Monday, February 27, 2023

বন্ধুত্বের বাঁধন

   


                        বন্ধুত্বের বাঁধন

জুলাই মাসের ৩০ তারিখ "আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে স্বীকৃত"  কিন্ত বন্ধুত্ব উদযাপনের কি আদৌ কোনও নির্দিষ্ট দিন হয়? শোলে  সিনেমার সেই বিখ্যাত গান— ‘ইয়ে দোস্তি, হম নেহি তোড়েঙ্গে' আজ আবার মনকে উত্তাল করল। তিন বছর পরে আবার আমরা বন্ধুরা- প্রণব,আশিস, দেবু এবং অবশ্যই আমি, সবাই সস্ত্রীক রাণার বাড়িতে meet করলাম। উদ্যোগটা রাণারই। খাওয়া-দাওয়া তো হলই, কিন্ত যেটা পরম প্রাপ্তি তা হ'ল ছকভাঙা নির্ভেজাল আড্ডা।  এ বয়সে অনেক অনিয়মও হ'ল। কিন্ত শরীরের ওপর এর কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ দেখতে পেলাম না। পাঁচ ঘন্টা যে কোথা দিয়ে কেটে গেল, সত্যিই বুঝতে পারলাম না। আসলে আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ছয় দশক পার হয়ে গেল। বন্ধুত্বের আর একটা নাম হ'ল ধারাবাহিকতা; বুঝতে পারলাম বন্ধুত্ব এক অদ্ভুত রসায়নের নাম। একবার শুরু হলে বিক্রিয়া চলতে থাকে, হয়তো আজীবন। শুধু আনন্দ নয়, বন্ধুত্ব আসলে দুঃখের দিনেরও অবলম্বন; শোক, তাপ থেকে বেরিয়ে আসার উত্তরের জানলা। বন্ধুত্বের স্বাদ যৌবনে একরকম, অনেক সময়েই লাগাম ছাড়া উদ্দাম, আবেগাশ্রিত। সেই বয়সে পাক ধরে যখন বার্ধক্যে উত্তীর্ণ হয় তখন তার বাঁধন একটা অন্য মাত্রা পায়। আসলে বয়স বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীর-স্বাস্থ্য ভাঙতে থাকে। শরীর কমজোরি হয়ে পড়ে, ফলে অজান্তেই মনের মধ্যে একটা নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে চলে। তাই হয়তো বন্ধুত্বের বাঁধন দৃঢ় হয়; আমরা পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সবল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বন্ধুত্ব আবশ্যিক এক ‘ড্রাগ’। বন্ধুত্ব বদলে দেয় জীবনশৈলী, জীবনে আনে ইতিবাচক পরিবর্তন। ছ'দশকের পুরোনো বন্ধুত্ব নিঃশর্ত নির্ভেজাল বন্ধুত্ব। এই সত্যিটা আজ আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিল। ওঠবার আগে অনুপ আর রামনন্দনকে ভিডিও কল করে ধরা হ'ল। আবার সেই রাণার উদ্যোগেই। মানতেই হবে আধুনিক ডিজিটাল যুগে এ এক পরম প্রাপ্তি। আজকের দিনটাকে নথিভুক্ত করে রাখার জন্যই বাড়ি ফিরেই ব্লগে লিখে ফেললাম। একটু বাদেই পোস্ট করে দেব।






Monday, February 13, 2023

পুস্তক পরিচয়

                               পুস্তক পরিচয়


দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের, "তবু পেশাগত  গবেষনার মধ্যে তাঁকে পাওয়া যাবে না" ০৯/০৯/১৯৯৫ তারিখের  আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। ভাইকিং প্রকাশিত সদ্য প্রয়াত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় বিজ্ঞানী, এস চন্দ্রশেখরের  লেখা, "ট্রুথ অ্যান্ড বিউটি"  বইটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে দীপঙ্করবাবু শেষের দিকে দু'একটি অনাবশ্যক বাক্য সংযোজন করেছেন, যার মধ্যে না আছে বিউটি না পুরোপুরি ট্রুথ। বইখানার চতুর্থ অধ্যায়ে নাকি বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ফরাসী গণিতজ্ঞ, পোঁয়াকারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, বিজ্ঞানী যে প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করেন সেটা এই কারণে নয় যে ব্যাপারটা মানুষের কাজে লাগে। বরং এই কারণে যে এতে তিনি আনন্দ পান। দীপঙ্কর বাবুর সংযোজন, "কথাটা মনে রাখার মতো। কারণ এদেশে ছেলে-বুড়ো, সকলের মুখেই আমরা ক্রমাগত বিজ্ঞানের উপকারিতা (অথবা অপকারিতার) কথা শুনে থাকি। ওগুলো আসলে ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্যবসায়ীদর কথা ('সাথে টু পাইস ভি আসবে'),বিজ্ঞানীর নয়।"

আসলে পোঁয়াকারে, চন্দ্রশেখর বা ঐ স্তরের বুদ্ধিজীবী মানুষদের গবেষণার ধারণাকে বলা হয় কিউরিওসিটি ড্রিভেন রিসার্চ, যে সব কিউরিওসিটি বা অনুসন্ধিৎসার  শিকড় চারিয়ে গেছে মননশীলতার অনেক অনেক গভীরে। নিজস্ব প্রতিভা এবং ধারাবাহিক কঠোর অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে তাঁরা কিউরিওসিটিকে পোষ মানিয়েছেন। তাঁরা এটাও জানেন যে এই জাতের রিসার্চের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের নানান ধরনের বীজ  যা দক্ষ হাতের লালনপালনে একদিন ফল দেবে এবং সেটা মানুষের উপকারে আসবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এভাবেই হাত ধরাধরি করে চলে। তাছাড়া ঐসব ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষেরা পেশাগত উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে তাঁদের উপলব্ধির কথা বলেছেন। সুতরাং তাঁদের আনন্দ ও উপলব্ধির মৌলিকতা আর যে কোনও দেশের রাম, শ্যাম, যদু বা দীপঙ্কর বাবুদের মতো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির স্বভাবসিদ্ধ স্বয়ম্ভু আত্মম্ভরি বিজ্ঞানীদের বাস্তববর্জিত বিজ্ঞান সাধনার আনন্দস্ফূর্তি এক জিনিস নয়। গুটিকয়েক ব্যতিক্রম বাদ দিলে শেষোক্ত শ্রেণীর সিংহভাগ বিজ্ঞানীর আনন্দ সীমিত থাকে প্রথম সারির মানুষদের সূত্র ধরে হিসেব-পত্র করা কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশনার মধ্যে। স্বপক্ষ যুক্তি হিসেবে পল ডিরাকের একটি সরস মন্তব্যের অবতারণা করছি : "....It was a good description to say that it was a good game, a very interesting game one could play. Whenever one solved one of the little problems, one could write a paper about it. It was very easy those days for any second-rate physicst to do first rate work...." কাজেই এটা খুবই পরিষ্কার যে, মননশীলতার রকমভেদে প্রকৃতি অধ্যয়নের আনন্দেরও রকমভেদ আছে। হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স আবিষ্কৃত হওয়ার অব্যবহিত পরেই সেটাকে ব্যবহার করে অনেক বিজ্ঞানী ছোটখাট বহু সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পান। আমার মনে হয় তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো নিজেকে হাইজেনবার্গ  ভেবে বসেছিলেন তাই বোধহয় ডিরাকের ওই সরস মন্তব্য। যাইহোক, এ দেশের কচিকাঁচা থেকে শুরু করে ছেলে-বুড়ো-সবাই ক্রমাগত বিজ্ঞানের উপকারিতার কথা যে যানতে চান, তার কারণ, বোধহয় তাঁরা আজীবন শুনে আসছেন, "বিজ্ঞানের সাধনার ফসল সাধারণ মানুষের জীবনের মানকে উন্নত করে। দেখে শুনে তাঁরা ধন্ধে পড়ে যান যে বিজ্ঞান সাধনার আনন্দে মশগুল বিজ্ঞান সাধকরা ঘনঘন দেশে-বিদেশে ঘুরে সেমিনার সভা এবং পকেট গরম করে নিজেদের বেশ রসেবশেই রেখেছেন, অথচ দেশের সাধারণ মানুষের সার্বিক হাল যেখানে ছিল, তার থেকে আরও অনেক নেমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্যানুযায়ী মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index) বলছে যে ১৭৪ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩৪।

আলোচনা করা যাক ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ীদর কথায়। টু-পাইসের জন্য ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসাদার হবার দরকার আছে কি ? ভাল নম্বর পাইয়ে দেবার প্রচেষ্টায় পাড়ায় পাড়ায় যে সব প্রাইভেট কোচিং সেন্টারগুলো গজিয়ে উঠেছে, সেগুলো কি নিঃস্বার্থ বিদ্যা বিতরণের জন্য ? যাইহোক, এর মধ্যে অন্যায়ের কিছু দেখছি না। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষ টু-পাইস করবে, এর মধ্যে বলার ই বা কী আছে ! আর তাছাড়া কমার্সিয়াল ওয়ার্ল্ডের ভোগবাদী অপন্ডিত মানুষরা যখন প্রকৃতি অধ্যয়নের গরিমময় সৌন্দর্য ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত, তখন তাঁদের একটা কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে। তাই শিল্প-বাণিজ্যের চাকা সচল রাখার দায়িত্ব তাঁরাই নিয়েছেন। কারণ সেটি না করলে এদেশের কাতারে কাতারে পন্ডিতদের বাস্তব বর্জিত মৌল বিজ্ঞান অধ্যয়নের আনন্দের খোরাক আসবে কোত্থেকে ? আসলে তথাকথিত বিজ্ঞান মনস্ক উচ্চশিক্ষিত এক ধরণের মানুষের মধ্যে দু'দুটো কাল্পনিক সত্ত্বা সহাবস্থান করে। উন্নততর সম্প্রদায়ভুক্ত মনে করে তাঁরা নিজেদের গুটিয়ে এনেছেন এমন একটা বৃত্তের মধ্যে যেখানে তাঁরা এক একজন মনে করেন আইনস্টাইন। আবার কর্পোরেট পৃথিবীর ব্যস্ততা আর গ্ল্যামারের মোহকেও উপেক্ষা করতে পারেন না। সেখানেও তাঁরা এক একজন রুশী মোদী। আমার মনে হয় এটা এক ধরনের বিকার যাকে বলা হয় অ্যালবার্ট-মোদী সিনড্রোম। 

যাইহোক, একটা উঁচু জাতের ব্যবসার পথ আমার জানা আছে, যেটা একমাত্র বিজ্ঞানীরাই করতে পারেন। পৃথিবীর বিখ্যাত বেশ কিছু বিজ্ঞানীরা আজকাল পপ্যুলার সায়েন্সের বই লিখছেন, যেগুলো বেস্ট সেলার লিস্টের তালিকাভুক্ত থাকছে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর এবং তাদের কাটতিও হাজারে হাজারে। দুরূহ বিজ্ঞানকে চিন্তাশীল অবৈজ্ঞানিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য তাঁদের শতকোটি প্রণাম। বিজ্ঞানকে তাঁরা মনোপলি বলে ভাবেননি। তবে নিজেদের সৃষ্টির ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা তাঁরাও ভেবেছেন বৈকি। স্বপক্ষ যুক্তি হিসেবে Stephen Hawking-এর একটি মন্তব্য পাঠকের কাছে তুলে ধরছি। Hawking সাহেবের লেখা A brief history of time বইটির Acknowledgement-এ উনি মন্তব্য করেছেন, "....Someone told me that each equation I included in the book would halve the sales. I therefore resolved not to have any equation at all....." আমার প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে আন্তরিক অনুরোধ- আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা কেন এই ধরনের বই লিখছেন না ?? তা করলে সব দিক বজায় থাকবে। একাধারে তিনি বিজ্ঞানীও থাকবেন, আবার টু-পাইস করেও অনুন্নত এবং নির্বোধ গোষ্ঠীভুক্ত ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসাদারের বদনাম বহন করতে হবে না এবং প্রকৃতি বুঝতে পারার আনন্দের কিছুটা চিন্তাশীল ফসল অবৈজ্ঞানিক মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে পারবেন। হয়তো বা নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান অধ্যয়নে উদ্বুদ্ধ করতেও পারবেন যাতে তারা ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ারিং বা ব্যবসার পথ না মাড়ায়। অকারণ অনাবশ্যক মন্তব্য করার আগে আমার মনে হয় ভেবে দেখা উচিত, যে সেটা সিরিয়াস, রুচিসম্পন্ন এবং মাটির অনেক কাছাকাছি থাকা বিজ্ঞানীদের ভাবমূর্তি যাতে খাটো না করতে পারে, যদিও বাস্তবজগতে তাঁরা অন্যান্য পেশার মানুষের সামাজিক ভূমিকা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। তাঁরা এমন কথা বলেন না।

Monday, February 6, 2023

লেখাচর্চা

                             লেখাচর্চা

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে অল্প-বিস্তর যোগাযোগ আছে। সেই কারণেই আমার লেখার স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ মেলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জগতের মাল-মসলা থেকে। কোনোটা হয়তো বিজ্ঞানীর জীবনী ঘিরে, আবার কোনোটা হয়তো বিজ্ঞানের আধুনিক কোনও বিষয়কে কেন্দ্র করে। আদতে লেখা আমার পেশা নয়। অকপটে স্বীকার করতে বাধা নেই যে, শিল্প-সাহিত্যে যথেষ্ট উৎসাহ থাকলেও, পেশা হিসেবে সেটা নেবার দুঃসাহস আমার নেই। করণ একটাই  - আর্থিক নিরাপত্তার অভাব। অসাধারণরাই পারেন সেটাকে পেশা হিসেবে নিতে। যাইহোক, তবুও একটা লেখা শেষ হলেই পরের লেখা আমায় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বিজ্ঞান ভিত্তিক কোনও বিষয়কে মনে রেখে, কাগজ, কলম আর অভিদান ছড়িয়ে লেখার জন্য মনোনিবেশ করি। তিন চার বা পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টির মোটামুটি একটা চেহারা খাড়া করে ফেলি। এর পরে চলে কাঠামোর মধ্যে সামর্থ্য মতো সূক্ষ্মতা সংযোজনের পালা। তাতেও সময় নেহাত কম লাগে না। যাইহোক, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন/চার হাজার শব্দের একটি বিজ্ঞান প্রবন্ধ লিখতে আমার সময় লাগে প্রায় দু'আড়াই মাস বা তারও বেশি সময়। কাজেই লেখালেখি যে আমার পেশা নয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি অত্যন্ত অধৈর্য, ছটফটে মানুষ। আমার আত্মীয়-পরিজন, পুরোনো বন্ধু-বান্ধব, সবাই এ কথা জানেন। বিশ্রামের অবসরে মাঝেমধ্যে নিজেকেই বহুবার প্রশ্ন করেছি- সামান্য এতটুকু লেখার জন্য এই দীর্ঘ সময় লেগে থাকার ধৈর্যের উৎসটা কোথায় ? উৎসের সন্ধান আমি অবশ্যই পেয়েছি, একটা নয়, বরং বলব অনেকগুলো। নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ সেগুলোর পর্যালোচনা করার জন্যই এই লেখা।

বহুদিন ধরে মনের মধ্যে আরও একটা মধুর প্রত্যাশা আনাগোনা করেছে, আমাকে সর্বক্ষণ তাড়া করে বেড়িয়েছে - বিজ্ঞান বিষয় ছাড়া অন্য কোনও বিষয় লিখলে কেমন হয় ? কাজটা নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে চেষ্টা করে দেখলে লাভ ছাড়া লোকসানের কিছু নেই। যাইহোক, একই ঢিলে দুই পাখি মারার মতো এই শিরোনামের প্রবন্ধটি বেছে নিলাম। এটা আমার দু'দুটো অভিপ্রায় মেটাতে সাহায্য করবে।

অনেকের সাথে বহু ব্যাপারে আমি সহমত পোষণ করি না। একটা নির্দিষ্ট ব্যাপারে অবশ্যই করি না। প্রায়ই শুনি, "সবাইকার দ্বারা সবকিছু হয় না" আমার মনে হয়েছে  অনেকের দ্বারাই লেখালেখির মতো কিছু কিছু আপাত কঠিন কাজ সম্ভব। প্রয়োজন উদ্যোগের, প্রয়োজন নিষ্ঠা এবং ধৈর্যের, এবং প্রয়োজন আন্তরিক অনুশীলনের। লেখার মূল্য নির্ধারণের ভার পাঠককুলের। অসার্থক লেখার বক্তব্যের মধ্যেও হয়তো প্রথাভাঙা কোনও দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। জনমানসকে আলোড়িত করার উপাদান হয়তো থাকতে পারে। শব্দ ও ভাষার নতুন ধরনের ব্যবহার থাকতে পারে। বিচার করার আরও কত কিছু থাকতে পারে তা আমার জানা নেই। অনেকবার মনে হয়েছে যে আমাদের মতো বিজ্ঞান প্রবন্ধ যাঁরা লেখেন তাঁদের বক্তব্যে নতুন কিছু থাকে কি ? থাকে না বললেই চলে। তবে নতুন যা থাকে, তা হ'ল লেখকের রচনাশৈলী। প্রত্যেক লেখকের ভঙ্গি আলাদা। যেটা বুঝি তা হ'ল, যে সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্য হিসেবে সাজিয়ে গুছিয়ে বিজ্ঞান প্রবন্ধ প্রকাশ করাও খুব সহজ ব্যাপার নয়। বিজ্ঞান প্রবন্ধ সাহিত্যের স্তরে জায়গা করে নেবার জন্য সাবলীল ভাষার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরী। উপযুক্ত শব্দ সঙ্কলন ও তার বিন্যাস- বক্তব্যের পরিসর এবং রূপায়ণের মধ্যে নিহিত থাকে লেখকের সৃজনীশক্তির প্রকাশ। যাইহোক, সব কিছু মিলিয়ে ব্যাপারটা পরীক্ষামূলক ভাবে নেওয়া উচিত। অনেকবার অনেক অচেনা লেখকের, বিশেষ করে বেশ কিছু ছোট গল্প পড়ে ভীষণ ভাল লেগেছে। সীমিত সুযোগের মধ্যে সাধারণ লেখকের অসাধারণ কল্পনার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। মুগ্ধ হয়েছিলাম অ-ভাবিত নতুন টেকনিকের ব্যবহারে, বিষয়বস্তুর অভিনবত্বে এবং উপস্থাপনের সপ্রতিভতায়। ধারণা করতে পারিনি যে সাধারণ কথ্যভাষা ব্যবহার করে এত ঝকঝকে বর্ণনা করা যায়, ভাষাকে এতখানি গতি দিতে পারা যায়। এই লেখাগুলোর মধ্যে পাঠক হিসেবে আনন্দ পেয়েছি। মনে হয়েছে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর না জানি আরও কত আনন্দ হয়েছে। অন্যদিকে নামী লেখকের উপন্যাস পড়েও মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যে বড্ড ফেনিয়ে লেখা হয়েছে অথবা মনে হয়েছে যে এতটা উর্দ্ধশ্বাসে না লিখে ধীরে-মন্থরে লিখলে ঠিক জায়গায় এসে দাঁড়াতো। মোদ্দাকথা, এমনটা ভেবে নেওয়া ভুল যে, প্রথম লেখাটাই স্বীকৃতি পাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বিরল ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আর তাছাড়া জনপ্রিয়তা আর আর সাহিত্য সৃষ্টি সব সময় সমার্থক নয়। আমার মনে হয় লেখার সাহিত্যগুণ নির্ধারিত হয় তাত্ত্বিক বিচারে এবং সেটা করতে পারেন বিশেষজ্ঞরা। জনপ্রিয়তার রায় দেন জনসাধারণ। এর মধ্যেও আবার গোলমেলে ব্যাপার আছে। আমার মতো সাধারণ মানুষেরা ধন্ধে পড়ে যান, যখন তাঁরা দেখেন যে নামী লেখকের সাহিত্যিকতা নির্ভেজাল অশ্লীলতার সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রথমে বিশেষজ্ঞ এবং পরবর্তীকালে জনসাধারণ, উভয়ের কাছেই বিতর্কিত সাহিত্যগুণে বিবেচিত হচ্ছে। আবার বিভূতিভূষণের "পথের পাঁচালির"মতো উপন্যাস কে বটানি বই আখ্যা দিয়ে প্রকাশনায় নিরুৎসাহ দেখাবার মতো প্রকাশকের সংখ্যাও কম নয়। সেখানে নীরদচন্দ্র বা সজনীকান্তের মতো বোদ্ধার প্রয়োজন আছে। সব লেখাকেই প্রথম প্রথম সাফল্য ও জনপ্রিয়তার মূল্য দিতে হয়। কাজেই অতশত না ভেবে মস্তিষ্কের চিন্তা রূপায়ণে মনোনিবেশ করাই শ্রেয় বলে মনে করি।

জনসাধারণের ব্যবহারের উপযুক্ত পত্র-পত্রিকার পাতায় ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখার একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি আছে, অবশ্যই নামটা যদি না কোনো সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তবে নামটা দেখার আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে যে ঝুঁকিটা থেকে যায়, তা হ'ল জনৈক পাঠক-পাঠিকাবৃন্দের লেখনী বেয়ে আসা এক হাত সমালোচনা। কখনও কখনও সমালোচনা মূল প্রবন্ধের দৈর্ঘ্যকেও টেক্কা দেয়। এ ব্যাপারে আমার কিছু ব্যক্তিগত মন্তব্য আছে। সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনা ত্রুটি সংশোধনের সহায়ক এবং অনেক ক্ষেত্রে সাহিত্যগুণে উত্তীর্ণ হওয়ায় পঠনে উপভোগ্য,  তা বাংলা ইংরেজি, যে কোনও ভাষাতেই হোক না কেন। যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা মূল প্রবন্ধের অপূর্ণতাকে অনেকাংশেই পূর্ণতা দানের সাহায্য করে উৎসাহী পাঠক-পাঠিকার কাছে সেটাকে আরও আকর্ষণীও করে তোলে। পাঠকের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার মধ্যে অনুভূত হয় এক অনির্বচনীয় আনন্দ। মোদ্দা কথা, সংযত এবং নিরপেক্ষ সমালোচনা সব সময়ই লাভজনক- তা লেখার অনুকূল বা প্রতিকূল, যাই হোক না কেন। অনুকূল সমালোচনার বাড়তি লাভ হল লেখকের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধির উপর আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠতে সাহায্য করা। এছাড়া এক অমূল্য সম্পদে পুরস্কৃত হবার অনুভূতি আছে। এটা একটা নতুন জাতের স্বাদ।

মুখে অনেক কিছু বলা যায়। জনসমাবেশে নেতা বা নেতৃদের, আঞ্চলিক মানুষদের সাক্ষী রেখে অঙ্গীকারবদ্ধ বক্তৃতার সঙ্গে বাস্তব মেলাতে গেলে সেটা প্রমাণ করতে অসুবিধে হয় না। কিন্ত লিখিত কিছু বলার মধ্যে একটা নৈতিক দায়িত্ব আছে।  প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার পৃষ্ঠাগুলো দেশে-বিদেশে কয়েক হাজার জোড়া চোখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাজেই সেই  সব পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপানোর মধ্যে ব্যক্তিগত ভাবে এক ধরনের গুরুতর দায়িত্বের স্বীকৃতি অনুভব করা যায়। এ ছাড়া অনুভব করা যায় আনন্দ-শঙ্কা মেশানো এক ধরনের উদ্বেগ যার চূড়ান্ত ফল নতুন এক আলাদা জাতের আনন্দানুভূতি। লেখালেখি হ'ল শব্দ-শিল্পের চর্চা।  লেখকের কলমেই নতুন নতুন শব্দ তৈরি হয়ে ভাষার মূল স্রোতে মিশে যায়। শব্দ জনপ্রিয় হলে সেগুলো একদিন অভিধানে জায়গা করে নেয়। উপযুক্ত শব্দ, ভাষার উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির সহায়ক।

নামজাদা পত্রিকায় লেখার বাড়তি যে আকর্ষণ আছে- সেটা হ'ল রীতিমত ভাল অঙ্কের একটা পারিশ্রমিক। তবে সেটাকে ঠিক অর্থ উপার্জনের পর্যায় ফেলা যায় না। সেই অর্থকে বরং আমার ভাবতে ভাল লাগে পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে। কারণ লেখা জমা দিলেই সেটা গ্রহণযোগ্য হবে এবং ছাপানো হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়,মানে প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকর এর একটা উক্তি মনে পড়ছে। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস 'কত অজানারে' লিখে যখন তিনি "দেশ" পত্রিকায় জমা করেন তখন সম্পাদক সাগরময় ঘোষ মহাশয় তাঁকে বলেন যে আড়াই মাস আগে যেন আর খবর না নেন। এরপর লেখকের উত্থান তো ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রসঙ্গে ফিরে আসি। লেখার পারিশ্রমিকের লক্ষ্মী লাভকে আমার ঠিক আর্থিক লাভের পর্যায়ে ফেলতে মন চায় না। এটা আমার আত্মার শান্তি। আর্থিক লাভ আর আত্মিক লাভের মধ্যে ফারাক অনেক। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করব। একটা লেখা জমা দিয়ে ছাপানোর আগে পর্যন্ত অপেক্ষার দিনগুলো বেশ একটা অতৃপ্তি অস্বস্তির মধ্যে কাটে। কখনও বা বেশ কয়েকটা সপ্তাহ, হয়তো কয়েক মাস। অপেক্ষা করার সময় মনের ঘড়িটা বোধহয় থেমে থেমে চলে, কাজেই সময়টা বেশি বলেই মনে হয়। লেখাটা ছাপার হরফে দেখলে বোঝা যায় যে লাভজনক প্রত্যাশার উদ্বেগের মধ্যে এক ধরণের অন্য স্বাদের আনন্দানুভূতি আছে। শুধু তাই নয়, অপ্রত্যাশিত পাওয়ার মধ্যে যে মধুরতা আছে, তা রেখে চেপে বহুদিন উপভোগ করা যায়। এই মধুরতার স্বাদ জীবনে আমি বেশ কয়েকবার উপভোগ করেছি যখন "দেশ" পত্রিকায় আমার লেখা বিজ্ঞান প্রবন্ধ নিয়মিত ছাপানো হতো। তারপর একদিন ইতি টানতে হয়, কারণ চাকরি এবং লেখালেখির মতো দু'টো কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া রীতিমত কঠিন কাজ। 

মনের ইচ্ছেকে বা যন্ত্রনাকে উপযুক্ত ভাষায় প্রকাশ করার মধ্যে বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার এবং প্রয়োজনে তার মোকাবিলার প্রশ্ন আসে। কত রকমের মানুষের সাথে মেলামেশা করেছি। সামান্যতম স্বার্থের দ্বন্দে অসংখ্যবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। স্বার্থদ্বন্দে বহুদিনের পুরোনো সম্পর্ক একেবারে খানখান না হয়ে গেলেও তার পরিণতি হয়েছে শুধুমাত্র সৌজন্যবোধে, কোথাও বা সেটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে। কে ঠিক কে-ই বা বেঠিক তার বিচার হয়নি, হয় না-ও। কে করবে বিচার? সবাই তো জোট অ-নিরপেক্ষ। পারিবারিক, রাজনৈতিক, বা পেশাগত নেতৃত্বের মধ্যে ক্রমশই অভাব হয়ে উঠছে যুক্তিপরায়ণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি সচেতন অভিভাবকের। কারণ সর্বক্ষেত্রেই মিডিওক্রিটির শাসন। স্থান-কাল-পাত্র এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বুঝে একই মানুষকে দেখেছি কতবার খোলস পরিবর্তন করতে। প্রতিষ্ঠিত ও শিক্ষিত মানুষকে কত সহজে মিথ্যাচার ও অশুভ আঁতাতের আশ্রয় নিতে দেখেছি। আসলে আরও একটু সুখে থাকার লোভে তাঁরা নিজেদের গন্ডী গুটিয়ে এনেছেন পরিবার এবং বন্ধুবর্গের ক্ষুদ্রতম বৃত্তের মধ্যে। অন্যায় এড়িয়ে যাওয়া কাপুরুষতার নামান্তর। সোচ্চার প্রতিবাদ করলে প্রতিক্রিয়া হয় বিরুদ্ধ চক্রান্তে। স্বার্থান্বেসী মানুষ যেখানেই যুক্তির সমর্থন পায়নি, সেখানেই প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে বয়সের উচ্চতা কিম্বা পদাধিকারের জোরে। ইচ্ছে করে উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি করে সমাজের এই মানুষগুলোকে আমার দেখা চোখ দিয়ে চিনিয়ে দিই। কিন্ত আগেই বলেছি যে, উপন্যাস লেখা আমার ক্ষমতার বাইরে। উপন্যাস লেখার প্রত্যাশা মাঝেমধ্যেই উঁকি মারে। বেশ কিছুদিন লাগাতার ভাবনাচিন্তা করেছি। কিন্ত ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। মনে হয়েছে, ওই কাজটা ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক। জানিনা প্রত্যাশাটা হয়তো আমরণ ভবিষ্যতই থেকে যাবে কি না। তবে লেখার বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, সেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ এসেই পড়ে আর সেই প্রসঙ্গ ধরেই নিজের পছন্দ-অপছন্দের কথাগুলো বলার সুযোগ হয়। মনে রাখার মত অভিব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনে প্রায়শই শুনে থাকি। বাস্তব পরিবেশ থেকে সঙ্কলন করা ওই সব উপাদান পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার মধ্যে লেখকের একটা সার্থকতা আছে। কৃতকার্য হলে সেটা হয়তো আরও পাঁচজন পাঠকেরও সুখের কারণ হতে পারে। সামাজিক ও ব্যক্তিচেতনাকে জাগিয়ে তুলতে লেখালেখির একটা বিরাট ভূমিকা আছে। কিছু কিছু লেখা পাঠকমনে ভীষণ রকমের প্রভাব বিস্তার করে। মনে হয় লেখক যেন পাঠকের মনের গোপন কথাটি জেনে নিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন জগতে। পাঠক-লেখকের মধ্যে গড়ে ওঠে একটা নিবিড় সম্পর্ক। 

কলেজ জীবনে বা অফিস ম্যাগাজিনে দু'একটা মামুলি লেখার পর মনোনিবেশ করেছিলাম বিজ্ঞান ভিত্তিক লেখালেখিতে। লিখতে বসে উপলব্ধি করলাম প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কোয়ানটিটি সর্বস্ব কুইজ কম্পিটিসনে যোগ দেওয়া যায়, কিন্ত জনসাধারণকে তা পরিবেশন করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন বিষয় সম্বন্ধে নিয়মিত অনুশীলন এবং কিছুটা তলিয়ে দেখা। সেটা না করলে কঠিন বিষয়বস্তুকে সাধারণ মানুষের চিন্তায় স্থাপন করা বেশ দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞ না হওয়ার ফলে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি আমাকে প্রায়ই হতে হয়েছে। কিন্ত সমাধানও পাওয়া গেছে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বই-কাগজের পাতায়। উপযুক্ত বই-কাগজ হাতের কাছে না থাকায় শরণাপন্ন হতে হয়েছে বিশেষজ্ঞদের। কাজেই লেখাচর্চা আমাকে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করেছে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সঠিক বইকাগজের সঙ্গেও বটে।

বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়ে লেখার জন্য বিভিন্ন বই, বিজ্ঞান পত্র-পত্রিকা থেকে তত্ত্ব এবং তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়। সমস্যা দাঁড়ায় আপাত বিচ্ছিন্ন এই তথ্যগুলোকে জোড়া লাগিয়ে সমস্ত লেখাটার মধ্যে একটা অবিচ্ছিন্ন চরিত্র ফুটিয়ে তোলার মধ্যে, যাতে না কি পাঠকের কাছে মনে হতে না পারে যে তথ্যগুলোর উৎস আলাদা আলাদা। যাইহোক, এই সমস্যা সমাধানের জন্য যুক্তিগ্রাহ্য কল্পনার আশ্রয় নেবার প্রয়োজন হয় এবং কল্পনার মধ্যে যুক্তি থাকলে তার মধ্যে থাকে সৃষ্টির আনন্দ। বলাই বাহুল্য, সৃষ্টি - তা যতই তুচ্ছ হোক না কেন, তার অনুভূতি গরিমময়। আশা, মুষ্টিমেয় কিছু পাঠকও যদি  সেই তুচ্ছ সৃষ্টির একটা টুকরো ধরে রাখতে পারে তবে তা হবে পরিশ্রমের সার্থকতা। মন যদি কখনও হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তুচ্ছ সৃষ্টির সেই স্মৃতি হতাশাচ্ছন্ন মনকে চাঙা করতে ভীষণ সাহায্য করে। গল্প, উপন্যাস বা কবিতা নয় - সম্পূর্ণ টেকনিক্যাল, ফলিত গবেষণা সংক্রান্ত বেশ কিছু লেখার একটিকে বাদ দিয়ে বাকিগুলোতে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আমার নামটা জড়িয়ে আছে। স্বীকার করতে বাধা নেই যে ওই কাজগুলোতে আমার অবদান মুখ্যত লাগাতার উদ্যোগে এবং ডিপার্টমেন্টের স্বার্থে কাজগুলোর প্রয়োজনীয়তার বিচারে। সেটা অবশ্যই আমি কম বলে মনে করি না। যাইহোক, কাজগুলোর খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমার অবদান নেই বললেই চলে। তবুও দেশী বা বিদেশী ম্যাগাজিনের পাতায় প্রকাশনা হওয়ার পর মুখ্য কর্মীদের সঙ্গে নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখে যারপরনাই খুশী হয়েছি। খুশী হয়েছি এই কারণে যে সুসম্পন্ন যৌথ কাজের দায়িত্বে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যে একটা sense of achievement-এর অনুভূতি আছে। এর থেকে বেশি কিছু নয়। কিন্ত বহুদিন আগে দেশী টেকনিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হওয়া ওই একটি কাজ, আজও আমার মনে শুধুমাত্র গরিমময় আনন্দের উপলব্ধি যোগায় না, তা আমার জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। কারণ কাজটা ছিল সময়োপযোগী, আগাগোড় নিজের হাতে করা এবং কাজের ভাবনার মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম কিছুটা মৌলিক চিন্তার স্পর্শ। টেকনোলজি অনেকটা এগিয়ে গেছে। কাজেই কাজটার কোনও গুরুত্ব নেই আজ। পাঠকের কৌতুহলকে মর্যাদা দিয়ে খুব সংক্ষেপে এ ব্যাপারে দু'চার কথা বলা যাক। কুড়ি-বাইশ বছর আগে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের একটি বিদেশী মেনফ্রেম কম্পিউটার কেনার পর সেটির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে বিদেশী সাপ্লায়ার এবং ভারত সরকারের মধ্যে যে সর্ত আরোপিত হয়েছিল, সেখানে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আলোচনার টেবিলে পারস্পরিক ঠান্ডা লড়াইয়ের একটা চোরা স্রোত সব সময়ই বইছিল। সেদিন বিদেশী সাপ্লায়ারের প্রতিনিধির,দেশী মানুষের প্রতি অবজ্ঞা ও অবিশ্বাসের চাহনি অকাট্য টেকনিক্যাল যুক্তি দিয়ে দমন করতে আমার মতামতটা ভীষণ কাজে লেগেছিল  এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তিটাই মেনে নেওয়া হয়েছিল।যুক্তিগ্রাহ্য টেকনিক্যাল মতামতটা সাজিয়ে গুছিয়ে লিখে একটা টেকনিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করেছিলাম। প্রকাশনার কয়েক মাস পরে সাম্মানিক হিসেবে প্রকাশকের কাছ থেকে ডাকযোগে একটি চিঠি সমেত একখানা ১০০ টাকার ব্যাঙ্ক ড্রাফট গ্রহণের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম স্বীকৃতির স্পর্শ ছাড়াও অনির্বচনীয় এক আনন্দানুভূতি। গবেষণা যাঁদের পেশা- তা সে বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, যাই হোক না কেন, এই ধরনের মুহূর্ত উপভোগ করার সৌভাগ্য তাঁদের জীবনে একাধিকবার আসে। তাঁদের প্রতি আমি খুসীভরা ঈর্ষা অনুভব করি।

সব শ্রেণীর মানুষেরই নিত্য নৈমিত্তিক একঘেঁয়েমি এবং হতাশা আছে। নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে সেই একঘেঁয়েমিটা আসে মূলত অভাব-অনটন থেকে আর উঁচুকোঠার মানুষের মধ্যে সেটা আসে সাধারণত ভোগবাদ থেকে। একঘেঁয়েমি কাটাতে বৈচিত্রের প্রয়োজন। বেশিরভাগ উচ্চবিত্ত মনে করেন যে বাড়িতে বিলাশ-বহুল জিনিসপত্রের বৈচিত্র্য মানেই জীবনের একঘেঁয়েমি চুকে যাওয়া। বাস্তব কি তাই বলে ? আসলে বাস্তবের রকমভেদ আছে। বেশিরভাগই দীর্ঘস্থায়ী নয়। আমার মনে হয় সুস্থ কল্পনাকে রূপ দেওয়ার মধ্যে যে বৈচিত্র্য, তাতে এক ধরনের গরিমময় আত্মতৃপ্তি আছে এবং শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যেই হয়তো সেই ধরনের বৈচিত্র্য ঘটাবার একমাত্র সুযোগ আছে। গত এক শতাব্দীর অ-ভাবিত যন্ত্রশিল্প বিকাশের উর্দ্ধগতি মানুষকে যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে, সেখানে লেখালেখির আবেদন কোথায় ? আমার মনে হয় যন্ত্রনির্ভর যুগে যন্ত্রের বিকাশই  হয়তো একদিন হয়ে দাঁড়াবে আশঙ্কার কারণ। লেখালেখি মুখ্যত স্রষ্টার চিন্তা-নির্ভর। কাজেই তার আবেদন যুগ-কাল নির্বিশেষে, বলা যায় চিরন্তন। 


Friday, February 3, 2023

Tax the super rich


অতি ধনী এবং অতি দরিদ্রের অর্থনৈতিক অসাম্যের ফাটল, যে কত গভীর তার একটা বিশ্লেষণ। অসাম্য কমিয়ে আনার কয়েকটা পন্থাও আলোচনা করা হয়েছে।_________________________________________________

একটা দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের আয়ের সমতার দিকে নজর রাখা, সেই দেশের সরকারের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ধনী এবং অপেক্ষাকৃত গরীব মানুষের আয়ের তফাত থাকবেই। কিন্ত সেই ফাঁক যেন এমন না হয়, যাতে ধনী মানুষ ক্রমশ ধনীতর হতে থাকে আর কম রোজগারের সাধারণ মানুষের আয় আরও কমের দিকে যায়। এই অসাম্য মাপার দু'টি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ আছে। এক, পিপিপি বা পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি এবং দ্বিতীয়টি হ'ল জিডিপি বা গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট।  এছাড়াও হয়তো দেশের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা বোঝার জন্য আরও অনেক সূচক আছে। তবে আমরা স্বল্প পরিসরের এই প্রবন্ধে উপরোক্ত দু'টি সূচকের পরিমাপের বিষয়ে আলোচনা করব এবং দেখাবার চেষ্টা করব কোন সূচকটি কোন দেশের জন্য বেশি কার্যকরী।

অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বে আন্তঃদেশীয় মুদ্রার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পরিমাপের একটি জনপ্রিয় সূচক হল, "পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি বা ক্রয়ক্ষমতার সাম্য বিচার করা।" একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা একটু সহজ করে বোঝা যেতে পারে। ধরা যাক, দুনিয়ায় একটিমাত্র পন্য কিনতে পাওয়া যায়, তা হ'ল চাল। একটি দেশের ১০০ টাকায় যদি এক কেজি চাল কেনা যায়, আর অন্য দেশে দু'কেজি - তাহলে ডলারের অঙ্কে যদি দেশ দু'টির আয় সমান হয়, তবে ক্রয়ক্ষমতার সাম্য অনুসারে দ্বিতীয় দেশটির আয় প্রথমটির দ্বিগুণ, কারণ একই পরিমাণ টাকায় দ্বিতীয় দেশে দ্বিগুণ পন্য কেনা সম্ভব। গরিব দেশগুলোতে সাধারণত ধনী দেশের তুলনায় সস্তায় খাবারদাবার-বাসস্থান পাওয়া যায়। তাই ভারতের মতো দেশের জিডিপি সরাসরি ডলারের অঙ্কের চেয়ে পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটির হিসাবে বেশি হয়।

অর্থনীতিতে আরও যে একটি সূচক গুরুত্বপূর্ণ, তা হ'ল জিডিপি বা Gross Domestic Product. এটি একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি নামেও পরিচিত। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঐ অঞ্চলের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও পরিসেবার মোট বাজারমূল্যকে বোঝার জন্যও এই সূচকটি ব্যবহার করা হয়, যা অঞ্চলটির অর্থনীতির আকার নির্দেশ করে।

জিডিপি পরিমাপ ও বোঝার সবচেয়ে সাধারণ উপায় হচ্ছে ব্যয় পদ্ধতি:

স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন = ভোগ + বিনিয়োগ + (সরকারী ব্যয়) + (রপ্তানি − আমদানি)
শেষ অংশটিকে  এককথায় বলা হয়  বাণিজ্য ঘাটতি/ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। এদের বিয়োগফল যদি হয় ধনাত্মক তাহলে তাকে বলা হবে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত, আর ঋণাত্মক হলে বলা হবে বাণিজ্য ঘাটতি।
 
এবার কর কাঠোমোর আলোচনায় কিছুটা আলোকপাত করা যাক। কর মোটামুটি দু'রকমের, প্রত্যক্ষ কর, যেমন আয়কর এবং পরোক্ষ কর জিএসটি। প্রত্যক্ষ করের আওতায় যাঁরা পড়েন তাঁদের সংখ্যা আদৌ তেমন কিছু নয়। একটা ছোট্ট উদাহরণ হল যে সম্প্রতি দেশের প্রধানমন্ত্রী ৮০ কোটি মানুষের জন্য ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত বিনা পয়সায় রেশন বিলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাত ৬০% মানুষের অবস্থা দারিদ্র্য সীমার নিচে। তাঁদের আয়করের প্রশ্নও ওঠেনা। এছাড়াও নির্দিষ্ট সীমার আয়ের আওতায় আরও অনেক মানুষই আয়করের  বাইরে। এসব হিসাব করে দেখা গেছে যে দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৬%মানুষ আয়করের আওতায় পড়েন। কাজেই সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের একটা ভগ্নাংশ মাত্র আসে আয়কর থেকে। বাকিটা পরোক্ষ কর থেকে, যেখানে মুকেশ আম্বানীরা-ও যেমন আছেন, হাসমুখ শেখ বা রামা কৈবর্তরা-ও আছেন। এই দ্বিতীয় গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা অনেক অনেকগুণ বেশি, কারণ দেশের সিংহভাগ নাগরিক-ই দরিদ্র। 

বিপুল আর্থিক বৈষম্য কমাতে সম্পদ কর একটি অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ। বৃহৎ ব্যবসায়ীদের উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সম্পদ কর ক্রেডিট দেওয়া অর্থাত বিনিয়োগের হার না বাড়ালে বাড়তি সম্পদের উপর প্রভূত কর বসানোর নীতি সাহসী সরকারের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। 

ধনীদের বাড়িতে রোজগারের খানিকটা সুষম বন্টন না হলে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়। সহজ ব্যাখ্যা হল, বড়লোক আরও অনেক বড়লোক হলেও আর কত বেশি খাবে ? নিশ্চয় তিনি বিনিয়োগ করে আরও খরচ করতে পারেন, যা বাজারে চাহিদা বাড়াবে। কিন্ত তিনি যদি বিনিয়োগ না করেন, শুধুই মুনাফার মুখ দেখতে চান আর সাম্রাজ্য বাড়িয়ে চলেন, তা হলে দেশের আদৌ যে কোনো উপকার হবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না! সরকার একটি সোজা হিসাব এখনই করে ফেলতে পারে - সরকার দেশের প্রথম ১০০টি সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করল। তাদের সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ যদি "x" হয় আর তারা যদি ওই একই সময়ে "y" পরিমাণ টাকা বা সম্পদ বিনিয়োগ করে থাকে কৃষি, শিল্প বা পরিষেবা ক্ষেত্রে, তা হলে 'y' আর 'x' এর অনুপাতটি হিসাব করতে হবে। যদি তা ১-এর চেয়ে বেশ কম হয়, তা হলে বোঝা যাবে যে, তাদের সম্পদ আহরণে দেশের তেমন উপকার হচ্ছে না। ছোট্ট পাটিগণিত ব্যবহার করে ব্যাপারটা বোঝানো যেতে পারো: (১) ধরা যাক বৃদ্ধির পরিমাণ ১০০(x) টাকা, ৫(y) টাকা বিনিয়োগ। তাহলে y/x= ০.০৫, অর্থাত তাঁরা তাঁদের আয়বৃদ্ধির মাত্র ৫ শতাংশ বিনিয়োগ করছেন, ৯৫ শতাংশ ঘরে তুলছেন। (২) এখন y যদি ৫ না হয়ে ৫৫ হয় তাহলে তাঁরা অনেকটাই বিনিয়োগ করছেন। প্রথম ক্ষেত্রের ব্যবসায়ীদের জন্য, তাদের ধনসম্পত্তির উপর কর বসিয়ে সে টাকাটা সরকার নিজেই বিনিয়োগ করতে পারে। যাদের y-এর পরিমাণ x-এর তুলনায় অন্যদের চেয়ে বেশ বেশি, তারা হয়তো সম্পদ কর দেওয়া থেকে অনেকটা ছাড় পেতে পারে। সরকার কি আদৌ এই হিসাবটি করতে চাইবে? আর সেই হিসাবমতো কড়া পদক্ষেপ করবে ?

আর্থিক বৈষম্যের অক্সফাম সমীক্ষা ভারতের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর একটি চমকপ্রদ স্ট্যাটাস রিপোর্ট দিয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা দেশের সম্পদের ৪০ শতাংশের বেশি ভোগ করেন। ভারতে বিলিয়নেয়ারের বা অতিধনীর সংখ্যা ২০০০সালে ছিল ন'জন, ২০১৭ সালে ১০১ জন, ২০২০-২১ সালে ১০২ থেকে ২০২১-২২ সালে 166-তে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যার নীচের অর্ধেক, সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশের মালিক। এই অসাম্য বহুলাংশে কাঠামোগত। যেমন, দেশে জিএসটি বাবদ মোট যত কর আদায় করা হয়, তার ৪৬% আসে দেশের ৫০% মানুষের পকেট থেকে। আর, মোট জিএসটি আদায়ের মাত্র ৪ শতাংশ আসে ধনীতম দশ শতাংশ মানুষের থেকে। হিসেবটা খুবই সহজ - দরিদ্র মানুষের আয়ের সিংহভাগ যায় ভোগব্যয়ে, যেখানে ধনীদের আয়ের অনুপাতে তাঁদের ভোগব্যয় যৎসামান্য। বাকি টাকা তাঁরা হয় সঞ্চয় করেন, নয়তো লগ্নি। ভারতের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে যে, ধনীদের আয় যে ভাবে বেড়েছে, লগ্নির প্রবণতা ততখানি বাড়েনি। বাজার অনিশ্চিত, ফলে তাঁরা হাতের টাকা সঞ্চয় করছেন। আয়ের অনুপাতে ভোগব্যয়ের পরিমাণ যেহেতু দরিদ্র মানুষের বেশি, ফলে জিএসটির বোঝাও তাঁদের উপরই বেশি। কথাটি শুধু জিএসটির জন্য সত্য নয়, এমনকি শুধু ভারতের জন্যও নয়- যে কোনও পরোক্ষ করের ক্ষেত্রেই এই একই ঘটনা ঘটে। পরোক্ষ কর চরিত্রে রিগ্রেসিভ, অর্থাত কার আয় কম বা বেশি, এই করের হার তার উপরে নির্ভর করে না- গৌতম আদানি থেকে রামা কৈবর্ত, প্রত্যেকেই সমান হারে পরোক্ষ কর দিতে বাধ্য। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কম রোজগারের মানুষের করের বোঝা অনেকটা বেশি। যাঁরা ধনী, তাঁদের থেকে বেশি হারে প্রত্যক্ষ কর আদায় করা যায়। কিন্ত এখানেই বর্তমান ভারতীয় অর্থব্যবস্থার দ্বিতীয় ত্রুটি। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কর্পোরেট করের পরিমাণ বহুলাংশে কমিয়ে দেয়।

আর্থিক অসাম্য অর্থব্যবস্থার পক্ষে কতখানি ক্ষতিকর, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। একটি মত হ'ল, অর্থব্যবস্থায় বৃদ্ধির হার চড়া হলে, এবং সব আর্থিক শ্রেণীর মানুষেরই আয়বৃদ্ধি হলে যদি খানিক অসাম্য বাড়েও, তাতে সমস্যা নেই। কিন্ত, ভারতের মতো দেশে, বিশেষত আর্থিক গতিভঙ্গের সময়, তীব্র অর্থনৈতিক অসাম্য গভীর বিপদ ডেকে আনতে পারে। তার একটি দিক হল, জীবনধারণের ন্যুনতম উপাদানগুলিও নাগরিকদের একটা বড় অংশের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তার মধ্যে যেমন অন্ন-বস্ত্র রয়েছ, তেমনই রয়েছে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য। ফলে এক প্রজন্মের আর্থিক অসাম্য ভবিষ্যত প্রজন্মের বিকাশ সম্ভাবনাকে খর্ব করতে পারে। "বন্ধু" অতিধনীদের চটাতে সরকার রাজি হবে কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য ভিন্ন। 

জাতির সম্পদের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট ধনী ব্যক্তিদের পকেটে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এটাই সত্য। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সত্ত্বেও ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য প্রতিদিনই প্রসারিত হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় দরিদ্র লোকদের দেওয়া মজুরি খুব কম, এবং অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার কথা যত কম বলা যায় ততই ভাল। আয়ের হার স্ল্যাব প্রায় এক দশক ধরে স্থির রয়েছে। মধ্যবিত্ত এবং বেতনভোগীরা তাদের অতি ধনী সমকক্ষদের তুলনায় অবিলম্বে তাদের কর পরিশোধ করে।  এছাড়াও সরকারের জন্য জিএসটি রাজস্ব আসে জনসংখ্যার নীচের অর্ধেক থেকে যখন এটি ধনী ব্যক্তিদের থেকে মাত্র 3 

এটি একটি অত্যন্ত খারাপ অর্থব্যবস্থা। ধনী আরও ধনী হচ্ছে এবং গরিব আরও দরিদ্র হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী। 

এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা এবং বন্ধ করা প্রয়োজন। ধনীদের তুলনায় দরিদ্ররা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উচ্চ কর প্রদান করছে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং পরিষেবাগুলিতে বেশি ব্যয় করছে। সময় এসেছে অতি ধনী ও ধনীদের থেকে আইন করে কর নেওয়া। অতি ধনীদের ট্যাক্স অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে অনেকটাই সাহায্য করবে।

ভারতই প্রথম দেশ যেখানে "কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি" (সি এস আর) -কে আইন করে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভারতের সব সংস্থাকে তাদের মুনাফার একটি অংশ সি এস আর-এ ব্যয় করতে হয়। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই তেমন কোনও আইন না থাকলেও, প্রচুর পরিমাণে কল্যাণমূলক ব্যয়ের পরম্পরা আছে অতি ধনীদের মধ্যে।ভারতে এক দিকে বাধ্যতামূলক সি এস আর, অন্যদিকে কর্পোরেট মুনাফায় কর বাড়ানোয় অনীহা। আর্থনীতিক অসাম্য কমানো যদি উদ্দেশ্য হয়, সি এস আর কিংবা জনহিতৈষী দাতব্য কখনও করের বিকল্প হতে পারে না।  তাই সি এস আর আইন নিয়ে তেমন আপত্তি হয়নি, কিন্ত কর্পোরেট কর বাড়ানোর সদিচ্ছা কোনও সরকারই দেখায় না।  ধনকুবেরদের থেকে কর আদায় করলে আমাদের লজ্জাজনক আর্থিক অসাম্য কিছুটা কমে। কিন্ত বাজারের বা রাজনীতির ব্যাপারী - দু'পক্ষের কাছেই এই নীতি অস্পৃশ্য।বস্তুত, ২০১৯ সালে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার অজুহাতে কর্পোরেট করের হার কমিয়ে ফেলা হয়েছিল, এবং তার ফলে ২০১৯-২০'তে কর্পোরেট কর বাবদ সরকারের আয় কমেছিল এক লক্ষ কোটি টাকা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই পরিমাণ টাকার ফাঁক কর্পোরেট ফিলানথ্রপি বা স্বতঃস্ফূর্ত দান প্রদানের সদিচ্ছা দিয়ে ভরানো যায় না। আসলে কর্পোরেট ফিলানথ্রপির কোনও প্রয়োজন নেই যদি প্রতিষ্ঠানের হিসেবের খাতাপত্র স্বচ্ছতার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শে এসে তাদের ভোটে জেতার টাকা জুগিয়ে গেলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষকে ঠকিয়ে ব্যবসায় মুনাফা লুট করে সংখ্যালঘু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিলিয়নেয়ার হবার এটাই অন্যতম এবং বোধহয় একমাত্র চাবিকাঠি। চুলোয় যাক দেশের সার্বিক অর্থনীতির দুরাবস্থা। ক্ষমতায় আসীন দেশের রাজনৈতিক শাসকদল একেবারেই "স্পিকটি নট"।