Friday, December 30, 2022

ফুটবল সম্রাট পেলে

 



ফুটবল সম্রাট পেলে, তোমারে সেলাম

সম্রাট, 

মাঠে নামার আগে ১০ শুধুই একটা সংখ্যা ছিল,

তোমার হাত ধরে ১০ মর্যাদায় উত্তীর্ণ হ'ল,

আরো দুই বিশ্বসেরা মারাদোনা হয়ে মেসির গায়ে উঠল,

তুমি আসার আগে ফুটবল শুধুই একটা খেলা ছিল,

তোমার পায়ের যাদু ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করলো,

অবহেলিত কৃষ্ণাঙ্গরা তোমার মধ্যে দিয়ে তাদের কন্ঠস্বর                                                                         খুঁজে পেল।

এই না হলে সম্রাট!!



Monday, December 26, 2022

জিডিপি ধাঁধা

জিডিপি ধাঁধা


আমি অর্থনীতির ছাত্র নই। খবরের কাগজ, টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোতে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বক্তাদের  মধ্যে অর্থনৈতিক আলোচনা, এবং অনেক লেখা থেকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য কুড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে, নিজের রাজ্যের এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করি। 

প্রচলিত প্রথায় বলা হয় যে একটা দেশের  জিডিপি-ই হ'ল অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের সর্বোতম মাপকাঠি। মুস্কিল হ'ল আমার মতো অ-বিশেষজ্ঞ মানুষজনেরা কেউ কেউ এটাকে মন থেকে যেন মেনে নিতে পারিনা; প্রায়শই ধন্ধে পড়ে যাই। জিডিপি কথাটাকে কেমন যেন একটা ধাঁধা বলে মনে হয়। সম্প্রতি দেশের প্রধানমন্ত্রী বললেন যে ভারত বিশ্বের জিডিপির অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যকে অর্থাৎ ইউনাইটেড কিংডমকে পেছনে ফেলে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এর সপ্তাহখানেক বাদেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মাননীয় অমিত শাহজীও একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। এমনকি তিনি তাঁদের রাজত্বকালের মেয়াদের খতিয়ান তুলে জানালেন যে ২০১৪ সালে বিশ্বের জিডিপির  অংশীদারিত্বের নিরিখে যেখানে ভারতের অবস্থা ছিল দশম স্থানে, সেখানে এখন তা এগিয়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চম স্থানে। এগুলো হ'ল মন্ত্রী-সান্ত্রীদের দরাজ ভাষ্য। এবার খোলামনে আমার মতো সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে একটু কাটাছেঁড়া করে দেখা যাক যে জিডিপি নামক বস্তুটি দেশের মানুষের ভাল থাকার সূচক হিসেবে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

জিডিপি বনাম মাথাপিছু আয়:

দেশের জিডিপির সঙ্গে মাথা পিছু আয়ের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থাকার কথা। অর্থাৎ দেশের সম্পদ নাগরিকদের মধ্যে সমবন্টন হওয়া উচিৎ। আমার ধারণা সেটা কোনো দেশেই হয় না। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি পরিচালনার পদ্ধতিগত বিষয়গুলো যথেষ্ট আঁটোসাটো হওয়ার ফলে গড় নাগরিকের অবস্থা আদৌ অসচ্ছল নয়।    কিন্ত আমাদের মতো দেশে ঢিলেঢালা ব্যবস্থার ফলে তলার দিকের জনসাধারণের প্রাপ্তির সঙ্গে জিডিপির কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। ঢাকুরিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা। প্রায় রোজই রেল লাইন সংলগ্ন বাজারে যাচ্ছি, চার দশক তো হবেই। লাইনের একেবারে ধার ঘেঁষা বস্তিগুলো দেখে মনে হয় না জিডিপির উন্নতির সঙ্গে হতদরিদ্র হাজার হাজার  বস্তিবাসীর কোনো যোগসূত্র আছে। অথচ মানুষ নিয়েই দেশ। সিংহভাগ মানুষের যদি এই আর্থিক অবস্থা হয় তাহলে "অচ্ছে দিন" কাদের জন্য?

এর মানে হ'ল যে আমাদের মতো উন্নয়নশীল গরীব দেশের সমাজের নিম্নবর্গের মানুষেরা উন্নত দেশগুলোর কম আয়ের নাগরিকদের তুলনায় অনেকটাই গরিব।জিডিপি শুধুমাত্র গড় আয় প্রকাশ করে এবং এটি সংখ্যাগরিষ্ঠরা কী উপার্জন করছে বা তারা কীভাবে জীবনযাপন করছে তার প্রতিফলন নয়।


পৃথিবীজুড়ে
 আবার করোনা শুরু হয়েছে। ২৩/১২/২০২২ তারিখে লকডাউনের কথা মাথায় রেখে আমার দেশের কেন্দ্রীয় সরকার তড়িঘড়ি ৮০ কোটি মানুষের জন্য ২০২৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত নিখরচায় রেশন বিলির কথা ঘোষণা করেছেন। নিন্দুকেরা বলছেন বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বেশ ক'টা রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ছাড়াও ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই মোদী সাহেবের এই সিদ্ধান্ত। এটা একটা কৌশল বই তো নয়। সে যাই হোক আমি রাজনীতির কারবারি নই। তবে এই ঘোষণার মধ্যে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, যে কেন্দ্রের সরকার পরোক্ষে হলেও মেনে নিয়েছেন যে ১৩৫ কোটির দেশে ৮০ কোটি মানুষ, অর্থাৎ কম-বেশি ৬০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করেন। উন্নত দেশগুলোর গরিবানার অবস্থাটা সেরকম আদৌ নয়।

প্রায় প্রতিদিনই আমরা শুনি যে চীন এক নম্বর অর্থনীতি হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ভারতও পিছিয়ে থাকবে না। কিন্তু যেহেতু ভারত ও চীনের জনসংখ্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় পাঁচগুণ, বিশ্বের নিরিখে তারা এখনও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশ হিসেবেই স্বীকৃত হবে।  ইংল্যান্ডের মাথাপিছু আয় ভারতের  তুলনায় ২০ গুণ বেশি। মাথাপিছু আয় গুরুত্বপূর্ণ।  আমার মনে হয় জিডিপি পরিসংখ্যান দেওয়া, ভারতের অর্থনীতি সম্পর্কে একটি রঙিন ছবি আঁকার চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। ভারত এখনও একটি অত্যন্ত দরিদ্র দেশ এবং বিশাল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও, মুষ্টিমেয় বিত্তশালী মানুষের মধ্যেই সেই সম্পদের অবাধ যাতায়াত। বিপুল সংখ্যক ভারতীয় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে।

এতক্ষণ যেটা বলা হ'ল সেটা জিডিপি সংক্রান্ত গল্পের খোলস। এবার আস্তে আস্তে খোলস খুলে বেরোবার পালা। আমরা খোঁজার চেষ্টা করব যে মানুষের সত্যিকারের ভাল থাকার সূচক হিসেবে অন্য কোনও একটি বা একাধিক সূচক আছে কি না! জিডিপি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কেন্দ্রীক। সেটা দরকার। কিন্ত এর সঙ্গে জুড়তে হবে সমাজকেন্দ্রীক বাস্তবতাকে।

এক শতক হতে হতে চলল আমরা কাজের মূল্যকে জিডিপির চোখে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তাই আজ আই টি কোম্পানিগুলোর কাজের কদর বেশি, শিক্ষিকার কাজের কদর কম, পুরকর্মীর আদৌ কদর নেই। শুধুতাই নয়, তার সঙ্গে জ্ঞান, মেধা, ও দক্ষতা সম্পর্কেও একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। যে কাজ সর্বজনীন ন্যায় ও কল্যাণকে উর্ধগামী করে, বা পরিবেশ সংরক্ষণ করে, তাকে আমরা কম কদর করি। যে কাজ প্রতিষ্ঠানের ও ব্যক্তির পকেট ভরায়, তাকে আমরা বেশি কদর করেছি, সেই কর্মীদের বেশি "মেধাবী" ভেবেছি। যে কাজ মানুষ  বাঁচায়, পরিবেশ বাঁচায়, সেগুলোকে "সামান্য মেধার কাজ" বলে ভেবেছি।

জিডিপি আসলে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, নীতি নির্ধারক এবং সাংবাদিকদের জন্য ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা মেট্রিক বা মাপকাঠি। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাডাম ট্রুজ বলেছেন, এটি "বাস্তবতার একটি সংকীর্ণ এবং কিছুটা স্বেচ্ছাচারী অংশ।"

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে আজাদী কা অমৃত মহোৎসব দিকে দিকে ধূমধাম করে পালিত হয়েছে।  আমিও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করে ১৫ই অগাস্ট নিজের ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় জাতীয় পতাকা লাগিয়ে দেশমাতৃকার উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে নিজের মতো করে মহোৎসব পালন করেছি। কিন্ত মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, প্রশ্ন জাগছিল যে সত্যিই কি আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল !! উদযাপন করছি বটে কিন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে আমরা পাশ কাটিয়ে গেছি, হয়তো সচেতন ভাবেই। কারণ সাদা চোখে যেটা ধরা পড়ে তা হ'ল দারিদ্রকে বিপন্ন করছে ক্রমবর্ধমান আর্থিক অসাম্য। একদিকে ধনকুবেরদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, অন্য দিকে বাড়ছে কর্মহীন, অপুষ্ট, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। অতিমারি এই চরিত্রকে আরও নগ্ন করে দিয়েছে।

বিশ্বের ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান ১১৬ টি দেশের মধ্যে ১০১ নম্বরে। কেবল অন্য দেশের তুলনায় নয়, নিজের অতীত অবস্থানের তুলনাতেও ভারত দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে।

বেশিরভাগ স্বাস্থ্য সূচকে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে ভারত নীচের দিকে রয়েছে৷ এই দেশে প্রতি ১০০০০ জনে মাত্র ৮.৫ টি হাসপাতালের শয্যা এবং আটজন চিকিত্সক রয়েছে। জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে এটি তুলনা করুন যেখানে প্রতি ১০০০০ জনে যথাক্রমে ১২০ এবং ১৩০ টি শয্যা রয়েছে।

আমাদের এখন একটি নতুন অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প লক্ষ্য করা উচিত যা মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই।যখন আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করতে জিডিপিকে লেন্স হিসাবে ব্যবহার করি, তখন আমরা কী পরিমাপ করা হয় তার উপর ফোকাস করি এবং যেগুলি পরিমাপ করা হয় না সেগুলিকে উপেক্ষা করি। জিডিপি শুধুমাত্র একটি দেশের অর্থনীতির আকার পরিমাপ করে। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী জোসেফ ই স্টিগলিটজ যুক্তি দেন যে "জিডিপি সুস্থতার একটি ভাল পরিমাপ নয়"

একটি ক্রমবর্ধমান জিডিপি প্রায়ই অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিমাপ হিসাবে দেখা হয় যা শুধুমাত্র সমাজের শীর্ষে সম্পদ তৈরি করতে পারে এবং ধনী-দরিদ্রের ফাটলকে আরও চওড়া করে। ফলে হতদরিদ্র মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারে না।

জিডিপি নিজে থেকে কোনো দেশের উন্নয়নের পর্যাপ্ত পরিমাপক নয়। উন্নয়ন শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক মাত্রা অন্তর্ভুক্ত করে না বরং সামাজিক, পরিবেশগত এবং মানসিক মাত্রাও অন্তর্ভুক্ত করে। জিডিপি শুধুমাত্র পরিমাণের উপর ফোকাস করে, কিন্তু মানের দিকটিকে উপেক্ষা করা হয় যা অসম, বেকার বিলিয়নেয়ারের জন্ম দেয় - 

একটি দেশের উন্নয়ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার প্রশ্নগুলি হল: "দারিদ্র্যের সাথে কি ঘটছে? বেকারত্বের সাথে কি ঘটছে? বৈষম্যের সাথে কি ঘটছে? প্রগতি মানে আরও ন্যায্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ। অগ্রগতির এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন আমাদের মনে রাখতে হবে। 


১৯৯০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রবর্তিত হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স HDI এবং OECD (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) বেটার লাইফ ইনডেক্স সহ অনেকগুলি বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, যা জীবনের মানের ক্ষেত্রে অনেক উচ্চতর ব্যবস্থা। এবং মঙ্গল।

আমাদের নীতি নির্ধারকরা যত তাড়াতাড়ি স্থূল প্রবৃদ্ধি থেকে সর্বত্র অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করবেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ততই মঙ্গলজনক হবে।



নীতিনির্ধারক এবং সুশীল সমাজকে "জিডিপি চিন্তা" থেকে দূরে সরে যেতে হবে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুযোগের সমতা, পরিবেশ, শারীরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষার মতো জীবনমানের সূচকগুলিতে মনোযোগ দিতে হবে। এটা এখন সামাজিক ভাবে অপরিহার্য যে আমরা মূলধারার নীতি বক্তৃতা দ্বারা আমাদের দেওয়া সংকীর্ণ লেন্সের বাইরে তাকাই এবং অগ্রগতির মাপকাঠিগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করি যা জিডিপির সরল পরিমাপের চেয়ে বেশি অন্তর্ভুক্ত।

আমাদের  মতো দেশে ক্রমবর্ধমান জিডিপির আরও একটা সহজ ব্যাখ্যা হল, জনবহুল দেশে পন্যের চাহিদা থাকবে। ফলে উৎপাদন সমানুপাতে বাড়তে থাকবে এবং জিডিপি বাড়বে। অতএব, জিডিপি বাড়া মানেই যে দেশের অর্থনীতির *স্বাস্থ্য হৃষ্টপুষ্ট* হচ্ছে এমন ভাবার কোনও কারণ দেখছি না যদি না সেই জিডিপির বৃদ্ধি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তার সুফল সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছোতে পারে।

  আরও একটা মামুলি (ব্যক্তিগত মতামত) অর্থনৈতিক তত্ত্বকথা বলে এই প্রবন্ধ শেষ করব। ট্রিকল-ডাউন তত্ত্ব বা চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব।  এটা হল এমন একটি তত্ত্ব যা বলে সিস্টেমের শীর্ষে থাকা লোকেদের দেওয়া সুবিধাগুলি শেষ পর্যন্ত সিস্টেমের নীচের লোকেদের কাছে পৌঁছে যাবে। উদাহরণ স্বরূপ, ধনীরা ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে সরকারি কর ছাড় পাবেন। ফলে তাঁরা আরও বিনিয়োগ করে চাকরি তৈরি করবে। এইভাবেই সুবিধাগুলি দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে যাবে। ডাহা মিথ্যে কথা, অন্তত আমাদের দেশে। লকডাউনের সময় সংগঠিত ক্ষেত্রে, অর্থাৎ সরকারি চাকুরে/পেনশন ভোগী, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক- তাঁরা নিয়মিত বেতন পেয়েছেন। অথচ মাসের পর মাস,  ট্রেন বন্ধ থাকার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে যেসব মহিলারা, মূলত গৃহ পরিচারিকারা, যাঁরা বহু বছরের পুরোনো মালিকদের বাড়িতে কাজে আসতে পারেননি, তাঁরা কেউ বেতন পাননি। সামান্য মিথ্যে থেকে গেল কথাটার মধ্যে। কোন কোনও মনিব ভিক্ষার দান হিসেবে একমাস, বড়জোর দু'মাসের মাইনে দিয়ে বিদায় করেছেন।

অসংগঠিত ক্ষেত্রের কথায় আসি। সেখানে বহু মানুষ কর্মহীন হয়েছেন, মালিকের যুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধের কারণে উৎপাদন বন্ধ, ফলে কর্মী ছাঁটাই। কিন্ত একটি নির্দিষ্ট লাভজনক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কথা আমার জানা আছে যেখানে লকডাউনে রোজগার থাকা সত্ত্বেও তাঁরা কর্মীদের বেতনে কাটছাঁট করেছেন। হ্যাঁ, সে প্রতিষ্ঠানগুলো হ'ল বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। সেখানে শিক্ষক/শিক্ষিকারা বাড়ি থেকে নিয়মিত অন-লাইন ক্লাস নিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীরাও বাড়ি থেকেই পঠন-পাঠন চালিয়ে গেছে। কাজেই মালিকের রোজগার কমেনি তো বটেই, বরং বলা যেতে পারে বেড়েছে (কর্মীরা কলেজে না আসার ফলে আলো,পাখা, জলের বিদ্যুতের বিল অবশ্যই কমে গেছে)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যেখানেই শোষণের সুযোগ থাকে, মালিকপক্ষ সেখানেই তার সদ্ব্যবহার করতে পিছপা হননি, তা বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মালিক বা সরকারি কর্মে বহাল গৃহকর্তা হন না কেন।

 

Monday, December 19, 2022

Bytes control Braille dots

Bytes control Braille dots.

Prof Pradip K Das started the conversation on a note of reminiscence carrying us to the year 1993 on the day when the first computerised Perkins Brailler (developed at the Computer Science and Engineering Department of Jadavpur University) was installed at the Ramakrishna Mission Blind Boys'Academy at Narendrapur. I was fortunate to be one of the invitees.

About a couple of months ago, when Prof. Das approached us for developing an improved version of the same at theVariable Energy Cyclotron Centre (VECC), Calcutta, I grabbed the opportunity and expressed my willingness to get my team involved in the project. The team members who contributed in the development project include Sunil Das, Sarbajit Pal, Tapas Samanta, Jiban Das,Sunil Karmakar, Ashok Das and  
R B Bhole.

The essential components of traditional Perkins Brailler consisted of a movable embossing head split into top and bottom halves having six pins organized in  2x3 rectangular array passing through the bottom half of the head, finally terminating on a coding Shaft. The upper half mirrors the lower half except that the corresponding holes terminate within 0.5mm.

The embossing of any of the combinations of 2x3 array on a thick  special paper in the form of elevated dots constitute Braille character or code devised by Louis Braille in France long ago. The coding Shaft is connected to a row of six coding knobs mounted to the front of the machine in the manner of a first generation typewriter.

Each of the pins is actuated by its corresponding coding Knob. The same row accommodates three more knobs. The one centrally located is meant for shifting the head after every Braille character is embossed like carriage shift in a typewriter. The other two knobs are meant for carriage return and line feed.

The special thick paper on which embossing is to be done makes its way through the split embossing head mounted on the carriage. Pressing the knobs pushes up the selected pins through the bottom half of the head, simultaneously pressing down the top half completing the embossing operation by leaving impressions of the selected Braille character on the paper in a desired form.

After embossing one character, the carriage moves to the next character position and after a line is completed, the next line is started by operating the carriage return and the line feed knobs.


Louis Braille (1809-1852) and English alphabets in Braille code

In the first version of computerised Brailler non-invasive technique was employed which means the original machine was kept intact meaning the original machine was not tampered.

All the keys were operated by pneumatically controlled robot fingers mounted on a common support with each finger accurately positioned above each key. Compressed air from an air compressor, controlled by computer selected electromagnetic valve, actuating the fingers, hammered the keys and completed the embossing cycle.

The system is reliable but robust and noisy and the start up time is high as well . The mass production of such a system is not without substantial investment. 

In the revised version, developed at the VECC, a major modification of the original keyboard was done. Taking advantage of the superior embossing quality of the mechanical Perkins Brailler, the machine has been modified. The coding keyboard has been completely replaced by computer actuated electromechanical links. 

The function of carriage return and line feed have been implemented using accurately controlled action of special motors. The printing speed of the modified Brailler is about 2.5 Braille characters per second. The New system is expected to be installed at Blind Boys Academy, Ramkrishna Mission, Calcutta soon.

One should know the importance of undertaking such a project. Today the mass production of books on different subjects and languages for Blind students is done through Braille Press. It is expensive and, unfortunately, the machine at R K Mission is the only one in the Eastern India. 

Besides English, the Press prints books in languages like Assamese, Oriya, Manipuri, Sanskrit and Bengali. As a result there is a shortage of supply in supply of these books.
"The documents produced using the manual Braille Press caters to only 10 per cent of the demand," says a Maharaj of Blind Boys' Academy. 

The manual Perkins Brailler is much cheaper and thus Blind academies are provided with a few Perkins Brailler. But the process of making a one-page document using such a machine is not only painstaking, error prone and time consuming but also requires special training in Braille coding. 

In the computerised system data in any language can be stored, corrected and finally transferred into appropriate Braille code by Translator Program. This accompanied with error free and uninterrupted service provided by the system increases the throughput by at least 30 times compared to the manual process.

Now that the computerised Braille Press is within our reach, it is going to improve the supply of textbooks to the visually handicapped. Elaborate plans have been chalked out to indegenise the complete system. 

So, days are not very far when we would find Braille farms equipped with a single computer driving a number of Perkins Brailler, each preparing a different document at the same time.

Published in "The Telegraph", Monday, May 13, 1996.


 




 

Friday, December 16, 2022

আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালের উদ্বোধন


কলকাতায় ২৮ তম আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালের      উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক জগতের তারকাখচিত ব্যক্তিত্ব সমূহের উপস্থিতি।


গতকাল বিকেলে টেলিভিশনের পর্দায়, কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে মন ভরে গেল। 

মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এ রাজ্যের নব নিযুক্ত স্বয়ং রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস মহাশয়। তাঁর স্বল্প কথার ভাষণ প্রশংসার দাবি রাখে। বিগ বি-র বাংলা এবং বাদশা শাহরুখের সংলাপে, তিন বছর বাদে, যেন স্বধর্মে ফিরেছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। দেশি-বিদেশি অতিথিদের সামনে ভারত ও বাংলার চলচ্চিত্রের ইতিহাস-গাথার নানা উজ্জ্বল দিক তুলে ধরেছেন বিগ বি। বাদশা খান, শাহরুখের  স্বল্প দু-চার কথায় ও বচ্চন সাহেবের  দীর্ঘ বক্তৃতায় দেশে একনায়কতন্ত্রের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত সহজেই ধরা পড়েছে। কিং খানের কথায় উঠে আসে, ইতিমধ্যে সমাজমাধ্যমে বয়কটের ডাক ওঠা 'পাঠান' ছবির সংলাপের  বিশেষ অংশ -  "ম্যায় আপ অউর সব পজিটিভ লোক  জিন্দা হ্যায়।"  

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর বক্তৃতায় বলেন, যে সিনেমা এবং সঙ্গীত, বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম। পশ্চিমবাঙলা, বলিউড ও হলিউডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। তিনি অমিতাভ বচ্চনকে ভারতরত্ন দেওয়ার দাবি তোলেন। "যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, তবে বাংলা থেকে আমরা অমিতাভ বচ্চনকে এত দীর্ঘ সময়ের চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ভারতরত্ন প্রদানের দাবি তুলব," তিনি বলেন। উৎসবের অঙ্গ হিসেবে, বচ্চনের জীবন ও কাজ তুলে ধরা হবে বলে মন্তব্য করেন।

৫২টি শর্টস এবং ডকুমেন্টারি সহ ৪২টি দেশের মোট ১৮৩টি চলচ্চিত্র, ১০টি প্রেক্ষাগৃহে সিনেফিলদের জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শিত হবে।

জয়া বচ্চন, রানি মুখার্জি, মহেশ ভাট, অরিজিৎ সিং, কুমার সানু, শত্রুঘ্ন সিনহা এবং সৌরভ গাঙ্গুলী সহ  আরও বেশ কয়েকজন সুপারস্টার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও শিল্পী জগতের পুরনো দিনের সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় রঞ্জিত মল্লিক থেকে শুরু করে আজকের নায়ক নায়িকাদের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। 

"কলকাতা ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী" হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। এই খেতাবের তকমা বাম আমলে আস্তে আস্তে স্তিমিত হতে হতে শেষদিকে প্রায় তলানিতে ঠেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ক্ষমতায় এসে, সেই  অবনমনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছেন।

যে কোনও সরকারই নিজস্ব পছন্দের বৃত্ত গড়ে নেয়। বৃত্তের বাইরে যাঁরা, তাঁরা অনেক সময় 'ব্রাত্য' হয়ে পড়েন। তবে এমন কিছু বিষয় থাকে, যেখানে কোনোরকম ভেদরেখার গোঁড়ামি ধৃষ্টতা। বাম জমানার ৩৪ বছরে তার কিছু প্রকাশ আমরা দেখেছি। মুক্তকন্ঠে বলব, বাঙালির আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে মমতা সেই বেড়া ভাঙার প্রমাণ দিয়েছেন বারবার। বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু তার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। সে আলোচনায় পরে আসছি।

উত্তমকুমার  হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের  কথা ধরা যাক। উত্তমবাবুর মৃত্যু হয় ১৯৮০ সালে, যখন বাম আমলের সবে শুরু। হেমন্তবাবুর প্রয়াণ ১৯৮৯ সালে, যখন বাম জমানার শাসন মধ্যগগনে। সেই সব সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। তাঁর মন্ত্রীসভার সংস্কৃতির দায়িত্বে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।  উত্তমকুমার বা হেমন্তবাবুর জনপ্রিয়তা রাজনীতির নায়ক জ্যোতিবাবু, বা প্রমোদ দাশগুপ্তের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল না। দু'জনের কেউই ক্ষমতাসীন বামেদের "কাছের লোক" বলে চিহ্নিত ছিলেন না। এমন খ্যাতনামা শিল্পীদের প্রয়াণে কী ছিল বামপন্থী সরকারের ভূমিকা ?

ফিরে আসি বছর দুয়েক আগে, কোভিদের সময়, সম্পূর্ণ বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী সৌমিত্রের প্রয়াণের কথায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শোকযাত্রা কেন্দ্র করে মমতার ভূমিকা। বিদ্বজ্জনের একাংশ সৌমিত্রের শোকযাত্রায় তাঁর তদারকির সর্বক্ষণের উপস্থিতিতে দৃশ্যত অখুসী ছিলেন। এ কথা ঠিক যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্টদের অধিকাংশের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই যোগাযোগ রক্ষা করে আসছেন। এটা তাঁর স্বভাবজাত। কিন্ত ঘোষিত ভাবে মমতা-বিরোধী অবস্থান নিয়ে চলেন যাঁরা, তাঁদেরও অনেকের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের খবর মুখ্যমন্ত্রী নিয়মিত রেখে এসেছেন। দরকারে হাত বাড়াতে দ্বিধা করেননি। এটা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটা মমতা স্তুতি নয়। কেউ কেউ এতে রাজনীতির উপাদান খুঁজে পেলেও সত্যি বদলায় না।



Sunday, December 4, 2022

জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতিতে গৃহকর্মে নিপুণা নারীর অসামান্য অবদান


জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতিতে গৃহকর্মে নিপুণা নারীর                                অসামান্য অবদান 

Statesman এমন একটা দৈনিক যেখানে ওই ১২ পৃষ্ঠার পরিসরে খবর ছাড়াও supplementary হিসাবে প্রায় প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পুস্তক পরিচিতি, ব্যবসা, আইন-আদালত, কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সংক্রান্ত খবর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন এবং, সমসাময়িক ঘটনাকে ঘিরে বিশেষজ্ঞদের লেখা, বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।   

সম্প্রতি আইন-আদালত সংক্রান্ত একটি মামলার ব্যাপারে আইনের ছাত্রী এলসা মুস্তাফার "আইন থেকে সামান্য সুরক্ষা সহ" নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে তা শুধুমাত্র আকর্ষণীয় নয় বরং রীতিমত কপালে চিন্তার ভাঁজের উদ্রেককারী। ঘটনাটি গার্হস্থ্য হিংসার একটি ঘটনায় বম্বে হাইকোর্টের একটি পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে। দাম্পত্য জীবনের শান্তি-স্বাচ্ছন্দ্যের উপরই জীবনের ভারসাম্য রক্ষিত। ওই জীবনটাকে যার যত ফাঁকি আর ফাঁকা, তার মূর্তিটা তত বিকৃত আর সামঞ্জস্যহীন। ঘটনাটা এমনই এক    বিকৃত চরিত্রের গৃহকর্তার কর্মকান্ড কেন্দ্র করে।

বাদী পক্ষের সওয়ালটা এরকম, "যদি তাঁর গৃহস্থালির কাজকর্ম করার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তাকে বিয়ের আগে বলা উচিত ছিল যাতে গৃহকর্তা নিজেই বিয়ের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারতেন......" বম্বে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ domestic violence অর্থাৎ গার্হস্থ্য সহিংসতার ঘটনা শুধুমাত্র নারীবাদীদেরই নয়, এমনকি লিঙ্গ ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী অন্যদেরও হতবাক করেছে। পর্যবেক্ষণগুলি আমাদের সমাজে ব্যাপক পিতৃতন্ত্রকে প্রতিফলিত করে এবং অবশ্যই বিচারকরা, যাঁরা দেবদূত নন, বরং সমাজেরই অংশ এবং আমাদের বেশিরভাগের মতোই পুরুষতান্ত্রিক, তাঁরাও হতবাক। এই পর্যবেক্ষণগুলি আবারও গৃহস্থালীর কাজ সম্পর্কে বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে। গৃহস্থালির কাজকর্মের উৎপাদনশীলতার দিকটা অস্বীকার করে অর্থনীতির একটা স্বীকৃত তত্ত্বকে প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। 

এটা অত্যন্ত লজ্জার যে আমরা যখন আমাদের নারীদের দেবী হিসাবে গণ্য করি তখন আমরা সমান অধিকার ও মর্যাদা দিতে অস্বীকার করি? তিনি কি এখনও একজন দাসী যাঁর একমাত্র অধিকার হল আন্তরিকতার সাথে শুধুমাত্র গৃহিণী হিসাবে দায়িত্ব পালন করা এবং গৃহস্থালির পুরো ভার নেওয়া? দেখা যাচ্ছে যে সমাজে গৃহস্থালী নারীর অবদান অর্থনৈতিক মূল্যের বিচারে কিছুই নয়।

বীরপুঙ্গবদের এটা মনে রাখা উচিত যে বাড়ির বাইরের কাজেও মহিলারা কতটা এবং কতদূর সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। উপরের ছবির কোলাজই তার যথাযথ সাক্ষ্য বহন করছে।

 যাইহোক, এই "অদৃশ্য নারী" সমস্যাটির মূলে রয়েছে অ্যাডাম স্মিথের পথপ্রদর্শক আধুনিক অর্থনীতি। আধুনিক অর্থনীতির জনক, অ্যাডাম স্মিথ, (১৭৩০-১৭৯০) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Wealth of a Nation বা জাতির সম্পদ"-এ বলেছেন যে, "আমরা রুটি, গরুর মাংস এবং সুরার জোগান পাই যথাক্রমে রুটি প্রস্তুতকারক, কসাই এবং মদ প্রস্তুতকারকের কল্যাণের অনুগ্রহে নয়, বরং তাঁদের লাভের উদ্দেশ্যের কারণে।"

কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে রুটি, গরুর মাংস এবং সুরা, প্রক্রিয়াজাত কাঁচামাল। ফলে রান্না এবং পরিবেশন না করা পর্যন্ত তা খাবার অযোগ্য। ফলস্বরূপ, তিনি তাঁর বৃদ্ধা মহৎ মায়ের ভূমিকাকে চিনতে ভুলে গিয়েছিলেন, যিনি শেষ নিঃশ্বাস অবধি তাঁকে সযত্নে লালনপালন করেছিলেন, লাভের জন্য নয়, বরং ভালবাসা এবং স্নেহ থেকে তাঁর খাবার রান্না এবং পরিবেশন করেছিলেন বলেই তিনি অ্যাডাম স্মিথ হতে পেরেছিলেন। 

তাই আধুনিক অর্থনীতি যুক্তিবাদী, স্বার্থপর এবং মুনাফা অর্জনকারী অর্থনৈতিক পুরুষের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়, নারীর নয়। সুতরাং, আধুনিক অর্থনীতি হল অর্ধেক মানুষের  জন্য যা নারীর অস্তিত্বকে বাদ দেয় ("কে বা কারা অ্যাডাম স্মিথের ডিনার রান্না করতেন? ২০১২ সালে ক্যাট্রিন মার্কালের লেখা নারী ও অর্থনীতির গল্প")। অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজগুলো নারীরা না করলে অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে। যেমন, মা যদি সময়মতো খাবার তৈরি না করেন, বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না, বাবা অফিসে যেতে পারে না ইত্যাদি।

যাইহোক, অসংগঠিত ক্ষেত্রে করা এই ধরনের অবৈতনিক কাজগুলি জিডিপিতে গণনাভুক্ত করা হয় না। এটা শুধুমাত্র অনৈতিক নয়, অগণতান্ত্রিক এবং অমানবিক।

প্রতিটি সমাজে কিছু নিয়ম আছে যার দ্বারা একটি পরিবার কাজ করে। একটি মৌলিক প্রাথমিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে, বিবাহ এবং পরিবার সন্তান জন্মদান এবং লালনপালনের নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণ করে যা সামাজিক এবং ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের মহিলা সদস্যদের উপর আরোপিত হয়, যদিও আজকের ছোট্ট পরিবারে, যাকে বলে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, সেখানে গৃহস্থালীর কাজগুলো স্ত্রী এবং স্বামী, উভয়ই পারস্পরিকভাবে ভাগ করে নিতে বাধ্য হয় এবং সেটা উচিতও বটে। 

কাজেই অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতির একপেশে ধারণার খোল নলচে পাল্টানোর দরকার। সামান্য দেখে নেওয়া যাক অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতির ভ্রান্ত দিকগুলো:

অর্থনীতি বিজ্ঞানে স্মিথের সংজ্ঞা খুবই সংকীর্ণ অর্থাৎ সীমাবদ্ধ ছিল। স্মিথিয়ান সংজ্ঞা আমাদের মানব জীবনের একমাত্র বস্তুগত দিকের উপর জোর দিতে পরিচালিত করে। সর্বোপরি সম্পদের বিজ্ঞান হিসাবে, এটি অর্থের প্রতি স্বার্থপরতা এবং ভালবাসা শেখায়। সমাজ সংস্কারকরা এটিকে 'নিঃস্ব বিজ্ঞান' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মানব জীবনের অ-বস্তুগত দিক, মূলত মানব কল্যাণের দিকটি অ্যাডাম স্মিথ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন। ফলে তাঁর প্রণীত অর্থনীতির তত্ব পরবর্তীকালে বিপুল সমালোচনার মুখে পড়ে। এই প্রবন্ধে অর্থনীতির বিষদ আলোচনার সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই। তদুপরি আমি বিশেষজ্ঞ নই। শুধুমাত্র মূল বিষয়ের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যতটুকু দরকার বলে মনে হয়েছে, ঠিক ততটুকুই আলোচনা করেছি।


যাঁরা অ্যাডাম স্মিথের সংজ্ঞার সংস্কারের পথে হাঁটলেন তাঁদের মধ্যে প্রথমে হলেন আলফ্রেড মার্শাল। (১৮৪২-১৯২৪) তাঁর বক্তব্য ছিল যে অর্থনীতি শাস্ত্র অবশ্যই  সম্পদের অধ্যয়ন, কিন্ত অন্যদিকে, সম্পদের উপর ভিত্তি করে মানব কল্যাণের অধ্যয়নের দিকটার ওপরেও আলোকপাতের প্রয়োজন অনস্বীকার্য

এর পরের ধাপে সংজ্ঞার পরিমার্জনে যাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনি হলেনলিয়োনেল রবিন্স। (১৮৯৮-১৯৮৪) তাঁর সংজ্ঞায় দুষ্প্রাপ্য সম্পদের বিকল্প ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনের উপকরণগুলো বিকল্প ব্যবহারযোগ্য।

 মানুষের অভাব অসীম; কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ বা সম্পদ সীমিত। তাই সমস্যা হ'ল সসীম সম্পদের সাহায্যে কিভাবে অসীম অভাব পূরণ করা যায়। দুষ্প্রাপ্য সম্পদের বিকল্প ব্যবহারের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক এক খন্ড জমি যেখানে পাট চাষও করা যায়, আবার মাছের চাষ করাও সম্ভব অর্থাৎ বিকল্প ব্যবস্থা আছে। এখানেই অগ্রাধিকারের প্রশ্ন আসে। কারণ একই জমিতে এক সঙ্গে দুটো করা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নেবার সময় দেখে নেওয়া প্রয়োজন ঐ সময়ের জন্য অগ্রাধিকারের তালিকায় কোনটি লাভজনক।

মার্কিন অর্থনীতিবিদ এবং ১৯৭০ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী পল স্যামুয়েলসন (১৯১৫-২০০৯) এমন একটি অর্থনৈতিক মডেলের প্রবর্তন করেন যেখানে কোনোরকম আর্থিক লেনদেন নেই। কল্যাণমূলক অর্থনীতিতে  এটা একটা যুগান্তকারী ভাবনা ছিল। কারণ মানুষের কল্যাণেরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য আছে যা জাতীয় আয়ের (GNP) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

তিনি Net Economic Welfare (NEW) অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণ নাম দিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন ধারণার অবতারনা করলেন। 

NEW হ'ল মোট জাতীয় আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সত্যিকারের আর্থিক লেনদেনের বাইরে, মানব কল্যাণের জন্য একটা মূল্য নির্ধারণ করা। এবং সেটা জাতীয় আয়ের মধ্যে জুড়ে দেওয়া।দুটি সহজবোধ্য উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা বুঝতে পারা যাবে।

১) ধনী হওয়ার সাথে সাথে, সাধারণত, আমরা আরও আয়ের চেয়ে অবসর বা অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক জীবন কাটাতে ভালবাসি। আমরা যখন অবসরের জন্য বেশি সময় বরাদ্দ করি, তখন আর্থিক লেনদেনের নিরিখে মোট জাতীয় উৎপাদন কমে যেতে পারেকিন্তু মনের সন্তুষ্টি অবশ্যই বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক মাককাঠিতে তার একটা মূল্য আছে। কাজেই GNP নির্ধারণ করার সময়, সন্তুষ্টির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২) দ্বিতীয় উদাহরণটি প্রাসঙ্গিক আলোচনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে আছে। বাড়িতে গৃহস্থালির যাবতীয় কাজে বাড়ির মহিলাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জিএনপি গণনা করার সময় এটি বিবেচনা করা হয় না। জিএনপি হিসেব করার সময় এটি আমাদের অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সমস্ত কিছু বিবেচনার মধ্যে ধরলে যে কোনও দেশের সঠিক GNP-র পরিমাপ আমরা নির্ধারণ করতে পারব। 

 স্যামুয়েলসনের কথায়, "সমাজে কে কাকে কতটা খয়রাতি দেয়, এই প্রসঙ্গে সে কথা না বললেই নয়। দেশের সম্পদ তৈরিতে শ্রমের অবদান সবাই স্বীকার করেন, তা-ই 'শ্রম' রোজগারের সমার্থক শব্দ। কিন্ত সত্যিই কি তাই? মহিলারা দৈনিক পাঁচ ঘন্টা বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজ করেন। তার ভিত্তিতেই সমাজ ও অর্থনীতি চলতে থাকে। এটা সবাই জানেন, শুধু দেশের হিসাবের খাতায় স্বীকৃত হয় না। মেয়েদের দৃষ্টিতে সেটাও দেশকে তাঁদের খয়রাতি। দেশ, অর্থনীতি ও সমাজকে সবচেয়ে বেশি খয়রাতি দেন মেয়েরাই,সেটা সরকারি নীতির ভাষায় প্রকাশ পায় না।"

নারীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাঁদের    অবদানের জন্য অবশ্যই যথাযথ অর্থ প্রদান করতে হবে। স্নেহ এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে করা গৃহস্থালী কাজের জন্য অর্থ প্রদান না করাটা সামাজিক অপরাধ বলেই গণ্য হওয়া উচিৎ।

 অ্যাডাম স্মিথ থেকে শুরু করে পরের যে সব দিকপাল অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা আলোচনা করা হ'ল তাঁদের প্রত্যেকের অবদান শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পারস্পরিক পরিপূরক। 

একটি পরিসংখ্যান দিয়ে আলোচনায় ইতি টানব। "ওমেনস ইকোনমিক কন্ট্রিবিউশন কেস স্টাডি ২০০৯"  শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছিল যে মহিলাদের অবৈতনিক পরিষেবার অর্থনৈতিক মূল্য বার্ষিক $ ৬১২.৮ বিলিয়ন ডলার। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আর্থার সিসিল পিগো ঠিক এক শতাব্দী আগে খেদোক্তি করেছিলেন যে জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে স্ত্রীদের গৃহস্থালীর কাজ বিবেচনা করা হয় না।

GDP- Gross Domestic Product

GNP- Gross National Product

ঋণস্বীকার: 

১) Statesman Article entitled "With little protection from the law" by Elsa Mustafa.....Are wives meant just for household work ! 17/11/22

২) Letters to Editor, 19/11/22, entitled, "Women's role unrecognised". by Samares Kumar Das.