানে বুঝলাম তিনি অসুস্থ-"বিশেষ কিছু নয়, সর্দ্দি-জ্বর স্যার।" ছুটি নিয়ে বাড়িতে বিশ্রামের প্রস্তাবে ওঁর উত্তর- "কয়েকটা জরুরী কাজ বাকি আছে স্যার, তাড়াতাড়ি সেরেই বাড়ি চলে যাব।" নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস; তখনও তাঁর জানা ছিল না যে সেটাই ছিল তাঁর শেষ অফিসে আসা।

টেলিফোন নামিয়ে বিস্ময়ের ঘোর কাটতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল। আমার মনে হয় যাঁরা তাঁকে চেনেন, তাঁকে জানেন তাঁদের সবাইকার মনের অবস্থা আমার মতই হয়েছিল। কারণ এমন একজন কর্মব্যস্ত ছটফটে মানুষের জীবনহানির মত দুঃসংবাদে বিচলিত হওয়াই স্বাভাবিক। 

বিধান চন্দ্র রায়, বি সি রায়, রায় বাবু, বিধান - সব একই মানুষের বিভিন্ন পরিচয়। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ১৫ বছরেরও বেশি। ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও একই প্রতিষ্ঠানে যাঁরা বহুদিন একসাথে কাজ করেন, যৌথ পরিবারের মতই তাদের মধ্যে একটা অব্যক্ত যৌথ স্বার্থ থাকে, পারস্পরিক একটা বোঝাপড়া থাকে। বলাই বাহুল্য যে এই বোঝাপড়ার মধ্যে কোন অশুভ আঁতাত থাকে না। শুধু তাই নয়, এই ধরনের বোঝাপড়া পদমর্য্যাদা নিরপেক্ষ, অন্তত আমাদের প্রতিষ্ঠানে। কারণ বিভিন্ন পদমর্য্যাদার কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কৈশোর পার করেছেন প্রতিষ্ঠানকে একটা জায়গায় দাঁড় করানোর সঙ্কল্প নিয়ে। প্রতিষ্ঠানের সুছ-স্বাচ্ছন্দ সবাইকার সমানভাবে জুটেছে, এমন কথা বলতে পারব না। তবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে হাসিমুখে দুঃখের ভাগ বহন করতে যাঁরা পিছপা হননি, বিধান রায় হাতে গোনা স্বল্প সংখ্যক সেই মানুষদের তালিকায় অবশ্যই প্রথম দিকের একজন।

মাত্র ছেচল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বহু মহৎ গুণের স্বাক্ষর রেখে গেছেন বিধানচন্দ্র। নানান কাজে ছিল তাঁর উৎসাহ এবং অস্বাভাবিক একাগ্রতা। গত কয়েক বছর যাবৎ ডিপার্টমেন্টের গাড়ি চলাচলের তদারকি করছিলেন তিনি। সরকারি দপ্তরে গাড়ির সংখ্যা সীমিত, দাবিদার অনেক। কাজেই আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও সবাইকার অনুরোধ সব সময় রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হ'ত না। তবে এজন্য তাঁকে মূল্য  দিতে হয়েছে, অনেক সময়ই তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে বিদ্রুপ। কিন্ত তাই বলে অভিমানবশত পশ্চাদপসরন করেননি তিনি।

চালচলনে তিনি ছিলেন সাদামাটা; অকৃত্রিম, সোজা কথার মানুষ। প্যাঁচাল মানুষজনের মত ভাষার কূটকচালি জানতেন না। স্মার্টনেস নামে ইংরেজি অভিধানে একটা শব্দ আছে যা এযুগের পৃথিবীতে খুব সহজেই বিকোয়। দায়িত্ব পালনের তাগিদে বিধান বাবুর দৌড়াদৌড়ি করার অন্ত ছিল না, কিন্ত তথাকথিত স্মার্টনেস ও বাকচাতুর্যের অভাবে তিনি শিকার হয়েছেন বিদ্রুপের, কখনও প্রকাশ্যে কখনও বা পশ্চাতে।নিয়মমাফিক  নিয়ম মেনে অফিস করা তাঁর ধাতে ছিল না। তাই সকাল, সন্ধ্যে, ছুটির দিন- সব সময়ই তাঁর দেখা পাওয়া যেত অফিসে। দায়িত্বের স্বীকৃতি না পেলেও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার উৎসাহেই ছিল তাঁর প্রাণশক্তি। তাঁর কাজের উৎসাহ দেখে আমার মনে হয় তিনি এক অমোঘ সত্যকে প্রমাণ করেছেন - "সাফল্য আর সুখ এক জিনিস নয়।" বিধান বাবু কাজ উপভোগ করতেন। এর জন্য তিনি সময়মত আহার-নিদ্রাকেও বশীভূত করেছিলেন। মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারবর্গের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা আমার অনুমানকে মিথ্যে প্রমাণ করে না।

দুম করে রেগে উঠে পরক্ষণেই ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শীর্ণকায় মানুষটির বাহ্যিক আবরণে কঠোরতা প্রকাশ পেলেও হৃদয়ে তিনি ছিলেন কোমল। এ ব্যাপারে ঠিক প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেওয়া সম্ভব নয়; তবে যাঁরা তাঁর মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা সন্ধান পেয়েছেন তাঁর নিষ্পাপ কোমল হৃদয়ের ঠিকানা। তাঁর কঠোরতার ভাবটা ছিল অনেকটা এই রকম, "পাছে লোকে দয়ালচিত্ত বলে, এই লজ্জার আশঙ্কায় তিনি কাঠিন্য প্রকাশ করতেন। আসলে তাঁর রুক্ষ-শুষ্ক চেহারা আর বর্ণের তলায় লুকিয়ে থাকত একজন নির্ভেজাল সৎ, কাজপাগলা, পরোপকারী মানুষ। 

অফিসের কাজে কর্মে কিছু কিছু কাজের চরিত্র এমন থাকে, যেখানে ব্যক্তিগত লাভের অনেক সুযোগ সুবিধা আছে। এমনই একটি স্পর্শকাতর জায়গার দায়িত্বে ছিলেন বিধান বাবু। আমার মনে হয় তাঁর নিন্দুকেরাও অভিযোগ করতে পারবেন না যে তিনি ব্যক্তিগত কাজে সরকারি সুযোগ সুবিধের অপচয় করেছেন। আত্মসম্মাণ, নির্লোভ ছাড়াও তাঁর চরিত্রে আর যে গুণটি যুক্ত হয়েছিল,  তা হ'ল অল্পে সন্তুষ্টি। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে হৃদয়বান। কাজেই সরকারি সুযোগ সুবিধে থেকে ব্যক্তিগত লাভের ব্যাপারটা স্বাভাবিক অধিকার বলে মনে করতেন না।

সুপারভাইজার ট্রেনিং শেষ করে বম্বে থেকে ফিরে এসে উনি ট্রেনিং-এর অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানাচ্ছিলেন। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্ত করছিলেন ট্রেনিং-এ তাঁকে নির্বাচনের জন্য ডিপার্টমেন্টের কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতা। চরিত্রের এই অকপট সরলতা ভাবা যায় আজকের যুগে !!

নির্লোভ হলেও সংসারী সব মানুষের সামাজিক, সাংসারিক নানান বায়নাক্কা মেটাতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়। বাড়তি অর্থ উপার্জনের যে পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন সেটা তাঁর মত পবিত্র আত্মারই উপযুক্ত। ছুটির অবকাশে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সাইকেলে চেপে চলে গেলেন কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায়। দেখেশুনে, বেছে কিলোগ্রাম দরে কিনে আনলেন পুরোনো বই; অনেকগুলোই হয়তো তার মধ্যে দুষ্প্রাপ্য। তারপর সামান্য দামে সেগুলো বিতরণ করতেন উৎসাহী সহকর্মীদের। জানা নেই ব্যবসায়িক সাফল্য তিনি কতটা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তবে বইয়ের এই নেশা অবশ্যই প্রমাণ করে তাঁর চরিত্রের আত্মিক এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষের দিকটা। সব বইগুলো হয়তো বুঝে উঠতে পারতেন না। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ঠাহর করতেন দুষ্প্রাপ্য বইগুলোর উপজীব্য বিষয় এবং সেগুলো হাজির করতেন উপযুক্ত সহকর্মীদের কাছে।

মৃত্যু কখনও সুখের নয়। বিধান বাবুর মর্মান্তিক অকাল মৃত্যুতে আমরা খুবই দুঃখিত বরং বলব অধিকতর বিস্মিত। পরিবারবর্গকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়ে দায়মুক্ত হবার চেষ্টা করব না। তবে স্বজন বিয়োগের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দু'একটা কথা বলতে চাই; বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আকস্মিক দুঃখ-দুর্দশার মোকাবিলার জন্য মানুষের কোনও প্রস্তুতি থাকে না বলেই প্রথম আঘাতটা খুব গুরুতর মনে হয়।তবে এটাও খুবই সত্যি যে সময়ের আবর্তনে দুঃখের আবেগ স্তিমিত হয়ে আসে। ক্রমশ দুঃখ বিলুপ্ত হয়ে তার জায়গা দখল করে জীবিতাবস্থার মধুর স্মৃতি। আসলে ক্ষত শুকিয়ে যায়, দাগ থেকে যায়। পরমেশ্বরের কাছে প্রয়াত বিধান চন্দ্র রায়ের আত্মার শান্তি কামনা করি। ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি।


Monday, August 22, 2022

Personal Computers

          Crunching numbers for millions

                Personal Computers (PC)



If the aircraft industry had evolved as spectacularly as the computer industry over the past 30 years, the latest aircraft would cost a few thousands of rupees and it would circle the globe in just 20 minutes on a few litres of fuel. So goes an anecdote, much popular among computer professionals. 

Suc a performance would give a rough analogies of the reduction in cost, the increase in speed of operation and the decrease in energy consumption of computers. The progression from the  huge mainframe computers of the sixties to the trendy boxes on desktops of the same power tells the same story. PCs have brought the individual at par with mainframe operators.

Anatomically, personal computers feature all the parts of a mainframe computer. It was in 1971 that INTEL a US-based company pioneered inscribing all elements of a Central Processing Unit (CPU) on a single silicon chip, calling it the Microprocessor. Tremendous advancement in microelectronics research during last three decades has been able to pack more and more computing power in the same area of the tiny silicon wafer, thereby increasing the speed of operations. 

These microprocessors are popularly addressed by their manufacturer's part number. Thus, the first member of the INTEL family of microprocessors took its unassuming number 4004 followed by 8008, 8085, 8086, 80186, 80286, 80386 and 80486.

The evolution of PCs followed, perhaps inevitably, from the advent of the microprocessor. Every PC now has one of the microprocessors from the family starting from 8086.

Why is it Personal ? What is so 'Personal' about it ? Well, it took birth in one of the research laboratories of the computer giant IBM in the US way back in 1975. Like any other gadgets such as TV, video, or music system, it was affordable to the common individual ; hence the name in the first place.

Though in India PCs are used primarily by the business community, this does not necessarily mean that they have become less personal. Their impact has been felt by the professionals - a professional of any discipline who can afford it.

The nomenclature can be justified from other angles too. Unlike Mainframe computers, one has much better manoeuvrability with this tiny number crunchers. Developments, particularly in software techniques, have made the interaction between man and machine increasingly friendly. As a result, a wide variety of computer functions are now accessible to people with no technical background. 

Also, the PC has a great sociological impact. Earlier, computer supremacy used to be enjoyed only by the elites. The scenario has changed now and more people enjoy the cosy glamor of computer culture, at least psychologically. Finally, the question remains to be answered whether an individual needs or will benefit from his own personal computer.

Whether or not we benefit from the PC, can be gauged from the spread of the "wonder machine." It is difficult to find areas untouched by the computer, specially the PC - it's simplicity in personality and low cost attracts users of varied taste. As far as the industrial sector is concerned, hooking up a PC with any electromechanical machine with appropriate hardware and software interface, will do miracle in terms of overall performance and productivity. 

The PC has brought revolution in high-tech areas such as information technology, the fruits of which are enjoyed by common people directly or indirectly. For example,  to establish personal contact with people anywhere on the globe is no more a fantasy provided you have a PC with communication software and a Modem - a device that translates the computer grade signal to corresponding voice grade signal for onward transmission. The message at the other end is deciphered in reverse fashion by another modem and stored in the computer storage there. So it is immaterial whether the called party is available or not at that particular instant; he retrieves the message from his PC when he is back. This is what is called Electronic mailing. There are hundreds, if not thousands, of useful areas where the PC finds its place.

For some class of people, the PC is a must as they are well aware of the use of the computer and the standard application areas are well defined. For them even if the application is not within the standard domain, they can improvise techniques to cope with the requirement of the problem and make use of the PCs for suitable solution. How ? The answer is pretty simple. Human beings have always enjoyed comprehending i.e., reducing phenomena by the process of logic and common sense to something already known or apparently evident.

Monday, August 8, 2022

Poem: What I'd like to be

 

Ambition 


I'd like to be earth bound

But let my mind sail around,

where the oxygen is getting thin,

cruising at a level of abstraction

with a sense of passion and perception,

searching for the truth yet to be seen.


I'd like to stretch my helping hands to all who care,

but certainly without motive unfair

Oh no ! it's not the kind of weakness that devils imagine,

rather self dictum , fighting devilish self within.


I'd like to live like a simple human being, 

But with the dignity of a magnanimous king.

And a courage of an untiring patriotic general

leading his army till a memorable farewell. 


Saturday, August 6, 2022

ব্যার্থ প্রেম

                     যে প্রেম পরিণতি পেল না

আজ বৃষ্টিভেজা সকাল মনে করিয়ে দিল ৬/৭ বছর আগের এমনই এক ভোরের দিনটাকে ; কিন্ত তা ছিল রীতিমত বেদনাবিধুর। ওই সময় আমি ঢাকুরিয়া লেকে বেড়াতে যেতাম। তিরতির করে বয়ে যাওয়া লেকের দু'ধারে সবুজ গাছগাছালির মনোরম পরিবেশকে মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করতাম। ফেরার পথে পাঁচ-সাতজন সমবয়সীদের (ওখানেই পরিচয়, কারও নাম পর্যন্ত জানা ছিল না।) সঙ্গে দু'চার কথা গল্প করে বাড়ি ফিরতাম। যে সময়ে আমরা ওখানে আড্ডা জমাতাম, প্রায় একই সময়ে দুই কিশোর-কিশোরী হাত ধরাধরি করে বেড়াতে আসতো। হাত ধরাধরি করে হাঁটার আচরণে অশালীন কিছু চোখে পড়েনি। তারা সব মানুষের দৃষ্টি কেড়েছিল যে কারণে, তা হ'ল তারা প্রয়োজেনে সবাইকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। নিজের চোখে দেখা দুটো ঘটনার উল্লেখ করব।

 ভারি চেহারার এক বৃদ্ধা একদিন হোঁচট খেয়ে পড়ে আর উঠতে পারছেন না। এই জুটি তাঁকে তুলে সামনের শাণের বেঞ্চিতে বসিয়ে পথচলতি মানুষের কাছ থেকে জলের বোতল চেয়ে নিয়ে মুখেচোখে ছিটিয়ে দিল। মেয়েটি তার ওড়না ভাঁজ করে হাওয়া দিতে লাগল। বৃদ্ধা একটু ধাতস্থ হলে, তাঁকে বলল, "চল দিদা তোমাকে আমরা বাড়ি পৌঁছে দি।"

বেশ কিছুদিন বাদের ঘটনাটা সত্যিই অবাক করার মত। আড্ডা শেষ করে লেক থেকে বেরোনোর ঠিক আগে জটলা দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। জটলার কাছাকাছি গিয়ে শুনলাম এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বেঞ্চি থেকে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলেন। আস্তে আস্তে ভিড় কমে যেতে দেখি সেই দুটি ছেলেমেয়ে বৃদ্ধের শুশ্রুশায় ব্যস্ত। ইতিমধ্যে ভদ্রলোক সুস্থ হয়ে মোবাইলে ফোন করে বাড়ির লোককে ডেকে পাঠালেন। ছেলেমেয়েদুটোকে বললেন, "তোমরা এখন যাও, আমি বেশ সুস্থ বোধ করছি এখন। কাছেই বাড়ি, বাড়ির লোক এক্ষুনি এসে যাবে।" ওরা তো নাছোড়। - তাহলে থাকো, কিন্ত জলের বোতলের আর দরকার হবে না। কৌতুহল দমন করতে না পেরে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের সঙ্গে তো সাধারণত জলের বোতল থাকে না ! মাসখানেক আগের ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলল, ঐ ঘটনার পর থেকে আমরা পালা করে বাড়ি থেকে জল নিয়ে আসি। আমি সত্যিই মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারিনি। 

বর্ষা পড়ে যাওয়ায় লেকে যাওয়া বন্ধ করেছিলাম, কারণ বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে যেতে হয়। বর্ষা শেষ হতে আবার যাওয়া শুরু করলাম। পুরোনদের সঙ্গে আবার দেখ হ'ল।  কিন্ত ওই ছেলেমেয়ে দুটোকে আর দেখা যাচ্ছিল না। বন্ধুদের ওদের কথা জিজ্ঞেস করাতে ওরা বলল, "বেশ কিছুদিন ছেলেটাকে একলা দেখার পর আর তাদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। লোকমুখে শোনা তারা নাকি দুজনেই ট্রেনে কাটা পড়েছিল।" মনটা খুবই ভারাক্রান্ত হয়ে গেছিল। যেদিন শুনলাম, সেদিনও ছিল আজকের মতো ঝিরঝিরে বৃষ্টির দিন।

আজ ঘুম থেকে উঠে মনে হ'ল একটা প্রেমের কবিতা লিখি। ৬/৭ বছর আগের ওই দিনের নায়ক-নায়িকাদের কথা মনে পড়ে গেল। এই ছোট্ট কবিতা তাই তাদের উৎসর্গ করে লিখছি।


তারা দু'টি মন, স্পর্শ করেছিল খ্যাতির শিখরে,

পেয়েছিল মানুষের অকৃত্রিম, অকৃপণ ভালবাসা,

জীবনেও এসেছিল অদম্য প্রেম  

কিন্ত কোথাও হয়তো ছিল অপার শূন্যতা।

অবসাদে যেদিন দগ্ধ হ'ল দেহমন,

মুক্তি পেতে বেছে নিল বেহিসেবি জীবন।

একদিন যে জীবন রাঙিয়েছিল রামধনুতে

ফিকে হয়ে একদিন ঠেলে দিল মৃত্যুর পথে।


Thursday, August 4, 2022

আবদুল কালাম


     এ পি জে আব্দুল কালাম 

তিনি কে ? 

ভারতবর্ষের ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা ও তাঁর নাম বহুদিন আগেই সমার্থক হয়ে গেছে। তিনি হলেন ভারতবর্ষের "মিসাইল মেসায়া"। আবুল পাকির জয়নালাবদীন  আব্দুল কালাম। ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ছোট্ট টীকা লিখে তুলে ধরব কালাম সাহেবের কর্মব্যস্ত জীবনের বিক্ষিপ্ত কয়েক ঝলক।

ক্ষেপণাস্ত্রের সুবিধেটা হ'ল এই যে, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো জওয়ানকে পাঠানোর দরকার নেই। গোটাকতক বোতাম টিপে অব্যর্থভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানা যাবে। এক মহাদেশ পার হয়ে আছড়ে পড়বে আরেক মহাদেশে। প্রথাগত বিস্ফোরক বা পরমাণু অস্ত্র - দু'ধরনের ওয়ারহেডস্ মজুত রাখা সম্ভব মিসাইলে। টেলিভিশনের দৌলতে আমরা অনেকেই দেখেছি পারস্য উপসাগর থেকে মিসাইলে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র কী ভাবে আছড়ে পড়েছিল অব্যর্থ লক্ষ্য, বাগদাদের তেল শোধনাগারে। কসোভার আকাশ আলোয় আলোকিত হয়ে গিয়েছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ছোটাছুটিতে। 

পিতা তিট্টাকুম্ভীর জয়নালাবদীন, পেশায় ছিলেন জেলে। ধনুষ্কোটি রামেশ্বরমের ঘাটে থাকতো তাঁর নৌকো। সেই নৌকো নিয়ে মাঝে মাঝে চলে যেতেন দূর দরিয়ায় মাছ ধরতে। মাঝে মাঝে বাবার পিছনে পিছনে জয়নালাবদীনও যেত আর তাকিয়ে থাকতো আকাশ আর সমুদ্র মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া দিগন্তে। সেখানে ছোট ছোট বিন্দুর মতো ভেসে থাকা পাখির দল স্বচ্ছন্দ উড়ে বেড়াতো। আর একদৃষ্টে তাকিয়ে ছোট্ট কালাম স্বপ্ন দেখত,  সে-ও একদিন ওই পাখির মতো উড়ে বেড়াবে আকাশে।

আক্ষরিক অর্থে মাদ্রাজের (এখন চেন্নাই) এম আই টি থেকে পাশ করা তিনি একজন অ্যারনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নামী-দামী পুরস্কারও কখনো পাননি স্কুল-কলেজে। অথচ পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের মুকুট তাঁর মাথার উপরে শোভা পাচ্ছে। এ পি জে আব্দুল কালাম উপমহাদেশের এক অতি পরিচিত নাম । তাই বা কি করে বলি ? পৃথিবীর নানান দেশের কর্ণধাররাও তাঁর নাম সমীহের সঙ্গে স্মরণ করেন। 

এয়ার ফোর্সের পাইলট হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, এম আই টি থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। পোশাকি ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষার এখানেই ইতি। মনের ইচ্ছে উড়ে  উড়ে ঘুরে বেড়াবেন দিগদিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন নীল আকাশের বুকে। বাস্তব তাঁকে অন্য পথে চালিত করল। ভগবৎপ্রেমী কালাম বুঝতে পারলেন যে তাঁর জীবন-দেবতা তাঁকে জনারণ্যে হারিয়ে যেতে দেবেন না বলেই তাঁর স্বপ্নের এই পরিণতি হয়েছে। কিশোর কালামের পেশার জীবন শুরু হ'ল হিন্দুস্তান অ্যারনটিকস্ লিমিটেডের শিক্ষানবিশী হিসেবে। এরপর প্রতিরক্ষা দফতরের ডাইরেক্টরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিসমেন্টে  (ADE)। অদম্য উড়ে বেড়ানোর ইচ্ছা রূপান্তরিত হ'ল, সেই ওড়ার নেশাকে ঘিরেই। জন্ম হ'ল দেশী প্রযুক্তির ফসল "নন্দী হোভারক্রাফট্" সেই সময় মুম্বই-এর টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের (TIFR) তদানীন্তন অধিকর্তা, প্রফেসর এম জি কে মেনন ADE-তে এসেছিলেন । তাঁকে তাঁর সৃষ্ট হোভারক্রাফট্ যন্ত্রটির মধ্যে বসিয়ে মাটির উপর ভাসিয়ে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক কার্যকারীতা প্রদর্শন করেছিলেন কালাম। এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই ইন্ডিয়ান কমিশন ফর স্পেস রিসার্চ (INCOSPAR) থেকে রকেট ইঞ্জিনিয়ার পদের ইন্টারভিউ-এর ডাক পেলেন। এইটি ছিল তাঁর বৃহত্তম জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করার প্রথম সিংহদুয়ার। INCOSPAR-এ যোগদানের অব্যবহিত পরেই তাঁকে ছ'মাসের ট্রেনিং-এ পাঠানো হ'ল স্পেস টেকনোলজির পীঠস্থান, আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যারনটিকস্ অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NASA) গবেষনাগারে। ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হলেন ত্রিবান্দ্রামের থুম্বায়। বাকিটা ভারতবর্ষের স্পেস টেকনোলজির ইতিহাস। শুরু হ'ল একের পর এক রকেট ওড়ানোর পালা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছিল। এবং এই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে একের পর এক মিসাইল - পৃথ্বী, ত্রিসুল, আকাশ, নাগ, অগ্নি। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা অসীম্মা, সেই সমুদ্র সৈকতেই দু'দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে গিয়েছেন ছেলে। বিক্রম সারাভাই-এর স্বপ্নের স্পেস প্রোগ্রাম, পৃথিবীর স্পেস টেকনোলজির ইতিহাসে ভারতবর্ষকে পাকাপাকিভাবে স্থান করে দিয়েছে মূলত তাঁরই হাত ধরে। শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারতবর্ষ বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আজ দেশ স্বাধীনতার ঊনসত্তর বছর কেটে গেলেও, সাদা চামড়া মানুষদের সিলমোহর না পাওয়া পর্যন্ত যেখানে সাফল্য স্বীকৃতি পায় না, আব্দুল কালাম সেখানে অবশ্যই একজন নজিরবিহীন সাফল্যের প্রতীক। দেশজ প্রযুক্তির ফসলেই একটা দেশের আর্থিক অগ্রগতি হয়,স্বায়ত্ব সভ্যতার অগ্রগতি হয়। এই সরল বিশ্বাসে আব্দুল কালাম দেশজ প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে শাণিত করেছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন স্পেস প্রোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশাল কর্মযজ্ঞে। এমন আত্মসম্মানী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয়দের নজির বড় একটা চোখে পড়ে না।

জীবনের শুরুতেই NASA-র প্রযুক্তি-গবেষণাগারে ট্রেনিংই ছিল কালামের চাকরি জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা এবং শেষও বটে। Dr. Kalam was born, raised and educated in India throughout and his career as a rocket scientist therefore becomes more significant, as he was the product of the education he had received in his country debunking widely canvassed notion that to be successful one needs to be in global institutions.

 ওই মাপের একজন ইঞ্জিনিয়ার আমেরিকাতে ঘাঁটি গেড়ে বসে পড়েননি, যেটা তিনি অনায়াসেই করতে পারতেন। ওর সম্বন্ধে এত কথা পড়েছি এবং জেনেছি যে ওঁর একটা আলেখ্যই মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে গেছে। তাঁর সারাজীবনের চাল-চলনের খতিয়ান বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে যে, জীবন শুরুর গোড়াতেই তিনি বুঝে গেছিলেন যে মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতাবোধ অর্থাৎ একান্ত নিজস্বতাবোধ গুলোকে কেড়ে নেবার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তার মুখে টাকা ছুঁড়ে দেওয়া, তাকে এমন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে দেওয়া, যা থেকে সে কোনোমতেই বেরিয়ে আসতে না পারে। এ সত্য পৃথিবীর সব প্রান্তের মালিকেরা খুব ভালই বোঝেন। আর মালিকদের অনুগতরাও খুব সহজেই ধরা দেয় সেই ফাঁদে। এই ব্যাপারগুলো তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। জীবনে কোনোরকম ফাঁদেই তিনি পা দেননি। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা মনে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা যাবতীয় সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ওই ফাঁদ পাতার কৌশলে। সারা পৃথিবীর সাধারণ যোগ্যতার অভিবাসীরা, অর্থাৎ immigrants (ব্যতিক্রমী অসাধারণের সংখ্যা, হিসেবে প্রায় নগন্য) ওই দেশটাতে ভিড় করেছে ওদের তৈরি করা পরিকল্পনার রূপায়ণে। মার্কিন মালিকরা বোঝেন  টাকার মতো আঠা আর কিছু নেই, সব ছ্যাঁদাই মেরামত হয়ে যায়। ফিরে যাব মূল আলোচনায়।

ভারতীয় স্পেস টেকনোলজির জনক, বিক্রম সারাভাই ছাড়াও পেশার জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে সংস্পর্শে এসেছেন সতীশ ধাওয়ান, ব্রহ্মপ্রকাশের মতো গুণীজনের। কিন্ত কর্মজীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে যে মানুষটির নীরব ভূমিকা ছিল, তিনি হলেন তাঁর পিতা, জয়নালাবদীন। সাফল্য, ব্যর্থতা, বিষাদ - সব পরিস্থিতিতে তিনি অকপটে স্মরণ করেছেন পিতাকে। আদর্শবাদের যে উত্তরাধিকার ছোটবেলায় এবং কৈশোরে তিনি পিতার কাছে পেয়েছিলেন, তার এতটুকু অমর্যাদা হতে দেননি। পিতার নির্দেশিত পথেই তিনি বরাবর অনুসরণ করেছেন, তা তাঁর মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। ....he adds, "I have throughout my life tried to emulate my father in my own world of science and technology. I have endeavored to understand the fundamental truths revealed to me by my father, and feel convinced that there exists a divine power that can lift one from confusion, misery, melancholy and failure and guide one to one's place".

কর্মক্ষেত্রে বিশেষত সরকারি কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারে লাল ফিতের গেরো ছাড়াও প্রধান প্রতিবন্ধক সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত। বিজ্ঞানীদের মধ্যে রেষারেষি নতুন কিছু নয়। কালামের ঘরানাই অন্য ধাঁচের। প্রতিরক্ষা দফতরের গবেষনাগার ডি আর ডি ও-র (DRDO) অধিকর্তা, কে সন্তরামের সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে কোনোদিন মন কষাকষি হয়েছে, এমন অপবাদ শত্রুতেও দিতে পারবেন না। অবশ্য যদি কেউ তাঁর শত্রু আদৌ থাকেন। কালাম সাহেবের কর্মকুশলতা, বিশেষত দক্ষ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের গুণ, দেশের নামজাদা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও জাতীয় গবেষণাগারের নবীন ও প্রবীন উজ্জ্বল তারকাদের চিন্তার ফসলকে একত্রিত করতে পেরেছে। নিট ফল -ভারতীয় স্পেস প্রোগ্রামের অভূতপূর্ব সাফল্য, স্পেস টেকনোলজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উল্লেখযোগ্য আরও একটি ঘটনার কথা মনে আসছে। ইসরোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক চুকিয়ে, হতাশা আর ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন কালাম হায়দ্রাবাদের ডি আর ডি এল গবেষণাগারের দায়ভার গ্রহণ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে এটি আরও একটি গবেষনাগার। পদমর্যাদার দৌলতে শহরতলির কাঞ্চনবাগে একটি সুবিশাল বাংলোয় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলো প্রত্যাখ্যান করে ল্যাবোরেটরির মেসে আটখানা ঘরের একটিতে তিনি শয্যা পাতলেন। ফৌজি কড়াকড়ির বদ্ধ বাতাস উধাও, বিজ্ঞানীমহলে চলে এল খোলামেলা কাজের পরিবেশ। পরের ঘটনাগুলো প্রায় রূপকথার মতো।   


Prithwi missile-II successfully test fired during night

সফল নেতৃত্বের প্রাথমিক সর্ত হওয়া উচিৎ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার ত্বরিত রূপায়ণ। দ্বিধাগ্রস্ততা বা দীর্ঘসূত্রীতার কোনও স্থান নেই সেখানে। এই সহজ তত্ত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন সহজ সরল মানুষটি। বাকপটুতায় অনভ্যস্থ কালাম, সব কর্মীদের সঙ্গে টেকনিক্যাল আলোচনায় শুধুমাত্র স্বচ্ছন্দবোধই করতেন না, সমস্যার গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতার বলে বাদ-প্রতিবাদের জট সহজে ছাড়াতে পারতেন। বই খাতা আর জ্ঞানের স্বচ্ছতাকে তিনি মনে করতেন আত্মরক্ষার অস্ত্র। আসলে ভাবনার দৌড়ে বরাবরই সময়ের থেকে এগিয়ে থেকেছেন তিনি। তিনি এটাও বুঝতেন যে বাকসর্বস্য চতুর মানুষ দৃষ্টি আকর্ষণী ভাষার ব্যবহারে কী ভাবে অসার বক্তৃতার ফাঁকগুলো ভরাট করে আসল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। সেইসব তথাকথিত স্মার্ট মানুষদের সঙ্গ তিনি নিজের চারিত্রিক সরলতা ও ধৈর্য্যকে হাতিয়ার করে সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে পারতেন। আমলাদের সঙ্গে মতান্তরে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল চাঁচাছোলা। স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল্, এস এল ভি প্রকল্পে কেনাকাটার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস, পায়ে পায়ে নিষেধের বেড়ি; প্রকল্পের কাজে বাধা সৃষ্টি করছিল। কালাম সাহেব নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি। ওপরওয়ালার সামনে নালিশ জানিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে মনেও হয়েছিল, সাময়িক হঠকারিতায় মেজাজ হারানো ঠিক হয়নি। সারারাত্রি জেগে কাটিয়েছেন। মনকে প্রবোধ দিয়েছেন এই বলে যে "বিচারের শক্তি যাদের আছে, তাদের মধ্যে মতের ঐক্যই অনিয়ম, মতের ঐক্য ব্যতিক্রম।" আসলে তাঁর চিন্তা-ভাবনায় ছিল অখন্ডনীয় যুক্তির স্বচ্ছতা। ঠিক সেই কারণেই তিনি আপসের পথ বেছে নেননি। উদ্যোগী নির্ভীক মানুষকে ঈশ্বর সাহায্য করেন। বলা বাহুল্য, এর পর থেকে এস এল ভি সংক্রান্ত কেনাকাটার ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল শেষ  কথা।


কুড়ি-বাইশ বছর বয়সে পেশার জীবন শুরু করে দৃষ্টি কেড়েছেন দেশের কর্ণধারদের। দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী ও আমলাদের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্ত কখনই তাঁদের সঙ্গে তিনি অনুচিতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি, সম্ভ্রম সূচক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা তাঁকে বিন্দুমাত্র আত্মঅহমিকাবোধে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। একের পর এক সাফল্য এসেছে এবং পরিণত বয়সেও সেই সাফল্যকে তিনি সমান উদ্যমে ধরে রেখেছেন। কারণ আত্মতুষ্টির মৌতাতে তিনি কখনও মসগুল হয়ে ওঠেননি অথবা সংবাদ মাধ্যমকে খাতির করে ডেকে ফলাও করে জাহিরও করেননি। সর্বদাই সংযত থেকেছেন। উচ্চতার শিখরে পৌঁছেও চাল-চলন কথাবার্তায় তাঁর কখনও কতৃত্বের সুর প্রকাশ পায়নি। সাফল্য ধরে রাখার এই ক্ষমতা তাঁকে ফারাক করে দিয়েছে আমার দেখা গড়পড়তা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নায়কদের সঙ্গে।

ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর প্রাণের অনেক কাছের মানুষ এবং সব সময়েই তাদের তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সময়টা ঠিক স্মরণে নেই। তবে সেই একবারই, দর্শকের আসন থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের একটি অনুষ্ঠান বিড়লা সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উনি এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসাবে। ছাত্রদের কৌতুহলী প্রশ্নবাণে তিনি মুগ্ধ। আবেগাপ্লুত কালাম নিরাপত্তার বেষ্টনী তোয়াক্কা না করে মঞ্চ পরিত্যাগ করে হাজির হলেন ছাত্রদের মাঝখানে। তাঁর প্রচারবিমুখ স্বভাব ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরাকে ম্লান করে দিয়েছিল। ছাত্রদের অন্য এক অনুষ্ঠানে কোনো একজন তাঁকে প্রশ্ন করে, "Define birthday"? ওঁর চটজলদি উত্তর, "The only day in your life when your mother smiled when you cried"-ভাবনার স্বচ্ছতা আর ধারালো উপস্থিত বুদ্ধির এক অভিনব মিশেল।

বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে, নিজের ভূত-ভবিষ্যতের কথা ভেবে মূল্যবোধ কথাটির অর্থ এক এক জনের কাছে এক এক রকম। অতীতের মূল্যবোধ প্রায় লুপ্তপ্রায়। আজীবন কর্মব্যস্ত কালাম সাহেবের মূল্যবোধে কখনও টান পড়েনি। কারণ, তা তিনি সযত্নে লালিত করে এসেছেন। ব্যস্ততার চরম মুহূর্তেও তিনি মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মূলবোধের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি, বরং সাদরে গ্রহণ করেছেন। ভাইয়ের বিবাহ, ভগ্নীপতির মৃত্যু, পিতার মৃত্যুর খবর তাঁর দেহ-মনকে ছুটিয়ে এনেছে রামেশ্বরমের গ্রাম্য পরিবেশে। আসলে এমনই একটি পরিবার থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন, যেখানে নিম্নবিত্ত রক্ষণশীলতার গ্রামীন পরিমন্ডল আজও রয়ে গেছে এবং তিনি সব সময়ই সেটাকে সমীহ করে এসেছেন। সাংস্কৃতিক বন্ধন আর পারিবারিক যোগাযোগের মধ্যেই উনি খুঁজে পেয়েছিলেন আত্মিক এবং বৌদ্ধিক উন্নতির মূলমন্ত্র। তিনি মনে করতেন যেসব গুরুস্থানীয় ব্যক্তির সস্নেহ ও সযত্ন শিক্ষা তাঁর অধীত জ্ঞানকে সমৃদ্ধি দান করেছে, তাঁরাই তাঁর জীবনে যা কিছু দৃষ্টির উৎস। আজীবন মনে রেখেছেন সেই সব গুরুস্থানীও মানুষদের। মাদুরাইতে কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন। সেখানে পৌঁছেই খুঁজে বার করেছেন তাঁর শিক্ষক আয়াদুরাই সলোমনকে। অশীতিপর বৃদ্ধ সলোমনকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির করেছেন মঞ্চের উপরে। প্রতিরক্ষা গবেষণাগারের কাজের পরিবেশের মধ্যে তিনি এমনই একটি বাতাবরন সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে কর্মদীপ্ত নবীনদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রবীনদের অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতাও বটে। আসলে মূল্যবোধকে তিনি মনে করতেন সমাজ ও জীবনচর্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি মনে করতেন মূল্যবোধ আর কিছুই নয়, শুধুমাত্র কতগুলো অগ্রাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। মূল্যবোধ ছিল তাঁর কাছে সহানুভূতি আশ্রিত, যেটা ক্রমশ গড়ে উঠেছিল আত্মীয়-স্বজন, গুরুস্থানীয় শিক্ষক এবং ভ্রাতা সহকর্মীদের আশ্রয় করে এবং অবধারিতভাবে চারিয়ে গেছে তাঁর ভাবনা ও মননের গভীর থেকে আরও গভীরে। ধর্মের গোঁড়ামি তাঁকে কখনও স্পর্শ করেনি। গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন ভাগবত গীতা। কোরান শরীফও। আমার মনে হয় তাঁর ধর্মবোধ এবং পারিবারিক ও বৃহত্তর সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর দেশাত্মবোধ। 

এই বিশাল দুনিয়ায় কতই না বিচিত্র আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে। মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য সম্পদ-সম্ভোগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। শিক্ষিত আধুনিক মানুষের প্রতি তাঁর আবেদন, অহেতুক ভোগবাদে বিরত থাকা। তাঁর মতে বস্তুবাদ আর সম্পদের প্রদর্শন কখনই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। যে কোনো অনুষ্ঠানের গতবাঁধা, নিয়মমাফিক উদ্বোধনী ভাষণের ক্ষেত্রবিশেষে নেতারাও তো বহুকাল যাবৎ এই কথা বলে আসছেন। তফাতটা ঠিক কোথায় ? আসল তফাত ব্যক্তিত্বের। তিনি অসার বামপন্থী চিন্তাধারা আর দক্ষিণপন্থী জীবনধারার ভন্ডামিতে আদৌ বিশ্বাস করেননি। এ প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একজন প্রতিভাশালী কলামনিস্টের উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম : ....."As an individual, he donated all his earnings to Providing Urban amenities to Rural Areas, a scheme that is designed to contain migration to urban areas. He donated his salary as President to charity. In a country where parliamentarians shamelessly enjoy all kinds of concessions, including that of Lok Sabha canteens, here was a man who almost had a disdain for wealth."সাময়িক লাভালাভের প্রশ্নে তিনি কখনও প্রভাবিত হননি। নীতিগতভাবে যেটা সঠিক মনে করেছেন, সেটা অবলম্বন করেই অগ্রসর হয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের মুকুট মাথায় নিয়েও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শে বিশ্বাসী অকৃতদার কালাম বহুকাল কাটিয়েছেন বারো ফুট বাই দশ ফুট একখানি ঘরে। সঙ্গী কিছু বই-কাগজ। দু'খানি ইডলি আর ঘোলের সরবৎ সহযোগে সেরেছেন প্রাতরাশ। প্রকৃত অর্থে তিনি ধনী মানুষ নন। আসলে তাঁর ধন-দৌলতের ভান্ডার রয়েছে মনে প্রাণে কর্মে আত্মায়। 

অবচেতনে তিনি একজন কবিও বটে। তামিল ভাষায় লেখা তাঁর কবিতা এবং সায়েন্স ফিকশন তামিল ভাষীদের অজানা নয়। কবিতা আসলে মানুষের মন ও তার পারিপার্শ্বিকের ছন্দবদ্ধতার যোগসূত্র ঘটায়। তাইতো সবার অলক্ষ্যে বারবারই সংবেদিত মনের শুদ্ধ অশ্রুবিন্দুর মতো কালাম সাহেবের হৃদয়ের নির্ঝর থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে কবিতা। ঊনিশশো ঊননব্বই সালের মে মাসে সম্পূর্ণ দেশী প্রযুক্তির ফসল অগ্নি উৎক্ষেপণের সাফল্যে আবেগঘন মুহূর্তে ডায়েরিতে লিখে ফেললেন :             

Do not look at Agni/ as an entity directed upward/ to deter ominous/ or exhibit your might;/ It is fire/ in the heart of an Indian/ Do not even give it/ the form of a missile/ As it clings to the/ burning pride of this nation / and thus is bright.

অনিশ্চয়তা আর আর্থিক উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে তাঁর শৈশব। যুদ্ধের সময় রামেশ্বরমে ট্রেন থামতো না। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া খবরের কাগজের বান্ডিল কুড়িয়ে হকারদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আট বছর বয়সের কালাম তার প্রথম পারিশ্রমিক উপার্জন করে।


একবেলা আধপেটা খেয়ে থাকা জেলে পরিবারের সন্তানের মাদ্রাজ এম আই টি তে ভর্তির হাজার টাকার ফি জুগিয়েছেন তারই সহোদর ভগিনী, সামান্য গয়না বিক্রী করে। রামেশ্বরমের পাঠশালা ঘুরে, রমানাথপুরের সোয়ার্জ স্কুল, ত্রিচির সেন্ট জোসেফ কলেজ, মাদ্রাজের এম আই টি - সঙ্কীর্ণ গন্ডী থেকে আস্তে আস্তে উঠে এসেছেন বৃহত থেকে বৃহত্তর জীবনে, প্রানচঞ্চল কর্মব্যস্ত মানুষটি। ঈশ্বরপ্রেমীক কালাম পিছনের দিকে তাকিয়ে তাঁর শৈশবের লড়াইয়ের কথা সমর্থন করে প্রান্তিক এবং পরিত্যক্ত জনের উদ্দেশ্যে লিখেছেন :

.....some poor child living in an obscure place, in an unprivileged social setting may find a little solace in the way my destiny has been shaped. It could perhaps liberate themselves from the bondage of their illusory backwardness and helplessness. Irrespective of where they are right now, they should be aware that God is with them and when He is with them , who can be against them ?"

এরই সারমর্ম করেছেন কাব্যে :

God has not promised/ skies always blue/ Flower-strewn pathways/ All our life through/ God has not promised/ sun without rain,/ joy without sorrow,/ peace without pain,/ But God has promised strength for the day,/ Rest for the labour/ Light for the way.

এস এল ভি নির্মাণের সময় উর্দ্ধতন সহকর্মী প্রায়ই তাড়া লাগাতেন। অধৈর্য উর্দ্ধতনের কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই শুনতে হ'ত, "কালাম তুমি যা চাও তাই পাবে, শুধুমাত্র সময় চেয়ো না।" হাসতে হাসতে কালাম উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইলিয়ট থেকে - Between the conception and the creation/ Between the emotion / And the response/ Falls the shadow/

ক্ষেত্রবিশেষে এমন উদ্ধৃতি তিনি অনেকবার করেছেন, কখনও নিজের সৃষ্টি থেকে, কখনও বা বিখ্যাত কবির সৃষ্টি থেকে ধার করে। পাঠক মনে করবেন না যেন আমি মোহগ্রস্থ হয়ে শ্রেষ্ঠ রকেট ইঞ্জিনিয়ার কালামের উপর শ্রেষ্ঠ কবির শিরোপা আরোপ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমার কাছে অজানা এবং প্রকৃত অর্থে অদেখা একজন মানুষ। তাঁকে নিয়ে লেখা বই-কাগজ পড়ে এবং পেশার সূত্রে তাঁর কাছে আসা দু'একজন গুণিজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তাঁর কবি সত্বার কথা জানতে পেরেছি। আমার ধারনা, কবিতার ব্যাপারটা তাঁর শুদ্ধ মনের আবেগ প্রকাশের একটা ভঙ্গিমা।

