Sunday, August 28, 2022

শূন্যের কাছাকাছি

   

মহাশূন্যে কান পেতে থাকা বেতার দূরবিনগুলো অতিপরিবাহী-প্রযুক্তির হাত ধরে ক্ষীণতম সংকেত শুনতে প্রস্তুত


                        শূন্যের কাছাকাছি

একটা বিদেশি তথ্যচিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অগভীর একটি জলাধারে সিঙি জাতীয় একটা মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে। পাশেই আরও একটি তরলাধার রাখা আছে। জীবন্ত মাছটাকে জল থেকে তুলে দ্বিতীয় আধারে রাখার কয়েক পলকের মধ্যেই মাছটা সিঁটিয়ে আপাত নিষ্প্রাণ অবস্থায় আধারের তরলে তলিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে মাছের সেই নির্জীব দেহটিকে তুলে এনে আবার ডুবিয়ে দেওয়া হ'ল জলাধারে। দু-চার সেকেন্ডের মধ্যেই সেটা আবার আগের মতোই ঘুরে ফিরে দিব্যি খেলতে শুরু করে দিল জলে। তথ্যচিত্রটি দেখতে দেখতে আন্দাজ করেছিলাম কী ঘটতে চলেছে, আর আমার মন চলে গিয়েছিল রিপভ্যান্ উইংকল্ আর স্লিপিং বিউটির জগতে। আরও মনে হয়েছিল আমার ঘনিষ্ঠ এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের উক্তি। কুশল বিনিময়ের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "একটা বয়সের পর বয়স বাড়া মানে বিদায়ের বিষণ্ণতা। দেখা হবে না ভবিষ্যত পৃথিবীর মাটিতে আরও কত কিছু ঘটবে।" আধুনিক বিজ্ঞানের ভবিষ্যত হয়তো ঘোচাতে পারবে সেই বিষণ্ণতা। পরিপক্ক বয়সে বিদ্বেষ, মারামারি-ভরা পৃথিবী থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষ হয়তো সাময়িক নির্বাসন নেবে এমনই এক ঘুমসাগরে। কয়েক দশক বাদে আবার যখন তাকে তুলে আনা হবে, ফিরে পাবে সে তার চলমান জীবন ; দেখতে পাবে পৃথিবীর তখনকার চেহারা।

মাছের ঘুমসাগরের তরলটা ছিল বরফের থেকে আরও অনেক  অনেক ঠান্ডা, তরল নাইট্রোজেন। আমাদের স্বাভাবিক চেতনায় শীতলতম বস্তু বলতে আমরা বুঝি বরফ বা বরফ-গলা জল যার তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানুষের লাগাতার অনুসন্ধিৎসা জন্ম দিয়েছে আরও অনেক ঠান্ডা বস্তুর, যাদের তাপমাত্রা আর এক শূন্যের কাছাকাছি ; যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় চরম শূন্য (Absolute Zero)। এই নিবন্ধে আলোচনার বিষয়বস্তু হল শূন্যের কাছাকাছি সেই তাপমাত্রা - যেটা শুধু মানুষেরই সৃষ্টি, যা ব্রহ্মান্ডের দূরতম প্রান্তের শীতলতম বিন্দুর থেকেও শীতল।

সময় ১৯০৮ - ১৯১১ সাল। ডাচ্ পদার্থবিদ্ হাইক ক্যামারলিং ওনস্ (১৮৫৩ - ১৯২৬) লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে আবিষ্কার করলেন হিলিয়াম তরলীকরণের এক অভিনব পদ্ধতি। তরলাবস্থায় পৌঁছানোর সময় যে কোনও গ্যাসের তাপমাত্রা কমে যেতে বাধ্য। হিলিয়াম গ্যাসও তার ব্যতিক্রম নয়। যাইহোক, সাধারণ বায়ুর চাপে তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রা দাঁড়াল ৪.২ ডিগ্রি কেলভিন। ওই তাপমাত্রা ঠিক কতটা ঠান্ডা, সেই আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখছি। সহকর্মীদের নিয়ে ওনস্ শুরু করলেন বিভিন্ন পদার্থকে তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রায়  রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মৌলিক পদার্থ হিসেবে প্রথমে বেছে নিলেন বিশুদ্ধ পারদ। কারণ অন্যান্য ধাতব মৌলের তুলনায় সেই যুগে বিশুদ্ধ পারদ ছিল অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য। তরল হিলিয়ামের পাত্রে খানিকটা জমাটবাঁধা পারদের মধ্যে দিয়ে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় তড়িৎ প্রবাহের ব্যবস্থা করা হ'ল। তাপমাত্রা হ্রাসের ফলে ধাতব পারদের বৈদ্যুতিক রোধ-ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকল। এটা অবশ্য কিছু নতুন ব্যাপার নয়। যাইহোক,  তাপমাত্রা যখন ৪.৩°কেলভিন (- ২৬৮.৭° সেলসিয়াস), তখন পারদের রোধের মান কমে হয়েছে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পারদের রোধের পাঁচশ ভাগের এক ভাগ। তাপমাত্রা আরও নামিয়ে আনা হ'ল ৪.২° কেলভিনে (-২৬৮.৬° সেলসিয়াস)। ক্যামারলিং ওনস্ এবং তাঁর সহকর্মীরা বিস্ফারিত নেত্রে লক্ষ করলেন এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা - জমাটবাঁধা পারদের এক অদ্ভুত আচরণ। ওই তাপমাত্রায় পারদের বৈদ্যুতিক রোধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে এবং বিদ্যুত প্রবাহের পথ হয়েছে সুগম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁরা পদার্থের এই আচরণের নাম দিলেন সুপারকন্ডাকটিভিটি (Superconductivity) বা অতিপরিবাহিতা। হিলিয়ামের তরলীকরণ ও সুপারকন্ডাকটিভিটির আবিষ্কার বিজ্ঞানজগতে উন্মোচিত করল এক নতুন দিগন্ত।  ১৯১৩ সালে ক্যামারলিং ওনস্ সম্মানিত হলেন নোবেল পুরস্কারে।

