রাষ্ট্রপ্রধানদের একটা ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা উচিত যাতে নাকি তাঁরা পৃথিবী নামক এই গ্রহের উপর কি ঘটে চলেছে সে ব্যাপারে একটা সম্যক ধারণা জন্মায়। সেজন্য common sense থাকাটাই যথেষ্ট, যা তথাকথিত বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে খুবই uncommon.
বিশ্বের জলবায়ু পরিস্থিতি রীতিমত উদ্বেগজনক। বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের ২০১৫-র জলবায়ু সম্মেলন, 'কনফারেন্স অব দি পার্টিজ' বা সি ও পি- ২১ বা সংক্ষেপে "কপ"-এ স্বাক্ষরিত হয় প্যারিস পরিবেশ চুক্তি, যার শরিক হয় এই গ্রহের ১৯৬ টি দেশ।
মূল লক্ষ্য, দুনিয়ার গড় তাপমাত্রাকে প্রাক শিল্প যুগের আগের তুলনায় দেড় থেকে দু'ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশির সীমারেখায় বেঁধে রাখা যায়। তার জন্য প্রয়োজন জীবাস্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমশ কমিয়ে ফেলা, তা হলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমে যাবে। কয়লা বা খনিজ তেলের মতো অনেক যুগের মরা ধন, পৃথিবী যাকে কবর দিয়ে রেখেছে, তা বার করে অনেকটাই মেটানো হয় দুনিয়ার শক্তির প্রয়োজন। একে বর্জন করা আদৌ সহজ নয়। তবে বিকল্প শক্তির কথা ভাবার এটাই আদর্শ সময়, এবং একই সঙ্গে উপযুক্ত পরিকল্পনার। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি - দুনিয়া জুড়ে এই সব অপ্রচলিত পরিচ্ছন্ন শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের অর্থ। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই অর্থ জোগাতে হবে ধনী দেশগুলোকেই। কারণ, সে ক্ষমতা তাদেরই আছে। বর্তমানে সল্পন্নতো দেশ হিসেবে বিবেচিত হয় দক্ষিণ সুদান, চাদ, নাইজার, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং বুরুন্ডি। সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভাবে, এবং এখনও গ্রিনহাউস গ্যাসের মাধ্যমে দুনিয়াকে বিষিয়ে দেওয়ার সিংহভাগ দায় তো তাদেরই। বাৎসরিক সিওপি সম্মেলনে তাই অর্থের জোগান নিয়ে দড়ি টানাটানি চলে ধনী-দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে।
পৃথিবীর স্বার্থপরতম দেশের নাম হল আমেরিকা। ওই দেশটা নিজেদের ভাল ছাড়া আর কারও ভাল চায় না। প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের তারতম্যে মাত্রা কম-বেশি হয়। যেমন জর্জ বুশের আমলে তিনি বলেছিলেন, "আমাদের দেশের মানুষকে কষ্টে থাকতে দিতে পারিনা, ফলে আমাদের অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন" যার অর্থ দাঁড়ায় যে তারা গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে যাবে, আর সারা বিশ্ববাসী তার ফল ভোগ করবে, তারাও যে তার প্রভাব থেকে মুক্তি পাবে, এমনটাও নয়। এমন বুদ্ধির পরিচয় দিয়েই তিনি দু'টি টার্ম চালিয়ে গেছেন, ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে পারেননি। পাকিস্তান আর্মির ঘেরাটোপে আবোতাবাদে লুকিয়ে কাটিয়ে দিল নিশ্চিন্তে। এরপর ওবামার সরকার চলল পরপর দু'টো টার্ম ২০০৮-২০১৭। লাদেন ধরা পড়ল এবং তার বিচার হল ওবামার আমলেই। পরের চার বছর শুরু হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানা। ট্রাম্প অবশ্য জলবায়ু বিপর্যয়কে 'নিছক গুজব' বা 'গল্পকথা' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বহুবার। এ হল সেই ট্রাম্প, যিনি কোভিদ ভাইরাসের নিদান হিসেবে রোগীকে জীবাণুনাশক ইঞ্জেকশন দেবার উপদেশ দিয়েছিলেন। আরও কীর্তি আছে ট্রাম্পের ঝুলিতে। আমেরিকার ইতিহাসে তিনিই প্রথম কোনও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, যাঁকে ৩৪ দফা ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছিল নিউ ইয়র্কের এক নিম্ন আদালত। এই হ'ল আমেরিকার ভাবী প্রেসিডেন্টের পূর্বতন ইতিহাস, একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধানদের বুদ্ধির দৌড়। আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন দুঁদে ব্যবসায়ী। আর আমেরিকার সঞ্চিত জীবাস্ম জ্বালানির পরিমাণ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিতে, তিনি চান না, ওই দেশের অর্থ কোনও বাজে কাজে ব্যয় হয়। ফলে ২০১৭ তে প্রথম বার রাষ্ট্রপতি হয়েই ট্রাম্প আমেরিকাকে বার করে আনেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে। কারণ, তাঁর মতে, এই চুক্তিতে আমেরিকার পুরো লোকসান। এর ফলে আমেরিকাকে 'অহেতুকই' প্রচুর ডলার জোগাতে হচ্ছে রাষ্ট্রপুঞ্জের ভান্ডারে। আমার কলেজের এক বান্ধবী অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ওই দেশটিতে বসবাস করছেন। স্বভাবতই তাঁরা সেই দেশের নাগরিক, যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমি তাঁদের দু'নম্বর নাগরিক বলেই মনে করি। সদ্য শেষ হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অব্যবহিত পরে সে আমাকে একটা ছবি পোস্ট করে। ছবিটিতে দেখাচ্ছে যে একটা আবর্জনার ট্রলিতে দাঁড়িয়ে আছেন জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস, আর সেটিকে ঠেলে দিচ্ছেনট্রাম্প। এরপর কুশল বিনিময়ের ছলে টেলিফোনে কথা বলে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চায়। ট্রাম্পের নির্বাচন ফলাফলে আমার বিরূপ মন্তব্যে সে আমাকে অনেক জ্ঞানগর্ভ উপদেশ দিল, যার সারমর্ম "ট্রাম্প এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে মডেল অনুসরণ করবেন তাতে আমেরিকান মানুষ ভাল থাকবে"। এরপর আর কথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি হয়নি আমার। তবে মনে হয়েছে যে তৃতীয় বিশ্ব থেকে একজন "তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত " মানুষ ঐ দেশে বসবাস করে, মানসিকতা কি ভাবে পাল্টে ফেলেছে। আমার পরিচিত আত্মীয়দের এক-আধজন ওই দেশটিতে গিয়ে কালচার শক কাটাতে না পারায়, প্রথম ছ'মাস আমেরিকানদের বাপ-বাপান্ত করত। তারপর বুঝেছিলাম হয়তো যে ওই দেশের মাটি হল একটা ফাঁদ, যার নাম ডলার। ওই ফাঁদের আবর্তে একবার ঢুকে পড়লে আর বেরোনো যায় না। ফাঁদের আরও একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ দেওয়া যাক। বছর ৭/৮ আগে, ট্রাম্প তখন সদ্য ক্ষমতায় এসেছে। কানশাস রাজ্যের ওলাথে নামে একটা জায়গায় একটি রেস্তোরাঁয় শ্রী নিবাস কুচিবোটলা নামে এক ভারতীয় ছাত্র তার স্ত্রী আর দু'একজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে খেতে ঢুকেছিল। হঠাৎই, আমেরিকান নেভির এক সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অফিসার,অ্যডাম পিউরিনটন. হাতে বন্দুক উঁচিয়ে তার দিকে তেড়ে গিয়ে হুমকির সুরে বলে, "Get out of my country" নিজেকে কোনও রকম সুরক্ষিত হবার সুযোগ না দিয়ে, কালক্ষেপ না করে শ্রী নিবাসের মাথা থেকে পা পর্যন্ত গুলিতে ঝাঁঝরা করে তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। দুঃখের বিষয় হল এর পরেও শ্রী নিবাসের স্ত্রী ওই দেশেই থেকে যায়। আমেরিকার মাটি ফাঁদ ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি?
ফিরে আসি প্রসঙ্গে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুননির্বাচন, বাকুতে অনুষ্ঠিত সিওপি২৯ সম্মেলনকে পূর্ণগ্রাসের মতো যে আঁধারে ঢেকেছে, তা বলাই বাহুল্য। বোঝাই যাচ্ছে, প্যারিস চুক্তি থেকে পৃথিবীর ধনীতম এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ আমেরিকার সরে যাওয়াটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা যদিও, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হয়ে তাঁর কার্যকালের প্রথম দিনেই আমেরিকাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন প্যারিস চুক্তির চৌহদ্দিতে। আমেরিকার জীবাস্ম জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে আবার বার করে আনার কথা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প হইহই করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় সিওপি২৯ সম্মেলনটি।
ওভাল অফিসের দায়িত্ব নেবার অব্যবহিত পরেই তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা। ২০১৭ সালের মতই এবারও তিনি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে আমেরিকাকে প্যারিস চুক্তি থেকে বার করে এনেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সরে এসেছেন।
আমরা এক চরম জলবায়ু যুগে বাস করছি - আমাদের চার পাশে বিপর্যয় ঘটে চলেছে। কিন্ত এর সমাধানে যথেষ্ট চেষ্টা করছি না। আমরা একে অস্বীকার করছি না, কিন্ত এক সর্বজনীন স্বার্থে একযোগে কাজ করার মতো সমাজ হিসেবেও আর আমরা গড়ে তুলছি না। এই কারনেই আজারবাইজানের বাকুতে ২৯তম কনফারেন্স অব পার্টিজ-এ আমরা এক যৌথ সহযোগী বিশ্ব গড়ে তোলার ইচ্ছাপ্রকাশের ভানটুকুকেও ঝেড়ে ফেলে দিলাম। ধনী বিশ্ব সরকারি ভাবে জলবায়ু-অনুদানের নামে সামান্য খুদকুঁড়ো ছুড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এবং ঐতিহাসিক ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী এই বিশ্ব জানাল, অপর যে বিশ্বকে কার্বন-হীন উন্নয়নের পথটি নতুন করে ভাবতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে এবং ক্ষতির ধাক্কা সয়ে বেঁচে থাকতে হবে। এটা অপমান বইকি!
এইখানেই অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন আর রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তা এক সমৃদ্ধতর এবং নিরাপদতর বিশ্ব গড়ে তুলবে। দেশগুলো পরস্পরকে আক্রমণ করবে না, কারণ নিজেদের স্বার্থেই তারা সহযোগিতার পথে থাকবে।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন-এর আমলে আমেরিকায় পাশ হয় ঐতিহাসিক "ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট", যার ফলে অন্তত ৩৯০ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ করা হয়েছে বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি ইত্যাদি বিকল্প পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎপাদনে। ২০২৪-এর আমেরিকার ভোটটা যেন তাই এক অর্থে ছিল শক্তি উৎপাদনের দুই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী নীতির টক্করও। ভোটে জয়-পরাজয় কোনও একটা বিচ্ছিন্ন বিষয়ে নির্ধারিত না হলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকার জনতা কিন্ত বেছে নিয়েছে ট্রাম্পকে। Non white ভোটারের সংখ্যাও, ভারতের অভিবাসীর সংখ্যা যুক্ত করে নেহাতই কম নয়, প্রায় ছয় মিলিয়ন। এতেই বুঝতে পারা যায় যে আমেরিকায় বসবাস করে তাঁরা নিজেদেরকে কতটা পাল্টে ফেলেছে।

1 comment:
Khub guchiye juktipurno kotha likhechen. Kintu Trump ke ke bojhabe. Chora na shone dharmer kahini. Onek orther dorkar biswer jolobayo pochhonno rakhte. Ke debe oto anudaan? Kintu sorbonas je ghoniye aaschhe seta to sobai bujhte paarche. Ki hobe ke jaane.
Post a Comment