Thursday, August 4, 2022

আবদুল কালাম


     এ পি জে আব্দুল কালাম 

তিনি কে ? 

ভারতবর্ষের ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা ও তাঁর নাম বহুদিন আগেই সমার্থক হয়ে গেছে। তিনি হলেন ভারতবর্ষের "মিসাইল মেসায়া"। আবুল পাকির জয়নালাবদীন  আব্দুল কালাম। ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ছোট্ট টীকা লিখে তুলে ধরব কালাম সাহেবের কর্মব্যস্ত জীবনের বিক্ষিপ্ত কয়েক ঝলক।

ক্ষেপণাস্ত্রের সুবিধেটা হ'ল এই যে, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো জওয়ানকে পাঠানোর দরকার নেই। গোটাকতক বোতাম টিপে অব্যর্থভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানা যাবে। এক মহাদেশ পার হয়ে আছড়ে পড়বে আরেক মহাদেশে। প্রথাগত বিস্ফোরক বা পরমাণু অস্ত্র - দু'ধরনের ওয়ারহেডস্ মজুত রাখা সম্ভব মিসাইলে। টেলিভিশনের দৌলতে আমরা অনেকেই দেখেছি পারস্য উপসাগর থেকে মিসাইলে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র কী ভাবে আছড়ে পড়েছিল অব্যর্থ লক্ষ্য, বাগদাদের তেল শোধনাগারে। কসোভার আকাশ আলোয় আলোকিত হয়ে গিয়েছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ছোটাছুটিতে। 

পিতা তিট্টাকুম্ভীর জয়নালাবদীন, পেশায় ছিলেন জেলে। ধনুষ্কোটি রামেশ্বরমের ঘাটে থাকতো তাঁর নৌকো। সেই নৌকো নিয়ে মাঝে মাঝে চলে যেতেন দূর দরিয়ায় মাছ ধরতে। মাঝে মাঝে বাবার পিছনে পিছনে জয়নালাবদীনও যেত আর তাকিয়ে থাকতো আকাশ আর সমুদ্র মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া দিগন্তে। সেখানে ছোট ছোট বিন্দুর মতো ভেসে থাকা পাখির দল স্বচ্ছন্দ উড়ে বেড়াতো। আর একদৃষ্টে তাকিয়ে ছোট্ট কালাম স্বপ্ন দেখত,  সে-ও একদিন ওই পাখির মতো উড়ে বেড়াবে আকাশে।

আক্ষরিক অর্থে মাদ্রাজের (এখন চেন্নাই) এম আই টি থেকে পাশ করা তিনি একজন অ্যারনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নামী-দামী পুরস্কারও কখনো পাননি স্কুল-কলেজে। অথচ পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের মুকুট তাঁর মাথার উপরে শোভা পাচ্ছে। এ পি জে আব্দুল কালাম উপমহাদেশের এক অতি পরিচিত নাম । তাই বা কি করে বলি ? পৃথিবীর নানান দেশের কর্ণধাররাও তাঁর নাম সমীহের সঙ্গে স্মরণ করেন। 

এয়ার ফোর্সের পাইলট হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, এম আই টি থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। পোশাকি ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষার এখানেই ইতি। মনের ইচ্ছে উড়ে  উড়ে ঘুরে বেড়াবেন দিগদিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন নীল আকাশের বুকে। বাস্তব তাঁকে অন্য পথে চালিত করল। ভগবৎপ্রেমী কালাম বুঝতে পারলেন যে তাঁর জীবন-দেবতা তাঁকে জনারণ্যে হারিয়ে যেতে দেবেন না বলেই তাঁর স্বপ্নের এই পরিণতি হয়েছে। কিশোর কালামের পেশার জীবন শুরু হ'ল হিন্দুস্তান অ্যারনটিকস্ লিমিটেডের শিক্ষানবিশী হিসেবে। এরপর প্রতিরক্ষা দফতরের ডাইরেক্টরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিসমেন্টে  (ADE)। অদম্য উড়ে বেড়ানোর ইচ্ছা রূপান্তরিত হ'ল, সেই ওড়ার নেশাকে ঘিরেই। জন্ম হ'ল দেশী প্রযুক্তির ফসল "নন্দী হোভারক্রাফট্" সেই সময় মুম্বই-এর টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের (TIFR) তদানীন্তন অধিকর্তা, প্রফেসর এম জি কে মেনন ADE-তে এসেছিলেন । তাঁকে তাঁর সৃষ্ট হোভারক্রাফট্ যন্ত্রটির মধ্যে বসিয়ে মাটির উপর ভাসিয়ে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক কার্যকারীতা প্রদর্শন করেছিলেন কালাম। এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই ইন্ডিয়ান কমিশন ফর স্পেস রিসার্চ (INCOSPAR) থেকে রকেট ইঞ্জিনিয়ার পদের ইন্টারভিউ-এর ডাক পেলেন। এইটি ছিল তাঁর বৃহত্তম জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করার প্রথম সিংহদুয়ার। INCOSPAR-এ যোগদানের অব্যবহিত পরেই তাঁকে ছ'মাসের ট্রেনিং-এ পাঠানো হ'ল স্পেস টেকনোলজির পীঠস্থান, আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যারনটিকস্ অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NASA) গবেষনাগারে। ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হলেন ত্রিবান্দ্রামের থুম্বায়। বাকিটা ভারতবর্ষের স্পেস টেকনোলজির ইতিহাস। শুরু হ'ল একের পর এক রকেট ওড়ানোর পালা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছিল। এবং এই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে একের পর এক মিসাইল - পৃথ্বী, ত্রিসুল, আকাশ, নাগ, অগ্নি। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা অসীম্মা, সেই সমুদ্র সৈকতেই দু'দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে গিয়েছেন ছেলে। বিক্রম সারাভাই-এর স্বপ্নের স্পেস প্রোগ্রাম, পৃথিবীর স্পেস টেকনোলজির ইতিহাসে ভারতবর্ষকে পাকাপাকিভাবে স্থান করে দিয়েছে মূলত তাঁরই হাত ধরে। শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারতবর্ষ বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আজ দেশ স্বাধীনতার ঊনসত্তর বছর কেটে গেলেও, সাদা চামড়া মানুষদের সিলমোহর না পাওয়া পর্যন্ত যেখানে সাফল্য স্বীকৃতি পায় না, আব্দুল কালাম সেখানে অবশ্যই একজন নজিরবিহীন সাফল্যের প্রতীক। দেশজ প্রযুক্তির ফসলেই একটা দেশের আর্থিক অগ্রগতি হয়,স্বায়ত্ব সভ্যতার অগ্রগতি হয়। এই সরল বিশ্বাসে আব্দুল কালাম দেশজ প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে শাণিত করেছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন স্পেস প্রোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশাল কর্মযজ্ঞে। এমন আত্মসম্মানী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয়দের নজির বড় একটা চোখে পড়ে না।

জীবনের শুরুতেই NASA-র প্রযুক্তি-গবেষণাগারে ট্রেনিংই ছিল কালামের চাকরি জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা এবং শেষও বটে। Dr. Kalam was born, raised and educated in India throughout and his career as a rocket scientist therefore becomes more significant, as he was the product of the education he had received in his country debunking widely canvassed notion that to be successful one needs to be in global institutions.

 ওই মাপের একজন ইঞ্জিনিয়ার আমেরিকাতে ঘাঁটি গেড়ে বসে পড়েননি, যেটা তিনি অনায়াসেই করতে পারতেন। ওর সম্বন্ধে এত কথা পড়েছি এবং জেনেছি যে ওঁর একটা আলেখ্যই মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে গেছে। তাঁর সারাজীবনের চাল-চলনের খতিয়ান বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে যে, জীবন শুরুর গোড়াতেই তিনি বুঝে গেছিলেন যে মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতাবোধ অর্থাৎ একান্ত নিজস্বতাবোধ গুলোকে কেড়ে নেবার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তার মুখে টাকা ছুঁড়ে দেওয়া, তাকে এমন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে দেওয়া, যা থেকে সে কোনোমতেই বেরিয়ে আসতে না পারে। এ সত্য পৃথিবীর সব প্রান্তের মালিকেরা খুব ভালই বোঝেন। আর মালিকদের অনুগতরাও খুব সহজেই ধরা দেয় সেই ফাঁদে। এই ব্যাপারগুলো তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। জীবনে কোনোরকম ফাঁদেই তিনি পা দেননি। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা মনে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা যাবতীয় সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ওই ফাঁদ পাতার কৌশলে। সারা পৃথিবীর সাধারণ যোগ্যতার অভিবাসীরা, অর্থাৎ immigrants (ব্যতিক্রমী অসাধারণের সংখ্যা, হিসেবে প্রায় নগন্য) ওই দেশটাতে ভিড় করেছে ওদের তৈরি করা পরিকল্পনার রূপায়ণে। মার্কিন মালিকরা বোঝেন  টাকার মতো আঠা আর কিছু নেই, সব ছ্যাঁদাই মেরামত হয়ে যায়। ফিরে যাব মূল আলোচনায়।

ভারতীয় স্পেস টেকনোলজির জনক, বিক্রম সারাভাই ছাড়াও পেশার জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে সংস্পর্শে এসেছেন সতীশ ধাওয়ান, ব্রহ্মপ্রকাশের মতো গুণীজনের। কিন্ত কর্মজীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে যে মানুষটির নীরব ভূমিকা ছিল, তিনি হলেন তাঁর পিতা, জয়নালাবদীন। সাফল্য, ব্যর্থতা, বিষাদ - সব পরিস্থিতিতে তিনি অকপটে স্মরণ করেছেন পিতাকে। আদর্শবাদের যে উত্তরাধিকার ছোটবেলায় এবং কৈশোরে তিনি পিতার কাছে পেয়েছিলেন, তার এতটুকু অমর্যাদা হতে দেননি। পিতার নির্দেশিত পথেই তিনি বরাবর অনুসরণ করেছেন, তা তাঁর মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। ....he adds, "I have throughout my life tried to emulate my father in my own world of science and technology. I have endeavored to understand the fundamental truths revealed to me by my father, and feel convinced that there exists a divine power that can lift one from confusion, misery, melancholy and failure and guide one to one's place".

কর্মক্ষেত্রে বিশেষত সরকারি কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারে লাল ফিতের গেরো ছাড়াও প্রধান প্রতিবন্ধক সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত। বিজ্ঞানীদের মধ্যে রেষারেষি নতুন কিছু নয়। কালামের ঘরানাই অন্য ধাঁচের। প্রতিরক্ষা দফতরের গবেষনাগার ডি আর ডি ও-র (DRDO) অধিকর্তা, কে সন্তরামের সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে কোনোদিন মন কষাকষি হয়েছে, এমন অপবাদ শত্রুতেও দিতে পারবেন না। অবশ্য যদি কেউ তাঁর শত্রু আদৌ থাকেন। কালাম সাহেবের কর্মকুশলতা, বিশেষত দক্ষ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের গুণ, দেশের নামজাদা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও জাতীয় গবেষণাগারের নবীন ও প্রবীন উজ্জ্বল তারকাদের চিন্তার ফসলকে একত্রিত করতে পেরেছে। নিট ফল -ভারতীয় স্পেস প্রোগ্রামের অভূতপূর্ব সাফল্য, স্পেস টেকনোলজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উল্লেখযোগ্য আরও একটি ঘটনার কথা মনে আসছে। ইসরোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক চুকিয়ে, হতাশা আর ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন কালাম হায়দ্রাবাদের ডি আর ডি এল গবেষণাগারের দায়ভার গ্রহণ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে এটি আরও একটি গবেষনাগার। পদমর্যাদার দৌলতে শহরতলির কাঞ্চনবাগে একটি সুবিশাল বাংলোয় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলো প্রত্যাখ্যান করে ল্যাবোরেটরির মেসে আটখানা ঘরের একটিতে তিনি শয্যা পাতলেন। ফৌজি কড়াকড়ির বদ্ধ বাতাস উধাও, বিজ্ঞানীমহলে চলে এল খোলামেলা কাজের পরিবেশ। পরের ঘটনাগুলো প্রায় রূপকথার মতো।   


Prithwi missile-II successfully test fired during night

সফল নেতৃত্বের প্রাথমিক সর্ত হওয়া উচিৎ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার ত্বরিত রূপায়ণ। দ্বিধাগ্রস্ততা বা দীর্ঘসূত্রীতার কোনও স্থান নেই সেখানে। এই সহজ তত্ত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন সহজ সরল মানুষটি। বাকপটুতায় অনভ্যস্থ কালাম, সব কর্মীদের সঙ্গে টেকনিক্যাল আলোচনায় শুধুমাত্র স্বচ্ছন্দবোধই করতেন না, সমস্যার গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতার বলে বাদ-প্রতিবাদের জট সহজে ছাড়াতে পারতেন। বই খাতা আর জ্ঞানের স্বচ্ছতাকে তিনি মনে করতেন আত্মরক্ষার অস্ত্র। আসলে ভাবনার দৌড়ে বরাবরই সময়ের থেকে এগিয়ে থেকেছেন তিনি। তিনি এটাও বুঝতেন যে বাকসর্বস্য চতুর মানুষ দৃষ্টি আকর্ষণী ভাষার ব্যবহারে কী ভাবে অসার বক্তৃতার ফাঁকগুলো ভরাট করে আসল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। সেইসব তথাকথিত স্মার্ট মানুষদের সঙ্গ তিনি নিজের চারিত্রিক সরলতা ও ধৈর্য্যকে হাতিয়ার করে সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে পারতেন। আমলাদের সঙ্গে মতান্তরে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল চাঁচাছোলা। স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল্, এস এল ভি প্রকল্পে কেনাকাটার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস, পায়ে পায়ে নিষেধের বেড়ি; প্রকল্পের কাজে বাধা সৃষ্টি করছিল। কালাম সাহেব নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি। ওপরওয়ালার সামনে নালিশ জানিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে মনেও হয়েছিল, সাময়িক হঠকারিতায় মেজাজ হারানো ঠিক হয়নি। সারারাত্রি জেগে কাটিয়েছেন। মনকে প্রবোধ দিয়েছেন এই বলে যে "বিচারের শক্তি যাদের আছে, তাদের মধ্যে মতের ঐক্যই অনিয়ম, মতের ঐক্য ব্যতিক্রম।" আসলে তাঁর চিন্তা-ভাবনায় ছিল অখন্ডনীয় যুক্তির স্বচ্ছতা। ঠিক সেই কারণেই তিনি আপসের পথ বেছে নেননি। উদ্যোগী নির্ভীক মানুষকে ঈশ্বর সাহায্য করেন। বলা বাহুল্য, এর পর থেকে এস এল ভি সংক্রান্ত কেনাকাটার ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল শেষ  কথা।


কুড়ি-বাইশ বছর বয়সে পেশার জীবন শুরু করে দৃষ্টি কেড়েছেন দেশের কর্ণধারদের। দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী ও আমলাদের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্ত কখনই তাঁদের সঙ্গে তিনি অনুচিতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি, সম্ভ্রম সূচক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা তাঁকে বিন্দুমাত্র আত্মঅহমিকাবোধে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। একের পর এক সাফল্য এসেছে এবং পরিণত বয়সেও সেই সাফল্যকে তিনি সমান উদ্যমে ধরে রেখেছেন। কারণ আত্মতুষ্টির মৌতাতে তিনি কখনও মসগুল হয়ে ওঠেননি অথবা সংবাদ মাধ্যমকে খাতির করে ডেকে ফলাও করে জাহিরও করেননি। সর্বদাই সংযত থেকেছেন। উচ্চতার শিখরে পৌঁছেও চাল-চলন কথাবার্তায় তাঁর কখনও কতৃত্বের সুর প্রকাশ পায়নি। সাফল্য ধরে রাখার এই ক্ষমতা তাঁকে ফারাক করে দিয়েছে আমার দেখা গড়পড়তা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নায়কদের সঙ্গে।

ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর প্রাণের অনেক কাছের মানুষ এবং সব সময়েই তাদের তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সময়টা ঠিক স্মরণে নেই। তবে সেই একবারই, দর্শকের আসন থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের একটি অনুষ্ঠান বিড়লা সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উনি এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসাবে। ছাত্রদের কৌতুহলী প্রশ্নবাণে তিনি মুগ্ধ। আবেগাপ্লুত কালাম নিরাপত্তার বেষ্টনী তোয়াক্কা না করে মঞ্চ পরিত্যাগ করে হাজির হলেন ছাত্রদের মাঝখানে। তাঁর প্রচারবিমুখ স্বভাব ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরাকে ম্লান করে দিয়েছিল। ছাত্রদের অন্য এক অনুষ্ঠানে কোনো একজন তাঁকে প্রশ্ন করে, "Define birthday"? ওঁর চটজলদি উত্তর, "The only day in your life when your mother smiled when you cried"-ভাবনার স্বচ্ছতা আর ধারালো উপস্থিত বুদ্ধির এক অভিনব মিশেল।

বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে, নিজের ভূত-ভবিষ্যতের কথা ভেবে মূল্যবোধ কথাটির অর্থ এক এক জনের কাছে এক এক রকম। অতীতের মূল্যবোধ প্রায় লুপ্তপ্রায়। আজীবন কর্মব্যস্ত কালাম সাহেবের মূল্যবোধে কখনও টান পড়েনি। কারণ, তা তিনি সযত্নে লালিত করে এসেছেন। ব্যস্ততার চরম মুহূর্তেও তিনি মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মূলবোধের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি, বরং সাদরে গ্রহণ করেছেন। ভাইয়ের বিবাহ, ভগ্নীপতির মৃত্যু, পিতার মৃত্যুর খবর তাঁর দেহ-মনকে ছুটিয়ে এনেছে রামেশ্বরমের গ্রাম্য পরিবেশে। আসলে এমনই একটি পরিবার থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন, যেখানে নিম্নবিত্ত রক্ষণশীলতার গ্রামীন পরিমন্ডল আজও রয়ে গেছে এবং তিনি সব সময়ই সেটাকে সমীহ করে এসেছেন। সাংস্কৃতিক বন্ধন আর পারিবারিক যোগাযোগের মধ্যেই উনি খুঁজে পেয়েছিলেন আত্মিক এবং বৌদ্ধিক উন্নতির মূলমন্ত্র। তিনি মনে করতেন যেসব গুরুস্থানীয় ব্যক্তির সস্নেহ ও সযত্ন শিক্ষা তাঁর অধীত জ্ঞানকে সমৃদ্ধি দান করেছে, তাঁরাই তাঁর জীবনে যা কিছু দৃষ্টির উৎস। আজীবন মনে রেখেছেন সেই সব গুরুস্থানীও মানুষদের। মাদুরাইতে কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন। সেখানে পৌঁছেই খুঁজে বার করেছেন তাঁর শিক্ষক আয়াদুরাই সলোমনকে। অশীতিপর বৃদ্ধ সলোমনকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির করেছেন মঞ্চের উপরে। প্রতিরক্ষা গবেষণাগারের কাজের পরিবেশের মধ্যে তিনি এমনই একটি বাতাবরন সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে কর্মদীপ্ত নবীনদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রবীনদের অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতাও বটে। আসলে মূল্যবোধকে তিনি মনে করতেন সমাজ ও জীবনচর্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি মনে করতেন মূল্যবোধ আর কিছুই নয়, শুধুমাত্র কতগুলো অগ্রাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। মূল্যবোধ ছিল তাঁর কাছে সহানুভূতি আশ্রিত, যেটা ক্রমশ গড়ে উঠেছিল আত্মীয়-স্বজন, গুরুস্থানীয় শিক্ষক এবং ভ্রাতা সহকর্মীদের আশ্রয় করে এবং অবধারিতভাবে চারিয়ে গেছে তাঁর ভাবনা ও মননের গভীর থেকে আরও গভীরে। ধর্মের গোঁড়ামি তাঁকে কখনও স্পর্শ করেনি। গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন ভাগবত গীতা। কোরান শরীফও। আমার মনে হয় তাঁর ধর্মবোধ এবং পারিবারিক ও বৃহত্তর সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর দেশাত্মবোধ। 

এই বিশাল দুনিয়ায় কতই না বিচিত্র আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে। মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য সম্পদ-সম্ভোগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। শিক্ষিত আধুনিক মানুষের প্রতি তাঁর আবেদন, অহেতুক ভোগবাদে বিরত থাকা। তাঁর মতে বস্তুবাদ আর সম্পদের প্রদর্শন কখনই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। যে কোনো অনুষ্ঠানের গতবাঁধা, নিয়মমাফিক উদ্বোধনী ভাষণের ক্ষেত্রবিশেষে নেতারাও তো বহুকাল যাবৎ এই কথা বলে আসছেন। তফাতটা ঠিক কোথায় ? আসল তফাত ব্যক্তিত্বের। তিনি অসার বামপন্থী চিন্তাধারা আর দক্ষিণপন্থী জীবনধারার ভন্ডামিতে আদৌ বিশ্বাস করেননি। এ প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একজন প্রতিভাশালী কলামনিস্টের উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম : ....."As an individual, he donated all his earnings to Providing Urban amenities to Rural Areas, a scheme that is designed to contain migration to urban areas. He donated his salary as President to charity. In a country where parliamentarians shamelessly enjoy all kinds of concessions, including that of Lok Sabha canteens, here was a man who almost had a disdain for wealth."সাময়িক লাভালাভের প্রশ্নে তিনি কখনও প্রভাবিত হননি। নীতিগতভাবে যেটা সঠিক মনে করেছেন, সেটা অবলম্বন করেই অগ্রসর হয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের মুকুট মাথায় নিয়েও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শে বিশ্বাসী অকৃতদার কালাম বহুকাল কাটিয়েছেন বারো ফুট বাই দশ ফুট একখানি ঘরে। সঙ্গী কিছু বই-কাগজ। দু'খানি ইডলি আর ঘোলের সরবৎ সহযোগে সেরেছেন প্রাতরাশ। প্রকৃত অর্থে তিনি ধনী মানুষ নন। আসলে তাঁর ধন-দৌলতের ভান্ডার রয়েছে মনে প্রাণে কর্মে আত্মায়। 

অবচেতনে তিনি একজন কবিও বটে। তামিল ভাষায় লেখা তাঁর কবিতা এবং সায়েন্স ফিকশন তামিল ভাষীদের অজানা নয়। কবিতা আসলে মানুষের মন ও তার পারিপার্শ্বিকের ছন্দবদ্ধতার যোগসূত্র ঘটায়। তাইতো সবার অলক্ষ্যে বারবারই সংবেদিত মনের শুদ্ধ অশ্রুবিন্দুর মতো কালাম সাহেবের হৃদয়ের নির্ঝর থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে কবিতা। ঊনিশশো ঊননব্বই সালের মে মাসে সম্পূর্ণ দেশী প্রযুক্তির ফসল অগ্নি উৎক্ষেপণের সাফল্যে আবেগঘন মুহূর্তে ডায়েরিতে লিখে ফেললেন :             

Do not look at Agni/ as an entity directed upward/ to deter ominous/ or exhibit your might;/ It is fire/ in the heart of an Indian/ Do not even give it/ the form of a missile/ As it clings to the/ burning pride of this nation / and thus is bright.

অনিশ্চয়তা আর আর্থিক উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে তাঁর শৈশব। যুদ্ধের সময় রামেশ্বরমে ট্রেন থামতো না। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া খবরের কাগজের বান্ডিল কুড়িয়ে হকারদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আট বছর বয়সের কালাম তার প্রথম পারিশ্রমিক উপার্জন করে।


একবেলা আধপেটা খেয়ে থাকা জেলে পরিবারের সন্তানের মাদ্রাজ এম আই টি তে ভর্তির হাজার টাকার ফি জুগিয়েছেন তারই সহোদর ভগিনী, সামান্য গয়না বিক্রী করে। রামেশ্বরমের পাঠশালা ঘুরে, রমানাথপুরের সোয়ার্জ স্কুল, ত্রিচির সেন্ট জোসেফ কলেজ, মাদ্রাজের এম আই টি - সঙ্কীর্ণ গন্ডী থেকে আস্তে আস্তে উঠে এসেছেন বৃহত থেকে বৃহত্তর জীবনে, প্রানচঞ্চল কর্মব্যস্ত মানুষটি। ঈশ্বরপ্রেমীক কালাম পিছনের দিকে তাকিয়ে তাঁর শৈশবের লড়াইয়ের কথা সমর্থন করে প্রান্তিক এবং পরিত্যক্ত জনের উদ্দেশ্যে লিখেছেন :

.....some poor child living in an obscure place, in an unprivileged social setting may find a little solace in the way my destiny has been shaped. It could perhaps liberate themselves from the bondage of their illusory backwardness and helplessness. Irrespective of where they are right now, they should be aware that God is with them and when He is with them , who can be against them ?"

এরই সারমর্ম করেছেন কাব্যে :

God has not promised/ skies always blue/ Flower-strewn pathways/ All our life through/ God has not promised/ sun without rain,/ joy without sorrow,/ peace without pain,/ But God has promised strength for the day,/ Rest for the labour/ Light for the way.

এস এল ভি নির্মাণের সময় উর্দ্ধতন সহকর্মী প্রায়ই তাড়া লাগাতেন। অধৈর্য উর্দ্ধতনের কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই শুনতে হ'ত, "কালাম তুমি যা চাও তাই পাবে, শুধুমাত্র সময় চেয়ো না।" হাসতে হাসতে কালাম উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইলিয়ট থেকে - Between the conception and the creation/ Between the emotion / And the response/ Falls the shadow/

ক্ষেত্রবিশেষে এমন উদ্ধৃতি তিনি অনেকবার করেছেন, কখনও নিজের সৃষ্টি থেকে, কখনও বা বিখ্যাত কবির সৃষ্টি থেকে ধার করে। পাঠক মনে করবেন না যেন আমি মোহগ্রস্থ হয়ে শ্রেষ্ঠ রকেট ইঞ্জিনিয়ার কালামের উপর শ্রেষ্ঠ কবির শিরোপা আরোপ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমার কাছে অজানা এবং প্রকৃত অর্থে অদেখা একজন মানুষ। তাঁকে নিয়ে লেখা বই-কাগজ পড়ে এবং পেশার সূত্রে তাঁর কাছে আসা দু'একজন গুণিজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তাঁর কবি সত্বার কথা জানতে পেরেছি। আমার ধারনা, কবিতার ব্যাপারটা তাঁর শুদ্ধ মনের আবেগ প্রকাশের একটা ভঙ্গিমা।

প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্যবোধও ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পরিবেশ সচেতনতা। রকেট উৎক্ষেপণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উড়িষ্যার বালেশ্বরের কাছে যে জায়গা সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল, সেখানে একটা বার্ড স্যাংচুয়ারি ছিল। সেটিকে বাঁচিয়েই তিনি  লঞ্চিং প্যাড নির্মাণের পরামর্শ দেন। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে পড়ছে। অগ্নি উৎক্ষেপণের আগের রাত্রে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, কে সি পন্থ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "অগ্নি উৎক্ষেপণের সাফল্য আমরা কী ভাবে উদযাপন করব ?" অকপট, আদর্শবাদী কালামের সহজ সরল উত্তর ছিল, "সহস্রাধিক বৃক্ষ রোপনের মধ্যে দিয়েই আমরা আনন্দোৎসব পালন করতে পারি।" আব্দুল কালাম আসলে দেশ, সমাজ, পরিবেশ - সব ব্যাপারেই আজীবন সজাগ ছিলেন। 

 

      Agni-V, long range (5000 km) ballistic missile

প্রকৃতির ভারসাম্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের যে বিশাল ভূমিকা আছে সে ব্যাপারে উনি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। দু'একটা ঘটনার উল্লেখ করছি। রাষ্ট্রপতি ভবনের ছ'বছর মেয়াদের মধ্যে সংযোজন হয়েছে একটি ভেষজ উদ্যান এবং একটি বায়োডাইভার্সিটি পার্ক। মোগল গার্ডেনের ফুল তাঁর কাছে যতটা প্রিয়, ততটাই প্রিয় পশু-পাখি। রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি হরিণ শাবকের পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। কালাম সাহেব নিজে টানা ন'মাস শাবকটিকে নিয়মিত ফিডিং বোতলে দুধ খাওয়াতেন। ভবন সীমানার মধ্যেই একটি পশু চিকিৎসার হাসপাতাল আছে। সেখানকার ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে পোষ্যদের খবর সংগ্রহ করতেন। পশু-পাখিদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে উনি এতটাই দায়বদ্ধ ছিলেন যে, মোগল গার্ডেনে একটি ময়ূরকে খোঁড়াতে দেখে খবর নিয়ে জানেন যে পাখিটির পায়ে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এবং সেজন্য একটি বিশেষ ট্রে-তে পাখিটিকে শোয়াতে হবে। হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকায়, তাঁরই নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে সেটি বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা হয়। দিল্লীর চিড়িয়াখানা সূত্রে খবর পান যে সার্কাস দলের একটি জলহস্তী চোখে ঝাপসা দেখছে। তৎপর আব্দুল কালাম পশুটির ছানি কাটানোর ব্যবস্থা করেন। এই রকমই রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি ঘোড়ার ছানি কাটানো হয় তাঁরই আমলে। এই না হলে আব্দুল কালাম!!

পদমর্যাদা নির্বিশেষে যে কোনও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা আন্তরিক ছিল, সেটা কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। মৃত্যুর দিন অর্থাৎ ২৭শে জুলাই, ২০১৫, কালাম সাহেবের শেষ ছ'বছরের ছায়াসঙ্গী এবং তিনটি বইয়ের সহলেখক, সৃজনপালের কথাগুলো তুলে ধরছি: "গুয়াহাটি বিমান বন্দর থেকে সড়ক পথে আই আই এম শিলং যাওয়ার পথে কালামের চোখে পড়ছিল তাঁর গাড়ির সামনে 'এসকর্ট' জিপসিতে মেসিনগান নিয়ে দাঁড়ানো এক জওয়ানদের দিকে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওয়ারলেসে খবর পাঠিয়ে ওঁকে বসতে বলতে। নিয়মের ফাঁদে তা করা যায়নি। শিলং পৌঁছেই ওই নিরাপত্তারক্ষীকে তিনি ডেকে পাঠাতে বললেন। লম্বা, সুঠাম চেহারার কনস্টেবল, এস এ লাপাং স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাবড়ে গেছিলেন। ওঁকে অবাক করে হাত সামনে এগিয়ে দিলেন স্যার। করমর্দনের পরে বললেন - আমার জন্য আপনাকে এতটা পথ দাঁড়িয়ে থাকতে হ'ল।  নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে। আমার সঙ্গে বসে চা খেয়ে যান। অবাক হয়ে যান জওয়ান। কিন্ত ভ্যাবাচাকা ভাবটা কাটিয়ে লাপাং উত্তর দেন, 'স্যার আপনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।'

আব্দুল কালামের ছাত্র এবং এক সহকর্মী দেবাশিস পালের অভিজ্ঞতার কথায় আসি : "অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায়, এস এল ভি উৎক্ষেপণের কাজে সবাই ব্যস্ত। লঞ্চিংয়ের দিন এগিয়ে আসছে, একদিন ডক্টর কালাম আমাকে বললেন,  'পল, টুমরো ইউ হ্যাভ টু গো কার-নিকোবর টু কনডাক্ট স্যাটেলাইট কমপ্যাটিবিলিটি টেস্ট।' মাথা নিচু করে কাচুমাচু হয়ে বললাম, 'রকেট লঞ্চিং ডেট ইজ নিয়ারিং, স্যার।' উনি শুধু বললেন, 'পল, আই শ্যাল সি দ্যাট ইউ আর ব্যাক বিফোর দ্য রকেট ইজ লঞ্চড্।' পরদিন বেরিয়ে পড়লাম কার-নিকোবারের পথে। সব কাজ করলাম। যেদিন ফিরব, দেখি, আমাকে নিতে আসা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের প্লেনটায় আমিই একমাত্র যাত্রী। পাইলট বললেন, 'মিস্টার পল, ক্যান ইউ সি, ইউ আর দ্য ওনলি প্যাসেঞ্জার, আ ভি আই পি।' বুঝলাম সবই হয়েছে ডক্টর কালামের নির্দেশে। অত ব্যস্ত একজন মানুষ, পদমর্যাদায় কনিষ্ঠ এক ইঞ্জিনিয়ারের আব্দার রেখে উৎক্ষেপণের ঠিক একদিন আগে আমাকে শ্রীহরিকোটায় ফিরিয়ে এনে ছিলেন। দেখা হতে বললেন, 'সো ইউ আর ব্যাক ইন টাইম, এনজয় দ্য থ্রিল নাউ'।"

মূল্যবোধের মাত্রা যে কোন্ পর্যায় পৌঁছতে পারে, এই ঘটনা তার সাক্ষী: একত্রিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন, এক সময়ের সহকর্মী ডঃ সুবীর চৌধুরী, কালাম সাহেবের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন: "সালটা  ২০০৩। ভরদুপুরবেলা। ডঃ কালাম সদ্য রাষ্ট্রপতির আসন অলঙ্কৃত করেছেন। হায়দ্রাবাদে এক মারাত্মক গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে আমি শয্যাশায়ী। হঠাৎই আমার কোয়ার্টারে বেল বাজল। দরজা খুলে আমার স্ত্রী দেখে যে সমস্ত কোয়ার্টারটা ঘিরে নিয়েছে ব্ল্যাক কম্যান্ডো। আর ওই দশাশই চেহারার মানুষগুলোর ফাঁক দিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন ছোটখাট চেহারার একটি মানুষ। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান, এ পি জে আব্দুল কালাম। এরপর কম্যান্ডোদের বললেন, 'পার্সোনাল ব্যাপারে আলোচনা হবে, তোমরা বাইরে থাক।' বলাই বাহুল্য যে উনি আমার ভয়ঙ্কর অ্যাকসিডেন্টের কথা জেনে এতটাই বিচলিত বোধ করেছেন যে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন আমাকে দেখতে" ভাবা যায় !!

দেশের নিরাপত্তার ব্যাপারে একই মানুষের অবস্থান একেবারে বিপরীত মেরুতে। তখনও উনি রাষ্ট্রপতি হননি। সংসদে নিউক্লিয়ার বিতর্কের সপ্তাহখানেক আগে ভূতপূর্ব সাংসদ শ্রীমতি কৃষ্ণা বসু, কোন্ পক্ষ নেওয়া উচিৎ বা কি বলা উচিত প্রশ্ন করে কালাম সাহেবের পরামর্শ চান। ওঁর খুব সহজ উত্তর ছিল, "আপনার যা মত তাই বলবেন, শুধু মাথায় রাখবেন, যে শক্তিশালী সকলে তাকে সমীহ করে, দুর্বলতা কেউ পাত্তা দেয় না" এরও কয়েক বছর আগে রাজস্থানের পোখরাণে, দ্বিতীয়বার পরমাণু পরীক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এক রিপোর্টারের প্রশ্নে শান্তিপূর্ণ কালাম যে জবাব দিয়েছিলেন, সেটা অবিকৃত তুলে ধরছি : "Abdul Kalam, a peace loving man, when led the team involved in India's second phase of nuclear explosion in 1998, was asked why he involved himself in the weapons of war. He answered cooly, 'I had no qualms in building such arsenal, I actually ensure peace of my country'."

প্রত্যেক মানুষের কথা বলার একটা ভঙ্গি আছে, কিছু মুদ্রাদোষ আছে, সময় যেটা কেড়ে নিতে পারে না। কালাম সাহেবের এমন একটি অভ্যাস ছিল। আবেগে অথবা মৃদু উত্তেজনার মুহূর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় উনি " funny guy", এই ছোট্ট বাক্যবন্ধটি প্রায়ই ব্যবহার করতেন।

ভারতবর্ষের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কর্ণধারদের অনেকের ভাষণে, ভাষার অলঙ্কারে সজ্জিত বহু প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ পাওয়া যায়। বাস্তবে সেটা কতটা রূপায়িত হয়,তার হিসেব করা খুবই কঠিন। কালাম সাহেবের বহিরঙ্গে বা ব্যবহারে চকচকে পালিশ ছিল না। তবে বাস্তব জগতের কথা মাথায় রেখে তিনি তাঁর জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছিলেন। কিছু অনুশাসন কেন্দ্র করে এবং স্বল্পায়তনে সেগুলো প্রকাশ করতেন ছাত্র এবং ছাত্রসম সহকর্মীদের কাছে। এর মধ্যে কিছু কিছু উক্তিতে দার্শনিক কালামকেও খুঁজে পাওয়া যায়। এমনই এক ডজন উক্তির দৃষ্টান্ত পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।

১) প্রথমবারের সাফল্যের পরও থেমে থেকো না কারণ, দ্বিতীয়বার তুমি ব্যর্থ হতেই পার। তখন কিন্ত সবাই অপেক্ষায় থাকবে। বলবে, যে প্রথমবারের জয় ছিল স্রেফ ভাগ্য।

২) বৃষ্টির সময় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে প্রতিটি পাখি। কিন্ত ঈগল বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পাড়ি দেয় মেঘের উপর।

৩) সাফল্যের সংজ্ঞা আমার কাছে যত বেশি দৃঢ় হবে, ব্যর্থতাকে ততই আমি পেছনে ফেলে যাব।

৪) সাফল্যের আনন্দ পেতেই মানুষের জীবনে কঠিন সময়ের প্রয়োজন। 

৫) যদি তুমি সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে চাও, তাহলে নিজেকে আগে সূর্যের মতো দগ্ধ কর।

৬) কাউকে পরাজিত করা অত্যন্ত সহজ, কিন্ত কঠিন হ'ল কাউকে জিতে নেওয়া।

৭) আমাদের সবার সমান প্রতিভা না থাকতে পারে। তবে প্রতিভার বিকাশ করার সমান সুযোগ আমাদের সকলের আছে।

৮) কাজকে ভালবাসো, সংস্থাকে নয়। কারণ, তুমি জানো না তোমার সংস্থা কবে তোমার প্রতি ভালবাসা বন্ধ করে দেবে।

৯) কৃত্রিম আনন্দের পিছনে দৌড়ানোর চেয়ে প্রকৃত সাফল্য পাওয়ার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা ভাল। 

১০) চিন্তাশক্তি সেরা সম্পদ। জীবনের সেইসব উত্থান-পতনকে পাত্তা দিও না, যা তুমি পেরিয়ে এসেছ।

১১) লেগে থাকা ছাড়া তোমার সাফল্য আসবে না। আর লেগে থাকলে ব্যর্থতার তোমাকে স্পর্শ করবে না।

১২) ঘুমিয়ে যেটা দেখ সেটা স্বপ্ন নয়। যেটা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না সেটাই স্বপ্ন। 

মৃত্যুর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ভিতরের মানুষটা আমজনতাকে যে কতখানি ছুঁয়ে গেছিল, সেটা প্রত্যক্ষ করলাম টেলিভিশনের পর্দায় যখন তাঁর মৃতদেহ দিল্লিতে এসে পৌঁছোলো। শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় অনেক রঙই মিশে গেছিল সেই আবেগভরা জমায়েতে। মনে রাখতে হবে যে পর পর দু'বছর এম টিভির সমীক্ষায় ইউথ আইকন নির্বাচিত হয়েছিলেন এই প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক। দিল্লিতে সেদিনের আবালবৃদ্ধবণিতার আবেগ উন্মাদনার জোয়ারে সেই ইতিহাস যেন প্রাসঙ্গিকতা পেল।প্রবীন রাজনীতিকরা বলেছেন যে মানুষের এই ঢল, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি, বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিনও মৃত্যুর পর জীবন নিয়ে এমন উদযাপন হয়েছিল।

বিখ্যাত ছাত্র, বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বিখ্যাত শিল্পপতি কোনও কিছুরই দাবিদার নন আবুল পাকির জয়নালাবদীন আব্দুল কালাম। বাপ-ঠাকুরদার নাম জড়িয়ে এত বড়ই তাঁর নাম। নামের বিশালত্বের সঙ্গে তাঁর কর্মযজ্ঞের বিশালত্বের বিশাল মিল। আসলে তাঁর খ্যাতি প্রতিকী। কিসের প্রতীক ? তপোশ্চর্যার প্রতীক, নৈতিকতার প্রতীক, মূল্যবোধের প্রতীক, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করার প্রতীক, কর্মকুশলতার প্রতীক, স্বায়ত্ব প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রতীক, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, সত্বার প্রতীক এবং অবশ্যই সফল নেতৃত্বের প্রতীক। 

শেষ করার আগে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। ঊনিশশো আটানব্বই সালের মে মাস। কেন্দ্রে বি জে পি সরকারের নেতৃত্বে অটল বিহারী বাজপেয়ী। ওই মাসের বারো তারিখে রাজস্থানে পোখরানের মরুভূমিতে একের পর এক পাঁচটি পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পরীক্ষা চালানো হয়। বিস্ফোরণ স্থলে ভাবা পরমাণু কেন্দ্রের পরমাণু গোষ্ঠীর সঙ্গে কালাম সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। এর পর থেকেই ওঁর নামের সঙ্গে পরমাণু বিজ্ঞানীর তকমা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে উনিও কখনও মুখ খোলেননি। পেশাগত জীবনে পরমাণু সংক্রান্ত বিষয় ওঁর গবেষণার অঙ্গ ছিল বলে আমার অন্তত জানা নেই। এটুকুই জানি যে বাজপেয়ী সরকারের অনুরোধে, পোখরান কর্মকান্ডে পরমাণু বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারের ওই দলটিকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থে আব্দুল কালাম একজন অত্যন্ত সফল টেকনোক্র্যাট এবং ভারতবর্ষের গর্ব।


তথ্যসূত্র:

১) Wings of fire - An autobiography,  APJ Abdul Kalam with Arun Tiwari

২) Weapons of peace - Raj Chengappa

৩) গত পনের বছরের প্রকাশিত প্রতিষ্ঠিত বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনের নির্বাচিত অংশ। 









No comments: