এই প্রবন্ধটা ২০০০ সালে লেখা। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। গত দু-দশকে মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সংখ্যাভিত্তিক যে তথ্যগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। কলকাতায় গাড়ির সংখ্যা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। কুড়ি বছরে জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে, গাড়ির সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। একটা তথ্য থেকেই বোঝা যাবে, যে শহরে গাড়ির সংখ্যা এখন অনেক। শুধুমাত্র সেক্টর ফাইভ আর নিউ টাউন মিলিয়ে ৫/৬ টা গাড়ির শোরুম আছে। তার মূল কারণ তথ্য-প্রযুক্তি বিস্ফোরণের যুগে তথ্য-প্রযুক্তির সিংহভাগ অফিস ওই এলাকাতেই। আর এই শিল্পে কর্মীদের মাস মাইনে যথেষ্ট বেশি। এছাড়া এখন সহজ কিস্তিতে কম সুদে দীর্ঘকালীন মেয়াদে ব্যাঙ্ক থেকে ধার পাওয়া যায়। কাজেই এখন হিসেব করলে আরও অনেক কিছু বিবেচনা করতে হবে। ফলে সংখ্যাগুলোর পরিবর্তন হবে। বিশ বছরের পুরোনো লেখা বলেই এতগুলো কথা খরচ করতে হ'ল।
পেশায় স্কুল শিক্ষক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বি.এস-সি পড়ুয়া এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করে বসলেন - 'আচ্ছা বলতে পার কলকাতা শহরে কতজনের নিজের গাড়ি আছে ?' বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটির চটজলদি উত্তর- 'কত আর হবে, নব্বই লক্ষের বেশি কিছুতেই নয়।' আড়চোখের অর্থপূর্ণ ইঙ্গিতে ছেলেটির উত্তরে তাঁর বিরক্তি বুঝিয়ে গটগট করে প্রত্যাখ্যান করলেন প্রৌঢ়। ভাবটা যেন আজকালকার ছেলেপুলেরা কি ডেঁপোরে বাবা ! আমার নিজের মনে হয় ছাত্রের উত্তরটা ছিল অর্থবহ। আলোচনা চললে তর্কাতর্কি হত ঠিকই, কিন্ত উত্তরটা এমন একটা সংখ্যায় পৌঁছতে পারতো যা সঠিক উত্তরের কম-বেশি কয়েক শতাংশের মধ্যেই। তাহলে তথ্য ছাড়াই মোটামুটি হিসেব করার কি কিছু নিয়ম আছে ? অবশ্যই আছে - যাকে বলা হয় অ্যাপ্রক্সিমেশন (approximation) । বলাই বাহুল্য যে চাল-ডাল-তেল ময়দার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সাধারণ জিনিসের হিসেবনিকেশ থেকে শুরু করে জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানের আন্দাজ পেতে গেলে অ্যাপ্রক্সিমেশনের একটা বিশাল ভূমিকা আছে। যে-কোনো চালু পেশায় অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ মানুষের আন্দাজ করার ক্ষমতা অনেক সময়ই শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই পদ্ধতিতে হিসেব করলে অন্তত এইটুকু বুঝতে পারা যায় যে চিন্তা-ভাবনাগুলো ঠিক পথে এগোচ্ছে কিনা। কিন্ত প্রশ্ন হ'ল একেবারেই কি কোনও তথ্যের প্রয়োজন নেই ! অবশ্যই আছে। শুরুতে কিছু একটা ধরে নেওয়ার ব্যাপার আছে, যেমন ছাত্রটি ধরে নিয়েছিল ৯০ লক্ষ। যাইহোক ব্যাপারটা মনগড়া বলে মনে হলেও অকাট্য যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
গাড়ির উদাহরণটা নিয়ে দেখা যাক, ছাত্রটির উত্তর কেন অর্থবহ ছিল। কী ভাবে সে এমন একটা যাদু-সংখ্যা বাতলে দিল। সে ধরে নিয়েছিল কলকাতার জনসংখ্যা ৯০ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রত্যেকটি মানুষের গাড়ি আছে।
কিন্ত ৯০ লক্ষ সংখ্যার হিসেবটা একটু বেশি সাদামাটা, যাকে বলে ইমপ্র্যাকটিকাল। বাস্তবকে গুরুত দিলে শুরু হবে কাটছাঁটের পালা। সাধারণ বুদ্ধিতে বলে পরিবারপিছু একটা গাড়ি থাকা সম্ভব। নিউক্লিয়ার বোমের যুগের মতো নিউক্লিয়ার পরিবারের সংখ্যাই আজ বেশি। অর্থাৎ পরিবার মানে মিঞা বিবি আর একটি সন্তান। কাজেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি তিন ধরে নেওয়া যায়, তাহলে হিসেব মতো একলাফে গাড়ির সংখ্যাও নেমে দাঁড়াচ্ছে ৩০ লক্ষ। এবার পরের ধাপ। ধরা যায় যে দশ শতাংশ পরিবারের গাড়ি কেনার আর্থিক সামর্থ্য আছে। সুতরাং তিরিশ লক্ষ গড়ি হয়ে দাঁড়ালো তিন লক্ষে। আরও অনেক কিছু বিবেচনা করার আছে। শুধুমাত্র আর্থিক সামর্থ্যই যথেষ্ট নয়, এমনও তো হতে পারে যে এক-একটি পরিবারের এক এক ব্যাপারে অগ্রাধিকার আছে। কেউ হয়তো টাক খরচ করে দেশ-বিদেশ বেড়ানোর জন্য , কেউ ফ্ল্যাট-বাড়ি কেনার জন্য, কেউ হয়তো ভাল-মন্দ খেয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে চায়, আবার কেউ হয়তো গাড়ি কিনতে। যাইহোক, এই ব্যাপারে সমান সম্ভাবনার কথা ভেবে ধরা যাক গাড়ি কেনার পক্ষপাতি, ওই দশ শতাংশ উচ্চবিত্ত পরিবারের ৫০%। এসব ধরে নিয়ে হিসেব করলে দেখা যাবে যে গাড়ির সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে দেড় লক্ষে। কাজেই শুধুমাত্র লোকসংখ্যার তথ্য থেকে শুরু করে যুক্তিগ্রাহ্য কিছু কিছু ব্যাপার ধরে নিয়ে একটা অনুমানে পৌঁছোনো গেল। হিসেবের মধ্যে ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। ৯০ লক্ষ জনসংখ্যাওয়ালা সব সহরের গাড়ির সংখ্যা কি দেড় লক্ষের আশেপাশে ? শহরটা যদি মুম্বই হয়, তখন অন্যান্য আরও অনেক কিছু বিবেচনা করার আছে। কারণ মুম্বই শহর মূলত শিল্পাঞ্চল বেষ্টিত। আর্থিক সামর্থ্যের লোকের সংখ্যা কলকাতার তুলনায় বেশি। যাইহোক, সেটা আসল কথা নয়। মূল উদ্দেশ্য হ'ল অজানা কোনও কিছুকে কোয়ান্টিফাই করতে হলে যুক্তিপূর্ণ অনুমান ভিত্তিতে কীভাবে এগোনো যায়, সেটা দেখানো। অনুমান ধাপগুলো যথাযথ হলে ফলাফল ক্রমশ সূক্ষ্মতার দিকে যাবে।
অনুমানভিত্তিক বা এই 'মোটামুটি' হিসেবের নিয়মটা স্কুল-কলেজ থেকেই অভ্যাস করা উচিৎ। এতে কল্পনাশক্তি বাড়বে এবং দূরুহ বিজ্ঞান না জেনেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাস্তব জগতকে অনুধাবন করা যাবে। এ ধরনের হিসেব করা একটা খেলা-)ও বটে। আজ ইন্টারনেটের তথ্যবহুল যুগে এক একটি মাউসের ক্লিক ভিডিও স্ক্রিনের ওপর ফুটিয়ে তুলছে পৃথিবীর উজাড় করা তথ্য। গবেষণা বা অন্যান্য কাজে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া আজ অনেকটাই সহজ। কিন্ত বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বিজ্ঞান মনীষীরা সংজ্ঞালব্ধ অনুমানের উপর ভিত্তি করেই তাঁদের গবেষণার কাজে ত্বরান্বিত করতেন। আমি অন্তত পাঁচজন বিজ্ঞান মনীষীর কথা জানি যাঁরা আনুমানিক হিসেবের ব্যাপারটায় প্রভূত গুরুত্ব দিতেন। এঁরা হলেন, স্যর নেভিল মট্, এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান, জর্জ গ্যামো ও ভিক্টর ভাইসকফ। ইতালি বংশোদ্ভূত এনরিকো ফার্মির জীবনের বেশির ভাগ সময়টা কেটেছে আমেরিকার শিকাগোতে। শিকাগো শহরের বেশ কিছু কবি, ফার্মির কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞান-মনস্কতা ব্যাপারটা কী ?প্রত্যুত্তরে ফার্মি বলেছিলেন,- 'আপনারা হিসেব করতে পারেন, শিকাগো শহরে কতগুলো পিয়ানো আছে ?' কবিবররা ভাবলেন ফার্মি হয় তাঁদের নিয়ে মস্করা করছেন অথবা প্রলাপ বকছেন। তখন ফার্মি গাড়ির হিসেবের মতো ব্যাপারটা জলের মতো সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। একটা ব্যাপার ঠিকই যে অনুমানের সঙ্গে সংজ্ঞা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একটা ঘটনা থেকে বোঝা যাবে যে এনরিকো ফার্মির অনুমান ক্ষমতা কত প্রবল ছিল। লস আলামসের অনতিদূরে আলমোগোর্দো-তে প্রথম যখন অ্যাটম বোমার শক্তি পরীক্ষা হচ্ছিল, ন-দশ মাইল দূরের গবেষণাগারে বসে বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট আগে থেকেই টুকরো টুকরো কাগজ মাটিতে ফেলেছিলেন এনরিকো ফার্মি। বিস্ফোরণ মুহূর্তের কয়েক পলক পরেই পড়ন্ত কাগজ টুকরোর বিক্ষেপ থেকে শক-ওয়েভের মাত্রা অনুমান করতে পারেন ফার্মি এবং বলতে সক্ষম হন যে বিস্ফোরণে কী পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়েছিল। বলাই বাহুল্য যে অনুমানের সঙ্গে সঠিক শক্তি উৎপাদনের তফাৎ যৎসামান্যই ছিল। আসলে তিনি যে এনরিকো ফার্মি। সৃষ্টির বেষ্টনী দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছেন আমাদের।
