Tuesday, June 28, 2022

ফ্র্যাকটালের জগৎ

ম্যানডেলব্রটের সৃষ্টি এই ফ্র্যাকটাল-আলপনার যে-কোনও ক্ষুদ্র অংশ বাড়িয়ে তুললে পাওয়া যাবে জটিল থেকে জটিলতর রূপবৈচিত্র্য 


ফ্র্যাকটালের  জগৎ


সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে যে জিনিসগুলো আমাদের চোখে পড়ে, বিশেষত জড় পদার্থের জগতে, তার আকার সম্বন্ধে আমাদের একটা ধারণা আছে। কারণটা হ'ল এই যে, আকারগুলো নিত্য পরিচিত সংস্কারলব্ধ জ্যামিতিক আকারগুলোর সঙ্গে সহজেই তুলনীয়। অর্থাৎ কোনটা চৌকো, কোনটা লম্বা, বৃত্তাকার গোল, ডিম্বাকার বা কোনটা হয়তো এইসব মৌলিক আকারের সমন্বয়ে তৈরি। এটা গেল বস্তুটির আকারের বিবরণ। আকার ছাড়াও প্রত্যেকটা জিনিসের আরও একটা ধর্ম আছে ; তা হ'ল বস্তুটির মাত্রা। আসলে মাত্রা এবং আকারের থেকেই বস্তুটির সার্বিক চেহারা সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা করা যায়। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় ছেলেরা ঘুঁড়ির দোকানে মাঞ্জা সুতো কেনার সময় বলে ৫০০ গজ বা ১০০০ গজ সুতো চাই। অর্থাৎ দৈর্ঘ্যের মাপটা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। সুতোর প্রস্থ বা স্থূলতা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। কাজেই, ব্যবহারিক জগতে সুতো বা অনুরূপ যথেষ্ট লম্বা জিনিসের মাত্রা এক বা একমাত্রিক। একই যুক্তিতে বলা যায় যে একটা চাদর বা খাতার একখানা পাতা হ'ল দ্বিমাত্রিক এবং একখানা বই বা একটা বাক্স বা প্রায় সব জিনিসই ত্রিমাত্রিক। আসলে মাত্রা, আকার ইত্যাদি সংজ্ঞার প্রয়োজন হয়েছে এই কারণে যাতে বস্তুটির নিখুঁত মাপ-জোখের একটা বিজ্ঞান ভিত্তিক  নিয়ম বার করা যায়।

এখন কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, পুরী থেকে দীঘা পর্যন্ত সমুদ্রোপকূলের দৈর্ঘ্য কত অথবা মাপ-জোখের হিসেবে একটা গাছের পাতা বা আকাশের কোলে ভাসমান মেঘের কিংবা একটা পাহাড়ের বিবরণ দিতে, তা হলে তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারবেন। আসলে প্রকৃতির সৃষ্টি এতটাই জট পাকানো যে তা খোলার জন্য বিজ্ঞানীরা সর্বদাই নতুন নতুন চিন্তাধারায় যাচাইয়ের কথা ভাবছেন। আরও ভাবছেন যে কীভাবে এই জটিলতার মধ্যে ছন্দ বা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উদ্দেশ্য এই যে, আপাতদৃষ্টিতে যে জিনিসগুলোর গঠন এবং যে ঘটনাগুলোকে ভীষণরকম এলোমেলো বা বিশৃঙ্খল বলে মনে হয়, সেই বিশৃঙ্খলার ভেতর একটা স্বীকৃত রীতি-পদ্ধতি আবিষ্কার করা। প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎই পাহাড়-পর্বত বা মেঘের বিবরণ ও মাপজোখে কোন পরমার্থ লাভ হবে ? লাভ-লোকসানের ব্যাপারটা ব্যবহারকারীর প্রয়োজনে এবং আলোচনার শেষে বোঝা যাবে যে এই সমস্ত উদ্ভট বস্তুর চরিত্রের বিবরণ ও মাপের নমুনায় রহস্যাবৃত হয়ে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানচর্চার এক নতুন ভাষা। এটা হয়তো বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দেবে এক নতুন অস্ত্র যা কাজে লাগিয়ে তাঁরা কাটাছেঁড়া করতে পারবেন অনেক জটিল সমস্যার। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি যা এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়, এমনই একটি বিজ্ঞানের ভাষা। মূলত উক্ত চেহারাগুলোর মাত্রা এক, দুই কিংবা তিন নয়, মাঝামাঝি কিছু একটা, ১.৫৩, ২.৭১ ইত্যাদি ইত্যাদি....। দেখা যাক চেহারার ধর্মের কোন্ বৈচিত্র্যে মাত্রার মাপে ভগ্নাংশ আসে আর তা দিয়ে কী উপকারই বা সাধিত হয়।

(ক) ফার্নের গঠনপ্রনালী (খ) কক্ কার্ভের  গঠনপ্রনালী (গ) সায়ারপিন্সকি গাস্কেট।  প্রাথমিক প্রতিলিপি যাই হোক, চূড়ান্ত চেহারাটা সব ক্ষেত্রেই সায়ারপিন্সকি গাস্কেট। 


সাদা কথায়, প্রচলিত জ্যামিতিক বিভিন্ন চেহারাগুলোকে নিজস্ব কায়দায় কাজে লাগিয়ে স্থপতিবিদ্যায় পারদর্শী (Architecht) যেমন ঘর-বাড়ি, ব্রিজ, মনুমেন্ট ইত্যাদি গঠনের চমৎকার নক্সা তৈরি করেন এবং বাস্তবে রূপ দেন, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির চেহারা কাজে লাগিয়ে তেমনই জটিল গঠনের খুঁটিনাটির নিখুঁত রূপ দেওয়া সম্ভব। তা যদি সম্ভব হয়, তা হলে একটা জিনিস খুব পরিষ্কার যে জটিল বিষয়টির ক্রমবিকাশের বৃত্তান্ত সম্বন্ধে একটা বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা করাও সম্ভব। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রচলিত জ্যামিতিক চেহারাগুলির সংখ্যা সীমিত ; অন্য দিকে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির সংখ্যাগুলির সংখ্যা শুধুমাত্র অগুনতিই নয়, কোনও নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকে সেগুলোর দেখাও মিলবে না। মোটামুটিভাবে সহজ সরল নিয়ম ও গাণিতিক সূত্রের মধ্যেই শৃঙ্খলিত হয়ে আছে ওই রোমাঞ্চকর নক্সাগুলি। যা প্রয়োজন তা হ'ল ওই গাণিতিক সূত্রগুলিকে কল্পনার সুরে বাঁধা। একটা উপমা দিলে এই সুর বাঁধা ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধারণা করা যাবে। যে কোন তার-যন্ত্রের বাদ্যকর যন্ত্রের কানে মোচড় লাগিয়ে তারের সুর বাঁধেন। অর্থাৎ তারগুলোর টান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গাণিতিক সূত্রগুলির মধ্যেও নিয়ন্ত্রণাধীন এরকম এক-আধটা সূক্ষ্ম অংশ (Parameter) আছে, যার সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে সূত্রগুলি শুধুমাত্র অদ্ভুত নয়, শিল্পসুলভ চমৎকার প্রাকৃতিক চেহারার জন্ম দেয়; কোনটা হয়তো আকাশের মেঘ, কোনটা হয়তো আকাশের কোলে বিদ্যুতের ছটা, পাড় ভাঙা আঁকা-বাঁকা নদ-নদী, ঝর্ণা, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, এমন কি কোনোটা হয়তো ছায়াপথের নক্ষত্রপুঞ্জের সদৃশ।

ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির নির্দিষ্ট দুটি বিভাগ আছে - Linear Fractal ও Non Linear Fractal । শেষোক্ত বিভাগটি অপেক্ষাকৃত জটিল এবং বহুমুখী রহস্য সন্ধানের উৎস। প্রথমে আলোচনা করা যাক Linear Fractal । এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত মৌলিক চেহারাগুলি প্রচলিত জ্যামিতিক সরলরেখার এক বিচিত্র সমন্বয়। নানান্ ধরনের নিয়মকানুন, যাকে অঙ্কের ভাষায় বলা হয় Algorithm, তা কাজে লাগিয়ে এই মৌলিক আকারগুলি দিয়ে তৈরি হয় এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রূপ। ছবিতে একটা ফার্ন গাছের অংশ দেখানো হয়েছে। একটু লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে গাছটির প্রায় সবটাই একটি ত্রিভুজাকৃতি মৌলিক চেহারার প্রতিকৃতি। মৌলিক চেহারাটা ইচ্ছেমত ছোট বা বড় করে, প্রয়োজনমত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সাজিয়ে তৈরি হয়েছে ফার্ন গাছটি। এই যে ছোট-বড় করা বা ঘোরান-ফেরানো সবই Algorothm-এর আওতায় পড়ে। যাইহোক,  ত্রিভুজাকৃতি এই মৌলিক চেহারাটা ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চেহারা এবং এর উদ্ভাবক পোলিশ গণিতবিদ ওয়াকল্ সায়ারপিন্সকির নামানুসারে সায়ারপিন্সকি গাস্কেট। কেউ কেউ এটাকে সায়ারপিন্সকি ত্রিভুজও বলে থাকেন। ত্রিভুজটি তৈরি করার কায়দা এরকম - আজকাল পথে-ঘাটে জেরক্স মেশিনের চল হয়েছে এবং একটু উঁচু জাতের মেশিনে মূল চেহারার প্রতিলিপিকে ইচ্ছেমত ছোট-বড় করার ব্যবস্থা আছে। এখন যে-কোনও মাপের একটা আকার, ধরা যাক একটা বৃত্তাকার চেহারা এইরকম একটা জেরক্স মেশিনে ঠিক অর্ধেক করে তিনটি প্রতিলিপি নিয়ে একটি সমবায় ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দুতে রাখা হ'ল। এইবার এই সমগ্র চেহারাটা আবার ঠিক অর্ধেক করে একই উপায়ে সাজাতে থাকলে জন্ম হবে সায়ারপিন্সকি গাস্কেটের। সত্যি কথা বলতে কি প্রাথমিক প্রতিলিপি যাই হোক না কেন মাপ এবং সাজানোর নিয়ম অবিকৃত রাখলে চূড়ান্ত চেহারার মধ্যে নির্দিষ্ট একটি আকৃতির প্রবনতা দেখা যাবে। প্রাসঙ্গিক পরিভাষায় এই ব্যাপারটাকে বলা হয় attractor of the process ( ছবিতে ব্যাপারটা দেখানো হল, ছবি 'গ')। ভন্ ককের নামানুসারে কক্ কার্ভ, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির আরও এক গুরুত্বপূর্ণ চেহারা। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় যে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশ - এই অর্ধ শতক সময়ে জর্জ ক্যান্টর, গিসেপ পিয়ানো, ডেভিড হিলবার্ট, গ্যাস্টন জুলিয়া, ফেলিক্স হাউসডর্ফ প্রমুখ বেশ কিছু বিখ্যাত গণিতবিদের সৃষ্টি,  ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মৌলিক চেহারাগুলির জন্ম দিয়েছে এবং সেগুলির নিখুঁত মাপজোখের গাণিতিক উপায় বাতলেছে।