প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্যবোধও ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পরিবেশ সচেতনতা। রকেট উৎক্ষেপণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উড়িষ্যার বালেশ্বরের কাছে যে জায়গা সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল, সেখানে একটা বার্ড স্যাংচুয়ারি ছিল। সেটিকে বাঁচিয়েই তিনি  লঞ্চিং প্যাড নির্মাণের পরামর্শ দেন। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে পড়ছে। অগ্নি উৎক্ষেপণের আগের রাত্রে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, কে সি পন্থ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "অগ্নি উৎক্ষেপণের সাফল্য আমরা কী ভাবে উদযাপন করব ?" অকপট, আদর্শবাদী কালামের সহজ সরল উত্তর ছিল, "সহস্রাধিক বৃক্ষ রোপনের মধ্যে দিয়েই আমরা আনন্দোৎসব পালন করতে পারি।" আব্দুল কালাম আসলে দেশ, সমাজ, পরিবেশ - সব ব্যাপারেই আজীবন সজাগ ছিলেন। 

 

      Agni-V, long range (5000 km) ballistic missile

প্রকৃতির ভারসাম্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের যে বিশাল ভূমিকা আছে সে ব্যাপারে উনি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। দু'একটা ঘটনার উল্লেখ করছি। রাষ্ট্রপতি ভবনের ছ'বছর মেয়াদের মধ্যে সংযোজন হয়েছে একটি ভেষজ উদ্যান এবং একটি বায়োডাইভার্সিটি পার্ক। মোগল গার্ডেনের ফুল তাঁর কাছে যতটা প্রিয়, ততটাই প্রিয় পশু-পাখি। রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি হরিণ শাবকের পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। কালাম সাহেব নিজে টানা ন'মাস শাবকটিকে নিয়মিত ফিডিং বোতলে দুধ খাওয়াতেন। ভবন সীমানার মধ্যেই একটি পশু চিকিৎসার হাসপাতাল আছে। সেখানকার ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে পোষ্যদের খবর সংগ্রহ করতেন। পশু-পাখিদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে উনি এতটাই দায়বদ্ধ ছিলেন যে, মোগল গার্ডেনে একটি ময়ূরকে খোঁড়াতে দেখে খবর নিয়ে জানেন যে পাখিটির পায়ে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এবং সেজন্য একটি বিশেষ ট্রে-তে পাখিটিকে শোয়াতে হবে। হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকায়, তাঁরই নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে সেটি বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা হয়। দিল্লীর চিড়িয়াখানা সূত্রে খবর পান যে সার্কাস দলের একটি জলহস্তী চোখে ঝাপসা দেখছে। তৎপর আব্দুল কালাম পশুটির ছানি কাটানোর ব্যবস্থা করেন। এই রকমই রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি ঘোড়ার ছানি কাটানো হয় তাঁরই আমলে। এই না হলে আব্দুল কালাম!!

পদমর্যাদা নির্বিশেষে যে কোনও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা আন্তরিক ছিল, সেটা কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। মৃত্যুর দিন অর্থাৎ ২৭শে জুলাই, ২০১৫, কালাম সাহেবের শেষ ছ'বছরের ছায়াসঙ্গী এবং তিনটি বইয়ের সহলেখক, সৃজনপালের কথাগুলো তুলে ধরছি: "গুয়াহাটি বিমান বন্দর থেকে সড়ক পথে আই আই এম শিলং যাওয়ার পথে কালামের চোখে পড়ছিল তাঁর গাড়ির সামনে 'এসকর্ট' জিপসিতে মেসিনগান নিয়ে দাঁড়ানো এক জওয়ানদের দিকে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওয়ারলেসে খবর পাঠিয়ে ওঁকে বসতে বলতে। নিয়মের ফাঁদে তা করা যায়নি। শিলং পৌঁছেই ওই নিরাপত্তারক্ষীকে তিনি ডেকে পাঠাতে বললেন। লম্বা, সুঠাম চেহারার কনস্টেবল, এস এ লাপাং স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাবড়ে গেছিলেন। ওঁকে অবাক করে হাত সামনে এগিয়ে দিলেন স্যার। করমর্দনের পরে বললেন - আমার জন্য আপনাকে এতটা পথ দাঁড়িয়ে থাকতে হ'ল।  নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে। আমার সঙ্গে বসে চা খেয়ে যান। অবাক হয়ে যান জওয়ান। কিন্ত ভ্যাবাচাকা ভাবটা কাটিয়ে লাপাং উত্তর দেন, 'স্যার আপনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।'

আব্দুল কালামের ছাত্র এবং এক সহকর্মী দেবাশিস পালের অভিজ্ঞতার কথায় আসি : "অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায়, এস এল ভি উৎক্ষেপণের কাজে সবাই ব্যস্ত। লঞ্চিংয়ের দিন এগিয়ে আসছে, একদিন ডক্টর কালাম আমাকে বললেন,  'পল, টুমরো ইউ হ্যাভ টু গো কার-নিকোবর টু কনডাক্ট স্যাটেলাইট কমপ্যাটিবিলিটি টেস্ট।' মাথা নিচু করে কাচুমাচু হয়ে বললাম, 'রকেট লঞ্চিং ডেট ইজ নিয়ারিং, স্যার।' উনি শুধু বললেন, 'পল, আই শ্যাল সি দ্যাট ইউ আর ব্যাক বিফোর দ্য রকেট ইজ লঞ্চড্।' পরদিন বেরিয়ে পড়লাম কার-নিকোবারের পথে। সব কাজ করলাম। যেদিন ফিরব, দেখি, আমাকে নিতে আসা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের প্লেনটায় আমিই একমাত্র যাত্রী। পাইলট বললেন, 'মিস্টার পল, ক্যান ইউ সি, ইউ আর দ্য ওনলি প্যাসেঞ্জার, আ ভি আই পি।' বুঝলাম সবই হয়েছে ডক্টর কালামের নির্দেশে। অত ব্যস্ত একজন মানুষ, পদমর্যাদায় কনিষ্ঠ এক ইঞ্জিনিয়ারের আব্দার রেখে উৎক্ষেপণের ঠিক একদিন আগে আমাকে শ্রীহরিকোটায় ফিরিয়ে এনে ছিলেন। দেখা হতে বললেন, 'সো ইউ আর ব্যাক ইন টাইম, এনজয় দ্য থ্রিল নাউ'।"

মূল্যবোধের মাত্রা যে কোন্ পর্যায় পৌঁছতে পারে, এই ঘটনা তার সাক্ষী: একত্রিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন, এক সময়ের সহকর্মী ডঃ সুবীর চৌধুরী, কালাম সাহেবের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন: "সালটা  ২০০৩। ভরদুপুরবেলা। ডঃ কালাম সদ্য রাষ্ট্রপতির আসন অলঙ্কৃত করেছেন। হায়দ্রাবাদে এক মারাত্মক গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে আমি শয্যাশায়ী। হঠাৎই আমার কোয়ার্টারে বেল বাজল। দরজা খুলে আমার স্ত্রী দেখে যে সমস্ত কোয়ার্টারটা ঘিরে নিয়েছে ব্ল্যাক কম্যান্ডো। আর ওই দশাশই চেহারার মানুষগুলোর ফাঁক দিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন ছোটখাট চেহারার একটি মানুষ। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান, এ পি জে আব্দুল কালাম। এরপর কম্যান্ডোদের বললেন, 'পার্সোনাল ব্যাপারে আলোচনা হবে, তোমরা বাইরে থাক।' বলাই বাহুল্য যে উনি আমার ভয়ঙ্কর অ্যাকসিডেন্টের কথা জেনে এতটাই বিচলিত বোধ করেছেন যে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন আমাকে দেখতে" ভাবা যায় !!

দেশের নিরাপত্তার ব্যাপারে একই মানুষের অবস্থান একেবারে বিপরীত মেরুতে। তখনও উনি রাষ্ট্রপতি হননি। সংসদে নিউক্লিয়ার বিতর্কের সপ্তাহখানেক আগে ভূতপূর্ব সাংসদ শ্রীমতি কৃষ্ণা বসু, কোন্ পক্ষ নেওয়া উচিৎ বা কি বলা উচিত প্রশ্ন করে কালাম সাহেবের পরামর্শ চান। ওঁর খুব সহজ উত্তর ছিল, "আপনার যা মত তাই বলবেন, শুধু মাথায় রাখবেন, যে শক্তিশালী সকলে তাকে সমীহ করে, দুর্বলতা কেউ পাত্তা দেয় না" এরও কয়েক বছর আগে রাজস্থানের পোখরাণে, দ্বিতীয়বার পরমাণু পরীক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এক রিপোর্টারের প্রশ্নে শান্তিপূর্ণ কালাম যে জবাব দিয়েছিলেন, সেটা অবিকৃত তুলে ধরছি : "Abdul Kalam, a peace loving man, when led the team involved in India's second phase of nuclear explosion in 1998, was asked why he involved himself in the weapons of war. He answered cooly, 'I had no qualms in building such arsenal, I actually ensure peace of my country'."

প্রত্যেক মানুষের কথা বলার একটা ভঙ্গি আছে, কিছু মুদ্রাদোষ আছে, সময় যেটা কেড়ে নিতে পারে না। কালাম সাহেবের এমন একটি অভ্যাস ছিল। আবেগে অথবা মৃদু উত্তেজনার মুহূর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় উনি " funny guy", এই ছোট্ট বাক্যবন্ধটি প্রায়ই ব্যবহার করতেন।

ভারতবর্ষের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কর্ণধারদের অনেকের ভাষণে, ভাষার অলঙ্কারে সজ্জিত বহু প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ পাওয়া যায়। বাস্তবে সেটা কতটা রূপায়িত হয়,তার হিসেব করা খুবই কঠিন। কালাম সাহেবের বহিরঙ্গে বা ব্যবহারে চকচকে পালিশ ছিল না। তবে বাস্তব জগতের কথা মাথায় রেখে তিনি তাঁর জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছিলেন। কিছু অনুশাসন কেন্দ্র করে এবং স্বল্পায়তনে সেগুলো প্রকাশ করতেন ছাত্র এবং ছাত্রসম সহকর্মীদের কাছে। এর মধ্যে কিছু কিছু উক্তিতে দার্শনিক কালামকেও খুঁজে পাওয়া যায়। এমনই এক ডজন উক্তির দৃষ্টান্ত পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।

১) প্রথমবারের সাফল্যের পরও থেমে থেকো না কারণ, দ্বিতীয়বার তুমি ব্যর্থ হতেই পার। তখন কিন্ত সবাই অপেক্ষায় থাকবে। বলবে, যে প্রথমবারের জয় ছিল স্রেফ ভাগ্য।

২) বৃষ্টির সময় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে প্রতিটি পাখি। কিন্ত ঈগল বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পাড়ি দেয় মেঘের উপর।

৩) সাফল্যের সংজ্ঞা আমার কাছে যত বেশি দৃঢ় হবে, ব্যর্থতাকে ততই আমি পেছনে ফেলে যাব।

৪) সাফল্যের আনন্দ পেতেই মানুষের জীবনে কঠিন সময়ের প্রয়োজন। 

৫) যদি তুমি সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে চাও, তাহলে নিজেকে আগে সূর্যের মতো দগ্ধ কর।

৬) কাউকে পরাজিত করা অত্যন্ত সহজ, কিন্ত কঠিন হ'ল কাউকে জিতে নেওয়া।

৭) আমাদের সবার সমান প্রতিভা না থাকতে পারে। তবে প্রতিভার বিকাশ করার সমান সুযোগ আমাদের সকলের আছে।

৮) কাজকে ভালবাসো, সংস্থাকে নয়। কারণ, তুমি জানো না তোমার সংস্থা কবে তোমার প্রতি ভালবাসা বন্ধ করে দেবে।

৯) কৃত্রিম আনন্দের পিছনে দৌড়ানোর চেয়ে প্রকৃত সাফল্য পাওয়ার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা ভাল। 

১০) চিন্তাশক্তি সেরা সম্পদ। জীবনের সেইসব উত্থান-পতনকে পাত্তা দিও না, যা তুমি পেরিয়ে এসেছ।

১১) লেগে থাকা ছাড়া তোমার সাফল্য আসবে না। আর লেগে থাকলে ব্যর্থতার তোমাকে স্পর্শ করবে না।

১২) ঘুমিয়ে যেটা দেখ সেটা স্বপ্ন নয়। যেটা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না সেটাই স্বপ্ন। 

মৃত্যুর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ভিতরের মানুষটা আমজনতাকে যে কতখানি ছুঁয়ে গেছিল, সেটা প্রত্যক্ষ করলাম টেলিভিশনের পর্দায় যখন তাঁর মৃতদেহ দিল্লিতে এসে পৌঁছোলো। শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় অনেক রঙই মিশে গেছিল সেই আবেগভরা জমায়েতে। মনে রাখতে হবে যে পর পর দু'বছর এম টিভির সমীক্ষায় ইউথ আইকন নির্বাচিত হয়েছিলেন এই প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক। দিল্লিতে সেদিনের আবালবৃদ্ধবণিতার আবেগ উন্মাদনার জোয়ারে সেই ইতিহাস যেন প্রাসঙ্গিকতা পেল।প্রবীন রাজনীতিকরা বলেছেন যে মানুষের এই ঢল, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি, বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিনও মৃত্যুর পর জীবন নিয়ে এমন উদযাপন হয়েছিল।

বিখ্যাত ছাত্র, বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বিখ্যাত শিল্পপতি কোনও কিছুরই দাবিদার নন আবুল পাকির জয়নালাবদীন আব্দুল কালাম। বাপ-ঠাকুরদার নাম জড়িয়ে এত বড়ই তাঁর নাম। নামের বিশালত্বের সঙ্গে তাঁর কর্মযজ্ঞের বিশালত্বের বিশাল মিল। আসলে তাঁর খ্যাতি প্রতিকী। কিসের প্রতীক ? তপোশ্চর্যার প্রতীক, নৈতিকতার প্রতীক, মূল্যবোধের প্রতীক, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করার প্রতীক, কর্মকুশলতার প্রতীক, স্বায়ত্ব প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রতীক, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, সত্বার প্রতীক এবং অবশ্যই সফল নেতৃত্বের প্রতীক। 

শেষ করার আগে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। ঊনিশশো আটানব্বই সালের মে মাস। কেন্দ্রে বি জে পি সরকারের নেতৃত্বে অটল বিহারী বাজপেয়ী। ওই মাসের বারো তারিখে রাজস্থানে পোখরানের মরুভূমিতে একের পর এক পাঁচটি পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পরীক্ষা চালানো হয়। বিস্ফোরণ স্থলে ভাবা পরমাণু কেন্দ্রের পরমাণু গোষ্ঠীর সঙ্গে কালাম সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। এর পর থেকেই ওঁর নামের সঙ্গে পরমাণু বিজ্ঞানীর তকমা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে উনিও কখনও মুখ খোলেননি। পেশাগত জীবনে পরমাণু সংক্রান্ত বিষয় ওঁর গবেষণার অঙ্গ ছিল বলে আমার অন্তত জানা নেই। এটুকুই জানি যে বাজপেয়ী সরকারের অনুরোধে, পোখরান কর্মকান্ডে পরমাণু বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারের ওই দলটিকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থে আব্দুল কালাম একজন অত্যন্ত সফল টেকনোক্র্যাট এবং ভারতবর্ষের গর্ব।


তথ্যসূত্র:

১) Wings of fire - An autobiography,  APJ Abdul Kalam with Arun Tiwari

২) Weapons of peace - Raj Chengappa

৩) গত পনের বছরের প্রকাশিত প্রতিষ্ঠিত বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনের নির্বাচিত অংশ।