কলকাতায় ২৮ তম আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক জগতের তারকাখচিত ব্যক্তিত্ব সমূহের উপস্থিতি।
মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এ রাজ্যের নব নিযুক্ত স্বয়ং রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস মহাশয়। তাঁর স্বল্প কথার ভাষণ প্রশংসার দাবি রাখে। বিগ বি-র বাংলা এবং বাদশা শাহরুখের সংলাপে, তিন বছর বাদে, যেন স্বধর্মে ফিরেছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। দেশি-বিদেশি অতিথিদের সামনে ভারত ও বাংলার চলচ্চিত্রের ইতিহাস-গাথার নানা উজ্জ্বল দিক তুলে ধরেছেন বিগ বি। বাদশা খান, শাহরুখের স্বল্প দু-চার কথায় ও বচ্চন সাহেবের দীর্ঘ বক্তৃতায় দেশে একনায়কতন্ত্রের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত সহজেই ধরা পড়েছে। কিং খানের কথায় উঠে আসে, ইতিমধ্যে সমাজমাধ্যমে বয়কটের ডাক ওঠা 'পাঠান' ছবির সংলাপের বিশেষ অংশ - "ম্যায় আপ অউর সব পজিটিভ লোক জিন্দা হ্যায়।"
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর বক্তৃতায় বলেন, যে সিনেমা এবং সঙ্গীত, বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম। পশ্চিমবাঙলা, বলিউড ও হলিউডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। তিনি অমিতাভ বচ্চনকে ভারতরত্ন দেওয়ার দাবি তোলেন। "যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, তবে বাংলা থেকে আমরা অমিতাভ বচ্চনকে এত দীর্ঘ সময়ের চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ভারতরত্ন প্রদানের দাবি তুলব," তিনি বলেন। উৎসবের অঙ্গ হিসেবে, বচ্চনের জীবন ও কাজ তুলে ধরা হবে বলে মন্তব্য করেন।
৫২টি শর্টস এবং ডকুমেন্টারি সহ ৪২টি দেশের মোট ১৮৩টি চলচ্চিত্র, ১০টি প্রেক্ষাগৃহে সিনেফিলদের জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শিত হবে।
জয়া বচ্চন, রানি মুখার্জি, মহেশ ভাট, অরিজিৎ সিং, কুমার সানু, শত্রুঘ্ন সিনহা এবং সৌরভ গাঙ্গুলী সহ আরও বেশ কয়েকজন সুপারস্টার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও শিল্পী জগতের পুরনো দিনের সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় রঞ্জিত মল্লিক থেকে শুরু করে আজকের নায়ক নায়িকাদের অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
"কলকাতা ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী" হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। এই খেতাবের তকমা বাম আমলে আস্তে আস্তে স্তিমিত হতে হতে শেষদিকে প্রায় তলানিতে ঠেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ক্ষমতায় এসে, সেই অবনমনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছেন।
যে কোনও সরকারই নিজস্ব পছন্দের বৃত্ত গড়ে নেয়। বৃত্তের বাইরে যাঁরা, তাঁরা অনেক সময় 'ব্রাত্য' হয়ে পড়েন। তবে এমন কিছু বিষয় থাকে, যেখানে কোনোরকম ভেদরেখার গোঁড়ামি ধৃষ্টতা। বাম জমানার ৩৪ বছরে তার কিছু প্রকাশ আমরা দেখেছি। মুক্তকন্ঠে বলব, বাঙালির আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে মমতা সেই বেড়া ভাঙার প্রমাণ দিয়েছেন বারবার। বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু তার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। সে আলোচনায় পরে আসছি।
উত্তমকুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথা ধরা যাক। উত্তমবাবুর মৃত্যু হয় ১৯৮০ সালে, যখন বাম আমলের সবে শুরু। হেমন্তবাবুর প্রয়াণ ১৯৮৯ সালে, যখন বাম জমানার শাসন মধ্যগগনে। সেই সব সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। তাঁর মন্ত্রীসভার সংস্কৃতির দায়িত্বে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। উত্তমকুমার বা হেমন্তবাবুর জনপ্রিয়তা রাজনীতির নায়ক জ্যোতিবাবু, বা প্রমোদ দাশগুপ্তের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল না। দু'জনের কেউই ক্ষমতাসীন বামেদের "কাছের লোক" বলে চিহ্নিত ছিলেন না। এমন খ্যাতনামা শিল্পীদের প্রয়াণে কী ছিল বামপন্থী সরকারের ভূমিকা ?
ফিরে আসি বছর দুয়েক আগে, কোভিদের সময়, সম্পূর্ণ বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী সৌমিত্রের প্রয়াণের কথায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শোকযাত্রা কেন্দ্র করে মমতার ভূমিকা। বিদ্বজ্জনের একাংশ সৌমিত্রের শোকযাত্রায় তাঁর তদারকির সর্বক্ষণের উপস্থিতিতে দৃশ্যত অখুসী ছিলেন। এ কথা ঠিক যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্টদের অধিকাংশের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই যোগাযোগ রক্ষা করে আসছেন। এটা তাঁর স্বভাবজাত। কিন্ত ঘোষিত ভাবে মমতা-বিরোধী অবস্থান নিয়ে চলেন যাঁরা, তাঁদেরও অনেকের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের খবর মুখ্যমন্ত্রী নিয়মিত রেখে এসেছেন। দরকারে হাত বাড়াতে দ্বিধা করেননি। এটা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটা মমতা স্তুতি নয়। কেউ কেউ এতে রাজনীতির উপাদান খুঁজে পেলেও সত্যি বদলায় না।

No comments:
Post a Comment