বেটি বচাও, বেটি পড়াও অভিযান ভারতের একটি সামাজিক প্রচার অভিযান, যার লক্ষ্য হ'ল কন্যা সন্তানের জন্য কল্যাণমূলক পরিষবা প্রদানের দক্ষতা বৃদ্ধি তথা সচেতনতা সৃষ্টি। এই প্রকল্পটির জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রাথমিক তহবিলে প্রদান করা হয়েছিল।
গত ১৬ জুলাই উত্তরপ্রদেশের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হঠাৎই "রেউড়ি সংস্কৃতি"-বিরূদ্ধে সবিশেষ সোচ্চার হন। তিনি বোঝাতে চান, যে ভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে মানুষের উৎসবাদিতে রেউড়ি (রেউড়ি হল গুড়-তিলের মিশ্রণের পাক করা এক ধরনের উত্তর ভারতীয় মিষ্টি) বিলি করা হয়, সেভাবেই বিরোধী দলগুলো সরকারি অর্থ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে এ দেশে "রেউড়ি সংস্কৃতির" আমদানি করছে। মোদ্দাকথা হল ভোট কেনার নামে ঘুষ দিচ্ছে। উক্তির মধ্যে কোথাও যেন একটা বিদ্রুপের গন্ধ আছে।
মুখ্যমন্ত্রী লাডলি বেহনা যোজনা হল মধ্যপ্রদেশ সরকারের একটি উদ্যোগ। এই যোজনার মাধ্যমে মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, স্বাস্থ্য, এবং পুষ্টির অবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।এই যোজনার সুবিধা: মাসিক আর্থিক সহায়তা.
লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প
এটা হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারের মহিলা প্রধানদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মহিলাদের ক্ষমতায়ন করা এবং স্বাবলম্বী করানো।
এ রকম গুজরাতের প্রকল্পের নামকরণ নমো শ্রী, ওড়িষায় সুভদ্রা যোজনা -তালিকা দীর্ঘায়িত করা অর্থহীন। কিন্ত সবাইকে পথ দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
লক্ষ করলে বুঝতে পারা যাবে যে, সব কটি প্রকল্পই হল মহিলাদের ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে করা। মনে রাখতে হবে যে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেখানো পথ, অর্থাত তারাই প্রথম শুরু করে। প্রত্যেকটি প্রকল্পকেই ভোটদাতাকে ঘুষ দেবার উদ্দেশ্যেই করা। পশ্চিমবঙ্গ একটু সম্মান জানিয়ে প্রকল্পের নামকরণ করেছে "লক্ষ্মীর ভান্ডার"
এই অংশটুকু হল প্রবন্ধের মুখবন্ধ। এটা ঘিরেই আজকের আলোচনা। উচ্চ শিক্ষিত এবং উচ্চ পদস্থ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ( বহুদিন অবসর নিয়েছেন) কিংবা অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করা শিক্ষক, তাঁরা কেউ বলছেন এইভাবে বসিয়ে বসিয়ে খাইয়ে এই মানুষ গুলোকে পঙ্গু করে দিয়ে সরকার ভোট কিনছে। আমি তো জানি যে এই যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছেন তাঁরা দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কাকভোরে উঠে কলকাতায় এসে গায়ে-গতরে খেটে ৩/৪ বাড়িতে কাজ করে আবার সন্ধ্যের ট্রেনে বাড়ি ফিরছেন। মাস গেলে হাতে আসে মেরেকেটে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। যাঁরা রান্নার কাজ করেন না তাঁদের জোটে সাকুল্যে ৭/৮ টাকার হাজার মতো।
১৮/০৪/২৪ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা "দুর্নীতিগ্রস্ত, তবু ভোট পান" শিরোনামে হুগলি রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক, চিরদীপ মজুমদারের লেখা একটি প্রবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওঁর কথাতেই লেখাটির সারমর্ম পাঠকের সামনে তুলে ধরছি।
সদ্য শেষ হওয়া দিল্লি নির্বাচনের ফল প্রকাশের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা। এই নির্বাচনের প্রচারে দুর্নীতি নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছিল। আম আদমি পার্টি (আপ) সরকারের আবগারি ও অন্যান্য দুর্নীতির কথা বিজেপি প্রচার করে; আপ-ও পোস্টার ছাপিয়ে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে। এর পরে দু'পক্ষই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির খেলায় নামে। ভোটের ফল দেখাল, বিজেপির প্রতিশ্রুতি ভোটারদের বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। কারণ তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে অনুদানের অঙ্কটা বেশি ছিল।
ভোটদানের হারে স্পষ্ট যে, দিল্লির উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের একটা বড় অংশ ভোটের দিন বুথমুখী হননি। স্পষ্টতই বিজেপির আশ্বাস আপ-এর মূল ভোটব্যাঙ্ক ও গরিব ও নিম্নবিত্ত মন ছুঁয়ে গেছে। একে অপরের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির প্রচার গৌণ, প্রতিশ্রুতির প্রচার মুখ্য হয়েছে। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে, অথচ ভোটে তার প্রভাব পড়ে না! অর্থাত দুর্নীতি ও মানবিকতার মেলবন্ধন অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্ত এটা কি করে সম্ভব। একটু কাটা-ছেঁড়া করে দেখা যাক:
দু'টো সম্ভাব্য ব্যাখা হতে পারে। (১) উপরতলার রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির খবর নীচের তলার সাধারণ ভোটারের কানে পৌঁছোয় না। রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অভাব থাকলে বা মিডিয়া যথেষ্ট কার্যকর না হলে এই সম্ভাবনা আরও বাড়ে। কিন্ত যে রাজ্যে "এবিপি আনন্দ"-র মতো অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিক সংস্থার (Investigative journalism agency) উপস্থিতি, সেখানে এই সম্ভাবনা প্রায় নেই। কাজেই আরও একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্য আছে (২) দুর্নীতির সঙ্গে মানুষের আপস করে নেওয়ার মানসিকতা। যদি সরকারি সুযোগসুবিধা বা গণবন্টনের প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা বা দল সহায়ক হয়, যেটা এ রাজ্যের শাসক দলের মধ্যে কেউ কেউ হয়েছেন, তবে ভোটাররা তাঁকে ভোট দিতে দ্বিধা করেন না।
এই রাজ্যের কথা ছেড়ে এবার তথ্যের ভিত্তিতে সমীক্ষার ফলাফল দেখে নেওয়া যাক সারা ভারতবর্ষ জুড়ে শুধু এ রাজ্যের সরকার-ই দুর্নীতিগ্রস্ত, না কি অন্যান্য দলও আছে!
বিশ্বব্যপী ৬৬ টি দেশে করা সমীক্ষার অঙ্গ হিসেবে ২০২৩ সালে ভারতের ৮টি রাজ্যে এই সমীক্ষা করা হয়। উত্তরদাতাদের কাছে দুর্নীতির মাত্রা সম্বধে মতামত চাওয়া হয়- ভারতে দুর্নীতি নেই মনে করলে উত্তরদাতা '১' বলবেন, এবং সর্বোচ্চ হারে দুর্নীতি আছে মনে করলে '১০' বলবেন। দুর্নীতির মাত্রা এর মধ্যবর্তী কোনও একটি স্তরে আছে বলে মনে করলে ২ থেকে ৯ এর মধ্যে যে সংখ্যাটি মানানসই বলে মনে হবে, সেটি বলবেন উত্তরদাতা। দেখা গেল, এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সব উত্তরদাতার দেওয়া নম্বরের গড় ৭.৭। অর্থাত, মানুষ মনে করেন যে, দেশে দুর্নীতির প্রভাব ও বিস্তার যথেষ্ট। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রা ৩১% পুরোপুরি ১০ দিলেন; অর্থাত, তাঁদের মতে, ভারতে দুর্নীতি লাগামছাড়া। ১ থেকে ৫ এর মধ্যে নম্বর দিলেন মাত্র ১৬% উত্তরদাতা; ৬ থেকে ১০- এর মধ্যে নম্বর দিলেন বাকি ৮৪%।
এই তথ্য থেকে আমরা কি বুঝলাম! ৮৪% শতাংশ ভোট দাতাদের মধ্যেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব রকম রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ আছেন। এ রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দল তৃণমূল আর বিজেপি। কংগ্রেস, বামফ্রন্ট আর আই এস এফ কে আলোচনার মধ্যে আনছি না। কারণ মানুষ তাঁদের বহুদিন আগেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্ত তাঁদের কিছু সমর্থক তো ওই ৮৪% শতাংশের মধ্যেই আছে। অন্তত অঙ্ক তো তাই বলছে। আগেই প্রমাণ পাওয়া গেছে যে দুর্নীতি আর তথাকথিত মানবতা হাত ধরাধরি করে চলে। এখন তথ্য থেকে বোঝা গেল, যে দুর্নীতি অল্প-বিস্তর প্রত্যেক দল এবং তাদের সমর্থকদেরও আছে। অ্যাডভান্টেজ সব সময়ই শাসক দল, সে যে দলই শাসনে থাকুন না কেন। কারণ তাঁদের হাতে সরকারি প্রশাসন।
No comments:
Post a Comment