Wednesday, June 1, 2022

বিতর্কিত শক্তির উৎস

 


                      বিতর্কিত শক্তির উৎস 


প্রস্তর যুগে মানুষ যেদিন চকমকি ঠুকে আগুনের সন্ধান পেয়েছিলেন, মানব সভ্যতার প্রস্তর ভিত্তিস্থাপিত হয়েছিল সেদিন। আগুন যে একটা কল্যাণমূলক শক্তি, সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে না পারলেও, তার ব্যবহারিক দিকগুলো আত্মরক্ষার্থে কাজে লাগিয়েছিল। এর পর থেকে শক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারে মানব সভ্যতা ধাপে ধাপে এগিয়েছে। আজকের আধুনিক যুগে "শক্তির উৎস" - এই বিষয়টির আলোচনায়, পারমাণবিক শক্তি, বিতর্কের ঝড় তোলে। কাজেই পারমাণবিক শক্তি দিয়েই শুরু করা যাক্ আলোচনা।

পারমাণবিক শক্তি ভাল বা খারাপ - প্রশ্নটা যতই সহজ বলে মনে হোক না কেন, উত্তরটা ভীষণভাবেই জটিল। কারণ গুণিজনেরা অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীরা এর স্বপক্ষে বা বিপক্ষে মাত্রাতিরিক্ত বক্তৃতা দিয়ে যাবেন - অবশ্যই নিজের পছন্দমতো দিকটা সম্বন্ধে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে। যাঁরা স্বপক্ষে বলছেন, তাঁরা বিষয়টির নেতিবাচক দিকটা যে জানেন না - তা আদৌ নয়। উল্টোটাও একই রকমভাবে সত্যি ; অর্থাৎ বিপক্ষ ক্যাম্পের লোকেরা ব্যাপারটার গুণাবলী সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। প্রশ্নটা তা নয়। প্রশ্নটা হ'ল, ব্যাপারটা তর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি তার ব্যবহারিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে কিছু একটা লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে ? আমার মতে তাত্ত্বিক দিকটা আপাতত শিকেয় তুলে চোখ কান এবং বিশেষ করে মন খোলা রেখে পারমাণবিক শক্তির উৎস ও তার ব্যবহারিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা যাক। প্রচলিত প্রথায় শক্তি উৎপাদনের ব্যাপারটা সাধারণ মানুষের অজানা নয় ; কারণ শতকরা ৯৮ ভাগ শক্তি উৎপাদিত হয় সেই সব উৎস থেকেই। কাজেই সেই সব উৎসের বিষদ ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। পারমাণবিক শক্তির আলোচনায় আসা যাক এবং দেখা যাক শক্তি উৎপাদনের মোকাবিলায় ভারতবর্ষের চেহারাটা কি।

আগেই বলেছি যে ব্যপারটা একটু খোলা মনে আলোচনার প্রয়োজন। পারমাণবিক শক্তির বিরুদ্ধবাদীতা করে যে সব প্রবন্ধ পড়েছি বা যে সব বক্তৃতা শুনেছি, তাতে মনে হয়, লেখক/লেখিকা বা বক্তার অবচেতন মনে পরমাণুর ধ্বংসলীলার ব্যাপারটা ভীষণভাবেই কাজ করে চলে এবং স্বভাবতই হিরোসিমা-নাগাসাকির কথা এসে পড়ে। এছাড়া ব্যাপারটার নেতিবাচক দিকটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিভিন্ন তথ্যাদির উদ্ধৃতি এসে পড়ে। সাধারণ বুদ্ধিতে বলে যে ব্যাপারটাতে যদি যথেষ্ট ইতিবাচক দিক না থাকত, তাহলে এত তথ্যাদির প্রয়োজন পড়ত না, এবং বুদ্ধিজীবীরা নথিপত্র, পেপার ক্লিপিং ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহের পিছনে সময় নষ্ট করতেন না। অতএব ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে।

পরমাণু শক্তি মানেই যে পরমাণু বোমা নয় সেটা কারুরই অজানা নয়। পার্থক্যটা এইরকম - পরমাণু বোমার শক্তি অনেকটা লাগামছাড়া দানবের শক্তির মতন ; কারণ সেখানে তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের বিভাজন প্রক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত। সেই কারণেই পরমাণু বোমা তাৎক্ষণিক ধ্বংসের রূপ নেয় এবং বিকিরণের প্রবল প্রকোপে প্রাণীজগতের বিনাশ হতে থাকে। এই ঘটনা বৈজ্ঞানিকদের সেইদিন থেকেই জানা যেদিন তেজস্ক্রিয় পরমাণুর বিভাজনে (ইউ ২৩৫) উদ্ভূত পদার্থের ভরের সামান্য লোপ ঘটে এবং কিছু পরিমাণ শক্তির উদ্ভব হয়। আইনস্টাইনের অপেক্ষবাদ তত্বের উপজাত E= mc² সূত্র থেকে উদ্ভূত শক্তির পরিমাণের (m= লুপ্ত ভর, c= শুন্যে আলোর গতিবেগ, সেকেন্ডে ৩০০০,০০০ কি মি) থেকে সঠিক উত্তর মেলে। হিসেবটা হ'ল, মাত্র একটি ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসের বিভাজনের ফলে উদ্ভূত শক্তির পরিমাণ প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ইলেকট্রনভোল্ট- আদৌ তেমন কিছুই নয়। কিন্ত একতাল ইউ-২৩৫, যার মধ্যে কয়েকশ হাজার কোটি নিউক্লিয়াস আছে, তার কয়েক শতাংশ বিভাজনে শক্তির পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। তাই এনরিকো ফার্মি প্রায় পাঁচ দশক আগেই এই দানবকে লাগাম দেবার কাজে উঠে-পড়ে লাগেন। জন্ম হয় রিয়্যাকটার বা পারমাণবিক চুল্লির। এখানে বিভাজন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে শক্তি উৎপাদনের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রিত করা হয় এবং সেই শক্তি থেকে উদ্ভূত তাপকে রূপান্তরিত করে বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিণত করা হয়। বোঝা গেল যে পরমাণু শক্তি আর পরমাণু বোমা এক জিনিস নয়। তাহলে ভীতিটা কোথায় ? ভীতিটা অবশ্যই আছে। পরমাণু চুল্লি থেকে প্রাণিজগতের উপর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব অনস্বীকার্য। দেখা যাক্ সেই মাত্রা কতটুকু।

প্রাণীদেহে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রার উপরসীমা কতটা অনুমোদন করা যায়, তা আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা বেঁধে দিয়েছেন। পৃথিবীতে যেখানেই পরমাণু চুল্লি আছে, সেইখানেই সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না, কারণ যথেষ্টর থেকেও বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা হয় এবং বিকিরণের মাত্রা, শোষণের মাপজোখ কঠোর নিয়ম মেনে পালন করা হয়। এটা জেনে রাখা প্রয়োজন যে মহাজাগতিক রস্মির যে বিকিরণ প্রাণিজগৎ অহরহ শোষণ করে চলেছে, তার মাত্রা পরমাণু চুল্লিতে কর্মরত কর্মীর থেকে অনেকটা বেশি। এক্সরের সামনে উন্মোচিত করলে যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ শোষিত হয় সেটাও নেহাতই কম নয়। এমনকি যে বিলাসবহুল পাকা বাড়িটিতে আমরা বাস করছি বা রঙিন টিভি দেখছি সেখান থেকেও সর্বক্ষণই আমরা নিজের অজান্তে বিকিরণের শিকার হচ্ছি। কাজেই তেজস্ক্রিয় বিকিরণের থেকে যে রেহাই পাওয়া যাবে না, তা প্রকৃতিই তার জন্মলগ্নে ঠিক করে রেখেছিল। সংযোজিত তালিকা থেকে বিভিন্ন উৎস থেকে বিচ্ছুরিত বিকিরণের মাত্রা সম্বন্ধে একটা ধারণা করা যাবে।




পরমাণুর চুল্লির বিকিরণ প্রসঙ্গে কিছু কিছু অবৈজ্ঞানিক ধ্যানধারনা সাধারণের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। পরমাণু চুল্লির বেশ কয়েকশ কিলোমিটার দূরের গ্রামের কিছু মানুষকে বিকলাঙ্গের শিকার হতে হয়েছে বা প্রাণঘাতী অসুস্থতার বলি হতে হয়েছে - এমন তথ্য মাঝেমধ্যেই কাগজপত্রে বা বক্তৃতায় পরিবেশিত হয়। পরিসংখ্যান এতই কম যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই তথ্য থেকে কিছুই প্রমাণিত হয় না। আমাদের কালীঘাটের কালীমন্দিরের আশেপাশে বেশ কিছু ভিক্ষুকের মধ্যে সেই ধরনের অসুস্থতার উপসর্গ দেখা যায়। অথচ কালীমন্দিরের কাছাকাছি শবদাহ করার বৈদ্যুতিক চুল্লি ছাড়া আর অন্য কোন চুল্লি নেই। এমনকি পূর্ব ভারতের আশপাশেও কোথাও পরমাণু চুল্লি নেই। মাফ্ করবেন, পরমাণু শক্তির স্বপক্ষে বলা হচ্ছে ভেবে এই উক্তিটাকে ভুল বুঝবেন না। বরং বহু তথ্যের মধ্যে এটাও একটা তথ্য। সত্যি কথা বলতে কি পরমাণু চুল্লির দু'কিলোমিটারের  মধ্যে গত তিন দশক ধরে পরমাণু শক্তি সংস্থার বেশ কয়েক হাজার কর্মী ট্রম্বেতে বসবাস করছেন। তারাপুর, রাজস্থান, মাদ্রাজ, দিল্লির নিকটবর্তী নরোরা, অর্থাৎ পূর্ব ও মধ্য ভারত ছাড়া ভারতবর্ষের যেখানেই পরমাণু চুল্লি আছে, তার অনতিদূরে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস কয়েক দশক ধরে চলে আসছে। তিন দশকের মধ্যে ভারতীয় পরমাণু সংস্থার একজন কর্মীও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের বলি হয়েছেন বলে শোনা যায়নি। এটা একটা ভাল পরিসংখ্যান বলেই মনে করি। প্রশ্ন উঠবে আমেরিকার থ্রি-মাইল আইল্যান্ড বা রাশিয়ার চেরনোবিল। থ্রি-মাইল আইল্যান্ভের কথাটা থাক, কারণ সেখানে ব্যাপক ধ্বংসের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তথ্য যাই বলুক, চেরনোবিল অবশ্যই ব্যাপক ধ্বংসের প্রতীক। কিন্ত সেটা তো দুর্ঘটনা মাত্র।

রাসায়নিক কারখানার বিষাক্ত গ্যাস লিকে মৃত্যুর বিভিন্ন ঘটনা জোড়া লাগালে সংখ্যাটা নেহাত কম হবে না। এই তো কয়েক বছর আগেই বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাসের তান্ডবলীলায় ভোপালের বেশ কয়েক হাজার মানুষ বলি হয়েছেন। বেশ কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পরেও সেই বিষের প্রকোপ থেকে সেখানকার মানুষ আজও মুক্তি পাননি কারণ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সেই বিষ ধাওয়া করে এসেছে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের সঙ্গে এর কোন যোগ নেই। দুর্ঘটনাটা রাসায়নিক গ্যাসের বিস্ফোরণের ফলে। সুতরাং দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই।

পরমাণু শক্তির মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে সব সময়ই একটা বিতর্কের ঝড় ওঠে। বৈজ্ঞানিকদের দাবি যে, প্রচলিত যে-কোন প্রথায় বিদ্যুত উৎপাদনে যে খরচ পড়ে তার তুলনায় পরমাণু শক্তি উৎপাদনের মূল্য কম। দামের ব্যাপারে যে সংখ্যাটা তাঁরা সাধারনত উল্লেখ করে থাকেন, সেটা বেশ পুরানো হিসেব থেকে নেওয়া, ইদানিং কালের আক্রাগন্ডার বাজারে সেই দামে পোষাবে না। এখানে বিজ্ঞানীদের অবচেতন মনে যেটা কাজ করে তা হয়তো এই রকম যে, সস্তায় ভাল জিনিস পাওয়া যাচ্ছে- এই ব্যাপারটায় সরব হলে সরকারি আমলাদের থেকে আর্থিক অনুমোদন আদায় করা অনেকটাই সহজ হবে এবং পরমাণু শক্তির নেতিবাচক দিকগুলো তেমন প্রাধান্য পাবে না। আমার মতে, যে-কোন জিনিসের চাহিদা থাকলে দামের ব্যাপারটাতে বোধহয় কিছু আসে যায় না।

এখন কথা হ'ল পরমাণু শক্তির প্রয়োজন আছে কি না ? তার আগে দেখা দরকার ভারতবর্ষের বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপাদিত শক্তি জোড়া লাগালে চেহারাটা কি দাঁড়ায়। আগেই বলেছি শক্তি সভ্যতা বিকাশের গোড়ার কথা এবং সার্বিক জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে শক্তি খরচের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। এ নিয়ে কোন বিতর্ক চলে না।

সাদা কথায় শক্তি কথাটার চুল চেরা বিচার না করে বিদ্যুত শক্তির কথাই বলছি। উন্নতিশীল দেশগুলোর, বিশেষত জাপান ও পশ্চিমী দেশগুলোর কথা থাক। কারণ তাদের অর্থনৈতিক সামাজিক ছাঁচ সম্পূর্ণ আলাদা এবং সেই ছাঁচের একটা সামগ্রিক চেহারা আছে। সুতরাং সেই সব দেশের গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুতচালিত আলো-পাখা, বিলাসবহুল সরঞ্জাম, এমনকি বিদ্যুতখেকো ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বহুদিন ধরে হয়ে আসছে। ভারতবর্ষের যেসব উৎস থেকে বিদ্যুত উৎপাদিত হয় তার ২.৫ শতাংশ ( ~ ১৫০০ মেগাওয়াট) পরমাণু শক্তি। এই হিসেবটা সঠিক ধরে নিলে ভারতবর্ষের বিদ্যুত উৎপাদন সর্বসাকুল্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। ভারতবর্ষের লোকসংখ্যা ৮৫ কোটি ছুঁই ছুঁই। অতএব ধার্য বিদ্যুত মাথাপিছু ৭০ ওয়াট। শুধু প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই প্রয়োজন ওইটুকু শক্তির এবং প্রতি মুহূর্তেই সেই চাহিদা বেড়ে চলেছে। কারণ শহরে ও গ্রামেগঞ্জের রাস্তাঘাটের চতুর্দিকে এবং খবরের কাগজ, টেলিভিশন ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনার সুখী দাম্পত্য জীবনের নিভৃত তত্বের ফলাও করে প্রচার থাকলেও মা ষষ্ঠীর দয়ায় শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের লোকসংখ্যাই বেড়ে চলেছে বছরে ১২ লক্ষ। সমানুপাতের হিসেবে সারা ভারতে লোকসংখ্যা বাড়ছে বছরে প্রায় দেড়কোটি। প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য ৭০ ওয়াট হিসেবে বছরে অতিরিক্ত শক্তির চাহিদা অন্তত ১০০০ মেগাওয়াট। শক্তির ঘাটতি যে আছে এবং দিনে দিনে যে সেটা আরও প্রকট হচ্ছে, তা অনস্বীকার্য। শুধু তাই নয় ; পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। প্রশ্ন উঠবে শহরতলির কলকারখানা বা শহরের অফিস কাছারি চালু রাখার জন্য যে বিপুল বিদ্যুত শক্তির প্রয়োজন, সেটা আসছে কোথা থেকে ? উত্তর খুব সহজ। সেটা আসছে শতকরা ৬৫ ভাগ মানুষ, যাঁরা সুদূর গ্রামেগঞ্জে বসবাস করেন তাঁদের অর্ধভূক্ত বা অভুক্ত রেখে। অর্থাৎ উৎপাদিত বিদ্যুত শক্তির বেশির ভাগটাই ভোগ করেন শহর বা শহরতলির মানুষেরা। ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে খুব নির্মম বলে মনে হলেও, এটাই স্বাভাবিক নতুবা থার্মোডায়নামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র ভেঙে পড়বে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যতটুকু অগ্রগতি চোখে পড়ছে সেটাও আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাবে। একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যেতে পারে। ধরা যাক এক কোটি টাকা আছে। এই টাকা সমান ভাবে এক কোটি মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হ'ল। ফলাফল মাথাপিছু এক টাকা। একেবারে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ওই এক টাকায় এক পেয়ালা চা ছাড়া আর কিছু মিলবে না, তাও ওই একবার। পক্ষান্তরে যদি ওই এক কোটি টাকা একজন সজ্জন  মানুষকে দেওয়া যায়, তাহলে তার পক্ষে অনেক কিছু কল্যাণমূলক কাজ করার সুযোগ থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, টাকাটা শুধুমাত্র ব্যাঙ্কে সঞ্চিত রাখলে প্রতি বছর একটা মাঝারি মাপের শিল্পের জন্ম হতে পারে এবং তাতে শিল্পোৎপাদন দ্রব্য ছাড়াও কিছু মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হতে পারে। এখানে টাকাটা শক্তির সমতুল্য। যাইহোক, ব্যাপারটা বোঝা গেল যে উৎপাদিত শক্তির অনেকটাই স্বল্প কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কেন্দ্রীভূত করার প্রয়োজন আছে যাতে নাকি গঠনমূলক একটা ফল পাওয়া যায়। এখন "নুন আনতে পান্তা ফুরোয়"- এই অবস্থার মধ্যে দেশের ৬৫ শতাংশ লোকের চলবে কি করে? সোজা কথায় চলবে না, আরও সহজ করে বলা যায়  চলছেও না। সুদূর গ্রামেগঞ্জের জনগণের অস্বাভাবিক দুরবস্থা সহজেই অনুমেয়। মানুষের মতো বেঁচে থাকার একটা ন্যুনতম মান আছে। ভারতবর্ষের ওই ৬৫ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান বোধ হয় শুধুমাত্র তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গেই তুলনা করা চলে। ওই মানুষগুলোর শুধুমাত্র চলচ্ছক্তি বজায় রাখার জন্য এই মুহূর্তে অতিরিক্ত শক্তি উৎপাদনের চাহিদা অন্ততপক্ষে কুড়ি হাজার মেগাওয়াট।  তারপর প্রায় সমস্ত রকম বিলাসিতা বর্জন করে কেবলমাত্র মানুষের মত বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন বাড়তি আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াট। মানুষের মত বেঁচে থাকার অর্থ এই যে, গ্রামেগঞ্জে প্রাথমিক স্কুল-কলেজের ব্যবস্থা থাকবে আর সামান্য হলেও বিদ্যুত চালিত আলো-পাখার ব্যবস্থা থাকবে। স্বাধীন দেশে এইটুকু আশা করার মধ্যে কোনও অন্যায় তো দেখছি না।

শক্তির সমস্ত উৎস উজাড় করেও বিগত পঞ্চাশ বছরে শক্তি উৎপাদন সম্ভব হয়েছে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। সুতরাং রাতারাতি যদি রূপকথার আলাদীনের আবির্ভাব না হয় তাহলে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ন্যুনতম মান বজায় রাখার জন্য যে শক্তি উৎপাদনের প্রয়োজন, চূড়ান্ত অগ্রাধিকার দিলেও তা তৈরি করতে আগামী কয়েক দশক লেগে যাবে। পরিস্থিতি যে মারাত্মকভাবে ভয়াবহ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কাজেই বিতর্কের ঝড় না তুলে, বাছবিচার না করে, অবিলম্বে বৃহদায়তন (massive) সমস্ত উৎস থেকেই শক্তি উৎপাদনের কাজে লেগে পড়ার দরকার - তা সে জলবিদ্যুৎ হোক, তাপবিদ্যুৎ হোক বা পরমাণু বিদ্যুত হোক না কেন। প্রযুক্তিগতভাবে সমস্ত বৃহদায়তন উৎস থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের কৌশল দেশের আয়ত্তের মধ্যে। অথবা বিকল্প পরিকল্পনা হিসাবে আর যেটা করা যায় তা হ'ল বৈদিক যুগের জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে নিয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করা। তাহলে আর শক্তির প্রয়োজন হবে না।

পরিশেষে একটা ব্যাপার বলে রাখা প্রয়োজন। বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে যেগুলো বিবেচিত হয় সেগুলোর যে কোনও একটাকেও ঠিক বৃহদায়তন উৎসের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। গোবর গ্যাস পরিকল্পনায় বিদ্যুত উৎপাদনের মাত্রা আদৌ তেমন কিছু নয়। মায়াপুরের গুরুকুলের গোটাকতক বৈদ্যুতিক আলো জ্বালাবার পক্ষে তা হয়তো যথেষ্ট। বায়ূচালিত উইন্ডমিলের থেকে যে বিদ্যুত উৎপাদিত হয় তার ক্ষমতা কয়েক দশক মেগাওয়াটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর তাছাড়া এ উপায়ে বিদ্যুত তৈরির জন্য সাধারনত সমুদ্রোপকূলবর্তী নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশের প্রয়োজন। সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুত শুধু দুর্মূল্যই নয়, এই উপায়ে বৃহদায়তন দূরে থাক, মাঝারি আয়তনের বিদ্যুত উৎপাদনের ব্যাপারটা এখনও গবেষণাগারের বিষয়বস্ত হিসেবেই সীমাবদ্ধ আছে।

উপসংহারে এইটুকুই বলা যায় যে শুরুতে মনে হয়েছিল ভারতবর্ষের শক্তি উৎপাদনের চেহারাটা গামা পালোয়ানের মত না হলেও, দোহারা গোছের কিছু একটা হবে, নিদেনপক্ষে ক্ষীণজীবী। বিশ্লেষণ করে দেখছি চেহারাটা নেহাতই কঙ্কালসার।

No comments: