Tuesday, June 14, 2022

ইলেকট্রনিক মেল


ইলেকট্রনিক মেল

প্রযুক্তির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে বিগত কয়েকটি শতাব্দীতে এক একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তির আধিপত্য বিরাজ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যান্ত্রিক প্রযুক্তির পরিণতি হ'ল শিল্পবিপ্লব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আধিপত্য বিস্তার করল বাষ্পীয় ইঞ্জিন ছাড়াও বাষ্পচালিত নানাবিধ যন্ত্র। একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যদি প্রশ্ন ওঠে যে কোন্ নির্দিষ্ট প্রযুক্তির অবদান বিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করবে, তা হলে দ্বিধাহীন ভাবে উত্তর দেওয়া যেতে পারে - যোগাযোগ ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রযুক্তি। এটা হ'ল সেই প্রযুক্তি, যার কল্যাণে বাড়িতে বসে টেলিফোন রিসিভার তুলে সরাসরি ডায়াল করা যাচ্ছে বিলেত-আমেরিকায়। অথবা রুফ-টপ অ্যান্টেনা খাড়া করে ঘরে বসে টিভির পর্দায় দেখা গেছে বিশ্বকাপ '৯৪ খেলা। আরও এক ধাপ এগিয়ে বলা যায় যে কলকাতার  কোনও প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার টার্মিনালে বসে সুদূর জাপান বা ইউরোপ-আমেরিকার, এমনকি যে কোনও জায়গার কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে। ইলেকট্রনিক মেল ; পেশার জগতে সংক্ষেপে ই-মেল (e-mail) এই জাতীয় অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু। সাধরণ ডাক ব্যবস্থায় ডাক বিলির জন্য প্রয়োজনীও সময় নির্ভর করে জায়গার ভৌগোলিক অবস্থানের উপর। সময় লাগে সাধারনত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। এ ছাড়া ভুলচুকের ঘটনা খুব কম ঘটলেও, চিঠি যে নির্দিষ্ট গন্তব্য স্থানে পৌঁছবেই তারও ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা নেই। ইলেকট্রনিক মেলের বিলি ব্যবস্থায় সময়ের হিসেবটা জায়গা নিরপেক্ষ এবং সুনিশ্চিত। 

বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব এই সংযোগ ব্যবস্থা কিভাবে সম্ভব হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে আলোচনা শুরু করব। টেলিফোন আবিষ্কার হ'ল আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রথম ভিত্তিস্তম্ভ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, ১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ টেলিফোনে প্রথম ঘন্টাটি বাজিয়ে সেই শুভক্ষণ ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই শুরু হয়ে যায় টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন। পাশাপাশি টেক্কা দেওয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি এই প্রগতিকে করেছে আরও ত্বরান্বিত এবং মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে যোগাযোগ সংক্রান্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ও সস্তার যন্ত্রপাতি। পরবর্তীকালে সুলভ এবং শক্তিশালী টেবল-টপ কম্পিউটার যন্ত্রের আবিষ্কার এবং যোগাযোগের কাজে তাদের সদ্ব্যবহার দৃশ্যপটকে এক লাফে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন মাত্রায়। কাজেই অত্যাধুনিক ও উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থার চাবিকাঠি এক দিকে যেমন লুকিয়ে আছে স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার যন্ত্রের তথ্য সংগ্রহ, সেগুলোর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার  এবং সংরক্ষণের উপর, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ তামার তারের মাধ্যম ছাড়াও ফাইবার অপটিকস, মাইক্রোওয়েভ বা কৃত্রিম উপগ্রহ  (Communication Satellite) ইত্যাদি উন্নত মাধ্যম মারফত সেগুলোকে গন্তব্য স্থানে পৌঁছে দেবার কায়দায় বড়সড় পরিবর্তন এসেছে।

টেলিফোন ও ই-মেলের মধ্যে সাদৃশ্য অনেক। বর্তমান টেলিফোন নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়েই ই-মেল ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। সুতরাং একটি টেলিফোন আর একটি টেলিফোনে সঙ্গে কিভাবে সংযোগ স্থাপন করে, সেটা আলোচনা করলেই, ই-মেলে যোগাযোগের ব্যাপারটা বুঝে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক কথাটা প্রবন্ধে প্রায়শই ব্যবহার করার দরকার হবে বলে পরিভাষাটির সংজ্ঞার প্রয়োজন। ব্যবহারিক জীবনে যে কোনও ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক রীতি-পদ্ধতি মেনে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা বা নক্সাকে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে নেটওয়ার্ক। যেমন দেশব্যাপী রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনাকে বলা যেতে পারে রেলওয়ে নেটওয়ার্ক। দেখা যাক টেলিফোন নেটওয়ার্কের চেহারাটা কি রকম আপনার বাড়ি থেকে মাত্র এক জোড়া তামার তার বেরিয়ে এসেছে।  অথচ আপনি পৃথিবীর যে-কোনও জায়গার টেলিফোনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন ! এটা সম্ভব হয়েছে এলাকাপিছু একটি এক্সচেঞ্জ খাড়া করে ( আপনার বাড়ির তার দুটি চলে গেছে আপনার এলাকার এক্সচেঞ্জে)। এক্সচেঞ্জ বস্তুটি ধরে নেওয়া যেতে পারে স্বয়ংক্রিয় একাধিক বহুমুখী সুইচের সমন্বয়। আজকের আধুনিক যুগে সুইচগুলো কম্পিউটার চালিত ইলেকট্রনিক সুইচ (ইলেকট্রনিক এক্সচেঞ্জ)। আমাদের দেশে অবশ্য এখনও বহু শহরে ইলেকট্রোমেকানিকাল স্ট্রোজার বা ক্রশবার এক্সচেঞ্জও চালু আছে। সুইচগুলো বহুমুখী এই কারণেই যে আপনি আপনার টেলিফোন থেকে যে কোনও জায়গায় সংযোগ স্থাপন করতে পারেন ; এবং একাধিক, কারণ একই সময়ে এক্সচেঞ্জ অধীনস্থ আরও অনেক গ্রাহক তাঁদের আকাঙ্খিত জনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এছাড়া টেলিফোন ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এক্সচেঞ্জের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং এক্সচেঞ্জের কাজ হ'ল এক বা একাধিক গ্রাহককে উপযুক্ত যোগাযোগ মাধ্যম মারফত তাঁদের প্রত্যেকের আকাঙ্খিত গ্রাহকের সঙ্গে নির্ভুলভাবে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। আগেই বলা হয়েছে যে তামার তার ছাড়াও মাধ্যমগুলো হতে পারে অপটিক্যাল ফাইবার, মাইক্রোওয়েভ বা কৃত্রিম উপগ্রহ। সাধারনত বিভিন্ন টেলিফোনে সংযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক চেহারাটাকে প্রাসঙ্গিক পরিভাষায় বলা হয় টেলিফোন নেটওয়ার্ক। প্রান্তিক যন্ত্রটি (Terminal equipment) টেলিফোন না হয়ে যদি কম্পিউটার হয়, তবে তাকে বলা হবে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক - সেক্ষেত্রে গলার স্বরের পরিবর্তে মাধ্যমগুলোর মধ্যে দিয়ে সাংকেতিক ভাষায় যাতায়াত করবে কম্পিউটার প্রেরিত চিঠিপত্র সংবাদ বা তথ্য। এই জাতীয় নেটওয়ার্কের সঠিক পরিভাষা হ'ল Wide Area Network, সংক্ষেপে WAN, অর্থাৎ যে নেটওয়ার্কের বিস্তার নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গন্ডীর মধ্যে সীমিত নেই। নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নেটওয়ার্কগুলোর নাম হ'ল Local Area Network (LAN).  LAN-এ কম্পিউটারগুলো যোগাযোগের জন্য এক্সচেঞ্জ জাতীয় কোনও যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের সীমা লঙ্ঘন না করে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে কম্পিউটারগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয় তামার তার বা অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে। প্রশ্ন হতে পারে যে একটি নির্দিষ্ট কম্পিউটার আরেকটি কম্পিউটারে সংবাদ বা তথ্য পাঠাবে কিভাবে ? সবগুলোই তো জোড়া আছে একই তার দিয়ে। আসলে নেটওয়ার্কের প্রতিটি কম্পিউটারের নিজস্ব সাংকেতিক পরিচিতি সফটওয়্যারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি কম্পিউটার অপর কম্পিউটারের উদ্দেশ্যে তথ্য পাঠানোর সময় শেষোক্ত যন্ত্রটির সংকেতও তথ্যের শুরুতে জুড়ে দেয়। নেটওয়ার্কের সেই কম্পিউটারই তথ্য সংগ্রহ করবে যার সঙ্গে প্রেরিত তথ্যের সংকেত মিলে যাবে। কাজেই সঠিক ঠিকানায় তথ্য পৌঁছানোর কোনও অসুবিধা নেই। বস্তুত ইলেকট্রনিক মেলের জন্ম এই LAN-কে আশ্রয় করে এবং এর শৈশবাবস্থা কেটেছে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে গবেষণাগারের এক ঘর থেকে আর এক ঘরে কম্পিউটার মারফত চিঠিপত্র বা তথ্য আদান-প্রদানের কাজে। এদিকে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের তাগিদে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই টেলিফোন গ্রাহকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে উঠতে লাগল। গত একশ বছরে সারা পৃথিবী ছেয়ে গেছে তামার তারের টেলিফোন লাইনে। অনেক মানুষের বহু দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্ভব হয়েছে লাইনগুলো স্থাপনের কাজ। কারণ ওই লাইনগুলো স্থাপন করা হয়েছে বেশির ভাগ জায়গায় মাটির তলায় খাদ কেটে, কোথাও সমুদ্রতলদেশ আশ্রয় করে, কোথাও বা ল্যাম্প পোস্টের মাথা বেয়ে। মোদ্দা কথা টেলিফোন লাইনের বিনিয়োগে খরচের অঙ্কটা ছিল বড়সড় আকারেরই। এদিকে সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকেই আমেরিকা-ইউরোপে শুরু হয়ে গেছে আধুনিক প্রযুক্তির রমরমা। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মহাকাশে উড়েছে কৃত্রিম উপগ্রহ। টেবল-টপ কম্পিউটারের ব্যবহারও শুরু হয়ে গেছে জোরকদমে। বিশেষজ্ঞরা চিন্তা করলেন যে নেটওয়ার্ক স্থাপত্য (Network Architecture) কাজে লাগিয়ে কিভাবে নবীন ও প্রবীনের মধ্যে গাঁটছড়া বেঁধে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ব্যাপক ও জোরদার করা যায়। বিশেষজ্ঞদের এই হিতচিন্তার ফলে গবেষণাগারের গন্ডী পার হয়ে ইলেকট্রনিক মেল ছড়িয়ে পড়ল শহর-শহরান্তর থেকে দেশ-দেশান্তরে। সামান্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ যে যন্ত্রটি এই দুই প্রান্তিক টেকনোলজির সমন্বয় সাধনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে তার সম্বন্ধে দু'চার কথা বলা প্রয়োজন। 

যে ধরনের সস্তার তামার তারের মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেতে গলার স্বর প্রেরিত হয়, সেই একই তারের মধ্য দিয়ে কম্পিউটারের সংকেত সরাসরি পাঠানো সম্ভব নয় ; তার রূপান্তরের প্রয়োজন। এর কারণ গলার স্বর নিরবচ্ছিন্ন এবং ওই স্বরের সমতুল্য বৈদ্যুতিক সংকেত শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্ন নয়, তার কম্পাঙ্কও প্রতি সেকেন্ডে ২০ থেকে ৩০০০ বার। টেলিফোন লাইনের ডিজাইন করা হয় মোটামুটি ওই ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত বহন করার জন্য। পক্ষান্তরে কম্পিউটার প্রেরিত বৈদ্যুতিক সংকেতের চরিত্র একেবারেই অন্য রকম -    দুটি নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক মানের মধ্যে ওঠা-নামা করে এবং ওই ওঠা-নামা করাটাও তাৎক্ষণিক। অর্থাৎ গলার স্বরের সমতুল্য বৈদ্যুতিক সংকেতের মতো নিরবচ্ছিন্ন নয়। এই ধরনের লাফ দিয়ে ওঠানামা সংকেতকে বলা হয় পালস্। টেলিফোন লাইনের মধ্যে দিয়ে যদি এই জাতীয় পালস্ চালনা করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা অবিকৃত অবস্থায় গন্তব্য স্থানে পৌঁছাবার সম্ভাবনা কম। গন্তব্য স্থানের দূরত্ব যত দীর্ঘ হবে, বিকৃতির সম্ভাবনা হবে ততই প্রবল। এই ঝামেলা এড়াতে কম্পিউটার ও টেলিফোন লাইনের মাঝখানে রাখা হয় মোডেম (Modem) নামে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র। মোডেমের প্রাথমিক কাজ দুটি। (১) কম্পিউটার প্রেরিত পালস্-এর দুটি বিচ্ছিন্ন (discrete) মানের জন্য আলাদা আলাদা দুটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের নিরবচ্ছিন্ন (continuous) সংকেত তৈরি করে টেলিফোন লাইনে চালনা করা ; (২) উদ্দিশ্ট কম্পিউটারে গৃহিত হবার আগে আবার মূল পালস্-এ রূপান্তর করা, উন্নততর মোডেমে আরও যে সব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাদি থাকে তা আমরা প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করব।

আগে যতটুকু বলা হ'ল, তা থেকে হয়তো বোঝা যাচ্ছে যে একটি পার্সোনাল কম্পিউটার (PC) যা ই-মেল সংক্রান্ত কমিউনিকেশন সফটওয়্যার চালাতে সক্ষম, এবং এস টি ডি (STD) টেলিফোন লাইন থাকলেই প্রাথমিক ভাবে ই-মেল চালু করা সম্ভব। দাম, ক্ষমতা এবং সুযোগ সুবিধের তারতম্যে বিভিন্ন জাতের পি-সি বাজারে পাওয়া যায়। মোডেম নির্বাচনের ব্যাপারেও ওই একই নিয়ম। ন্যুনতম যতটা অর্থ বিনিয়োগে এগুলো পাওয়া যাবে তার পরিমাণ আজকের দিনে তিরিশ হাজার টাকার কাছাকাছি। সঙ্গে একটা সাদামাটা প্রিন্টার থাকলে খরচের মধ্যে আরও হাজার দশেক টাকা জুড়ে দিতে হবে। প্রযুক্তি সংক্রান্ত ব্যাপারটার এইখানেই ইতি। বাকি রইল ভারত সরকারের বিশেষ কতৃপক্ষের (Dept. of Electronics) অনুমতি এবং দেশব্যাপী ই-মেলের প্রসারের স্বার্থে প্রযুক্তি ও আমলা সংক্রান্ত যে পরিকাঠামো উক্ত কতৃপক্ষকে বজায় রাখতে হয় তার আংশিক খরচ বাবদ নির্দিষ্ট অঙ্কের বাৎসরিক অনুদান, যা (এক লাখ টাকার কাছাকাছি)। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ বলে মনে হতে পারে। তবে সরকারি কাজকর্মে এবং বিশেষ করে শিক্ষাজগতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের বিপুল তথ্যভান্ডারের পারস্পরিক আদান-প্রদানের কাজে ই-মেলের ব্যবহার আলোচনা করলে বোঝা যাবে যে এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র সুবিধাজনক নয়, লাভজনকও বটে।

কয়েক দশক আগেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যে পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান করা হতো, তার পরিমাণ ছিল সীমিত। আজকের যন্ত্রশিল্পের যুগে তথ্যভান্ডার বেড়ে চলেছে সীমাহীনভাবে। তথ্যের চরিত্র হয়েছে অনেক জটিল এবং পরস্পর নির্ভরশীল। এ ছাড়া তথ্যের মূল্য প্রায়ই বাঁধা থাকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারপযোগিতার সঙ্গে। সুতরাং উন্নতমানের যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া এই বিশাল তথ্যের সদ্ব্যবহার প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।  টেলিফোন, টেলেক্স, ফ্যাক্সের তুলনায় ই-মেলের জনপ্রিয়তার কারণ হ'ল, এই ব্যবস্থায় যোগাযোগ স্বয়ংক্রিয়, দ্রুত এবং সস্তা। খরচের ব্যাপারটা আপাতত স্থগিত রেখে ই-মেলের উপকারিতা ও ব্যবহারের উপযুক্ত ক্ষেত্রের কয়েকটা উদাহরণ দিতে চাই।

অফিস-কাছারি সংক্রান্ত কাজকর্মে অহরহ টেলিফোন ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পরিসংখ্যান বলে যে এক অফিস থেকে আর এক অফিসে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে অপর প্রান্তের গ্রাহকের তাৎক্ষণিক সন্ধান না পাবার সম্ভাবনা শতকরা ৭৫ ভাগ। ব্যবহারিক জীবনে প্রায় প্রতিদিনই 'তিনি আপাতত চেয়ারে নেই বা তিনি মিটিং-এ আছেন বা উনি আজ আসেননি, ট্যুরে আছেন' জাতীয় উত্তর শুনতে শুনতে বা বলতে বলতেও আমরা প্রত্যেকেই বিরক্ত। ই-মেলের দৌলতে এই বিরক্তিকর পরিস্থিতি থেকে খুব সহজেই অব্যাহতি পাওয়া সম্ভব। কারণ এই ব্যবস্থায় সংযোগ স্থাপনে নিজস্ব উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না। আপনি আপনার বক্তব্য কী-বোর্ড মারফত কম্পিউটারে ঢুকিয়ে যথারীতি নির্দেশ দিয়ে যেতে পারেন নির্দিষ্ট কোনও সময়ে আপনার আকাঙ্খিত নম্বরে ডায়াল করতে হবে। প্রথমবার ডায়াল করে নিষ্ফল হলে নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদে পুনঃপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার নির্দেশ দেবার ব্যবস্থাও কম্পিউটারে আছে। যাইহোক,  লাইন পেয়ে গেলে, আপনার কম্পিউটারের ভান্ডারে সংরক্ষিত নির্দিষ্ট তথ্য আকাঙ্খিত ব্যক্তির কম্পিউটারে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। তিনি সে সময়ে উপস্থিত না থাকলেও কিছু এসে যায় না। তাঁর কম্পিউটার চালু থাকলেই হ'ল।  তিনি ফিরে এসে কী-বোর্ড মারফত উপযুক্ত নির্দেশ দিলেই তাঁর উদ্দেশ্যে পাঠানো যাবতীয় তথ্য বা সংবাদ ভিডিও স্ক্রিনে ফুটে উঠবে। সঙ্গে একটি প্রিন্টার থাকলে সংবাদটির প্রতিলিপি নিয়ে রাখারও অসুবিধে নেই।

গবেষণার কাজে ই-মেলের ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে-কোনও গবেষণার কাজে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র ও গবেষকগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বিশেষ প্রয়োজন। এমনও হতে পারে, যে-কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ের গবেষণা চলছে বেশ কয়েকটি গবেষণাগারের যৌথ প্রচেষ্টায়। গবেষণায় আজকাল প্রতিযোগিতা খুবই বেশি। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফলাফল প্রকাশিত হওয়াও বাঞ্ছনীয়। সুতরাং ভাব বিনিময়ের জন্য সব সময় পারস্পরিক যোগাযোগ রাখা অপরিহার্য। চিঠিপত্রে বা টেলিফোনে যোগাযোগ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষও বটে। ই-মেল এ ক্ষেত্রে শুধু সস্তাই নয়, দ্রুততম ও নিশ্চিত উপায়। সারা পৃথিবীতে কয়েক হাজার কম্পিউটার নেটওয়ার্ক আছে। ARPANET, BITNET প্রভৃতি বিদেশি নেটওয়ার্কগুলো শুধুমাত্র গবেষণার কাজের জন্যই উপসর্গিত। অর্থাৎ ওই নেটওয়ার্কগুলোতে গ্রাহক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে। ভৌগোলিক দূরত্ব যাতে গবেষণার কাজে বাধা সৃষ্টি না করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং-এর সুবিধে নিয়ে যোগাযোগ সংক্রান্ত কিছু সফটওয়্যার তৈরি করে নিয়েছিলেন উৎসাহী গবেষকরা। ই-মেল ব্যবহারের আরও একটা উপযুক্ত উদাহরণ দেব। ধরা যাক একটি চিঠি বিভিন্ন গ্রাহককে পাঠাতে হবে। চিঠির বয়ান ও গ্রাহকদের ঠিকানাগুলো কম্পিউটারে ঢুকিয়ে যথাযথ নির্দেশ দিলে, কম্পিউটার গন্তব্য ঠিকানায় চিঠিগুলো পাঠিয়ে দেবে। এই ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ব্রডকাস্টিং (Broadcasting)। ইলেকট্রনিক মেলের এই ধরনের ব্যবহার সেমিনার, কনফারেন্স জাতীয় আলোচনাচক্র সংগঠনের কাজে ভীষণ উপযোগী। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতের বেশ কয়েকটা রাজ্যের সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের জড়ো করে সম্প্রতি একটি আলোচনাচক্রের আয়োজন সম্ভব হয়ছিল ই-মেলের দৌলতে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো হবার প্রাক্কালে মস্কো শহরে অরাজকতা ছিল তুঙ্গে। চরমপন্থীরা টিভি স্টেশন, খবরের কাগজের অফিস ইত্যাদি যাবতীয় প্রচার সংস্থাগুলো দখল করে নেয়। কিন্ত তাঁরা ভুলে গেছিলেন ইন্টারনেটের কথা (Internet) । এই কম্পিউটার নেটওয়ার্কটি ব্যবহার করছেন পৃথিবীর চল্লিশটি দেশের অন্তত ১৫০ লক্ষ গ্রাহক। যাইহোক, ইন্টারনেট সোভিয়েত চরমপন্থীদের ভোলেনি। ইন্টারনেট গ্রাহকগোষ্ঠী ঘরে বসে মস্কোর রাস্তাঘাটে জমা ওঠা নাটকের কাহিনী জানতে পেরেছিলেন।  একটা রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে জনমত গড়ে তোলার কাজে সেই দিন ইন্টারনেট একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

তবে, সমাজজীবনে একজন মানুষের সঙ্গে আরেক জন মানুষের সংযোগ মাধ্যম হিসাবে ই-মেলের ব্যবহার পশ্চিমি দেশে বেশ ভালরকমই শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ আসবাবপত্রের  মতো ঘরে ঘরে পার্সোনাল কম্পিউটার ব্যবহার পশ্চিমি দুনিয়ায় খুবই মামুলি ব্যাপার। ই-মেল সফটওয়্যার কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারকে ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক এবং পারিবারিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে।এমনকি একই পরিবারের সদস্যরা মানে, বাবা-মা, ভাই,  বোনেরা পারস্পরিক প্রয়োজনে ভাব বিনিময় করছেন কম্পিউটার মারফত। প্রশ্ন - এটা ভাল না খারাপ ? আমার মতে এই ধরনের ব্যবহার একটা ফ্যাশনমাত্র এবং আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী। ওসব দেশে আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে। সামাজিক জীবন মূলত বস্তুভিত্তিক। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সেখানে অনেক প্রবল। এসব কারণে ওই দেশে যে রীতি-প্রথাগুলো সামাজিক নিয়ম বলে স্বীকৃত, আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে সেগুলোই নিয়মের ব্যতিক্রম। 

ই-মেলের এই ধরনের ব্যবহারের ঢেউ এদেশে এসে পড়তেও খুব একটা বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। কারণ তথাকথিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত তো বটেই, অর্থাৎ শহুরে এলিট  গোষ্ঠী পরিবারগুলো ভিন্নতা বজায় রাখার জন্য পশ্চিমি দুনিয়ার সেই জিনিসগুলোর অনুকরণেই প্রবৃত্ত, যেগুলো সহজলভ্য এবং এ দেশের কাঠামোতে অসামাজিক। এমনিতেই সামাজিক এমনকি পারিবারিক জীবনেও কৃত্রিমতার ছড়াছড়ি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রুচি এখন আর ব্যক্তিগত নেই, তা হয়েছে বিজ্ঞাপন দাতার স্বার্থনির্ভর। ওদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতিকে মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক বিসদৃশ ককটেল যার স্বাদ না দেশি না বিদেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারে সময় কাটাবার সঙ্গী হিসেবে ভি-সি-আর  এবং ভিডিও গেমের চল অধিক থেকে অধিকতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো ভিডিও পার্লার গজিয়ে ওঠা এবং সেগুলোর ভাড়া ক্রমশ নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা এই মন্তব্যকেই সমর্থন করে। এর ওপর পারিবারিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম যদি কম্পিউটার হয়, তবে তার পরিণতি সহজেই অনুমেয়। আসলে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বড়ই বিচত্র্য। প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের নিবিড়তা, আবেগ বা কুশল বিনিময়ের উষ্ণতা কি যন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব  ? কোথায় সেখানে প্রাণের স্পর্শ  ? আর প্রাণের স্পর্শই যদি না থাকে তবে তার অভাব পূরণ করবে একমাত্র হতাশা, পশ্চিমি দেশগুলোর মানুষেরাও হয়তো একদিন শিকার হবেন প্রাণস্পর্শের  অভাবজনিত এই হতাশার। আমার মনে হয় অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই আঁচ অন্দরমহল থেকে দূরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। চাকরির সুবাদে ১৯৭৫ সালে বেশ কিছু মাস আমেরিকাতে থাকার সুযোগ হয়েছিল। এমন একটা নিষ্প্রাণ দেশ আমি কখনও দেখিনি। অথচ সবকিছুই ঝকঝকে, তকতকে, অভাবের কোনও চিহ্ন দেখতে পাইনি সেখানে। কিন্ত সবই কেমন যেন impersonal. বম্বের মতো জনবহুল একটা শহর থেকে পৌঁছে মনে হ'ল যেন চতুর্দিকে শ্মশানের নীরবতা। বন্ধুবান্ধব ছাড়াও অনেক বাঙালি বাড়িতে গেছি। আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি ছিল না। বরং একটু বেশিই বলব। তবুও তাঁদের একাকীত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা, তারা মুখে না বললেও, আমার দৃষ্টি এড়ায় নি। অনাবাসী জীবনের দ্বন্দ্ব তাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সামাজিক এই পরিবেশে যদি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের মাধ্যম কম্পিউটার হয়, তাহলে তার পরিণতি সত্যিই মারাত্মক হবার কথা। মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। 


জনস্বার্থমূলক যে কোনও ব্যবস্থা চালু করার আগে যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক বিচার করে দেখা অপরিহার্য, তা হ'ল ব্যবস্থাটার রক্ষণাবেক্ষণের প্রযুক্তিগত কুশলতা এবং অর্থনৈতিক আনুকুল্য। কম্পিউটার এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আমাদের দেশে বহুদিন চালু আছে। সুতরাং রক্ষণাবেক্ষণের প্রযুক্তিগত যোগ্যতা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে। দেখা যাক অর্থনৈতিক দিকটা। ই-মেল ব্যবহারে খরচের ব্যাপারে শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই অনেক ধন্দ আছে। অনেকে বুঝে উঠতে পারেন না যে টেলিফোন, ফ্যাক্স, বা টেলেক্সের তুলনায় ই-মেলের খরচ বেশি না কম। পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ব্যবস্থার উপকারিতা বোঝাতে সকলেই প্রশ্ন করেন যে এত অত্যাধুনিক ব্যবস্থা তো খুবই খরচা সাপেক্ষ হবে। কিন্ত ব্যাপারটা আদৌ তা নয় আসলে আমার কাজ ছিল পূর্ব ভারতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে DOE-র তরফ থেকে ই-মেলের বিপনন অর্থাৎ মার্কেটিং। এই বিষয়ে খুঁটিনাটি সামান্য আলোচনা করলে ব্যাপারটা জলের মতো পরিস্কার হয়ে যাবে। এককালীন যে সব প্রাথমিক যন্ত্রাদির প্রয়োজন তা আগেই বলা হয়েছে।সেটা হ'ল এককালীন অনুদান। বাকি খরচ নির্ভর করবে তথ্য আদান-প্রদানে STD লাইন অধিগ্রহণের সময়ের উপর। যাইহোক, এটা কিছু নতুন কথা নয়। টেলিফোনে STD গ্রাহকরা এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। ইলেকট্রনিক এক্সচেঞ্জের অধীনস্থ গ্রাহকদের আঞ্চলিক যোগাযোগের খরচও এখন আর সময় নিরপেক্ষ নয়। নির্দিষ্ট সময় বাদে বাদেই এক্সচেঞ্জের কম্পিউটারটি 'কুক' করে আওয়াজ দিয়ে জানিয়ে দেবে যে খরচের মিটার উর্দ্ধগামী। সুতরাং উদ্দেশ্য হবে কত শিগগির তথ্যের আদান-প্রদান সেরে ফেলা যায় - তা টেলিফোন বা ইলেকট্রনিক-মেল যাতেই হোক না কেন। এখন ব্যাপার হ'ল যে, তথ্য সরবরাহের দ্রুততা নির্ভর করে টেলিফোন লাইনের সেই সময়কার অবস্থার উপর। লাইনের অবস্থার মানে হ'ল এই - শহর এবং শহরতলিতে ক্ষুদ্র, ভারী শিল্পের কারখানায় বড় বড় মোটর, ওয়েল্ডিং সেট ইত্যাদি ইলেকট্রোমেকানিকাল যন্ত্রপাতি অহরহ চলছে। এই সব যন্ত্র থেকে উদ্ভূত তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ টেলিফোন লাইনে অনাবশ্যক ভোল্টেজ (সিগন্যাল) আবেশিত করতে পারে। এই জাতীয় অনাবশ্যক সিগন্যালকে বলা হয় নয়েজ (Noise)। নয়েজ যুক্ত টেলিফোন লাইনে যদি তথ্য সরবরাহের হার দ্রুত হয়, তবে অপর প্রান্তে তা গৃহিত হবার পর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া যাবে না। ব্যাপারটা দাঁড়াতে পারে 'ধান শুনতে কান' শোনার মতো। অর্থাৎ তথ্য এমনই বিকৃত অবস্থায় গৃহীত হতে পারে যে হয়তো তার মাথা-মুন্ডু কিছুই বোঝা গেল না। উঁচু জাতের মোডেমে (Smart Modem), লাইনের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকে এবং সেই অনুযায়ী হিসেব করে তথ্য সরবরাহের হার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

টেলিফোন লাইনের ক্ষেত্রে সাধারণত এই হারের নিম্নতম ও উর্দ্ধতম মান যথাক্রমে প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ ও ৯৬০০ বড্। বডের হিসেবটা মোটামুটি এইরকম - ১০ বড্ড হ'ল ইংরেজির একটি অক্ষর। একটা উদাহরণ: দেশ পত্রিকার একটি পৃষ্ঠায় কমবেশি ৩০০০ অক্ষর আঁটে। এই পাতাটি ই-মেল ব্যবহার করে পাঠাতে সময় লাগবে ১০০ সেকেন্ড (সবচেয়ে মন্থর) থেকে ৩ সেকেন্ডের (দ্রুততম) কাছাকাছি। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে দ্রুততার গড় হার সেকেন্ডে ১২০০ বডের কাছাকাছি। সুতরাং এই পাতাটির জন্য সময় লাগবে ২৫ সেকেন্ড।  সমপরিমাণ তথ্য ফ্যাক্স, টেলেক্স বা টেলিফোন যোগে পাঠাতে হলে, সময়ের মাপটা আসবে মিনিটের এককে। কাজেই ইলেকট্রনিক মেল অনেকটাই সস্তা। এতটা বিশদ আলোচনা করলাম এই কারণে যে বাজারে টেবল-টপ কম্পিউটারের ছড়াছড়িতে ভুঁইফোঁড় কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে। জোর গলায় তাঁরা অনেক কিছু বলছেনও। গণ্যমান্য অনেকের ধারণা আছে উন্নত মানের এই সংযোগ ব্যবস্থা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যে উদাহরণটি দেওয়া হ'ল আশা করা যায় তাতে ভুল ভাঙবে।

ইলেকট্রনিক মেল এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পৃথিবীকে এনে দিয়েছে ঘরের মধ্যে। এই বিস্ময়কর সংযোগ ব্যবস্থার প্রচারে এবং প্রসারে সরকারি সংস্থা DOE (Department of Electronics) উদ্যোগী হয়েছেন। তাঁরা যে নেটওয়ার্কটির উদ্যোক্তা, তার নাম ERNET (Education & Research Network)। নাম দেখেই বোঝা যায় যে শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারের জন্য এই নেটওয়ার্কটির জন্ম। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসাবে DOE ১৯৮৮ সালে এই কাজে হস্তক্ষেপ করেন। পাঁচটি আই আই টি, আই আই এস-সি (বাঙ্গালোর) ,ন্যাশনাল সেন্টার ফর সফটওয়্যার টেকনোলজি (বম্বে), এবং DOE (দিল্লি) - প্রাথমিকভাবে এই আটটি শিক্ষা সংস্থাকে বেছে নেওয়া হয় ERNET কম্পিউটার নেটওয়ার্কে যুক্ত করার জন্য। আপাতত সারা ভারতে ERNET-এর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় তিনশোর কাছাকাছি। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সংখ্যাটা হাজারে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রবন্ধটি লেখার মাঝে মধ্যেই একটি প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে একরকম বিবেকদংশনের জ্বালা আমাকে বিঁধেছে। প্রশ্নটা হ'ল আমাদের, অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের বাদামি বর্ণের মানুষদের নিজেদের দেশের মাটিতে বসে বিজ্ঞান প্রযুক্তির এই সামগ্রিক প্রগতিতে অবদান কতটুকু ? আমার মনে হয় পশ্চিমি মানুষদের তুলনায় কিছু না বললেই চলে। আমরা বেশির ভাগই কেবলমাত্র মাঝে মাঝে শামুকের মতো মুখ বের করে ঘরে বসে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার আনন্দ উপভোগ করছি আর আপ-টু-ডেট থাকার ভান করছি অগ্রিম খবর বিলিয়ে। খোঁজ করলে হয়তো দেখা যাবে যে বিদেশি গবেষণাগারে এবং শিল্পে কর্মব্যস্ত বিজ্ঞান-প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে বাদামি বর্ণের মানুষের সংখ্যা হয়তো কম নয়। প্রশ্ন তা হলে একটাই থেকে যায় যে বিগত চার-পাঁচ দশকে, সাড়া জাগানো বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তৈরি করার পরিবেশ আমরা কি সৃষ্টি করতে পারিনি ? তর্কে-বিতর্কে বা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাচক্রে শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় দাবিদারের সংখ্যা অগুনতি থাকলেও বাস্তব অন্তত তাই বলছে না। আসলে ফাঁকিবাজি আর বাকচাতুর্যে সস্তায় বাজি মাত করার ঝোঁকটাই সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে যাচ্ছে ; তা বিজ্ঞান-টেকনোলজি, খেলাধুলো বা রাজনীতি যাই হোক না কেন।

No comments: