Tuesday, June 28, 2022

ফ্র্যাকটালের জগৎ

ম্যানডেলব্রটের সৃষ্টি এই ফ্র্যাকটাল-আলপনার যে-কোনও ক্ষুদ্র অংশ বাড়িয়ে তুললে পাওয়া যাবে জটিল থেকে জটিলতর রূপবৈচিত্র্য 


ফ্র্যাকটালের  জগৎ


সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে যে জিনিসগুলো আমাদের চোখে পড়ে, বিশেষত জড় পদার্থের জগতে, তার আকার সম্বন্ধে আমাদের একটা ধারণা আছে। কারণটা হ'ল এই যে, আকারগুলো নিত্য পরিচিত সংস্কারলব্ধ জ্যামিতিক আকারগুলোর সঙ্গে সহজেই তুলনীয়। অর্থাৎ কোনটা চৌকো, কোনটা লম্বা, বৃত্তাকার গোল, ডিম্বাকার বা কোনটা হয়তো এইসব মৌলিক আকারের সমন্বয়ে তৈরি। এটা গেল বস্তুটির আকারের বিবরণ। আকার ছাড়াও প্রত্যেকটা জিনিসের আরও একটা ধর্ম আছে ; তা হ'ল বস্তুটির মাত্রা। আসলে মাত্রা এবং আকারের থেকেই বস্তুটির সার্বিক চেহারা সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা করা যায়। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় ছেলেরা ঘুঁড়ির দোকানে মাঞ্জা সুতো কেনার সময় বলে ৫০০ গজ বা ১০০০ গজ সুতো চাই। অর্থাৎ দৈর্ঘ্যের মাপটা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। সুতোর প্রস্থ বা স্থূলতা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। কাজেই, ব্যবহারিক জগতে সুতো বা অনুরূপ যথেষ্ট লম্বা জিনিসের মাত্রা এক বা একমাত্রিক। একই যুক্তিতে বলা যায় যে একটা চাদর বা খাতার একখানা পাতা হ'ল দ্বিমাত্রিক এবং একখানা বই বা একটা বাক্স বা প্রায় সব জিনিসই ত্রিমাত্রিক। আসলে মাত্রা, আকার ইত্যাদি সংজ্ঞার প্রয়োজন হয়েছে এই কারণে যাতে বস্তুটির নিখুঁত মাপ-জোখের একটা বিজ্ঞান ভিত্তিক  নিয়ম বার করা যায়।

এখন কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, পুরী থেকে দীঘা পর্যন্ত সমুদ্রোপকূলের দৈর্ঘ্য কত অথবা মাপ-জোখের হিসেবে একটা গাছের পাতা বা আকাশের কোলে ভাসমান মেঘের কিংবা একটা পাহাড়ের বিবরণ দিতে, তা হলে তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারবেন। আসলে প্রকৃতির সৃষ্টি এতটাই জট পাকানো যে তা খোলার জন্য বিজ্ঞানীরা সর্বদাই নতুন নতুন চিন্তাধারায় যাচাইয়ের কথা ভাবছেন। আরও ভাবছেন যে কীভাবে এই জটিলতার মধ্যে ছন্দ বা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উদ্দেশ্য এই যে, আপাতদৃষ্টিতে যে জিনিসগুলোর গঠন এবং যে ঘটনাগুলোকে ভীষণরকম এলোমেলো বা বিশৃঙ্খল বলে মনে হয়, সেই বিশৃঙ্খলার ভেতর একটা স্বীকৃত রীতি-পদ্ধতি আবিষ্কার করা। প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎই পাহাড়-পর্বত বা মেঘের বিবরণ ও মাপজোখে কোন পরমার্থ লাভ হবে ? লাভ-লোকসানের ব্যাপারটা ব্যবহারকারীর প্রয়োজনে এবং আলোচনার শেষে বোঝা যাবে যে এই সমস্ত উদ্ভট বস্তুর চরিত্রের বিবরণ ও মাপের নমুনায় রহস্যাবৃত হয়ে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানচর্চার এক নতুন ভাষা। এটা হয়তো বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দেবে এক নতুন অস্ত্র যা কাজে লাগিয়ে তাঁরা কাটাছেঁড়া করতে পারবেন অনেক জটিল সমস্যার। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি যা এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়, এমনই একটি বিজ্ঞানের ভাষা। মূলত উক্ত চেহারাগুলোর মাত্রা এক, দুই কিংবা তিন নয়, মাঝামাঝি কিছু একটা, ১.৫৩, ২.৭১ ইত্যাদি ইত্যাদি....। দেখা যাক চেহারার ধর্মের কোন্ বৈচিত্র্যে মাত্রার মাপে ভগ্নাংশ আসে আর তা দিয়ে কী উপকারই বা সাধিত হয়।

(ক) ফার্নের গঠনপ্রনালী (খ) কক্ কার্ভের  গঠনপ্রনালী (গ) সায়ারপিন্সকি গাস্কেট।  প্রাথমিক প্রতিলিপি যাই হোক, চূড়ান্ত চেহারাটা সব ক্ষেত্রেই সায়ারপিন্সকি গাস্কেট। 


সাদা কথায়, প্রচলিত জ্যামিতিক বিভিন্ন চেহারাগুলোকে নিজস্ব কায়দায় কাজে লাগিয়ে স্থপতিবিদ্যায় পারদর্শী (Architecht) যেমন ঘর-বাড়ি, ব্রিজ, মনুমেন্ট ইত্যাদি গঠনের চমৎকার নক্সা তৈরি করেন এবং বাস্তবে রূপ দেন, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির চেহারা কাজে লাগিয়ে তেমনই জটিল গঠনের খুঁটিনাটির নিখুঁত রূপ দেওয়া সম্ভব। তা যদি সম্ভব হয়, তা হলে একটা জিনিস খুব পরিষ্কার যে জটিল বিষয়টির ক্রমবিকাশের বৃত্তান্ত সম্বন্ধে একটা বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা করাও সম্ভব। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রচলিত জ্যামিতিক চেহারাগুলির সংখ্যা সীমিত ; অন্য দিকে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির সংখ্যাগুলির সংখ্যা শুধুমাত্র অগুনতিই নয়, কোনও নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকে সেগুলোর দেখাও মিলবে না। মোটামুটিভাবে সহজ সরল নিয়ম ও গাণিতিক সূত্রের মধ্যেই শৃঙ্খলিত হয়ে আছে ওই রোমাঞ্চকর নক্সাগুলি। যা প্রয়োজন তা হ'ল ওই গাণিতিক সূত্রগুলিকে কল্পনার সুরে বাঁধা। একটা উপমা দিলে এই সুর বাঁধা ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধারণা করা যাবে। যে কোন তার-যন্ত্রের বাদ্যকর যন্ত্রের কানে মোচড় লাগিয়ে তারের সুর বাঁধেন। অর্থাৎ তারগুলোর টান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গাণিতিক সূত্রগুলির মধ্যেও নিয়ন্ত্রণাধীন এরকম এক-আধটা সূক্ষ্ম অংশ (Parameter) আছে, যার সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে সূত্রগুলি শুধুমাত্র অদ্ভুত নয়, শিল্পসুলভ চমৎকার প্রাকৃতিক চেহারার জন্ম দেয়; কোনটা হয়তো আকাশের মেঘ, কোনটা হয়তো আকাশের কোলে বিদ্যুতের ছটা, পাড় ভাঙা আঁকা-বাঁকা নদ-নদী, ঝর্ণা, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, এমন কি কোনোটা হয়তো ছায়াপথের নক্ষত্রপুঞ্জের সদৃশ।

ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির নির্দিষ্ট দুটি বিভাগ আছে - Linear Fractal ও Non Linear Fractal । শেষোক্ত বিভাগটি অপেক্ষাকৃত জটিল এবং বহুমুখী রহস্য সন্ধানের উৎস। প্রথমে আলোচনা করা যাক Linear Fractal । এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত মৌলিক চেহারাগুলি প্রচলিত জ্যামিতিক সরলরেখার এক বিচিত্র সমন্বয়। নানান্ ধরনের নিয়মকানুন, যাকে অঙ্কের ভাষায় বলা হয় Algorithm, তা কাজে লাগিয়ে এই মৌলিক আকারগুলি দিয়ে তৈরি হয় এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রূপ। ছবিতে একটা ফার্ন গাছের অংশ দেখানো হয়েছে। একটু লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে গাছটির প্রায় সবটাই একটি ত্রিভুজাকৃতি মৌলিক চেহারার প্রতিকৃতি। মৌলিক চেহারাটা ইচ্ছেমত ছোট বা বড় করে, প্রয়োজনমত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সাজিয়ে তৈরি হয়েছে ফার্ন গাছটি। এই যে ছোট-বড় করা বা ঘোরান-ফেরানো সবই Algorothm-এর আওতায় পড়ে। যাইহোক,  ত্রিভুজাকৃতি এই মৌলিক চেহারাটা ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চেহারা এবং এর উদ্ভাবক পোলিশ গণিতবিদ ওয়াকল্ সায়ারপিন্সকির নামানুসারে সায়ারপিন্সকি গাস্কেট। কেউ কেউ এটাকে সায়ারপিন্সকি ত্রিভুজও বলে থাকেন। ত্রিভুজটি তৈরি করার কায়দা এরকম - আজকাল পথে-ঘাটে জেরক্স মেশিনের চল হয়েছে এবং একটু উঁচু জাতের মেশিনে মূল চেহারার প্রতিলিপিকে ইচ্ছেমত ছোট-বড় করার ব্যবস্থা আছে। এখন যে-কোনও মাপের একটা আকার, ধরা যাক একটা বৃত্তাকার চেহারা এইরকম একটা জেরক্স মেশিনে ঠিক অর্ধেক করে তিনটি প্রতিলিপি নিয়ে একটি সমবায় ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দুতে রাখা হ'ল। এইবার এই সমগ্র চেহারাটা আবার ঠিক অর্ধেক করে একই উপায়ে সাজাতে থাকলে জন্ম হবে সায়ারপিন্সকি গাস্কেটের। সত্যি কথা বলতে কি প্রাথমিক প্রতিলিপি যাই হোক না কেন মাপ এবং সাজানোর নিয়ম অবিকৃত রাখলে চূড়ান্ত চেহারার মধ্যে নির্দিষ্ট একটি আকৃতির প্রবনতা দেখা যাবে। প্রাসঙ্গিক পরিভাষায় এই ব্যাপারটাকে বলা হয় attractor of the process ( ছবিতে ব্যাপারটা দেখানো হল, ছবি 'গ')। ভন্ ককের নামানুসারে কক্ কার্ভ, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির আরও এক গুরুত্বপূর্ণ চেহারা। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় যে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশ - এই অর্ধ শতক সময়ে জর্জ ক্যান্টর, গিসেপ পিয়ানো, ডেভিড হিলবার্ট, গ্যাস্টন জুলিয়া, ফেলিক্স হাউসডর্ফ প্রমুখ বেশ কিছু বিখ্যাত গণিতবিদের সৃষ্টি,  ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মৌলিক চেহারাগুলির জন্ম দিয়েছে এবং সেগুলির নিখুঁত মাপজোখের গাণিতিক উপায় বাতলেছে।

এখন প্রশ্ন হ'ল চেহারার কি ধরনের অভিনব বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির অন্তর্ভুক্ত বলে চিহ্নিত করা হবে ? চেহারার স্বয়ং সদৃশতা (Self Similarity), সম্পূর্ণ বা আংশিক অবশ্যই একটি জরুরি প্রয়োজনীয় শর্ত। সায়ারপিন্সকি গাস্কেট বা কক্ কার্ভ সম্পূর্ণ বা পুরোপুরি স্বয়ংসদৃশ, কারণ চেহারাগুলি নির্দিষ্ট চেহারার হুবহু প্রতিকৃতি। কিন্ত ফার্ন গাছটি আংশিক স্বয়ংসদৃশ কারণ কান্ড  (stem) বা পাতার মাঝখানের শিরা সায়ারপিন্সকি ত্রিভুজ নয়। তবে ছবিতে ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে একটি মাত্র মৌলিক আকারের কারসাজিতে (ছোট খোপের মধ্যে) গাছের পাতাগুলি তৈরি হয়েছে এবং গাছের একটা গোটা পাতার সঙ্গে (বড় খোপের মধ্যে) সমস্ত গাছটারও একটা মিল আছে। স্বয়ংসদৃশতার সংজ্ঞানুযায়ী একটা সরলরেখা বা বর্গক্ষেত্র বা একটা চৌকো বাক্স পুরোপুরি স্বয়ংসদৃশ  কিন্ত এগুলি কোনোটাই ফ্র্যাকটালের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির চেহারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে স্বয়ংসদৃশতা বজায় রাখার জন্য একই রকমের নির্দিষ্ট সংখ্যক ছোট ছোট অনুলিপি নিয়ম মেনে জোড়া লাগিয়ে গোটা চেহারাটা তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুলিপিগুলির সঙ্কোচন গুণিতক (reduction factor) ও সঙ্কুচিত অংশের সংখ্যার (number of reduced pieces) মধ্যে সম্পর্কটা স্থির নির্দিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে সায়ারপিন্সকি গাস্কেটের সঙ্কোচন গুণিতক ১/২, ১/৪, ১/৮....এবং কক্ কার্ভের ক্ষেত্রে ওই সংখ্যাগুলো ১/৩, ১/৯, ১/২৭...., কিন্ত সরলরেখা, বর্গক্ষেত্র, বা ঘনকের ক্ষেত্রে সঙ্কোচন গুণিতক যাই হোক না কেন, স্বয়ংসদৃশতা বজায় থাকবে। দেখা যাচ্ছে সায়ারপিন্সকি গাস্কেটের ক্ষেত্রে সঙ্কোচন গুণিতক অর্ধেক হলে তিনটে ছোট টুকরো জোড়া লাগিয়ে তৈরি হবে বড় একটা গাস্কেট, গুণিতক এক চতুর্থাংশ হলে টুকরোর সংখ্যা হবে ৯ টা ইত্যাদি। অর্থাৎ গুণিতক ১/২^ k হলে টুকরোর সংখ্যা হবে ৩^k। কক্ কার্ভের ক্ষেত্রে গুণিতক ১/৩, ১/৯, ১/২৭.... ১/৩^k হলে বড় কক্ কার্ভের জন্য টুকরোর সংখ্যা হবে যথাক্রমে ৪, ১৬, ৬৪...৪^k এবং ফেলিক্স হাউসডর্ফের মাত্রার সংজ্ঞানুযায়ী সায়ারপিন্সকি গাস্কেট ও কক্ কার্ভের মাত্রা যথাক্রমে ১.৫৮ ও ১.২৬, পরিচিত জ্যামিতিক চেহারাগুলোর মতো এক, দুই বা তিন নয় ; দেখা যাক হাউসডর্ফের নিয়মটি কি ? উচ্চমাধ্যমিক বীজগণিতের পাঠক্রমে লগারিদম্ (Logarithm) শিরোনামে একটা অনুচ্ছেদ আছে এবং যে কোন সংখ্যার Logarithm, সংক্ষেপে Log হিসেব করার তালিকা, পরিশিষ্ট হিসেবে সাধারণত পাঠ্যপুস্তকের শেষের অনুচ্ছেদে থাকে। হাউসডর্ফের মাত্রার সংজ্ঞায় তিনি Logarithm-এর নিয়মকে কাজে লাগিয়েছেন। জটিলতার মধ্যে না গিয়ে প্রাসঙ্গিক দু-একটা নমুনা দিলেই Log হিসেব করার আন্দাজ পাওয়া যাবে। 

তালিকা লক্ষ্য করলে নিয়মটা ব্যবহার করার পদ্ধতি সহজেই বোঝা যাবে এবং ওই একই সাধারণ নিয়মে হিসেব করলে সরলরেখা, বর্গক্ষেত্র ও ঘনকের মাত্রা বেরিয়ে আসবে যথাক্রমে ১, ২, এবং ৩ (উৎসাহী পাঠক লগ তালিকা দেখে মিলিয়ে দেখতে পারেন)। কাজেই ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির অন্তর্ভুক্তির জন্য দুটি শর্ত প্রয়োজন - সম্পূর্ণ বা আংশিক স্বয়ংসদৃশতা ও ভগ্নমাত্রা। এই ভগ্নমাত্রার মৌলিক চেহারাগুলি কাজে লাগিয়েই প্রাকৃতিক বিভিন্ন বস্তুর চেহারার ছাঁচ বা মডেল তৈরি করা হয়। একটা ঘরের মাপ ১০০ বর্গফুট বললে অভ্যস্ত মাপের অভিজ্ঞতায় একটা উপলব্ধি জন্ম নেয়। কিন্ত পাহাড়ের মাপ কি এইভাবে বলা যায় ? বরং বলা হয় পাহাড়টা কি  এবড়ো-খেবড়ো অথবা সমুদ্রের ধারটা কীরকম পাক খেয়ে খেয়ে এগিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ফ্র্যাকটালের মাপ  হ'ল ওই এবড়ো-খেবড়ো বা পাক খাওয়ার পরিমাণের একটা নিশ্চিত ইঙ্গিত।

আসা যাক Non Linear Fractal-এর জগতে। খুব সাধারণ সহজ ফর্মুলার মধ্যে লুকিয়ে আছে এই জাতীয় ফ্র্যাকটালের রহস্য। ফর্মুলাটি ব্যবহার করার নিয়মও মোটামুটি ভাবে সরল এবং সেটা বোঝার প্রয়োজনে কিঞ্চিত অঙ্কের কচকচি অপরিহার্য। প্রায় সাত দশক আগে ফরাসী গণিতবিদ গ্যাস্টন। জুলিয়া যে সমীকরণটি উদ্ভাবন করেছিলেন তার চেহারাটা অবিকৃত রেখে ফর্মুলাটা লেখা যাক। ফর্মুলাটা এরকম : Z = Z²+C .  এর মানে হ'ল C এবং Z- এর একটা প্রারম্ভিক মান ধরে সমীকরণের ডান পাশটা হিসেব করলে যা ফলাফল বেরোবে, তা হ'ল Z- এর নতুন মান। এবার C-এর মান অবিকৃত রেখে Z-এর এই নতুন মান ফর্মুলার ডান দিকে আবার বসিয়ে পাওয়া যাবে Z-এর দ্বিতীয় নতুন মান।। এইভাবেই হিসেব করার পদ্ধতিকে অঙ্কের ভাষায় বলা হয় আইটারেসন (Iteration)। আইটারেসন পদ্ধতিতে প্রত্যেক বারের পাওয়া  Z -এর মানগুলো লিপিবদ্ধ করে সেই পয়েন্টগুলো গ্রাফ কাগজে চিহ্নিত করে জোড়া লাগালে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির একটা মৌলিক চেহারা পাওয়া যাবে। এবার পরের ধাপ। এখন C- এর মানকে সূক্ষ্ম পরিবর্তন করে  Z- এর আবার একটা প্রারম্ভিক মান ধরে আইটারেসন করলে পাওয়া যাবে Z- এর মানের দ্বিতীয় তালিকা। এইভাবেই তৃতীয়, চতুর্থ... অনেক এবং প্রত্যেকটি তালিকা নির্দেশ করবে এক একটি নতুন ছন্দের ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির নক্সা। অঙ্কের  ব্যাপারটা নিয়মরক্ষার্থে নিষ্পত্তি করার জন্য আরও কিছুটা বলার প্রয়োজন নতুবা চিন্তাশীল এবং উৎসাহী পাঠককুল ব্যাপারটা ঠাট্টাচ্ছলে না নিয়ে যদি গ্রাফ কাগজ আর ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে যান, তাহলে বিপদে পড়বেন। কারণ গ্রাফ কাগজে একটি স্থানাঙ্ক নিদেনপক্ষে দুটি সংখ্যাকে চিহ্নিত করে ; এক্ষেত্রে সংখ্যা মাত্র একটি এবং তা হ'ল Z. আসলে Z বা C প্রত্যেকটিই দুটি সংখ্যার সমন্বয়ে তৈরি জটিল সংখ্যা (Complex number) । এই প্রবন্ধে জটিল সংখ্যার জটিলতায় গেলে বাড়াবাড়িই হবে, তবে এইটুকু বলে প্রসঙ্গে যবনিকা টানব যে, জটিল সংখ্যার সরলীকরণের ব্যাপারটা বহুকাল ধরেই উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান শাখার ছাত্র-ছাত্রীদের নির্ধারিত পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এখন প্রশ্ন হ'ল সাত দশক বা তারও আগে বিখ্যাত গণিতবিদরা তাঁদের সৃষ্ট গণিতের মধ্যে যে মহামূল্যবান সম্পদ রেখে গেছেন, তা কি এতদিনে কারুরই নজরে পড়ল না ? না কি তাঁরাও বুঝতে পারেননি তাঁদের সৃষ্টির ব্যাপ্তি অথবা ব্যবহারিক প্রয়োগ ? কী ভাবে তাঁরা এগুলো সৃষ্টি করেছিলেন তা বলা খুব কঠিন। আসলে যুক্তিবাদী মন আর গাণিতিক নিয়মকানুনের কাঠামোর মধ্যে সংখ্যা ব্যবহার করার কায়দায় তৈরি হয় আরও নতুন নিয়ম, তখন গণিতবিদরা আর মনে রাখেন না কী উদ্দেশ্যে কাজটা শুরু করেছিলেন।

ভিনগ্রহের পর্বতশ্রেণী। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির বিশেষ প্রয়োগে জন্ম নিয়েছে এই প্রকৃতিসদৃশ দৃশ্য 

এইসব তথ্যের ভিত্তিতে নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির বীজ যথেষ্ট পুরনো হলেও উপযুক্ত দানাপানির অভাবে তার প্রকাশ আদৌ হয়নি। কিন্ত কোন্ দানাপানির গুণে এবং কোন্ দক্ষ হাতের লালনপালনের নৈপুণ্যে সাত দশকের মৃতপ্রায় ঘুমন্ত বীজ মাত্র গত দেড় দশকে একেবারে তেড়েফুঁড়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল ? দানাপানির রহস্য লুকিয়ে আছে শক্তিশালী আরও শক্তিশালী কম্পিউটার যন্ত্রের আবিষ্কার এবং চোখের পলকে যন্ত্রগুলোর হিসেব করার ক্রমবর্ধমান ক্ষিপ্রতার মধ্যে। দক্ষ কারিগর হলেন একালের আরেক গণিতবিদ বিনোয়া ম্যানডেলব্রট। ১৯২৪ সালে পোল্যান্ড জন্ম। ১২ বছর বয়সে ফরাসী দেশে চলে আসেন এবং প্রাথমিক লেখাপড়ার কাজটা ওই দেশেই করেন। কাকা জোলেম ম্যানডেলব্রট, গ্যাস্টন জুলিয়ার অর্ধ শতাব্দীরও অধিক পুরনো কাজে ভাইপোকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। কাকার কথা রাখতে জুলিয়ার কাজ তিনি নেড়েচড়ে দেখেন, তবে মনে খুব একটা রেখাপাত করে না। নিজের পছন্দমত গণিতে গবেষণা শুরু করেন সম্পূর্ণ নতুন ভঙ্গিতে  এবং ১৯৭৭ সাল নাগাদ গবেষণার ফলাফল যা দাঁড়ায় তা হ'ল জুলিয়ার কাজেরই রূপান্তর। পশ্চিমি দুনিয়ায় ততদিনে বেশ শক্তিশালী কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছে। জুলিয়ার অনবদ্য সৃষ্টি নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে লাগলেন বিনোয়া ম্যানডেলব্রট। জন্ম হ'ল নতুন নতুন ফ্র্যাকটালের।

এখন ব্যাপারটা সহজে উপলব্ধি করা যায় যে ষাটের দশক থেকে শুরু করে ক্রমশ উচ্চশক্তিসম্পন্ন কম্পিউটার তৈরি করার ব্যাপারে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির এতটা উৎসাহ কেন। এমন কি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির কিছু মানুষের এই প্রয়াসকে বেশ কিছু নামী-দামী মানুষ কিছুদিন আগে পর্যন্তও ব্যঙ্গচ্ছলে শৌখিনতা বা বাড়াবাড়ি আখ্যা  দিতে শুনেছি। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির আবিষ্কারে কম্পিউটারের প্রয়োগ একটা উদাহরণ মাত্র। মানুষের কল্যাণে শক্তিশালী ইলেকট্রনিক কম্পিউটার প্রয়োগের অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। কাজেই শক্তিশালী কম্পিউটারের প্রয়োজন কোনদিনই শৌখিনতা ছিল না, আজ তো আদৌ নয়। মন্তব্যটির স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে ছিয়াত্তর বছর বয়সের বর্ষীয়ান কল্পবিজ্ঞানী আর্থার ক্লার্ক-এর উক্তি - "এখন কম্পিউটারের যুগ, ভবিষ্যদ্বাণীর নয়....। মানুষের জীবনে বিপ্লব এনে দিয়েছে এই অদ্ভুত যন্ত্র। আজ যা আমি আগামী দশ বছরে ঘটা অসম্ভব ভাবছি, কাল সকালেই দেখলাম কম্পিউটার তা করে ফেলেছে। কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটের কথাই ধরা যাক। আমি লিখেছিলাম এই শতাব্দীর মধ্যেই হবে। তার কত বছর আগে ব্যাপারটা হয়ে গেল"। আর্থার ক্লার্ক ইংরেজ, তবে বহুকাল শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে বসবাস করছেন। সম্প্রতি  কলকাতার এক সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাতে এই কথাগুলি বলেন।

ফিরে আসা যাক  প্রসঙ্গে, বিনোয়া ম্যানডেলব্রট যে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির জনক এ কথা বললে ভুল হবে না, যদিও পেশাদারদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। ১৯৮৩ সালে তাঁর প্রকাশিত বিখ্যাত বই, "The Fractal Geometry of Nature."-এ তিনি এই বিষয়টির মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে পেশাদারদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন এবং ফলিত বিজ্ঞানের আরেক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ফ্র্যাকটাল কথাটা লাতিন শব্দ থেকে নেওয়া তাঁরই সৃষ্টি, যার অর্থ "ভাঙা"।  ম্যানডেলব্রট সৃষ্ট অগুনতি ফ্র্যাকটালের চেহারাগুলি জোড়া লাগালে (চেহারাগুলোর প্রত্যেকটির মাপ ৬ সেঃ ×৬ সেঃ) ১০০ টি ফুটবল মাঠের সম্মিলিত মাপের সমান জায়গার প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞদের লেখা '৯০ সালের একটি বিজ্ঞান প্রবন্ধ থেকে এই তথ্য নেওয়া। কাজেই কাগজ-পেন্সিল, গ্রাফ কাগজের কথা দূরে থাক, অত্যাধুনিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে কাজগুলো করতে হলে বেশ কিছু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কয়েক শতাব্দী লেগে যেত। এমন কি সত্তরের দশকের শুরুতেও যে-সব কম্পিউটার ও সংলগ্ন গ্রাফিক্সের চল ছিল তা ব্যবহার করেও কয়েক দশক লেগে যেত। কাজেই উন্নত মানের কাজের জন্য অবশ্যই উন্নত মানের যুতসই কম্পিউটারের প্রয়োজন আছে। নিউ ইয়র্কের শহরের অনতিদূরে ইয়র্কটাউন হাইটস্-এ পৃথিবী বিখ্যাত কম্পিউটার সংস্থা আই বি এম-এর টমাস জে রিসার্চ সেন্টারে বসে ম্যানডেলব্রট এই অসাধারণ কর্মকান্ড সম্পন্ন করেন।

এত সব কান্ড-কারখানা করে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি শেষ পর্যন্ত কিভাবে কোন কাজে লাগল ? প্রথমত, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির ব্যবহার, বিজ্ঞান ও কলার এক অপূর্ব সমন্বয় সূচনা করেছে। আপাতদৃষ্টিতে খটখটে নীরস শুকনো অঙ্কের মধ্যে যে এত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, কম্পিউটারের রঙিন পর্দার উপর ফ্র্যাকটালের চেহারাগুলো দেখার আগে মানুষ তা বুঝে উঠতে পারেনি। কাজেই উঁচুদরের আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার জন্য এবং কল্পনাকে রূপ দেবার জন্য বস্তুটি বিজ্ঞানীদের কাছে একটি অতি আকর্ষণীয় হাতিয়ার। 

অঙ্কে কাঁচা ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা কোনও দেশেই কম নয়, কারণ সংখ্যা নাড়াচাড়ার ভেলকির মধ্যে তারা কোনরকম রসকষ খুঁজে পায় না এবং সে কারণেই অঙ্ক বিষয়টা তাদের ঠিক অনুপ্রাণিত করতে পারে না। স্কুল-কলেজের পাঠক্রমে অঙ্কের প্র্যাক্টিকাল হিসাবে ফ্র্যাকটালের ব্যবহার চালু করলে ব্যপারটা মন্দ হবে বলে মনে হয় না। কলেজে, অন্তত শহরের প্রায় সব কলেজেই এবং অনেক স্কুলে আজকাল ক্ষমতাশালী পার্সোনাল কম্পিউটারের চল হয়েছে। কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু গ্রাফিক্স সফটওয়্যার জুড়ে দিলেই ওইসব কাজগুলো করা অসম্ভব হবে না। এটা অবশ্যই ব্যক্তিগত মত।

ডাক্তারি বিদ্যার গবেষণায় ফ্র্যাকটালের প্রয়োগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। জীব ও উদ্ভিদজগৎ হাজার হাজার বছরের ক্রমবিকাশের ফলে যে চেহারা নিয়েছে তার ব্যাখ্যা হল, যোগ্যতার উদবর্তন অর্থাৎ Survival for the fittest। তাই হয়তো উদ্ভিদ ডালপালা, পাতা ছড়িয়ে দেয় যাতে যথেষ্ট আলো-বাতাস সংগ্রহ করে সুস্থ এবং সজীব ভাবে জীবন ধারণ করতে পারে। প্রাণিজগতে স্তন্যপায়ী প্রায় সব প্রাণীর মধ্যেই দেখা গেছে যে ফুসফুসের নালীগুলো স্বল্প জায়গার মধ্যে অদ্ভুত ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আসলে প্রকৃতি থেকে অক্সিজন সংগ্রহ করে রক্ত পরিশুদ্ধ করার জন্য  এই বিস্তার। এই এলোমেলো বিস্তার, সৃষ্টির খেয়ালখুশি  বলে মনে হলেও ফ্র্যাকটালের প্রয়োগে সেই বিস্তারের মধ্যে একটা সুন্দর নিয়ম খুঁজে পাওয়া গেছে।

Non Linear Fractal কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, এমন কি চন্দ্র পৃষ্ঠের খানা-খন্দের এমন চমৎকার মডেল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে ক্যামেরার পর্দায় ধরা পড়া আসল ছবি কি না ! সুতরাং ফ্র্যাকটালের প্রয়োগ যে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অধ্যয়নে ফলপ্রসূ কাজ করতে শুরু করেছে তাতে সন্দেহ নেই। পেশাদারী মন নিয়ে লেগে থাকলে ফল অনিবার্য। 

যে কোন ছবির চরিত্র বিশ্লেষণে ফ্র্যাকটালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলেই মনে করা হচ্ছে, যদিও সেটা গবেষণাগারের মধ্যেই সীমিত আছে। আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহে ও প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজে কৃত্রিম উপগ্রহ মারফত ভূপৃষ্ঠের ছবি ও তথ্য পাঠানোর রেওয়াজ বেশ কিছু বছর চালু আছে। প্রযুক্তিগতভাবে ছবিগুলো পাঠানোর কৌশল আপাতত শুধু জটিলই নয়, বেশ সময়সাপেক্ষ এবং সেই কারণেই ব্যয়সাপেক্ষ। গাণিতিক কলা-কৌশলে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মোড়কে বেঁধে ছবিগুলোর পাঠাবার ব্যবস্থা করা গেলে অস্বাভাবিক সঙ্কুচিত অবস্থায় পাঠানো সম্ভব হবে অথচ তথ্য হারিয়ে যাবার ভয় থাকবে না। ফ্র্যাকটালের সঙ্কোচন করার ধর্ম সম্বন্ধে একটা ব্যক্তিগত ধারণা প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি। - প্রাণিজগতে মানুষের বুদ্ধির প্রখরতা সব চাইতে বেশি। সেই কারণেই সাধারণ মানুষেরও তথ্য সংগ্রহের ভান্ডার শুধুমাত্র অস্বাভাবিক বেশিই নয়, সেগুলি অবিকৃত অবস্থায় বহুকাল ধরে রাখার কলকাঠিও মস্তিষ্কের গঠনের মধ্যে বর্তমান। পৃথক পৃথক নিউরণগুচ্ছের জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থার কায়দায় মানুষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সব জিনিস সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং তা বহুকাল মনেও রাখে। বিশ্লেষণ করলে হয়তো দেখা যাবে যে মানুষের মস্তিষ্কের লক্ষ কোটি নিউরণের ভান্ডারের তুলনায় তথ্য সংগ্রহের ভান্ডার অনেক বেশি। যাইহোক, তা যদি হয়, তবে বুঝতে হবে যে, তথ্য সঙ্কোচন করে রাখার একটা সহজাত ব্যবস্থা মস্তিষ্কে ইতিমধ্যেই আছে এবং সেটা ফ্র্যাকটালের সংকেতে থাকলে অবাক হবার কিছু নেই। এটা অবশ্যই নিজস্ব অনুভূতি বা নিছক কল্পনা।

দেখা যাচ্ছে যে ফ্র্যাকটালের শাখাপ্রশাখা বিভিন্ন পেশায় বিস্তার লাভ করেছে। ছবি সঙ্কোচনের ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে যে, যে-কোনো ছবিকেই কি ফ্র্যাকটালের সমন্বয় বলে ধরে নেওয়া যায় ? এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে নেওয়া একটা যুতসই গল্প মনে পড়ছে। প্রায় দুশো বছরের আগেকার ঘটনা।  ফরাসী গণিতবিদ ব্যারন জাঁ ব্যাপটিস্ট জোসেফ ফুরিয়ার ধাতব পদার্থের তাপ পরিবহনের একটি চমৎকার নিয়ম আবিষ্কার করেন। সমসাময়িক গণিতবিদ এবং সহকর্মীদের কঠোর সমালোচনা ও ঈর্ষার শিকার হয়ে কাজটা আবিষ্কারের ১৫ বছর আগে পর্যন্ত তিনি কোনও পত্র-পত্রিকায় ছাপাতে পারেননি। যাইহোক, স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিজ্ঞান সমাজের প্রায় এক শতাব্দী লেগেছে ফুরিয়ারের তত্ত্বের ভিত্তি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতে। আজ ফুরিয়ারের তত্ত্ব, যা ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তা কাজে লাগিয়ে DNA-র ডবল্ হেলিক্সের জটিলতা থেকে শুরু করে Sun Spot-এর কালচক্র (Sun Spot Cycle), শব্দ তরঙ্গ, বিদ্যুত তরঙ্গ, প্রায় যাবতীয় তরঙ্গাকৃতি ঘটনার মৌলিক আচরণের জট অতি সহজেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। অনেক ঘটনার আচরণ এলোমেলো তরঙ্গের মতো মনে হলেও, ফুরিয়ার দেখিয়েছেন যে ওই এলোমেলো তরঙ্গ আসলে কতকগুলি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের তরঙ্গের সমষ্টিমাত্র।

ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি এখনও শৈশবস্থাতেই আছে। ফুরিয়ারের মতো আশাবাদী কিছু বৈজ্ঞানিক মনে করেন শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই নয়, মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চায় এ এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। অন্য ক্যাম্পের লোকেরা মনে করেন আধুনিক সাজপোশাকের মতো এর প্রয়োগ একটা ফ্যাশন মাত্র, অন্তত ছবি সঙ্কোচনের ক্ষেত্রে। শৈশবস্থাতেই এই বিষয়টির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্বন্ধে প্রতিকূল মন্তব্য ইতিহাসের ধোপে নাও টিকতে পারে। ফুরিয়ার সম্বন্ধে আমরা সামান্য কিছু জানলাম। আসলে সব যুগে, সব দেশে এবং সব পেশাতেই পণ্ডিতদের মধ্যেও কিছু ঈর্ষাকাতর প্যাঁচালো মানুষ থাকেন। তাঁরা যদি ওপরের তলার মানুষ হন তা হলেই বিপদ। যাইহোক,  বিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, কেপলার, ডারউইন, ম্যাক্সওয়েল, আইনস্টাইনের মতো মনীষীরাও দেশকালের সীমা লঙ্ঘন করে যখন যুগান্তকারী সৃষ্টিগুলি করেছিলেন, সমসাময়িক দার্শনিক ও বিজ্ঞান সমাজের মধ্যে তখনও সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কিন্ত তা স্থায়ী হয়নি, তবে ইতিহাসের কোলাহলে অন্ধ সমালোচকদেরও পরে আর চিহ্নিত করা যায়নি।



Tuesday, June 14, 2022

ইলেকট্রনিক মেল


ইলেকট্রনিক মেল

প্রযুক্তির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে বিগত কয়েকটি শতাব্দীতে এক একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তির আধিপত্য বিরাজ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যান্ত্রিক প্রযুক্তির পরিণতি হ'ল শিল্পবিপ্লব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আধিপত্য বিস্তার করল বাষ্পীয় ইঞ্জিন ছাড়াও বাষ্পচালিত নানাবিধ যন্ত্র। একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যদি প্রশ্ন ওঠে যে কোন্ নির্দিষ্ট প্রযুক্তির অবদান বিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করবে, তা হলে দ্বিধাহীন ভাবে উত্তর দেওয়া যেতে পারে - যোগাযোগ ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রযুক্তি। এটা হ'ল সেই প্রযুক্তি, যার কল্যাণে বাড়িতে বসে টেলিফোন রিসিভার তুলে সরাসরি ডায়াল করা যাচ্ছে বিলেত-আমেরিকায়। অথবা রুফ-টপ অ্যান্টেনা খাড়া করে ঘরে বসে টিভির পর্দায় দেখা গেছে বিশ্বকাপ '৯৪ খেলা। আরও এক ধাপ এগিয়ে বলা যায় যে কলকাতার  কোনও প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার টার্মিনালে বসে সুদূর জাপান বা ইউরোপ-আমেরিকার, এমনকি যে কোনও জায়গার কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে। ইলেকট্রনিক মেল ; পেশার জগতে সংক্ষেপে ই-মেল (e-mail) এই জাতীয় অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু। সাধরণ ডাক ব্যবস্থায় ডাক বিলির জন্য প্রয়োজনীও সময় নির্ভর করে জায়গার ভৌগোলিক অবস্থানের উপর। সময় লাগে সাধারনত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। এ ছাড়া ভুলচুকের ঘটনা খুব কম ঘটলেও, চিঠি যে নির্দিষ্ট গন্তব্য স্থানে পৌঁছবেই তারও ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা নেই। ইলেকট্রনিক মেলের বিলি ব্যবস্থায় সময়ের হিসেবটা জায়গা নিরপেক্ষ এবং সুনিশ্চিত। 

বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব এই সংযোগ ব্যবস্থা কিভাবে সম্ভব হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে আলোচনা শুরু করব। টেলিফোন আবিষ্কার হ'ল আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রথম ভিত্তিস্তম্ভ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, ১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ টেলিফোনে প্রথম ঘন্টাটি বাজিয়ে সেই শুভক্ষণ ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই শুরু হয়ে যায় টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন। পাশাপাশি টেক্কা দেওয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি এই প্রগতিকে করেছে আরও ত্বরান্বিত এবং মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে যোগাযোগ সংক্রান্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ও সস্তার যন্ত্রপাতি। পরবর্তীকালে সুলভ এবং শক্তিশালী টেবল-টপ কম্পিউটার যন্ত্রের আবিষ্কার এবং যোগাযোগের কাজে তাদের সদ্ব্যবহার দৃশ্যপটকে এক লাফে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন মাত্রায়। কাজেই অত্যাধুনিক ও উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থার চাবিকাঠি এক দিকে যেমন লুকিয়ে আছে স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার যন্ত্রের তথ্য সংগ্রহ, সেগুলোর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার  এবং সংরক্ষণের উপর, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ তামার তারের মাধ্যম ছাড়াও ফাইবার অপটিকস, মাইক্রোওয়েভ বা কৃত্রিম উপগ্রহ  (Communication Satellite) ইত্যাদি উন্নত মাধ্যম মারফত সেগুলোকে গন্তব্য স্থানে পৌঁছে দেবার কায়দায় বড়সড় পরিবর্তন এসেছে।

টেলিফোন ও ই-মেলের মধ্যে সাদৃশ্য অনেক। বর্তমান টেলিফোন নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়েই ই-মেল ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। সুতরাং একটি টেলিফোন আর একটি টেলিফোনে সঙ্গে কিভাবে সংযোগ স্থাপন করে, সেটা আলোচনা করলেই, ই-মেলে যোগাযোগের ব্যাপারটা বুঝে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক কথাটা প্রবন্ধে প্রায়শই ব্যবহার করার দরকার হবে বলে পরিভাষাটির সংজ্ঞার প্রয়োজন। ব্যবহারিক জীবনে যে কোনও ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক রীতি-পদ্ধতি মেনে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা বা নক্সাকে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে নেটওয়ার্ক। যেমন দেশব্যাপী রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনাকে বলা যেতে পারে রেলওয়ে নেটওয়ার্ক। দেখা যাক টেলিফোন নেটওয়ার্কের চেহারাটা কি রকম আপনার বাড়ি থেকে মাত্র এক জোড়া তামার তার বেরিয়ে এসেছে।  অথচ আপনি পৃথিবীর যে-কোনও জায়গার টেলিফোনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন ! এটা সম্ভব হয়েছে এলাকাপিছু একটি এক্সচেঞ্জ খাড়া করে ( আপনার বাড়ির তার দুটি চলে গেছে আপনার এলাকার এক্সচেঞ্জে)। এক্সচেঞ্জ বস্তুটি ধরে নেওয়া যেতে পারে স্বয়ংক্রিয় একাধিক বহুমুখী সুইচের সমন্বয়। আজকের আধুনিক যুগে সুইচগুলো কম্পিউটার চালিত ইলেকট্রনিক সুইচ (ইলেকট্রনিক এক্সচেঞ্জ)। আমাদের দেশে অবশ্য এখনও বহু শহরে ইলেকট্রোমেকানিকাল স্ট্রোজার বা ক্রশবার এক্সচেঞ্জও চালু আছে। সুইচগুলো বহুমুখী এই কারণেই যে আপনি আপনার টেলিফোন থেকে যে কোনও জায়গায় সংযোগ স্থাপন করতে পারেন ; এবং একাধিক, কারণ একই সময়ে এক্সচেঞ্জ অধীনস্থ আরও অনেক গ্রাহক তাঁদের আকাঙ্খিত জনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এছাড়া টেলিফোন ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এক্সচেঞ্জের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং এক্সচেঞ্জের কাজ হ'ল এক বা একাধিক গ্রাহককে উপযুক্ত যোগাযোগ মাধ্যম মারফত তাঁদের প্রত্যেকের আকাঙ্খিত গ্রাহকের সঙ্গে নির্ভুলভাবে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। আগেই বলা হয়েছে যে তামার তার ছাড়াও মাধ্যমগুলো হতে পারে অপটিক্যাল ফাইবার, মাইক্রোওয়েভ বা কৃত্রিম উপগ্রহ। সাধারনত বিভিন্ন টেলিফোনে সংযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক চেহারাটাকে প্রাসঙ্গিক পরিভাষায় বলা হয় টেলিফোন নেটওয়ার্ক। প্রান্তিক যন্ত্রটি (Terminal equipment) টেলিফোন না হয়ে যদি কম্পিউটার হয়, তবে তাকে বলা হবে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক - সেক্ষেত্রে গলার স্বরের পরিবর্তে মাধ্যমগুলোর মধ্যে দিয়ে সাংকেতিক ভাষায় যাতায়াত করবে কম্পিউটার প্রেরিত চিঠিপত্র সংবাদ বা তথ্য। এই জাতীয় নেটওয়ার্কের সঠিক পরিভাষা হ'ল Wide Area Network, সংক্ষেপে WAN, অর্থাৎ যে নেটওয়ার্কের বিস্তার নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গন্ডীর মধ্যে সীমিত নেই। নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নেটওয়ার্কগুলোর নাম হ'ল Local Area Network (LAN).  LAN-এ কম্পিউটারগুলো যোগাযোগের জন্য এক্সচেঞ্জ জাতীয় কোনও যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের সীমা লঙ্ঘন না করে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে কম্পিউটারগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয় তামার তার বা অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে। প্রশ্ন হতে পারে যে একটি নির্দিষ্ট কম্পিউটার আরেকটি কম্পিউটারে সংবাদ বা তথ্য পাঠাবে কিভাবে ? সবগুলোই তো জোড়া আছে একই তার দিয়ে। আসলে নেটওয়ার্কের প্রতিটি কম্পিউটারের নিজস্ব সাংকেতিক পরিচিতি সফটওয়্যারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি কম্পিউটার অপর কম্পিউটারের উদ্দেশ্যে তথ্য পাঠানোর সময় শেষোক্ত যন্ত্রটির সংকেতও তথ্যের শুরুতে জুড়ে দেয়। নেটওয়ার্কের সেই কম্পিউটারই তথ্য সংগ্রহ করবে যার সঙ্গে প্রেরিত তথ্যের সংকেত মিলে যাবে। কাজেই সঠিক ঠিকানায় তথ্য পৌঁছানোর কোনও অসুবিধা নেই। বস্তুত ইলেকট্রনিক মেলের জন্ম এই LAN-কে আশ্রয় করে এবং এর শৈশবাবস্থা কেটেছে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে গবেষণাগারের এক ঘর থেকে আর এক ঘরে কম্পিউটার মারফত চিঠিপত্র বা তথ্য আদান-প্রদানের কাজে। এদিকে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের তাগিদে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই টেলিফোন গ্রাহকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে উঠতে লাগল। গত একশ বছরে সারা পৃথিবী ছেয়ে গেছে তামার তারের টেলিফোন লাইনে। অনেক মানুষের বহু দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্ভব হয়েছে লাইনগুলো স্থাপনের কাজ। কারণ ওই লাইনগুলো স্থাপন করা হয়েছে বেশির ভাগ জায়গায় মাটির তলায় খাদ কেটে, কোথাও সমুদ্রতলদেশ আশ্রয় করে, কোথাও বা ল্যাম্প পোস্টের মাথা বেয়ে। মোদ্দা কথা টেলিফোন লাইনের বিনিয়োগে খরচের অঙ্কটা ছিল বড়সড় আকারেরই। এদিকে সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকেই আমেরিকা-ইউরোপে শুরু হয়ে গেছে আধুনিক প্রযুক্তির রমরমা। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মহাকাশে উড়েছে কৃত্রিম উপগ্রহ। টেবল-টপ কম্পিউটারের ব্যবহারও শুরু হয়ে গেছে জোরকদমে। বিশেষজ্ঞরা চিন্তা করলেন যে নেটওয়ার্ক স্থাপত্য (Network Architecture) কাজে লাগিয়ে কিভাবে নবীন ও প্রবীনের মধ্যে গাঁটছড়া বেঁধে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ব্যাপক ও জোরদার করা যায়। বিশেষজ্ঞদের এই হিতচিন্তার ফলে গবেষণাগারের গন্ডী পার হয়ে ইলেকট্রনিক মেল ছড়িয়ে পড়ল শহর-শহরান্তর থেকে দেশ-দেশান্তরে। সামান্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ যে যন্ত্রটি এই দুই প্রান্তিক টেকনোলজির সমন্বয় সাধনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে তার সম্বন্ধে দু'চার কথা বলা প্রয়োজন। 

যে ধরনের সস্তার তামার তারের মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেতে গলার স্বর প্রেরিত হয়, সেই একই তারের মধ্য দিয়ে কম্পিউটারের সংকেত সরাসরি পাঠানো সম্ভব নয় ; তার রূপান্তরের প্রয়োজন। এর কারণ গলার স্বর নিরবচ্ছিন্ন এবং ওই স্বরের সমতুল্য বৈদ্যুতিক সংকেত শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্ন নয়, তার কম্পাঙ্কও প্রতি সেকেন্ডে ২০ থেকে ৩০০০ বার। টেলিফোন লাইনের ডিজাইন করা হয় মোটামুটি ওই ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত বহন করার জন্য। পক্ষান্তরে কম্পিউটার প্রেরিত বৈদ্যুতিক সংকেতের চরিত্র একেবারেই অন্য রকম -    দুটি নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক মানের মধ্যে ওঠা-নামা করে এবং ওই ওঠা-নামা করাটাও তাৎক্ষণিক। অর্থাৎ গলার স্বরের সমতুল্য বৈদ্যুতিক সংকেতের মতো নিরবচ্ছিন্ন নয়। এই ধরনের লাফ দিয়ে ওঠানামা সংকেতকে বলা হয় পালস্। টেলিফোন লাইনের মধ্যে দিয়ে যদি এই জাতীয় পালস্ চালনা করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা অবিকৃত অবস্থায় গন্তব্য স্থানে পৌঁছাবার সম্ভাবনা কম। গন্তব্য স্থানের দূরত্ব যত দীর্ঘ হবে, বিকৃতির সম্ভাবনা হবে ততই প্রবল। এই ঝামেলা এড়াতে কম্পিউটার ও টেলিফোন লাইনের মাঝখানে রাখা হয় মোডেম (Modem) নামে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র। মোডেমের প্রাথমিক কাজ দুটি। (১) কম্পিউটার প্রেরিত পালস্-এর দুটি বিচ্ছিন্ন (discrete) মানের জন্য আলাদা আলাদা দুটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের নিরবচ্ছিন্ন (continuous) সংকেত তৈরি করে টেলিফোন লাইনে চালনা করা ; (২) উদ্দিশ্ট কম্পিউটারে গৃহিত হবার আগে আবার মূল পালস্-এ রূপান্তর করা, উন্নততর মোডেমে আরও যে সব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাদি থাকে তা আমরা প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করব।

আগে যতটুকু বলা হ'ল, তা থেকে হয়তো বোঝা যাচ্ছে যে একটি পার্সোনাল কম্পিউটার (PC) যা ই-মেল সংক্রান্ত কমিউনিকেশন সফটওয়্যার চালাতে সক্ষম, এবং এস টি ডি (STD) টেলিফোন লাইন থাকলেই প্রাথমিক ভাবে ই-মেল চালু করা সম্ভব। দাম, ক্ষমতা এবং সুযোগ সুবিধের তারতম্যে বিভিন্ন জাতের পি-সি বাজারে পাওয়া যায়। মোডেম নির্বাচনের ব্যাপারেও ওই একই নিয়ম। ন্যুনতম যতটা অর্থ বিনিয়োগে এগুলো পাওয়া যাবে তার পরিমাণ আজকের দিনে তিরিশ হাজার টাকার কাছাকাছি। সঙ্গে একটা সাদামাটা প্রিন্টার থাকলে খরচের মধ্যে আরও হাজার দশেক টাকা জুড়ে দিতে হবে। প্রযুক্তি সংক্রান্ত ব্যাপারটার এইখানেই ইতি। বাকি রইল ভারত সরকারের বিশেষ কতৃপক্ষের (Dept. of Electronics) অনুমতি এবং দেশব্যাপী ই-মেলের প্রসারের স্বার্থে প্রযুক্তি ও আমলা সংক্রান্ত যে পরিকাঠামো উক্ত কতৃপক্ষকে বজায় রাখতে হয় তার আংশিক খরচ বাবদ নির্দিষ্ট অঙ্কের বাৎসরিক অনুদান, যা (এক লাখ টাকার কাছাকাছি)। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ বলে মনে হতে পারে। তবে সরকারি কাজকর্মে এবং বিশেষ করে শিক্ষাজগতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের বিপুল তথ্যভান্ডারের পারস্পরিক আদান-প্রদানের কাজে ই-মেলের ব্যবহার আলোচনা করলে বোঝা যাবে যে এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র সুবিধাজনক নয়, লাভজনকও বটে।

কয়েক দশক আগেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যে পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান করা হতো, তার পরিমাণ ছিল সীমিত। আজকের যন্ত্রশিল্পের যুগে তথ্যভান্ডার বেড়ে চলেছে সীমাহীনভাবে। তথ্যের চরিত্র হয়েছে অনেক জটিল এবং পরস্পর নির্ভরশীল। এ ছাড়া তথ্যের মূল্য প্রায়ই বাঁধা থাকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারপযোগিতার সঙ্গে। সুতরাং উন্নতমানের যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া এই বিশাল তথ্যের সদ্ব্যবহার প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।  টেলিফোন, টেলেক্স, ফ্যাক্সের তুলনায় ই-মেলের জনপ্রিয়তার কারণ হ'ল, এই ব্যবস্থায় যোগাযোগ স্বয়ংক্রিয়, দ্রুত এবং সস্তা। খরচের ব্যাপারটা আপাতত স্থগিত রেখে ই-মেলের উপকারিতা ও ব্যবহারের উপযুক্ত ক্ষেত্রের কয়েকটা উদাহরণ দিতে চাই।

অফিস-কাছারি সংক্রান্ত কাজকর্মে অহরহ টেলিফোন ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পরিসংখ্যান বলে যে এক অফিস থেকে আর এক অফিসে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে অপর প্রান্তের গ্রাহকের তাৎক্ষণিক সন্ধান না পাবার সম্ভাবনা শতকরা ৭৫ ভাগ। ব্যবহারিক জীবনে প্রায় প্রতিদিনই 'তিনি আপাতত চেয়ারে নেই বা তিনি মিটিং-এ আছেন বা উনি আজ আসেননি, ট্যুরে আছেন' জাতীয় উত্তর শুনতে শুনতে বা বলতে বলতেও আমরা প্রত্যেকেই বিরক্ত। ই-মেলের দৌলতে এই বিরক্তিকর পরিস্থিতি থেকে খুব সহজেই অব্যাহতি পাওয়া সম্ভব। কারণ এই ব্যবস্থায় সংযোগ স্থাপনে নিজস্ব উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না। আপনি আপনার বক্তব্য কী-বোর্ড মারফত কম্পিউটারে ঢুকিয়ে যথারীতি নির্দেশ দিয়ে যেতে পারেন নির্দিষ্ট কোনও সময়ে আপনার আকাঙ্খিত নম্বরে ডায়াল করতে হবে। প্রথমবার ডায়াল করে নিষ্ফল হলে নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদে পুনঃপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার নির্দেশ দেবার ব্যবস্থাও কম্পিউটারে আছে। যাইহোক,  লাইন পেয়ে গেলে, আপনার কম্পিউটারের ভান্ডারে সংরক্ষিত নির্দিষ্ট তথ্য আকাঙ্খিত ব্যক্তির কম্পিউটারে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। তিনি সে সময়ে উপস্থিত না থাকলেও কিছু এসে যায় না। তাঁর কম্পিউটার চালু থাকলেই হ'ল।  তিনি ফিরে এসে কী-বোর্ড মারফত উপযুক্ত নির্দেশ দিলেই তাঁর উদ্দেশ্যে পাঠানো যাবতীয় তথ্য বা সংবাদ ভিডিও স্ক্রিনে ফুটে উঠবে। সঙ্গে একটি প্রিন্টার থাকলে সংবাদটির প্রতিলিপি নিয়ে রাখারও অসুবিধে নেই।

গবেষণার কাজে ই-মেলের ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে-কোনও গবেষণার কাজে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র ও গবেষকগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বিশেষ প্রয়োজন। এমনও হতে পারে, যে-কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ের গবেষণা চলছে বেশ কয়েকটি গবেষণাগারের যৌথ প্রচেষ্টায়। গবেষণায় আজকাল প্রতিযোগিতা খুবই বেশি। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফলাফল প্রকাশিত হওয়াও বাঞ্ছনীয়। সুতরাং ভাব বিনিময়ের জন্য সব সময় পারস্পরিক যোগাযোগ রাখা অপরিহার্য। চিঠিপত্রে বা টেলিফোনে যোগাযোগ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষও বটে। ই-মেল এ ক্ষেত্রে শুধু সস্তাই নয়, দ্রুততম ও নিশ্চিত উপায়। সারা পৃথিবীতে কয়েক হাজার কম্পিউটার নেটওয়ার্ক আছে। ARPANET, BITNET প্রভৃতি বিদেশি নেটওয়ার্কগুলো শুধুমাত্র গবেষণার কাজের জন্যই উপসর্গিত। অর্থাৎ ওই নেটওয়ার্কগুলোতে গ্রাহক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে। ভৌগোলিক দূরত্ব যাতে গবেষণার কাজে বাধা সৃষ্টি না করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং-এর সুবিধে নিয়ে যোগাযোগ সংক্রান্ত কিছু সফটওয়্যার তৈরি করে নিয়েছিলেন উৎসাহী গবেষকরা। ই-মেল ব্যবহারের আরও একটা উপযুক্ত উদাহরণ দেব। ধরা যাক একটি চিঠি বিভিন্ন গ্রাহককে পাঠাতে হবে। চিঠির বয়ান ও গ্রাহকদের ঠিকানাগুলো কম্পিউটারে ঢুকিয়ে যথাযথ নির্দেশ দিলে, কম্পিউটার গন্তব্য ঠিকানায় চিঠিগুলো পাঠিয়ে দেবে। এই ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ব্রডকাস্টিং (Broadcasting)। ইলেকট্রনিক মেলের এই ধরনের ব্যবহার সেমিনার, কনফারেন্স জাতীয় আলোচনাচক্র সংগঠনের কাজে ভীষণ উপযোগী। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতের বেশ কয়েকটা রাজ্যের সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের জড়ো করে সম্প্রতি একটি আলোচনাচক্রের আয়োজন সম্ভব হয়ছিল ই-মেলের দৌলতে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো হবার প্রাক্কালে মস্কো শহরে অরাজকতা ছিল তুঙ্গে। চরমপন্থীরা টিভি স্টেশন, খবরের কাগজের অফিস ইত্যাদি যাবতীয় প্রচার সংস্থাগুলো দখল করে নেয়। কিন্ত তাঁরা ভুলে গেছিলেন ইন্টারনেটের কথা (Internet) । এই কম্পিউটার নেটওয়ার্কটি ব্যবহার করছেন পৃথিবীর চল্লিশটি দেশের অন্তত ১৫০ লক্ষ গ্রাহক। যাইহোক, ইন্টারনেট সোভিয়েত চরমপন্থীদের ভোলেনি। ইন্টারনেট গ্রাহকগোষ্ঠী ঘরে বসে মস্কোর রাস্তাঘাটে জমা ওঠা নাটকের কাহিনী জানতে পেরেছিলেন।  একটা রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে জনমত গড়ে তোলার কাজে সেই দিন ইন্টারনেট একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

তবে, সমাজজীবনে একজন মানুষের সঙ্গে আরেক জন মানুষের সংযোগ মাধ্যম হিসাবে ই-মেলের ব্যবহার পশ্চিমি দেশে বেশ ভালরকমই শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ আসবাবপত্রের  মতো ঘরে ঘরে পার্সোনাল কম্পিউটার ব্যবহার পশ্চিমি দুনিয়ায় খুবই মামুলি ব্যাপার। ই-মেল সফটওয়্যার কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারকে ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক এবং পারিবারিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে।এমনকি একই পরিবারের সদস্যরা মানে, বাবা-মা, ভাই,  বোনেরা পারস্পরিক প্রয়োজনে ভাব বিনিময় করছেন কম্পিউটার মারফত। প্রশ্ন - এটা ভাল না খারাপ ? আমার মতে এই ধরনের ব্যবহার একটা ফ্যাশনমাত্র এবং আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী। ওসব দেশে আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে। সামাজিক জীবন মূলত বস্তুভিত্তিক। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সেখানে অনেক প্রবল। এসব কারণে ওই দেশে যে রীতি-প্রথাগুলো সামাজিক নিয়ম বলে স্বীকৃত, আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে সেগুলোই নিয়মের ব্যতিক্রম। 

ই-মেলের এই ধরনের ব্যবহারের ঢেউ এদেশে এসে পড়তেও খুব একটা বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। কারণ তথাকথিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত তো বটেই, অর্থাৎ শহুরে এলিট  গোষ্ঠী পরিবারগুলো ভিন্নতা বজায় রাখার জন্য পশ্চিমি দুনিয়ার সেই জিনিসগুলোর অনুকরণেই প্রবৃত্ত, যেগুলো সহজলভ্য এবং এ দেশের কাঠামোতে অসামাজিক। এমনিতেই সামাজিক এমনকি পারিবারিক জীবনেও কৃত্রিমতার ছড়াছড়ি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রুচি এখন আর ব্যক্তিগত নেই, তা হয়েছে বিজ্ঞাপন দাতার স্বার্থনির্ভর। ওদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতিকে মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক বিসদৃশ ককটেল যার স্বাদ না দেশি না বিদেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারে সময় কাটাবার সঙ্গী হিসেবে ভি-সি-আর  এবং ভিডিও গেমের চল অধিক থেকে অধিকতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো ভিডিও পার্লার গজিয়ে ওঠা এবং সেগুলোর ভাড়া ক্রমশ নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা এই মন্তব্যকেই সমর্থন করে। এর ওপর পারিবারিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম যদি কম্পিউটার হয়, তবে তার পরিণতি সহজেই অনুমেয়। আসলে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বড়ই বিচত্র্য। প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের নিবিড়তা, আবেগ বা কুশল বিনিময়ের উষ্ণতা কি যন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব  ? কোথায় সেখানে প্রাণের স্পর্শ  ? আর প্রাণের স্পর্শই যদি না থাকে তবে তার অভাব পূরণ করবে একমাত্র হতাশা, পশ্চিমি দেশগুলোর মানুষেরাও হয়তো একদিন শিকার হবেন প্রাণস্পর্শের  অভাবজনিত এই হতাশার। আমার মনে হয় অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই আঁচ অন্দরমহল থেকে দূরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। চাকরির সুবাদে ১৯৭৫ সালে বেশ কিছু মাস আমেরিকাতে থাকার সুযোগ হয়েছিল। এমন একটা নিষ্প্রাণ দেশ আমি কখনও দেখিনি। অথচ সবকিছুই ঝকঝকে, তকতকে, অভাবের কোনও চিহ্ন দেখতে পাইনি সেখানে। কিন্ত সবই কেমন যেন impersonal. বম্বের মতো জনবহুল একটা শহর থেকে পৌঁছে মনে হ'ল যেন চতুর্দিকে শ্মশানের নীরবতা। বন্ধুবান্ধব ছাড়াও অনেক বাঙালি বাড়িতে গেছি। আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি ছিল না। বরং একটু বেশিই বলব। তবুও তাঁদের একাকীত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা, তারা মুখে না বললেও, আমার দৃষ্টি এড়ায় নি। অনাবাসী জীবনের দ্বন্দ্ব তাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সামাজিক এই পরিবেশে যদি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের মাধ্যম কম্পিউটার হয়, তাহলে তার পরিণতি সত্যিই মারাত্মক হবার কথা। মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। 


জনস্বার্থমূলক যে কোনও ব্যবস্থা চালু করার আগে যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক বিচার করে দেখা অপরিহার্য, তা হ'ল ব্যবস্থাটার রক্ষণাবেক্ষণের প্রযুক্তিগত কুশলতা এবং অর্থনৈতিক আনুকুল্য। কম্পিউটার এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আমাদের দেশে বহুদিন চালু আছে। সুতরাং রক্ষণাবেক্ষণের প্রযুক্তিগত যোগ্যতা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে। দেখা যাক অর্থনৈতিক দিকটা। ই-মেল ব্যবহারে খরচের ব্যাপারে শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই অনেক ধন্দ আছে। অনেকে বুঝে উঠতে পারেন না যে টেলিফোন, ফ্যাক্স, বা টেলেক্সের তুলনায় ই-মেলের খরচ বেশি না কম। পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ব্যবস্থার উপকারিতা বোঝাতে সকলেই প্রশ্ন করেন যে এত অত্যাধুনিক ব্যবস্থা তো খুবই খরচা সাপেক্ষ হবে। কিন্ত ব্যাপারটা আদৌ তা নয় আসলে আমার কাজ ছিল পূর্ব ভারতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে DOE-র তরফ থেকে ই-মেলের বিপনন অর্থাৎ মার্কেটিং। এই বিষয়ে খুঁটিনাটি সামান্য আলোচনা করলে ব্যাপারটা জলের মতো পরিস্কার হয়ে যাবে। এককালীন যে সব প্রাথমিক যন্ত্রাদির প্রয়োজন তা আগেই বলা হয়েছে।সেটা হ'ল এককালীন অনুদান। বাকি খরচ নির্ভর করবে তথ্য আদান-প্রদানে STD লাইন অধিগ্রহণের সময়ের উপর। যাইহোক, এটা কিছু নতুন কথা নয়। টেলিফোনে STD গ্রাহকরা এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। ইলেকট্রনিক এক্সচেঞ্জের অধীনস্থ গ্রাহকদের আঞ্চলিক যোগাযোগের খরচও এখন আর সময় নিরপেক্ষ নয়। নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদেই এক্সচেঞ্জের কম্পিউটারটি 'কুক' করে আওয়াজ দিয়ে জানিয়ে দেবে যে খরচের মিটার উর্দ্ধগামী। সুতরাং উদ্দেশ্য হবে কত শিগগির তথ্যের আদান-প্রদান সেরে ফেলা যায় - তা টেলিফোন বা ইলেকট্রনিক-মেল যাতেই হোক না কেন। এখন ব্যাপার হ'ল যে, তথ্য সরবরাহের দ্রুততা নির্ভর করে টেলিফোন লাইনের সেই সময়কার অবস্থার উপর। লাইনের অবস্থার মানে হ'ল এই - শহর এবং শহরতলিতে ক্ষুদ্র, ভারী শিল্পের কারখানায় বড় বড় মোটর, ওয়েল্ডিং সেট ইত্যাদি ইলেকট্রোমেকানিকাল যন্ত্রপাতি অহরহ চলছে। এই সব যন্ত্র থেকে উদ্ভূত তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ টেলিফোন লাইনে অনাবশ্যক ভোল্টেজ (সিগন্যাল) আবেশিত করতে পারে। এই জাতীয় অনাবশ্যক সিগন্যালকে বলা হয় নয়েজ (Noise)। নয়েজ যুক্ত টেলিফোন লাইনে যদি তথ্য সরবরাহের হার দ্রুত হয়, তবে অপর প্রান্তে তা গৃহিত হবার পর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া যাবে না। ব্যাপারটা দাঁড়াতে পারে 'ধান শুনতে কান' শোনার মতো। অর্থাৎ তথ্য এমনই বিকৃত অবস্থায় গৃহীত হতে পারে যে হয়তো তার মাথা-মুন্ডু কিছুই বোঝা গেল না। উঁচু জাতের মোডেমে (Smart Modem), লাইনের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকে এবং সেই অনুযায়ী হিসেব করে তথ্য সরবরাহের হার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

টেলিফোন লাইনের ক্ষেত্রে সাধারণত এই হারের নিম্নতম ও উর্দ্ধতম মান যথাক্রমে প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ ও ৯৬০০ বড্। বডের হিসেবটা মোটামুটি এইরকম - ১০ বড্ড হ'ল ইংরেজির একটি অক্ষর। একটা উদাহরণ: দেশ পত্রিকার একটি পৃষ্ঠায় কমবেশি ৩০০০ অক্ষর আঁটে। এই পাতাটি ই-মেল ব্যবহার করে পাঠাতে সময় লাগবে ১০০ সেকেন্ড (সবচেয়ে মন্থর) থেকে ৩ সেকেন্ডের (দ্রুততম) কাছাকাছি। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে দ্রুততার গড় হার সেকেন্ডে ১২০০ বডের কাছাকাছি। সুতরাং এই পাতাটির জন্য সময় লাগবে ২৫ সেকেন্ড।  সমপরিমাণ তথ্য ফ্যাক্স, টেলেক্স বা টেলিফোন যোগে পাঠাতে হলে, সময়ের মাপটা আসবে মিনিটের এককে। কাজেই ইলেকট্রনিক মেল অনেকটাই সস্তা। এতটা বিশদ আলোচনা করলাম এই কারণে যে বাজারে টেবল-টপ কম্পিউটারের ছড়াছড়িতে ভুঁইফোঁড় কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে। জোর গলায় তাঁরা অনেক কিছু বলছেনও। গণ্যমান্য অনেকের ধারণা আছে উন্নত মানের এই সংযোগ ব্যবস্থা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যে উদাহরণটি দেওয়া হ'ল আশা করা যায় তাতে ভুল ভাঙবে।

ইলেকট্রনিক মেল এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পৃথিবীকে এনে দিয়েছে ঘরের মধ্যে। এই বিস্ময়কর সংযোগ ব্যবস্থার প্রচারে এবং প্রসারে সরকারি সংস্থা DOE (Department of Electronics) উদ্যোগী হয়েছেন। তাঁরা যে নেটওয়ার্কটির উদ্যোক্তা, তার নাম ERNET (Education & Research Network)। নাম দেখেই বোঝা যায় যে শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারের জন্য এই নেটওয়ার্কটির জন্ম। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসাবে DOE ১৯৮৮ সালে এই কাজে হস্তক্ষেপ করেন। পাঁচটি আই আই টি, আই আই এস-সি (বাঙ্গালোর) ,ন্যাশনাল সেন্টার ফর সফটওয়্যার টেকনোলজি (বম্বে), এবং DOE (দিল্লি) - প্রাথমিকভাবে এই আটটি শিক্ষা সংস্থাকে বেছে নেওয়া হয় ERNET কম্পিউটার নেটওয়ার্কে যুক্ত করার জন্য। আপাতত সারা ভারতে ERNET-এর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় তিনশোর কাছাকাছি। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সংখ্যাটা হাজারে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রবন্ধটি লেখার মাঝে মধ্যেই একটি প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে একরকম বিবেকদংশনের জ্বালা আমাকে বিঁধেছে। প্রশ্নটা হ'ল আমাদের, অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের বাদামি বর্ণের মানুষদের নিজেদের দেশের মাটিতে বসে বিজ্ঞান প্রযুক্তির এই সামগ্রিক প্রগতিতে অবদান কতটুকু ? আমার মনে হয় পশ্চিমি মানুষদের তুলনায় কিছু না বললেই চলে। আমরা বেশির ভাগই কেবলমাত্র মাঝে মাঝে শামুকের মতো মুখ বের করে ঘরে বসে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার আনন্দ উপভোগ করছি আর আপ-টু-ডেট থাকার ভান করছি অগ্রিম খবর বিলিয়ে। খোঁজ করলে হয়তো দেখা যাবে যে বিদেশি গবেষণাগারে এবং শিল্পে কর্মব্যস্ত বিজ্ঞান-প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে বাদামি বর্ণের মানুষের সংখ্যা হয়তো কম নয়। প্রশ্ন তা হলে একটাই থেকে যায় যে বিগত চার-পাঁচ দশকে, সাড়া জাগানো বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তৈরি করার পরিবেশ আমরা কি সৃষ্টি করতে পারিনি ? তর্কে-বিতর্কে বা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাচক্রে শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় দাবিদারের সংখ্যা অগুনতি থাকলেও বাস্তব অন্তত তাই বলছে না। আসলে ফাঁকিবাজি আর বাকচাতুর্যে সস্তায় বাজি মাত করার ঝোঁকটাই সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে যাচ্ছে ; তা বিজ্ঞান-টেকনোলজি, খেলাধুলো বা রাজনীতি যাই হোক না কেন।

Sunday, June 12, 2022

অপরাজিত

 অপরাজিত:


গতকাল আমাদের বুড়ো-বুড়ির একটা বিশেষ দিন ছিল। আমাদের একমাত্র পুত্রবধূ, অমৃতা বলল, "বাবা আমরা সবাই মিলে, মানে তোমাদের নাতি নাতনি সমেত, South City Inox-এর multiplex-এ অপরাজিত দেখতে যাব।" ওদের ন্যায্য অনুরোধে আমরা কোনোদিন প্রত্যাখান করিনি। গতকালও তার ব্যতিক্রম হ'ল না। 

প্রায় ১২ বছর বাদে, হ্যাঁ তা এক যুগই হবে, হলে গিয়ে, তাও আবার Multiplex-এর চমৎকার বড় Screen with sterioscopic sound effects, যা আমাদের আগে দেখা ছিল না, সেটাও প্রত্যক্ষ করা যাবে - এইসব সাত সতের ভেবে রাজি হয়ে সবাইকে নিয়ে চলে গেলাম। 

বহু বহুদিন বাদে একটা অসাধারণ ভাল সিনেমা দেখে মুগ্ধ হলাম। অনীক দত্ত পরিচালিত ছবিটির প্রেক্ষাপট খবরের কাগজের review-তে পড়েছিলাম। সেটা সবারই জানা আছে আশা করব। অতীতকে ভালবেসে বেঁচে থাকা আমার অত্যন্ত প্রিয়। পথের পাঁচালি-র নির্মাণকে নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি করা শুধু কঠিনই নয়, বানিজ্যিক ব্যাপারটার কথা ভেবে সেটা রূপায়ণের ঝুঁকি নেওয়া একটা দুঃসাহসিক কাজ। অনীক দত্ত কোনও ত্রুটি রাখেননি। কাগজে পড়লাম যে ছবিটির নির্মাণে ১ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রথম ১০ দিনেই প্রায় ৩ কোটি টাকার sale দিয়েছে। Inox-এর মত প্রেক্ষাগৃহ প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। 

আসা যাক ছবির বিষয়ে। সত্যজিত রায় সদৃশ একজন অভিনেতাকে বেছে আনা প্রথম challenge. ছোটো পর্দা থেকে উঠে আসা জীতু কমল কামাল করে দিয়েছে। অসাধারণ অভিনয়। সেইদিনে এইরকম একটা ছবি তৈরি করা যে কি শ্রমসাদ্ধ এবং সময় সাপেক্ষ ছিল সেটা ছবিটার প্রতি ধাপে ধরা দিয়েছে। দেখতে দেখতে কয়েকবার চোখের জল বাধা মানেনি। কারণ আজও অপু, দুর্গা, সর্বজয়া, হরিহর পন্ডিত, ইন্দিরা ঠাকরুন -এদের সবাইকে আমরা কল্পনায় ধরে রেখেছি। আজও আমরা কাশ ফুলের মাঠ পেরিয়ে ট্রেন দেখতে দৌড় লাগাই। জীতু কমল ছাড়া আরও যাঁরা অভিনয় করেছেন, ছোট্ট পরিসরে তাঁরাও তাঁদের কর্মকীর্তির  ছাপ রেখে গেছেন। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের ভূমিকায় পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষনের স্ত্রীর ভূমিকায় মানসী  সিনহা, অপুর স্ত্রী এবং মায়ের ভূমিকায় যথাক্রমে  সায়নী ঘোষ ও অনসূয়া মজুমদার এবং হরিহর পত্নী হিসেবে অঞ্জনা বসুর অভিনয়শিল্প নজর কেড়েছে। ইন্দিরা ঠাকরুনের ভূমিকায় যে বৃদ্ধাকে কাজে লাগিয়ে অভিনয় করানো হয়েছে, তা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। কালো-সাদা ছবিটিতে দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে কেমন যেন নিজের মধ্যে হারিয়ে গেছিলাম। ২ ঘন্টা ১৮ মিনিটের ছবিটি যখন শেষ হয়ে গেল মনে হ'ল বড্ড তাড়াতাড়ি হয়ে গেল।

Saturday, June 11, 2022

কম্পিউটার কে চালায় ?



কম্পিউটার কে চালায় ?


"ব্রজরাজ লাহিড়ি জমিদার।  তাঁর সংসারের সব দায়-দায়িত্ব  জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধবীর ওপর। ঠাকুরঘর, হেঁসেল থেকে শুরু করে ভগিনী প্রমীলার গৃহশিক্ষক সুরেন্দ্রর চশমা বদলির ব্যবস্থাও তার হস্তক্ষেপ ছাড়া হয় না। তাছাড়া নায়েব-গোমস্তা, ঠাকুর-চাকর থেকে শুরু করে বাড়ির সব মানুষগুলোর, এমনকি পোষা কুকুরটারও নানান বায়নাক্কা,নালিশ-অভমিান সামাল দেওয়াও তার কাজ। মোদ্দাকথা ব্রজরাজের সংসারের যাবতীয় কাজের তদারকি এবং প্রত্যেকটির সময়মতো সুস্থ রূপায়ণের কাজেই মাধবী তার জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। সংসারের কোন খুঁটিনাটিই তার নজর এড়িয়ে যেতে পারে না। সে হ'ল জমিদার পরিবারের মধ্যমণি।" - মোটামুটিভাবে এই হ'ল শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মধ্যমণি 'বড়দিদি'র চরিত্র। 

সম্প্রতি গল্পটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল কম্পিউটার সংসারকেও সুস্থভাবে পরিচালনা করছে আর এক বড়দিদি। তবে সে রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া মানুষ-বড়দিদি নয়। এমনকি তাকে চোখ মেলেও দেখতে পাওয়া যায় না। অশরীরী। সে হ'ল ছোট-বড় সফটওয়্যার প্যাকেজের সমন্বয়ে তৈরি একটা মাস্টার সফটওয়্যার, যার পোশাকি নাম 'অপারেটিং সিস্টেম' সংক্ষেপে ও. এস।

কম্পিউটার সংসারের সদস্যদের সঙ্গে পাঠকের সামান্য পরিচয় করিয়ে দিয়ে মূল বক্তব্যে আসব। এই সংসারের সদস্যদের মূলত দু'ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার। সাদা বাংলায় যে কোনও কম্পিউটার সিস্টেমের যে-সব জিনিসগুলোকে চোখে দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো হার্ডওয়্যার। ক্ষমতাশালী অদৃশ্য সদস্যরা সফটওয়্যার, যার নির্দেশে হার্ডওয়্যার গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে কাজ করে। হার্ডওয়্যারের মুখ্য অংশগুলো হ'ল সি পি ইউ, মেমারি, হার্ড ডিস্ক, ফ্লপি ডিস্ক, কী-বোর্ড, ভিডিও টার্মিনাল, প্রিন্টার এবং মাউস। এরা প্রত্যেকেই বিশেষজ্ঞের ভূমিকা পালন করে। কী-বোর্ড বা মাউসকে বলা হয় ইনপুট ডিভাইস, যেহেতু তাদের ব্যবহার করে কম্পিউটারকে কোনও নির্দেশ দেওয়া হয় বা কোনও তথ্য কম্পিউটারের ভান্ডারে অর্থাৎ মেমারিতে রাখা হয়, নয়তো মাউসের ইঙ্গিতে ভিডিও স্ক্রিনের ওপর লেখা বা আঁকা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর কম্পিউটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তেমনই প্রিন্টার বা ভিডিও স্ক্রিন হ'ল আউটপুট ডিভাইস। তথ্য বা হিসেব-নিকেশের যাবতীয় ফলাফল কম্পিউটার এর মাধ্যমেই জানায়। ফ্লপি ও হার্ড ডিস্ক, তথ্যভান্ডার ছাড়াও ইনপুট ও আউটপুট, দুইয়ের ভূমিকা পালন করে। সি পি ইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট- নামেই বোঝা যাচ্ছে যে এটি হ'ল হার্ডওয়্যারের মধ্যমণি। মেমারিতে রাখা তথ্যের যাবতীয় প্রয়োজনীও হিসেব করা ছাড়াও সিস্টেমের সমস্ত হার্ডওয়্যার ইউনিটগুলোর তদারকি করা সি পি ইউ-এর কাজ। ফ্লপি, হার্ড ডিস্ক বা মেমারি, সবগুলোই তথ্যভান্ডার। তবে মেমারিকে বলা হয় মুখ্য তথ্যভান্ডার, কারণ সি পি ইউ তার থেকে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান করে।

সি পি ইউ ও মেমারিকে একটা যৌথ ইউনিট ধরে নিলে সহজ একটা নিয়ম ব্যবহার করে বোঝা যেতে পারে কোনগুলো ইনপুট বা আউটপুট ডিভাইস, কোনগুলো বা দুই-ই। মেমারিতে কিছু রাখা হলে, সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ইনপুট করা হ'ল। পক্ষান্তরে, মেমারি থেকে তথ্য বার করে আনলে সেই ব্যাপারটাকে বলা হবে আউটপুট করা হ'ল। চৌম্বক-মাধ্যম হওয়ার ফলে হার্ড ডিস্ক বা ফ্লপি ডিস্কের উপর তথ্য লিখে রাখা যায়, আবার প্রয়োজনমতো লিখিত তথ্য পড়ে নেওয়া যায়, যেমনটি করা যায় অডিও বা ভিডিও ক্যাসেটে। সুতরাং ডিস্কমেমারি ইনপুট-আউটপুট দুটোরই কাজ করে; যখন ডিস্কমেমারি থেকে কোনও তথ্য মুখ্য মেমারিতে রাখা হয় তখন বলা হবে ইনপুট করা হ'ল, উল্টোটা করা হলে বলা হবে আউটপুট করা হ'ল। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব যে আজকের দিনের কম্পিউটারে মুখ্য মেমারির ভান্ডার ব্যয়সাপেক্ষ, উঁচুজাতের সেমিকন্ডাকটার টেকনোলজির ফসল এবং দ্রুতগতিসম্পন, কারণ সি পি এউ-এর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হয় তাকে, ফলে অপেক্ষাকৃত সস্তা হার্ড ডিস্কের তুলনায় মুখ্য মেমারির সাইজ বা তথ্য ধারণক্ষমতা অনেক কম। একটা ছোট্ট উদাহরণের মাধ্যমে মেমারির ধারণক্ষমতা সম্বন্ধে  আন্দাজ করা যাক।

৮ মেগাবাইট মুখ্য মেমারি ও ৫০০ মেগাবাইট ডিস্ক মেমারি-ওয়ালা পার্সোনাল কম্পিউটার বা পি সি আজকাল খুবই মামুলি ব্যাপার। ১ মেগাবাইট = ১০ লক্ষ বাইট। প্রশ্ন হতে পারে এক বাইট-এর সঠিক মাপ ঠিক কতটা ? খুব সহজ। ইংরেজির একটি অক্ষর বা সংখ্যা বা দাঁড়ি, কমা, ফুলস্টপ, সেমিকোলন জাতীয় সাংকেতিক চিহ্ন রাখার জায়গাটুকুই হ'ল এক বাইট। আমার নাম  S. K. De । ফাঁক-ফোঁকর নিয়ে গোটা নামটা মেমারির ভান্ডারে ছয় বাইট জায়গা জুড়ে থাকবে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও হিসেব করে সহজেই দেখানো যায় যে ১২৫/১৩০ পৃষ্ঠার 'দেশ' পত্রিকার পাক্ষিক প্রকাশনার কুড়ি বছরের তথ্য ৫০০ মেগাবাইট একখানা ডিস্কের মধ্যে অনায়াসে ভরে রাখা যেতে পারে। টেকনোলজি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে এসব জিনিসগুলোর গুণগত মানের অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নানান জাতের সি পি ইউ, মেমারি, ইনপুট-আউটপুট ডিভাইস আন্তর্জাতিক বাজার ছেয়ে ফেলেছে। মুক্ত অর্থনীতির মওকায় এদেশও সেই ব্যাপারে খুব একটা পিছিয়ে নেই। যাইহোক, খুঁটিনাটিতে না গিয়ে মূল বিষয়ের আলোচনার জন্য যতটুকু জেনে রাখা জরুরি, এখানে আমরা সেইটুকুই আলোচনা করলাম। 

আসা যাক সফটওয়্যারের আলোচনায়। সফটওয়্যার হ'ল কম্পিউটার সিস্টেমের সঞ্জীবনী সুধা, কম্পিউটারের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। সফটওয়্যারের নির্দেশেই হার্ডওয়্যার কাজ করে। নির্দেশ দেওয়ার জন্য কম্পিউটারের অনেক ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। যেমন বেসিক, ফোর্টরান, কোবল, অ্যালগল, পাশক্যাল, সি, সি প্লাস প্লাস, ভিসুয়াল বেসিক না জানি আরও কত কিছু। যে কোনও একটা ভাষা ব্যবহার করে কম্পিউটার-প্রোগ্রাম লেখা যায়। প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার প্যাকেজ জিনিসটা কী, সেটা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ধরুন খাতার পাতায় ৭, ১২, ৫, ১..... পরপর এরকম অনেক সংখ্যা লিখে সংখ্যাগুলো ছোট থেকে ক্রমশ বড় সংখ্যার দিকে সাজাতে বলা হ'ল আপনাকে। আপনি চটপট সাজিয়ে দিলেন ১, ৫, ৭, ১২ । কী করে করলেন ? - কেন দেখেই তো বোঝা যায় ! আসলে আপনি দেখে বোঝেননি, বুঝে লিখেছেন। কী করে ? প্রক্রিয়াটা এরকম - প্রথম সংখ্যা থেকে শুরু করে পরপর প্রতি জোড়া সংখ্যা তুলনা করে করে গেছেন। যে জোড়াতে ছোট সংখ্যা বড় সংখ্যার পরে থাকবে, সেখানেই সংখ্যা দুটোর মধ্যে স্থান পরিবর্তন করে নিতে হবে। চারটে সংখ্যা নিয়ে দেখা যাক নিয়মটা কীভাবে কাজ করে।


তাহলে এখন বুঝে দেখুন সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য আপনার মগজ কী পরিমাণ কাজ করেছে। নিয়ম মেনে করলে চারটে কেন, হাজার হাজার সংখ্যা সাজানোর নির্ভুল কায়দা আপনার আয়ত্তে চলে আসবে। তবে সময়ও লাগবে অনেক। সংখ্যা যদি সত্যিই হাজার হাজার হয় এবং আপনি যদি খাতা-পেনসিল নিয়ে সাজাতে বসেন, তাহলে চুল তো আপনার পাকবেই, এমনকি রাঁচির টিকিটও কাটতে হতে পারে। অথচ শুধুমাত্র হাজার কেন, কয়েকশ লক্ষ এই ধরনের হিসেব চোখের পলকে নির্ভুলভাবে আপনার সামনে তুলে ধরবে আজকের দিনের কম্পিউটার। কারণ দ্রুত নির্ভুল হিসেবের ক্ষমতা এবং ক্লান্তিহীনতা- এই দুটোই কম্পিউটারকে মস্তিষ্কের তুলনায় সুবিধে দিয়েছে। কিন্ত কীভাবে করতে হবে, সেটা বুঝিয়ে দিতে হবে আপনাকেই। সমাধানের নিয়মকে সঠিক অনুক্রমে কম্পিউটারের ভাষায় অনুবাদ করার ব্যাপারটাই হ'ল প্রোগ্রামিং। অনুক্রমে ত্রুটি থাকলে ফলাফল ত্রুটিপৃর্ণ হবে। কারণ কম্পিউটারের বুদ্ধি নেই। সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়ার জন্য মগজ খাটিয়ে প্রোগ্রামটা আপনাকেই লিখতে হবে। গতানুগতিক নিয়ম মেনে উদাহরণের প্রবলেমটার সমাধান করা হয়েছে। গণিতবিদরা এই জাতীয় প্রবলেমের মোকাবিলার জন্য অনেক নিয়ম - যাকে কম্পিউটারের পরিভাষায় অ্যালগরিদম বলে, সেগুলো মাথা খাটিয়ে বের করেছেন, যাতে নাকি কম্পিউটার কম খেটে অর্থাৎ আরও কম সময় নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে।

বেশ কয়েকটা প্রবলেম সমাধানের মাধ্যমে আমরা ও এস- এর ভূমিকা আলোচনা করব। ধরা যাক আমরা হিসেব করতে চাই Z = X/Y. X ও Y -এর মান আলাদা আলাদা দুটি জটিল ফর্মুলা থেকে হিসেব করতে হবে। Z-এর একটি নির্দিষ্ট মানে আমরা আগ্রহী। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে Z-এর আকাঙ্খিত মান না পাওয়া পর্যন্ত X ও Y-এর মান হিসেব করে যেতে হবে। এমনও তো হতে পারে যে কোনও একবার Y-এর মান শূন্য বেরলো। সেক্ষেত্রে Z- এর মান আসবে অসীম সংখ্যা, যেটি অবাস্তব। এই ধরনের পরিস্থিতি কম্পিউটারেকে বুঝতে হবে এবং ব্যবহারকারীকে জানাতে হবে। প্রোগ্রামের এই ধরনের ব্যতিক্রমী আচরণের স্বাক্ষর নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যারে নথিভুক্ত হয়ে যায়। কিন্ত কম্পিউটার কী করে বুঝবে ? Exception handling routine শ্রেণীভুক্ত কতগুল প্রোগ্রাম আছে, যারা সর্বক্ষণ নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যারের ওপর নজরদারি করে প্রোগ্রামের এই ধরনের আচরণের মোকাবিলা করে। এছাড়া কে, কবে, কতক্ষণ কোন টার্মিনাল ব্যবহার করেছেন বা কার প্রোগ্রাম কত সময় নিয়েছে  - এই জাতীয় খাতা লেখার কাজের, যাকে বলে বুক কিপিং এর জন্যও বেশ কিছু রুটিন ব্যবহার করে। যাইহোক, এগুলোও, ও এস-এর অধীনে অসংখ্য প্রোগ্রামের কয়েকটি। প্রোগ্রাম বা রুটিন কথাগুলো মোটামুটি সমার্থক। 

কোন প্রোগ্রাম ও এস এর অধীনে, কোনগুলো নয় বলার থেকে উদাহরণের মাধ্যমেই ও এস আলোচনা করা অনেক সহজ। কারণ ও এস-কে নানান ধরনের পরিস্থিতির সামাল দিতে হয়। আর একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। একটি কম্পিউটারে অনেকের প্রোগ্রাম একই সঙ্গে চলছে। প্রত্যেকের একই সঙ্গে ডিস্ক থেকে তথ্য আমদানি প্রয়োজন হতে পারে অথবা প্রিন্টারে ছাপানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। যে কোনও কম্পিউটার সিস্টেমের ডিস্ক বা প্রিন্টারের সংখ্যা সীমিত। সত্যি বলতে কি একমাত্র টার্মিনাল ছাড়া বাকি ইউনিটগুলো সবাইকে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। সুতরাং ভাগ করে নেওয়ার ব্যাপারটা সুস্থভাবে হওয়া জরুরি। রাম ও শ্যামের প্রোগ্রাম যদি একই সঙ্গে ফলাফল ছাপাতে চায়, তাহলে এমন যেন না হয় যে কাগজের খানিকটায় ফুটে উঠল রামের হিসেবের ফলাফল, তারপর কিছুটা শ্যামের তারপর আবার রামের। সত্যিই কি তাই হয় ? হয় না, কারণ ও এস,  প্রিন্ট হ্যান্ডলিং প্রোগ্রাম সেমাফোরের সাহায্য নিয়ে এই জাতীয় পরিস্থিতির বুক-কিপিং করে। সেমাফোরের কাজ হ'ল পুলিশি করা, যেমন চৌরাস্তার মোড়ের পুলিশ এক দিকে হাত উঠিয়ে অন্য দিকের যান চলাচলের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। সেইরকম Input handling routine-এর কাজ হ'ল একাধিক টার্মিনাল বা ইনপুট ডিভাইস থেকে আসা তথ্যকে গুলিয়ে না ফেলে ঠিকঠাক শ্রেণীভুক্ত করা। মোদ্দাকথা, সি পি ইউ, মেমারি, ইনপুট-আউটপুট ডিভাইস, ব্যবহারকারীর প্রোগ্রাম ইত্যাদি যাবতীয় রিসোর্স সুস্থভাবে সামাল দেবার সমস্ত বিশেষজ্ঞ প্রোগ্রামের ডালায় সাজানো অপারেটিং সিস্টেমের সংসার, যাদের মাথা হ'ল মনিটর। মনিটর হ'ল বিশেষজ্ঞদের বিশেষজ্ঞ। বিশেষজ্ঞ প্রোগ্রামগুলোকে প্রয়োজনমতো এবং সময়মতো কাজে লাগিয়ে কম্পিউটেশনের সমস্ত ব্যাপারটার পরিচ্ছন্ন পরিচালনা ও নজরদারি করাই তার কাজ। সে হ'ল কম্পিউটার হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যারের মিলিত সংসারের বড়দিদি।

আগের দুটো উদাহরণে আমরা দেখলাম যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পরোক্ষভাবে ও এস-এর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছে। আরও একটা উদাহরণ নিয়ে দেখাব, সরাসরি নির্দেশ পাঠিয়ে ব্যবহারকারী কীভাবে ও এস-কে দিয়ে তার কাজ করিয়ে নেয়। এই উদাহরণে বুঝতে পারা যাবে মনিটরের হুকুম তামিল করার জন্য আরও কত প্রোগ্রাম আছে।। এই উদাহরণটা একটু খুঁটিয়ে আলোচনা করব।

চতুর্দিকে আজকাল পার্সোনাল কম্পিউটারের ছড়াছড়ি। এরকম একটা চালু পি সি-র  টার্মিনালে বসে কি-বোর্ডে d,a,t,e পরপর চারটি ইংরেজি অক্ষর টাইপ করে ক্যারেজ রিটার্ন টিপে দেওয়া হ'ল। ইতিমধ্যেই আমরা লক্ষ্য করেছি যে প্রতিটি অক্ষর টাইপ করার অব্যবহিত পরেই টার্মিনালের স্ক্রিনের উপর তা ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ ক্যারেজ রিটার্ন টিপে দেওয়ার আগেই স্ক্রিনের উপর date শব্দটা ফুটে উঠেছে। date শব্দটা ব্যবহারকারীর তরফ থেকে মনিটরের কাছে সরাসরি একটি সাংকেতিক নির্দেশ বা কমান্ড। মনিটরকে এই ধরনের বহু কমান্ড দেওয়া যায়। এই নির্দিষ্ট কমান্ড সেই দিনের তারিখ ও সেই মুহুর্তের সময় জানতে চাওয়া হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, কমান্ডের নাম যে 'date'-ই হতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কী কর্তব্য পালনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সাধারনত কমান্ডের সংকেত ঠিক করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী অজস্র কমান্ডের অন্তত কিছু কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ সম্বন্ধে আন্দাজ করতে পারেন। যেমন 'copy'  কমান্ডের কাজ হ'ল এক জায়গা থেকে নির্দিষ্ট ফাইল অন্য এক জায়গায় হুবহু নকল করা। কোথা থেকে কোন ফাইল কোথায় নকল করত হবে, সেই নির্দেশও কমান্ডের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। date, copy ইত্যাদি এই জাতীয় প্রোগ্রামকে ইউটিলিট প্রোগ্রাম বা রুটিন বলা হয়। দেখা যাক ক্যারেজ রিটার্নের পর কম্পিউটারের প্রতিক্রিয়া। এক্ষেত্রে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বছর, মাস, দিন-ক্ষণ সমেত সেই দিনের তারিখ হিসেব করে কম্পিউটার ভিডিও স্ক্রিনে পাঠিয়ে দেবে। কাজটা সামান্য মনে হলেও, শুনলে অবাক লাগবে যে কম্পিউটারকে কী প্রচন্ড মাথা ঘামাতে হয়েছে - অর্থাৎ তার কলকব্জাকে কী পরিমাণ কাজে লাগাতে হয়েছে। দ্রুতগতিসম্পন ঘুরন্ত ডিস্কের উপরের পিক-আপ হেডটা বহুবার আগু-পিছু করে ডিস্কে রাখা বেশ কিছু প্রোগ্রাম খুঁজে বার করে, সে মেমারিতে তুলে এনেছে। সি পি ইউ ওই প্রোগ্রামগুলোকে চালাবার সময় কয়েক লক্ষ সলিড স্টেট সুইচ (ট্রানজিস্টর) যথাযথ অবস্থা পরিবর্তন করেছে ( সুইচের দুটোই অবস্থা - অন কিংবা অফ, হ্যাঁ বা না)। এত সব কিছু ঘটে গেছে কয়েক পলকের মধ্যে। ঘটনাগুলোকে আরও একটু ভেঙে দেখলে ব্যাপারটা অনেকটা পরিস্কার হয়ে যাবে; ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো যেমন স্লো মোশানে দেখা যায়। 

নির্দিষ্ট অক্ষর টাইপ করা মাত্র কী-বোর্ডের ইলেকট্রনিক্স সার্কিট উক্ত অক্ষরের উপযুক্ত কোড তৈরি করে ফেলে এবং সি পি ইউ-এর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। সি পি ইউ সর্বদাই সজাগ। কাজেই সে মেমারিতে রাখা উপযুক্ত প্রোগ্রাম চালিয়ে  কী-বোর্ডের অক্ষর তুলে মেমারির নির্দিষ্ট জায়গায় সাজিয়ে রাখবে এবং সঙ্গে সঙ্গেই একই অক্ষর টার্মিনালের স্ক্রিনে পাঠিয়ে দেবে। অর্থাৎ যে অক্ষরটি টাইপ করা হ'ল সেটিই যেন মেমারি থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে স্ক্রিনে ফুটে উঠল, যাতে বোঝা যায় যে অক্ষরটা মেমারিতে গিয়ে পৌঁছেছে। এই সমস্ত কাজগুলো যে প্রোগ্রাম করেছে, তার নাম, ধরা যাক টার্মিনাল ড্রাইভার। যে মুহূর্তে টার্মিনাল ড্রাইভার ক্যারেজ রিটার্ন দেখতে পাবে, সেই মুহুর্তে বুঝতে পারবে, তখনকার মতো তার কাজ শেষ এবং সে আরও একটা প্রোগ্রাম চালু করবে, যার নাম দিলাম আমরা লিসনার (listner) কারণ ব্যবহারকারীর অনুরোধে কর্ণপাত করে যথাযথ কর্তব্য পালন করাই এই প্রোগ্রামের কাজ। মেমারির নির্দিষ্ট জায়গায় date কথাটা পাওয়া মাত্রই লিসনার বুঝতে পারবে যে date নামে একটি প্রোগ্রাম চালাবার অনুরোধ এসেছে। কিন্ত প্রোগ্রামটা আছে কোথায় ? ও এস-এর অধীনে অসংখ্য প্রোগ্রাম আছে এবং বেশির ভাগ প্রোগ্রামের প্রয়োজন সাময়িক। সুতরাং অপেক্ষাকৃত স্বল্প জায়গার মুখ্য মেমারিতে মনিটর, exception handling routine, টার্মিনাল ড্রাইভার, লিসনার জাতীয় কিছু জরুরি প্রোগ্রাম ছাড়া বাকি সব প্রোগ্রামগুলোকে ডিস্ক মেমারিতে রেখে দেওয়া হয়। মুখ্য মেমারি আর ডিস্ক মেমারির সম্পর্ক অনেকটা রান্নাঘর-ভাঁড়ার ঘরের সম্পর্কের মতো। গৃহিণীরা দিনের দিনের রান্নার জন্য সামান্য কিছু তেল-নুন-মশলা রান্নাঘরে এনে রাখেন। সিংহভাগই থাকে ভাঁড়ারে।

প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ডিস্ক মেমারির অ্যানাটমি নিয়ে সামান্য কিছু আলোচনা করব। উন্নত টেকনোলজিজাত অত্যাধুনিক ডিস্ক সিস্টেমের আলোচনা বাদ দিয়ে সাদামাটা ম্যাগনেটিক ডিস্কের প্রাসঙ্গিক ব্যাপারস্যাপারগুলোই আলোচনা করব। চার-পাঁচ ইঞ্চি ব্যাসের বৃত্তাকার চাকতিই ম্যাগনেটিক ডিস্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকটা পুরোনো দিনের ই পি (৪৫ আর পি এম) গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো। প্রতিটি চাকতির উভয়তলে চৌম্বকীয় পদার্থের কোটিং লাগানো আছে। এরকম গুটিকতক চাকতি সমান্তরালভাবে শক্তপোক্ত একটি দন্ডে বেশ মজবুত করে গাঁথা থাকে। দন্ডটি চাকতিগুলোর কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে প্রবিষ্ট করানো আছে। পরপর সমান্তরাল দুটি চাকতি দন্ডের উপর নির্দিষ্ট ব্যবধানে অবস্থান করে। সমস্ত ব্যবস্থাটা সাধারনত উল্লম্ব (vertically) ভাবে রাখা হয় এবং দ্রুতগতিসম্পন বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে ঘোরানো হয়। ঘুরন্ত ডিস্কের প্রতিটি তলের উপর একটি করে পিক-আপ হেড অবস্থান করে। সবগুলো হেডকে একই সঙ্গে ডিস্কের নির্দিষ্ট একটি ব্যাসার্ধ বরাবর আগু-পিছু যাতায়াত করবার কলকব্জা ডিস্ক সিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

আলোচনার সুবিধের জন্য আমাদের অনাড়ম্বর  ডিস্কে একটি চাকতি ও একটি  পিক-আপ হেড আছে এবং চাকতির চৌম্বকীয় তলের মাঝামাঝি বৃত্তাকার একটি পটিকে তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। বৃত্তাকার চওড়া পটিকে অত্যল্প দূরত্বের ব্যবধানে পাশাপাশি অবস্থানকারী বহুসংখ্যক ট্র্যাকের সমন্বয় বলে সহজেই কল্পনা করা যেতে পারে। লম্বা দৌড় প্রতিযোগিতায় সীমানার কাছ বরাবর সমস্ত মাঠ বেষ্টন করে চূন-দাগে আলাদা করা পাশাপাশি যেমন অনেক ট্র্যাক থাকে। ডিস্কের প্রতিটি ট্র্যাক আবার নির্দিষ্ট কয়েকটি ভাগে ভাগ করা থাকে, কম্পিউটারের ভাষায় যাদের বলা হয় সেক্টর। প্রত্যেক সেক্টরের নির্দিষ্ট তথ্যধারণ ক্ষমতা আছে। কাজেই অমুক নম্বর ট্র্যাকের অত নম্বর সেক্টর বললে নির্দিষ্ট একটি ডিস্ক তলের বিশেষ অংশ এককভাবে চিহ্নিত হয়ে যাবে। এখন, ডিস্ককে একটি ফাইলিং কেবিনেটের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কেবিনেটের মধ্যে যেমন প্রত্যেকটি ফাইলের আলাদা নাম এবং অস্তিত্ব আছে, ডিস্কে রাখা প্রতিটি প্রোগ্রামের জন্য তেমনই আলাদা আলাদা ফাইল আছে। স্রেফ তথ্যের জন্যও ফাইল থাকতে পারে। যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক সদস্যের নাম, ঠিকানা, বয়স, ব্লাড গ্রুপ ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য কী-বোর্ডে টাইপ করে ডিস্কে 'পার্সোনাল ডাটা' নাম দিয়ে ফাইল করে রাখা যায়। date প্রোগ্রামটাও ঠিক ওইরকম একটা ফাইলে রাখা আছে, যার নাম ধরা যাক 'date'। ফাইলের অন্য কোনও নাম হলেও কিছু আসে যায় না; তবে প্রোগ্রাম বা তথ্যকে ফাইলের নামে চিহ্নিত করাই রীতিসিদ্ধ।  কিন্ত ডিস্কের উপর রেকর্ড করা হাজার হাজার ফাইলের জঙ্গল থেকে প্রয়োজনীও ফাইলটা কী করে খুঁজে পাওয়া যাবে ? খুব সোজা, 'ডিরেক্টরি থেকে। ডিরেক্টরি একটা স্পেশাল ফাইল, যেখানে ডিস্কের বাকি ফাইলগুলোর প্রত্যেকটির নাম, ঠিকানা (কত নম্বর ট্র্যাকের কোন সেক্টর), জন্ম তারিখ অর্থাৎ কবে ফাইলটি সৃষ্টি হয়েছিল, আকারে কত বড় ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকে। ব্যস, 'date' ফাইল খুঁজে পাওয়ার আর কোনও অসুবিধে নেই। ফিরে যাওয়া যাক লিসনার প্রোগ্রামে, যার কাছে ডিরেক্টরির ঠিকানা আছে। লিসনার ঠিকানা পাঠানোমাত্রই ডিস্ক সিস্টেম পিক-আপ হেডকে ঘুরন্ত ডিস্কের ঠিক সেইখানে নিয়ে হাজির করে যেখানে ডিরেক্টরি ফাইল রাখা শুরু হয়েছে। ফাইলটা হয়তো বেশ কয়েকটা সেক্টর জুড়ে আছে। অসুবিধে নেই। হেড এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও ডিস্ক ঘুরে যাওয়ার ফলে পরপর সেক্টরে রাখা তথ্য পড়ে নিতে কোনও অসুবিধে নেই। সংগ্রহ করা তথ্য প্রথমে ডিস্কের নিজস্ব মেমারি, যাকে বলে বাফার, সেখানে জমা হয়। বাফার পূর্ণ হয়ে গেলে লিসনারের কাছে খবর চলে যায় এবং সে বাফার থেকে ডিরেক্টরিকে মেমারিতে তুলে এনে সেখান থেকে 'date' ফাইলের নাম-ধাম সংগ্রহ করে। পরিশেষে 'date' প্রোগ্রাম  ফাইলকে মুখ্য মেমারিতে নিয়ে আসে। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে 'date' প্রোগ্রাম কী কাজ করতে সক্ষম। কিন্ত কীভাবে করবে ? সময় মাপার জন্য প্রত্যেক কম্পিউটারে ইলেকট্রনিক ঘড়ি থাকে। নিশ্চয়ই মনে আছে যে সুইচ টিপে কম্পিউটার চালু করার পরে সে আপনার কাছ থেকে তখনকার ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, এমনকি মাস ও বছরের হিসেব চেয়ে নিয়েছিল। সেই সময় থেকেই ঘড়িটা প্রতি মিলিসেকেন্ডে (এক সেকেন্ডের এক সহস্রাংশ) একটা ইলেকট্রনিক কাউন্টার এক এক করে যোগ করে চলেছে।  অর্থাৎ, শূন্য অবস্থা থেকে শুরু করলে এক সেকেন্ড বাদে কাউন্টারের গণনা দাঁড়াবে এক হাজার। 'date' প্রোগ্রাম কাউন্টারের তাৎক্ষণিক গণনা তুলে এনে হিসেব করে ফেলে যে চালু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে কতটা সময় কেটেছে এবং শুরুতে আপনার উল্লেখ করা সময়ের সঙ্গে তুলনা করে নির্ভুলভাবে তখনকার সময় নির্ধারণ করে ফেলবে। সবশেষে ওই টার্মিনাল ড্রাইভার প্রোগ্রামের সাহায্য নিয়ে ফলাফল ভিডিও স্ক্রিনে পাঠিয়ে দেবে।

ডিস্কের অ্যানাটমি ও 'date' প্রোগ্রামের খুঁটিনাটি নিয়ে এতগুলো কথা খরচ করার উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। আমরা দেখলাম যে সামান্য একটা জিজ্ঞাস্যের উত্তর দিতে গিয়ে ডিস্কের হার্ডওয়্যার ও ইলেকট্রনিক সার্কিট ছাড়াও আরও কতগুলো সফটওয়্যার প্যাকেজকে কাজ করতে হয়েছে। ও এস মনিটরের পরিচালনায় সমস্ত ব্যাপারটাই ঘটেছে সুশৃঙ্খলভাবে। অনেক ব্যবহারকারীর প্রোগ্রাম একসঙ্গে চালাবার সময় মনিটরকে আরও যে কত জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই পরিস্থিতিতেও কাজকর্ম সম্পন্ন হয় সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে।

ইতিমধ্যে আমরা আরও একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। এতগুলো কাজ করা সত্ত্বেও, ক্যারেজ রিটার্ন টাইপ করা মাত্রই চটজলদি উত্তর এল কীভাবে ? এটা সম্পূর্ণ হার্ডওয়্যারের অবদান। সি পি ইউ চলে আরও একটি নির্দিষ্ট ঘড়ির তালে তালে। কম্পিউটারের জাত অনুসারে নির্ভর করে এই ঘড়ির দ্রুততা। আজকের দিনে সাধারণ পি সি-র সি পি ইউ-এর ঘড়িটা টিক টিক করে সেকেন্ডে কয়েক কোটি গুনে ফেলতে পারে। প্রতিটি ঘটনাই সি পি ইউ-কে দিয়ে যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ বা 'ইধর কা মাল উধর' - অর্থাৎ এখানকার তথ্য ওখানে রাখা জাতীয় কিছু না কিছু মৌলিক কাজ করিয়ে নেয়। গণিতবিদরা অনেক আগেই প্রমাণ করেছেন যে, যে-কোনও জটিল ফর্মূলাকে এই ধরনের মৌলিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে নেওয়া যায়। একটি কম্পিউটার সিস্টেমের সামগ্রিক দ্রুততায় বাদ সাধে ডিস্ক সিস্টেম। মেকানিক্যাল কলকব্জায় তৈরি চাকতি দ্রুত মোটরের সাহায্যে সেকেন্ডে ৫০/৬০ বার ঘুরতে পারে এবং পিক-আপ হেডটিও চাকতির উপর ততোধিকবার যাতায়াত করতে পারলেও সি পি ইউ-এর দ্রুততার তুলনায় তা কিছুই নয়।

ইলেকট্রনিক কম্পিউটারে অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারের রেওয়াজ আদৌ নতুন নয়। এর সূত্রপাত হয় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৪০ সালের শেষের দিকে। এই সহজ সরল  ও এস-এ ইনপুট-আউটপুট রুটিন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তারপর হার্ডওয়্যারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ও এস-এর ক্রমবিকাশ হতে থাকে। ব্যবহারকারীদের চাহিদাও দিনে দিনে বেড়েছে। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত যেসব ও এস তৈরি হয়েছে সেগুলো সবই ব্যাচ প্রসেসিং ও এস, অর্থাৎ ব্যবহারকারীদের জমা দেওয়া গাদা গাদা 'জব' (ব্যবহারকারীর প্রোগ্রামকে জব বলা হয়) একটির পর একটি সুসম্পন্ন করাই ছিল তার কাজ। ইনপুট-আউটপুট রুটিন ছাড়াও মুখ্য মেমারি ডিস্ক মেমারি তদারকি করার রুটিনও ছিল ব্যাচ প্রসেসিং ও এস-এর সঙ্গী-সাথী। বিজ্ঞান-টেকনোলজি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের হিসেব-নিকেশের জন্য জটিল অথচ চেনা অনেক গাণিতিক ফর্মুলার সাহায্য নিতে হয়। এই সব ফর্মুলাগুলোর সমাধানের প্রোগ্রাম নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ম্যাথামেটিক্যাল লাইব্রেরি। এই ধরনের লাইব্রেরি উন্নত ব্যাচ প্রসেসিং ও এস-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যবহারকারীর প্রোগ্রামে যেখানেই কোনও স্ট্যান্ডার্ড ফর্মুলার উল্লেখ থাকবে, সেখানেই ও এস ম্যাথামেটিক্যাল লাইব্রেরির উপযুক্ত রুটিনটি ব্যবহার করে মুশকিল আসানে সাহায্য করবে।  ধরা যাক একটি প্রোগ্রামে চার-পাঁচ জায়গায় y=sinx স্টেটমেন্টটি আছে (প্রোগ্রামের এক একটি লাইনকে সাধারনত একটি স্টেটমেন্ট বলা হয়। এবং x একটি পরিবর্তনশীল সংখ্যা। প্রোগ্রাম চলার সময় যখনই এই লাইনটি আসবে, তখনই ও এস-এর তত্ত্বাবধানে লাইব্রেরির নির্দিষ্ট রুটিন x-এর তখনকার মানের জন্য sinx এর মান হিসেব করে ফেলবে।

ক্রমোন্নয়নের পরের ধাপে ১৯৬০ সালে বাজারে এসে গেল টাইম-শেয়ারিং ও এস। পূর্বসূরিদের যাবতীয় সুযোগসুবিধে ছাড়াও এ ধরনের ও এস-এ যুক্ত হ'ল সি পি ইউ-কে যৌথভাবে ব্যবহার করার কায়দা। ইতিমধ্যেই হার্ডওয়্যারের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে এবং কম্পিউটারের জগতে টার্মিনালের ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছে। মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে পলকা হার্ডওয়্যারের কাঠামো, উন্নত ও এস-এর বাসস্থান হলে ব্যবহারকারীর সুবিধে থেকে অসুবিধে অনেক গুণ বেড়ে যাবে। টাইম-শেয়ারিং অপারেটিং সিস্টেমের আবির্ভাব ও এস-এর উন্নয়নে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, বলা যায় কম্পিউটেশনে সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা। টাইম-শেয়ারিং-এর অর্থ হ'ল সময় ভাগ করে নেওয়া। এর নজরদারিতে কম্পিউটার ভান্ডারে রাখা সমস্ত প্রোগ্রাম সমানভাবে সি পি ইউ-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হ'ল। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। মজা হ'ল, প্রত্যেক ব্যবহারকারীই ভাবছেন যে কম্পিউটার শুধুমাত্র তাঁরই প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। 'স্ট্যাটাস' (status) কম্যান্ড দিলেই সব চালু প্রোগ্রামের নাম, প্রত্যেকটির শুরু হওয়ার সময়, ইতিমধ্যে কতক্ষণ চলেছে ইত্যাদি তথ্য ভিডিও স্ক্রিনের উপর ফুটে উঠবে। আসলে এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদে একটি প্রোগ্রাম থেকে আর একটি প্রোগ্রামে সুইচ করে। 'স্ট্যাটাস' (status) বা 'date' জাতীয় কমান্ড - যাদের নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে কম্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ, তারও সৃষ্টি হয়েছে টাইম শেয়ার ও এস-এর আমল থেকে। পরবর্তীকালে গ্রাফিক্স লাইব্রেরির ব্যবহার শুরু হ'ল এবং ও এস ঘরানার আরও কিছুটা সমৃদ্ধ হ'ল মাউসের হাত ধরে। টাইপ করে কম্যান্ড দেওয়ার পরিবর্তে টার্মিনালের সঙ্গে লাগানো মাউস নাড়াচাড়া করে স্ক্রিনের উপর ফুটে ওঠা গ্রাফিক্স সংকেতের ওপর তীর চিহ্নের নিয়ন্ত্রিত ইঙ্গিতে প্রোগ্রামাররা কম্যান্ড দেওয়া শুরু করলেন। ব্যাপারটা অনেকটা রিমোট সুইচ ব্যবহার করে আধুনিক টিভি সেটে যেমন চ্যানেল ও সাউন্ড নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ও এস নিয়ে চিন্তাভাবনা থেমে থাকেনি। ১৯৮৫ সালের পর থেকেই বড়সড় এবং মাঝারি ধাঁচের (যাদের বলা হয় মেনফ্রেম বা মিনি কম্পিউটার) কম্পিউটারের জনপ্রিয়তা ক্রমশ কমতে থাকল। তাদের জায়গা দখল করে নিল অপেক্ষাকৃত অনেক সস্তা এবং ক্ষমতাশালী ওয়ার্ক স্টেশন ও পার্সোনাল কম্পিউটার। সস্তা যে কোনও জিনিসের চাহিদা বাড়ে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হ'ল না। সারা পৃথিবীতে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক লাফে অনেক গুণ বেড়ে গেল। আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যনতুন অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার প্যাকেজের আমদানি ব্যাপকভাবে শুরু হ'ল। ফলে এক নতুন বিপত্তি দানা বাঁধল। সব কম্পিউটার সিস্টেমে সব অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার রাখার ব্যবস্থা করতে হলে কম্পিউটার সিস্টেমের দাম ভীষণভাবে চড়ে যায়। নেটওয়ার্কিং-এর সুবিধে নিয়ে কম্পিউটার আর্কিটেক্টরা এই সমস্যার সমাধান করলেন। নেটওয়ার্কে অনেকগুলো কম্পিউটার এমনভাবে জোড়া থাকে যাতে সেগুলো স্বাধীনভাবে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। সুতরাং একটি দামি সিস্টেমের ভান্ডারে সমস্ত অ্যাপ্লিকেশন গচ্ছিত রেখে সিস্টেমটা নেটওয়ার্কে স্থাপন করা হলে নেটওয়ার্কের যে কোনও কম্পিউটার প্রয়োজনমতো তাদের ব্যবহার করত পারবে। নেটওয়ার্ক কম্পিউটারগুলোর সম্মিলত এই ব্যবস্থার পোশাকি নাম হ'ল ক্লায়েন্ট-সার্ভার মডেল (Client-Server model)। এই ধরনের পরিবেশে ও এস এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে গেল। এখন তার কর্মক্ষেত্র আর একটিমাত্র কম্পিউটারের মধ্যে সীমিত রইল না। কারণ ও এস-এর কাজ সকলের নজরদারি করা। কাজেই নেটওয়ার্কের প্রতিটি কম্পিউটার তার নিজের মধ্যে রাখা আলাদা আলাদা ও এস-এর তত্ত্বাবধানেই কাজ করছে। কিন্ত তাদের মধ্যে গাঁটছড়া বাঁধার দায়িত্ব পালন করছে প্রত্যেকটি ও এস-এর অধীনস্থ নেটওয়ার্কের প্যাকেজ। এ যেন 'একই সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন'। ও এস-এর উন্নয়নে বহু সৃজনশীল মানুষের অবদান আছে। ই ডব্লিউ ডাইক্সট্রা, ডি ই ক্নুথ, ই জি কফম্যান, পার ব্রিঞ্জ হ্যানসেন, স্টুয়ার্ট ম্যাডনিক, জন ডনোভ্যান প্রমুখ কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে।

ও এস জীবন্ত। বিবর্তনশীলতা,  পরিবর্তনশীলতা  অর্থাৎ জীবনের সব লক্ষণই তার মধ্যে বিদ্যমান। পান্ডুলিপি শেষ করার আগে পর্যন্ত ও এস-এর চরিত্র যতটুকু জানা আছে তাই ব্যক্ত করলাম। কম্পিউটার বিষয়ে গবেষণা অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। সুতরাং,  পাঠকের কাছে এই লেখা যখন পৌঁছবে তখন হয়তো দেখা যাবে যে নতুন কিছু হার্ডওয়্যার বাজারে এসে গেছে এবং ও এস-এর মৌলিক কাঠামোয় আরও কিছু গুণাবলী যুক্ত হয়েছে। ইনপুট-আউটপুট রুটিন সম্বল করে ও এস-এর ধারণা যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা হয়তো ভাবতেও পারেননি যে চল্লিশের দশকে পোঁতা ছোট্ট চারাগাছ আজ ডালপালা বিস্তার করে এক মহীরুহের আকার নেবে। প্রশ্ন হ'ল এটাই কি শেষ ? মনে হয় না। কারণ ব্যবহারকারীদের একটা দাবি মেটাতে না মেটাতেই তাঁরা পরবর্তী দাবি তুলে ধরেন। কাজেই ও এস গবেষণার কাজ কোনও দিনই শেষ হয় না। নতুন থেকে নতুনতর প্রশ্নের সমাধানে তার অনিঃশেষ যাত্রা। আসলে জীবন্ত জিনিস এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, সব সময়ই অবস্থান বদলায়।

অপারেটিং সিস্টেম বিশাল সাবজেক্ট। বিষয়টির ওপর বেশ কিছু বই বাজারে চালু আছে। কয়েক পাতার মধ্যে ও এস-এর আলোচনা করাটা বিষয়টির প্রতি সুবিচার করা হয়নি। এই লেখা তাঁদেরই জন্য, যাঁদের সঙ্গে কম্পিউটারের নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হয় না, কম্পিউটারের খুঁটিনাটি জানার তাঁদের সুবিধে নেই ; অথচ কম্পিউটার তাঁদের কাজে-কর্মে ভীষণ সাহায্য করে।

ও এস বিবর্তনের ইতিহাস ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে মৌল বিজ্ঞানের সঙ্গে দুটো জায়গায় এর মিল চোখে পড়ল। মৌল বিজ্ঞান অনুযায়ী বিশ্বব্রহ্মান্ডের যাবতীয় ক্রিয়া-বিক্রিয়ার নিয়ামক পাঁচ ধরনের বল - (১) ইলেকট্রিক ফোর্স  (২) ম্যাগনেটিক ফোর্স (৩) উইক নিউক্লয়ার ফোর্স (৪) স্ট্রং ফোর্স  এবং (৫) গ্র্যাভিটেশন। আপাতদৃষ্টিতে আলাদা অস্তিত্ব বলে মনে হলেও, সবগুলোকে একই সূত্রে বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং তাঁর জীবনের শেষ দু'দশক কেটেছিল এরই গবেষণায়। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তাঁরা মনে করেন, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশ শেষ হবার আগেই মহামিলন তত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যাবে। [ আইনস্টাইনের জন্মের আগেই (১) ও (২)-এর মিলনসূত্র - ইলেকট্রোম্যাগনেটিক থিওরি উপহার দিয়েছিলেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। এর বেশি তাঁর জীবদ্দশায় দেখা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ও শেল্ডন গ্লাশোর আবিষ্কৃত তত্ত্ব জন্ম দিল ইলেকট্রোউইক ফোর্সের (Electroweak force)। আবিষ্কর্তারা প্রমান করলেন যে এই তত্ত্ব (১), (২) ও (৩) এর একীকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। চার নম্বর বলকে একই তত্ত্বের আওতায় আনার কাজ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও, মহাকর্ষ  অর্থাৎ গ্র্যাভিটেশনকে মহামিলনের যজ্ঞে যুক্ত করা দুরস্ত।]

যাইহোক, এবার এ এস-এর দিকে তাকালে দেখতে পাচ্ছি, আজকের দিনের কম্পিউটারে ব্যবহার করা ও এস-এর মোটামুটি একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হয়ে গেছে।

মেনফ্রেম কম্পিউটারের ও এস, যাদের বলা হয় প্রোপ্রাইটরি অপারেটিং সিস্টেম (Proprietary operating system) তাদের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। সেই আলোচনায় আমরা যাব না; কারণ ওই ধরনের কম্পিউটারের দিন শেষ হয়ে গেছে। ডস (DOS), ও এস টু (OS2), ইউনিক্স (UNIX), উইনডো ৯৫ (Window 95), উইনডো এনটি (Window NT) - এই ও এস গুলোই বাণিজ্যিক বাজারে চলছে। ব্যবহারের সুবিধে-অসুবিধে বিচার করে ভবিষ্যতে হয়তো এক-আধটাই টিকে থাকবে। আপাতত পাল্লা ঝুঁকে ইউনিক্সের দিকে। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে যে কোনও জাতের কম্পিউটার হার্ডওয়্যারকে চালাবে ইউনিক্স অপারেটিং সিস্টেম। সুতরাং একটি প্রোগ্রাম, সেটি যে কম্পিউটারেই তৈরি হোক না কেন, অন্য সব কম্পিউটার তাকে গ্রহণ করতে পারবে। চারটি প্রাকৃতিক বলের মহামিলনকে আইনস্টাইন আখ্যা দিয়েছিলেন গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন (Grand Unification)। তারই জের টেনে বলা যায়, কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেমের ধারা ক্রমশ এগিয়ে চলেছে গ্র্যান্ড ইউনিক্সিফিকেশনের (Grand Unixification) দিকে।

সময়ের চাকা বেশ কিছুটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলে ও এস-এর যে চেহারা দেখতে পাই, তার সঙ্গে আজকের দিনের ও এস-এর মডেলের কোনও মিলই নেই। উপস্থিত বুদ্ধি দিয়েই সেদিনের ও এস-এর মডেল বোঝা যেত। আজকের মডেল হৃদয়ঙ্গম করার জন্য অনেকটা কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। কারণ তার অনেকটাই বিমূর্ত  (abstract)। মৌলবিজ্ঞান ও আর্টের সঙ্গে এখানেও অপারেটিং সিস্টেমের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিউটনীয় বলবিদ্যা এবং যুগান্তকারী আইনস্টাইনীয় বলবিদ্যা পদার্থের গতিবিধি ব্যাখ্যা করতে পারলেও, অণু-পরমাণুর গতিবিধির আচরণের ব্যাখ্যায় তা ব্যর্থ হয়। রাদারফোর্ড ও বোরের সহজ-সরল মডেলেও এটি ছিল। প্রয়োজন হয়েছিল শ্রয়ডিঙ্গার-হাইসেনবার্গের কোয়ান্টাম বলবিদ্যার, যা আজও অনেকের কাছেই কষ্টকল্পিত। কিন্ত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল যাবতীয় মডেলের সারবত্তা। আর্টের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। মন্দ্রিয়ানের (১৮৭২-১৯৪৪) গোড়ার দিকে আঁকা গাছের ছবির সঙ্গে শেষ বয়সে অঙ্কিত গাছের কোনও মিল নেই - যেন কিছু জ্যামিতিক আকৃতির বিন্যাস। পিকাশোর পরিণত বয়সে আঁকা একটি চিত্রকলায় আমরা দেখতে পাই একই রমণীর ধড়ে জোড়া মুন্ডু। আসলে সূক্ষ্ম, মননশীল এবং সৃজনশীল সৃষ্টিমূলক সাধনার পরিণতি ঘটে বিমূর্ত প্রকাশের মধ্যে। কারণ বিমূর্তনের (abstraction) মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিষয়ের গভীরতা, যার অতলান্ত খুঁজে পাওয়া যায় প্রাসঙ্গিক আরও অনেক নতুন পথের ইঙ্গিত। 




Monday, June 6, 2022

রিচার্ড ফিলিপস্ ফাইনম্যান

রিচার্ড ফিলিপস্ ফাইনম্যান

বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার সফলততম উপহার কোয়ান্টাম বলবিদ্যা (Quantum Mechanics) - যুগ্ম নায়ক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ও এরউইন স্রোডিঞ্জার। সাল ১৯২৬। পল ডিরাকের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের (Quantum Field Theory) গোড়াপত্তনও ওই কুড়ির দশকেই। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আধুনিক বিজ্ঞান অধ্যয়নের সব থেকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হলেও কুড়ির দশকের শেষ দিকে আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের প্রগতির পথে জগদ্দল পাথরের মতো বাধা সৃষ্টি করেছিল একটি দুরূহ সমস্যা। পৃথিবীর তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা দুই দশক ধরে মাথা ঘামিয়েছেন সমস্যাটি সমাধানে। পরিণতি হয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতায়। বিজ্ঞানের এমনই এক সঙ্কটের মুহূর্তে আবির্ভূত হলেন রিচার্ড ফিলিপস্ ফাইনম্যান। সম্পূর্ণ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করার ঝুঁকি নিয়ে এক বিকল্প ধারায় ভিত্তিস্থাপন করলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার। এই সূত্রে উদ্ভাবনা করলেন প্রথা-ভাঙা কিছু নিয়ম যার প্রয়োগে জগদ্দল পাথরের বাধা সরে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার পথ হ'ল সুগম।

বিজ্ঞানের জগতে ফাইনম্যান এক কিংবদন্তী - এক বিশাল অধ্যায় ও এই প্রবন্ধের মুখ্য চরিত্র। আলোচনায় জোর দেওয়া হয়েছে তাঁর বিজ্ঞানে অবদানের উপর। স্বাভাবিকভাবে এসে পড়েছে বিজ্ঞানীর বহুমুখী ব্যক্তিত্বের দিকগুলিও। কারণ রিচার্ড ফাইনম্যানের জীবন শুধুমাত্র তাঁর বৈজ্ঞানিক সত্তা ঘিরে নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে নানান বিষয়ের সক্রিয় শাখা-প্রশাখায়। জন্ম নিউ ইয়র্কের অনতিদূরে সমুদ্রপকূলবর্তী ছোট্ট শহর ফার-রকওয়ে।

পিতা ইহুদি ধর্মাবলম্বী মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান জন্মসূত্রে বেলারুশিয়ার মানুষ হলেও শৈশবেই দেশান্তরিত হন এবং আমেরিকা চলে আসেন। মা লুসিল ফিলিপস্ জন্মসূত্রে পোলিশ হলেও আজীবন নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। গৃহগত মায়ের ভালবাসা, হাস্যকৌতুক আর বান্ধবীসুলভ ব্যবহার রিচার্ডকে প্রভাবিত করেছিল।  সাধারণ মধ্যবিত্ত পিতা মেলভিল পেশায় ছিলেন মাঝারি এক স্কুল-পোশাক বিক্রয়-সংস্থার সেলস্ ম্যানেজার। পিতার অকৃত্রিম গাম্ভীর্য, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা রিচার্ডকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং নানান্ বিষয়ের বই-কাগজ পড়ার আগ্রহ শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে লক্ষ করা যায়। এনসাইক্লোপেডিয়ায় ডাইনোসরের কঙ্কাল দেখে শিশু রিচার্ড তাজ্জব, দৈর্ঘ্য পঁচিশ ফুট মাপটা ঠিক কতখানি জানবার জন্য পিতার শরণাপন্ন হয়েছিলেন রিচার্ড। খুব সহজ উপমায় মেলভিল বুঝিয়েছিলেন যে তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় ডাইনোসর দাঁড়ালে, তার গলাটা দোতলার ঘরের জানলায় পৌঁছবে। এর পর থেকে যে কোনও জিনিসের নির্ভুল মাপজোখ এবং তার সহজ ব্যাখা তাঁর অনুসন্ধিৎসু মনকে অনুপ্রাণিত করেছিল। রিচার্ডের যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর ভাই হেনরির জন্ম হয়। কিন্ত এক মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু রিচার্ডকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। বয়স যখন তাঁর বছর নয়েক তখন ভূমিষ্ঠ হয় তাঁর একমাত্র ভগিনী জোয়ান। পরবর্তীকালে তিনিও হয়ে ওঠেন একজন পদার্থবিদ্।

পৃথিবীর ইতিহাসের যুদ্ধোত্তর অধ্যায়ে এমন বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব বিরল। স্কুল জীবনের শুরু ফার-রকওয়ের সাধারণ স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান বিষয়ে হাতে-কলমে কাজ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায় রিচার্ডের মধ্যে -বিশেষত যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া, খোঁচাখুঁচির ব্যাপারে ওস্তাদ।  ফেলে দেওয়া অকেজো যন্ত্রাংশর টুকিটাকি জোড়া লাগিয়ে নতুন একটা যন্ত্র খাড়া করার মধ্যে তিনি উপভোগ করতেন অনাবিল আনন্দ। রসায়ন ও গণিতেও তাঁর অপরিসীম আগ্রহ ছিল। স্কুল জীবন শেষ করে কলেজ জীবনের শুরু ১৯৩৫ সালে, বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এম-আই-টি-তে। ছোটবেলা থেকেই যুক্তিবাদে তাঁর নিজস্বতা প্রকাশ পায় এবং কৈশোরে সেই যুক্তিবাদী মন পরিণত রূপ নেয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পদার্থবিদ্যা, ও গণিতের অন্যতম শাখা ডিফারেন্সিয়াল ও ইনটিগ্র্যাল ক্যালকুলাসে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন এবং মার্কিন জাতীয় প্রতিযোগিতায় (Putnam Contest) প্রথম স্থানটি দখল করে নেন। পদার্থবিদ্যাকে মুখ্য বিষয় হিসাবে গ্রহণ করে ১৯৩৯ সালে তিনি স্নাতক হন এবং চলে যান প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জন আর্চিবল্ড হুইলারের অধীনে বছর তিনেক গবেষণা করে ১৯৪২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ডক্টরাল উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল Path integral approach to quantum mechanics.

ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। রবার্ট ওপেনহাইমারের নেতৃত্বে ম্যানহাটান প্রকল্পে পরমাণু বোমা প্রস্তুতি পর্ব জোর কদমে চলছে। রিচার্ড সেই প্রকল্পে যোগদান করলেন এবং খুব শিগগিরই চলে গেলেন লস্ আলামসে। লস আলামসের পরিবেশ গুরুগম্ভীর, কাজটা আরও গুরুগম্ভীর এবং গোপনীয় - তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপ পৃথক করার পদ্ধতি নির্ধারণ। এই সূত্রে সংস্পর্শে  এলেন বহু গুণিজনের - নিলস্ বোর, ভন্ নিউম্যান, এনরিকো ফার্মি, আর্থার কম্পটন, আই রাবি, হানস্ বেথে, ওয়ে বোর প্রমুখ। লস আলামসের আবহাওয়ায় ছিল সামরিক নিয়মানুবর্তিতা যা বৈজ্ঞানিকের স্বাধীন মনোভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সামরিক আমলাদের নিয়মানুবর্তিতার ধাক্কায় অধৈর্য হয়ে রিচার্ডের মাথায় মাঝে-মধ্যেই আনাগোনা করত নানা দুষ্টুবুদ্ধি। যে কোনও তালা খোলার একটা বিশেষ কায়দা তিনি আয়ত্ত করেছিলেন এবং যে সব সিন্দুকে আমলাতান্ত্রিক গুপ্ত তথ্য থাকত, সেই সিন্দুকগুলি মাঝেমধ্যেই খুলে রেখে সামরিক শাসকদের বেশ সমস্যার মধ্যেই ফেলে দিতেন। সহকর্মীরা এতে খুব মজা পেতেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কৌতুক, তামাশা, নাটকীয়তা ছিল রিচার্ডের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য এবং এর মধ্য দিয়েই তিনি নিজের চারপাশের পরিবেশকে মাতিয়ে রাখতেন। যা লক্ষণীয় তা হ'ল, এই মাতিয়ে রাখার মধ্যে "আমিই সব" - এই ভাবের ঘোষণা বা ঝাঁঝ কোনোটাই ছিল না। একটা অকৃত্রিম, স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণোদ্দীপক প্রকাশ। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই লস আলামসের অদূরবর্তী আলমোগোর্দোতে পৃথিবীর প্রথম পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার তিনি একজন সাক্ষী। এ ব্যাপারটা তাঁর মোটেই ভাল লাগেনি।

বিবাহিত জীবনের শুরু ১৯৪১ সালে। যৌবনের প্রথম প্রেমের নায়িকা নিউ ইয়র্কের আর্টসের ছাত্রী আর্লিন গ্রীনবম্। প্রেম নিবেদনের ধরনটাও ছিল তাঁর নিজস্ব। বুদ্ধিদীপ্ত যুবক    রিচার্ডের অকৃত্রিম ব্যবহার আর্লিনের মন জয় করে এবং ক্রমশই গভীর প্রেমে আবদ্ধ হন তাঁরা। এই সূত্রে রিচার্ড ফাইনম্যানের ব্যক্তিত্বের দিকটা আলোচনা করে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কপটতা ও ভন্ডামির ঘোর বিরোধী ছিলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। কাজেই যেসব সামাজিক গুণে মানুষের চরিত্রের প্রশংসা বাড়ে যেমন অকারণ মিষ্টভাষিতা বা শিষ্টাচার, অভিভাবক-স্থানীয় মানুষের প্রতি কপট বাধ্যতা প্রদর্শন ইত্যাদি ইত্যাদি, তার একটাও ছিল না তাঁর চরিত্রে। বরং তাঁর চরিত্রে ছিল যথেষ্ট ঔদ্ধত্ব, তর্কাতর্কির সময়ে প্রয়োজনে বিদ্রুপাত্মক। কারোকেই পরোয়া করতেন না। তর্কে-বিতর্কে স্নাতকোত্তর ছাত্র থেকে শুরু করে মারে গেলম্যানের মতো ব্যক্তিত্যও তাঁর বিদ্রুপের ঝাঁঝ থেকে অব্যাহতি পাননি। সেই কারণেই লস্ আলামসে থাকাকালীন পিতৃতুল্য ও সংরক্ষণশীল নিলস্ বোর এই প্রতিভাটির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ভাব বিনিময় করতেন পুত্র ওয়ে বোরের মাধ্যমে। এছাড়া ফাইনম্যান ছিলেন মাদকাশক্ত এবং যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল সুন্দরী নারীদের প্রতি। স্নাতকোত্তর ছাত্রের স্ত্রী বা বান্ধবীর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি ও অবাধ মেলামেশায়, এমনকি গণিকা সংসর্গেও তাঁর বিবেকের কোনো বাধা ছিল না। তবে, তাঁর চরিত্রের এই তথাকথিত দিকগুলো হয়তো আসলে তাঁর চরিত্রের খোলামেলা দিকটিরই প্রকাশ- আবেগতাড়িত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।

প্রেম বিনিময়ের পালা যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎই আর্লিন অসুস্থ হয়ে স্থানান্তরিত হন হাসপাতালে। রোগের কারণ নির্ণয়ের ব্যাপারে হাসপাতালের ডাক্তারদের সিদ্ধান্তে নাক গলানো আর্লিনের অভিভাবকদের যথেষ্ট অসন্তোষের কারণ হলেও তিনি চুপ করে থাকেননি। সেই অবস্থায় তিনি আর্লিনকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আর্লিন তখন প্রায় মৃত্যুমুখী। তার অভিভাবকদের ঘোর বিরোধিতা তাঁকে নিরস্ত করতে পারেনি, বরং শক্তিই যুগিয়েছিল। আর্লিনের শারিরীক অবস্থার দ্রুত অবনতিতে তাঁর মনে হয়েছিল যে একমাত্র বিবাহবন্ধনই সেই মুহূর্তে আর্লিনের দেহ-মনে শান্তি সঞ্চার করতে পারে এবং তিনি তৎক্ষণাৎ তাই করেন। বিবাহের পরে অসুস্থ আর্লিন পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন। আর্লিনের মৃত্যুর বেশ কিছু বছর পরে রিচার্ড বিয়ে করেন মেরি লাওকে। তবে পারস্পরিক আমূল চরিত্রগত পার্থক্যের জন্য মাত্র দুবছরেই শেষ হয়ে যায় দ্বিতীয় বিবাহিত জীবন। তাঁর তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী হলেন গুইনেথ হাওয়ার্থ। ১৯৬০ সালে ইউরোপে গিয়ে বিজ্ঞান সমাবেশে উচ্চ শক্তি সম্পর্কিত পদার্থবিজ্ঞানের যথেষ্ট পরীক্ষামূলক তথ্য যেমন তাঁর লাভ হয়েছিল, তেমনি উপরি জুটেছিল চোখের ইশারায় গুইনেথের সঙ্গে হৃদয় বিনিময়ের মাধুরী। এরপর দেশে ফিরে এসে চিঠিপত্রে প্রেম বিনিময় এবং অদূর-ভবিষ্যতে বিবাহ। কয়েক বছরের মধ্যেই ভূমিষ্ঠ হয় ফাইনম্যানের একমাত্র পুত্র কার্ল এবং এর কিছুদিন বাদে তাঁরা সাদরে গ্রহণ করেন এবং লালনপালনের দায়িত্ব নেন মিচেল নামে এক শিশুকন্যার। আর্লিন ছিলেন রিচার্ড ফাইনম্যানের যৌবনের জুলিয়েট, গুইনেথ্ ছিলেন তাঁর আমরণ সঙ্গিনী।

আলমোগোর্দোতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রথম পরীক্ষার সামরিক উদ্দেশ্য তাঁর ভাল লাগেনি। তিনি ঠিক করেছিলেন যে সরকারি কোনও কাজের সঙ্গে নিজেকে আর জড়াবেন না। মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে ছ'জন মহাকাশযাত্রী সমেত মহাকাশযান চ্যালেঞ্জারের বিধ্বংসী বিস্ফোরণের অনুসন্ধানে রেগন-সরকার থেকে আবার তাঁর ডাক পড়ল। তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। গুইনেথ্ ভাল করেই চিনতেন তাঁর স্বামী দেবতাদের রুক্ষ ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সৎ, কাজপাগল এবং

দায়িত্বশীল পরোপকারী মানুষটিকে। তিনি রিচার্ডকে তাঁর বুদ্ধি
দীপ্ত ঝাঁঝালো ও অবাধ্য ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এই বলে যে - বারোজনের অনুসন্ধান কমিটিতে চেয়ারম্যান ছাড়া বাকি দশজন থাকবে চা-কফি-সিগার সহযোগে গুরুগম্ভীর সভায় থাকার উত্তেজনার আগুন পোহাতে আর চেয়ারম্যানের মন্তব্যের অনুকূলে ঘাড় নাড়তে। কাজেই ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনে বিপরীত দিকে ঘাড় নাড়ার অন্তত একজন অবাধ্য মানুষের প্রয়োজন আছে। রিচার্ড ফাইনম্যানের পরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জার রহস্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি, বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্ধানের শুধুমাত্র এক অপূর্ব দৃষ্টান্তই নয়, তা স্মরণ করিয়ে দেয় আমলাদের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াইয়ে বৈজ্ঞানিক মহলের নৈতিক দায়িত্বের কথা। তিনি মনে
করতেন কমিটিতে থাকা মানে একটা অত্যন্ত গুরুতর দায়িত্বের স্বীকৃতি দেওয়া, কাজেই যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে তা পালন করাও অবশ্য কর্তব্য।


পৃথিবীর মানুষকে রিচার্ড ফাইনম্যানের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হ'ল কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের তত্ব এবং সেই তত্ব ব্যবহারের সরল ও নির্ভুল কায়দা। এই তত্ত্ব হ'ল ফোটন অর্থাৎ আলোক কণিকার সঙ্গে ইলেকট্রনের যে সব ক্রিয়া-বিক্রিয়া হয় তার নিয়মকানুন। ২২/২৩ বছর বয়সে প্রিন্সটনে হুইলারের অধীনে পি এইচ ডি গবেষণা করার চূড়ান্ত পরিণতি হ'ল এই কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স, সংক্ষেপে QED. QED-র ব্যাপারটা আপাতত মুলতুবি রেখে দেখা যাক কিসের তাগিদে উনি এই দুরূহ কাজ হাতে নিয়েছিলেন। কাজেই সামান্য একটু ঐতিহাসিক পটভূমিকা এবং শতাব্দীর সমসাময়িক পদার্থ বিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিস্তম্ভগুলো সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছি। একটা কথা বলে রাখি যে, এই প্রকৃতি বৈজ্ঞানিকদের আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হ'ল প্রকৃতির যাবতীয় ঘটনাবলীর তাত্ত্বিক একীকরণ। অর্থাৎ এমন একটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তৈরি করা,  যা দিয়ে জাগতিক-মহাজাগতিক, যাবতীয় ঘটনার ব্যাখ্যা সম্ভব। ফাইনম্যান দাবি করেন যে তাঁর তত্ব QED মাধ্যাকর্ষণ ও তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারস্যাপারগুলো ছাড়া বাকি সব কিছু ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। যাইহোক, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাত্ত্বিক একীকরণের (Unified Theory) প্রচেষ্টায় প্রথম সফল উত্তরাধিকারী হলেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে তিনি দেখালেন যে, বিদ্যুত শক্তি ও চৌম্বক শক্তি মূলত একই শক্তির দুই ভিন্ন রূপের সমন্বয়। এ ছাড়া আর যা গুরুত্বপূর্ণ তত্ব জানা ছিল তা হ'ল সপ্তদশ শতাব্দীতে তৈরি নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র ও গতি সূত্র এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে আবিষ্কৃত স্যর জে জে টমসনের পরমাণুর কাঠামোয় ইলেকট্রনের অস্তিত্বের আভাস ও ম্যাক্স প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ব। ১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড পরীক্ষালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে পরমাণুর চেহারার এক অভিনব ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেন: পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অতি সামান্য আয়তনের মধ্যে পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর কেন্দ্রীভূত। তিনি এই কেন্দ্রস্থলের নামকরণ করলেন নিউক্লিয়াস এবং বললেন যে নিউক্লিয়াসে ঠাসা আছে ধনাত্মক তড়িতাধান যুক্ত কণা আর তার চারদিকে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমান সংখ্যক ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন। রাদারফোর্ডের ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকল না, কারণ আধানযুক্ত গতিশীল কণা থেকে শক্তি বিকিরণ হবার কথা, অথচ পরীক্ষায় তা দেখা যায় না। ত্রুটির মীমাংসা করলেন নিলস্ বোর তাঁর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়।  তিনি বললেন যে, ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঠিকই তবে তাদের কক্ষপথ নির্দিষ্ট এবং বিকিরণ তখনই হবে যখন এক কক্ষপথের ইলেকট্রন আর এক কক্ষপথে লাফঝাঁপ করবে। নিলস্ বোরের এই যুগান্তকারী তত্ব অনেক ঘটনার ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হ'ল। শুধু তাই নয়, তাঁর তত্বে "নির্দিষ্ট কক্ষপথের" কথাটার মধ্যে নিহিত ছিল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার বীজ  (Quantum Mechanics). সুতরাং বোরের তত্ব আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের প্রগতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পরমাণুর গঠন নিশ্চিত জানার পর বিজ্ঞানীরা মন দিলেন ইলেকট্রনের গতিবিধির আচরণে। নিউটনের গতিসূত্র প্রয়োগের ফলাফল পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে আদৌ মিলল না। ইতিমধ্যেই ১৯০৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বিশেষ অপেক্ষবাদ তত্ব (Special Theory of Relativity) ও সাধারণ অপেক্ষবাদ তত্ব (General Theory of Relativity) সৃষ্টি করলেও পরমাণুস্থিত ইলেট্রনের গতিবিধি ব্যাখ্যার কোন সুরাহা হ'ল না। ইলেকট্রন সম্বন্ধে আর যা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা ছিল  তা হ'ল উলফগ্যাঙ পাউলির ইলেকট্রন বর্জন নীতি (Exclusion Principle) অর্থাৎ পরমাণুস্থিত প্রতিটি কক্ষপথ চিহ্নিত করবে এক একটি ইলেকট্রনকে। এমন সঙ্কটাবস্থায় মাত্র কয়েক সপ্তাহের তফাতে  ১৯২৬ সালে আবিষ্কৃত হ'ল কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, নায়ক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ও এরউইন স্রোডিঞ্জার। এঁরা উভয়ে যে যার নিজস্ব কায়দায় কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করলেন। উদ্দেশ্য একই লক্ষ্যে পৌঁছানো - কিভাবে পরমাণুস্থিত বিভিন্ন কক্ষপথের ইলেকট্রনের গতিবিধির আচরণ অর্থাৎ তাদের অবস্থান, ভরবেগ ইত্যাদি তথ্য নির্ধারণের তাত্ত্বিক নিয়ম খুঁজে বার করা যায়। স্রোডিঞ্জার আবিষ্কার করলেন তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ, সম্পূর্ণ দার্শনিক ও গাণিতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে। তিনি ১৯২৪ সালে আবিষ্কৃত লুই ডি ব্রয়লির অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন কণিকা দ্বৈতবাদের মত অনুসরণ করলেন। অর্থাৎ বস্তুর অস্তিত্বকে বস্তুকণাও বলা চলে, আবার একই সঙ্গে তরঙ্গও বলা চলা বলে তাঁর সৃষ্ট কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নামকরণ হ'ল তরঙ্গ বলবিদ্যা (Wave Mechanics) । এক্স-রে বিচ্ছুরণের পথপ্রদর্শক ডব্লিউ এল ব্র্যাগ তরঙ্গায়িত কণিকার এই দোলাচলের একটা চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন। ব্র্যাগ সাহেবের মৌলিক উক্তির সংজ্ঞাটা হ'ল, "The dividing line between the wave and particle nature of matter is the moment 'NOW'. As this moment steadily advances with time, it coagulates a wavy future into a particle past. Everything in the future is a wave, everything in the past is a particle. বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় অতীতের জমাট বাঁধা কণিকার তরঙ্গায়িত ভবিষ্যত। 

হাইসেনবার্গের মত হ'ল মাপজোখের হিসেব থেকেই তাত্ত্বিক ভিত্তিতে পৌঁছতে হবে। কাজেই ইলেকট্রনের গতিবেগ, স্থানাঙ্ক ইত্যাদি যে সব তথ্যের মাপজোখ করা যায় সেগুলো প্রকাশ করার এক ধরনের সুসজ্জিত তালিকা তিনি তৈরি করলেন। এই ধরনের তালিকার গাণিতিক পরিভাষা হ'ল ম্যাট্রিক্স। ধরা যাক ইলেকট্রনের স্থানাঙ্কের ম্যাট্রিক্সের মান 'x' এবং ভরবেগের ম্যাট্রিক্সের মান 'p'। এই ধরনের প্রকাশের  বিশেষত্ব এই যে 'x'কে 'p' দিয়ে গুণ করলে যা ফল বেরোবে, 'p' কে 'x' দিয়ে গুণ করলে সাধারনত একই ফল পাওয়া যাবে না। অপর দিকে পরীক্ষালব্ধ তথ্যের উপর গাণিতিক কলাকৌশল চালিয়ে হাইজেনবার্গ আবিস্কার করলেন তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতি (Uncertainty Principle)। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির সংজ্ঞা উনি এক কথায় বলেছেন যে, "Uncertainty" is NOT "I don't know".  "It is I can't know". "I am uncertain" does not mean "I could be certain". অর্থাৎ, 'অনিশ্চয়তা' মানে এই নয় যে 'আমি জানি না' বরং বলা ভাল 'আমি কোনোদিন জানতে পারব না, আমার জানার কোনও উপায় নেই।' 'আমি অনিশ্চিত' মানে ' আমার নিশ্চিত হবার আদৌ কোনও সম্ভাবনা নেই।' হাইজেনবার্গ সৃষ্ট কোয়ান্টাম  বলবিদ্যার নামকরণ হ'ল' ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা (Matrix Mechanics) কিছুদিনের মধ্যেই স্রোডিঞ্জার প্রমাণ করলেন যে তরঙ্গ বলবিদ্যা এবং ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা আসলে একই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দুটি আলাদা চেহারা। দু' বছরের মধ্যে পল্ ডিরাক ইলেকট্রনের উপর আইনস্টাইনের বিশেষ অপেক্ষবাদ প্রয়োগ করে স্রোডিঞ্জার সমীকরণের রূপান্তর ঘটিয়ে তৈরি করলেন আলোক কণিকার সমতুল্য গতির ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম তত্ব  (Relativistic Quantum theory of electron)। রূপান্তরিত সমীকরণের সমাধান থেকে ইলেকট্রনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ধর্মের  - যেমন ইলেকট্রনের স্পিন, (নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা ছাড়াও ইলেকট্রন যেন নিজের অক্ষের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করছে) ইলেকট্রনের বিপরীত ধর্মী কণা অর্থাৎ ধনাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনের অস্তিত্ব (পজিট্রন), চৌম্বক ক্ষেত্রে ইলেকট্রনের আচরণ ইত্যাদির সন্ধান পাওয়া গেল। প্রত্যেকটি ভবিষ্যদ্বাণীর পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া গেল পরের কয়েক বছরের মধ্যেই। ডিরাকের এই অবদান বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই কাজের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন স্রোডিঞ্জারের সঙ্গে। পল ডিরাকই হলেন প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি যুক্তির সঙ্গে গাণিতিক কৌশল মিলিয়ে সৃষ্টি করলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার রীতিবদ্ধ পরিকাঠামো। এ ছাড়া কুড়ির দশকের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের (Quantum Field Theory) গাণিতিক পরিকাঠামোও তাঁরই সৃষ্টি। আসল কথা একদিকে হাইজেনবার্গ, স্রোডিঞ্জার ও ডিরাকের এবং অপরদিকে পাউলি, ম্যাক্স বর্ন, জর্ডন প্রমুখ বিজ্ঞানীদের অবদান কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে করল আরও সমৃদ্ধ। পদার্থ কণিকার আচরণের বহু প্রতীক্ষিত জিজ্ঞাসার নির্ভুল ব্যাখ্যা পাওয়া গেল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়োগে।

ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উন্নতমানের যন্ত্রপাতির প্রয়োগে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাবির গবেষণাগারে এক ছোকরা বিজ্ঞানী, উইলিস ল্যাম্ব (Willis Lamb) উত্তপ্ত হাইড্রোজেন গ্যাসের উপর মাইক্রোওয়েভের প্রয়োগে ( তড়িৎ-চুম্বক বর্ণালীর খানিকটা পরিসরের নাম মাইক্রোওয়েভ ) ইলেকট্রনের শক্তি স্তরের বর্ণালীতে অভ্রান্ত ও স্বতন্ত্র দুটো রেখার সন্ধান পেয়েছেন, ডিরাকের সমীকরণ অনুযায়ী পাওয়া উচিত ছিল একটি । তাত্ত্বিক বিচারে দু'টো রেখার অস্তিত্ব কিছুতেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ডিরাকের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের প্রয়োগে সৃষ্ট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের সন্দেহ দানা বেঁধেছে। স্বয়ং উনিও কিছুটা বিভ্রান্ত। সত্যি কথা বলতে প্রায় দুই দশক কেটে গেল পদার্থ কণিকার এই ধরনের আচরণের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খুঁজতে। রিচার্ড ফাইনম্যান তখন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরতাজা উঠতি বিজ্ঞানী এবং প্রিন্সটনে হুইলারের কাছে পি এইচ ডি কাজের সূত্র ধরে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে বেশ হাত পাকিয়েছেন। প্রথম সারির প্রবীন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনিও মাথা ঘামাচ্ছেন ওই একই সমস্যার সমাধানে। আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার প্রগতিতে যখন এমন চরম সঙ্কট চলছে। এই অবস্থায় ভিক্টর ভাইসকফের নেতৃত্বে নিউইয়র্কের অদূরবর্তী সেল্টার আইল্যান্ভের নিরিবিলি পরিবেশে বাছাই করা ডজন দুয়েক বিজ্ঞানীকে নিয়ে বসল আলোচনাচক্র। আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু সাম্প্রতিক পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা । ভাইসকফ ছাড়া প্রবীনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাকসাইটে ওপেনহাইমার, বেথে, হুইলার  রাবি প্রমুখ । নবীনদের মধ্যে আমন্ত্রিত হলেন সুইংগার, ফাইনম্যান, মারস্যাক, পায়াস প্রমুখ। প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞান আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল তিনদিনের সমাবেশে। ফাইনম্যান এবং সুইংগার, দুজনেই বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন এই সমাবেশের পর; ডিরাক সৃষ্ট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের সমর্থন মিলছে না। বছর খানেকের মধ্যেই আরও একটা সমাবেশের আয়োজন করা হ'ল। স্থান পেনসিলভেনিয়ার পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিবৃত পোকোনো। নতুন অংশগ্রহণকারী মধ্যে আছেন এনরিকো ফার্মি ও ভন নিউম্যান এবং যুদ্ধ পূর্ববর্তী দুই যশ্বসী বিজ্ঞানী, নিলস্ বোর  এবং স্বয়ং পল ডিরাক। ইতিমধ্যেই বার্কলের উচ্চশক্তি সম্পন্ন কণা ত্বরণ যন্ত্রে (Particle Accelerator) উৎপাদিত মৌলকণারা তাদের আচরণের বিচিত্র স্বাক্ষর রেখে গেছে ফটোপ্লেটের উপর। প্রথম দিনটা কাটল পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের আলোচনায়। দ্বিতীয় দিন মঞ্চ অধিকার করলেন সুইংগার। ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁর বক্তৃতা, তাঁর অকাট্য গাণিতিক যুক্তি এবং নায়কোচিত বাকপটুতা সবাইকে মুগ্ধ করল; বিশেষ করে ওপেনহাইমারকে। ফাইনম্যান মোটামুটি বেপাত্তাই বলা চলে। সঙ্কট মোচনে কোমর বেঁধে লেগেছেন বিজ্ঞানীরা। তৃতীয় সমাবেশের আয়োজন হ'ল নিউইয়র্কে হার্ডসন নদীর তীরে ওল্ডস্টোন নামে একটি জায়গায়। ইতিমধ্যেই ফাইনম্যান, ডাইসনের সঙ্গে গভীর আলোচনা করেছেন এই ব্যপারে এবং ডাইসন বুঝতে পেরেছেন ফাইনম্যানের অন্তর্দৃষ্টি। সমাবেশে ফাইনম্যানের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাজগুলো একত্রিত করে বেশ গুছিয়ে ব্যাপারটা প্রকাশ করলেন। হাইজেনবার্গ, স্রোডিঞ্জার  ছাড়া তৃতীয় এক বিকল্প ধারায় তিনি ভিত্তি স্থাপন করলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার।  চিন্তাভাবনার শুরু আবার


সেই দ্বৈত তরঙ্গ কণিকাবাদের ভিত্তিতে।  তাঁর মূল বক্তব্য হ'ল ইলেকট্রনের এক অবস্থান থেকে অন্য এক অবস্থানে যাবার নির্দিষ্ট কোনও পথ চিহ্নিত নেই। যে কোনও পথে যাবার সম্ভাবনা সমান। তবে সব রকম পথে চলাফেরার সম্মিলিত যোগফল নির্ণয় করবে চূড়ান্ত সম্ভাবনা। অবশ্য এই যোগ করার কায়দাটা ঠিক সনাতন পদ্ধতিতে যোগ করা নয়। কারণটা এইরকম  : বিভিন্ন পথে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবার সময় স্থান-কালের (Space-time)  পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত পথগুলোর মধ্যে অবস্থাগত তারতম্য  (phase difference) থাকবে। সেই কারণে কোনো কোনো পথের অবদান অনুকূল ফল দেবে অর্থাৎ সেইসব পথগুচ্ছের সম্মিলিত অবদান হবে প্রবল। একই যুক্তিতে বলা যায় যে অন্য কিছু পথগুচ্ছের সম্মিলিত অবদান হবে নগন্য। তিনি প্রমাণ করলেন যে তাঁর মডেল, স্রোডিঞ্জারের মডেলের গাণিতিক চেহারার সমতুল্য এবং হয়তো সহজবোধ্য কারণ তাঁর তৈরি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সাধারণ পদার্থবিদের হাতে তুলে দিল বহু প্রতীক্ষিত এক সহজ সরল হাতিয়ার যা প্রয়োগ করে তাঁরা হিসেব করতে সক্ষম হলেন মৌলকণিকাদের পারস্পরিক জটিল ক্রিয়া-বিক্রিয়ার নির্ভুল ফলাফল।  তাঁর সৃষ্ট কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নামকরণ Path Integral Approach ( sum over histories). এই সূত্রে তিনি এক ধরনের লেখচিত্র প্রবর্তন করলেন যা পদার্থ বিজ্ঞানীদের কাছে ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম নামে পরিচিত। ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম পদার্থ কণিকা সমূহের পারস্পরিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ ক্রিয়া-বিক্রিয়ার এক সচিত্র বর্ণনা যা সহজে নির্দেশ করবে তাদের এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় যাবার যাবতীয় সম্ভাবনা। আগেই বলেছি চূড়ান্ত সম্ভাবনা পাওয় যাবে প্রতিটি সম্ভাবনা যোগ করে। ডায়াগ্রামের প্রতিটি পথ এক একটি গাণিতিক ফর্মুলার সমতুল্য। সুতরাং ছবিটি আঁকলে ফর্মূলা বসিয়ে হিসেব করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম প্রয়োগে হিসেব করা গবেষণা পত্রগুলো পদার্থবিদ্যার সব থেকে সম্মানিত বিজ্ঞান পত্রিকা Physical Review-এর পৃষ্ঠা অলঙ্কৃত করতে লাগল। ফাইনম্যান যে যুগে এই অভিনব উপায় আবিষ্কার করেছিলেন তখন কম্পিউটারের চল্ আদৌ ছিল না এবং সেই কারণে হিসেব করার ব্যাপারটা ছিল অস্বাভাবিক শ্রমশাদ্ধ ও ফলাফলের সূক্ষ্মতাও ছিল সীমিত। আজ শক্তিশালী কম্পিউটারের যুগে হিসেবের সূক্ষ্মতা বাড়ার জন্য শতাধিক এমনকি সহস্রাধিক ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের সমতুল্য ফর্মুলা এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেব করা সম্ভব।  এতে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সঙ্গে শুধু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের যথার্থতা প্রতিপাদনই যে সম্ভব হয়েছ তাই নয়, তা সূক্ষ্মতর থেকে সূক্ষ্মতম পর্যায়েও পৌঁছে গেছে।

আসলে স্রোডিঞ্জার বা ডিরাক তাঁদের সৃষ্ট ইলেকট্রোডায়নামিক্সে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বের প্রয়োগ করেছেন ঠিকই কিন্ত তা সীমিত ছিল পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটন ও কক্ষপথে বিচরণকারী ইলেকট্রনের মধ্যে তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের বিক্রিয়ায়। তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের আরও যে সূক্ষ্ম ব্যাপারটা তাঁরা তাঁদের তত্বে বিবেচনা করেননি তা হ'ল আধানযুক্ত ঘুর্ণায়মান ইলেকট্রনের নিজস্ব তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র যা তার নিজের উপরেই প্রভাব বিস্তার করবে। কাজেই তত্বে ইলেকট্রনের যে অবিকৃত ভর (m) ও অবিকৃত আধানের (e) মান ধরে নিয়ে হিসেব করা হয়েছে তার যথাযথ রূপান্তরের প্রয়োজন। এ যেন স্বভাবদুষ্ট কোনও বিষধর সাপের নিজের লেজ ভক্ষণ - প্রতি মুহূর্তেই তার চেহারার পরিবর্তন হয়ে চলেছে, এক অদ্ভুত ধাঁধার মতো। ফাইনম্যান অনুভব করেছিলেন যে মূল ভর ও আধানের মানের সঙ্গে রূপান্তরিত মানের তারতম্য অতি সামান্য হলেও তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে উইলিস্ ল্যাম্বের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের রহস্য।এর আগে প্রচলিত তত্ব প্রয়োগ করে দেখা যাচ্ছিল যে রূপান্তরিত মানের তারতম্য সামান্য তো নয়ই, বরং তা দাঁড়াচ্ছে অসীম সংখ্যায়। ফাইনম্যান দেখালেন অসীম সংখ্যার উৎপত্তিকে হিসেবের সময় কি ভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়। প্রাসঙ্গিক হিসেব নিকেশে ব্যবহৃত সমীকরণে ইলেকট্রনের ভর বা আধান জাতীয় মৌলিক জিনিসগুলোকে (Parameter) যে নিয়মে রূপান্তরিত করা হয়, পদার্থবিজ্ঞানীরা তাকে বলেন Renormalization। এই বিশেষ অবদানটির জন্য ১৯৬৫ সালে মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। ফাইনম্যান আবিষ্কৃত রিনর্মালাইজেশন পদ্ধতির গাণিতিক সিদ্ধতায় যে সন্ধেহের অবকাশ আছে, সেটা তিনি নিজেও স্বীকার করতেন। কিন্ত কম্পিউটারের হিসেবের ক্ষিপ্রতা ও সূক্ষ্মতা যতই বাড়ছে, তাঁর পদ্ধতি ততই সূক্ষ্ম ফলাফল দিচ্ছে। তাঁর সৃষ্ট রিনর্মালাইজেশন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গেলে মাপের সূক্ষ্মতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তার একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক- ইলেকট্রনের স্পিন আছে, আধান আছে এবং পরমাণুর নির্দিষ্ট কক্ষপথে এটি গতিশীল। কাজেই ইলেকট্রনগুলোকে ধরে নেওয়া যেতে পারে এক একটি ক্ষুদে চুম্বক। প্রত্যেক চুম্বকের চৌম্বকীয় সংবেদনশীলতা নামে একটা ধর্ম আছে যার প্রাসঙ্গিক পরিভাষা Magnetic moment। পল ডিরাক কোনও একটি নির্দিষ্ট এককে ইলেকট্রনের ওই ধর্মটির মাপের মান নির্ণয় করেন ১.০, অথচ পরীক্ষালব্ধ মান হ'ল ১.০০১১৫৯৬৫২২১। ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র কণিকাদের জগতে এই দুটো মাপের মধ্যে তফাত অনেকটাই, কিন্ত ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম প্রয়োগ করলে এই মান দাঁড়ায় ১.০০১১৫৯৬৫২৪৩। প্রশ্ন হ'ল এই দুটো মাপের মধ্যে ফারাক কতটা ? একটা ছোট্ট উপমার মাধ্যমে উত্তরটা দেওয়া যাক। কলকতা থেকে নিউইয়র্কের সঠিক দূরত্ব যদি ১৫, ০০০ কিলোমিটার হয়, তবে ওই মাপে এক মিলিমিটারের পার্থক্য যতটা ভুল নির্দেশ করবে ততটাই, অর্থাৎ সূক্ষ্ম ফারাক। আশা করি এ থেকেই বোঝা যাবে ফাইনম্যানের রিনর্মালাইজেশন পদ্ধতির সূক্ষ্মতা কতদূর। অন্তর্দৃষ্টি থেকে যে সব অনুভূতি জন্ম নেয়, তা প্রকাশের গাণিতিক ভাষা হয়তো মানুষের এখনও অজানা। এই ধরনের সৃজনশীল চিন্তা হয়তো মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর পারস্পরিক সংযোগে উদ্ভূত এক বিশেষ কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল অবস্থার উপহার, যে উপহার পেয়েছিলেন নিলস্ বোর, আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ, স্রোডিঞ্জার বা পল ডিরাক। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীরা মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারগুলো সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্পর্কের কথা চিন্তা করছেন। আগামী দিনের বিজ্ঞানের ভাষা ও গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে বস্তু জগতের তথ্য ছাড়াও মনস্তত্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের সুযোগ হয়তো থাকবে।

কৌতুহলী অনেক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে ক্ষুদ্র কণিকাদের রাজত্বে আক্রমন চালিয়ে সূক্ষ্ম মাপজোখে সাধারণ মানুষের কোন পরমার্থ লাভ হবে ?! এই জাতীয় ব্যাপারগুলো মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার আওতায় পড়ে। সুতরাং মূল প্রশ্ন হ'ল বিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণা মানুষের কোন উপকারে লাগবে ? এই বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য নয়। শুধু একটা দৃষ্টান্ত দেওয়াই যথেষ্ট। ১৯৪৮ সালে বার্ডিন ও শকলের ট্রানজিস্টরের মতো ক্ষুদ্র বস্তুর আবিষ্কার পৃথিবীর সভ্যতার চেহারাটা সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। আমরা সকলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই আবিষ্কারের সুফল ভোগ করি এবং এটা মৌলিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন ও গবেষণার সুফল।

পরীক্ষালব্ধ মাপজোখের ভিত্তিতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়োগে পদার্থকণিকার ধর্মের সূক্ষ্মতম চরিত্রসমূহ অবহিত হওয়ার ফলে ফলিত বিজ্ঞান হয়েছে সমৃদ্ধ। আজ এক ঘন সেন্টিমিটার জায়গায় দশ লক্ষাধিক ট্রানজিস্টরকে জোড়া লাগিয়ে তৈরি হয়েছে Integrated Circuit, যার আটপৌরে নাম 'চিপ' (Chip) । আমি নিশ্চিত যে 'দেশ' পত্রিকার এমন চমৎকার ও নির্ভুল ছাপা অক্ষর কম্পিউটার  চালিত টাইপ সেটিং যন্ত্রের সাহায্যে সম্ভব হয়েছে এবং কম্পিউটার যন্ত্রটির মূল উপাদান হ'ল এই সিলিকন চিপস। আসলে মৌল বিজ্ঞান গবেষণার ফলে তৈরি হয় উন্নতমানের যন্ত্রপাতি আর সেই যন্ত্রপাতির ব্যবহারে মৌল বিজ্ঞান অধ্যয়ন করা যায় আরও সূক্ষ্মভাবে। এইভাবেই হয় সভ্যতার বিকাশ। মৌল বিজ্ঞান ও ফলিত বিজ্ঞান- একট অপরটির পরিপূরক। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার।

দেখা যাচ্ছে যে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই মৌল বিজ্ঞান চিন্তায় রমরমা লেগে যায় পাশ্চাত্যে এবং সেই ধারাবাহিকতা শুধু অক্ষুন্নই থেকে না, ফাইনম্যানেরা সেটাকে আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে নিয়ে যান। তার নমুনা আমরা দেখতে পাই নিত্যনতুন ফলিত বিজ্ঞানের প্রকাশে। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের পটভূমিকায় সামান্য কিছু আলোচনা করা যাক। শ্রীনিবাস রামানুজন, জগদীশচন্দ্র বসু, সি ভি রামণ, প্রশান্ত মহালানবিশ, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বসু এবং শেষ পর্যায়ে হোমি ভাবা ও বিক্রম সারাভাই - এঁরা ছিলেন এ দেশে বিজ্ঞান ধ্যানধারনার পুরোধা। এঁরা প্রায় সকলেই দেশের মাটিতে পা গেঁথে দেশ-কালের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞানে এঁদের অবদান যে যুগ চিহ্নিত করে, সেই যুগে এদেশ ছিল পরাধীন। বিজ্ঞানচর্চায় আর্থিক অনুদানও ছিল অতি ক্ষীণ। সঙ্কীর্ণ আর্থিক গন্ডীর মধ্যে থেকেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের আসরে পাল্লা দিতেন তাঁরা। আর্থিক অনুদানের অভাবই একমাত্র অভাব ছিল না, অভাব ছিল প্রাসঙ্গিক বই-কাগজের এবং আজকের যুগের অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার। এক কথায় ভবিষ্যত সম্বন্ধে কোনও নিশ্চয়তা ছিল না বলেই হয়তো ভিতরের আগুনটা জ্বলে ওঠবার সুযোগ পেয়েছিল। যাইহোক, ধারাবাহিকতার কথা থাক। যাঁদের নাম নেওয়া হ'ল সেই মানদন্ডে জানি না এ দেশে আর ক'জনের নাম যুক্ত করা যায়। অথচ আর্থিক আনুকুল্যের জন্য এখন বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদদের দেশের মাটিতে পা রাখার প্রয়োজন পড়ে না, হয়তো দরকারও নেই। বরং হাত-পা ছড়ানোর এবং হাওয়ায় মেলবার সুবন্দোবস্তই আছে। এই পরিস্থিতিতে তবে স্বাধীন ভারতে মৌল বা ফলিত বিজ্ঞানে সাড়া জাগানো কাজ হচ্ছে না কেন ? না কি হচ্ছে, তবে যাঁরা করছেন তাঁরা প্রচারবিমুখ অন্তর্মুখী মানুষ, ফলে আমরা খবর পাচ্ছি না। একটা কথা অবশ্যই সত্যি যে বিজ্ঞানে নতুন কিছু সংযোজন করা আর এক-আধজনের কাজ নয়। কারণ কোনও মৌলিক ধারণার সত্যতা পরীক্ষামূলক সত্যতা প্রমাণের জন্য যে আর্থিক অনুদান এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণলব্ধ যত মানুষের প্রয়োজন, তা আমাদের মতো দেশের বেশ কয়েকটি বিজ্ঞান সংস্থার সম্মিলিত সামর্থ্যেরও বাইরে। তাছাড়া যৌথ উদ্যোগ নিতে গেলেই গবেষণাগারের ভৌগোলিক অবস্থান ও নেতৃত্বের প্রশ্ন আসে। কাজেই গণতান্ত্রিক দেশে অর্থনৈতিক সাহায্যের অনেকটাই নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। তা সত্বেও অবশ্য মুষ্টিমেয় কিছু বিজ্ঞানী চোখ কান খোলা রেখে যৌথ প্রচেষ্টার নানান্ সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেও নিশ্চেষ্ট হয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। তবে ব্যাপারটা আংশিক সত্যি। এই কারণেই যে মৌলিক ধারণা বা তা প্রমাণের পরীক্ষামূলক পরিকল্পনার জন্য বোধহয় খুব বিরাট কিছু অঙ্কের আর্থিক প্রয়োজন নেই। স্বপক্ষ যুক্তি হিসেবে বলা যেতে পারে, যে ভেক্টর বোসনের (পরমাণুস্থিত নিউক্লিয়াসের কয়েক শতাংশ ফার্মির ব্যবধানে যে সব ভারী কণারা দূর্বল নিউক্লীয় বলের আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করে তাদের বলা হয় ভেক্টর বোসন্। ১ ফার্মি = এক সেন্টিমিটারের দশ লক্ষ কোটি ভাগ) অস্তিত্বের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার জন্য ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে যুগ্মভাবে নোবেল পুরস্কার পান আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেল্ডন গ্ল্যশো। ওই একই কাজের পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা বাতলানোর জন্য ১৯৮৪ সালে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হন কার্লো রুবিয়া এবং ভ্যান্ডার মিয়ার। মাফ করবেন, ভুল বুঝবেন না যে নোবেলজয়ী কাজের নমুনাই সাড়া জাগানো মাপকাঠি বলে মনে করছি। রিচার্ড ফাইনম্যান প্রসঙ্গে আমাদের দেশের যে সব বিজ্ঞান মনীষীদের নাম এসে গেছে, সি ভি রামণ ছাড়া তাঁদের মধ্যে কেউই নোবেল পুরস্কার পাননি। রামানুজন্ অবশ্য ছিলেন গণিতবিদ এবং গণিতে নোবেল পুরষ্কার ছিল না। তা হলে মেঘনাদ সাহা বা সত্যেন বসু কি প্রথম সারির বিজ্ঞানী নন ? একটা ছোট্ট উপমা : অলিম্পিকে ম্যারাথন দৌড়ের বাজিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রথম চার-পাঁচজনের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্বের ব্যবধান সামান্য হলেও প্রথম স্থানটি অধিকার করেন একজনই। বাকিদের কি ছোট করে দেখা যায় ? না দেখা উচিত ! নোবেল পুরষ্কার হ'ল বিজ্ঞানীর চূড়ান্ত স্বীকৃতি। আলফ্রেড নোবেল তাঁর প্রদত্ত পুরস্কার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বঞ্চিত করেছিলেন। সুতরাং মেঘনাদ নোবেল জয়ে বঞ্চিত হতেনই। নোবেলের এই বঞ্চনার কারণ যা জানা যায় তা হ'ল নোবেলের শ্বশুরের দেওয়া একমাত্র উপহারটিতে এক রসিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী  নাকি ভাগ বসাবার চেষ্টা করেছিলেন। খবরের উৎস নিছক গালগপ্প নয়, খোদ সাহেবের লেখা বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে পড়া। তবে জানা নেই মৃত্যুর আগে নোবেল মত পরিবর্তন করেছিলেন কি না, কারণ প্রায় সাত দশক বাদে ১৯৭৪ সালে রেডিও পালসার আবিষ্কারের জন্য ওই পুরস্কারে পুরষ্কৃত হন অ্যান্টনি হিউইস ও মার্টিন রাইল এবং ১৯৮৪ সালে ওই পুরস্কার পান সুব্রম্ভনিয়ম চন্দ্রশেখর, নক্ষত্রমন্ডলের সৃষ্টি ও ক্রমবিকাশের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়। যাইহোক, নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গে উল্লেখ করব যে সত্যেন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত না করাটা বোধহয় তাঁর সৃষ্টির ব্যাপকতাকে খাটো করে না, খাটো করে তৎকালীন নোবেল কমিটির বিকৃত রুচি ও পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বিচারবুদ্ধিকে, কারণ কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিকসে উনি ছাড়া সবাইকার অবদান চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেয়েছে নোবেল পুরস্কারে।


এ ছাড়া ওই পুরস্কারপ্রাপ্তির পেছনে খানিকটা কপালের ব্যাপারও আছে। ইলেকট্রোডায়নামিক্সে ফাইনম্যান, সুইংগার, টোমোনাগা ছাড়া চতুর্থ যিনি ওই সম্মানের অংশীদার হতে পারতেন, তিনি হলেন ফ্রিম্যান ডাইসন। জাতে ইংরেজ, ডাইসন মুখ্যত ছিলেন গণিতবিদ, রূপান্তরিত হন পদার্থবিদে। নোবেলের উইলের শর্ত অনুযায়ী একই সঙ্গে তিনজনের অধিক ব্যক্তি পুরস্কারে ভাগ বসাতে পারেন না। ডাইসনের বাদ পড়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হ'ল যে তিনি ওপেনহাইমারের নেকনজরে ছিলেন না এবং পশ্চিমি দুনিয়ার বিজ্ঞান পরিচালনায় ওপেনহাইমারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই কপালের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। 

ফিরে আসা যাক ফাইনম্যান প্রসঙ্গে। 'প্রতিভা' এবং এরকমই আরও কিছু কিছু শব্দের আভিধানিক অর্থ অতি ব্যবহারের ফলে ভোঁতা হয়ে গেছে। কারণ, যে কোনও বিষয়ে পারদর্শিতার একটা সাধারণ সীমা অতিক্রম করলেই আমরা এই শব্দগুলো নির্দ্ধিদায় ব্যবহার করে থাকি। কিন্ত প্রতিভার প্রকৃত সংজ্ঞা তাহলে কি ? বা কি ধরনের ব্যক্তিত্বকে প্রতিভাশালী ব্যাখ্যায় ভূষিত করা যায় ? এই প্রশ্ন মনস্তাত্বিক  ও স্নায়ুমনস্তাত্বিকদের মনে বহুকাল ধরেই ঝড় তুলেছে এবং এ বিষয়ে তাঁরা গবেষণাও নেহাত কম করেননি। কিন্ত গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল থেকে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। স্থান-কালের সীমা ছাড়িয়ে যে মানুষটি সর্বজনীনভাবে প্রতিভাশালীর আখ্যায় ভূষিত হয়েছিলেন, সেই অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের, ১৯৫৫ সালে পিন্সটনে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই, হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট টমাস হার্ভে মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করে তাঁর মগজটি উদ্ধার করেন এবং ফর্মালডিহাইডে চুবিয়ে রেখে সংরক্ষণ করেন। মগজের মাপ, ওজন, এমনকি শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের নিচে মগজ কোষের তন্তুসমূহের শাখা-প্রশাখার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরীক্ষণ করেও এমন কিছু তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি যা দিয়ে ওই মাপের মানুষের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভেদরেখা টানা যায়।

এই ঘটনার বহুদিন বাদে জীবিত অবস্থায় আর যে মানুষটির মস্তিষ্কের তরল পদার্থ সংগ্রহ করে বিশেষ কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, তিনি হলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। মাথায় আঘাত পাওয়ার পর ওঁর গতিবিধির মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ ভাব লক্ষ করে পত্নী গুইনেথ ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। যাইহোক, পরীক্ষার ফল এবারেও অস্বাভাবিক কোনও তথ্যের সন্ধান দিতে পারেনি। তাহলে সব সৃজনশীল মানুষের সৃজনী শক্তির মাপকাঠি হিসেবে প্রতিভা কথাটা কি ব্যবহার করা চলে ? ১৯৬৫ সালের পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন আমেরিকার রিচার্ড ফাইনম্যান ও জুলিয়ান সুইংগার এবং জাপানের ইসিহিরো টোমোনাগা। বিষয়টি ছিল কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মনে করেন যে সুইংগার ও টোমোনাগার ইলেকট্রোডায়নামিক্সের ভিতের কাঠামো আগে থেকে ছিল। তাঁরা সেই কাঠামোর ওপরেই অসাধারণ অধ্যবসায় ও গাণিতিক যুক্তির নিজস্ব কায়দা-কানুন লাগিয়ে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, ফাইনম্যান তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গিতে, পুরোপুরি নতুন কাঠামো তৈরি করে নিয়ে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। কাজেই তাঁর অবদানে আছে নতুন পথের দিশা, আছে প্রতিভার জাদুস্পর্শ। 

রিচার্ড ফাইনম্যানের কর্মক্ষেত্রের কোনও নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না। তাই তাঁকে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ভৃমিকায়- কখনও তিনি কবি, কখনও লেখক, কখনও আবার শিল্পী। সৌরশক্তিই সব শক্তির উৎস- এ ঘটনা পিতার কাছে গল্পচ্ছলে শুনে প্রকাশ পেয়েছিল কবিতার ছন্দে। তখন তিনি ফার-রকওয়ের অখ্যাত স্কুলের সাধারণ ছাত্র। সুতরাং ওই বয়সেই তাঁর মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছিল কবিসত্তার বীজ। পরিণত বয়সে আবার দেখতে পাই সমুদ্রতরঙ্গের আনাগোনার সঙ্গে বিজ্ঞানকে মিশিয়ে রোমাঞ্চকর অনুভূতির প্রকাশে। হয়তো সেটাই ছিল তাঁর শেষ কবিতা। আসলে কাব্য আর বিজ্ঞানের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। প্রকৃতির নিয়মের ছন্দে স্পন্দিত হয় সংবেদনশীল কবির হৃদয়, সৃষ্টি হয় বৈচিত্র্যময় শব্দগুচ্ছ সংকলিত ছন্দোময় কবিতা। বিজ্ঞানীর মনও ঝংকৃত হয়, প্রকাশ পায় বিজ্ঞানের ভাষায় আর গণিতে - যার ধাপে ধাপে ছন্দ, গরমিলের কোনও উপায় নেই। প্রকৃতির সঙ্গে মনের বাক্যবিনিময়ই হ'ল বিজ্ঞানচেতনা আর প্রকৃতির নক্সার সঙ্গে মনের নক্সাকে মিলিয়ে ফেলাই হ'ল  বিজ্ঞানীর ইকুয়েশন। মুখে বিড়বিড় করতে করতে চেয়ারের হাতলে বা নোটবইয়ের ওপর তালে তালে হাতের আঙুল ঠোকার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা নতুন কিছু সৃষ্টির আনন্দে ঘরের মেঝেতে ডিগবাজি খাওয়া, তাঁর বন্ধুস্থানীয় সহকর্মী ও ছাত্রদের প্রায়ই নজরে পড়ত। তাঁরা লক্ষ করতেন ওই অবস্থায় সটান দাঁড়িয়ে উঠে বোর্ডে চলে যেতেন রিচার্ড।  বোর্ডের উপর ফুটে উঠতো সরলরেখা-বক্ররেখার মিশ্রণে সাধারণের দুর্বোধ্য কিছু লেখচিত্র আর গণিতের বেশ কয়েকটি ধাপ।

বিজ্ঞানে মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের একটি উক্তির উদ্ধৃতি দিতেন, " প্রত্যেক মানুষের কাছে একটি চাবি আছে যার কৌশলে স্বর্গদ্বার উন্মুক্ত হয়। আবার ওই একই চাবি নরকের দরজা ভাঙতেও সক্ষম। " এ প্রবাদ তাঁর হোনোলুলু সফরের সময় এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে শেখা। তিনি আরও বলেছেন যে পদমর্যাদার জোরে বিজ্ঞানভিত্তিক সমালোচনার দমন মানে বিজ্ঞান প্রগতির প্রতিবন্ধকতা করা।

ঈশ্বর বিশ্বাসের প্রশ্নে তাঁর সহজ সরল যুক্তি হ'ল- সনাতনী প্রথায় ভগবানের দ্বারস্থ হওয়ার মানে শুধু অজ্ঞতার সঙ্গে আপোসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই নয়, অজ্ঞতাকে আরও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠতে সাহায্য করা। নিজের অজ্ঞতা মেনে নিয়ে চেষ্টা করেছিলেন জ্ঞানের পথে এগোতে আর সেই যাত্রাপথে পেয়েছিলেন জাগতিক, মহাজাগতিক ঘটনাবলীর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার এক অভিনব ধারা। দুর্ভাগ্যবশত তথাকথিত শিক্ষিত, এমনকি অতি শিক্ষিত বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন যে কোনও বিষয়ে নিজেকে অজ্ঞ বলার মতো আর লজ্জজনক কী থাকতে পারে।

গান-বাজনা, চিত্রাঙ্কন যৌবনে আদৌ পছন্দের বিষয়বস্ত না হ'লেও, শিল্পীসত্বাটা তাঁর মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থাতেই ছিল। তাই শিল্পী ফাইনম্যানকে আমরা দেখতে পাই তাঁর পরিণত বয়সে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে আঁকতে শিখে তিনি যেসব ছবি এঁকে যান তা নজিরবিহীন। সূক্ষ্ম অহঙ্কারবোধও নেহাত কম ছিল না। তবে সেই অহঙ্কারের জাতটা ছিল বেশ অন্যরকম। আঁকা শেখার ব্যাপারে একটা ছোট্ট গল্প বলা যাক : এয়ারপোর্ট বসে প্লেন ছাড়ার বিলম্বে একঘেঁয়েমি কাটাতে ব্যাগ থেকে কাগজ পেন্সিল বের করে অপেক্ষমান যাত্রী ও পরিবেশের পেন্সিল স্কেচ করে ফেললেন রিচার্ড। সঙ্গী বন্ধু কৌতুহল দমন করতে পারেননি, রিচার্ডচে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে এমন সুন্দর আঁকতে তিনি কোথা থেকে শিখলেন। উত্তরটা ফাইনম্যানের জবানিতেই শোনা যাক - "হঠাৎই মনে হ'ল আঁকা শিখব। এক শিল্পীর সঙ্গে সাময়িক বন্ধুত্ব জমালাম।  চুক্তি হ'ল আমরা পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় করব। ও আমাকে আঁকা শেখাবে, বদলে আমি ওকে শেখাবো কোয়ান্টাম মেকানিক্স।  মানতেই হবে ও আমার তুলনায় অনেক ভাল শিক্ষক। " ড্রাম জাতীয় বাদ্যযন্ত্র 'বঙ্গো' বাজানোতেও তিনি ছিলেন ওস্তাদ আর হাসির গল্প শুনিয়ে আসর জমাতেও তাঁর জুড়ি ছিল না। ক্যালটেকের কনসার্টে প্রায়ই সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন রিচার্ড ফাইনম্যান।

লেখক ফাইনম্যানকে আমরা দেখতে পাই সর্বসাধারণের জন্য লেখা তাঁর দুখানি বইতে - Surely You Are Joking Mr Feynman এবং What Do You Care What Other People Think. আত্মজীবনীই বলা চলে। সারা জীবনের অভিজ্ঞতা বই দুখানির পাতায় পাতায়। কৌতুক আর মস্করায় ঠাসা।  প্রকাশের ভঙ্গিমা যেন এক একটি একাঙ্ক নাটকের মতো। দুরূহ বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করে লিখেছেন আরও দুখানা বই -  The Character of Physical Law এবং QED, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ চিন্তাধারার প্রকাশ নিজস্ব অভিনব কায়দায়। বই দুখানি পড়ে একটা কথাই মনে আসে যে জর্জ গ্যামো ছাড়া বিজ্ঞানকে, বিশেষত দুরূহ বিজ্ঞানকে চিন্তাশীল সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সহজ ভাষা সৃষ্টির আর যিনি দাবিদার হতে পারেন তিনি হলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। 

পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। গতানুগতিক পাঠ্যসূচিতে ছিল তাঁর প্রবল অনীহা। ১৯৬১ সালে ক্যালটেকে পদার্থবিদ্যার পাঠ্যসূচির খোল-নলচে বদলে তিনি প্রবর্তন করলেন সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যসৃচি, পরবর্তীকালে যা ফাইনম্যান লেকচারস্ অন ফিজিক্স নামে তিন খন্ডে প্রকাশিত হয়। ছাত্র হিবস্- এর সঙ্গে লিখেছিলেন আরও একখানি বই  - কোয়ান্টাম মেকানিক্স  অ্যান্ড পাথ ইনটিগ্র্যাল। এই শেষ বইটা বাদে বাকি সবগুলো লেখার ভঙ্গিমায় মিলেমিশে আছে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ভঙ্গি। বাস্তববাদী উপমায়, হাল্কা ব্যঙ্গবিদ্রুপে উপভোগ্য।  সেই সঙ্গে সূক্ষ্ম ফাইনম্যানীয় অহঙ্কারবোধের উত্তাপ।

বিজ্ঞান পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রবন্ধ সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও গুণমানে সেগুলো ছিল অতুলনীয়। যাবতীয় গবেষণার ফলাফল ছাপার হরফে প্রকাশের প্রবণতা তাঁর ছিল না। ক্যালটেকের বিজ্ঞানী সহকর্মীরা নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশের কথা যখন চিন্তা করছেন, তখন তাঁরা ফাইনম্যানের অফিসর দেরাজে মুগ্ধ হয়ে আবিষ্কার করেছেন বহু আগে ফাইনম্যানীয় ভঙ্গীতে কষে ফেলা সেই গবেষণার ফলাফল।  আসলে প্রকাশনার ব্যাপারে তাঁর ন্যুনতম মান ছিল অনেক উঁচু।

গদির মোহ বা ক্ষমতার প্রতি লিপ্সা তাঁকে কোনদিনই আকৃষ্ট করতে পারেনি। এই মন্তব্যের স্বপক্ষে একটি ছোট্ট গল্প- নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হওয়ার পর বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মী বর্ষীয়ানরা বলেছিলেন যে বিজ্ঞান সাধনায় চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাওয়ার পর এবার শুরু হবে তাঁর আমলাতান্ত্রিক ফাইলপত্রের কাজ, যে কাজে পদমর্যাদা আছে। এই সূত্রে ভিক্টর ভাইসকফ দশ ডলার বাজিই ধরে ফেললেন। বলাই বাহুল্য যে, সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর রিচার্ড বাজির দশ ডলার কড়ায়-গন্ডায় উসুল করে নেন।

তাঁর রিনর্মালাইজেশন তত্ব অসীমের মাঝে নিখুঁত সীমারেখা টানতে সক্ষম হলেও, সত্তর বছরের কীর্তিময় জীবন প্রমাণ করেছে সীমার মাঝে অসীমের অস্তিত্ব। কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের কাজ তাঁকে নোবেল পুরষ্কার এনে দিয়েছিল।  আর যে কাজগুলো বিজ্ঞানজগতে তাঁকে অমর কর রাখবে তা হ'ল তরলীকৃত হিলিয়ামের অদ্ভুত ধর্মের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, পরমাণুস্থিত নিউক্লিয়াসের ক্ষীণ বলের (weak interaction) তত্ব,  পদার্থের অতিপরিবাহিতা (Superconductivity) এবং পার্টন তত্ব। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের যশস্বী বিজ্ঞানীরা পদার্থবিজ্ঞানের যে মঞ্চ রচনা করেন, রিচার্ড ফাইনম্যান দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তার উপর শুধুমাত্র দাপিয়েই বেড়াননি, মহামূল্য সম্ভারে সেই অঙ্গন সমৃদ্ধ করেন। আমার সঠিক জানা নেই নোবেল জয়ীদের মধ্যেও এই কর্মোদ্যম  ও সৃষ্টির দীর্ঘ ধারাবাহিকতা কতজন অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছেন। তিনি ছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। কিন্ত নানান বিষয়ে উৎসাহ ও অবদানের স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন তাঁর কীর্তিতে। ক্যালটেকে থাকাকালীন ছুটির অবসরে মাস ছয়েক জীববিদ্যার উপর গবেষণা চালিয়ে DNA সংক্রান্ত সাংকেতিক ভাষার নতুন এক অনুবাদ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যে কোন বিষয়ের অধ্যয়নের স্বধীনতায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। পূর্বাপর প্রস্তুতি ছাড়াই যা করা যায়। মৌলিক ব্যাপারগুলি জেনে নিয়ে তিনি উদ্ভাবনা করতেন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি। বিজ্ঞান পত্রিকার প্রবন্ধে ভাষা ভাষা চোখ বোলাতেন মূল সমস্যাটা বোঝার জন্য। সমাধান করতেন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে। ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের পর তিনি বুঝেছিলেন এবং বলেও ছিলেন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ক্ষুদ্রাকৃতিই কম্পিউটারের ক্ষিপ্রতা বাড়াবার একমাত্র উপায়। ষাটের দশকের শেষের দিকে এই সূক্ষ্ম প্রযুক্তিরই উপহার দেখি ইনটিগ্রেটেড সার্কিট টেকনোলজি - স্বল্প পরিসরে বহু ট্রানজিস্টরকে জোড়া লাগিয়ে রাখার কৌশল। এই কৌশলে এক দশকের মধ্যে কম্পিউটারের ক্ষিপ্রতা বেড়ে গেল, অন্তত একশ গুণ। কিন্ত এই উপায়ে ক্ষিপ্রতা বাড়ানোর একটা সীমা আছে। ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধির উপায়ের কথা ভেবে ফাইনম্যান শেষ বয়সে ব্যস্ত হয়েছিলেন কম্পিউটার যন্ত্রটির সর্বাঙ্গীণ চেহারায় একটা নতুন পরিবর্তন আনতে - বিকল্প একটা গঠন আর এই নতুন বিন্যাস কাজ করবে অভিনব নিয়মে অভিনব (Algorithm) কৌশলে। এ ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অপরিসীম। 

পছন্দ-অপছন্দ ও মেলামেশার ব্যাপারে তিনি নিজস্ব স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। জীবনে সাক্ষাৎ মাত্র এক-আধবার হলেও বাকসংযমী  পল ডিরাক ছিলেন ফাইনম্যানের কাছের মানুষ এবং অনুপ্রেরণা। কারণটা হয়তো এই যে, দুই দশকের পরিশ্রমে ডিরাকের সৃষ্ট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের সূত্র ধরে কাজ শুরু করে জীবনের বিখ্যাত কাজটি তিনি শেষ করেন ১৯৪৮ সালে।

সদাহাস্যময় ও প্রণোচ্ছল হানস্ বেথে ও তাঁর পরিবার ছিল ফাইনম্যানের খুবই আপনজন। লস্ আলামসে এই রত্নটিকে চিনতে পাকা জহুরী বেথের ভুল হয়নি। আজীবন স্নেহ করতেন। আর্লিনের মৃত্যুর পর বিধ্বস্ত রিচার্ডকে কর্নেলে নিয়ে আসার মূলে ছিলেন হানস্ বেথে এবং ক্যালটেকে যোগদানের আগে যতদিন তিনি কর্নেলে ছিলেন বেথের পরিবার ছিল রিচার্ডের আড্ডা, তামাশা, অবকাশকালীন বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম জায়গা। অপেক্ষাকৃত বর্ষীয়ান বেথে বুঝেছিলেন যে সময়ের আবর্তনে দুঃখের আবেগ ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসবে। তাই হয়েছিল, কারণ কর্নেলের বছরগুলোই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কর্নেলের দিনগুলোতে আরও একজন মনের মতো সঙ্গী ছিলেন তাঁর - ফ্রিম্যান ডাইসন। ডাইসনই প্রথম ফাইনম্যানের তত্ত্বের গুরুত্ব বুঝতে পেরে ওপেনহাইমারকে চিঠি লেখেন। কাজকর্মের অবসাদ মেটাতে খেয়ালি রিচার্ডের ভ্রমণসঙ্গীও ছিলেন ফ্রিম্যান ডাইসন। জুলিয়ান সুইংগার ছিলেন তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, যদিও সেই প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বা মূল্যবোধের কোনও ঘাটতি ছিল না। ক্যালটেকে সহকর্মী ও বয়ঃকনিষ্ঠ মারে গেলম্যান ছিলেন স্নেহভাজন এবং পরবর্তী জীবনে বিজ্ঞান আলোচনার প্রধান সঙ্গী।

সৌন্দর্যবোধেও তাঁর ছিল অপরিসীম ব্যাপ্তি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হতেন এবং বিজ্ঞানের যোগসূত্র খুঁজতেন। তিনি প্রশ্ন করেননি প্রকৃতি কেন এত বৈচিত্র্যময়, বরং নিয়ম খুঁজেছেন সেই বৈচিত্র্যের - অকাট্য যুক্তিতে, অভিনব ধারায়। এক দিকে রাজা-রানি পরিবৃত অভিজাত,  সম্পন্ন পোশাকী পরিবেশ, অন্য দিকে নাইটক্লাবের উন্মুক্ত পরিবেশ - এই দুই-ই ছিল তাঁর উপভোগ্য। 

আশির দশকের গোড়ায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয় এবং ক্ষুদ্রান্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ে। আট বছরের মধ্যেই দেহে তিন-তিনবার অস্ত্রোপচারের ধকল তিনি সহ্য করতে পারেননি। ১৯৮৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের তিন তারিখে তিনি শেষবারের জন্য উকলা মেডিক্যাল সেন্টারের ইনটেনসিভ কেয়ারে ভর্তি হন। ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাত্রির সামান্য কিছু আগে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। শিয়রে দন্ডায়মান ছিলেন নিশ্চল, নীরব স্ত্রী গুইনেথ, ভগিনী জোয়ান এবং আত্মীয়া, ফ্রান্সেস লিউইন্। মৃত্যুশয্যায় তাঁর শেষ কথা - "I hate to die twice" অর্থাৎ "দুবার মরতে আমি ঘৃণা করি।"

রিচার্ড ফাইনম্যানকে দেখার পরম সৌভাগ্য আমার কখনও হয়নি এবং তিনি ভারতবর্ষেও কখনও আসেননি যদিও ভারতবর্ষের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তাঁর অকুন্ঠ শ্রদ্ধা। পোর্ট অব স্পেনের ত্রিনিদাদে ট্যাক্সিযোগে ভ্রমণের সময় চালকের কাছে কথা প্রসঙ্গে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য থেকে এটা প্রকাশ পায়। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় তাঁর লেখা এবং তাঁর সম্বন্ধে লেখা বই, কাগজপত্রের মাধ্যমে। পৃথিবীর মাটিতে অচেনা, অদেখা এই মানুষটির অনুপস্থিতির বিষণ্ণতা মাঝে মধ্যেই আমাকে গ্রাস করে। আমি মৌলবিজ্ঞানের লোক নই; তা সত্বেও এমন অনুভূত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে যা মনে হয় তা হ'ল তাঁর জীবনদর্শন সব বিজ্ঞানের উর্দ্ধে। রিচার্ড ফাইনম্যান রক্তমাংসে গড়া একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আসলে এই ধরনের বর্ণময়, কর্মময়, নির্ভীক এবং বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন অর্থাৎ সত্যিকারের নায়কোচিত ব্যক্তিত্বের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা, হৃদয়ের উষ্ণতা ও চরিত্রের দ্যুতি এতই তীব্র যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই কল্পনার মানসপটে তা চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। সত্তর বছরের ঘটনাবহুল গুরুত্বপূর্ণ মাত্র কয়েক ঝলক পাঠকের কাছে তুলে ধরে আমি তাই তৃপ্ত। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: আমার সহকর্মী ডঃ আশিস কুমার ধারাকে এই লেখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সাহায্য করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। 

 তথ্য সূত্র

১. Surely you are joking Mr Feynman - R P Feynman.

২. What do you care what other people think - R P Feynman

৩.  The character of physical law - R P Feynman

৪.   QED, The strange theory of light and matter - R P Feynman

৫.   Genius - Richard Feynman and modern physics - James Gleick 

৬.   An outsider's insider view of the Challenger enquiry - Physics To-day Feb '88, 26

৭.   Physics To-day - Feb 1989 ( Specisl Issue: Richard Feynman)

 ৮.   Stephen Hawking - A life in science - Michael White & John Gibbon

৯.     A note on Richard Feynman - C K Majumdar