Statesman এমন একটা দৈনিক যেখানে ওই ১২ পৃষ্ঠার পরিসরে খবর ছাড়াও supplementary হিসাবে প্রায় প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পুস্তক পরিচিতি, ব্যবসা, আইন-আদালত, কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সংক্রান্ত খবর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন এবং, সমসাময়িক ঘটনাকে ঘিরে বিশেষজ্ঞদের লেখা, বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
সম্প্রতি আইন-আদালত সংক্রান্ত একটি মামলার ব্যাপারে আইনের ছাত্রী এলসা মুস্তাফার "আইন থেকে সামান্য সুরক্ষা সহ" নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে তা শুধুমাত্র আকর্ষণীয় নয় বরং রীতিমত কপালে চিন্তার ভাঁজের উদ্রেককারী। ঘটনাটি গার্হস্থ্য হিংসার একটি ঘটনায় বম্বে হাইকোর্টের একটি পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে। দাম্পত্য জীবনের শান্তি-স্বাচ্ছন্দ্যের উপরই জীবনের ভারসাম্য রক্ষিত। ওই জীবনটাকে যার যত ফাঁকি আর ফাঁকা, তার মূর্তিটা তত বিকৃত আর সামঞ্জস্যহীন। ঘটনাটা এমনই এক বিকৃত চরিত্রের গৃহকর্তার কর্মকান্ড কেন্দ্র করে।
বাদী পক্ষের সওয়ালটা এরকম, "যদি তাঁর গৃহস্থালির কাজকর্ম করার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তাকে বিয়ের আগে বলা উচিত ছিল যাতে গৃহকর্তা নিজেই বিয়ের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারতেন......" বম্বে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ domestic violence অর্থাৎ গার্হস্থ্য সহিংসতার ঘটনা শুধুমাত্র নারীবাদীদেরই নয়, এমনকি লিঙ্গ ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী অন্যদেরও হতবাক করেছে। পর্যবেক্ষণগুলি আমাদের সমাজে ব্যাপক পিতৃতন্ত্রকে প্রতিফলিত করে এবং অবশ্যই বিচারকরা, যাঁরা দেবদূত নন, বরং সমাজেরই অংশ এবং আমাদের বেশিরভাগের মতোই পুরুষতান্ত্রিক, তাঁরাও হতবাক। এই পর্যবেক্ষণগুলি আবারও গৃহস্থালীর কাজ সম্পর্কে বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে। গৃহস্থালির কাজকর্মের উৎপাদনশীলতার দিকটা অস্বীকার করে অর্থনীতির একটা স্বীকৃত তত্ত্বকে প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এটা অত্যন্ত লজ্জার যে আমরা যখন আমাদের নারীদের দেবী হিসাবে গণ্য করি তখন আমরা সমান অধিকার ও মর্যাদা দিতে অস্বীকার করি? তিনি কি এখনও একজন দাসী যাঁর একমাত্র অধিকার হল আন্তরিকতার সাথে শুধুমাত্র গৃহিণী হিসাবে দায়িত্ব পালন করা এবং গৃহস্থালির পুরো ভার নেওয়া? দেখা যাচ্ছে যে সমাজে গৃহস্থালী নারীর অবদান অর্থনৈতিক মূল্যের বিচারে কিছুই নয়।
বীরপুঙ্গবদের এটা মনে রাখা উচিত যে বাড়ির বাইরের কাজেও মহিলারা কতটা এবং কতদূর সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। উপরের ছবির কোলাজই তার যথাযথ সাক্ষ্য বহন করছে।
যাইহোক, এই "অদৃশ্য নারী" সমস্যাটির মূলে রয়েছে অ্যাডাম স্মিথের পথপ্রদর্শক আধুনিক অর্থনীতি। আধুনিক অর্থনীতির জনক, অ্যাডাম স্মিথ, (১৭৩০-১৭৯০) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Wealth of a Nation বা জাতির সম্পদ"-এ বলেছেন যে, "আমরা রুটি, গরুর মাংস এবং সুরার জোগান পাই যথাক্রমে রুটি প্রস্তুতকারক, কসাই এবং মদ প্রস্তুতকারকের কল্যাণের অনুগ্রহে নয়, বরং তাঁদের লাভের উদ্দেশ্যের কারণে।"
কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে রুটি, গরুর মাংস এবং সুরা, প্রক্রিয়াজাত কাঁচামাল। ফলে রান্না এবং পরিবেশন না করা পর্যন্ত তা খাবার অযোগ্য। ফলস্বরূপ, তিনি তাঁর বৃদ্ধা মহৎ মায়ের ভূমিকাকে চিনতে ভুলে গিয়েছিলেন, যিনি শেষ নিঃশ্বাস অবধি তাঁকে সযত্নে লালনপালন করেছিলেন, লাভের জন্য নয়, বরং ভালবাসা এবং স্নেহ থেকে তাঁর খাবার রান্না এবং পরিবেশন করেছিলেন বলেই তিনি অ্যাডাম স্মিথ হতে পেরেছিলেন।
তাই আধুনিক অর্থনীতি যুক্তিবাদী, স্বার্থপর এবং মুনাফা অর্জনকারী অর্থনৈতিক পুরুষের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়, নারীর নয়। সুতরাং, আধুনিক অর্থনীতি হল অর্ধেক মানুষের জন্য যা নারীর অস্তিত্বকে বাদ দেয় ("কে বা কারা অ্যাডাম স্মিথের ডিনার রান্না করতেন? ২০১২ সালে ক্যাট্রিন মার্কালের লেখা নারী ও অর্থনীতির গল্প")। অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজগুলো নারীরা না করলে অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে। যেমন, মা যদি সময়মতো খাবার তৈরি না করেন, বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না, বাবা অফিসে যেতে পারে না ইত্যাদি।
যাইহোক, অসংগঠিত ক্ষেত্রে করা এই ধরনের অবৈতনিক কাজগুলি জিডিপিতে গণনাভুক্ত করা হয় না। এটা শুধুমাত্র অনৈতিক নয়, অগণতান্ত্রিক এবং অমানবিক।
প্রতিটি সমাজে কিছু নিয়ম আছে যার দ্বারা একটি পরিবার কাজ করে। একটি মৌলিক প্রাথমিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে, বিবাহ এবং পরিবার সন্তান জন্মদান এবং লালনপালনের নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণ করে যা সামাজিক এবং ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের মহিলা সদস্যদের উপর আরোপিত হয়, যদিও আজকের ছোট্ট পরিবারে, যাকে বলে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, সেখানে গৃহস্থালীর কাজগুলো স্ত্রী এবং স্বামী, উভয়ই পারস্পরিকভাবে ভাগ করে নিতে বাধ্য হয় এবং সেটা উচিতও বটে।
কাজেই অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতির একপেশে ধারণার খোল নলচে পাল্টানোর দরকার। সামান্য দেখে নেওয়া যাক অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতির ভ্রান্ত দিকগুলো:
অর্থনীতি বিজ্ঞানে স্মিথের সংজ্ঞা খুবই সংকীর্ণ অর্থাৎ সীমাবদ্ধ ছিল। স্মিথিয়ান সংজ্ঞা আমাদের মানব জীবনের একমাত্র বস্তুগত দিকের উপর জোর দিতে পরিচালিত করে। সর্বোপরি সম্পদের বিজ্ঞান হিসাবে, এটি অর্থের প্রতি স্বার্থপরতা এবং ভালবাসা শেখায়। সমাজ সংস্কারকরা এটিকে 'নিঃস্ব বিজ্ঞান' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মানব জীবনের অ-বস্তুগত দিক, মূলত মানব কল্যাণের দিকটি অ্যাডাম স্মিথ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন। ফলে তাঁর প্রণীত অর্থনীতির তত্ব পরবর্তীকালে বিপুল সমালোচনার মুখে পড়ে। এই প্রবন্ধে অর্থনীতির বিষদ আলোচনার সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই। তদুপরি আমি বিশেষজ্ঞ নই। শুধুমাত্র মূল বিষয়ের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যতটুকু দরকার বলে মনে হয়েছে, ঠিক ততটুকুই আলোচনা করেছি।
যাঁরা অ্যাডাম স্মিথের সংজ্ঞার সংস্কারের পথে হাঁটলেন তাঁদের মধ্যে প্রথমে হলেন আলফ্রেড মার্শাল। (১৮৪২-১৯২৪) তাঁর বক্তব্য ছিল যে অর্থনীতি শাস্ত্র অবশ্যই সম্পদের অধ্যয়ন, কিন্ত অন্যদিকে, সম্পদের উপর ভিত্তি করে মানব কল্যাণের অধ্যয়নের দিকটার ওপরেও আলোকপাতের প্রয়োজন অনস্বীকার্য
এর পরের ধাপে সংজ্ঞার পরিমার্জনে যাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনি হলেনলিয়োনেল রবিন্স। (১৮৯৮-১৯৮৪) তাঁর সংজ্ঞায় দুষ্প্রাপ্য সম্পদের বিকল্প ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনের উপকরণগুলো বিকল্প ব্যবহারযোগ্য।
মানুষের অভাব অসীম; কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ বা সম্পদ সীমিত। তাই সমস্যা হ'ল সসীম সম্পদের সাহায্যে কিভাবে অসীম অভাব পূরণ করা যায়। দুষ্প্রাপ্য সম্পদের বিকল্প ব্যবহারের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক এক খন্ড জমি যেখানে পাট চাষও করা যায়, আবার মাছের চাষ করাও সম্ভব অর্থাৎ বিকল্প ব্যবস্থা আছে। এখানেই অগ্রাধিকারের প্রশ্ন আসে। কারণ একই জমিতে এক সঙ্গে দুটো করা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নেবার সময় দেখে নেওয়া প্রয়োজন ঐ সময়ের জন্য অগ্রাধিকারের তালিকায় কোনটি লাভজনক।স্যামুয়েলসনের কথায়, "সমাজে কে কাকে কতটা খয়রাতি দেয়, এই প্রসঙ্গে সে কথা না বললেই নয়। দেশের সম্পদ তৈরিতে শ্রমের অবদান সবাই স্বীকার করেন, তা-ই 'শ্রম' রোজগারের সমার্থক শব্দ। কিন্ত সত্যিই কি তাই? মহিলারা দৈনিক পাঁচ ঘন্টা বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজ করেন। তার ভিত্তিতেই সমাজ ও অর্থনীতি চলতে থাকে। এটা সবাই জানেন, শুধু দেশের হিসাবের খাতায় স্বীকৃত হয় না। মেয়েদের দৃষ্টিতে সেটাও দেশকে তাঁদের খয়রাতি। দেশ, অর্থনীতি ও সমাজকে সবচেয়ে বেশি খয়রাতি দেন মেয়েরাই,সেটা সরকারি নীতির ভাষায় প্রকাশ পায় না।"
নারীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাঁদের অবদানের জন্য অবশ্যই যথাযথ অর্থ প্রদান করতে হবে। স্নেহ এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে করা গৃহস্থালী কাজের জন্য অর্থ প্রদান না করাটা সামাজিক অপরাধ বলেই গণ্য হওয়া উচিৎ।
অ্যাডাম স্মিথ থেকে শুরু করে পরের যে সব দিকপাল অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা আলোচনা করা হ'ল তাঁদের প্রত্যেকের অবদান শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পারস্পরিক পরিপূরক।
একটি পরিসংখ্যান দিয়ে আলোচনায় ইতি টানব। "ওমেনস ইকোনমিক কন্ট্রিবিউশন কেস স্টাডি ২০০৯" শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছিল যে মহিলাদের অবৈতনিক পরিষেবার অর্থনৈতিক মূল্য বার্ষিক $ ৬১২.৮ বিলিয়ন ডলার। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আর্থার সিসিল পিগো ঠিক এক শতাব্দী আগে খেদোক্তি করেছিলেন যে জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে স্ত্রীদের গৃহস্থালীর কাজ বিবেচনা করা হয় না।
GDP- Gross Domestic Product
GNP- Gross National Product
ঋণস্বীকার:
১) Statesman Article entitled "With little protection from the law" by Elsa Mustafa.....Are wives meant just for household work ! 17/11/22
২) Letters to Editor, 19/11/22, entitled, "Women's role unrecognised". by Samares Kumar Das.






No comments:
Post a Comment