Monday, February 6, 2023

লেখাচর্চা

                             লেখাচর্চা

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে অল্প-বিস্তর যোগাযোগ আছে। সেই কারণেই আমার লেখার স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ মেলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জগতের মাল-মসলা থেকে। কোনোটা হয়তো বিজ্ঞানীর জীবনী ঘিরে, আবার কোনোটা হয়তো বিজ্ঞানের আধুনিক কোনও বিষয়কে কেন্দ্র করে। আদতে লেখা আমার পেশা নয়। অকপটে স্বীকার করতে বাধা নেই যে, শিল্প-সাহিত্যে যথেষ্ট উৎসাহ থাকলেও, পেশা হিসেবে সেটা নেবার দুঃসাহস আমার নেই। করণ একটাই  - আর্থিক নিরাপত্তার অভাব। অসাধারণরাই পারেন সেটাকে পেশা হিসেবে নিতে। যাইহোক, তবুও একটা লেখা শেষ হলেই পরের লেখা আমায় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বিজ্ঞান ভিত্তিক কোনও বিষয়কে মনে রেখে, কাগজ, কলম আর অভিদান ছড়িয়ে লেখার জন্য মনোনিবেশ করি। তিন চার বা পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টির মোটামুটি একটা চেহারা খাড়া করে ফেলি। এর পরে চলে কাঠামোর মধ্যে সামর্থ্য মতো সূক্ষ্মতা সংযোজনের পালা। তাতেও সময় নেহাত কম লাগে না। যাইহোক, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন/চার হাজার শব্দের একটি বিজ্ঞান প্রবন্ধ লিখতে আমার সময় লাগে প্রায় দু'আড়াই মাস বা তারও বেশি সময়। কাজেই লেখালেখি যে আমার পেশা নয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি অত্যন্ত অধৈর্য, ছটফটে মানুষ। আমার আত্মীয়-পরিজন, পুরোনো বন্ধু-বান্ধব, সবাই এ কথা জানেন। বিশ্রামের অবসরে মাঝেমধ্যে নিজেকেই বহুবার প্রশ্ন করেছি- সামান্য এতটুকু লেখার জন্য এই দীর্ঘ সময় লেগে থাকার ধৈর্যের উৎসটা কোথায় ? উৎসের সন্ধান আমি অবশ্যই পেয়েছি, একটা নয়, বরং বলব অনেকগুলো। নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ সেগুলোর পর্যালোচনা করার জন্যই এই লেখা।

বহুদিন ধরে মনের মধ্যে আরও একটা মধুর প্রত্যাশা আনাগোনা করেছে, আমাকে সর্বক্ষণ তাড়া করে বেড়িয়েছে - বিজ্ঞান বিষয় ছাড়া অন্য কোনও বিষয় লিখলে কেমন হয় ? কাজটা নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে চেষ্টা করে দেখলে লাভ ছাড়া লোকসানের কিছু নেই। যাইহোক, একই ঢিলে দুই পাখি মারার মতো এই শিরোনামের প্রবন্ধটি বেছে নিলাম। এটা আমার দু'দুটো অভিপ্রায় মেটাতে সাহায্য করবে।

অনেকের সাথে বহু ব্যাপারে আমি সহমত পোষণ করি না। একটা নির্দিষ্ট ব্যাপারে অবশ্যই করি না। প্রায়ই শুনি, "সবাইকার দ্বারা সবকিছু হয় না" আমার মনে হয়েছে  অনেকের দ্বারাই লেখালেখির মতো কিছু কিছু আপাত কঠিন কাজ সম্ভব। প্রয়োজন উদ্যোগের, প্রয়োজন নিষ্ঠা এবং ধৈর্যের, এবং প্রয়োজন আন্তরিক অনুশীলনের। লেখার মূল্য নির্ধারণের ভার পাঠককুলের। অসার্থক লেখার বক্তব্যের মধ্যেও হয়তো প্রথাভাঙা কোনও দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। জনমানসকে আলোড়িত করার উপাদান হয়তো থাকতে পারে। শব্দ ও ভাষার নতুন ধরনের ব্যবহার থাকতে পারে। বিচার করার আরও কত কিছু থাকতে পারে তা আমার জানা নেই। অনেকবার মনে হয়েছে যে আমাদের মতো বিজ্ঞান প্রবন্ধ যাঁরা লেখেন তাঁদের বক্তব্যে নতুন কিছু থাকে কি ? থাকে না বললেই চলে। তবে নতুন যা থাকে, তা হ'ল লেখকের রচনাশৈলী। প্রত্যেক লেখকের ভঙ্গি আলাদা। যেটা বুঝি তা হ'ল, যে সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্য হিসেবে সাজিয়ে গুছিয়ে বিজ্ঞান প্রবন্ধ প্রকাশ করাও খুব সহজ ব্যাপার নয়। বিজ্ঞান প্রবন্ধ সাহিত্যের স্তরে জায়গা করে নেবার জন্য সাবলীল ভাষার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরী। উপযুক্ত শব্দ সঙ্কলন ও তার বিন্যাস- বক্তব্যের পরিসর এবং রূপায়ণের মধ্যে নিহিত থাকে লেখকের সৃজনীশক্তির প্রকাশ। যাইহোক, সব কিছু মিলিয়ে ব্যাপারটা পরীক্ষামূলক ভাবে নেওয়া উচিত। অনেকবার অনেক অচেনা লেখকের, বিশেষ করে বেশ কিছু ছোট গল্প পড়ে ভীষণ ভাল লেগেছে। সীমিত সুযোগের মধ্যে সাধারণ লেখকের অসাধারণ কল্পনার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। মুগ্ধ হয়েছিলাম অ-ভাবিত নতুন টেকনিকের ব্যবহারে, বিষয়বস্তুর অভিনবত্বে এবং উপস্থাপনের সপ্রতিভতায়। ধারণা করতে পারিনি যে সাধারণ কথ্যভাষা ব্যবহার করে এত ঝকঝকে বর্ণনা করা যায়, ভাষাকে এতখানি গতি দিতে পারা যায়। এই লেখাগুলোর মধ্যে পাঠক হিসেবে আনন্দ পেয়েছি। মনে হয়েছে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর না জানি আরও কত আনন্দ হয়েছে। অন্যদিকে নামী লেখকের উপন্যাস পড়েও মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যে বড্ড ফেনিয়ে লেখা হয়েছে অথবা মনে হয়েছে যে এতটা উর্দ্ধশ্বাসে না লিখে ধীরে-মন্থরে লিখলে ঠিক জায়গায় এসে দাঁড়াতো। মোদ্দাকথা, এমনটা ভেবে নেওয়া ভুল যে, প্রথম লেখাটাই স্বীকৃতি পাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বিরল ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আর তাছাড়া জনপ্রিয়তা আর আর সাহিত্য সৃষ্টি সব সময় সমার্থক নয়। আমার মনে হয় লেখার সাহিত্যগুণ নির্ধারিত হয় তাত্ত্বিক বিচারে এবং সেটা করতে পারেন বিশেষজ্ঞরা। জনপ্রিয়তার রায় দেন জনসাধারণ। এর মধ্যেও আবার গোলমেলে ব্যাপার আছে। আমার মতো সাধারণ মানুষেরা ধন্ধে পড়ে যান, যখন তাঁরা দেখেন যে নামী লেখকের সাহিত্যিকতা নির্ভেজাল অশ্লীলতার সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রথমে বিশেষজ্ঞ এবং পরবর্তীকালে জনসাধারণ, উভয়ের কাছেই বিতর্কিত সাহিত্যগুণে বিবেচিত হচ্ছে। আবার বিভূতিভূষণের "পথের পাঁচালির"মতো উপন্যাস কে বটানি বই আখ্যা দিয়ে প্রকাশনায় নিরুৎসাহ দেখাবার মতো প্রকাশকের সংখ্যাও কম নয়। সেখানে নীরদচন্দ্র বা সজনীকান্তের মতো বোদ্ধার প্রয়োজন আছে। সব লেখাকেই প্রথম প্রথম সাফল্য ও জনপ্রিয়তার মূল্য দিতে হয়। কাজেই অতশত না ভেবে মস্তিষ্কের চিন্তা রূপায়ণে মনোনিবেশ করাই শ্রেয় বলে মনে করি।

জনসাধারণের ব্যবহারের উপযুক্ত পত্র-পত্রিকার পাতায় ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখার একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি আছে, অবশ্যই নামটা যদি না কোনো সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তবে নামটা দেখার আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে যে ঝুঁকিটা থেকে যায়, তা হ'ল জনৈক পাঠক-পাঠিকাবৃন্দের লেখনী বেয়ে আসা এক হাত সমালোচনা। কখনও কখনও সমালোচনা মূল প্রবন্ধের দৈর্ঘ্যকেও টেক্কা দেয়। এ ব্যাপারে আমার কিছু ব্যক্তিগত মন্তব্য আছে। সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনা ত্রুটি সংশোধনের সহায়ক এবং অনেক ক্ষেত্রে সাহিত্যগুণে উত্তীর্ণ হওয়ায় পঠনে উপভোগ্য,  তা বাংলা ইংরেজি, যে কোনও ভাষাতেই হোক না কেন। যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা মূল প্রবন্ধের অপূর্ণতাকে অনেকাংশেই পূর্ণতা দানের সাহায্য করে উৎসাহী পাঠক-পাঠিকার কাছে সেটাকে আরও আকর্ষণীও করে তোলে। পাঠকের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার মধ্যে অনুভূত হয় এক অনির্বচনীয় আনন্দ। মোদ্দা কথা, সংযত এবং নিরপেক্ষ সমালোচনা সব সময়ই লাভজনক- তা লেখার অনুকূল বা প্রতিকূল, যাই হোক না কেন। অনুকূল সমালোচনার বাড়তি লাভ হল লেখকের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধির উপর আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠতে সাহায্য করা। এছাড়া এক অমূল্য সম্পদে পুরস্কৃত হবার অনুভূতি আছে। এটা একটা নতুন জাতের স্বাদ।

মুখে অনেক কিছু বলা যায়। জনসমাবেশে নেতা বা নেতৃদের, আঞ্চলিক মানুষদের সাক্ষী রেখে অঙ্গীকারবদ্ধ বক্তৃতার সঙ্গে বাস্তব মেলাতে গেলে সেটা প্রমাণ করতে অসুবিধে হয় না। কিন্ত লিখিত কিছু বলার মধ্যে একটা নৈতিক দায়িত্ব আছে।  প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার পৃষ্ঠাগুলো দেশে-বিদেশে কয়েক হাজার জোড়া চোখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাজেই সেই  সব পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপানোর মধ্যে ব্যক্তিগত ভাবে এক ধরনের গুরুতর দায়িত্বের স্বীকৃতি অনুভব করা যায়। এ ছাড়া অনুভব করা যায় আনন্দ-শঙ্কা মেশানো এক ধরনের উদ্বেগ যার চূড়ান্ত ফল নতুন এক আলাদা জাতের আনন্দানুভূতি। লেখালেখি হ'ল শব্দ-শিল্পের চর্চা।  লেখকের কলমেই নতুন নতুন শব্দ তৈরি হয়ে ভাষার মূল স্রোতে মিশে যায়। শব্দ জনপ্রিয় হলে সেগুলো একদিন অভিধানে জায়গা করে নেয়। উপযুক্ত শব্দ, ভাষার উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির সহায়ক।

নামজাদা পত্রিকায় লেখার বাড়তি যে আকর্ষণ আছে- সেটা হ'ল রীতিমত ভাল অঙ্কের একটা পারিশ্রমিক। তবে সেটাকে ঠিক অর্থ উপার্জনের পর্যায় ফেলা যায় না। সেই অর্থকে বরং আমার ভাবতে ভাল লাগে পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে। কারণ লেখা জমা দিলেই সেটা গ্রহণযোগ্য হবে এবং ছাপানো হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়,মানে প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকর এর একটা উক্তি মনে পড়ছে। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস 'কত অজানারে' লিখে যখন তিনি "দেশ" পত্রিকায় জমা করেন তখন সম্পাদক সাগরময় ঘোষ মহাশয় তাঁকে বলেন যে আড়াই মাস আগে যেন আর খবর না নেন। এরপর লেখকের উত্থান তো ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রসঙ্গে ফিরে আসি। লেখার পারিশ্রমিকের লক্ষ্মী লাভকে আমার ঠিক আর্থিক লাভের পর্যায়ে ফেলতে মন চায় না। এটা আমার আত্মার শান্তি। আর্থিক লাভ আর আত্মিক লাভের মধ্যে ফারাক অনেক। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করব। একটা লেখা জমা দিয়ে ছাপানোর আগে পর্যন্ত অপেক্ষার দিনগুলো বেশ একটা অতৃপ্তি অস্বস্তির মধ্যে কাটে। কখনও বা বেশ কয়েকটা সপ্তাহ, হয়তো কয়েক মাস। অপেক্ষা করার সময় মনের ঘড়িটা বোধহয় থেমে থেমে চলে, কাজেই সময়টা বেশি বলেই মনে হয়। লেখাটা ছাপার হরফে দেখলে বোঝা যায় যে লাভজনক প্রত্যাশার উদ্বেগের মধ্যে এক ধরণের অন্য স্বাদের আনন্দানুভূতি আছে। শুধু তাই নয়, অপ্রত্যাশিত পাওয়ার মধ্যে যে মধুরতা আছে, তা রেখে চেপে বহুদিন উপভোগ করা যায়। এই মধুরতার স্বাদ জীবনে আমি বেশ কয়েকবার উপভোগ করেছি যখন "দেশ" পত্রিকায় আমার লেখা বিজ্ঞান প্রবন্ধ নিয়মিত ছাপানো হতো। তারপর একদিন ইতি টানতে হয়, কারণ চাকরি এবং লেখালেখির মতো দু'টো কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া রীতিমত কঠিন কাজ। 

মনের ইচ্ছেকে বা যন্ত্রনাকে উপযুক্ত ভাষায় প্রকাশ করার মধ্যে বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার এবং প্রয়োজনে তার মোকাবিলার প্রশ্ন আসে। কত রকমের মানুষের সাথে মেলামেশা করেছি। সামান্যতম স্বার্থের দ্বন্দে অসংখ্যবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। স্বার্থদ্বন্দে বহুদিনের পুরোনো সম্পর্ক একেবারে খানখান না হয়ে গেলেও তার পরিণতি হয়েছে শুধুমাত্র সৌজন্যবোধে, কোথাও বা সেটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে। কে ঠিক কে-ই বা বেঠিক তার বিচার হয়নি, হয় না-ও। কে করবে বিচার? সবাই তো জোট অ-নিরপেক্ষ। পারিবারিক, রাজনৈতিক, বা পেশাগত নেতৃত্বের মধ্যে ক্রমশই অভাব হয়ে উঠছে যুক্তিপরায়ণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি সচেতন অভিভাবকের। কারণ সর্বক্ষেত্রেই মিডিওক্রিটির শাসন। স্থান-কাল-পাত্র এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বুঝে একই মানুষকে দেখেছি কতবার খোলস পরিবর্তন করতে। প্রতিষ্ঠিত ও শিক্ষিত মানুষকে কত সহজে মিথ্যাচার ও অশুভ আঁতাতের আশ্রয় নিতে দেখেছি। আসলে আরও একটু সুখে থাকার লোভে তাঁরা নিজেদের গন্ডী গুটিয়ে এনেছেন পরিবার এবং বন্ধুবর্গের ক্ষুদ্রতম বৃত্তের মধ্যে। অন্যায় এড়িয়ে যাওয়া কাপুরুষতার নামান্তর। সোচ্চার প্রতিবাদ করলে প্রতিক্রিয়া হয় বিরুদ্ধ চক্রান্তে। স্বার্থান্বেসী মানুষ যেখানেই যুক্তির সমর্থন পায়নি, সেখানেই প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে বয়সের উচ্চতা কিম্বা পদাধিকারের জোরে। ইচ্ছে করে উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি করে সমাজের এই মানুষগুলোকে আমার দেখা চোখ দিয়ে চিনিয়ে দিই। কিন্ত আগেই বলেছি যে, উপন্যাস লেখা আমার ক্ষমতার বাইরে। উপন্যাস লেখার প্রত্যাশা মাঝেমধ্যেই উঁকি মারে। বেশ কিছুদিন লাগাতার ভাবনাচিন্তা করেছি। কিন্ত ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। মনে হয়েছে, ওই কাজটা ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক। জানিনা প্রত্যাশাটা হয়তো আমরণ ভবিষ্যতই থেকে যাবে কি না। তবে লেখার বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, সেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ এসেই পড়ে আর সেই প্রসঙ্গ ধরেই নিজের পছন্দ-অপছন্দের কথাগুলো বলার সুযোগ হয়। মনে রাখার মত অভিব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনে প্রায়শই শুনে থাকি। বাস্তব পরিবেশ থেকে সঙ্কলন করা ওই সব উপাদান পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার মধ্যে লেখকের একটা সার্থকতা আছে। কৃতকার্য হলে সেটা হয়তো আরও পাঁচজন পাঠকেরও সুখের কারণ হতে পারে। সামাজিক ও ব্যক্তিচেতনাকে জাগিয়ে তুলতে লেখালেখির একটা বিরাট ভূমিকা আছে। কিছু কিছু লেখা পাঠকমনে ভীষণ রকমের প্রভাব বিস্তার করে। মনে হয় লেখক যেন পাঠকের মনের গোপন কথাটি জেনে নিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন জগতে। পাঠক-লেখকের মধ্যে গড়ে ওঠে একটা নিবিড় সম্পর্ক। 

কলেজ জীবনে বা অফিস ম্যাগাজিনে দু'একটা মামুলি লেখার পর মনোনিবেশ করেছিলাম বিজ্ঞান ভিত্তিক লেখালেখিতে। লিখতে বসে উপলব্ধি করলাম প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কোয়ানটিটি সর্বস্ব কুইজ কম্পিটিসনে যোগ দেওয়া যায়, কিন্ত জনসাধারণকে তা পরিবেশন করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন বিষয় সম্বন্ধে নিয়মিত অনুশীলন এবং কিছুটা তলিয়ে দেখা। সেটা না করলে কঠিন বিষয়বস্তুকে সাধারণ মানুষের চিন্তায় স্থাপন করা বেশ দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞ না হওয়ার ফলে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি আমাকে প্রায়ই হতে হয়েছে। কিন্ত সমাধানও পাওয়া গেছে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বই-কাগজের পাতায়। উপযুক্ত বই-কাগজ হাতের কাছে না থাকায় শরণাপন্ন হতে হয়েছে বিশেষজ্ঞদের। কাজেই লেখাচর্চা আমাকে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করেছে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সঠিক বইকাগজের সঙ্গেও বটে।

বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়ে লেখার জন্য বিভিন্ন বই, বিজ্ঞান পত্র-পত্রিকা থেকে তত্ত্ব এবং তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়। সমস্যা দাঁড়ায় আপাত বিচ্ছিন্ন এই তথ্যগুলোকে জোড়া লাগিয়ে সমস্ত লেখাটার মধ্যে একটা অবিচ্ছিন্ন চরিত্র ফুটিয়ে তোলার মধ্যে, যাতে না কি পাঠকের কাছে মনে হতে না পারে যে তথ্যগুলোর উৎস আলাদা আলাদা। যাইহোক, এই সমস্যা সমাধানের জন্য যুক্তিগ্রাহ্য কল্পনার আশ্রয় নেবার প্রয়োজন হয় এবং কল্পনার মধ্যে যুক্তি থাকলে তার মধ্যে থাকে সৃষ্টির আনন্দ। বলাই বাহুল্য, সৃষ্টি - তা যতই তুচ্ছ হোক না কেন, তার অনুভূতি গরিমময়। আশা, মুষ্টিমেয় কিছু পাঠকও যদি  সেই তুচ্ছ সৃষ্টির একটা টুকরো ধরে রাখতে পারে তবে তা হবে পরিশ্রমের সার্থকতা। মন যদি কখনও হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তুচ্ছ সৃষ্টির সেই স্মৃতি হতাশাচ্ছন্ন মনকে চাঙা করতে ভীষণ সাহায্য করে। গল্প, উপন্যাস বা কবিতা নয় - সম্পূর্ণ টেকনিক্যাল, ফলিত গবেষণা সংক্রান্ত বেশ কিছু লেখার একটিকে বাদ দিয়ে বাকিগুলোতে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আমার নামটা জড়িয়ে আছে। স্বীকার করতে বাধা নেই যে ওই কাজগুলোতে আমার অবদান মুখ্যত লাগাতার উদ্যোগে এবং ডিপার্টমেন্টের স্বার্থে কাজগুলোর প্রয়োজনীয়তার বিচারে। সেটা অবশ্যই আমি কম বলে মনে করি না। যাইহোক, কাজগুলোর খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমার অবদান নেই বললেই চলে। তবুও দেশী বা বিদেশী ম্যাগাজিনের পাতায় প্রকাশনা হওয়ার পর মুখ্য কর্মীদের সঙ্গে নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখে যারপরনাই খুশী হয়েছি। খুশী হয়েছি এই কারণে যে সুসম্পন্ন যৌথ কাজের দায়িত্বে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যে একটা sense of achievement-এর অনুভূতি আছে। এর থেকে বেশি কিছু নয়। কিন্ত বহুদিন আগে দেশী টেকনিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হওয়া ওই একটি কাজ, আজও আমার মনে শুধুমাত্র গরিমময় আনন্দের উপলব্ধি যোগায় না, তা আমার জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। কারণ কাজটা ছিল সময়োপযোগী, আগাগোড় নিজের হাতে করা এবং কাজের ভাবনার মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম কিছুটা মৌলিক চিন্তার স্পর্শ। টেকনোলজি অনেকটা এগিয়ে গেছে। কাজেই কাজটার কোনও গুরুত্ব নেই আজ। পাঠকের কৌতুহলকে মর্যাদা দিয়ে খুব সংক্ষেপে এ ব্যাপারে দু'চার কথা বলা যাক। কুড়ি-বাইশ বছর আগে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের একটি বিদেশী মেনফ্রেম কম্পিউটার কেনার পর সেটির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে বিদেশী সাপ্লায়ার এবং ভারত সরকারের মধ্যে যে সর্ত আরোপিত হয়েছিল, সেখানে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আলোচনার টেবিলে পারস্পরিক ঠান্ডা লড়াইয়ের একটা চোরা স্রোত সব সময়ই বইছিল। সেদিন বিদেশী সাপ্লায়ারের প্রতিনিধির,দেশী মানুষের প্রতি অবজ্ঞা ও অবিশ্বাসের চাহনি অকাট্য টেকনিক্যাল যুক্তি দিয়ে দমন করতে আমার মতামতটা ভীষণ কাজে লেগেছিল  এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তিটাই মেনে নেওয়া হয়েছিল।যুক্তিগ্রাহ্য টেকনিক্যাল মতামতটা সাজিয়ে গুছিয়ে লিখে একটা টেকনিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করেছিলাম। প্রকাশনার কয়েক মাস পরে সাম্মানিক হিসেবে প্রকাশকের কাছ থেকে ডাকযোগে একটি চিঠি সমেত একখানা ১০০ টাকার ব্যাঙ্ক ড্রাফট গ্রহণের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম স্বীকৃতির স্পর্শ ছাড়াও অনির্বচনীয় এক আনন্দানুভূতি। গবেষণা যাঁদের পেশা- তা সে বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, যাই হোক না কেন, এই ধরনের মুহূর্ত উপভোগ করার সৌভাগ্য তাঁদের জীবনে একাধিকবার আসে। তাঁদের প্রতি আমি খুসীভরা ঈর্ষা অনুভব করি।

সব শ্রেণীর মানুষেরই নিত্য নৈমিত্তিক একঘেঁয়েমি এবং হতাশা আছে। নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে সেই একঘেঁয়েমিটা আসে মূলত অভাব-অনটন থেকে আর উঁচুকোঠার মানুষের মধ্যে সেটা আসে সাধারণত ভোগবাদ থেকে। একঘেঁয়েমি কাটাতে বৈচিত্রের প্রয়োজন। বেশিরভাগ উচ্চবিত্ত মনে করেন যে বাড়িতে বিলাশ-বহুল জিনিসপত্রের বৈচিত্র্য মানেই জীবনের একঘেঁয়েমি চুকে যাওয়া। বাস্তব কি তাই বলে ? আসলে বাস্তবের রকমভেদ আছে। বেশিরভাগই দীর্ঘস্থায়ী নয়। আমার মনে হয় সুস্থ কল্পনাকে রূপ দেওয়ার মধ্যে যে বৈচিত্র্য, তাতে এক ধরনের গরিমময় আত্মতৃপ্তি আছে এবং শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যেই হয়তো সেই ধরনের বৈচিত্র্য ঘটাবার একমাত্র সুযোগ আছে। গত এক শতাব্দীর অ-ভাবিত যন্ত্রশিল্প বিকাশের উর্দ্ধগতি মানুষকে যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে, সেখানে লেখালেখির আবেদন কোথায় ? আমার মনে হয় যন্ত্রনির্ভর যুগে যন্ত্রের বিকাশই  হয়তো একদিন হয়ে দাঁড়াবে আশঙ্কার কারণ। লেখালেখি মুখ্যত স্রষ্টার চিন্তা-নির্ভর। কাজেই তার আবেদন যুগ-কাল নির্বিশেষে, বলা যায় চিরন্তন। 


No comments: