Wednesday, November 16, 2022

ঋষি সুনাকের উত্থান কাহিনী

    ঋষি সুনাক 

ঋষি সুনাক ব্রিটেনের প্রধান মন্ত্রীত্বের পদ আলোকিত করার আগে থেকেই ভারতীয় মিডিয়া তাঁর ভারতীয়ত্বের গল্পে আচ্ছন্ন হয়েছিল। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি যে এগুলো হয়তো কয়েকশ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে
পাওয়া এক ধরনের মানসিক দেউলিয়াপনা। হীনমন্যতাও বলা চলে।
প্রীতি প্যাটেল 
 যাইহোক, দেখে নেওয়া যাক সুনাকের ধর্ম, জাতিসত্তা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের খতিয়ান। সুনাক ঠিক আসলে কতটা ভারতীয়। সুনাকের দুই তরফেরই দাদা-দাদিরা ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে পূর্ব আফ্রিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথের মধ্যে অবাধ চলাচলের সুবিধা নিয়ে সুনাকের বাবা-মা ১৯৬০-এর দশকে ব্রিটেনে পাড়ি জমান। ঘটনাচক্রে, বেশিরভাগ হিন্দুমতাবলম্বী রক্ষণশীল প্রবাসী রাজনীতিবিদ, যেমন প্রীতি প্যাটেল এবং সুয়েলা ব্র্যাভারম্যানের গল্পটাও প্রায় একই রকমের - ব্রিটিশ ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকা হয়ে গ্রেট ব্রিটেনে অভিবাসন। ফলস্বরূপ, তাঁদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি সেইসব ভারতীয় অভিবাসীদের থেকে একেবারেই আলাদা, যাঁদের বাবা-মা স্বাধীনতার পর ভারত থেকে পশ্চিমে চলে গিয়েছিলেন। সুয়েলা ব্র্যাভারম্যান  ভারতীয় অভিবাসীদের সম্পর্কে কিছু সংবেদনশীল মন্তব্য করলে এবং কিছু ভারতীয় অভিবাসীদের 

                                                     সুয়েলা ব্র্যাভারম্যান 
রুয়ান্ডায় নির্বাসন দিলে ভারতীয় মিডিয়া যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হয়। সুয়েলা, জনসন মন্ত্রিসভার অ্যাটর্নি জেনারেল     ছিলেন। 
যাইহোক, রূঢ়ভাবে প্রকাশ না করলেও  অবৈধ অভিবাসন সম্পর্কে সুনাক  একই রকম মতামত পোষণ করেন। এর মৌলিক কারণ হ'ল তিনজনই নিজেদেরকে ভারতের চেয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সন্তান বলে মনে করেন। টেকনিক্যালি, অর্থাৎ, অভিবাসনের নিয়ম বিধি মানলে, তাঁদের ভাবনায় হয়তো সেটা অসত্যও নয়। কিন্ত যাঁদের অবস্থান আদৌ এঁদের মতো নয়, পশ্চিমে, বিশেষ করে মার্কিন মুলুকে যাঁরা অভিবাসী হিসেবে পাকাপাকি ঘাঁটি গেড়েছেন, তাঁদের মনস্তত্বও একই রকম ভাবে কাজ করে। আসলে এঁদের অবস্থান  হ'ল 'না ঘরকা, না ঘাটকা'। আফ্রিকা থেকে রাজনৈতিক কারণে বিতাড়িত হয়ে  ইংল্যান্ডের যে জেলায় তাঁরা বাস করছেন, তাকে ঘিরেই তাঁদের স্বদেশ ভাবনা গড়ে ওঠে এবং ক্রমে তা বিস্তৃত হয় ব্রিটিশ-দ্বীপপুঞ্জের সীমা পর্যন্ত। এ এমন এক প্রাদেশিকতা, যা আন্তর্জাতিক বিশ্ব ধারণার বিরোধী। ঋষি সুনক সেই মনোজগতের অন্তর্গত। তাঁরা ব্রেক্সিটপন্থী, কারণ অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলেমিশে এবং  দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে সমাধান তাঁরা পছন্দ করেন না। 


একই ধরনের উচ্ছ্বাসের স্রোত ছিল যখন কয়েক বছর আগে কমলা হ্যারিস, বাইডেন প্রেসিডেন্সিতে  ইউএস-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন
। কেউ কেউ এটাও ভেবে নিয়েছিলেন যে বার্ধক্যের কারণে জোসেফ বাইডেন অক্ষম হয়ে পড়লে তিনিই প্রেসিডেন্টের কুর্সির মালিকানা পাবেন। যাইহোক, মিসেস হ্যারিসের ভাইস-প্রেসিডেন্সি নিয়ে উল্লাস শীঘ্রই বিলীন হয়ে গেল - যখন মিস হ্যারিস ভারতের মানবাধিকার এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাঁটাবিহীন বিষয়গুলির উপর তাঁর  উপরওয়ালার মতামত প্রকাশ করা শুরু করলেন। 
ববি জিন্দাল 

পশ্চিমা বিশ্বে ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদদের মধ্যে একাধিক সমস্যা। যদি ভারত বা ভারত সরকারের পক্ষপাতী হতে দেখা যায় এবং তাঁরা সেদেশের নির্বাচন প্রতিযোগিতার ময়দানে লড়াইয়ে নামে, তাহলে জয়ী হয়ে ফিরে আসার একটা ঝুঁকি থাকে। এর একটি চরম উদাহরণ হল ববি জিন্দাল। লুইজিয়ানার দু'বারের গভর্নর এবং একমাত্র ভারতীয়-আমেরিকান রিপাবলিকান যিনি মার্কিন কংগ্রেসে দায়িত্ব পালন করেছেন। জিন্দাল যখন মার্কিন ইতিহাসে প্রথম ভারতীয়-আমেরিকান গভর্নর নির্বাচিত হন, তখন দেশে তাঁর পৈতৃক ভিটেতে গ্রামের বাসিন্দারা রাস্তায় নাচানাচি শুরু করেন, মিষ্টি বিতরণ করেন এবং শব্দবাজি ফাটিয়ে আনন্দোৎসব পালন করেন। এছাড়া অনেককেই তাঁর বিজয়ের জন্য স্থানীয় মন্দিরে প্রার্থনা করতে দেখা যায়। দেশের ভিটের আনন্দোৎসবের হর্ষধ্বনি হয়তো মার্কিন মুলুক পর্যন্ত পৌঁছে গেছিল। আমেরিকাবাসীর মধ্যে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্সির  লড়াইয়ে জিন্দাল তাঁর ভারতীয় শিকড়কে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে বলেছিলেন: "আমরা ভারতীয়-আমেরিকান, আইরিশ-আমেরিকান, ধনী আমেরিকান বা দরিদ্র আমেরিকান নই। আমরা সবাই আমেরিকান।" এই ধরনের বিবৃতির ফলে তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সমর্থন হারাতে হয়। ভারতীয়-আমেরিকানদের সমর্থন হারানোর ফলস্বরূপ নির্বাচনে লড়াইয়ে প্রচারপর্ব চালানোর জন্য যে আর্থিক তহবিল তিনি আগে পেয়ে থাকতেন, তা অচিরেই শুকিয়ে যায় এবং অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির দৌড় থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন। সুনাকের মতো অন্যান্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেতারা একটি সূক্ষ্ম রেখায় চলেন, তাঁদের অভিবাসী অবস্থার উপর জোর দেন কিন্তু একই সাথে, তাদের গৃহীত দেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন এবং তাদের দেওয়া সুযোগের জন্য ধন্যবাদ জানান। সুনাকের ক্ষেত্রেও এমনই দ্বিধা-দ্বন্দের দোলাচল দেখা যায়। এক সময় তিনি এমন কথা বলেছিলেন যাতে মনে হয় যে অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গেই তাঁর ওঠাবসা। কিন্ত তাঁর এই কথা দীর্ঘস্থায় হয় না। বরং পরক্ষণেই সংযত হয়ে তিনি বলেছিলেন, "কর্মীসম্প্রদায়ের মধ্যেও অনেকে আমার  বন্ধুস্থানীয়।"

দেখে নেওয়া যাক সুনাকের ক্যরিয়র প্রোফাইল। মিঃ সুনাক, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন, রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে ডিগ্রী অর্জন করেন এবং "গোল্ডম্যান শ্যাচে" প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক হিসাবে কাজের অভিজ্ঞতার  পরে ফুলব্রাইট স্কলারশিপে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। বরিস জনসন মন্ত্রিসভার  এক্সচেকারের চ্যান্সেলর, সাজিদ জাভেদ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করলে  এক্সচেকারের চ্যান্সেলর হন সুনাক। অবিলম্বে, মিঃ সুনাক, কোভিড -১৯ মহামারীর ক্ষতে ভেঙে পড়া ব্রিটেনের অর্থনীতির বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হন

বরিস জনসন 

দেশের সাধারণ নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে তিনি কেনিসিয়ানিজম অর্থনৈতিক মডেলকে বেছে নেন এবং সরকারি কোষাগার থেকে  চারশো বিলিয়ন ডলারের ($৪০০ বিলিয়ন) অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেন। ফলে চালু চাকরিগুলো বজায় থাকে এবং  সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে মহামারীর বেশিরভাগ অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি সফলভাবে পূরণ হওয়া ছাড়াও  ব্যবসায় তহবিল আসায় বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি হয়। ফলে ব্যক্তি ও কোম্পানির মাথার উপর থেকে লক ডাউনের বোঝা সহজ হয়ে যায়। (উৎসাহী পাঠক Freebies and doles শিরোনামে ইংরেজি ও সেটির বাংলা অনুবাদ করা একটি ছোট প্রবন্ধ  আমার blog-এ লেখা আছে, সেটা পড়ে নিলে কেনিসিয়ানিজম তত্ব বুঝতে সুবিধে হবে।)                                                                                                                                                                                                                        লিজ ট্রাস    

পরে, মিঃ সুনাক সরকারী ভর্তুকিযুক্ত খাবার এবং পানীয় সহ রেস্তোরাঁ এবং পাবগুলিকে সমর্থন করার জন্য তাঁর মস্তিষ্ক প্রসূত জনপ্রিয় প্রকল্প "ইট আউট টু হেল্প আউট" স্কিম চালু করেন।  এই ব্যবস্থাগুলি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রমাণিত হয়েছিল, এবং সুনাক সাহেব দৈনিক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের মুখ হয়ে ওঠেন। 

লিজ স্ট্রাসের ৪৫ দিনের সরকারের পতনের সাথে সাথেই,  ব্রিটেনের বর্তমান অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কথা ভেবে সুনাকের অর্থনৈতিক ও আর্থিক বুদ্ধিমত্তার কথা মাথায় রেখেই সাংসদরা তাঁকে ব্রিটিশ রাজনীতির শীর্ষ পদাধিকারী হিসেবে যোগ্যতম ব্যক্তি মনে করেছেন।

মনে রাখা উচিত যে, ব্রেক্সিট, কোভিদ, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তজ্জনিত মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় জনমত টোরিদের পরিত্যাগ করে লেবারের দিকে ঘুরতে আরম্ভ করেছিল। কিন্ত সুনক কিছু ব্যাপারে - যথা, কর হ্রাস বা সরকারি ব্যয়সঙ্কোচ- জনপ্রিয়তার জন্য খয়রাত না করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সমর্থন আবার কিছুটা ঘুরেছে টোরি সরকারের দিকে।

তবে সুনক সরকারের বৃহত্তর সমস্যা হল তাঁর দল আর নতুন সমর্থন আকর্ষণ করতে পারছে না। ব্রিটেন মূলত এক পরিষেবা-ভিত্তিক অর্থনীতি, যেখানে মোট উৎপাদনে পরিষেবার অনুপাত ৮০ শতাংশের বেশি এবং তা সম্ভব হয়েছিল ইউরোপ থেকে অপর্যাপ্ত পরিযায়ী কর্মীর চলাচলের জন্য।  পড়শি দেশগুলি থেকে মানুষের, ও সেই সঙ্গে পণ্যের, অবাধ চলাচলে ব্রেক্সিট এত বেশি বাধানিষেধ তৈরি করছে যে, দূর্বিষহ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জীবন। বিশেষত, অভিবাসীরা মনে করেন যে, ব্রেক্সিট সমর্থকেরা অভিবাসন- বিরোধী। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা এখন লেবারের দিকে ঝুঁকছেন।

এখন দেখার বিষয় যে সুনাকের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক বিচার, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সাথে মিলে যায় কিনা। সময়ই এর উত্তর দেবে।

 










Tuesday, November 8, 2022

কান্না

   


     https://youtu.be/9eJq-frMgyM

                           কান্না

সব কান্নার আওয়াজ শোনা যায় না।

সব কান্না দেখা যায় না।

সব কান্নাতে চোখের জলও ঝরে না।

বহু মানুষ আছে পৃথিবীতে, যারা নীরবে কাঁদে;

                                              গুঙিয়ে কাঁদে।

তাদের আওয়াজ কক্ষনো শোনা যায় না।

তাদের আওয়াজ কক্ষনো হৃদয় ভেদ করে

                                      বাইরে আসে না।

কিন্ত সেই কান্না মন-প্রাণ ক্ষত-বিক্ষত করে, 

আর অশ্রুধারার রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলে হৃদয়ে

তাইতো মানুষের কান্না মানুষ শুনতে পায় না

                    অথচ প্রকৃতি নিরবে শুনতে পায়।

এ কান্না যেন শব্দহীন অশ্রুহীন হৃদয় ভাঙা কান্না

কেউ শুনতে পায়নি, কেউ দেখতেও পায়নি, 

তবুও কাঁদে এই হিয়া।

বুকে চাপা কষ্টের পাথর নিয়ে 

স্তব্ধ - কাঁদতেও পারে না,

হায়রে কপাল।


Saturday, November 5, 2022

বার্ধক্য তো দেহে !

 https://youtu.be/LWvLYHjx810




                   বার্ধক তো দেহে !

মুখের কারুকার্য করা ফাটলগুলোর আঁকিবুকি,

আয়নার ভেতর থেকে যেন তাকিয়ে থাকে !

কিন্ত তাতে কি-ই বা যায় আসে ?

হৃদয় জুড়ে তো এখনও ভালবাসা আছে।


উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা,

                              আজও পারে মনে সাড়া জাগাতে,

চোখের সামনে ভেসে ওঠে

                          যা দেখেছি সেদিনের ছায়াছবিতে।


ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ফিরে যাই ছটফটে কৈশোরে,

মনের দর্পনে দেখতে পাই টানটান উজ্জ্বল অবয়বের।

আয়নাতে দেখা ফাটলগুলো যেন মিলিয়ে যায় পলকে,

ক্ষণিকের ভ্রান্তি থেকে আবার ফিরে আসি বার্ধক্যে।


এ বয়সেরও তো একটা আলাদা শোভা আছে,

 খুঁজতে হবে কোঁচকানো ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে,

অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতার ঝাঁপি কানায় কানায় উঠেছে ভরে,

কেউ না চাইলে ফেলে যেতে হবে ধরীত্রীর এই কারাগারে।

    

ভাবতে আজও ভাল লাগে, আরে ! 

                        বার্ধক্য তো আমার দেহে,

মন তো আমার এখনও সতেজ 

                             যেমনটি ছিল যৌবনের শুরুতে।