এম আর আই পরীক্ষায় ব্যবহারের  জন্য  নির্মিত আধুনিক  অতিপরিবাহী-তড়িচ্চুম্বক 

যে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হ'ল, প্রাসঙ্গিক পরিভাষায় সেই তাপমাত্রার নামকরণ হ'ল ক্রিটিক্লাল টেম্পারেচার, Tc (Critical Temperature). সুপারকন্ডাকটিভিটি ধর্মসম্পন্ন  সাধারণ পদার্থগুলোর নাম হ'ল সুপারকন্ডাটার। তাপমাত্রা নামিয়ে আনলে অবশ্য সব পদার্থই সুপারকন্ডাকটারে রূপান্তরিত হয় না। কেন হয় না, সেই আলোচনায় আমরা পরে আসব। যেসব পদার্থের মধ্যে সুপারকন্ডাকটার হবার ধর্ম আছে, তাদের প্রত্যেকের ক্রিটিক্লাল টেম্পারেচার আলাদা। সুপারকন্ডাকটারের চরিত্র অনেকটা আজকের দিনের রাজনৈতিক নেতাদের মতো। দল মত নির্বিশেষে প্রত্যেক নেতার একটি মুখ আর এক বা একাধিক মুখোশ থাকে। ক্রিটিক্লাল টেম্পারেচারের মতো এমন কি প্রত্যেকের মুখোশও আলাদা আলাদা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেতাদের যেমন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বলে মনে হয়, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটারগুলোও সাধারণ পরিবাহীর মতো আচরণ করে। তাপমান কমিয়ে আনলে নির্দিষ্ট তাপমানে সুপারকন্ডাটার তার আসল চেহারা মেলে ধরে এবং অতিপরিবাহী অবস্থা প্রাপ্ত হয়। একাধারে আত্মগোপন ও আত্মপ্রকাশের এ এক অভিনব দৃষ্টান্ত। যাইহোক, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সিসা, অ্যালুমনিয়াম ইত্যাদি কয়েকটি ধাতব মৌলের মধ্যে নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটিভিটির অস্তিত্ব লক্ষিত হ'ল। সুবিধেমতো  চেনা সুপারকন্ডাটারের তার বেছে নিয়ে ওনস্ তড়িঘড়ি শুরু করে দিলেন তারের কুন্ডলী তৈরির কাজ। উদ্দেশ্য শক্তিশালী তড়িচ্চুম্বক তৈরি করা। এখনে বলে রাখা প্রয়োজন যে যে-কোনও তড়িচ্চুম্বকের চৌম্বকীয় ক্ষমতা নির্ভর করে দুটি জিনিসের গুণফলের উপর - (১) কুন্ডলীটি কতগুলো তারের পাক দিয়ে তৈরি এবং (২) সেই তারের মধ্যে দিয়ে কী পরিমাণ বিদ্যুত প্রবাহিত হচ্ছে। সুপারকন্ডাটারের বৈদ্যুতিক রোধ শূন্য হয়ে যেতে দেখে ক্যামারলিং ওনস্ ধারণা করেছিলেন যে তরল হিলিয়ামে চোবানো সামান্য কয়েক পাক তারের কুন্ডলীর মধ্যে যথচ্ছ তড়িৎ চালনা করে তৈরি করবেন আকৃতিতে ছোট, অথচ শক্তিশালী চুম্বক। শক্তিশালী চুম্বকের প্রয়োগক্ষেত্রের আলোচনা আপাতত স্থগিত রেখে দেখা যাক ওনস্-এর তৈরি চুম্বকের পরিণতি। কুন্ডলীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে কুন্ডলীটি চুম্বকের রূপ নিল এবং যে কোনও চুম্বকের ধর্মানুযায়ী নিজের চতুর্দিকে ক্ষমতার জাল বিস্তার করল, যাকে বলে চৌম্বকক্ষেত্র। কিন্ত দেখা গেল যে এই চুম্বকক্ষেত্রের শক্তি একটি নির্দিষ্ট মানে পৌঁছনো মাত্রই কুন্ডলীর অতিপরিবাহী ধর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরল হিলিয়ামের সংস্পর্শে থেকেও পদার্থটি ফিরে এল পূর্বাবস্থায়, অর্থাৎ বৈদ্যুতিক রোধবিশিষ্ট্য সাধারণ পরিবাহীর মতো আচরণ শুরু করল এবং পরিবাহীর রোধ বিদ্যুত প্রবাহের সর্বোচ্চ মাত্রা  বেঁধে দিল। সুতরাং ক্ষুদ্রাকৃতি শক্তিশালী চুম্বক তৈরির কাজে ব্যর্থ হলেন হাইক্ ক্যামারলিং ওনস্। তাই বলে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি তাঁর প্রচেষ্টা। সব ব্যর্থতার পেছনেই থাকে সাফল্যের বীজ। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হ'ল না। ক্যমারলিং ওনস্-এর ঝুলিতে সঞ্চিত হ'ল নতুন অভিজ্ঞতা, সুপারকন্ডাকটারের উপর চুম্বকক্ষেত্রের প্রভাবের উদাহরণ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় চৌম্বকক্ষেত্রের যে সর্বোচ্চ মান অতিপরিবাহিতা ধর্মকে বিনষ্ট করে, তাকে বলা হ'ল ক্রিটিক্লাল ফিল্ড (Critical Field), Bc.  নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চৌম্বকক্ষেত্রের সর্বোচ্চ মান ছাড়াও আর যা সুপারকন্ডাটারের উপর প্রভাব বিস্তার করে তা হ'ল কুন্ডলীর তারের প্রস্থচ্ছেদের প্রতিএকক ক্ষেত্রফলের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত প্রবাহের মাত্রা - যাকে বলা হয় ক্রিটিক্লাল কারেন্ট (Critical Current), Jc. মোদ্দা কথায় দেখা গেল যে, পরস্পর নির্ভরশীল এই তিনটি চরিত্রমানের (Tc, Bc, Jc) একটা ত্রিমাত্রিক গন্ডী আছে এবং সেই গন্ডির মধ্যে থাকলে তবেই কিছু বিশেষ পদার্থের অতিপরিবাহিতা বজায় থাকে।

কিন্ত এই শর্তগুলি পূরণ করলেই কি যে-কোনও পদার্থ সুপারকন্ডাটারে পরিণত হতে পারে ? পদার্থের কোন্ কোন্ ধর্ম চিহ্নিত করবে সুপারকন্ডাকটারকে ? এইরকম নানা প্রশ্ন বিজ্ঞানীকুলকে ভাবালো। আসল কথা ১৯৩৫ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা এমন কোনও তথ্য পরিবেশন করতে পারেননি যা পদার্থের মধ্যে সুপারকন্ডাকটিভিটির অস্তিত্ব ঠাহর করতে পারে। কিন্ত নিষ্ঠাবান বিজ্ঞানীরা জোরকদমে তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেলেন। তাঁদের অনুসন্ধানের ফলে আরও বেশ কয়েকটি মৌলিক পদার্থের মধ্যে অতিপরিবাহী ধর্মের প্রমাণ পাওয়া গেল। এ ব্যাপারে আমেরিকান বেল টেলিফোন গবেষণাগারের বি টি ম্যাথিয়াসের ভূমিকা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাথিয়াস এবং তাঁর সহকর্মী জন হুলম্ ১৯৫০ সালে লাগাতার শ্রমসাদ্ধ পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা হাতে নিলেন। তাঁদের আশা, যদি এই ঘটনার কোনও নিয়ম খুঁজে বার করা যায়। একরকম অজানা অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার মতো প্রায় বাছবিচার না করেই, টানা তিন বছর পরীক্ষা চালিয়ে গেলেন নানাবিধ পদার্থের উপর (মৌলিক, যৌগিক বা মিশ্র ধাতু)। তাঁরা ধারনা করেছিলেন যে অনেক তথ্য থাকলে তাদের মধ্যে হয়তো একটা সম্পর্ক খুঁজে বার করা যাবে। তাঁরা তাঁদের সৃজনীশক্তির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন অসাধারণ ধৈর্য এবং অক্লান্ত দৈহিক পরিশ্রম। বলা বাহুল্য, তাঁদের প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়নি। রাশিকৃত সেই তথ্যের বিশ্লেষণে যে সত্যটি বেরিয়ে এল তা হ'ল এই - কোনও পদার্থের পরমাণুতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ইলেকট্রনের, - বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের  (Valence Electron), গড় সংখ্যার উপর নির্ভর করবে কোনও পদার্থের সুপারকন্ডাকটার হবার যোগ্যতা। পরীক্ষালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা বুঝতে পারলেন যে যেসব পদার্থের পরমাণুতে ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সংখ্যা ২ থেকে ৮, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তাদের সুপারকন্ডাকটার হবার সম্ভাবনা প্রবল। এ ছাড়া ৩, ৫, ৭ অর্থাৎ বিজোড় সংখ্যক ভ্যালেন্স ইলেকট্রনযুক্ত পদার্থগুলোও তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রার তুলনায় অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটিভিটি অবস্থাপ্রাপ্ত হবে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করব যে আজকের উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটার (High Tc Superconductor) গবেষনারও সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৫০ সালে এবং তার জনক হলেন এই বি টি ম্যাথিয়াস। পদার্থের পরমাণুতে ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সঙ্গে সুপারকন্ডাকটিভিটির সম্পর্কের নিয়মটা হুলম-ম্যাথিয়াসের আবিষ্কার। আরও যে বাড়তি তথ্যটি তাঁরা জানলেন তা হ'ল, সুপারকন্ডাকটিভিটি নির্ভর করবে পদার্থের গঠনে পরমাণুগুচ্ছের বিন্যাসের উপর। তথ্যের এইমাত্র পুঁজি নিয়ে তাঁরা দেখালেন যে ৭ ভ্যালেন্স ইলেকট্রন সম্পন্ন টেকনিসিয়াম, ১১ কেলভিন তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটারে রূপান্তরিত হয় অথচ ৮ ভ্যালেন্স ইলেকট্রনযুক্ত রুথেনিয়ামের ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রা মাত্র আধ কেলভিন। আবার মলিবডেনামের ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সংখ্যা ৬ হওয়া সত্ত্বেও তাপাঙ্কের নিম্নতম মানেও তা ওই অবস্থাপ্রাপ্ত হয় না। এক্ষেত্রে পরমাণুগুচ্ছের বিন্যাস ওই ধর্মপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধক। মজা হ'ল এই যে মলিবডেনাম ও রুথেনিয়ামের রাসায়নিক সংমিশ্রণে উদ্ভূত যৌগিক পদার্থটি ১০.৬ কেলভিন তাপমাত্রায় একটি উৎকৃষ্ট সুপারকন্ডাকটার। কারণ যৌগিকটির গঠনে পরমাণুর বিন্যাস শুধুমাত্র অনুকূলই  নয়, পরমাণুর গড়-পড়তা ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের সংখ্যা ৭ অর্থাৎ বিজোড় সংখ্যক। হুলম-ম্যাথিয়াসের শ্রমশাদ্ধ পরীক্ষামূলক গবেষণার ভিত্তিতে বহু মৌলিক এবং বিশেষত যৌগিক পদার্থের মধ্যে সুপারকন্ডাকটিভিটির অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া গেল। 

প্রশ্ন হ'ল ভ্যালেন্স ইলেকট্রন কি ইলেকট্রনের একটা বিশেষ জাতি ? পরমাণু গঠনের মোটামুটি কাঠামোটা আলোচনা করলে বুঝতে পারা যাবে কোনগুলো ভ্যালেন্স ইলেকট্রন। পরমাণুর গঠনের মূল উপাদান হ'ল প্রোটন ও নিউট্রনে ঠাসা স্বল্প আয়তনের একটি নিউক্লিয়াস, যার চারপাশে বিভিন্ন কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ঝাঁক ইলেকট্রন। পরমাণুতে প্রোটন বা ইলেকট্রনের আধান মানে ইলেকট্রিক চার্জ সমান এবং বিপরীতধর্মী হবার ফলে সাধারণ অবস্থায় পদার্থ আধান নিরপেক্ষ। যাইহোক, পরমাণুতে ইলেকট্রন বা প্রোটনের সংখ্যা নির্দেশ করে পদার্থের ধর্ম। সেই অনুযায়ী কোনটি হিলিয়াম, বেরিলিয়াম, বা রুপো, তামা, লোহা ইত্যাদি। নিউক্লিয়াসকে ঘিরে যে কক্ষপথগুলো আছে তাদের প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা আছে। নিউক্লিয়াসের নিকটতম কক্ষপথটি ভরে গেলে বাকি ইলেকট্রনেরা পরের কক্ষপথে ভিড় করে। সেটিও পূর্ণ হয়ে গেলে পরেরটি - এইভাবে কক্ষপথগুলো ক্রমশ পরিপূর্ণ হতে থাকে। পরিপূর্ণ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুচ্ছ ও নিউক্লিয়াসের মধ্যে পারস্পরিক প্রীতি একটু বেশিই।  অর্থাৎ তাদের মধ্যে তড়িচ্চুম্বকীয় বলের বাঁধন অপেক্ষাকৃত বেশি মজবুত। যে কক্ষপথ নিউক্লিয়াসের যত কাছাকাছি, বাঁধন তার ততই মজবুত। ব্যাপারটা অনেকটা   'কৃষ্ণাকান্তের উইল' উপন্যাসে ভ্রমর-গোবিন্দলালের উদ্দেশ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের সরস মন্তব্যের সঙ্গে তুলনা করা যায় - "যাহাকে ভালবাস, তাহাকে নয়নের আড় করিও না। যদি প্রেমবন্ধন দৃঢ় করিবে তবে সূতা ছোট করিও।" নিউক্লিয়াসের সঙ্গে অসম্পূর্ণ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলোর বাঁধন সম্পূর্ণ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলোর তুলনায় অনেকটাই আলাদা। খুব অল্প শক্তি খরচ করেই এদের সহজে হঠিয়ে দেওয়া যায়। তবে কল্পনা করা যেতে পারে যে ওই ইলেকট্রনগুলোর যেন হাত আছে। কাজেই একটি পদার্থের অসম্পূর্ণ কক্ষপথের   হাতওয়ালা ইলেকট্রনগুলো অন্য পদার্থের হাতওয়ালা ইলেকট্রনের হাতে হাত মিলিয়ে সম্পূর্ণ নতুন পদার্থ তৈরি করতে সক্ষম। হাতে-হাত মেলানোর প্রক্রিয়াটাকে বলা হয় রাসায়নিক বিক্রিয়া। বিক্রিয়া-প্রবণ, 'হাত' ওলা এই ইলেকট্রনদেরই বলা হয় ভ্যালেন্স ইলেকট্রন। 

জাপানের 'কেক' গবেষণাগারে অতিশীতল প্রযুক্তি বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

একের পর এক পরীক্ষায় অতিশীতল পরিবেশে পদার্থের এক-একটি নতুন ধর্ম যেমন আবিষ্কৃত হচ্ছিল, তেমনি তাগিদ আসছিল সেইসব ঘটনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খোঁজার জন্যও। বৈদ্যুতিক রোধশূন্যতা ছাড়াও মাইসনার এফেক্ট  (Meissner effect)-এর ঘটনা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের ভাবিিয়ে তুলেছিল। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে  ডব্লিউ মাইসনার দেখালেন যে অতিপরিবাহী অবস্থায় কোনও বস্তুকে একটি চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হলে, চৌম্বক বলরেখা বস্তুটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে ( অবশ্যই যদি না চৌম্বকক্ষেত্রের মাত্রা ওই বস্তুর জন্য নির্ধারিত মান Bc অতিক্রম না করে ; সেক্ষেত্রে বস্তুটি আর অতিপরিবাহী থাকবে না)। পরীক্ষাটা দুরকমভাবে করা যেতে পারে - (১) চৌম্বকক্ষেত্রের উপস্থিতিতে বস্তুটিকে ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রায় নামিয়ে এনে ; (২) বস্তুটিকে ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রায় নামিয়ে আনার পর চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করে। দুটি ক্ষেত্রেই একই ফল মেলে, অর্থাৎ চৌম্বক বলরেখাগুলো বস্তুটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। এখন প্রশ্ন হ'ল দুটো পরীক্ষার মধ্যে পার্থক্য কোথায় ! প্রকৃতির সৃষ্টিতে আদর্শ পরিবাহী বলে কিছু নেই। যদি থাকতো, তাহলে শেষোক্ত পরীক্ষার বেলায় চৌম্বক বলরেখা পদার্থের পাশ কাটিয়ে যেত, কিন্ত প্রথমোক্ত ব্যবস্থায় বলরেখার প্রভাব উপেক্ষা করার পরিবর্তে বস্তুটি সেগুলোকে নিজের মধ্যে বন্দি করে ফেলত। কাজেই আদর্শ পরিবাহীর ধর্ম ছাড়াও সুপারকন্ডাকটিভিটির অভিনবত্ব লুকিয়ে আছে মাইসনার এফেক্ট-এ সাড়া দেওয়ার দৃষ্টান্তে। 

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রচেষ্টায় প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ নিলেন ফ্রিৎজ্ লন্ডন। তিনি বললেন যে এক টুকরো সুপারকন্ডাকটারের নমুনা চোখে দেখার মতো বড় মাপের হওয়া সত্বেও অতিপরিবাহী অবস্থায় সেটাকে তুলনা করা যেতে পারে একটা পরমাণুর সঙ্গে। সুতরাং নমুনার আচরণে ফুটে উঠবে কোয়ান্টাম স্বভাব। ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলো চলাফেরা করবে নমুনাটির উপরিতলে এবং পরস্পর হাত ধরাধরি করে। নমুনাতে বিভব প্রভেদ (potential difference) সৃষ্টি করলে একটি ইলেকট্রনের গতি তড়িৎবাহী সব স্বাধীন ইলেকট্রনগুলোকে যুগপৎভাবে সচল করে তুলবে, তা সেগুলো যতদূরেই থাকুক না কেন। শিকলের একটা আংটায় টান পড়লে যেমন দূরের আংটাও একই সঙ্গে সচল হয়ে ওঠে। যাইহোক, এই যুগপৎ সচল হওয়ার প্রক্রিয়াটাই নির্দেশ করে পদার্থের রোধশূন্যতা। লন্ডনের মডেল থেকে মাইসনার এফেক্ট-এর ব্যাখ্যাও পাওয়া গেল। কারণ লেনজ্-এর নিয়মানুযায়ী বহিরাগত চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো আবেশিত (induced) হয়ে প্রতিরোধ করার মতো চৌম্বকক্ষেত্র গড়ে তুলবে এবং বহিরাগত চৌম্বকক্ষেত্রের বলরেখাগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দেবে। লন্ডনের তত্ত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও তাঁর যুক্তি ব্যাখ্যা করতে পারল না, স্বল্প তাপমাত্রায় বড় মাপের নমুনা কেন পরমাণুর মতো আচরণ করবে। 

ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পরবর্তী নায়করা হলেন আমেরিকার পার্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড ফ্রলিক ও বেল টেলিফোন গবেষণাগারের জন্ বার্ডিন। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র (Uncertainty Ptinciple) বলে যে স্বল্পতম তাপমাত্রাতেও পদার্থ কণিকা সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে না, তাদের একটা নির্দিষ্ট কম্পন থাকে, যাকে বলা হয় শূন্যাঙ্ক তাপমাত্রার কম্পন (Zero Point Vibration)। এর মূল কারণ হ'ল অনিশ্চয়তা সূত্রের গাণিতিক চেহারায় প্লাঙ্কের ধ্রুবকের (Planck's constant) উপস্থিতি। এই ধ্রুবকের মান যৎসামান্য হলেও একবারে শূন্য নয়। নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায় পদার্থের প্রতিটি পরমাণুর স্পন্দনের সঙ্গে যুগপৎভাবে তাল মেলায় তড়িৎ বহনকারী ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলো। পরমাণু স্পন্দনের ঢেউ যেন ইলেকট্রনগুলোকে ঝেঁঁটিয়ে নিয়ে চলেছে। সাধারণ তাপমাত্রায় যে সব ধাতব মৌল কুপরিবাহী হিসেবে চিহ্নিত, নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায় তাদের সুপারকন্ডাটারে রূপান্তরিত হয়ে যাবার পূর্ব সংকেত ফ্রলিক-বার্ডিনের তত্ত্বের মধ্যে নিহিত ছিল। তাঁদের কল্পনা অনেকটা এরকম - সাধারণ বা উচ্চ তাপমাত্রায় তড়িৎ কুপরিবাহী পদার্থের ভ্যালেন্স ইলেকট্রনের উপর পরমাণুর তাপীয় স্পন্দনের প্রভাব প্রবল হওয়ার ফলে ইলেকট্রনগুলো চলার পথে পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে শক্তি অপচয় করে। এই শক্তি অপচয়ের ব্যাপারটাই পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ হিসেবে প্রকাশ পায়। তাপমাত্রা কমতে থাকলে পারস্পরিক এই বিক্রিয়ার প্রবণতা কমতে থাকে এবং নির্দিষ্ট স্বল্প তাপমাত্রায়, যাকে বল সুপারকন্ডাকটিং টেম্পারেচার, এই বিক্রিয়া এমনই একটা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় আসে যখন তড়িৎবাহী ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর স্পন্দনের সঙ্গে ছন্দোবদ্ধভাবে ওঠানামা করতে করতে এগিয়ে চলে। সুপারপরিবাহীর ক্ষেত্রে ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলোর পরমাণুর তাপীয় স্পন্দনের প্রভাব এমনিতেই ক্ষীণ হওয়ায় ইলেকট্রন ও পরমাণুর মধ্যে পারস্পরিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কম বা নেই বললেই চলে। সুতরাং কম তাপমাত্রায় সুপরিবাহীর বৈদ্যুতিক রোধ কমে গেলেও তা একেবারে নিঃশেষিত হয় না। এই যুক্তিভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণ পাওয়া গেছে পর্যায় সারণীর (Periodic Table) বেশ কিছ ধাতব মৌলের মধ্যে। মিশ্র ধাতু এবং যৌগিক পদার্থ অপেক্ষাকৃত অধিক তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাকটিভিটি প্রাপ্ত হওয়ার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় বিতর্কেরও কিছু অবকাশ ছিল। একই বিষয়ে কর্মরত সমকালীন বৈজ্ঞানিকরা বার্ডিন-ফ্রলিক তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারলেন। চেষ্টা চলতে থাকল পুরনো তত্ত্বের ত্রুটিগুলো দূর করার। চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় পদার্থের সুপারকন্ডাকটিভিটি প্রাপ্ত হওয়ার আধুনিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সফলতম তিন মহারথী হলেন জন্ বার্ডিন, লিওঁ কুপার এবং রবার্ট স্রিফার। ১৯৫৭ সালে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাঁরা এই দুরূহ কাজে সফল হন। তবে তাঁদের গবেষণা ত্বরান্বিত হওয়ার পিছনে রিচার্ড ফিলিপস্ ফাইনম্যানের অবদান অনস্বীকার্য। তিনিও এই কাজে লিপ্ত ছিলেন। বি সি এস ত্রয়ী ( 'বি সি এস' হ'ল সফল তিন বিজ্ঞানীর নামের আদ্যক্ষর। তাঁদের তত্ত্ব ওই নামেই প্রসিদ্ধ) জানতেন ফাইনম্যানের দৃষ্টিভঙ্গির অভিনবত্ব এবং বুদ্ধির প্রাখর্য। ছুটি কাটাতে যাবার আগে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তাঁর একটি বক্তৃতায় স্রিফার অভিভূত হন। সেই বক্তৃতায় প্রথমে তিনি বলেছিলেন যে, সব সমস্যাই নির্ভুলভাবে সমাধান করতে পেরেছেন তিনি। কিন্ত শেষে তিনি দেখান কোথায় কোথায় গবেষণায় খামতি আছে এবং আলোচনা করেন অসফল হবার কারণগুলোর যাবতীয় খুঁটিনাটি। বক্তৃতা শেষ করার আগে তিনি বলেন - "...We should not even have to look at the experiments... It is like looking in the back of the book for the answer...The only reason that we cannot do this problem of Superconductivity is that we haven't got enough imagination." তাঁর বক্তৃতার অবিকৃত পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয় বিজ্ঞান পত্রিকায়। পেশার জীবনে প্রাত্যহিক ক্ষুদ্র গন্ডীর মধ্যে যে সবজান্তা বিজ্ঞানীরা বিচরণ করেন তাঁদের পক্ষে এমন ভুল স্বীকার করে নেওয়ার নজিরবিহীন উদাহরণ কল্পনা করাও দুষ্কর। বরং তাঁদের মধ্যে অহরহ কাজ করে চলে এই ভাবনাটা - 'আমি পিছিয়ে পড়ছি, অতএব তুমিও পিছিয়ে পড়।' এই ঘটনা আরও প্রমাণ করে পশ্চিমী বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান মানসিকতার ইতিবাচক দিকটা। যাইহোক, দেখা যাক বি সি এস তত্ত্বের বক্তব্য। 

ধাতব পদার্থের গঠন সাধারণত অসংখ্য স্ফটিকাকার কোষের (Crystalline Unit Cell) সমন্বয়। বস্তুটির মধ্যে যে কোনও দিক বরাবর এই কোষগুলোর পুনরাবৃত্তিতে সামগ্রিকভাবে তৈরি হয় জাফরির মতো একটি পরমাণু-কাঠামো, যার প্রাসঙ্গিক পরিভাষা ল্যাটিস। ত্রিমাত্রিক এই জাফরিতে প্রতিটি পরমাণু নিকটবর্তী পরমাণুর সঙ্গে অদৃশ্য তন্তু দিয়ে রীতিসিদ্ধ জ্যামিতিক নিয়মে গাঁথা থাকে। এই অবস্থায় পরমাণুর ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলোকে কোনও নির্দিষ্ট পরমাণুর অন্তর্গত বলে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। যেন একটা যৌথ তহবিলে পরমাণুরা তাদের ভ্যালেন্স ইলেকট্রনগুলোকে দান করে দিয়েছে। ফলে জাফরির গাঁটে গাঁটে প্রত্যেকটি পরমাণু আয়নিত অবস্থায় থাকবে, অর্থাৎ জাফরির গাঁটগুলো ধনাত্মক আধানের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করবে। যৌথ তহবিলের ইলেকট্রনগুলো স্বাধীন এবং একই আধানযুক্ত হওয়ার ফলে পারস্পরিক বিকর্ষিত হওয়ার কথা। বি সি এস তত্ত্ব প্রমাণ করল যে এই স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো অতিপরিবাহী অবস্থায় এক অভিনব কায়দায় পরস্পরকে আকর্ষণ করবে। কৌশলটা কী ? ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন জাফরির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় বিপরীত আধানধর্মী পরমাণুখচিত জাফরিকে আকর্ষণ করব। ফলে ল্যাটিসের গাঁটের পরমাণুগুলো পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসে ল্যাটিসকে সঙ্কুচিত করবে এবং সাময়িকভাবে ধনাত্মক আধানের ঘনত্ব বাড়িয়ে তুলবে ( অপেক্ষাকৃত অল্প জায়গায় ধনাত্মক আধানের সহাবস্থানের ফলে)। সুতরাং নিকটবর্ত আরও একটি ইলেকট্রন ওই দিকেই ধাবিত হবে অর্থাৎ পূর্ববর্তী ইলেকট্রনকে অনুসরণ করবে। এটাকেই বলা হচ্ছে ইলেকট্রনের প্রতি ইলেকট্রনের আকর্ষণ এবং স্পষ্টতই এটা সম্ভব হচ্ছে ল্যাটিসের মধ্যস্থতার ফলে। ল্যাটিস মধ্যস্থিত এই পরোক্ষ আকর্ষণের মাত্রা পারস্পরিক বিকর্ষণের প্রভাবকে অতিক্রম করার ফলে আকর্ষণের দিকেই পাল্লা ঝুঁকবে এবং অতিপরিবাহী অবস্থায় স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো জোড়ায় জোড়ায় ল্যাটিসের ফাঁক-ফোঁকরের মধ্যে দিয়ে অপ্রতিরোধ্যভাবে একে অপরকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলবে। এই জোড়া বাঁধার ব্যাপারটাকে বলা হয় 'ফরমেশন অফ বাউন্ড পেয়ারস্' বা 'কুপার পেয়ারস্' (Cooper Pairs) এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই অবস্থায় ফার্মিয়ন ধর্মাবলম্বী ইলেকট্রনেরা বোসন ধর্মী কণিকার মতো আচরণ করবে। ফার্মিয়ন ও বোসনের চরিত্রগত পার্থক্য আলোচনা করলে বুঝতে পারা যাবে অতিপরিবাহী অবস্থায় পদার্থের ইলেকট্রনগুলো কেন অবাধে চলতে থাকবে। সেই আলোচনায় আসা যাক।

পদার্থ কণিকাদের সাধারণত দু'ভাগে ভাগ করা যায় - ফার্মিয়ন বোসন (যথাক্রমে এনরিকো ফার্মি ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামানুসারে) পদার্থের গঠনে প্রত্যেকটি ফার্মিয়নের নিজস্ব শক্তিস্তর আছে। পক্ষান্তরে সব বোসনরা একই শক্তিস্তরে অবস্থান করার প্রবণতা দেখায়। এখন, বৈদ্যুতিক রোধের উৎসটা কোথায় ? ধাতব পদার্থ নিয়েই আলোচনা করা যাক। বিভব প্রভেদ সৃষ্টি করলে কম শক্তিস্তরে অবস্থিত স্বাধীন ইলেকট্রনগুলো (সাধারণত ফার্মিয়ন) গতিশীল হবে এবং অপেক্ষাকৃত উচ্চ শক্তিস্তরে পৌঁছবার চেষ্টা করবে, যদি সে শক্তিস্তর অন্য কোনও ইলেকট্রনের দখলে না থাকে। যাইহোক, পদার্থের গঠন সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন না হওয়ার ফলে ইলেকট্রনগুলো তাদের গতিপথে  ল্যাটিসের জায়গায় জায়গায় (যেখানে ত্রুটি আছে) পরমাণুদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে শক্তি অপচয় করবে এবং মন্দগতি বা গতিহীন হয়ে পড়বে। ইলেকট্রনের শক্তি অপচয়ের এই ব্যাপারটাই পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ হিসেবে প্রকাশ পায়। বলা বাহুল্য, অতিপরিবাহী অবস্থায় বোসন ধর্মে রূপান্তরিত সমস্ত ইলেকট্রন জুটির একই শক্তিস্তরে অবস্থানের প্রবণতা থাকায়, বিভব পার্থক্য দেখা দিলে সেগুলি সব একই সঙ্গে গতিশীল হয়। আগে আমরা দেখেছি যে ফ্রিৎজ্ লন্ডনের তত্ত্বে ইলেকট্রনগুলোর এই ধরনের যুগপৎ গতিশীলতার একটা আভাস ছিল। বি সি এস তত্ত্বের মডেল গাণিতিক সিদ্ধতায় পূর্ণতার স্বাক্ষর রাখে। সুপরিবাহীর তুলনায় কুপরিবাহী কেন উৎকৃষ্ট সুপারকন্ডাকটার হতে পারে, এই তত্ত্বের নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তার ব্যাখ্যাও পাওয়া গেল। এই অসামান্য অবদানের জন্য বার্ডিন, কুপার ও স্রিফার নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। পদার্থের সুপারকন্ডাকটিভিটি প্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা এতই জটিল যে আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই ঘটনার সঠিক মৌলিক ব্যাখ্যা খুঁজতে বিজ্ঞানীদের সময় লেগেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। মনে রাখা প্রয়োজন বি সি এস তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুধুমাত্র স্বল্প তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটারগুলোর  ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। 

আলোচনার গোড়ায় তাপমাত্রার চরমশূন্যের উল্লেখ করেছি, শীতলতার মাপকাঠিতে যা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস, - যে তাপমানে জল জমে বরফ হয়, তার থেকেও ২৭৩.১৫ ডিগ্রি নীচে। এই তাপমান থেকে শুরু করে তাপমাত্রার যে নতুন মাপকাঠি তৈরি হয়েছে তাকে বলা হয় কেলভিন স্কেল। কেলভিন স্কেলের হিসেবে জল জমে বরফ হয় ২৭৩.১৫ ডিগ্রি কেলভিনে, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হিলিয়াম - এই গ্যাসগুলি তরলে পরিণত হয় যথাক্রমে ২০, ৯০, ৭৭ এবং ৪.২ ডিগ্রি কেলভিনে। কিন্ত কেন এই মাপকাঠির সর্বনিম্ন বিন্দুটি 'চরম' শূন্য ? এর থেকেও শীতলতর কোনও অবস্থা কি হতে পারে না ?   না পারে না। কেন এই নিষেধ, সেই প্রসঙ্গে পদার্থের আরও একটা ভৌত ধর্মের কথা এখানে টেনে আনতে হবে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় তার নাম এন্ট্রপি (Entropy)। সাধারণভাবে বলা যায় এন্ট্রপি হ'ল কোনও পদার্থসমষ্টির অন্তর্নিহিত বিশৃঙ্খলার মাত্রা। দুটি পদার্থের মধ্যে যেটির তাপমাত্রা বেশি, সেটির এন্ট্রপি বেশি। কারণ তাপমাত্রা বাড়লে পদার্থের অণুগুলি চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাদের বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায।  তাপমাত্রা কমালে এনট্রপি কমে। কিন্ত এই এনট্রপির মান শূন্য হওয়া অসম্ভব - এ কথা পদার্থবিদ্যার অন্যতম সত্য।

অঙ্ক কষে দেখা গেছে এনট্রপির মান শূন্য হবে ওই চরম শূন্যে পৌঁছলে। এ ছাড়া ওই তাপমাত্রাতেও যদি কোনও পদার্থ গ্যাসীও অবস্থায় থাকতে পারে (বাস্তবে সব পদার্থ তার আগেই তরলে পরিণত হয়) তবে চরম শূন্য তাপমাত্রায় তা হবে আয়তনহীন - আরও এক অসম্ভব অবস্থা।

                             

                                                                                              লিয়ঁ  কুপার    

এখন বুঝতে পারা যাবে শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় পৌঁছানোর জন্য ক্যামারলিং ওনস্ কেন বেছে নিয়েছিলেন হিলিয়াম গ্যাস। সহজেই আন্দাজ করা যায় গ্যাসিও অবস্থায় যে কোনও পদার্থকণিকার গতিপ্রকৃতি এলোমেলো অর্থাৎ এনট্রপি থাকে বেশি। তাই এটাও বোঝা সহজ যে, যে-গ্যাস যত হাল্কা, তার এনট্রপি তত বেশি।সবচেয় হাল্কা গ্যাস হাইড্রোজেনকে বাদ দিয়ে হিলিয়ামকে বেছে নেওয়ার কারণ হ'ল - হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, ক্রিপটন ও জেনন্ - এই গ্যাসগুলো রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়। এদের পরমাণুর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ খুবই ক্ষীণ বা নেই বললেই চলে। আবার হিলিয়াম হাল্কাও বটে। পর্যায় সারণীতে হাইড্রোজেনের পরেই হিলিয়ামের স্থান। সুতরাং হিলিয়ামের এনট্রপি সবথেকে বেশি। উন্নত যান্ত্রিক উপায়ে ধাপে ধাপে হিলিয়াম পরমাণুগূলোকে ক্রমশ কাছাকাছি এনে এনট্রপি কমানো হতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত গ্যাস তরলে রূপান্তরিত হয়। তরলাবস্থায় হিলিয়াম টগবগ করে ফুটতে থাকে এবং তার তাপমাত্রা দাঁড়ায় ৪.২ ডিগ্রি কেলভিন।  যে ধরনের হিলিয়ামের কথা আলোচনা হচ্ছে তাকে বলা হয় হিলিয়াম-৪ অর্থাৎ তাদের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আছে দুটি করে প্রোটন ও নিউট্রন। হিলিয়াম-৪ এর আইসোটোপ (isotope) হিলিয়াম-৩, এটাতে একটি নিউট্রন কম আছে। কাজেই এটি হিলিয়াম-৪ এর থেকে কিছুটা হাল্কা। হিলিয়াম-৩ গ্যাস ব্যবহার করে সর্বনিম্ন যে তাপমাত্রায় পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে তার মান হ'ল ০.৪ কেলভিন। বলা বাহুল্য, প্রকৃতির ভান্ডারে হিলিয়াম-৩ এর উপস্থিতি খুবই কম। এর থেকেও কম তাপমাত্রায় পৌঁছতে হলে পদার্থের এমন কিছু ধর্ম খুঁজে বের করতে হবে যাকে নিয়ন্ত্রণ করে পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। হিলিয়ামের মতো গ্যাসিও পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় ওই পদার্থের বিশৃঙ্খল অণু-পরমাণুগুলোকে যান্ত্রিক উপায়ে পরস্পরের কাছাকাছি এনে এনট্রপি কমানো হতো। এরপর নেওয়া হ'ল ভিন্ন উদ্যোগ।  আয়রন অ্যামোনিয়াম অ্যালাম, ক্রোমিয়াম পটাশিয়াম  অ্যালাম এবং সিরিয়াম ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রেটের মতো কিছু লবণ আছে যেগুলোর প্রতিটি পরমাণুকে ধরা যেতে পারে একেকটি ক্ষুদে চুম্বক। এগুল সাধারণ অবস্থায় এলোমেলোভাবে থাকে। এটাও পদার্থের এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবই এই অবস্থার মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে। তরল হিলিয়ামের পরিবেশে যথোপযুক্ত দুই দেওয়ালবিশিষ্ট আধারে এই জাতীয় লবণ রেখে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে ক্ষুদে চুম্বকগুলো নিজেদের চৌম্বকরেখা বরাবর ঠিকমতো সাজিয়ে ফেলার জন্য যে শক্তি ব্যয় করে, তাতে তরল হিলিয়ামের তাপমাত্রা সামান্য কিছু বেড়ে যায়। আধারের দুই দেওয়ালের মধ্যে ঠান্ডা গ্যাস প্রবিষ্ট করিয়ে বর্ধিত তাপমাত্রা আবার নামিয়ে আনা হয়। এইবার চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাব সরিয়ে নিলে ক্ষুদে চুম্বকগুলো আবার এলোমেলো হয়ে যেত শুরু করে, কিন্ত তাতে যে শক্তি খরচ হয়, সেটা তরল হিলিয়াম থেকে সঞ্চয় করে। ফলে হিলিয়ামের তাপমাত্রার আরও কিছুটা হ্রাস হয়। এই পদ্ধতি ক্রমান্বয় চালিয়ে গেলে, তাপমাত্রা কমে দাঁড়াতে পারে এক কেলভিনের দশ লক্ষ ভাগের কাছাকাছি। অক্সফোর্ডের ক্ল্যারেনডন গবেষণাগারে প্রায় দুই দশক আগে ফ্রান্সিস সাইমন ও কুর্তি নিম্নতম যে তাপমাত্রা যে তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তার মান ছিল ০.০০০০০১ কেলভিন। পৃথিবীর বিখ্যাত গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা তাপমাত্রার নিম্নতম মানে পৌঁছবার জন্য বহুকাল ধরে যাবতীয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই তীব্র প্রতিযোগিতায় আপাতত সম্মুখবর্তীরা হলেন আমেরিকার কলোরাডোয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি গবেষণাগারের এম এইচ অ্যান্ডারসন, জে আর এনসার, এম আর ম্যাথুজ, সি ই ওয়াইম্যান এবং ই এ কর্নেল। তাঁদের শেষ পরীক্ষায় পাওয়া তাপমাত্রার মান দাঁড়িয়েছে ০.০০০০০০১৭ কেলভিন। বিজ্ঞান পত্রিকা 'সায়েন্স' এর ১৪ জুলাই '৯৫ সংখ্যায় এক বিজ্ঞান পত্রে তাঁরা প্রকাশ করেছেন তাঁদের গবেষণার ফলাফল। তাঁরা সামান্য কিছু রুবিডিয়াম পরমাণুকে ওই তাপমাত্রায় নামিয়ে এনে প্রমাণ করলেন কঠিন, তরল, গ্যাস ও প্লাজমা ছাড়া পদার্থের এক পঞ্চম অবস্থার অস্তিত্ব, মৌলিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন কন্ডেনসেট 

শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রার সামান্য তারতম্যে হিলিয়াম-৪ যে বহুরূপী ধর্ম প্রদর্শন করে সে ব্যাপারে সামান্য কিছু না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমরা দেখেছি যে ফুটন্ত হিলিয়াম-৪ এর তাপমাত্রা ৪.২ কেলভিন। বিশেষভাবে নির্মিত আধারে ওই ফুটন্ত তরলকে রেখে উন্নত ভ্যাকুয়াম পাম্পের সাহায্যে তরলের উপরিস্থিত বাষ্প টেনে সরিয়ে নিলে হিলিয়াম-৪ এর তাপমাত্রা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে। তাপমাত্রা ২.১৯ কেলভিনে পৌঁছলে, ফুটন্ত তরল হঠাৎই শান্ত চেহারা নেবে এবং তরলের উপরিতলকে মনে হবে কাচের মতো মসৃণ। আরও বায়ু টেনে নিতে থাকলে তরলটি আরও ঠান্ডা হবে কিন্ত উপরের তলে কোনোরকম নড়াচাড়া হবে না। এই তাপমাত্রাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'ল্যামডা পয়েন্ট', কারণ ওই তাপমাত্রায় তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটালে তরলটির তাপ ধারণ ক্ষমতার যে পরিবর্তন হয়, তার লেখচিত্রের সঙ্গে গ্রিক অক্ষর ল্যামডার হুবহু মিল আছে। এটা হিলিয়াম-৪ এর একটা বিশেষ অবস্থা। এই অবস্থায় তরলটির পরিবাহিতা অস্বাভাবিক বেশি ( সাধারণ তাপমাত্রায় তামার পরিবাহিতার ২০০ গুণ)। সব তরলের চলার পথে একটা পিছুটান বা বাধা থাকে, যাকে বলা হয় ভিসকোসিটি (Viscosity) বা সান্দ্রতা। যেমন জলের থেকে মধুর সান্দ্রতা অনেক বেশি। নতুন অবস্থার এই হিলিয়াম-৪ এর সান্দ্রতা আদৌ নেই। কাজেই যে পাত্রে রাখা হবে তার গা বেয়ে অনায়াসে উঠে আসবে। এই ঘটনাটাকে বলা হয় সুপারফ্লুয়িডিটি (Superfluidity) বা অতিতারল্য। বিজ্ঞানীরা এই ধরনের (২.১৯ কেলভিনের নীচের তাপমাত্রার) হিলিয়াম-৪ এর নাম দিয়েছেন 'কোয়ান্টাম ফ্লুইড' (Quantum fluid) কারণ কেবল কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকেই এই অচেনা স্বভাব ব্যাখ্যা করা যায়। এই বিষয়ে সফল গবেষণার প্রথম সারির বিজ্ঞানীরা হলেন রুশ বিজ্ঞানী পিটার কাপিৎজা (Peter Kapitza) ও লেও ল্যান্ডাও (Lev Landau) মার্কিন বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman)

৪.২ কেলভিন তাপমাত্রায় তরল হিলিয়ামের সংস্পর্শে সুপারকন্ডাকটার হিসেবে নায়োবিয়াম-টাইটেনিয়াম (NbTi) মিশ্র ধাতুর জুড়ি নেই। কারণ ওই পদার্থটিকে বিদ্যুতবাহী তারের আকার দেওয়ার কাজে প্রযুক্তিবিদরা বিগত এক দশক হ'ল হাত পাকিয়েছেন। কাজেই যথেষ্ট ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ প্রয়োগক্ষেত্রেই নায়োবিয়াম-টাইটেনয়ামের ব্যবহার হচ্ছে। কিন্ত সমাজসচেতন বিজ্ঞানীরা সবসময়ই চিন্তা করেন কীভাবে তাঁদের হিতচিন্তার ফসলকে অর্থনৈতিক অনুকূলতার সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগানো যায়। সেই উদ্দেশ্যেই দেশকালের ভেদাভেদ অগ্রাহ্য করে পৃথিবী জুড়ে গবেষণা চলছে এমন পদার্থ আবিষ্কারের, যা অতীব ব্যয়বহুল এবং দুষ্প্রাপ্য হিলিয়ামের পরিবর্তে অনেক সস্তা ও সহজপ্রাপ্য তরল নাইট্রোজেনের সংস্পর্শে অতিপরিবাহী চরিত্র বজায় রাখবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব যে যে-কোনও সুপারকন্ডাকটারকে তার ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রার দুই-তৃতীয়াংশ তাপমাত্রায় কাজ করানো নিরাপদ। সেই কারণেই নায়োবিয়াম-টাইটেনয়ামের ক্রিটিক্লাল তাপমাত্রা ৯ কেলভিনের কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও সেটিকে ৪.২ কেলভিনে তরল হিলিয়ামের সংস্পর্শে রাখা হয়। সুতরাং তরল নাইট্রোজেনের (তাপমাত্রা ৭৭ কেলভিন) সংস্পর্শে যে অতিপরিবাহী কাজ করবে তার তাপমাত্রা হওয়া উচিত ১২০ কেলভিন বা তারও বেশি। বেশ কিছু যৌগিক পদার্থ (বিশেষ করে সেরামিক জাতীয়) এই ধরনের উচ্চ তাপমাত্রায় অতিপরিবাহিতার চরিত্র প্রদর্শন করেছে। কিন্ত টেকনোলজির অভাবে তাদের ব্যবহারোপযোগী শিল্প-পণ্য হিসেবে রূপ দেওয়া যাচ্ছে না। উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাকটার উদ্ভাবনে কৃতিত্বের গবেষণার জন্য ১৯৮৭ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন জোহানস্ গর্গ বেদনোর্জ কার্ল অ্যালেক্স মুলার

যে কোনও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার অনেক ব্যবহারিক দিক। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞান ভিত্তিক কাজের গুরুত্বও বিচার করা হয় সেই কাজ থেকে আরও কত নতুন পথ খুলে যাচ্ছে সেটাকে কেন্দ্র করে। সুপারকন্ডাকটিভিটি এমনই একটি আবিষ্কার। আমরা আলোচনা করব সুপারকন্ডাকটারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে।

আজকের প্রগতিশীল দুনিয়ায় একটা দেশ বস্তু কণা ত্বরণ যন্ত্র (Particle Accelerator) তৈরির কাজে কতটা এগিয়ে আছে, তা দিয়ে মাপা হয় সেই দেশের প্রায়োগিক উন্নয়নের মাত্রা। কারণ ওই যন্ত্র তৈরি করে কাজ করাতে কয়েক হাজার রকমের পরস্পরনির্ভর সূক্ষ্ম এবং জটিল যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। মৌলিক বিজ্ঞান সাধনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই যন্ত্র ব্যবহারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ত্বরণযন্ত্রকে বলা যেতে পারে এমন এক ধরনের মাইক্রোস্কোপ যা ব্যবহার করে অণু-পরমাণু বা তার থেকেও আরও অনেক ক্ষুদ্র কণিকাদের (sub-nuclear particle) আচরণ অধ্যয়ন করা যায়। এ ছাড়া সেমিকন্ডাকটার তৈরির শিল্প , নিউক্লিয়ার মেডিসিন, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ, জীবাণুর, ফরেন্সক তদন্ত (ট্রেস এলিমেন্টের উপস্থিতি), ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ত্বরণযন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে।

উচ্চশক্তিসম্পন্ন বৃহদাকার ত্বরণযন্ত্রের তড়িৎযুক্ত পদার্থকণিকার নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রাখার জন্য কয়েকশ তড়িচ্চুম্বকের প্রয়োজন হয়। চুম্বকের তারের কুন্ডলীতে তড়িৎবাহী তার হিসেবে ব্যবহার করা হয় নায়োবিয়াম-টাইটেনিয়াম সুপারকন্ডাকটার। অপেক্ষাকৃত ছোট চুম্বকে ব্যবহার করা যেতে পারে নায়োবিয়াম-টিনের ( NbSn) টেপ। এই ধরনের বৃহদাকার ত্বরণযন্ত্র ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানে বেশ কিছু আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব দেশীয় প্রযুক্তি প্রয়োগ করে পঞ্চাশের দশকে আমাদের দেশে প্রথম যে ত্বরণ যন্ত্রটি তৈরি হয়, সেটির নির্মাণকার্জে পুরোধা ছিলেন স্বয়ং মেঘনাদ সাহা। সাহা ইনস্টিটিউটের রাজাবাজার ক্যাম্পাসে সেটির এখনও রাখা আছে। পরে তৈরি হয় সল্ট লেকের ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন। এ ছাড়াও মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে উচ্চশক্তিসম্পন্ন বৃত্তাকার একটি ত্বরণযন্ত্র নির্মাণের কাজ চলছে। তবে এগুলোর কোনোটিতেই সুপারকন্ডাকটিং টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়নি।

তাপমাত্রার পরম শূন্যে পৌঁছানো অসম্ভব। কিন্ত সেই তাপমাত্রাথেকে মাত্র এক ডিগ্রির তিরিশ লক্ষ ভাগের ব্যবধানে পৌঁছেছে জার্মানির এই বিজ্ঞানীরা

দেহ অভ্যন্তরস্থ প্রায় যে কোনও ত্রুটি পর্যবেক্ষণের জন্য সবথেকে আধুনিক যে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়, তাকে বলা হয় এম আর আই (Magnetic Resonance Imaging)। যে বৃত্তাকার বস্তুটি রোগীকে বেষ্টন করে থাকে, সেটি একটি শক্তিশালী তড়িচ্চুম্বক, যার কুন্ডলী তৈরি করা হয়েছে সুপারকন্ডাকটার ব্যবহার করে। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে সাধারণ তামার তারের কুন্ডলী ব্যবহার করা হলে একই চৌম্বকশক্তির জন্য কুন্ডলীর আকার হতো অনেক গুণ বড় এবং পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতশক্তিও খরচ হতো অনেকটাই বেশি।

                জন বার্ডিন                       রবার্ট  স্রিফার 

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাপজোখে সুপারকন্ডাকটারের ব্যবহার দিনে দিনে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ: সুদূর গ্রহ-নক্ষত্রের জগতে অনুসন্ধান চালাবার জন্য জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীরা (Astrophysicists) বহুকাল ধরে টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আসছেন। এগুলোকে বলা হয় অপটিক্যাল টেলিস্কোপ। অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্র থেকে ঠিকরে পড়া দৃশ্যমান আলোকের চরিত্র পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ব্রহ্মান্ডের বিবর্তনের ঘটনা জানবার চেষ্টা করেন। কিন্ত যে সমস্ত নক্ষত্রের বিকিরিত আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের থেকে বেশি তাদের ধরার উপায় কী ? উত্তর - রেডিও টেলিস্কোপ। মহাশূন্য থেকে ভেসে আসা রেডিও তরঙ্গগুচ্ছকে কেন্দ্রীভূত করবার ব্যবস্থা আছে এই রেডিও টেলিস্কোপে। অনেকটা স্টার টিভির প্রোগ্রাম দেখার জন্য উপবৃত্তাকার রুফ টপ অ্যান্টেনার। মতো। রেডিও টেলিস্কোপ হ'ল এই ধরনের একাধিক অ্যান্টেনার এক সুসজ্জিত বিন্যাস। প্রতিটি অ্যান্টেনার উপবৃত্তের ফোকাসে অর্থাৎ কেন্দ্রে রাখা থাকে বিকিরণ মাপার একটি ক্ষুদ্রাকার যন্ত্র,  যাকে বলা হয় ডিটেক্টর (detector)। সুদূর নক্ষত্র থেকে বিকিরিত রেডিও সিগন্যালের শক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সুপারকন্ডাকটিং টানেল ডিটেক্টর। বস্তুটির বিবরণ এবং কার্যপ্রণালীর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে প্রসঙ্গে যবনিকা টানব। একটি অত্যন্ত পাতলা (৮ থেকে ১০ অ্যাংস্ট্রম; ১ অ্যাংস্ট্রম = এক মিটারের হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ) অপরিবাহী বস্তুকে দু-টুকরো সুপারকন্ডাকটারের মধ্যে স্যান্ডউইচ করে সম্পূর্ণ জিনিসটাকে একটি বিদ্যুতবাহী বর্তনীতে (Electrical circuit) স্থাপন করা হয়। সাধারণ অবস্থায় বর্তনীতে কোনও বিদ্যুত প্রবাহ হয় না বললেই চলে, কারণ বিদ্যুতপ্রবাহে অপরিবাহীটি বাধা সৃষ্টি করে। কিন্ত বস্তুটির উপর ক্ষীণতম রেডিও সিগন্যাল আপতিত হলেই বিদ্যুতপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রবল হয়। এর মূলে আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম যা আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রেডিও সিগন্যাল আপতিত হওয়ার আগে সুপারকন্ডাকটারের ইলেকট্রনগুলো জোড়ায় জোড়ায় (Cooper pair)  নিজেদের পারস্পরিক বেঁধে রাখায় অপরিবাহীর বাধা ভেদ করার মতো যথেষ্ট স্বাধীন ইলেকট্রনের অভাব থাকে, কিন্ত কুপার পেয়ারের বেঁধে রাখার শক্তি অত্যন্ত কম হওয়ার ফলে ক্ষীণতম শক্তির রেডিও সিগন্যাল কুপার পেয়ারদের বাঁধন মুক্ত করে সুপারকন্ডাকটারে স্বাধীন ইলেকট্রনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। ফলে ইলেকট্রনগুলোর অপরিহার্য বাধা পেরনোর সম্ভাবনা বেড়ে গিয়ে বর্তনীতে বিদ্যুতপ্রবাহ হতে থাকে। বলা বাহুল্য বিদ্যুতপ্রবাহের মাত্রা নির্ভর করে রেডিও সিগন্যালের তীব্রতার উপর। 

অবাক লাগে প্রকৃতির বিশাল কর্মকান্ডে মানুষের অসাধারণ ভূমিকার কথা ভেবে। পৃথিবীর মাটিতে তার জীবন অনতিদীর্ঘ। গতিবিধির সীমানাও তার বাঁধা পৃথিবীতলেই। এমনকি যে পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে সে অভ্যস্ত তারও একটা সীমানা আছে। অথচ তার সন্ধানী মন ছুটে চলেছে স্থান, কাল, তাপমানের সব সীমানা অতিক্রম করে।

No comments: