শিখা,
দু'দিন আগেই চিঠিটা লিখে ফেলতে বাধ্য হলাম। কারণ গত কয়েকটা দিন দুজনেরই ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে কাটছে, তাইতো! হ্যাঁ, তারিখটা আমার ভালই মনে আছে। ১৯৭২ সালের ওই দিনটায় গাঁটছড়া বাঁধার পর, প্রতি বছরই নিয়মিত, ছোটখাট হলেও, কোনো না কোনো অনুষ্ঠান করে পালন করি। আর বাড়িতে বৌ আসার পর তারা-ও আর একবার পালন করে। এখন নাতি-নাতনি সেই দলে যোগ দিয়েছে।
এটাই বোধহয় তোমাকে লেখা আমার শেষ চিঠি। চিঠি লেখালেখি তো যৌবনে অজস্র হয়েছে। ১৯৭২-১৯৭৫। এই সময়টায় টানা তিন-চার মাসের বেশি আমাদের সংসার করা সম্ভব হয়নি। কারণ, তখন আমার প্রায় বার-চারেক দেশ থেকে বিদেশ আর বিদেশ থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পালা চলছে। বিয়ের পরপরই চলে গেলাম ৭/৮ মাসের জন্য মস্কো আর পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশ। মানুষের পায়ে লোহার বেড়ি পরানো দেশ। তোমার পাঠানো গোছা গোছা চিঠি ভারতীয় দূতাবাস ঘুরে আমার হাতে এসে পৌঁছাত। আমার অবাঙালি সহকর্মীরা রসিকতা করে বলতো, "আরে ভাই চিঠ্ঠি তো দে দাদাকোই মিলতা হ্যায়।" আমি জানি আজ ৫০ বছর বাদেও চিঠির সেই গোছা তুমি সযত্নে রেখে দিয়েছ। কিন্ত সেই চিঠিগুলোর মধ্যে ছিল কল্পরাজ্যের নায়ক-নায়িকার গল্প। রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি হলাম তো ১৯৭৬ সালে কলকাতা ফেরার পর থেকে। কে জানে, মাঝবয়সে সাহিত্য করার বীজ বপণের সূত্রপাত হয়তো সেদিনের চিঠির আদান-প্রদানেই অঙ্কুরিত হয়েছিল। উপলব্ধি করেছিলাম এক মহান সত্য। সাময়িক বিচ্ছেদ নৈকট্য বাড়িয়ে তোলে।
পাঁচ দশক আগে আসা এই দিনটা মনে রাখার জন্য আমাকে স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে যেতে হয়নি। এটা স্বতঃস্ফূর্ত। তাইতো ২০২১ সালের মার্চ মাস পড়তেই আমার মনে আজকের দিনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছিল। যে কথাগুলো লিখব, সেগুলো পারস্পরিক রোমান্টিসিজমের এক একটা মাইল স্টোন মুহূর্ত। বুঝেছিলাম অভাবের সংসারেও রোমান্স থাকে।
আজ মনে হচ্ছে, এই তো সেদিন মাহেন্দ্রযোগটা ঘটে গেল। সেই মননে রোমান্সের উন্মেষ। সবাইকার সামনে অথচ সকলের অলক্ষ্যে। কলেজ জীবনের দুষ্টুমিগুলো তখনও মনের আনাচে কানাচে ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে পড়ছে !! মঙ্গলঘটের ওপরে হাতে হাত পড়ার পরেই শিহরণ। পুরুতঠাকুর গামছা রেখে ফুলের মালা দিয়ে হাত বেঁধে দিলেন। দু-হাত মিলে গেল। মন্ত্র পড়া শুরু। সেদিকে আমার মন নেই। ইচ্ছে করছে ছ-মাস আগে দেখা বড় বড় টানা টানা চোখ দুটো দেখব কখন। মাথায় বুদ্ধি এসে গেল। দিলাম একটা রাম চিমটি !! ব্যস, তুমি হাসিমুখে চোখ তুলে ইসারায় দুষ্টুমিটাকে প্রশ্রয় দিলে। নিষিদ্ধ কিছু করার মধ্যে একটা অন্য রকম আনন্দানুভূতি অনুভব করলাম। মোদ্দাকথা শুভ দৃষ্টির আদান-প্রদান, আনুষ্ঠানিক শুভ দৃষ্টির আগেই সকলের অজান্তেই ও অলক্ষ্যে হয়ে গেল। রোমান্সের প্রথম মুহূর্ত এবং মূর্ছনাও বটে। আজকের দিনের দাদাগিরি reality show, Googly round-এ এমন একটা প্রশ্ন হতেই পারে, " কী করে সবার অলক্ষ্যে শুভদৃষ্টি হওয়া সম্ভব?" বিয়ের পর তো এক সপ্তাহের মধ্যেই বম্বে চলে গেলাম। এর মধ্যেই একদিন বেরিয়ে পড়ে গড়ের মাঠে বসলাম। হঠাৎ Firpo Hotel-এর দিকে নজর যেতেই মনে হ'ল ওখানে বসে একটু চা খাওয়া যাক। পকেটে ৫০ টাকা। বাস ভাড়া ১০ পয়সার যুগে যথেষ্ট।
২/৩ মাস বাদে তুমি বম্বে আসার পরে অভাব অনটন থাকলেও দু'জনের সংসারে টুকরো টুকরো রোমান্সের মুহূর্ত অনেক বারই এসেছে। সায়ন পাহাড়ে ওঠা, জুহু বীচে বেড়ানো, মেরিন ড্রাইভে সমুদ্রের ধারে বসে চিনে বাদাম খেতে খেতে আড্ডা, ছুটির দিনের এক বিকেলে পাওয়াই লেক ঘুরে আসা। week-end-এ হিন্দী সিনেমা দেখা, এই ছোটো ছোটো চাওয়া পাওয়ার মধ্যেই তখন ভালবাসা আর বিশ্বাসের শেকড় উর্বর মাটি পেয়েছে। আর আজ গ্লোবালাইজেসনের যুগের তথাকথিত মধ্যবিত্ত বিবাহিত যুবক-যুবতীর প্রেম-ভালবাসায় চিত্তের থেকে বিত্তের ঘোষণাই বেশি চোখে পড়ে। তাই এত Gift লেনদেনের হিড়িক। মাঝে মাঝে অফিসে, মানে TIFR-এ নিয়ে চলে আসতাম। Library lounge-এ বসে তুমি magazine পড়তে। Lunch-এর সময় আরব সাগরের কোলে West Canteen-এর কন্টিনেন্টাল লাঞ্চ খাওয়া সেরে তুমি আবার চলে যেতে লাইব্রেরি লাউঞ্জে। অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে Gateway of India আর তাজমহল হোটেল লাগোয়া সমুদ্র সৈকতে কিছুটা সময় কাটিয়ে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস থেকে লোকাল ট্রেন ধরে ছোট্ট কুটিরে ফিরে আসতাম।
১৯৭৯, ২১ শে মে। আমাদের কাছে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পারস্পরিক বোঝাপড়ায়, ওই দিনটাতে তুমি আমাকে উপহার দিলে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আমাদের একমাত্র সন্তানের জন্ম হ'ল। এর আগে সাড়ে তিন বছরে তুমি কলকাতার অনেকগুলো নার্সিংহোম দেখে ফেলেছো। তোমার গর্ভে বেড়ে ওঠা ৩/৪ টে অঙ্কুরিত প্রাণের বলি হয়ে গেছে। আমরা দুজনেই মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত। তুমি শারিরীক ভাবেও বটে। সম্পূর্ণ দিশেহারা অবস্থা। বিবাহিত জীবনের ওই সময়টাতে অনেকটাই অন্ধকার মিশে আছে। অতৃপ্তির মর্মবেদনা আমাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে আর চোখেমুখে শ্রাবণ ঝরিয়েছে। ওই সময়টাতে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। অনেক বছরের চেনা মানুষগুলোকে একেবারে অচেনা লেগেছিল। সংবেদনশীল মানুষই কিন্ত মানসিকভাবে আঘাতপ্রবণ। কাজেই ধাক্কাটা বড় জোর লেগেছিল। তাইতো আজও মনে আছে। তবুও কলকাতা ফেরার পর থেকে সব কিছু মানিয়ে নিয়ে, আজ পর্যন্ত আমাদের এত বড় পরিবারের যাবতীয় সামাজিক দায়-দায়িত্ব নিয়ম নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। বৃহত্তর পরিবারের পাশে সাধ্যমত দাঁড়িয়েছি। আসলে জীবন হ'ল বহতা নদী। সেখানে স্রোতের পর স্রোত আসে। কোন ঢেউ দীর্ঘস্থায়ী, কোনোটা আবার ক্ষণিকের। আমাদের একমাত্র সন্তান সব আঘাত ভুলিয়ে দিয়েছে। আমরা যথার্থ কোলে পিঠে করে তাকে বড় করে তুলেছি। শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াও সে একজন ভাল মানুষ হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত।
২৭ বছর বয়স পার হবার আগেই তার মতামত নিয়েই বিয়ের প্রস্তুতি সেরে ফেললাম। সুশ্রী, সুচারু অমৃতাকে দেখে, ওর পরিবার দেখে আমরা তাকে বরণ করে নিলাম। নামের মধ্যেই ওর সহবৎ আর লক্ষীশ্রী স্বভাব লুকিয়ে ছিল বলেই নিজে নিজেই এবং খুব শিগগিরই সে বৃহত্তর পরিবারের একজন হয়ে উঠল। আর তোমার-আমার সব সময়ের সঙ্গী হয়ে উঠতে ওর আদৌ সময় লাগেনি। আমাদের মেয়ে পাওয়ার শখ মিটল। ছেলে-বৌ যথাসময়ে আমাদের উপহার দিল দু'টি দেবশিশু। তারা যেভাবে বেড়ে উঠছে তাতে আমরা যারপরনাই খুসী। অমৃতা এমনই একটি মেয়ে যে গত ১৬ বছরে পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে বয়সের নিরিখে অকপটে দাদা-দিদি-বৌদি বা কাকিমা-জেঠিমা পাতিয়ে ফেলেছে। কথায় আছে সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। কাজেই, এ-ব্যাপারে পরম্পরা মেনে ও তোমারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। তাইতো মনে হয় যে, প্রথম জীবনে ধারাবাহিক ভাবে বেশ কিছু বছর কষ্টে কাটানোর পর, আজ প্রাপ্তির খাতা তৃপ্তি দিয়েছে। আমরা দাবী করতেই পারি যে আমরা সফল অভিভাবক।
তোমার সম্বন্ধে আর দু'একটা কথা বলতেই হয়। দুটো ব্যাপারে তুমি সত্যিই অনন্যা। এই পঞ্চাশ বছরে শহুরে আর অন্য কোনো মহিলার মধ্যে এই গুণগুলো আমি দেখিনি। পোশাকের ব্যাপারে তোমার প্রথম পছন্দ শাড়ি, দ্বিতীয় পছন্দ শাড়ি, তৃতীয় পছন্দও শাড়ি। এই ধারাবহিকতা আমাদের আমলের আর কাউকে আমার চোখে পড়েনি। মেয়েদের এই পোশাকটা আজও আমার কাছে শুধু পছন্দই নয়, একটা পবিত্রতার প্রতীকও বটে।
চরিত্রের আরও একটা বিরল দিক আমাকে মুগ্ধ করেছে। তোমার অটুট ধৈর্য। গত ৫০ বছরে তোমার মধ্যে আমি একদিনের জন্যও কারো প্রতি কোনো উষ্মার প্রকাশ ঘটতে দেখিনি, যেটা আমার প্রায়ই ঘটে যায়। কিন্ত তোমার এই স্বভাবটা আমাকে অনেক সময় আঘাতও করেছে। আমি অসম্মানিত হচ্ছি দেখেও তুমি কখনও প্রতিবাদ করনি। ফলে আমার মনে হয়েছে, I am a defenseless person. অবশ্য সেটা আমাকে শক্তি যুগিয়েছে। বুঝে নিয়েছি আমার লড়াইটা আমাকেই লড়তে হবে। তবে শেষ হাসিটা আমিই হেসেছি। কিন্ত তোমাকে কেউ অকারণে অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা করলে, আমি মাঝখানে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছি। শুধু তোমাকেই বা কেন, আমার সামনে অনৈতিক কিছু হলে রুখে দাঁড়িয়েছি। যাইহোক, তোমার ধৈর্যের এই গুণটা ছেলের চরিত্রে সঞ্চারিত হয়েছে। তবে, এটাও ঠিক,ভেতরে ভেতরে তার আত্মবিশ্বাসের আগুন আমার দৃষ্টি এড়ায় নি। Also he is not a peace loving docile person like you nor most menfolk.
নিজের ব্যাপারে একটা কথা শপথ করে বলতে পারি যে উচ্চাকাঙ্খার হাতছানি আমাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারেনি, যাতে বেশিদিনের জন্য সংসার ছেড়ে থাকতে হয়। তাইতো তিন তিনবার বিদেশ যাবার আহ্বানে authority-কে অগ্রাহ্য করে প্রত্যাখ্যান করেছি। বিদেশ যাবার লোভে আর গ্ল্যামারের কথা মনে রেখে মানুষ যেখানে নিঃশর্ত মাথা ঝোঁকায়, সেখানে এটা একটা বিরল দৃষ্টান্তও বটে। এ অহঙ্কার আমার আছে। আর তাছাড়া বিদেশের মাটি আমাকে কোনোদিন টানেনি। সবই সেখানে ঝকঝকে চকচকে, very impressive but highly impersonal. প্রবাসে থাকা বাঙালিদের একাকীত্ব আর নিরাপত্তাহীনতা আমি স্পষ্ট দেখেছি, বিশেষত আমেরিকায়, যেখানে অনাবাসী জীবনের দ্বন্দ্ব রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সে কারণেই গ্ল্যামার শহর বম্বে যখন ছেড়েছিলাম, তা শুধু কলকাতার আকর্ষণেই নয়, অন্যান্য জায়গার অত্যাধুনিক নাগরিক জীবনের বিকর্ষণেও বটে। আর এই সিদ্ধান্তে তোমারও ১০০% সায় ছিল। আদর্শে অবিচল থেকে নিজের আওতায় থেকেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছি। কাজেই জীবনে কম হোঁচট খেতে হয়েছে।
একটা আফসোস অবশ্যই আছে, যা না বললে সত্যের অপলাপ হবে। সেই যুগের রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের হনার্সের ছাত্রী হয়েও তোমার মধ্যে অ্যাকাডেমিক আগ্রহ তেমন চোখে পড়েনি।
কিছুটা বলা হ'ল। সেজন্যই এগুলো ল্যান্ডমার্ক ইভেন্ট। অনেক কিছু বাদও পড়ে গেল। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের দিনলিপি গুটিকয়েক ছত্রে এঁটে রাখা যায় কি ? যেদিন আমি থাকব না সেদিন তুমি বাকিটা লিখে রেখো। আর আমার আগে তুমি চলে গেলে, তখন যৌবনের বিচ্ছেদের সময়ের পারস্পরিক লেখা চিঠিগুলো - আমি জানি সেগুলো কোথায় রাখা আছে; আজ পর্যন্ত একবারও দেখার কৌতুহল হয়নি, সেগুলো বার করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে ফেলব। শেষ করলাম। শেষ করে মনে হ'ল শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে গেলেও মনের মধ্যে কোথাও এখনও একটু কাঁচা একটু সবুজ নিজের অজান্তেই গুনগুন করে গেয়ে চলেছে। তবে ভেতরের আগুন এখনও নিভে যায়নি। তাইতো এতদিন পরে এরকম একটা চিঠি লিখে ফেললাম। ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য সত্বেও হয়তো এটাই আমার বেঁচে থাকার রসদ। তোমার কেমন লাগল জানিও। অপেক্ষায় থাকব।
আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল।