১৯শে জুন, ১৯৯৪, রবিবার রাত ন'টা। টেলিফোনের বেসুরো শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল অঘটনের ইঙ্গিত। খবর পেলাম শ্রীবিধানচন্দ্র রায় আর আমাদের মধ্যে নেই। তাৎক্ষণিক মানসিক প্রতিক্রিয়া ঠিক কী ধরনের হয়েছিল ঠিক মনে নেই। তবে শোকাকুল না হয়েছিলাম যতটা, বিস্মিত হয়েছিলাম তার অনেক বেশি। কারণ ঠিক তার দু'দিন আগেই, মানে শুক্রবার সকাল ১১টা নাগাদ মানুষটিকে দেখেছিলাম অফিসে; জুন মাসের ওই গরমে নিজের অফিস ঘরের সামনের করিডরে সোয়েটার গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে - দু'একটা কথার আদান-প্রদানে বুঝলাম তিনি অসুস্থ-"বিশেষ কিছু নয়, সর্দ্দি-জ্বর স্যার।" ছুটি নিয়ে বাড়িতে বিশ্রামের প্রস্তাবে ওঁর উত্তর- "কয়েকটা জরুরী কাজ বাকি আছে স্যার, তাড়াতাড়ি সেরেই বাড়ি চলে যাব।" নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস; তখনও তাঁর জানা ছিল না যে সেটাই ছিল তাঁর শেষ অফিসে আসা।
টেলিফোন নামিয়ে বিস্ময়ের ঘোর কাটতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল। আমার মনে হয় যাঁরা তাঁকে চেনেন, তাঁকে জানেন তাঁদের সবাইকার মনের অবস্থা আমার মতই হয়েছিল। কারণ এমন একজন কর্মব্যস্ত ছটফটে মানুষের জীবনহানির মত দুঃসংবাদে বিচলিত হওয়াই স্বাভাবিক।
বিধান চন্দ্র রায়, বি সি রায়, রায় বাবু, বিধান - সব একই মানুষের বিভিন্ন পরিচয়। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ১৫ বছরেরও বেশি। ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও একই প্রতিষ্ঠানে যাঁরা বহুদিন একসাথে কাজ করেন, যৌথ পরিবারের মতই তাদের মধ্যে একটা অব্যক্ত যৌথ স্বার্থ থাকে, পারস্পরিক একটা বোঝাপড়া থাকে। বলাই বাহুল্য যে এই বোঝাপড়ার মধ্যে কোন অশুভ আঁতাত থাকে না। শুধু তাই নয়, এই ধরনের বোঝাপড়া পদমর্য্যাদা নিরপেক্ষ, অন্তত আমাদের প্রতিষ্ঠানে। কারণ বিভিন্ন পদমর্য্যাদার কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কৈশোর পার করেছেন প্রতিষ্ঠানকে একটা জায়গায় দাঁড় করানোর সঙ্কল্প নিয়ে। প্রতিষ্ঠানের সুছ-স্বাচ্ছন্দ সবাইকার সমানভাবে জুটেছে, এমন কথা বলতে পারব না। তবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে হাসিমুখে দুঃখের ভাগ বহন করতে যাঁরা পিছপা হননি, বিধান রায় হাতে গোনা স্বল্প সংখ্যক সেই মানুষদের তালিকায় অবশ্যই প্রথম দিকের একজন।
মাত্র ছেচল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বহু মহৎ গুণের স্বাক্ষর রেখে গেছেন বিধানচন্দ্র। নানান কাজে ছিল তাঁর উৎসাহ এবং অস্বাভাবিক একাগ্রতা। গত কয়েক বছর যাবৎ ডিপার্টমেন্টের গাড়ি চলাচলের তদারকি করছিলেন তিনি। সরকারি দপ্তরে গাড়ির সংখ্যা সীমিত, দাবিদার অনেক। কাজেই আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও সবাইকার অনুরোধ সব সময় রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হ'ত না। তবে এজন্য তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছে, অনেক সময়ই তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে বিদ্রুপ। কিন্ত তাই বলে অভিমানবশত পশ্চাদপসরন করেননি তিনি।
চালচলনে তিনি ছিলেন সাদামাটা; অকৃত্রিম, সোজা কথার মানুষ। প্যাঁচাল মানুষজনের মত ভাষার কূটকচালি জানতেন না। স্মার্টনেস নামে ইংরেজি অভিধানে একটা শব্দ আছে যা এযুগের পৃথিবীতে খুব সহজেই বিকোয়। দায়িত্ব পালনের তাগিদে বিধান বাবুর দৌড়াদৌড়ি করার অন্ত ছিল না, কিন্ত তথাকথিত স্মার্টনেস ও বাকচাতুর্যের অভাবে তিনি শিকার হয়েছেন বিদ্রুপের, কখনও প্রকাশ্যে কখনও বা পশ্চাতে।নিয়মমাফিক নিয়ম মেনে অফিস করা তাঁর ধাতে ছিল না। তাই সকাল, সন্ধ্যে, ছুটির দিন- সব সময়ই তাঁর দেখা পাওয়া যেত অফিসে। দায়িত্বের স্বীকৃতি না পেলেও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার উৎসাহেই ছিল তাঁর প্রাণশক্তি। তাঁর কাজের উৎসাহ দেখে আমার মনে হয় তিনি এক অমোঘ সত্যকে প্রমাণ করেছেন - "সাফল্য আর সুখ এক জিনিস নয়।" বিধান বাবু কাজ উপভোগ করতেন। এর জন্য তিনি সময়মত আহার-নিদ্রাকেও বশীভূত করেছিলেন। মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারবর্গের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা আমার অনুমানকে মিথ্যে প্রমাণ করে না।
দুম করে রেগে উঠে পরক্ষণেই ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শীর্ণকায় মানুষটির বাহ্যিক আবরণে কঠোরতা প্রকাশ পেলেও হৃদয়ে তিনি ছিলেন কোমল। এ ব্যাপারে ঠিক প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেওয়া সম্ভব নয়; তবে যাঁরা তাঁর মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা সন্ধান পেয়েছেন তাঁর নিষ্পাপ কোমল হৃদয়ের ঠিকানা। তাঁর কঠোরতার ভাবটা ছিল অনেকটা এই রকম, "পাছে লোকে দয়ালচিত্ত বলে, এই লজ্জার আশঙ্কায় তিনি কাঠিন্য প্রকাশ করতেন। আসলে তাঁর রুক্ষ-শুষ্ক চেহারা আর বর্ণের তলায় লুকিয়ে থাকত একজন নির্ভেজাল সৎ, কাজপাগলা, পরোপকারী মানুষ।
অফিসের কাজে কর্মে কিছু কিছু কাজের চরিত্র এমন থাকে, যেখানে ব্যক্তিগত লাভের অনেক সুযোগ সুবিধা আছে। এমনই একটি স্পর্শকাতর জায়গার দায়িত্বে ছিলেন বিধান বাবু। আমার মনে হয় তাঁর নিন্দুকেরাও অভিযোগ করতে পারবেন না যে তিনি ব্যক্তিগত কাজে সরকারি সুযোগ সুবিধের অপচয় করেছেন। আত্মসম্মাণ, নির্লোভ ছাড়াও তাঁর চরিত্রে আর যে গুণটি যুক্ত হয়েছিল, তা হ'ল অল্পে সন্তুষ্টি। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে হৃদয়বান। কাজেই সরকারি সুযোগ সুবিধে থেকে ব্যক্তিগত লাভের ব্যাপারটা স্বাভাবিক অধিকার বলে মনে করতেন না।
সুপারভাইজার ট্রেনিং শেষ করে বম্বে থেকে ফিরে এসে উনি ট্রেনিং-এর অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানাচ্ছিলেন। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্ত করছিলেন ট্রেনিং-এ তাঁকে নির্বাচনের জন্য ডিপার্টমেন্টের কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতা। চরিত্রের এই অকপট সরলতা ভাবা যায় আজকের যুগে !!
নির্লোভ হলেও সংসারী সব মানুষের সামাজিক, সাংসারিক নানান বায়নাক্কা মেটাতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়। বাড়তি অর্থ উপার্জনের যে পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন সেটা তাঁর মত পবিত্র আত্মারই উপযুক্ত। ছুটির অবকাশে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সাইকেলে চেপে চলে গেলেন কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায়। দেখেশুনে, বেছে কিলোগ্রাম দরে কিনে আনলেন পুরোনো বই; অনেকগুলোই হয়তো তার মধ্যে দুষ্প্রাপ্য। তারপর সামান্য দামে সেগুলো বিতরণ করতেন উৎসাহী সহকর্মীদের। জানা নেই ব্যবসায়িক সাফল্য তিনি কতটা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তবে বইয়ের এই নেশা অবশ্যই প্রমাণ করে তাঁর চরিত্রের আত্মিক এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষের দিকটা। সব বইগুলো হয়তো বুঝে উঠতে পারতেন না। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ঠাহর করতেন দুষ্প্রাপ্য বইগুলোর উপজীব্য বিষয় এবং সেগুলো হাজির করতেন উপযুক্ত সহকর্মীদের কাছে।
মৃত্যু কখনও সুখের নয়। বিধান বাবুর মর্মান্তিক অকাল মৃত্যুতে আমরা খুবই দুঃখিত বরং বলব অধিকতর বিস্মিত। পরিবারবর্গকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়ে দায়মুক্ত হবার চেষ্টা করব না। তবে স্বজন বিয়োগের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দু'একটা কথা বলতে চাই; বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আকস্মিক দুঃখ-দুর্দশার মোকাবিলার জন্য মানুষের কোনও প্রস্তুতি থাকে না বলেই প্রথম আঘাতটা খুব গুরুতর মনে হয়।তবে এটাও খুবই সত্যি যে সময়ের আবর্তনে দুঃখের আবেগ স্তিমিত হয়ে আসে। ক্রমশ দুঃখ বিলুপ্ত হয়ে তার জায়গা দখল করে জীবিতাবস্থার মধুর স্মৃতি। আসলে ক্ষত শুকিয়ে যায়, দাগ থেকে যায়। পরমেশ্বরের কাছে প্রয়াত বিধান চন্দ্র রায়ের আত্মার শান্তি কামনা করি। ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি।

1 comment:
🙏আলাদা ধরনের সুন্দর মানুষটির আত্মার শান্তি কামনা করি
Post a Comment