যে প্রেম পরিণতি পেল না
আজ বৃষ্টিভেজা সকাল মনে করিয়ে দিল ৬/৭ বছর আগের এমনই এক ভোরের দিনটাকে ; কিন্ত তা ছিল রীতিমত বেদনাবিধুর। ওই সময় আমি ঢাকুরিয়া লেকে বেড়াতে যেতাম। তিরতির করে বয়ে যাওয়া লেকের দু'ধারে সবুজ গাছগাছালির মনোরম পরিবেশকে মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করতাম। ফেরার পথে পাঁচ-সাতজন সমবয়সীদের (ওখানেই পরিচয়, কারও নাম পর্যন্ত জানা ছিল না।) সঙ্গে দু'চার কথা গল্প করে বাড়ি ফিরতাম। যে সময়ে আমরা ওখানে আড্ডা জমাতাম, প্রায় একই সময়ে দুই কিশোর-কিশোরী হাত ধরাধরি করে বেড়াতে আসতো। হাত ধরাধরি করে হাঁটার আচরণে অশালীন কিছু চোখে পড়েনি। তারা সব মানুষের দৃষ্টি কেড়েছিল যে কারণে, তা হ'ল তারা প্রয়োজেনে সবাইকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। নিজের চোখে দেখা দুটো ঘটনার উল্লেখ করব।
ভারি চেহারার এক বৃদ্ধা একদিন হোঁচট খেয়ে পড়ে আর উঠতে পারছেন না। এই জুটি তাঁকে তুলে সামনের শাণের বেঞ্চিতে বসিয়ে পথচলতি মানুষের কাছ থেকে জলের বোতল চেয়ে নিয়ে মুখেচোখে ছিটিয়ে দিল। মেয়েটি তার ওড়না ভাঁজ করে হাওয়া দিতে লাগল। বৃদ্ধা একটু ধাতস্থ হলে, তাঁকে বলল, "চল দিদা তোমাকে আমরা বাড়ি পৌঁছে দি।"
বেশ কিছুদিন বাদের ঘটনাটা সত্যিই অবাক করার মত। আড্ডা শেষ করে লেক থেকে বেরোনোর ঠিক আগে জটলা দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। জটলার কাছাকাছি গিয়ে শুনলাম এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বেঞ্চি থেকে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলেন। আস্তে আস্তে ভিড় কমে যেতে দেখি সেই দুটি ছেলেমেয়ে বৃদ্ধের শুশ্রুশায় ব্যস্ত। ইতিমধ্যে ভদ্রলোক সুস্থ হয়ে মোবাইলে ফোন করে বাড়ির লোককে ডেকে পাঠালেন। ছেলেমেয়েদুটোকে বললেন, "তোমরা এখন যাও, আমি বেশ সুস্থ বোধ করছি এখন। কাছেই বাড়ি, বাড়ির লোক এক্ষুনি এসে যাবে।" ওরা তো নাছোড়। - তাহলে থাকো, কিন্ত জলের বোতলের আর দরকার হবে না। কৌতুহল দমন করতে না পেরে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের সঙ্গে তো সাধারণত জলের বোতল থাকে না ! মাসখানেক আগের ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলল, ঐ ঘটনার পর থেকে আমরা পালা করে বাড়ি থেকে জল নিয়ে আসি। আমি সত্যিই মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারিনি।
বর্ষা পড়ে যাওয়ায় লেকে যাওয়া বন্ধ করেছিলাম, কারণ বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে যেতে হয়। বর্ষা শেষ হতে আবার যাওয়া শুরু করলাম। পুরোনদের সঙ্গে আবার দেখ হ'ল। কিন্ত ওই ছেলেমেয়ে দুটোকে আর দেখা যাচ্ছিল না। বন্ধুদের ওদের কথা জিজ্ঞেস করাতে ওরা বলল, "বেশ কিছুদিন ছেলেটাকে একলা দেখার পর আর তাদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। লোকমুখে শোনা তারা নাকি দুজনেই ট্রেনে কাটা পড়েছিল।" মনটা খুবই ভারাক্রান্ত হয়ে গেছিল। যেদিন শুনলাম, সেদিনও ছিল আজকের মতো ঝিরঝিরে বৃষ্টির দিন।
আজ ঘুম থেকে উঠে মনে হ'ল একটা প্রেমের কবিতা লিখি। ৬/৭ বছর আগের ওই দিনের নায়ক-নায়িকাদের কথা মনে পড়ে গেল। এই ছোট্ট কবিতা তাই তাদের উৎসর্গ করে লিখছি।
তারা দু'টি মন, স্পর্শ করেছিল খ্যাতির শিখরে,
পেয়েছিল মানুষের অকৃত্রিম, অকৃপণ ভালবাসা,
জীবনেও এসেছিল অদম্য প্রেম
কিন্ত কোথাও হয়তো ছিল অপার শূন্যতা।
অবসাদে যেদিন দগ্ধ হ'ল দেহমন,
মুক্তি পেতে বেছে নিল বেহিসেবি জীবন।
একদিন যে জীবন রাঙিয়েছিল রামধনুতে
ফিকে হয়ে একদিন ঠেলে দিল মৃত্যুর পথে।
1 comment:
স্বপন কল্পনা বা সত্যি যেটাই হোক গল্পটা এবং কবিতাটা বেশ ভাল লাগল। কিন্ত অমি suicide করাটাকে কাপুরুষ তা মনে করি।
কবিতার প্রথম লাইনে শেষটা " খ্যাতির শিখরে" একটু বেমানান মনেহয়।
Post a Comment