এখন প্রশ্ন হ'ল চেহারার কি ধরনের অভিনব বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির অন্তর্ভুক্ত বলে চিহ্নিত করা হবে ? চেহারার স্বয়ং সদৃশতা (Self Similarity), সম্পূর্ণ বা আংশিক অবশ্যই একটি জরুরি প্রয়োজনীয় শর্ত। সায়ারপিন্সকি গাস্কেট বা কক্ কার্ভ সম্পূর্ণ বা পুরোপুরি স্বয়ংসদৃশ, কারণ চেহারাগুলি নির্দিষ্ট চেহারার হুবহু প্রতিকৃতি। কিন্ত ফার্ন গাছটি আংশিক স্বয়ংসদৃশ কারণ কান্ড  (stem) বা পাতার মাঝখানের শিরা সায়ারপিন্সকি ত্রিভুজ নয়। তবে ছবিতে ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে একটি মাত্র মৌলিক আকারের কারসাজিতে (ছোট খোপের মধ্যে) গাছের পাতাগুলি তৈরি হয়েছে এবং গাছের একটা গোটা পাতার সঙ্গে (বড় খোপের মধ্যে) সমস্ত গাছটারও একটা মিল আছে। স্বয়ংসদৃশতার সংজ্ঞানুযায়ী একটা সরলরেখা বা বর্গক্ষেত্র বা একটা চৌকো বাক্স পুরোপুরি স্বয়ংসদৃশ  কিন্ত এগুলি কোনোটাই ফ্র্যাকটালের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির চেহারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে স্বয়ংসদৃশতা বজায় রাখার জন্য একই রকমের নির্দিষ্ট সংখ্যক ছোট ছোট অনুলিপি নিয়ম মেনে জোড়া লাগিয়ে গোটা চেহারাটা তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুলিপিগুলির সঙ্কোচন গুণিতক (reduction factor) ও সঙ্কুচিত অংশের সংখ্যার (number of reduced pieces) মধ্যে সম্পর্কটা স্থির নির্দিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে সায়ারপিন্সকি গাস্কেটের সঙ্কোচন গুণিতক ১/২, ১/৪, ১/৮....এবং কক্ কার্ভের ক্ষেত্রে ওই সংখ্যাগুলো ১/৩, ১/৯, ১/২৭...., কিন্ত সরলরেখা, বর্গক্ষেত্র, বা ঘনকের ক্ষেত্রে সঙ্কোচন গুণিতক যাই হোক না কেন, স্বয়ংসদৃশতা বজায় থাকবে। দেখা যাচ্ছে সায়ারপিন্সকি গাস্কেটের ক্ষেত্রে সঙ্কোচন গুণিতক অর্ধেক হলে তিনটে ছোট টুকরো জোড়া লাগিয়ে তৈরি হবে বড় একটা গাস্কেট, গুণিতক এক চতুর্থাংশ হলে টুকরোর সংখ্যা হবে ৯ টা ইত্যাদি। অর্থাৎ গুণিতক ১/২^ k হলে টুকরোর সংখ্যা হবে ৩^k। কক্ কার্ভের ক্ষেত্রে গুণিতক ১/৩, ১/৯, ১/২৭.... ১/৩^k হলে বড় কক্ কার্ভের জন্য টুকরোর সংখ্যা হবে যথাক্রমে ৪, ১৬, ৬৪...৪^k এবং ফেলিক্স হাউসডর্ফের মাত্রার সংজ্ঞানুযায়ী সায়ারপিন্সকি গাস্কেট ও কক্ কার্ভের মাত্রা যথাক্রমে ১.৫৮ ও ১.২৬, পরিচিত জ্যামিতিক চেহারাগুলোর মতো এক, দুই বা তিন নয় ; দেখা যাক হাউসডর্ফের নিয়মটি কি ? উচ্চমাধ্যমিক বীজগণিতের পাঠক্রমে লগারিদম্ (Logarithm) শিরোনামে একটা অনুচ্ছেদ আছে এবং যে কোন সংখ্যার Logarithm, সংক্ষেপে Log হিসেব করার তালিকা, পরিশিষ্ট হিসেবে সাধারণত পাঠ্যপুস্তকের শেষের অনুচ্ছেদে থাকে। হাউসডর্ফের মাত্রার সংজ্ঞায় তিনি Logarithm-এর নিয়মকে কাজে লাগিয়েছেন। জটিলতার মধ্যে না গিয়ে প্রাসঙ্গিক দু-একটা নমুনা দিলেই Log হিসেব করার আন্দাজ পাওয়া যাবে। 

তালিকা লক্ষ্য করলে নিয়মটা ব্যবহার করার পদ্ধতি সহজেই বোঝা যাবে এবং ওই একই সাধারণ নিয়মে হিসেব করলে সরলরেখা, বর্গক্ষেত্র ও ঘনকের মাত্রা বেরিয়ে আসবে যথাক্রমে ১, ২, এবং ৩ (উৎসাহী পাঠক লগ তালিকা দেখে মিলিয়ে দেখতে পারেন)। কাজেই ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির অন্তর্ভুক্তির জন্য দুটি শর্ত প্রয়োজন - সম্পূর্ণ বা আংশিক স্বয়ংসদৃশতা ও ভগ্নমাত্রা। এই ভগ্নমাত্রার মৌলিক চেহারাগুলি কাজে লাগিয়েই প্রাকৃতিক বিভিন্ন বস্তুর চেহারার ছাঁচ বা মডেল তৈরি করা হয়। একটা ঘরের মাপ ১০০ বর্গফুট বললে অভ্যস্ত মাপের অভিজ্ঞতায় একটা উপলব্ধি জন্ম নেয়। কিন্ত পাহাড়ের মাপ কি এইভাবে বলা যায় ? বরং বলা হয় পাহাড়টা কি  এবড়ো-খেবড়ো অথবা সমুদ্রের ধারটা কীরকম পাক খেয়ে খেয়ে এগিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ফ্র্যাকটালের মাপ  হ'ল ওই এবড়ো-খেবড়ো বা পাক খাওয়ার পরিমাণের একটা নিশ্চিত ইঙ্গিত।

আসা যাক Non Linear Fractal-এর জগতে। খুব সাধারণ সহজ ফর্মুলার মধ্যে লুকিয়ে আছে এই জাতীয় ফ্র্যাকটালের রহস্য। ফর্মুলাটি ব্যবহার করার নিয়মও মোটামুটি ভাবে সরল এবং সেটা বোঝার প্রয়োজনে কিঞ্চিত অঙ্কের কচকচি অপরিহার্য। প্রায় সাত দশক আগে ফরাসী গণিতবিদ গ্যাস্টন। জুলিয়া যে সমীকরণটি উদ্ভাবন করেছিলেন তার চেহারাটা অবিকৃত রেখে ফর্মুলাটা লেখা যাক। ফর্মুলাটা এরকম : Z = Z²+C .  এর মানে হ'ল C এবং Z- এর একটা প্রারম্ভিক মান ধরে সমীকরণের ডান পাশটা হিসেব করলে যা ফলাফল বেরোবে, তা হ'ল Z- এর নতুন মান। এবার C-এর মান অবিকৃত রেখে Z-এর এই নতুন মান ফর্মুলার ডান দিকে আবার বসিয়ে পাওয়া যাবে Z-এর দ্বিতীয় নতুন মান।। এইভাবেই হিসেব করার পদ্ধতিকে অঙ্কের ভাষায় বলা হয় আইটারেসন (Iteration)। আইটারেসন পদ্ধতিতে প্রত্যেক বারের পাওয়া  Z -এর মানগুলো লিপিবদ্ধ করে সেই পয়েন্টগুলো গ্রাফ কাগজে চিহ্নিত করে জোড়া লাগালে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির একটা মৌলিক চেহারা পাওয়া যাবে। এবার পরের ধাপ। এখন C- এর মানকে সূক্ষ্ম পরিবর্তন করে  Z- এর আবার একটা প্রারম্ভিক মান ধরে আইটারেসন করলে পাওয়া যাবে Z- এর মানের দ্বিতীয় তালিকা। এইভাবেই তৃতীয়, চতুর্থ... অনেক এবং প্রত্যেকটি তালিকা নির্দেশ করবে এক একটি নতুন ছন্দের ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির নক্সা। অঙ্কের  ব্যাপারটা নিয়মরক্ষার্থে নিষ্পত্তি করার জন্য আরও কিছুটা বলার প্রয়োজন নতুবা চিন্তাশীল এবং উৎসাহী পাঠককুল ব্যাপারটা ঠাট্টাচ্ছলে না নিয়ে যদি গ্রাফ কাগজ আর ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে যান, তাহলে বিপদে পড়বেন। কারণ গ্রাফ কাগজে একটি স্থানাঙ্ক নিদেনপক্ষে দুটি সংখ্যাকে চিহ্নিত করে ; এক্ষেত্রে সংখ্যা মাত্র একটি এবং তা হ'ল Z. আসলে Z বা C প্রত্যেকটিই দুটি সংখ্যার সমন্বয়ে তৈরি জটিল সংখ্যা (Complex number) । এই প্রবন্ধে জটিল সংখ্যার জটিলতায় গেলে বাড়াবাড়িই হবে, তবে এইটুকু বলে প্রসঙ্গে যবনিকা টানব যে, জটিল সংখ্যার সরলীকরণের ব্যাপারটা বহুকাল ধরেই উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান শাখার ছাত্র-ছাত্রীদের নির্ধারিত পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এখন প্রশ্ন হ'ল সাত দশক বা তারও আগে বিখ্যাত গণিতবিদরা তাঁদের সৃষ্ট গণিতের মধ্যে যে মহামূল্যবান সম্পদ রেখে গেছেন, তা কি এতদিনে কারুরই নজরে পড়ল না ? না কি তাঁরাও বুঝতে পারেননি তাঁদের সৃষ্টির ব্যাপ্তি অথবা ব্যবহারিক প্রয়োগ ? কী ভাবে তাঁরা এগুলো সৃষ্টি করেছিলেন তা বলা খুব কঠিন। আসলে যুক্তিবাদী মন আর গাণিতিক নিয়মকানুনের কাঠামোর মধ্যে সংখ্যা ব্যবহার করার কায়দায় তৈরি হয় আরও নতুন নিয়ম, তখন গণিতবিদরা আর মনে রাখেন না কী উদ্দেশ্যে কাজটা শুরু করেছিলেন।

ভিনগ্রহের পর্বতশ্রেণী। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির বিশেষ প্রয়োগে জন্ম নিয়েছে এই প্রকৃতিসদৃশ দৃশ্য 

এইসব তথ্যের ভিত্তিতে নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির বীজ যথেষ্ট পুরনো হলেও উপযুক্ত দানাপানির অভাবে তার প্রকাশ আদৌ হয়নি। কিন্ত কোন্ দানাপানির গুণে এবং কোন্ দক্ষ হাতের লালনপালনের নৈপুণ্যে সাত দশকের মৃতপ্রায় ঘুমন্ত বীজ মাত্র গত দেড় দশকে একেবারে তেড়েফুঁড়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল ? দানাপানির রহস্য লুকিয়ে আছে শক্তিশালী আরও শক্তিশালী কম্পিউটার যন্ত্রের আবিষ্কার এবং চোখের পলকে যন্ত্রগুলোর হিসেব করার ক্রমবর্ধমান ক্ষিপ্রতার মধ্যে। দক্ষ কারিগর হলেন একালের আরেক গণিতবিদ বিনোয়া ম্যানডেলব্রট। ১৯২৪ সালে পোল্যান্ড জন্ম। ১২ বছর বয়সে ফরাসী দেশে চলে আসেন এবং প্রাথমিক লেখাপড়ার কাজটা ওই দেশেই করেন। কাকা জোলেম ম্যানডেলব্রট, গ্যাস্টন জুলিয়ার অর্ধ শতাব্দীরও অধিক পুরনো কাজে ভাইপোকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। কাকার কথা রাখতে জুলিয়ার কাজ তিনি নেড়েচড়ে দেখেন, তবে মনে খুব একটা রেখাপাত করে না। নিজের পছন্দমত গণিতে গবেষণা শুরু করেন সম্পূর্ণ নতুন ভঙ্গিতে  এবং ১৯৭৭ সাল নাগাদ গবেষণার ফলাফল যা দাঁড়ায় তা হ'ল জুলিয়ার কাজেরই রূপান্তর। পশ্চিমি দুনিয়ায় ততদিনে বেশ শক্তিশালী কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছে। জুলিয়ার অনবদ্য সৃষ্টি নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে লাগলেন বিনোয়া ম্যানডেলব্রট। জন্ম হ'ল নতুন নতুন ফ্র্যাকটালের।

এখন ব্যাপারটা সহজে উপলব্ধি করা যায় যে ষাটের দশক থেকে শুরু করে ক্রমশ উচ্চশক্তিসম্পন্ন কম্পিউটার তৈরি করার ব্যাপারে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির এতটা উৎসাহ কেন। এমন কি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির কিছু মানুষের এই প্রয়াসকে বেশ কিছু নামী-দামী মানুষ কিছুদিন আগে পর্যন্তও ব্যঙ্গচ্ছলে শৌখিনতা বা বাড়াবাড়ি আখ্যা  দিতে শুনেছি। ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির আবিষ্কারে কম্পিউটারের প্রয়োগ একটা উদাহরণ মাত্র। মানুষের কল্যাণে শক্তিশালী ইলেকট্রনিক কম্পিউটার প্রয়োগের অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। কাজেই শক্তিশালী কম্পিউটারের প্রয়োজন কোনদিনই শৌখিনতা ছিল না, আজ তো আদৌ নয়। মন্তব্যটির স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে ছিয়াত্তর বছর বয়সের বর্ষীয়ান কল্পবিজ্ঞানী আর্থার ক্লার্ক-এর উক্তি - "এখন কম্পিউটারের যুগ, ভবিষ্যদ্বাণীর নয়....। মানুষের জীবনে বিপ্লব এনে দিয়েছে এই অদ্ভুত যন্ত্র। আজ যা আমি আগামী দশ বছরে ঘটা অসম্ভব ভাবছি, কাল সকালেই দেখলাম কম্পিউটার তা করে ফেলেছে। কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটের কথাই ধরা যাক। আমি লিখেছিলাম এই শতাব্দীর মধ্যেই হবে। তার কত বছর আগে ব্যাপারটা হয়ে গেল"। আর্থার ক্লার্ক ইংরেজ, তবে বহুকাল শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে বসবাস করছেন। সম্প্রতি  কলকাতার এক সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাতে এই কথাগুলি বলেন।

ফিরে আসা যাক  প্রসঙ্গে, বিনোয়া ম্যানডেলব্রট যে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির জনক এ কথা বললে ভুল হবে না, যদিও পেশাদারদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। ১৯৮৩ সালে তাঁর প্রকাশিত বিখ্যাত বই, "The Fractal Geometry of Nature."-এ তিনি এই বিষয়টির মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে পেশাদারদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন এবং ফলিত বিজ্ঞানের আরেক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ফ্র্যাকটাল কথাটা লাতিন শব্দ থেকে নেওয়া তাঁরই সৃষ্টি, যার অর্থ "ভাঙা"।  ম্যানডেলব্রট সৃষ্ট অগুনতি ফ্র্যাকটালের চেহারাগুলি জোড়া লাগালে (চেহারাগুলোর প্রত্যেকটির মাপ ৬ সেঃ ×৬ সেঃ) ১০০ টি ফুটবল মাঠের সম্মিলিত মাপের সমান জায়গার প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞদের লেখা '৯০ সালের একটি বিজ্ঞান প্রবন্ধ থেকে এই তথ্য নেওয়া। কাজেই কাগজ-পেন্সিল, গ্রাফ কাগজের কথা দূরে থাক, অত্যাধুনিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে কাজগুলো করতে হলে বেশ কিছু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কয়েক শতাব্দী লেগে যেত। এমন কি সত্তরের দশকের শুরুতেও যে-সব কম্পিউটার ও সংলগ্ন গ্রাফিক্সের চল ছিল তা ব্যবহার করেও কয়েক দশক লেগে যেত। কাজেই উন্নত মানের কাজের জন্য অবশ্যই উন্নত মানের যুতসই কম্পিউটারের প্রয়োজন আছে। নিউ ইয়র্কের শহরের অনতিদূরে ইয়র্কটাউন হাইটস্-এ পৃথিবী বিখ্যাত কম্পিউটার সংস্থা আই বি এম-এর টমাস জে রিসার্চ সেন্টারে বসে ম্যানডেলব্রট এই অসাধারণ কর্মকান্ড সম্পন্ন করেন।

এত সব কান্ড-কারখানা করে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি শেষ পর্যন্ত কিভাবে কোন কাজে লাগল ? প্রথমত, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির ব্যবহার, বিজ্ঞান ও কলার এক অপূর্ব সমন্বয় সূচনা করেছে। আপাতদৃষ্টিতে খটখটে নীরস শুকনো অঙ্কের মধ্যে যে এত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, কম্পিউটারের রঙিন পর্দার উপর ফ্র্যাকটালের চেহারাগুলো দেখার আগে মানুষ তা বুঝে উঠতে পারেনি। কাজেই উঁচুদরের আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার জন্য এবং কল্পনাকে রূপ দেবার জন্য বস্তুটি বিজ্ঞানীদের কাছে একটি অতি আকর্ষণীয় হাতিয়ার। 

অঙ্কে কাঁচা ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা কোনও দেশেই কম নয়, কারণ সংখ্যা নাড়াচাড়ার ভেলকির মধ্যে তারা কোনরকম রসকষ খুঁজে পায় না এবং সে কারণেই অঙ্ক বিষয়টা তাদের ঠিক অনুপ্রাণিত করতে পারে না। স্কুল-কলেজের পাঠক্রমে অঙ্কের প্র্যাক্টিকাল হিসাবে ফ্র্যাকটালের ব্যবহার চালু করলে ব্যপারটা মন্দ হবে বলে মনে হয় না। কলেজে, অন্তত শহরের প্রায় সব কলেজেই এবং অনেক স্কুলে আজকাল ক্ষমতাশালী পার্সোনাল কম্পিউটারের চল হয়েছে। কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু গ্রাফিক্স সফটওয়্যার জুড়ে দিলেই ওইসব কাজগুলো করা অসম্ভব হবে না। এটা অবশ্যই ব্যক্তিগত মত।

ডাক্তারি বিদ্যার গবেষণায় ফ্র্যাকটালের প্রয়োগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। জীব ও উদ্ভিদজগৎ হাজার হাজার বছরের ক্রমবিকাশের ফলে যে চেহারা নিয়েছে তার ব্যাখ্যা হল, যোগ্যতার উদবর্তন অর্থাৎ Survival for the fittest। তাই হয়তো উদ্ভিদ ডালপালা, পাতা ছড়িয়ে দেয় যাতে যথেষ্ট আলো-বাতাস সংগ্রহ করে সুস্থ এবং সজীব ভাবে জীবন ধারণ করতে পারে। প্রাণিজগতে স্তন্যপায়ী প্রায় সব প্রাণীর মধ্যেই দেখা গেছে যে ফুসফুসের নালীগুলো স্বল্প জায়গার মধ্যে অদ্ভুত ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আসলে প্রকৃতি থেকে অক্সিজন সংগ্রহ করে রক্ত পরিশুদ্ধ করার জন্য  এই বিস্তার। এই এলোমেলো বিস্তার, সৃষ্টির খেয়ালখুশি  বলে মনে হলেও ফ্র্যাকটালের প্রয়োগে সেই বিস্তারের মধ্যে একটা সুন্দর নিয়ম খুঁজে পাওয়া গেছে।

Non Linear Fractal কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, এমন কি চন্দ্র পৃষ্ঠের খানা-খন্দের এমন চমৎকার মডেল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে ক্যামেরার পর্দায় ধরা পড়া আসল ছবি কি না ! সুতরাং ফ্র্যাকটালের প্রয়োগ যে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অধ্যয়নে ফলপ্রসূ কাজ করতে শুরু করেছে তাতে সন্দেহ নেই। পেশাদারী মন নিয়ে লেগে থাকলে ফল অনিবার্য। 

যে কোন ছবির চরিত্র বিশ্লেষণে ফ্র্যাকটালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলেই মনে করা হচ্ছে, যদিও সেটা গবেষণাগারের মধ্যেই সীমিত আছে। আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহে ও প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজে কৃত্রিম উপগ্রহ মারফত ভূপৃষ্ঠের ছবি ও তথ্য পাঠানোর রেওয়াজ বেশ কিছু বছর চালু আছে। প্রযুক্তিগতভাবে ছবিগুলো পাঠানোর কৌশল আপাতত শুধু জটিলই নয়, বেশ সময়সাপেক্ষ এবং সেই কারণেই ব্যয়সাপেক্ষ। গাণিতিক কলা-কৌশলে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মোড়কে বেঁধে ছবিগুলোর পাঠাবার ব্যবস্থা করা গেলে অস্বাভাবিক সঙ্কুচিত অবস্থায় পাঠানো সম্ভব হবে অথচ তথ্য হারিয়ে যাবার ভয় থাকবে না। ফ্র্যাকটালের সঙ্কোচন করার ধর্ম সম্বন্ধে একটা ব্যক্তিগত ধারণা প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি। - প্রাণিজগতে মানুষের বুদ্ধির প্রখরতা সব চাইতে বেশি। সেই কারণেই সাধারণ মানুষেরও তথ্য সংগ্রহের ভান্ডার শুধুমাত্র অস্বাভাবিক বেশিই নয়, সেগুলি অবিকৃত অবস্থায় বহুকাল ধরে রাখার কলকাঠিও মস্তিষ্কের গঠনের মধ্যে বর্তমান। পৃথক পৃথক নিউরণগুচ্ছের জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থার কায়দায় মানুষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সব জিনিস সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং তা বহুকাল মনেও রাখে। বিশ্লেষণ করলে হয়তো দেখা যাবে যে মানুষের মস্তিষ্কের লক্ষ কোটি নিউরণের ভান্ডারের তুলনায় তথ্য সংগ্রহের ভান্ডার অনেক বেশি। যাইহোক, তা যদি হয়, তবে বুঝতে হবে যে, তথ্য সঙ্কোচন করে রাখার একটা সহজাত ব্যবস্থা মস্তিষ্কে ইতিমধ্যেই আছে এবং সেটা ফ্র্যাকটালের সংকেতে থাকলে অবাক হবার কিছু নেই। এটা অবশ্যই নিজস্ব অনুভূতি বা নিছক কল্পনা।

দেখা যাচ্ছে যে ফ্র্যাকটালের শাখাপ্রশাখা বিভিন্ন পেশায় বিস্তার লাভ করেছে। ছবি সঙ্কোচনের ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে যে, যে-কোনো ছবিকেই কি ফ্র্যাকটালের সমন্বয় বলে ধরে নেওয়া যায় ? এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে নেওয়া একটা যুতসই গল্প মনে পড়ছে। প্রায় দুশো বছরের আগেকার ঘটনা।  ফরাসী গণিতবিদ ব্যারন জাঁ ব্যাপটিস্ট জোসেফ ফুরিয়ার ধাতব পদার্থের তাপ পরিবহনের একটি চমৎকার নিয়ম আবিষ্কার করেন। সমসাময়িক গণিতবিদ এবং সহকর্মীদের কঠোর সমালোচনা ও ঈর্ষার শিকার হয়ে কাজটা আবিষ্কারের ১৫ বছর আগে পর্যন্ত তিনি কোনও পত্র-পত্রিকায় ছাপাতে পারেননি। যাইহোক, স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিজ্ঞান সমাজের প্রায় এক শতাব্দী লেগেছে ফুরিয়ারের তত্ত্বের ভিত্তি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতে। আজ ফুরিয়ারের তত্ত্ব, যা ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তা কাজে লাগিয়ে DNA-র ডবল্ হেলিক্সের জটিলতা থেকে শুরু করে Sun Spot-এর কালচক্র (Sun Spot Cycle), শব্দ তরঙ্গ, বিদ্যুত তরঙ্গ, প্রায় যাবতীয় তরঙ্গাকৃতি ঘটনার মৌলিক আচরণের জট অতি সহজেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। অনেক ঘটনার আচরণ এলোমেলো তরঙ্গের মতো মনে হলেও, ফুরিয়ার দেখিয়েছেন যে ওই এলোমেলো তরঙ্গ আসলে কতকগুলি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের তরঙ্গের সমষ্টিমাত্র।

ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি এখনও শৈশবস্থাতেই আছে। ফুরিয়ারের মতো আশাবাদী কিছু বৈজ্ঞানিক মনে করেন শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই নয়, মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চায় এ এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। অন্য ক্যাম্পের লোকেরা মনে করেন আধুনিক সাজপোশাকের মতো এর প্রয়োগ একটা ফ্যাশন মাত্র, অন্তত ছবি সঙ্কোচনের ক্ষেত্রে। শৈশবস্থাতেই এই বিষয়টির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্বন্ধে প্রতিকূল মন্তব্য ইতিহাসের ধোপে নাও টিকতে পারে। ফুরিয়ার সম্বন্ধে আমরা সামান্য কিছু জানলাম। আসলে সব যুগে, সব দেশে এবং সব পেশাতেই পণ্ডিতদের মধ্যেও কিছু ঈর্ষাকাতর প্যাঁচালো মানুষ থাকেন। তাঁরা যদি ওপরের তলার মানুষ হন তা হলেই বিপদ। যাইহোক,  বিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, কেপলার, ডারউইন, ম্যাক্সওয়েল, আইনস্টাইনের মতো মনীষীরাও দেশকালের সীমা লঙ্ঘন করে যখন যুগান্তকারী সৃষ্টিগুলি করেছিলেন, সমসাময়িক দার্শনিক ও বিজ্ঞান সমাজের মধ্যে তখনও সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কিন্ত তা স্থায়ী হয়নি, তবে ইতিহাসের কোলাহলে অন্ধ সমালোচকদেরও পরে আর চিহ্নিত করা যায়নি।



No comments: