বিজ্ঞানের জগতে ফাইনম্যান এক কিংবদন্তী - এক বিশাল অধ্যায় ও এই প্রবন্ধের মুখ্য চরিত্র। আলোচনায় জোর দেওয়া হয়েছে তাঁর বিজ্ঞানে অবদানের উপর। স্বাভাবিকভাবে এসে পড়েছে বিজ্ঞানীর বহুমুখী ব্যক্তিত্বের দিকগুলিও। কারণ রিচার্ড ফাইনম্যানের জীবন শুধুমাত্র তাঁর বৈজ্ঞানিক সত্তা ঘিরে নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে নানান বিষয়ের সক্রিয় শাখা-প্রশাখায়। জন্ম নিউ ইয়র্কের অনতিদূরে সমুদ্রপকূলবর্তী ছোট্ট শহর ফার-রকওয়ে।
পিতা ইহুদি ধর্মাবলম্বী মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান জন্মসূত্রে বেলারুশিয়ার মানুষ হলেও শৈশবেই দেশান্তরিত হন এবং আমেরিকা চলে আসেন। মা লুসিল ফিলিপস্ জন্মসূত্রে পোলিশ হলেও আজীবন নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। গৃহগত মায়ের ভালবাসা, হাস্যকৌতুক আর বান্ধবীসুলভ ব্যবহার রিচার্ডকে প্রভাবিত করেছিল। সাধারণ মধ্যবিত্ত পিতা মেলভিল পেশায় ছিলেন মাঝারি এক স্কুল-পোশাক বিক্রয়-সংস্থার সেলস্ ম্যানেজার। পিতার অকৃত্রিম গাম্ভীর্য, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা রিচার্ডকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং নানান্ বিষয়ের বই-কাগজ পড়ার আগ্রহ শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে লক্ষ করা যায়। এনসাইক্লোপেডিয়ায় ডাইনোসরের কঙ্কাল দেখে শিশু রিচার্ড তাজ্জব, দৈর্ঘ্য পঁচিশ ফুট মাপটা ঠিক কতখানি জানবার জন্য পিতার শরণাপন্ন হয়েছিলেন রিচার্ড। খুব সহজ উপমায় মেলভিল বুঝিয়েছিলেন যে তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় ডাইনোসর দাঁড়ালে, তার গলাটা দোতলার ঘরের জানলায় পৌঁছবে। এর পর থেকে যে কোনও জিনিসের নির্ভুল মাপজোখ এবং তার সহজ ব্যাখা তাঁর অনুসন্ধিৎসু মনকে অনুপ্রাণিত করেছিল। রিচার্ডের যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাঁর ভাই হেনরির জন্ম হয়। কিন্ত এক মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু রিচার্ডকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। বয়স যখন তাঁর বছর নয়েক তখন ভূমিষ্ঠ হয় তাঁর একমাত্র ভগিনী জোয়ান। পরবর্তীকালে তিনিও হয়ে ওঠেন একজন পদার্থবিদ্।
পৃথিবীর ইতিহাসের যুদ্ধোত্তর অধ্যায়ে এমন বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব বিরল। স্কুল জীবনের শুরু ফার-রকওয়ের সাধারণ স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান বিষয়ে হাতে-কলমে কাজ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায় রিচার্ডের মধ্যে -বিশেষত যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া, খোঁচাখুঁচির ব্যাপারে ওস্তাদ। ফেলে দেওয়া অকেজো যন্ত্রাংশর টুকিটাকি জোড়া লাগিয়ে নতুন একটা যন্ত্র খাড়া করার মধ্যে তিনি উপভোগ করতেন অনাবিল আনন্দ। রসায়ন ও গণিতেও তাঁর অপরিসীম আগ্রহ ছিল। স্কুল জীবন শেষ করে কলেজ জীবনের শুরু ১৯৩৫ সালে, বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এম-আই-টি-তে। ছোটবেলা থেকেই যুক্তিবাদে তাঁর নিজস্বতা প্রকাশ পায় এবং কৈশোরে সেই যুক্তিবাদী মন পরিণত রূপ নেয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পদার্থবিদ্যা, ও গণিতের অন্যতম শাখা ডিফারেন্সিয়াল ও ইনটিগ্র্যাল ক্যালকুলাসে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন এবং মার্কিন জাতীয় প্রতিযোগিতায় (Putnam Contest) প্রথম স্থানটি দখল করে নেন। পদার্থবিদ্যাকে মুখ্য বিষয় হিসাবে গ্রহণ করে ১৯৩৯ সালে তিনি স্নাতক হন এবং চলে যান প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জন আর্চিবল্ড হুইলারের অধীনে বছর তিনেক গবেষণা করে ১৯৪২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ডক্টরাল উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল Path integral approach to quantum mechanics.
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। রবার্ট ওপেনহাইমারের নেতৃত্বে ম্যানহাটান প্রকল্পে পরমাণু বোমা প্রস্তুতি পর্ব জোর কদমে চলছে। রিচার্ড সেই প্রকল্পে যোগদান করলেন এবং খুব শিগগিরই চলে গেলেন লস্ আলামসে। লস আলামসের পরিবেশ গুরুগম্ভীর, কাজটা আরও গুরুগম্ভীর এবং গোপনীয় - তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপ পৃথক করার পদ্ধতি নির্ধারণ। এই সূত্রে সংস্পর্শে এলেন বহু গুণিজনের - নিলস্ বোর, ভন্ নিউম্যান, এনরিকো ফার্মি, আর্থার কম্পটন, আই রাবি, হানস্ বেথে, ওয়ে বোর প্রমুখ। লস আলামসের আবহাওয়ায় ছিল সামরিক নিয়মানুবর্তিতা যা বৈজ্ঞানিকের স্বাধীন মনোভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সামরিক আমলাদের নিয়মানুবর্তিতার ধাক্কায় অধৈর্য হয়ে রিচার্ডের মাথায় মাঝে-মধ্যেই আনাগোনা করত নানা দুষ্টুবুদ্ধি। যে কোনও তালা খোলার একটা বিশেষ কায়দা তিনি আয়ত্ত করেছিলেন এবং যে সব সিন্দুকে আমলাতান্ত্রিক গুপ্ত তথ্য থাকত, সেই সিন্দুকগুলি মাঝেমধ্যেই খুলে রেখে সামরিক শাসকদের বেশ সমস্যার মধ্যেই ফেলে দিতেন। সহকর্মীরা এতে খুব মজা পেতেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কৌতুক, তামাশা, নাটকীয়তা ছিল রিচার্ডের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য এবং এর মধ্য দিয়েই তিনি নিজের চারপাশের পরিবেশকে মাতিয়ে রাখতেন। যা লক্ষণীয় তা হ'ল, এই মাতিয়ে রাখার মধ্যে "আমিই সব" - এই ভাবের ঘোষণা বা ঝাঁঝ কোনোটাই ছিল না। একটা অকৃত্রিম, স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণোদ্দীপক প্রকাশ। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই লস আলামসের অদূরবর্তী আলমোগোর্দোতে পৃথিবীর প্রথম পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার তিনি একজন সাক্ষী। এ ব্যাপারটা তাঁর মোটেই ভাল লাগেনি।
বিবাহিত জীবনের শুরু ১৯৪১ সালে। যৌবনের প্রথম প্রেমের নায়িকা নিউ ইয়র্কের আর্টসের ছাত্রী আর্লিন গ্রীনবম্। প্রেম নিবেদনের ধরনটাও ছিল তাঁর নিজস্ব। বুদ্ধিদীপ্ত যুবক রিচার্ডের অকৃত্রিম ব্যবহার আর্লিনের মন জয় করে এবং ক্রমশই গভীর প্রেমে আবদ্ধ হন তাঁরা। এই সূত্রে রিচার্ড ফাইনম্যানের ব্যক্তিত্বের দিকটা আলোচনা করে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কপটতা ও ভন্ডামির ঘোর বিরোধী ছিলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। কাজেই যেসব সামাজিক গুণে মানুষের চরিত্রের প্রশংসা বাড়ে যেমন অকারণ মিষ্টভাষিতা বা শিষ্টাচার, অভিভাবক-স্থানীয় মানুষের প্রতি কপট বাধ্যতা প্রদর্শন ইত্যাদি ইত্যাদি, তার একটাও ছিল না তাঁর চরিত্রে। বরং তাঁর চরিত্রে ছিল যথেষ্ট ঔদ্ধত্ব, তর্কাতর্কির সময়ে প্রয়োজনে বিদ্রুপাত্মক। কারোকেই পরোয়া করতেন না। তর্কে-বিতর্কে স্নাতকোত্তর ছাত্র থেকে শুরু করে মারে গেলম্যানের মতো ব্যক্তিত্যও তাঁর বিদ্রুপের ঝাঁঝ থেকে অব্যাহতি পাননি। সেই কারণেই লস্ আলামসে থাকাকালীন পিতৃতুল্য ও সংরক্ষণশীল নিলস্ বোর এই প্রতিভাটির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ভাব বিনিময় করতেন পুত্র ওয়ে বোরের মাধ্যমে। এছাড়া ফাইনম্যান ছিলেন মাদকাশক্ত এবং যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল সুন্দরী নারীদের প্রতি। স্নাতকোত্তর ছাত্রের স্ত্রী বা বান্ধবীর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি ও অবাধ মেলামেশায়, এমনকি গণিকা সংসর্গেও তাঁর বিবেকের কোনো বাধা ছিল না। তবে, তাঁর চরিত্রের এই তথাকথিত দিকগুলো হয়তো আসলে তাঁর চরিত্রের খোলামেলা দিকটিরই প্রকাশ- আবেগতাড়িত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।
প্রেম বিনিময়ের পালা যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎই আর্লিন অসুস্থ হয়ে স্থানান্তরিত হন হাসপাতালে। রোগের কারণ নির্ণয়ের ব্যাপারে হাসপাতালের ডাক্তারদের সিদ্ধান্তে নাক গলানো আর্লিনের অভিভাবকদের যথেষ্ট অসন্তোষের কারণ হলেও তিনি চুপ করে থাকেননি। সেই অবস্থায় তিনি আর্লিনকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আর্লিন তখন প্রায় মৃত্যুমুখী। তার অভিভাবকদের ঘোর বিরোধিতা তাঁকে নিরস্ত করতে পারেনি, বরং শক্তিই যুগিয়েছিল। আর্লিনের শারিরীক অবস্থার দ্রুত অবনতিতে তাঁর মনে হয়েছিল যে একমাত্র বিবাহবন্ধনই সেই মুহূর্তে আর্লিনের দেহ-মনে শান্তি সঞ্চার করতে পারে এবং তিনি তৎক্ষণাৎ তাই করেন। বিবাহের পরে অসুস্থ আর্লিন পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন। আর্লিনের মৃত্যুর বেশ কিছু বছর পরে রিচার্ড বিয়ে করেন মেরি লাওকে। তবে পারস্পরিক আমূল চরিত্রগত পার্থক্যের জন্য মাত্র দুবছরেই শেষ হয়ে যায় দ্বিতীয় বিবাহিত জীবন। তাঁর তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী হলেন গুইনেথ হাওয়ার্থ। ১৯৬০ সালে ইউরোপে গিয়ে বিজ্ঞান সমাবেশে উচ্চ শক্তি সম্পর্কিত পদার্থবিজ্ঞানের যথেষ্ট পরীক্ষামূলক তথ্য যেমন তাঁর লাভ হয়েছিল, তেমনি উপরি জুটেছিল চোখের ইশারায় গুইনেথের সঙ্গে হৃদয় বিনিময়ের মাধুরী। এরপর দেশে ফিরে এসে চিঠিপত্রে প্রেম বিনিময় এবং অদূর-ভবিষ্যতে বিবাহ। কয়েক বছরের মধ্যেই ভূমিষ্ঠ হয় ফাইনম্যানের একমাত্র পুত্র কার্ল এবং এর কিছুদিন বাদে তাঁরা সাদরে গ্রহণ করেন এবং লালনপালনের দায়িত্ব নেন মিচেল নামে এক শিশুকন্যার। আর্লিন ছিলেন রিচার্ড ফাইনম্যানের যৌবনের জুলিয়েট, গুইনেথ্ ছিলেন তাঁর আমরণ সঙ্গিনী।
দায়িত্বশীল পরোপকারী মানুষটিকে। তিনি রিচার্ডকে তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ঝাঁঝালো ও অবাধ্য ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এই বলে যে - বারোজনের অনুসন্ধান কমিটিতে চেয়ারম্যান ছাড়া বাকি দশজন থাকবে চা-কফি-সিগার সহযোগে গুরুগম্ভীর সভায় থাকার উত্তেজনার আগুন পোহাতে আর চেয়ারম্যানের মন্তব্যের অনুকূলে ঘাড় নাড়তে। কাজেই ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনে বিপরীত দিকে ঘাড় নাড়ার অন্তত একজন অবাধ্য মানুষের প্রয়োজন আছে। রিচার্ড ফাইনম্যানের পরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জার রহস্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি, বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্ধানের শুধুমাত্র এক অপূর্ব দৃষ্টান্তই নয়, তা স্মরণ করিয়ে দেয় আমলাদের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াইয়ে বৈজ্ঞানিক মহলের নৈতিক দায়িত্বের কথা। তিনি মনে
হাইসেনবার্গের মত হ'ল মাপজোখের হিসেব থেকেই তাত্ত্বিক ভিত্তিতে পৌঁছতে হবে। কাজেই ইলেকট্রনের গতিবেগ, স্থানাঙ্ক ইত্যাদি যে সব তথ্যের মাপজোখ করা যায় সেগুলো প্রকাশ করার এক ধরনের সুসজ্জিত তালিকা তিনি তৈরি করলেন। এই ধরনের তালিকার গাণিতিক পরিভাষা হ'ল ম্যাট্রিক্স। ধরা যাক ইলেকট্রনের স্থানাঙ্কের ম্যাট্রিক্সের মান 'x' এবং ভরবেগের ম্যাট্রিক্সের মান 'p'। এই ধরনের প্রকাশের বিশেষত্ব এই যে 'x'কে 'p' দিয়ে গুণ করলে যা ফল বেরোবে, 'p' কে 'x' দিয়ে গুণ করলে সাধারনত একই ফল পাওয়া যাবে না। অপর দিকে পরীক্ষালব্ধ তথ্যের উপর গাণিতিক কলাকৌশল চালিয়ে হাইজেনবার্গ আবিস্কার করলেন তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতি (Uncertainty Principle)। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির সংজ্ঞা উনি এক কথায় বলেছেন যে, "Uncertainty" is NOT "I don't know". "It is I can't know". "I am uncertain" does not mean "I could be certain". অর্থাৎ, 'অনিশ্চয়তা' মানে এই নয় যে 'আমি জানি না' বরং বলা ভাল 'আমি কোনোদিন জানতে পারব না, আমার জানার কোনও উপায় নেই।' 'আমি অনিশ্চিত' মানে ' আমার নিশ্চিত হবার আদৌ কোনও সম্ভাবনা নেই।' হাইজেনবার্গ সৃষ্ট কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নামকরণ হ'ল' ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা (Matrix Mechanics) কিছুদিনের মধ্যেই স্রোডিঞ্জার প্রমাণ করলেন যে তরঙ্গ বলবিদ্যা এবং ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা আসলে একই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দুটি আলাদা চেহারা। দু' বছরের মধ্যে পল্ ডিরাক ইলেকট্রনের উপর আইনস্টাইনের বিশেষ অপেক্ষবাদ প্রয়োগ করে স্রোডিঞ্জার সমীকরণের রূপান্তর ঘটিয়ে তৈরি করলেন আলোক কণিকার সমতুল্য গতির ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম তত্ব (Relativistic Quantum theory of electron)। রূপান্তরিত সমীকরণের সমাধান থেকে ইলেকট্রনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ধর্মের - যেমন ইলেকট্রনের স্পিন, (নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা ছাড়াও ইলেকট্রন যেন নিজের অক্ষের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করছে) ইলেকট্রনের বিপরীত ধর্মী কণা অর্থাৎ ধনাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনের অস্তিত্ব (পজিট্রন), চৌম্বক ক্ষেত্রে ইলেকট্রনের আচরণ ইত্যাদির সন্ধান পাওয়া গেল। প্রত্যেকটি ভবিষ্যদ্বাণীর পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া গেল পরের কয়েক বছরের মধ্যেই। ডিরাকের এই অবদান বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই কাজের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন স্রোডিঞ্জারের সঙ্গে। পল ডিরাকই হলেন প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি যুক্তির সঙ্গে গাণিতিক কৌশল মিলিয়ে সৃষ্টি করলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার রীতিবদ্ধ পরিকাঠামো। এ ছাড়া কুড়ির দশকের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের (Quantum Field Theory) গাণিতিক পরিকাঠামোও তাঁরই সৃষ্টি। আসল কথা একদিকে হাইজেনবার্গ, স্রোডিঞ্জার ও ডিরাকের এবং অপরদিকে পাউলি, ম্যাক্স বর্ন, জর্ডন প্রমুখ বিজ্ঞানীদের অবদান কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে করল আরও সমৃদ্ধ। পদার্থ কণিকার আচরণের বহু প্রতীক্ষিত জিজ্ঞাসার নির্ভুল ব্যাখ্যা পাওয়া গেল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়োগে।
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উন্নতমানের যন্ত্রপাতির প্রয়োগে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাবির গবেষণাগারে এক ছোকরা বিজ্ঞানী, উইলিস ল্যাম্ব (Willis Lamb) উত্তপ্ত হাইড্রোজেন গ্যাসের উপর মাইক্রোওয়েভের প্রয়োগে ( তড়িৎ-চুম্বক বর্ণালীর খানিকটা পরিসরের নাম মাইক্রোওয়েভ ) ইলেকট্রনের শক্তি স্তরের বর্ণালীতে অভ্রান্ত ও স্বতন্ত্র দুটো রেখার সন্ধান পেয়েছেন, ডিরাকের সমীকরণ অনুযায়ী পাওয়া উচিত ছিল একটি । তাত্ত্বিক বিচারে দু'টো রেখার অস্তিত্ব কিছুতেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ডিরাকের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের প্রয়োগে সৃষ্ট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের সন্দেহ দানা বেঁধেছে। স্বয়ং উনিও কিছুটা বিভ্রান্ত। সত্যি কথা বলতে প্রায় দুই দশক কেটে গেল পদার্থ কণিকার এই ধরনের আচরণের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খুঁজতে। রিচার্ড ফাইনম্যান তখন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরতাজা উঠতি বিজ্ঞানী এবং প্রিন্সটনে হুইলারের কাছে পি এইচ ডি কাজের সূত্র ধরে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে বেশ হাত পাকিয়েছেন। প্রথম সারির প্রবীন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনিও মাথা ঘামাচ্ছেন ওই একই সমস্যার সমাধানে। আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার প্রগতিতে যখন এমন চরম সঙ্কট চলছে। এই অবস্থায় ভিক্টর ভাইসকফের নেতৃত্বে নিউইয়র্কের অদূরবর্তী সেল্টার আইল্যান্ভের নিরিবিলি পরিবেশে বাছাই করা ডজন দুয়েক বিজ্ঞানীকে নিয়ে বসল আলোচনাচক্র। আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু সাম্প্রতিক পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা । ভাইসকফ ছাড়া প্রবীনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাকসাইটে ওপেনহাইমার, বেথে, হুইলার রাবি প্রমুখ । নবীনদের মধ্যে আমন্ত্রিত হলেন সুইংগার, ফাইনম্যান, মারস্যাক, পায়াস প্রমুখ। প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞান আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল তিনদিনের সমাবেশে। ফাইনম্যান এবং সুইংগার, দুজনেই বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন এই সমাবেশের পর; ডিরাক সৃষ্ট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের সমর্থন মিলছে না। বছর খানেকের মধ্যেই আরও একটা সমাবেশের আয়োজন করা হ'ল। স্থান পেনসিলভেনিয়ার পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিবৃত পোকোনো। নতুন অংশগ্রহণকারী মধ্যে আছেন এনরিকো ফার্মি ও ভন নিউম্যান এবং যুদ্ধ পূর্ববর্তী দুই যশ্বসী বিজ্ঞানী, নিলস্ বোর এবং স্বয়ং পল ডিরাক। ইতিমধ্যেই বার্কলের উচ্চশক্তি সম্পন্ন কণা ত্বরণ যন্ত্রে (Particle Accelerator) উৎপাদিত মৌলকণারা তাদের আচরণের বিচিত্র স্বাক্ষর রেখে গেছে ফটোপ্লেটের উপর। প্রথম দিনটা কাটল পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের আলোচনায়। দ্বিতীয় দিন মঞ্চ অধিকার করলেন সুইংগার। ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁর বক্তৃতা, তাঁর অকাট্য গাণিতিক যুক্তি এবং নায়কোচিত বাকপটুতা সবাইকে মুগ্ধ করল; বিশেষ করে ওপেনহাইমারকে। ফাইনম্যান মোটামুটি বেপাত্তাই বলা চলে। সঙ্কট মোচনে কোমর বেঁধে লেগেছেন বিজ্ঞানীরা। তৃতীয় সমাবেশের আয়োজন হ'ল নিউইয়র্কে হার্ডসন নদীর তীরে ওল্ডস্টোন নামে একটি জায়গায়। ইতিমধ্যেই ফাইনম্যান, ডাইসনের সঙ্গে গভীর আলোচনা করেছেন এই ব্যপারে এবং ডাইসন বুঝতে পেরেছেন ফাইনম্যানের অন্তর্দৃষ্টি। সমাবেশে ফাইনম্যানের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাজগুলো একত্রিত করে বেশ গুছিয়ে ব্যাপারটা প্রকাশ করলেন। হাইজেনবার্গ, স্রোডিঞ্জার ছাড়া তৃতীয় এক বিকল্প ধারায় তিনি ভিত্তি স্থাপন করলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার। চিন্তাভাবনার শুরু আবার
সেই দ্বৈত তরঙ্গ কণিকাবাদের ভিত্তিতে। তাঁর মূল বক্তব্য হ'ল ইলেকট্রনের এক অবস্থান থেকে অন্য এক অবস্থানে যাবার নির্দিষ্ট কোনও পথ চিহ্নিত নেই। যে কোনও পথে যাবার সম্ভাবনা সমান। তবে সব রকম পথে চলাফেরার সম্মিলিত যোগফল নির্ণয় করবে চূড়ান্ত সম্ভাবনা। অবশ্য এই যোগ করার কায়দাটা ঠিক সনাতন পদ্ধতিতে যোগ করা নয়। কারণটা এইরকম : বিভিন্ন পথে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবার সময় স্থান-কালের (Space-time) পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত পথগুলোর মধ্যে অবস্থাগত তারতম্য (phase difference) থাকবে। সেই কারণে কোনো কোনো পথের অবদান অনুকূল ফল দেবে অর্থাৎ সেইসব পথগুচ্ছের সম্মিলিত অবদান হবে প্রবল। একই যুক্তিতে বলা যায় যে অন্য কিছু পথগুচ্ছের সম্মিলিত অবদান হবে নগন্য। তিনি প্রমাণ করলেন যে তাঁর মডেল, স্রোডিঞ্জারের মডেলের গাণিতিক চেহারার সমতুল্য এবং হয়তো সহজবোধ্য কারণ তাঁর তৈরি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সাধারণ পদার্থবিদের হাতে তুলে দিল বহু প্রতীক্ষিত এক সহজ সরল হাতিয়ার যা প্রয়োগ করে তাঁরা হিসেব করতে সক্ষম হলেন মৌলকণিকাদের পারস্পরিক জটিল ক্রিয়া-বিক্রিয়ার নির্ভুল ফলাফল। তাঁর সৃষ্ট কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নামকরণ Path Integral Approach ( sum over histories). এই সূত্রে তিনি এক ধরনের লেখচিত্র প্রবর্তন করলেন যা পদার্থ বিজ্ঞানীদের কাছে ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম নামে পরিচিত। ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম পদার্থ কণিকা সমূহের পারস্পরিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ ক্রিয়া-বিক্রিয়ার এক সচিত্র বর্ণনা যা সহজে নির্দেশ করবে তাদের এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় যাবার যাবতীয় সম্ভাবনা। আগেই বলেছি চূড়ান্ত সম্ভাবনা পাওয় যাবে প্রতিটি সম্ভাবনা যোগ করে। ডায়াগ্রামের প্রতিটি পথ এক একটি গাণিতিক ফর্মুলার সমতুল্য। সুতরাং ছবিটি আঁকলে ফর্মূলা বসিয়ে হিসেব করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম প্রয়োগে হিসেব করা গবেষণা পত্রগুলো পদার্থবিদ্যার সব থেকে সম্মানিত বিজ্ঞান পত্রিকা Physical Review-এর পৃষ্ঠা অলঙ্কৃত করতে লাগল। ফাইনম্যান যে যুগে এই অভিনব উপায় আবিষ্কার করেছিলেন তখন কম্পিউটারের চল্ আদৌ ছিল না এবং সেই কারণে হিসেব করার ব্যাপারটা ছিল অস্বাভাবিক শ্রমশাদ্ধ ও ফলাফলের সূক্ষ্মতাও ছিল সীমিত। আজ শক্তিশালী কম্পিউটারের যুগে হিসেবের সূক্ষ্মতা বাড়ার জন্য শতাধিক এমনকি সহস্রাধিক ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের সমতুল্য ফর্মুলা এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেব করা সম্ভব। এতে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের সঙ্গে শুধু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের যথার্থতা প্রতিপাদনই যে সম্ভব হয়েছ তাই নয়, তা সূক্ষ্মতর থেকে সূক্ষ্মতম পর্যায়েও পৌঁছে গেছে।
আসলে স্রোডিঞ্জার বা ডিরাক তাঁদের সৃষ্ট ইলেকট্রোডায়নামিক্সে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বের প্রয়োগ করেছেন ঠিকই কিন্ত তা সীমিত ছিল পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটন ও কক্ষপথে বিচরণকারী ইলেকট্রনের মধ্যে তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের বিক্রিয়ায়। তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রের আরও যে সূক্ষ্ম ব্যাপারটা তাঁরা তাঁদের তত্বে বিবেচনা করেননি তা হ'ল আধানযুক্ত ঘুর্ণায়মান ইলেকট্রনের নিজস্ব তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র যা তার নিজের উপরেই প্রভাব বিস্তার করবে। কাজেই তত্বে ইলেকট্রনের যে অবিকৃত ভর (m) ও অবিকৃত আধানের (e) মান ধরে নিয়ে হিসেব করা হয়েছে তার যথাযথ রূপান্তরের প্রয়োজন। এ যেন স্বভাবদুষ্ট কোনও বিষধর সাপের নিজের লেজ ভক্ষণ - প্রতি মুহূর্তেই তার চেহারার পরিবর্তন হয়ে চলেছে, এক অদ্ভুত ধাঁধার মতো। ফাইনম্যান অনুভব করেছিলেন যে মূল ভর ও আধানের মানের সঙ্গে রূপান্তরিত মানের তারতম্য অতি সামান্য হলেও তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে উইলিস্ ল্যাম্বের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের রহস্য।এর আগে প্রচলিত তত্ব প্রয়োগ করে দেখা যাচ্ছিল যে রূপান্তরিত মানের তারতম্য সামান্য তো নয়ই, বরং তা দাঁড়াচ্ছে অসীম সংখ্যায়। ফাইনম্যান দেখালেন অসীম সংখ্যার উৎপত্তিকে হিসেবের সময় কি ভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়। প্রাসঙ্গিক হিসেব নিকেশে ব্যবহৃত সমীকরণে ইলেকট্রনের ভর বা আধান জাতীয় মৌলিক জিনিসগুলোকে (Parameter) যে নিয়মে রূপান্তরিত করা হয়, পদার্থবিজ্ঞানীরা তাকে বলেন Renormalization। এই বিশেষ অবদানটির জন্য ১৯৬৫ সালে মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। ফাইনম্যান আবিষ্কৃত রিনর্মালাইজেশন পদ্ধতির গাণিতিক সিদ্ধতায় যে সন্ধেহের অবকাশ আছে, সেটা তিনি নিজেও স্বীকার করতেন। কিন্ত কম্পিউটারের হিসেবের ক্ষিপ্রতা ও সূক্ষ্মতা যতই বাড়ছে, তাঁর পদ্ধতি ততই সূক্ষ্ম ফলাফল দিচ্ছে। তাঁর সৃষ্ট রিনর্মালাইজেশন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গেলে মাপের সূক্ষ্মতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তার একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক- ইলেকট্রনের স্পিন আছে, আধান আছে এবং পরমাণুর নির্দিষ্ট কক্ষপথে এটি গতিশীল। কাজেই ইলেকট্রনগুলোকে ধরে নেওয়া যেতে পারে এক একটি ক্ষুদে চুম্বক। প্রত্যেক চুম্বকের চৌম্বকীয় সংবেদনশীলতা নামে একটা ধর্ম আছে যার প্রাসঙ্গিক পরিভাষা Magnetic moment। পল ডিরাক কোনও একটি নির্দিষ্ট এককে ইলেকট্রনের ওই ধর্মটির মাপের মান নির্ণয় করেন ১.০, অথচ পরীক্ষালব্ধ মান হ'ল ১.০০১১৫৯৬৫২২১। ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র কণিকাদের জগতে এই দুটো মাপের মধ্যে তফাত অনেকটাই, কিন্ত ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম প্রয়োগ করলে এই মান দাঁড়ায় ১.০০১১৫৯৬৫২৪৩। প্রশ্ন হ'ল এই দুটো মাপের মধ্যে ফারাক কতটা ? একটা ছোট্ট উপমার মাধ্যমে উত্তরটা দেওয়া যাক। কলকতা থেকে নিউইয়র্কের সঠিক দূরত্ব যদি ১৫, ০০০ কিলোমিটার হয়, তবে ওই মাপে এক মিলিমিটারের পার্থক্য যতটা ভুল নির্দেশ করবে ততটাই, অর্থাৎ সূক্ষ্ম ফারাক। আশা করি এ থেকেই বোঝা যাবে ফাইনম্যানের রিনর্মালাইজেশন পদ্ধতির সূক্ষ্মতা কতদূর। অন্তর্দৃষ্টি থেকে যে সব অনুভূতি জন্ম নেয়, তা প্রকাশের গাণিতিক ভাষা হয়তো মানুষের এখনও অজানা। এই ধরনের সৃজনশীল চিন্তা হয়তো মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর পারস্পরিক সংযোগে উদ্ভূত এক বিশেষ কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল অবস্থার উপহার, যে উপহার পেয়েছিলেন নিলস্ বোর, আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ, স্রোডিঞ্জার বা পল ডিরাক। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীরা মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারগুলো সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্পর্কের কথা চিন্তা করছেন। আগামী দিনের বিজ্ঞানের ভাষা ও গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে বস্তু জগতের তথ্য ছাড়াও মনস্তত্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের সুযোগ হয়তো থাকবে।
কৌতুহলী অনেক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে ক্ষুদ্র কণিকাদের রাজত্বে আক্রমন চালিয়ে সূক্ষ্ম মাপজোখে সাধারণ মানুষের কোন পরমার্থ লাভ হবে ?! এই জাতীয় ব্যাপারগুলো মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার আওতায় পড়ে। সুতরাং মূল প্রশ্ন হ'ল বিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণা মানুষের কোন উপকারে লাগবে ? এই বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য নয়। শুধু একটা দৃষ্টান্ত দেওয়াই যথেষ্ট। ১৯৪৮ সালে বার্ডিন ও শকলের ট্রানজিস্টরের মতো ক্ষুদ্র বস্তুর আবিষ্কার পৃথিবীর সভ্যতার চেহারাটা সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। আমরা সকলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই আবিষ্কারের সুফল ভোগ করি এবং এটা মৌলিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন ও গবেষণার সুফল।
পরীক্ষালব্ধ মাপজোখের ভিত্তিতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়োগে পদার্থকণিকার ধর্মের সূক্ষ্মতম চরিত্রসমূহ অবহিত হওয়ার ফলে ফলিত বিজ্ঞান হয়েছে সমৃদ্ধ। আজ এক ঘন সেন্টিমিটার জায়গায় দশ লক্ষাধিক ট্রানজিস্টরকে জোড়া লাগিয়ে তৈরি হয়েছে Integrated Circuit, যার আটপৌরে নাম 'চিপ' (Chip) । আমি নিশ্চিত যে 'দেশ' পত্রিকার এমন চমৎকার ও নির্ভুল ছাপা অক্ষর কম্পিউটার চালিত টাইপ সেটিং যন্ত্রের সাহায্যে সম্ভব হয়েছে এবং কম্পিউটার যন্ত্রটির মূল উপাদান হ'ল এই সিলিকন চিপস। আসলে মৌল বিজ্ঞান গবেষণার ফলে তৈরি হয় উন্নতমানের যন্ত্রপাতি আর সেই যন্ত্রপাতির ব্যবহারে মৌল বিজ্ঞান অধ্যয়ন করা যায় আরও সূক্ষ্মভাবে। এইভাবেই হয় সভ্যতার বিকাশ। মৌল বিজ্ঞান ও ফলিত বিজ্ঞান- একট অপরটির পরিপূরক। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার।
দেখা যাচ্ছে যে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই মৌল বিজ্ঞান চিন্তায় রমরমা লেগে যায় পাশ্চাত্যে এবং সেই ধারাবাহিকতা শুধু অক্ষুন্নই থেকে না, ফাইনম্যানেরা সেটাকে আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে নিয়ে যান। তার নমুনা আমরা দেখতে পাই নিত্যনতুন ফলিত বিজ্ঞানের প্রকাশে। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের পটভূমিকায় সামান্য কিছু আলোচনা করা যাক। শ্রীনিবাস রামানুজন, জগদীশচন্দ্র বসু, সি ভি রামণ, প্রশান্ত মহালানবিশ, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বসু এবং শেষ পর্যায়ে হোমি ভাবা ও বিক্রম সারাভাই - এঁরা ছিলেন এ দেশে বিজ্ঞান ধ্যানধারনার পুরোধা। এঁরা প্রায় সকলেই দেশের মাটিতে পা গেঁথে দেশ-কালের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞানে এঁদের অবদান যে যুগ চিহ্নিত করে, সেই যুগে এদেশ ছিল পরাধীন। বিজ্ঞানচর্চায় আর্থিক অনুদানও ছিল অতি ক্ষীণ। সঙ্কীর্ণ আর্থিক গন্ডীর মধ্যে থেকেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের আসরে পাল্লা দিতেন তাঁরা। আর্থিক অনুদানের অভাবই একমাত্র অভাব ছিল না, অভাব ছিল প্রাসঙ্গিক বই-কাগজের এবং আজকের যুগের অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার। এক কথায় ভবিষ্যত সম্বন্ধে কোনও নিশ্চয়তা ছিল না বলেই হয়তো ভিতরের আগুনটা জ্বলে ওঠবার সুযোগ পেয়েছিল। যাইহোক, ধারাবাহিকতার কথা থাক। যাঁদের নাম নেওয়া হ'ল সেই মানদন্ডে জানি না এ দেশে আর ক'জনের নাম যুক্ত করা যায়। অথচ আর্থিক আনুকুল্যের জন্য এখন বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদদের দেশের মাটিতে পা রাখার প্রয়োজন পড়ে না, হয়তো দরকারও নেই। বরং হাত-পা ছড়ানোর এবং হাওয়ায় মেলবার সুবন্দোবস্তই আছে। এই পরিস্থিতিতে তবে স্বাধীন ভারতে মৌল বা ফলিত বিজ্ঞানে সাড়া জাগানো কাজ হচ্ছে না কেন ? না কি হচ্ছে, তবে যাঁরা করছেন তাঁরা প্রচারবিমুখ অন্তর্মুখী মানুষ, ফলে আমরা খবর পাচ্ছি না। একটা কথা অবশ্যই সত্যি যে বিজ্ঞানে নতুন কিছু সংযোজন করা আর এক-আধজনের কাজ নয়। কারণ কোনও মৌলিক ধারণার সত্যতা পরীক্ষামূলক সত্যতা প্রমাণের জন্য যে আর্থিক অনুদান এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণলব্ধ যত মানুষের প্রয়োজন, তা আমাদের মতো দেশের বেশ কয়েকটি বিজ্ঞান সংস্থার সম্মিলিত সামর্থ্যেরও বাইরে। তাছাড়া যৌথ উদ্যোগ নিতে গেলেই গবেষণাগারের ভৌগোলিক অবস্থান ও নেতৃত্বের প্রশ্ন আসে। কাজেই গণতান্ত্রিক দেশে অর্থনৈতিক সাহায্যের অনেকটাই নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। তা সত্বেও অবশ্য মুষ্টিমেয় কিছু বিজ্ঞানী চোখ কান খোলা রেখে যৌথ প্রচেষ্টার নানান্ সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেও নিশ্চেষ্ট হয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। তবে ব্যাপারটা আংশিক সত্যি। এই কারণেই যে মৌলিক ধারণা বা তা প্রমাণের পরীক্ষামূলক পরিকল্পনার জন্য বোধহয় খুব বিরাট কিছু অঙ্কের আর্থিক প্রয়োজন নেই। স্বপক্ষ যুক্তি হিসেবে বলা যেতে পারে, যে ভেক্টর বোসনের (পরমাণুস্থিত নিউক্লিয়াসের কয়েক শতাংশ ফার্মির ব্যবধানে যে সব ভারী কণারা দূর্বল নিউক্লীয় বলের আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করে তাদের বলা হয় ভেক্টর বোসন্। ১ ফার্মি = এক সেন্টিমিটারের দশ লক্ষ কোটি ভাগ) অস্তিত্বের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার জন্য ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে যুগ্মভাবে নোবেল পুরস্কার পান আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেল্ডন গ্ল্যশো। ওই একই কাজের পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা বাতলানোর জন্য ১৯৮৪ সালে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হন কার্লো রুবিয়া এবং ভ্যান্ডার মিয়ার। মাফ করবেন, ভুল বুঝবেন না যে নোবেলজয়ী কাজের নমুনাই সাড়া জাগানো মাপকাঠি বলে মনে করছি। রিচার্ড ফাইনম্যান প্রসঙ্গে আমাদের দেশের যে সব বিজ্ঞান মনীষীদের নাম এসে গেছে, সি ভি রামণ ছাড়া তাঁদের মধ্যে কেউই নোবেল পুরস্কার পাননি। রামানুজন্ অবশ্য ছিলেন গণিতবিদ এবং গণিতে নোবেল পুরষ্কার ছিল না। তা হলে মেঘনাদ সাহা বা সত্যেন বসু কি প্রথম সারির বিজ্ঞানী নন ? একটা ছোট্ট উপমা : অলিম্পিকে ম্যারাথন দৌড়ের বাজিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রথম চার-পাঁচজনের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্বের ব্যবধান সামান্য হলেও প্রথম স্থানটি অধিকার করেন একজনই। বাকিদের কি ছোট করে দেখা যায় ? না দেখা উচিত ! নোবেল পুরষ্কার হ'ল বিজ্ঞানীর চূড়ান্ত স্বীকৃতি। আলফ্রেড নোবেল তাঁর প্রদত্ত পুরস্কার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বঞ্চিত করেছিলেন। সুতরাং মেঘনাদ নোবেল জয়ে বঞ্চিত হতেনই। নোবেলের এই বঞ্চনার কারণ যা জানা যায় তা হ'ল নোবেলের শ্বশুরের দেওয়া একমাত্র উপহারটিতে এক রসিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী নাকি ভাগ বসাবার চেষ্টা করেছিলেন। খবরের উৎস নিছক গালগপ্প নয়, খোদ সাহেবের লেখা বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে পড়া। তবে জানা নেই মৃত্যুর আগে নোবেল মত পরিবর্তন করেছিলেন কি না, কারণ প্রায় সাত দশক বাদে ১৯৭৪ সালে রেডিও পালসার আবিষ্কারের জন্য ওই পুরস্কারে পুরষ্কৃত হন অ্যান্টনি হিউইস ও মার্টিন রাইল এবং ১৯৮৪ সালে ওই পুরস্কার পান সুব্রম্ভনিয়ম চন্দ্রশেখর, নক্ষত্রমন্ডলের সৃষ্টি ও ক্রমবিকাশের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়। যাইহোক, নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গে উল্লেখ করব যে সত্যেন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত না করাটা বোধহয় তাঁর সৃষ্টির ব্যাপকতাকে খাটো করে না, খাটো করে তৎকালীন নোবেল কমিটির বিকৃত রুচি ও পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বিচারবুদ্ধিকে, কারণ কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিকসে উনি ছাড়া সবাইকার অবদান চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেয়েছে নোবেল পুরস্কারে।
এ ছাড়া ওই পুরস্কারপ্রাপ্তির পেছনে খানিকটা কপালের ব্যাপারও আছে। ইলেকট্রোডায়নামিক্সে ফাইনম্যান, সুইংগার, টোমোনাগা ছাড়া চতুর্থ যিনি ওই সম্মানের অংশীদার হতে পারতেন, তিনি হলেন ফ্রিম্যান ডাইসন। জাতে ইংরেজ, ডাইসন মুখ্যত ছিলেন গণিতবিদ, রূপান্তরিত হন পদার্থবিদে। নোবেলের উইলের শর্ত অনুযায়ী একই সঙ্গে তিনজনের অধিক ব্যক্তি পুরস্কারে ভাগ বসাতে পারেন না। ডাইসনের বাদ পড়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হ'ল যে তিনি ওপেনহাইমারের নেকনজরে ছিলেন না এবং পশ্চিমি দুনিয়ার বিজ্ঞান পরিচালনায় ওপেনহাইমারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই কপালের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না।
ফিরে আসা যাক ফাইনম্যান প্রসঙ্গে। 'প্রতিভা' এবং এরকমই আরও কিছু কিছু শব্দের আভিধানিক অর্থ অতি ব্যবহারের ফলে ভোঁতা হয়ে গেছে। কারণ, যে কোনও বিষয়ে পারদর্শিতার একটা সাধারণ সীমা অতিক্রম করলেই আমরা এই শব্দগুলো নির্দ্ধিদায় ব্যবহার করে থাকি। কিন্ত প্রতিভার প্রকৃত সংজ্ঞা তাহলে কি ? বা কি ধরনের ব্যক্তিত্বকে প্রতিভাশালী ব্যাখ্যায় ভূষিত করা যায় ? এই প্রশ্ন মনস্তাত্বিক ও স্নায়ুমনস্তাত্বিকদের মনে বহুকাল ধরেই ঝড় তুলেছে এবং এ বিষয়ে তাঁরা গবেষণাও নেহাত কম করেননি। কিন্ত গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল থেকে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। স্থান-কালের সীমা ছাড়িয়ে যে মানুষটি সর্বজনীনভাবে প্রতিভাশালীর আখ্যায় ভূষিত হয়েছিলেন, সেই অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের, ১৯৫৫ সালে পিন্সটনে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই, হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট টমাস হার্ভে মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করে তাঁর মগজটি উদ্ধার করেন এবং ফর্মালডিহাইডে চুবিয়ে রেখে সংরক্ষণ করেন। মগজের মাপ, ওজন, এমনকি শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের নিচে মগজ কোষের তন্তুসমূহের শাখা-প্রশাখার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরীক্ষণ করেও এমন কিছু তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি যা দিয়ে ওই মাপের মানুষের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভেদরেখা টানা যায়।
এই ঘটনার বহুদিন বাদে জীবিত অবস্থায় আর যে মানুষটির মস্তিষ্কের তরল পদার্থ সংগ্রহ করে বিশেষ কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, তিনি হলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। মাথায় আঘাত পাওয়ার পর ওঁর গতিবিধির মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ ভাব লক্ষ করে পত্নী গুইনেথ ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। যাইহোক, পরীক্ষার ফল এবারেও অস্বাভাবিক কোনও তথ্যের সন্ধান দিতে পারেনি। তাহলে সব সৃজনশীল মানুষের সৃজনী শক্তির মাপকাঠি হিসেবে প্রতিভা কথাটা কি ব্যবহার করা চলে ? ১৯৬৫ সালের পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন আমেরিকার রিচার্ড ফাইনম্যান ও জুলিয়ান সুইংগার এবং জাপানের ইসিহিরো টোমোনাগা। বিষয়টি ছিল কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মনে করেন যে সুইংগার ও টোমোনাগার ইলেকট্রোডায়নামিক্সের ভিতের কাঠামো আগে থেকে ছিল। তাঁরা সেই কাঠামোর ওপরেই অসাধারণ অধ্যবসায় ও গাণিতিক যুক্তির নিজস্ব কায়দা-কানুন লাগিয়ে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, ফাইনম্যান তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গিতে, পুরোপুরি নতুন কাঠামো তৈরি করে নিয়ে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। কাজেই তাঁর অবদানে আছে নতুন পথের দিশা, আছে প্রতিভার জাদুস্পর্শ।
রিচার্ড ফাইনম্যানের কর্মক্ষেত্রের কোনও নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না। তাই তাঁকে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ভৃমিকায়- কখনও তিনি কবি, কখনও লেখক, কখনও আবার শিল্পী। সৌরশক্তিই সব শক্তির উৎস- এ ঘটনা পিতার কাছে গল্পচ্ছলে শুনে প্রকাশ পেয়েছিল কবিতার ছন্দে। তখন তিনি ফার-রকওয়ের অখ্যাত স্কুলের সাধারণ ছাত্র। সুতরাং ওই বয়সেই তাঁর মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছিল কবিসত্তার বীজ। পরিণত বয়সে আবার দেখতে পাই সমুদ্রতরঙ্গের আনাগোনার সঙ্গে বিজ্ঞানকে মিশিয়ে রোমাঞ্চকর অনুভূতির প্রকাশে। হয়তো সেটাই ছিল তাঁর শেষ কবিতা। আসলে কাব্য আর বিজ্ঞানের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। প্রকৃতির নিয়মের ছন্দে স্পন্দিত হয় সংবেদনশীল কবির হৃদয়, সৃষ্টি হয় বৈচিত্র্যময় শব্দগুচ্ছ সংকলিত ছন্দোময় কবিতা। বিজ্ঞানীর মনও ঝংকৃত হয়, প্রকাশ পায় বিজ্ঞানের ভাষায় আর গণিতে - যার ধাপে ধাপে ছন্দ, গরমিলের কোনও উপায় নেই। প্রকৃতির সঙ্গে মনের বাক্যবিনিময়ই হ'ল বিজ্ঞানচেতনা আর প্রকৃতির নক্সার সঙ্গে মনের নক্সাকে মিলিয়ে ফেলাই হ'ল বিজ্ঞানীর ইকুয়েশন। মুখে বিড়বিড় করতে করতে চেয়ারের হাতলে বা নোটবইয়ের ওপর তালে তালে হাতের আঙুল ঠোকার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা নতুন কিছু সৃষ্টির আনন্দে ঘরের মেঝেতে ডিগবাজি খাওয়া, তাঁর বন্ধুস্থানীয় সহকর্মী ও ছাত্রদের প্রায়ই নজরে পড়ত। তাঁরা লক্ষ করতেন ওই অবস্থায় সটান দাঁড়িয়ে উঠে বোর্ডে চলে যেতেন রিচার্ড। বোর্ডের উপর ফুটে উঠতো সরলরেখা-বক্ররেখার মিশ্রণে সাধারণের দুর্বোধ্য কিছু লেখচিত্র আর গণিতের বেশ কয়েকটি ধাপ।
বিজ্ঞানে মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের একটি উক্তির উদ্ধৃতি দিতেন, " প্রত্যেক মানুষের কাছে একটি চাবি আছে যার কৌশলে স্বর্গদ্বার উন্মুক্ত হয়। আবার ওই একই চাবি নরকের দরজা ভাঙতেও সক্ষম। " এ প্রবাদ তাঁর হোনোলুলু সফরের সময় এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে শেখা। তিনি আরও বলেছেন যে পদমর্যাদার জোরে বিজ্ঞানভিত্তিক সমালোচনার দমন মানে বিজ্ঞান প্রগতির প্রতিবন্ধকতা করা।
ঈশ্বর বিশ্বাসের প্রশ্নে তাঁর সহজ সরল যুক্তি হ'ল- সনাতনী প্রথায় ভগবানের দ্বারস্থ হওয়ার মানে শুধু অজ্ঞতার সঙ্গে আপোসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই নয়, অজ্ঞতাকে আরও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠতে সাহায্য করা। নিজের অজ্ঞতা মেনে নিয়ে চেষ্টা করেছিলেন জ্ঞানের পথে এগোতে আর সেই যাত্রাপথে পেয়েছিলেন জাগতিক, মহাজাগতিক ঘটনাবলীর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার এক অভিনব ধারা। দুর্ভাগ্যবশত তথাকথিত শিক্ষিত, এমনকি অতি শিক্ষিত বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন যে কোনও বিষয়ে নিজেকে অজ্ঞ বলার মতো আর লজ্জজনক কী থাকতে পারে।
গান-বাজনা, চিত্রাঙ্কন যৌবনে আদৌ পছন্দের বিষয়বস্ত না হ'লেও, শিল্পীসত্বাটা তাঁর মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থাতেই ছিল। তাই শিল্পী ফাইনম্যানকে আমরা দেখতে পাই তাঁর পরিণত বয়সে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে আঁকতে শিখে তিনি যেসব ছবি এঁকে যান তা নজিরবিহীন। সূক্ষ্ম অহঙ্কারবোধও নেহাত কম ছিল না। তবে সেই অহঙ্কারের জাতটা ছিল বেশ অন্যরকম। আঁকা শেখার ব্যাপারে একটা ছোট্ট গল্প বলা যাক : এয়ারপোর্ট বসে প্লেন ছাড়ার বিলম্বে একঘেঁয়েমি কাটাতে ব্যাগ থেকে কাগজ পেন্সিল বের করে অপেক্ষমান যাত্রী ও পরিবেশের পেন্সিল স্কেচ করে ফেললেন রিচার্ড। সঙ্গী বন্ধু কৌতুহল দমন করতে পারেননি, রিচার্ডচে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে এমন সুন্দর আঁকতে তিনি কোথা থেকে শিখলেন। উত্তরটা ফাইনম্যানের জবানিতেই শোনা যাক - "হঠাৎই মনে হ'ল আঁকা শিখব। এক শিল্পীর সঙ্গে সাময়িক বন্ধুত্ব জমালাম। চুক্তি হ'ল আমরা পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় করব। ও আমাকে আঁকা শেখাবে, বদলে আমি ওকে শেখাবো কোয়ান্টাম মেকানিক্স। মানতেই হবে ও আমার তুলনায় অনেক ভাল শিক্ষক। " ড্রাম জাতীয় বাদ্যযন্ত্র 'বঙ্গো' বাজানোতেও তিনি ছিলেন ওস্তাদ আর হাসির গল্প শুনিয়ে আসর জমাতেও তাঁর জুড়ি ছিল না। ক্যালটেকের কনসার্টে প্রায়ই সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন রিচার্ড ফাইনম্যান।
লেখক ফাইনম্যানকে আমরা দেখতে পাই সর্বসাধারণের জন্য লেখা তাঁর দুখানি বইতে - Surely You Are Joking Mr Feynman এবং What Do You Care What Other People Think. আত্মজীবনীই বলা চলে। সারা জীবনের অভিজ্ঞতা বই দুখানির পাতায় পাতায়। কৌতুক আর মস্করায় ঠাসা। প্রকাশের ভঙ্গিমা যেন এক একটি একাঙ্ক নাটকের মতো। দুরূহ বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করে লিখেছেন আরও দুখানা বই - The Character of Physical Law এবং QED, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ চিন্তাধারার প্রকাশ নিজস্ব অভিনব কায়দায়। বই দুখানি পড়ে একটা কথাই মনে আসে যে জর্জ গ্যামো ছাড়া বিজ্ঞানকে, বিশেষত দুরূহ বিজ্ঞানকে চিন্তাশীল সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সহজ ভাষা সৃষ্টির আর যিনি দাবিদার হতে পারেন তিনি হলেন রিচার্ড ফাইনম্যান।
পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। গতানুগতিক পাঠ্যসূচিতে ছিল তাঁর প্রবল অনীহা। ১৯৬১ সালে ক্যালটেকে পদার্থবিদ্যার পাঠ্যসূচির খোল-নলচে বদলে তিনি প্রবর্তন করলেন সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যসৃচি, পরবর্তীকালে যা ফাইনম্যান লেকচারস্ অন ফিজিক্স নামে তিন খন্ডে প্রকাশিত হয়। ছাত্র হিবস্- এর সঙ্গে লিখেছিলেন আরও একখানি বই - কোয়ান্টাম মেকানিক্স অ্যান্ড পাথ ইনটিগ্র্যাল। এই শেষ বইটা বাদে বাকি সবগুলো লেখার ভঙ্গিমায় মিলেমিশে আছে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ভঙ্গি। বাস্তববাদী উপমায়, হাল্কা ব্যঙ্গবিদ্রুপে উপভোগ্য। সেই সঙ্গে সূক্ষ্ম ফাইনম্যানীয় অহঙ্কারবোধের উত্তাপ।
বিজ্ঞান পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রবন্ধ সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও গুণমানে সেগুলো ছিল অতুলনীয়। যাবতীয় গবেষণার ফলাফল ছাপার হরফে প্রকাশের প্রবণতা তাঁর ছিল না। ক্যালটেকের বিজ্ঞানী সহকর্মীরা নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশের কথা যখন চিন্তা করছেন, তখন তাঁরা ফাইনম্যানের অফিসর দেরাজে মুগ্ধ হয়ে আবিষ্কার করেছেন বহু আগে ফাইনম্যানীয় ভঙ্গীতে কষে ফেলা সেই গবেষণার ফলাফল। আসলে প্রকাশনার ব্যাপারে তাঁর ন্যুনতম মান ছিল অনেক উঁচু।
গদির মোহ বা ক্ষমতার প্রতি লিপ্সা তাঁকে কোনদিনই আকৃষ্ট করতে পারেনি। এই মন্তব্যের স্বপক্ষে একটি ছোট্ট গল্প- নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হওয়ার পর বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মী বর্ষীয়ানরা বলেছিলেন যে বিজ্ঞান সাধনায় চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাওয়ার পর এবার শুরু হবে তাঁর আমলাতান্ত্রিক ফাইলপত্রের কাজ, যে কাজে পদমর্যাদা আছে। এই সূত্রে ভিক্টর ভাইসকফ দশ ডলার বাজিই ধরে ফেললেন। বলাই বাহুল্য যে, সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর রিচার্ড বাজির দশ ডলার কড়ায়-গন্ডায় উসুল করে নেন।
তাঁর রিনর্মালাইজেশন তত্ব অসীমের মাঝে নিখুঁত সীমারেখা টানতে সক্ষম হলেও, সত্তর বছরের কীর্তিময় জীবন প্রমাণ করেছে সীমার মাঝে অসীমের অস্তিত্ব। কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের কাজ তাঁকে নোবেল পুরষ্কার এনে দিয়েছিল। আর যে কাজগুলো বিজ্ঞানজগতে তাঁকে অমর কর রাখবে তা হ'ল তরলীকৃত হিলিয়ামের অদ্ভুত ধর্মের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, পরমাণুস্থিত নিউক্লিয়াসের ক্ষীণ বলের (weak interaction) তত্ব, পদার্থের অতিপরিবাহিতা (Superconductivity) এবং পার্টন তত্ব। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের যশস্বী বিজ্ঞানীরা পদার্থবিজ্ঞানের যে মঞ্চ রচনা করেন, রিচার্ড ফাইনম্যান দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তার উপর শুধুমাত্র দাপিয়েই বেড়াননি, মহামূল্য সম্ভারে সেই অঙ্গন সমৃদ্ধ করেন। আমার সঠিক জানা নেই নোবেল জয়ীদের মধ্যেও এই কর্মোদ্যম ও সৃষ্টির দীর্ঘ ধারাবাহিকতা কতজন অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছেন। তিনি ছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। কিন্ত নানান বিষয়ে উৎসাহ ও অবদানের স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন তাঁর কীর্তিতে। ক্যালটেকে থাকাকালীন ছুটির অবসরে মাস ছয়েক জীববিদ্যার উপর গবেষণা চালিয়ে DNA সংক্রান্ত সাংকেতিক ভাষার নতুন এক অনুবাদ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যে কোন বিষয়ের অধ্যয়নের স্বধীনতায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। পূর্বাপর প্রস্তুতি ছাড়াই যা করা যায়। মৌলিক ব্যাপারগুলি জেনে নিয়ে তিনি উদ্ভাবনা করতেন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি। বিজ্ঞান পত্রিকার প্রবন্ধে ভাষা ভাষা চোখ বোলাতেন মূল সমস্যাটা বোঝার জন্য। সমাধান করতেন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে। ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের পর তিনি বুঝেছিলেন এবং বলেও ছিলেন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ক্ষুদ্রাকৃতিই কম্পিউটারের ক্ষিপ্রতা বাড়াবার একমাত্র উপায়। ষাটের দশকের শেষের দিকে এই সূক্ষ্ম প্রযুক্তিরই উপহার দেখি ইনটিগ্রেটেড সার্কিট টেকনোলজি - স্বল্প পরিসরে বহু ট্রানজিস্টরকে জোড়া লাগিয়ে রাখার কৌশল। এই কৌশলে এক দশকের মধ্যে কম্পিউটারের ক্ষিপ্রতা বেড়ে গেল, অন্তত একশ গুণ। কিন্ত এই উপায়ে ক্ষিপ্রতা বাড়ানোর একটা সীমা আছে। ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধির উপায়ের কথা ভেবে ফাইনম্যান শেষ বয়সে ব্যস্ত হয়েছিলেন কম্পিউটার যন্ত্রটির সর্বাঙ্গীণ চেহারায় একটা নতুন পরিবর্তন আনতে - বিকল্প একটা গঠন আর এই নতুন বিন্যাস কাজ করবে অভিনব নিয়মে অভিনব (Algorithm) কৌশলে। এ ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অপরিসীম।
পছন্দ-অপছন্দ ও মেলামেশার ব্যাপারে তিনি নিজস্ব স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। জীবনে সাক্ষাৎ মাত্র এক-আধবার হলেও বাকসংযমী পল ডিরাক ছিলেন ফাইনম্যানের কাছের মানুষ এবং অনুপ্রেরণা। কারণটা হয়তো এই যে, দুই দশকের পরিশ্রমে ডিরাকের সৃষ্ট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের সূত্র ধরে কাজ শুরু করে জীবনের বিখ্যাত কাজটি তিনি শেষ করেন ১৯৪৮ সালে।
সদাহাস্যময় ও প্রণোচ্ছল হানস্ বেথে ও তাঁর পরিবার ছিল ফাইনম্যানের খুবই আপনজন। লস্ আলামসে এই রত্নটিকে চিনতে পাকা জহুরী বেথের ভুল হয়নি। আজীবন স্নেহ করতেন। আর্লিনের মৃত্যুর পর বিধ্বস্ত রিচার্ডকে কর্নেলে নিয়ে আসার মূলে ছিলেন হানস্ বেথে এবং ক্যালটেকে যোগদানের আগে যতদিন তিনি কর্নেলে ছিলেন বেথের পরিবার ছিল রিচার্ডের আড্ডা, তামাশা, অবকাশকালীন বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম জায়গা। অপেক্ষাকৃত বর্ষীয়ান বেথে বুঝেছিলেন যে সময়ের আবর্তনে দুঃখের আবেগ ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসবে। তাই হয়েছিল, কারণ কর্নেলের বছরগুলোই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কর্নেলের দিনগুলোতে আরও একজন মনের মতো সঙ্গী ছিলেন তাঁর - ফ্রিম্যান ডাইসন। ডাইসনই প্রথম ফাইনম্যানের তত্ত্বের গুরুত্ব বুঝতে পেরে ওপেনহাইমারকে চিঠি লেখেন। কাজকর্মের অবসাদ মেটাতে খেয়ালি রিচার্ডের ভ্রমণসঙ্গীও ছিলেন ফ্রিম্যান ডাইসন। জুলিয়ান সুইংগার ছিলেন তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, যদিও সেই প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বা মূল্যবোধের কোনও ঘাটতি ছিল না। ক্যালটেকে সহকর্মী ও বয়ঃকনিষ্ঠ মারে গেলম্যান ছিলেন স্নেহভাজন এবং পরবর্তী জীবনে বিজ্ঞান আলোচনার প্রধান সঙ্গী।
সৌন্দর্যবোধেও তাঁর ছিল অপরিসীম ব্যাপ্তি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হতেন এবং বিজ্ঞানের যোগসূত্র খুঁজতেন। তিনি প্রশ্ন করেননি প্রকৃতি কেন এত বৈচিত্র্যময়, বরং নিয়ম খুঁজেছেন সেই বৈচিত্র্যের - অকাট্য যুক্তিতে, অভিনব ধারায়। এক দিকে রাজা-রানি পরিবৃত অভিজাত, সম্পন্ন পোশাকী পরিবেশ, অন্য দিকে নাইটক্লাবের উন্মুক্ত পরিবেশ - এই দুই-ই ছিল তাঁর উপভোগ্য।
আশির দশকের গোড়ায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয় এবং ক্ষুদ্রান্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ে। আট বছরের মধ্যেই দেহে তিন-তিনবার অস্ত্রোপচারের ধকল তিনি সহ্য করতে পারেননি। ১৯৮৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের তিন তারিখে তিনি শেষবারের জন্য উকলা মেডিক্যাল সেন্টারের ইনটেনসিভ কেয়ারে ভর্তি হন। ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাত্রির সামান্য কিছু আগে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। শিয়রে দন্ডায়মান ছিলেন নিশ্চল, নীরব স্ত্রী গুইনেথ, ভগিনী জোয়ান এবং আত্মীয়া, ফ্রান্সেস লিউইন্। মৃত্যুশয্যায় তাঁর শেষ কথা - "I hate to die twice" অর্থাৎ "দুবার মরতে আমি ঘৃণা করি।"
রিচার্ড ফাইনম্যানকে দেখার পরম সৌভাগ্য আমার কখনও হয়নি এবং তিনি ভারতবর্ষেও কখনও আসেননি যদিও ভারতবর্ষের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তাঁর অকুন্ঠ শ্রদ্ধা। পোর্ট অব স্পেনের ত্রিনিদাদে ট্যাক্সিযোগে ভ্রমণের সময় চালকের কাছে কথা প্রসঙ্গে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য থেকে এটা প্রকাশ পায়। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় তাঁর লেখা এবং তাঁর সম্বন্ধে লেখা বই, কাগজপত্রের মাধ্যমে। পৃথিবীর মাটিতে অচেনা, অদেখা এই মানুষটির অনুপস্থিতির বিষণ্ণতা মাঝে মধ্যেই আমাকে গ্রাস করে। আমি মৌলবিজ্ঞানের লোক নই; তা সত্বেও এমন অনুভূত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে যা মনে হয় তা হ'ল তাঁর জীবনদর্শন সব বিজ্ঞানের উর্দ্ধে। রিচার্ড ফাইনম্যান রক্তমাংসে গড়া একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আসলে এই ধরনের বর্ণময়, কর্মময়, নির্ভীক এবং বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন অর্থাৎ সত্যিকারের নায়কোচিত ব্যক্তিত্বের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা, হৃদয়ের উষ্ণতা ও চরিত্রের দ্যুতি এতই তীব্র যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই কল্পনার মানসপটে তা চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। সত্তর বছরের ঘটনাবহুল গুরুত্বপূর্ণ মাত্র কয়েক ঝলক পাঠকের কাছে তুলে ধরে আমি তাই তৃপ্ত।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: আমার সহকর্মী ডঃ আশিস কুমার ধারাকে এই লেখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সাহায্য করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
তথ্য সূত্র
১. Surely you are joking Mr Feynman - R P Feynman.
২. What do you care what other people think - R P Feynman
৩. The character of physical law - R P Feynman
৪. QED, The strange theory of light and matter - R P Feynman
৫. Genius - Richard Feynman and modern physics - James Gleick
৬. An outsider's insider view of the Challenger enquiry - Physics To-day Feb '88, 26
৭. Physics To-day - Feb 1989 ( Specisl Issue: Richard Feynman)
৮. Stephen Hawking - A life in science - Michael White & John Gibbon
৯. A note on Richard Feynman - C K Majumdar






No comments:
Post a Comment