Thursday, February 20, 2025

অনুদান

 বেটি বচাও, বেটি পড়াও অভিযান ভারতের একটি সামাজিক প্রচার অভিযান, যার লক্ষ্য হ'ল কন্যা সন্তানের জন্য কল্যাণমূলক পরিষবা প্রদানের দক্ষতা বৃদ্ধি তথা সচেতনতা সৃষ্টি। এই প্রকল্পটির জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রাথমিক তহবিলে প্রদান করা হয়েছিল। 

গত ১৬ জুলাই উত্তরপ্রদেশের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হঠাৎই "রেউড়ি সংস্কৃতি"-বিরূদ্ধে সবিশেষ সোচ্চার হন। তিনি বোঝাতে চান, যে ভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে মানুষের উৎসবাদিতে রেউড়ি (রেউড়ি হল গুড়-তিলের মিশ্রণের পাক করা এক ধরনের উত্তর ভারতীয় মিষ্টি) বিলি করা হয়, সেভাবেই বিরোধী দলগুলো সরকারি অর্থ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে এ দেশে "রেউড়ি সংস্কৃতির" আমদানি করছে। মোদ্দাকথা হল ভোট কেনার নামে ঘুষ দিচ্ছে। উক্তির মধ্যে কোথাও যেন একটা বিদ্রুপের গন্ধ আছে।

মুখ্যমন্ত্রী লাডলি বেহনা যোজনা হল মধ্যপ্রদেশ সরকারের একটি উদ্যোগ। এই যোজনার মাধ্যমে মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, স্বাস্থ্য, এবং পুষ্টির অবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।এই যোজনার সুবিধা: মাসিক আর্থিক সহায়তা. 

লক্ষ্মীর ভান্ডার  প্রকল্প 

 এটা হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারের মহিলা প্রধানদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মহিলাদের ক্ষমতায়ন করা এবং স্বাবলম্বী করানো

এ রকম গুজরাতের প্রকল্পের নামকরণ নমো শ্রী, ওড়িষায় সুভদ্রা যোজনা -তালিকা দীর্ঘায়িত করা অর্থহীন। কিন্ত সবাইকে পথ দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। 

লক্ষ করলে বুঝতে পারা যাবে যে, সব কটি প্রকল্পই হল মহিলাদের ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে করা। মনে রাখতে হবে যে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেখানো পথ, অর্থাত তারাই প্রথম শুরু করে। প্রত্যেকটি প্রকল্পকেই ভোটদাতাকে ঘুষ দেবার উদ্দেশ্যেই করা। পশ্চিমবঙ্গ একটু সম্মান জানিয়ে প্রকল্পের নামকরণ করেছে "লক্ষ্মীর ভান্ডার"

 এই অংশটুকু হল প্রবন্ধের মুখবন্ধ। এটা ঘিরেই আজকের আলোচনা। উচ্চ শিক্ষিত এবং উচ্চ পদস্থ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ( বহুদিন অবসর নিয়েছেন) কিংবা অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করা শিক্ষক, তাঁরা কেউ বলছেন এইভাবে বসিয়ে বসিয়ে খাইয়ে এই মানুষ গুলোকে পঙ্গু করে দিয়ে সরকার ভোট কিনছে। আমি তো জানি যে এই যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছেন তাঁরা দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কাকভোরে উঠে কলকাতায় এসে গায়ে-গতরে খেটে ৩/৪ বাড়িতে কাজ করে আবার সন্ধ্যের ট্রেনে বাড়ি ফিরছেন। মাস গেলে হাতে আসে মেরেকেটে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। যাঁরা রান্নার কাজ করেন না তাঁদের জোটে সাকুল্যে ৭/৮ টাকার হাজার মতো।

১৮/০৪/২৪ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা "দুর্নীতিগ্রস্ত, তবু ভোট পান" শিরোনামে হুগলি রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক, চিরদীপ মজুমদারের লেখা একটি প্রবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওঁর কথাতেই লেখাটির সারমর্ম পাঠকের সামনে তুলে ধরছি।

সদ্য শেষ হওয়া দিল্লি নির্বাচনের ফল প্রকাশের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা। এই নির্বাচনের প্রচারে দুর্নীতি নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছিল। আম আদমি পার্টি (আপ) সরকারের আবগারি ও অন্যান্য দুর্নীতির কথা বিজেপি প্রচার করে; আপ-ও পোস্টার ছাপিয়ে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে। এর পরে দু'পক্ষই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির খেলায় নামে। ভোটের ফল দেখাল, বিজেপির প্রতিশ্রুতি ভোটারদের বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। কারণ তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে অনুদানের অঙ্কটা বেশি ছিল।

ভোটদানের হারে স্পষ্ট যে, দিল্লির উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের একটা বড় অংশ ভোটের দিন বুথমুখী হননি। স্পষ্টতই বিজেপির আশ্বাস আপ-এর মূল ভোটব্যাঙ্ক ও গরিব ও নিম্নবিত্ত মন ছুঁয়ে গেছে। একে অপরের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির প্রচার গৌণ, প্রতিশ্রুতির প্রচার মুখ্য হয়েছে। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে, অথচ ভোটে তার প্রভাব পড়ে না! অর্থাত দুর্নীতি ও মানবিকতার মেলবন্ধন অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্ত এটা কি করে সম্ভব।  একটু কাটা-ছেঁড়া করে দেখা যাক:

 দু'টো সম্ভাব্য ব্যাখা হতে পারে। (১)  উপরতলার রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির খবর নীচের তলার সাধারণ ভোটারের কানে পৌঁছোয় না। রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অভাব থাকলে বা মিডিয়া যথেষ্ট কার্যকর না হলে এই সম্ভাবনা আরও বাড়ে। কিন্ত যে রাজ্যে "এবিপি আনন্দ"-র মতো অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিক সংস্থার (Investigative journalism agency) উপস্থিতি, সেখানে এই সম্ভাবনা প্রায় নেই। কাজেই আরও একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্য আছে (২) দুর্নীতির সঙ্গে মানুষের আপস করে নেওয়ার মানসিকতা। যদি সরকারি সুযোগসুবিধা বা গণবন্টনের প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা বা দল সহায়ক হয়, যেটা এ রাজ্যের শাসক দলের মধ্যে কেউ কেউ হয়েছেন, তবে ভোটাররা তাঁকে ভোট দিতে দ্বিধা করেন না। 

এই রাজ্যের কথা ছেড়ে এবার তথ্যের ভিত্তিতে সমীক্ষার ফলাফল দেখে নেওয়া যাক সারা ভারতবর্ষ জুড়ে শুধু এ রাজ্যের সরকার-ই দুর্নীতিগ্রস্ত, না কি অন্যান্য দলও আছে!

বিশ্বব্যপী ৬৬ টি দেশে করা সমীক্ষার অঙ্গ হিসেবে ২০২৩ সালে ভারতের ৮টি রাজ্যে এই সমীক্ষা করা হয়। উত্তরদাতাদের কাছে দুর্নীতির মাত্রা সম্বধে মতামত চাওয়া হয়- ভারতে দুর্নীতি নেই মনে করলে উত্তরদাতা '১' বলবেন, এবং সর্বোচ্চ হারে দুর্নীতি আছে মনে করলে '১০' বলবেন। দুর্নীতির মাত্রা এর মধ্যবর্তী কোনও একটি স্তরে আছে বলে মনে করলে ২ থেকে ৯ এর মধ্যে যে সংখ্যাটি মানানসই বলে মনে হবে, সেটি বলবেন উত্তরদাতা। দেখা গেল, এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সব উত্তরদাতার দেওয়া নম্বরের গড় ৭.৭। অর্থাত, মানুষ মনে করেন যে, দেশে দুর্নীতির প্রভাব ও বিস্তার যথেষ্ট। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রা ৩১% পুরোপুরি ১০ দিলেন; অর্থাত, তাঁদের মতে, ভারতে দুর্নীতি লাগামছাড়া। ১ থেকে ৫ এর মধ্যে নম্বর দিলেন মাত্র ১৬% উত্তরদাতা; ৬ থেকে ১০- এর মধ্যে নম্বর দিলেন বাকি ৮৪%।

এই তথ্য থেকে আমরা কি বুঝলাম! ৮৪% শতাংশ ভোট দাতাদের মধ্যেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব রকম রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ আছেন। এ রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দল তৃণমূল আর বিজেপি। কংগ্রেস, বামফ্রন্ট আর আই এস এফ কে আলোচনার মধ্যে আনছি না। কারণ মানুষ তাঁদের বহুদিন আগেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্ত তাঁদের কিছু সমর্থক তো ওই ৮৪% শতাংশের মধ্যেই আছে। অন্তত অঙ্ক তো তাই বলছে। আগেই প্রমাণ পাওয়া গেছে যে দুর্নীতি আর তথাকথিত মানবতা হাত ধরাধরি করে চলে। এখন তথ্য থেকে বোঝা গেল, যে দুর্নীতি অল্প-বিস্তর প্রত্যেক দল এবং তাদের সমর্থকদেরও আছে। অ্যাডভান্টেজ সব সময়ই শাসক দল, সে যে দলই শাসনে থাকুন না কেন। কারণ তাঁদের হাতে সরকারি প্রশাসন। 


 


 

Monday, February 17, 2025

রাষ্ট্রপ্রধানদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন।

 


রাষ্ট্রপ্রধানদের একটা ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা উচিত যাতে নাকি তাঁরা পৃথিবী নামক এই গ্রহের উপর কি ঘটে চলেছে সে ব্যাপারে একটা সম্যক ধারণা জন্মায়। সেজন্য common sense থাকাটাই যথেষ্ট, যা তথাকথিত বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে খুবই uncommon.

বিশ্বের জলবায়ু পরিস্থিতি রীতিমত উদ্বেগজনক। বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের ২০১৫-র জলবায়ু সম্মেলন,  'কনফারেন্স অব দি পার্টিজ' বা সি ও পি- ২১ বা সংক্ষেপে "কপ"-এ স্বাক্ষরিত হয় প্যারিস পরিবেশ চুক্তি, যার শরিক হয় এই গ্রহের ১৯৬ টি দেশ। 

মূল লক্ষ্য, দুনিয়ার গড় তাপমাত্রাকে প্রাক শিল্প যুগের আগের তুলনায় দেড় থেকে দু'ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশির সীমারেখায় বেঁধে রাখা যায়। তার জন্য প্রয়োজন জীবাস্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমশ কমিয়ে ফেলা, তা হলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমে যাবে। কয়লা বা খনিজ তেলের মতো অনেক যুগের মরা ধন, পৃথিবী যাকে কবর দিয়ে রেখেছে, তা বার করে অনেকটাই মেটানো হয় দুনিয়ার শক্তির প্রয়োজন। একে বর্জন করা আদৌ সহজ নয়। তবে বিকল্প শক্তির কথা ভাবার এটাই আদর্শ সময়, এবং একই সঙ্গে উপযুক্ত পরিকল্পনার। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি - দুনিয়া জুড়ে এই সব অপ্রচলিত পরিচ্ছন্ন শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের অর্থ। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল  দেশগুলোকে এই অর্থ জোগাতে হবে ধনী দেশগুলোকেই। কারণ, সে  ক্ষমতা তাদেরই আছে। বর্তমানে সল্পন্নতো দেশ হিসেবে বিবেচিত হয় দক্ষিণ সুদান, চাদ, নাইজার, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং বুরুন্ডি। সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভাবে, এবং এখনও গ্রিনহাউস গ্যাসের মাধ্যমে দুনিয়াকে বিষিয়ে দেওয়ার সিংহভাগ দায় তো তাদেরই। বাৎসরিক সিওপি সম্মেলনে তাই অর্থের জোগান নিয়ে দড়ি টানাটানি চলে ধনী-দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে।

পৃথিবীর স্বার্থপরতম দেশের নাম হল আমেরিকা। ওই দেশটা নিজেদের ভাল ছাড়া আর কারও ভাল চায় না। প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের তারতম্যে মাত্রা কম-বেশি হয়। যেমন জর্জ বুশের আমলে তিনি বলেছিলেন, "আমাদের দেশের মানুষকে কষ্টে থাকতে দিতে পারিনা, ফলে আমাদের অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন" যার অর্থ দাঁড়ায় যে তারা গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে যাবে, আর সারা বিশ্ববাসী তার ফল ভোগ করবে, তারাও যে তার প্রভাব থেকে মুক্তি পাবে, এমনটাও নয়। এমন বুদ্ধির পরিচয় দিয়েই তিনি দু'টি টার্ম চালিয়ে গেছেন, ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে পারেননি। পাকিস্তান আর্মির ঘেরাটোপে আবোতাবাদে লুকিয়ে কাটিয়ে দিল নিশ্চিন্তে। এরপর ওবামার সরকার চলল পরপর দু'টো টার্ম ২০০৮-২০১৭। লাদেন ধরা পড়ল এবং তার বিচার হল ওবামার আমলেই। পরের চার বছর শুরু হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানা। ট্রাম্প অবশ্য জলবায়ু বিপর্যয়কে 'নিছক গুজব' বা 'গল্পকথা' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বহুবার। এ হল সেই ট্রাম্প, যিনি কোভিদ ভাইরাসের নিদান হিসেবে রোগীকে জীবাণুনাশক ইঞ্জেকশন দেবার উপদেশ দিয়েছিলেন। আরও কীর্তি আছে ট্রাম্পের ঝুলিতে। আমেরিকার ইতিহাসে তিনিই প্রথম কোনও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, যাঁকে ৩৪ দফা ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছিল নিউ ইয়র্কের এক নিম্ন আদালত। এই হ'ল আমেরিকার ভাবী প্রেসিডেন্টের পূর্বতন ইতিহাস, একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধানদের বুদ্ধির দৌড়। আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন দুঁদে ব্যবসায়ী। আর আমেরিকার সঞ্চিত জীবাস্ম জ্বালানির পরিমাণ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিতে, তিনি চান না, ওই দেশের অর্থ কোনও বাজে কাজে ব্যয় হয়। ফলে ২০১৭ তে প্রথম বার রাষ্ট্রপতি  হয়েই ট্রাম্প আমেরিকাকে বার করে আনেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে। কারণ, তাঁর মতে, এই চুক্তিতে আমেরিকার পুরো লোকসান।  এর ফলে আমেরিকাকে 'অহেতুকই' প্রচুর ডলার জোগাতে হচ্ছে রাষ্ট্রপুঞ্জের ভান্ডারে। আমার কলেজের এক বান্ধবী অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ওই দেশটিতে বসবাস করছেন। স্বভাবতই তাঁরা সেই দেশের নাগরিক, যদিও  ব্যক্তিগত ভাবে আমি তাঁদের দু'নম্বর নাগরিক বলেই মনে করি।  সদ্য শেষ হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অব্যবহিত পরে সে আমাকে একটা ছবি পোস্ট করে। ছবিটিতে দেখাচ্ছে যে একটা আবর্জনার ট্রলিতে দাঁড়িয়ে আছেন জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস, আর সেটিকে ঠেলে দিচ্ছেনট্রাম্প। এরপর কুশল বিনিময়ের ছলে টেলিফোনে কথা বলে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চায়। ট্রাম্পের নির্বাচন ফলাফলে আমার বিরূপ মন্তব্যে সে আমাকে অনেক জ্ঞানগর্ভ উপদেশ দিল, যার সারমর্ম "ট্রাম্প এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে মডেল অনুসরণ করবেন তাতে আমেরিকান মানুষ ভাল থাকবে"। এরপর আর কথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি হয়নি আমার। তবে মনে হয়েছে যে তৃতীয় বিশ্ব থেকে একজন "তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত " মানুষ ঐ দেশে বসবাস করে, মানসিকতা কি ভাবে পাল্টে ফেলেছে। আমার পরিচিত আত্মীয়দের এক-আধজন ওই দেশটিতে গিয়ে কালচার শক কাটাতে না পারায়, প্রথম ছ'মাস আমেরিকানদের বাপ-বাপান্ত করত। তারপর বুঝেছিলাম হয়তো যে ওই দেশের মাটি হল একটা ফাঁদ, যার নাম ডলার। ওই ফাঁদের আবর্তে একবার ঢুকে পড়লে আর বেরোনো যায় না। ফাঁদের আরও একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ দেওয়া যাক। বছর ৭/৮ আগে, ট্রাম্প তখন সদ্য ক্ষমতায় এসেছে। কানশাস রাজ্যের ওলাথে নামে একটা জায়গায় একটি রেস্তোরাঁয় শ্রী নিবাস কুচিবোটলা নামে এক ভারতীয় ছাত্র তার স্ত্রী আর দু'একজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে খেতে ঢুকেছিল। হঠাৎই, আমেরিকান নেভির এক সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অফিসার,অ্যডাম পিউরিনটন. হাতে বন্দুক উঁচিয়ে তার দিকে তেড়ে গিয়ে হুমকির সুরে বলে, "Get out of my country" নিজেকে কোনও রকম সুরক্ষিত হবার সুযোগ না দিয়ে, কালক্ষেপ না করে শ্রী নিবাসের মাথা থেকে পা পর্যন্ত গুলিতে ঝাঁঝরা করে তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। দুঃখের বিষয় হল এর পরেও শ্রী নিবাসের স্ত্রী ওই দেশেই থেকে যায়। আমেরিকার মাটি ফাঁদ ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি?

ফিরে আসি প্রসঙ্গে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুননির্বাচন, বাকুতে অনুষ্ঠিত সিওপি২৯ সম্মেলনকে পূর্ণগ্রাসের মতো যে আঁধারে ঢেকেছে, তা বলাই বাহুল্য। বোঝাই যাচ্ছে, প্যারিস চুক্তি থেকে পৃথিবীর ধনীতম এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ আমেরিকার সরে যাওয়াটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা যদিও, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হয়ে তাঁর কার্যকালের প্রথম দিনেই আমেরিকাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন প্যারিস চুক্তির চৌহদ্দিতে। আমেরিকার জীবাস্ম জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে আবার বার করে আনার কথা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প হইহই করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় সিওপি২৯ সম্মেলনটি।

ওভাল অফিসের দায়িত্ব নেবার অব্যবহিত পরেই তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা। ২০১৭ সালের মতই এবারও তিনি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে আমেরিকাকে প্যারিস চুক্তি থেকে বার করে এনেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সরে এসেছেন। 

আমরা এক চরম জলবায়ু যুগে বাস করছি - আমাদের চার পাশে বিপর্যয় ঘটে চলেছে। কিন্ত এর সমাধানে যথেষ্ট চেষ্টা করছি না। আমরা একে অস্বীকার করছি না, কিন্ত এক সর্বজনীন স্বার্থে একযোগে কাজ করার মতো সমাজ হিসেবেও আর আমরা গড়ে তুলছি না। এই কারনেই আজারবাইজানের বাকুতে ২৯তম কনফারেন্স অব পার্টিজ-এ আমরা এক যৌথ সহযোগী বিশ্ব গড়ে তোলার ইচ্ছাপ্রকাশের ভানটুকুকেও ঝেড়ে ফেলে দিলাম। ধনী বিশ্ব সরকারি ভাবে জলবায়ু-অনুদানের নামে সামান্য খুদকুঁড়ো ছুড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এবং ঐতিহাসিক ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী এই বিশ্ব জানাল, অপর যে বিশ্বকে কার্বন-হীন উন্নয়নের পথটি নতুন করে ভাবতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে এবং ক্ষতির ধাক্কা সয়ে বেঁচে থাকতে হবে। এটা অপমান বইকি!

 এইখানেই অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন আর রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তা এক সমৃদ্ধতর এবং নিরাপদতর বিশ্ব গড়ে তুলবে। দেশগুলো পরস্পরকে আক্রমণ করবে না, কারণ নিজেদের স্বার্থেই তারা সহযোগিতার পথে থাকবে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন-এর আমলে আমেরিকায় পাশ হয় ঐতিহাসিক "ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট", যার ফলে অন্তত ৩৯০ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ করা হয়েছে বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি ইত্যাদি বিকল্প পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎপাদনে। ২০২৪-এর আমেরিকার ভোটটা যেন তাই এক অর্থে ছিল শক্তি উৎপাদনের দুই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী নীতির টক্করও। ভোটে জয়-পরাজয় কোনও একটা বিচ্ছিন্ন বিষয়ে নির্ধারিত না হলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকার জনতা কিন্ত বেছে নিয়েছে ট্রাম্পকে। Non white ভোটারের সংখ্যাও, ভারতের অভিবাসীর সংখ্যা যুক্ত করে নেহাতই কম নয়, প্রায় ছয় মিলিয়ন। এতেই বুঝতে পারা যায় যে আমেরিকায় বসবাস করে তাঁরা নিজেদেরকে কতটা পাল্টে ফেলেছে।





Monday, February 10, 2025

স্বাক্ষরতা বনাম প্রকৃত শিক্ষিত

   


                   স্বাক্ষরতা বনাম প্রকৃত শিক্ষিত 

অনেক বছর আগে যখন ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দা হই, তখন সুবিধে-অসুবিধের কথা ভেবে, মনে হয়েছিল ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকা বেশ নিরাপদ এবং সুবিধের। মাসে-মাসে রক্ষণাবেক্ষণের টাকাটা চুকিয়ে দিলেই ল্যাটা চুকে গেল। সেই সময় আমার পুরোনো পাড়ার ২/১ জন বন্ধু বলেছিল, "ফ্ল্যাট সিস্টেমের বাড়িগুলো এক-একটা vertical slum, মানে উল্লম্ব বস্তিবিশেষ। খেয়োখেয়ি ঝগড়া লেগেই থাকে। । সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য মানুষ অনেক নিচে নামতে পারে। একটু আঘাত পেয়েছিলাম। আজ ৪০/৪২  বছর পরে এসে বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল যে, সে কতটা দূরদর্শী ছিল। হালের কিছু অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়া যাক। 

 আর্থিক উপার্জনের তারতম্যে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরাই সাধারণত ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাস করেন। উচ্চ মধ্যবিত্তের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের তফাত ঊনিশ-বিশের। কিন্ত যাঁরা অর্থনৈতিক কৌলিন্যে সামান্য এগিয়ে থাকেন তাঁদের শরীরী ভাষা এবং কথ্য ভাষার ঝাঁঝ এতই কদর্য যে আবাসনের মিটিং-এ প্রতিবেশীর অনিচ্ছাকৃত অসাবধানতায় সংলগ্ন ফ্ল্যাটের সামান্য ক্ষতির জন্য যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ শানানো যায়, তা না শুনলে বিশ্বাস করা যায় না

আমার মনে হয় অর্থের বিস্তার চিন্তার পরিধিকে ছোট করে আনে, মননের পরিধিকে খর্ব করে। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত সমাজের থেকে উঠে আসা সমাজের মানুষের অভদ্রতা ও অবজ্ঞার নিজস্ব ভাষা আছে। এই শেষের শ্রেণীভুক্ত হাতেগোনা মানুষগুলোর চালচলন দেখলে বুঝতে পারা যায় যে তাঁরা সবসময় প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্যের সাফল্যের  কথা ভেবে একটা গোপন প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাগ্যিস হাতেগোনা, তাই সমাজটা এখনও নরক হয়ে যায়নি।

এই হাতে গোনা বিত্তবান মানুষের বাড়িতে ঢুকলেই বুঝতে পারা যায় অর্থানুকুল্যের ছাপ এবং একই সঙ্গে দুর্গন্ধ। আধুনিক আসবাবপত্রে মোড়া। এমনকি ফ্ল্যাটের কিছুটা অংশ ফলস্ সিলিং-এর। তার অদৃশ্য ফাঁকফোঁকর দিয়ে ঠিকরে পড়ছে আলো। কিন্ত তাঁদের বাড়িতে বই রাখার কোনও আলমারি চোখে পড়ে না। দৈনিক খবরের কাগজও তাঁরা পড়েন বলে মনে হয় না। আসলে স্বাক্ষরতা, আর প্রকৃত শিক্ষিত মানসিকতার মধ্যে অনেক তফাত। সাক্ষর প্রায় সবাই, কিন্ত ক'জনই বা শিক্ষিত। কাগজে কলমে উচ্চ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ঘরে ঘরে, কিন্ত তাঁরা কি প্রকৃত শিক্ষিত! Very few are educated, What we see most, are literate. এই ব্যাপারটা ঠিক বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় না, বাহ্যিক ব্যবহারে এর প্রকাশ পাওয়া যায়। যে হাউজিং ফ্ল্যাটগুলো একটা বড় কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে, তাদের বাসিন্দাদের মধ্যে এই ধরনের মানসিকতা চোখে পড়ে না। কিন্ত একটা ১০/১২/১৫/ বা ২০ আবাসিকদের আবাসনে এই ধরনের ঝামেলা লেগেই থাকে।

                    Educated vs Literate


Many years ago, when I lived in an apartment building, I thought about the pros and cons, and thought living in a self contained flat was quite safe and secured. As soon as my monthly dues are cleared, I felt peace in mind. At that time, a few of my friends of old neighborhood said, "The houses in the flat system are like vertical slums. There are constant quarrels. People can stoop very low for narrow interests." I was a little hurt. Today, after little more than four decades, I remembered my friend's words and how far-sighted they were. Let's share some recent experiences.


In terms of financial income, people from the middle and upper middle classes usually live in flats. The difference in economic inequality among the upper middle class is few and far between. But the body language and spoken language of those who are slightly ahead in economic status are so ugly that it is hard to believe the obnoxious and heated exchange among members used in housing meetings for minor damage to the adjacent flat due to unintentional carelessness of a neighbor.


Wealthy people are narrow minded in general. I think the wealth narrows down the thought process. Another thing I have noticed is that the people of the society that emerged from the so-called enlightened society have their own language of rudeness and contempt. If you look at the behavior of these handful of people belonging to this last category, you can understand that they are always carrying on a secret competition and showcases one upmanship with their neighbors, thinking about the success of their economic well-being. Fortunately, they are handful, so the society has not yet become hell.

As soon as you enter the homes of these few so called wealthy people, you can sense the impression of wealth and at the same time its stench. They are covered with modern furniture. Even some parts of the flats have false ceilings. Light shines through the invisible gaps. But there is no cupboard to keep books in their homes. They do not even seem to read the daily newspaper. In fact, there is a big difference between literacy and a truly educated mindset. Almost everyone is literate, but how many are educated? The number of highly educated people on paper and pen is in every house, but are they truly educated! Very few are educated, What we see, most are literate. This matter cannot be understood with the intellect, it is expressed in their apparent behavior.  This kind of mentality is not seen among the residents of housing flats that are in a large complex. But in a housing complex with 10/12/15/ or 20 residents, such problems persist.