• এই প্রবন্ধ প্রায় দু'দশক আগে লেখা। সেটা প্রবন্ধটি পড়তে পড়তেই বুঝতে পারা যাবে। ব্লগ তৈরির সুবিধে হ'ল, এখানে যাবতীয় সৃষ্ট লেখালেখি লিপিবদ্ধ করে রাখা যাবে। এটা পড়তে গিয়ে মনে হ'ল যে বিশ বছর আগে, কম্পিউটার এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ব্যাপারে ভবিষ্যতের গতিপ্রকৃতির কথা উল্লেখ করেছিলাম। সেগুলো সত্যি সত্যিই ঘটেছে।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ব জন্ম দিয়েছিল একটি বিখ্যাত ধারনার। ধারনাটা এরকম – বিশ্বব্রহ্মান্ডের যেখানেই বস্তু থাকে, সেখানেই চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের ভাঁজ পড়ে। স্পেস অর্থাৎ স্থান এবং টাইম বা কালকে আলাদা করে দেখার কোনও উপায় নেই, মিলেমিশে একাকার হয়ে তাদের নাম হয়েছে স্পেস-টাইম। বিংশ শতাব্দীর যুগান্তকারী দু'টি সৃষ্টিধর্মী কাজের এটি অন্যতম। অন্যটি কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা যা বলে বস্তুকণিকার অস্তিত্ব একই সঙ্গে বস্তু এবং তরঙ্গ। বস্তু কণিকা আসলে তরঙ্গ-কণিকা। কোনোটাই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এই মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে। আর কয়েকটা মাসের অপেক্ষামাত্র। শুধুমাত্র একটা শতাব্দীই শেষ হবে না। এক ধাপ এগিয়ে বলা যায় যে আধুনিক মানব সভ্যতা আমাদের জীবনে এই প্রথম মিলেনিয়াম বা সহস্রাবদীর মুখোমুখি হবে। সহস্রাবদীর এই সন্ধিক্ষণে পৌঁছে আমার সাদামাটা বুদ্ধিতে মনে হচ্ছে যে স্পেস জোড়া তথ্যের ভারে মহাকর্ষ আজ কেন্দ্রীভূত হয়েছে ইন্টারনেটের অজস্র তথ্য আর আর কিছুটা তথ্য আবর্জনায়। স্পেসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে শুধু তথ্য আর তথ্য। আর সেই তথ্য মন্থনের কাজ নাকি কেড়ে নিয়েছে অগুনতি ছাত্র-ছাত্রীর অনেকটা সময়। ইন্টারনেটের হামলায় ছাত্র-ছাত্রীরা নাকি বই-কাগজকে ছুটি দিয়ে সাইবার স্পেসে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। কথাটা অসত্য নয়, আবার, পুরোপুরি সত্যিও নয়। কারণ, বইমেলার ভিড়ের একটা বড় অংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী বলে মনে হয়েছে। সুতরাং এটাও মনে হয়েছে যে চটকদার ইলেকট্রনিক মিডিয়া হানায় মানুষ এখনও অক্ষর ভুলে যায়নি। প্রশ্ন হ'ল বইমেলা না ইন্টারনেট ? না দুটোই ? কিছু তুলনামূলক, থুড়ি, আপাত তুলনামূলক আলোচনাই আমার মূল উদ্দেশ্য। আপাত কথাটা বলছি এই জন্য যে দুটোর উদ্দেশ্য এক নয়। তবুও আলোচনা যেহেতু বিষয় দুটোকে ঘিরে, অবচেতনে তুলনা একটা এসেই যায়।
বইপড়ার অভ্যাসের ব্যাপারটা দিয়েই শুরু করা যাক আলোচনা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বই পড়া আজকাল সাধারণ মানুষ এবং পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা বাহুল্য বলে মনে করে। মন্তব্যের সমর্থনে সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় বইমেলা সম্পর্কিত আলোচনার প্রাসঙ্গিক একটি লাইন তুলে ধরছি – “ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রন্থ মাত্র সাতশো ছাপিয়ে প্রকাশককে বছরের পর বছর বসে থাকতে হয়।“ ইন্টারনেট ইন্টারনেট রব তুলে আধুনিক জগতে সাময়িকভাবে হয়তো একটু এগিয়ে থাকা যায়। তবে তা বই পড়ার ব্যর্থতাকেও আড়াল করে। এটা এক ধরনের মানসিক দেউলিয়াপনা। মনে রাখা দরকার যে বইপড়া সহজাত, ইলেকট্রনিক মিডিয়া যান্ত্রিক। যান্ত্রিক জিনিস আধুনিক সভ্যতার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিফলিত হলেও যান্ত্রিক ব্যাপারস্যাপার গুলো কোনও না কোনও সময়ে বৈচিত্র্যহীন একঘেঁয়ে হয়ে উঠতে বাধ্য। একগুচ্ছ খবরের বোঝা মাথায় ভরে আখেরে কিছু লাভ আছে কি ? পাঠক ভুল বুঝবেন না আশা করি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ভর করে তথ্য সংগ্রহ আর বই-কাগজ পড়ার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। আজকের দিনে বরং একটি অন্যটির পরিপূরক। বহু বিজ্ঞান গবেষকের সঙ্গে পরিচয় থাকার সুবাদে দেখেছি যে ইন্টারনেট হাতড়ে নির্বাচিত প্রাসঙ্গিক তথ্যের অংশটুকু ছাপিয়ে নিয়ে পড়তেই তাঁরা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কিন্ত একই সঙ্গে তথ্য নির্বাচনের ব্যাপারে ইন্টারনেটের সুবিধেগুলোকেও অনস্বীকার্য বলেও মনে করেন। বই কাগজের গন্ধ, নতুন বইয়ের পাতাগুলো, তা সে যত সস্তা কাগজের হোক না কেন- তা উল্টেপাল্টে দেখা আর মাউস ক্লিকে ইন্টারনেটের হালফিল খবরের মধ্যে বিচরণ ঠিক এক ধরনের অনুভূতির উদ্রেক করে না। ইন্টারনেটে পড়ার মধ্যে ডিসিপ্লিনের বাঁধাধরা ব্যাপারটা মগজে পুরে পড়তে হয়। ফলে পড়ার মধ্যে কৃত্রিমতা এসে গিয়ে চিন্তার স্রোতগুলোকে মাঝে মাঝেই ভেঙে দেয়। ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের কথাই ধরা যাক। রঙীন স্ক্রীনের উপর সাজানো রয়েছে রঙ-বেরঙের তথ্যের ডালি। কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরব ! তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া – সবগুলোই তো জানতে ইচ্ছে করছে। যাইহোক, একটাকে নিয়ে শুরু করা গেল। হাইপারটেক্সেটের হাতছানি অবচেতনে নিয়ে চলে গেল অন্য এক তথ্য জগতে। সেখান থেকে আরও একটায়……। তথ্য এনসাইক্লোপেডিয়ায় এই যে ছোটাছুটি, লাফালাফি, বই পড়ায় সেই সুযোগ না থাকার কারণেই মনোনিবেশ হতে বাধ্য। বিষয়ের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ার কোনো উপায় নেই। ব্রাউজিংয়ের সময় এমনও হয় যে, যেটা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল সেটা ভুলেই গেলাম। এ যেন চাল কিনতে বেরিয়ে ডাল কিনে ফিরে আসার মতো। কাজের কাজ বিশেষ কিছু হ’ল না।
“ইন্টারনেট ইজ টু বই ইকুয়্যালস্ টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ ইজ টু মাঠে ঢুকে দেখা ম্যাচ।“ টেলিভিসনের পর্দায় ম্যাচ দেখা আর মাঠে ঢুকে ম্যাচ দেখার তফাত তো থাকবেই। টিভিতে খুঁটিনাটি গুলো তো রিপ্লেতে বারবার দেখতে পাবার সুযোগ আছে। তবু অদৃশ্য অদেখা শূন্যতা কিছু থেকেই যায়। মাঠের ম্যাচ দেখার অনুভূতিতে যে সম্পূর্ণতা তা টিভিতে পাওয়া সম্ভব নয়।
হাইপারটেক্সট ব্যাপারটা প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি। ক্রস রেফারেন্সের সুবিধের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে তৈরি করা ইন্টারনেটের সংরক্ষিত তথ্যকে হাইপারটেক্সট আখ্যা দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠিত এবং অভিজ্ঞ গবেষক মহলে আড্ডার মেজাজে বিষয়টা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। তাঁদের কথার সারমর্ম ভাষায় ব্যক্ত করলাম, “মানসিক ও দৈহিক গঠনের সঙ্গে বইপড়ার যে মেলবন্ধন, সেটা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে পাওয়া সম্ভব নয়।“ আমার মনে হয় তাঁরা হয়তো বলতে চান যে বই হাতে নিয়ে শুয়ে বসে বা চায়ের টেবিলে পড়ার যে ঘরোয়া বিলাসিতা, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সেটা হয় না। আসলে ডিসিপ্লিনের সঙ্গে আড়ষ্টতার ব্যাপারটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। ইন্টারনেটে পড়া ভীষণভাবে ডিসিপ্লিন্ড। শৃঙ্খলা বস্তুটা সব ক্ষেত্রে কি মানায় ? আরও একজন সুপন্ডিত গবেষকের মন্তব্য, “ওভারহেড প্রোজেক্টার লাগিয়ে বড় পর্দায় সেমিনার শোনার আড়ষ্টতা আর ব্ল্যাকবোর্ড-চক-ডাস্টার ব্যবহার করে ক্লাস করার সহজ পরিবেশের যে তফাত, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে বইয়ের পার্থক্য অনেকটা সেরকম। তবে দুটোরই প্রয়োজন আছে।“
ইন্টারনেটের চটজলদি ব্যাপারটায় সুবিধে-অসুবিধে দুইই আছে। খবরের ক্ষিদেয় মানুষ যখন প্রায় দিশেহারা, অব্যবহিত সেই খবরটা পাওয়ার ব্যাপারে এর আর জুড়ি নেই। কিন্ত এ তো আর লাইফ সেভিং ড্রাগ নয়, যে খবর জেনে মানুষ জীবন ফিরে পাবে। কাজেই চট্ করে পাওয়া বেশিরভাগ খবরের গুরুত্ব চট্ করে ফুরিয়ে যায়। সহজলভ্য সবকিছু পাওয়ার মধ্যে এমনটাই হয়ে থাকে।
ইনফরমেশন টেকনোলজি, সংক্ষেপে আই টির-দাপটে পৃথিবীটা ছোট হতে হতে বৈঠকখানায় ঢুকে গেছে।। একই সঙ্গে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে সব রুচির মসলার খবরে খবরে পৃথিবীটা ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মনের পৃথিবীটা কি বলে ? সমাজবদ্ধতা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক- এগুলো আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। সময় নেই কারোরই, বিশেষ করে পড়ুয়াদের। তারা মনের মতো করে আড্ডা মারতেও ভুলে গেছে। রুচির বেড়াজাল না টপকে আড্ডা চর্চাও তো এক ধরনের শিল্পচর্চা। আমার মনে হয় মনের ঈপ্সিত ইচ্ছেগুলোর উপকরণ, উপযুক্ত বই-কাগজ এবং পারস্পরিক আলোচনাতেই পাওয়া যায়। ছোটবেলায় দেখতাম যে স্কুল বা কলেজ ডিঙোনো ছেলে-মেয়েরা বাড়তি সময়টাকে কাজে লাগাতো টাইপ-শর্টহ্যান্ড স্কুলে ভর্তি হয়ে। বাবা-কাকারাও মনে করতেন যে এটা জানা থাকলে ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। আজকের টাইপ স্কুল আর টাইপ মেশিনের জায়গা নিয়েছে যথাক্রমে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর কম্পিউটার। এটা ভালই এবং সময়োপযোগী। কারণ আর্থসামাজিক দিকটার কথা ভেবে যুগের সঙ্গে কিছুটা তাল মিলিয়ে চলাই ঠিক। এর বেশি কিছু নয়। কম্পিউটার- ইন্টারনেট করতে গিয়ে সেটাই ধ্যানজ্ঞান মনে করে ছাত্র-ছাত্রীরা যেন বুদ্ধিচর্চায় ব্রেক না কষে, সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা না হয়ে যায়, বই-কাগজের ছাপা অক্ষরের সঙ্গে সম্পর্ক যেন ছিন্ন না হয়।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া তথা ইন্টারনেটের প্লাস পয়েন্টগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে সাংবাদিকতা। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রভাবে সাংবাদিকতার মান আজ অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। দশ-বারো বছর আগেও বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষাতেও হয়তো দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকাগুলোর তথ্য পরিবেশনের মধ্যে কোনও বৈচিত্র্য থাকতো না। আজ পত্র-পত্রিকার সংখ্যা শুধু যে বেড়েছে, তাই না, উপরন্তু নিয়মিত তথ্য ছাড়াও তাতে পাওয়া যাচ্ছে বিজ্ঞান, সাহিত্য, যাবতীয় শিল্পজগতের আলোচনা এবং সমালোচনা। সুতরাং জেনে নেবার পরিধি এবং লেখাচর্চার সুযোগ বেড়েছে বই কমেনি। বিজ্ঞাপনের জগতেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জুড়ি নেই। সব রুচির জন্যই বিজ্ঞাপনে আজ যে বৈচিত্র্যের ছড়াছড়ি, তা সম্ভব হয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দৌলতে।
কট্টর ইন্টারনেট বিরোধী মানুষজনকে বলতে শুনেছি যে, সাইবারস্পেস নাকি দূষণের দখলে। ইউজনিটের পর্নোগ্রাফিক ছবির ভিড় আর অশ্লীলতার মুখরোচক খবরের দৃষ্টান্ত অস্বীকার করা যায় না ঠিকই। কিন্ত দূষিত বই-কাগজের অভাবও কি কম আছে ? এমনকি ঝকঝকে আধুনিক লেখকের রগরগে ভাষায় মেশানো সাহিত্যকতা মাঝে মাঝেই মিশে যায় নির্ভেজাল অশ্লীলতার সঙ্গে এবং নামী সাহিত্যিকদের সৃষ্ট অশ্লীলতা সাহিত্যগুণেও উত্তীর্ণ হয়। নামী শিল্পীর বিকৃত (আমার মতে) শিল্পকলা শিল্পগুণে বিবেচিত হওয়ার নজির ভুরি ভুরি আছে। নগ্ন নারীদেহের বিকৃত ভঙ্গীর মধ্যে কোথায় যে শিল্প লুকিয়ে আছে, সেটা আমারও জানা নেই। নামী লেখক বা শিল্পীর স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের সৃজনশীলতার স্বাধীনতা এবং মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হয়। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নামী-দামি তকমার লেবেল একবার পড়ে গেলে, বাকিটা ভারে কাটে তা সে যে বিষয়েই হোক না কেন। যাইহোক, ব্যাপারটা আপেক্ষিক এবং বিতর্কিত।
বব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহারকে আমি আদৌ ছোট করে দেখছি না। কারণ, বিজ্ঞান গবেষণায় গবেষকদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় ভৌগোলিক দূরত্ব যাতে বাধা না হয়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যেই এর সৃষ্টি। পরে তার নানাবিধ সুযোগ সুবিধে নিয়ে বানিজ্যিক প্রয়োগক্ষেত্র বিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্রকে বহুগুণ ছাপিয়ে গেছে। সেটা খুবই ভালোর দিক। আমি নিজেও ইন্টারনেটের একজন উৎসাহী ব্যবহারকারী। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের চমক আর ঝলকের দিকটাকে বড্ড বেশি তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ্য করছি।
তাহলে কোনটা ? বই না কম্পিউটা চালিত মিডিয়া ?আমার মনে হয় এখনও পর্যন্ত বই এর বিকল্প নেই। সুস্থ, সামাজিক সব স্তরের মানুষের কাছে তা সমাদৃত। বেশ কিছু বছর আগে বইমেলায় বই এর ভূমিকা সম্পর্কে স্বনামধন্য একজন ব্যক্তিত্ব একটি মন্তব্য করেছিলেন। মন্তব্যটা এরকম, “বইমেলার তাৎপর্য এই যে এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা, দু তরফের লাভ। একজনের ব্যবসায়িক সাফল্য অন্যজনের উৎকর্ষের সহায়ক।“ এই মন্তব্যের খেই ধরে কল্পনানেত্রে আরও একটা দৃশ্য ভেসে উঠেছে। বই এর বদলে টার্মিনালে টার্মিনালে ছয়লাপ সাইবার কাফে, তথ্য আর খবরের পশরা সাজিয়ে বসে আছে। এক্ষেত্রেও ক্রেতা এসেছেন গাঁটের কড়ি খরচ করে তথ্য কিনতে, মানে ইন্টারনেট থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে। কাফে মালিকের ব্যবসায়িক সাফল্যে কোনও সন্দেহ নেই। তবে ক্রেতার আত্মিক উৎকর্ষের সঙ্গে যোগ হয়েছে মাউস ক্লিকে ইন্টারনেট হাতড়ানোর পাওনা সময় খরচ হয়ে যাবার মানসিক উৎকন্ঠা।
বিষয়টি আলোচন করতে গিয়ে চার-পাঁচ দশক আগে লেখা যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাস এর একটি লাইনের কথা মনে পড়ছে। “ বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।“ ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আবেগবর্জিত বেগের সুগন্ধ-দুর্গন্ধ দুই-ই আছে বলে আমার মনে হয়। তবে যাযাবরের যুগের সঙ্গে তুলনা করলে আজকের পৃথিবীর চেহারাটা অনেকটাই আলাদা। মানুষকে আজ প্রতিপদে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। কাজেই আধুনিক সাজ-সরঞ্জাম যে প্রয়োজন, তা অনস্বীকার্য। আমার মনে হয়, চিন্তাভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে পারলে আজকের দিনে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে বাড়িয়ে নেবার সুযোগ আছে।
দশ-পনেরো বছর আগেও রেফ্রিজারেটর, রান্নার গ্যাস বা টেলিফোন মধ্যবিত্তের কাছে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। আজকাল সেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। ইন্টারনেটের অবস্থাটা সেরকমই হতে চলেছে। আমার মনে হয় আগামী দশ বছরের মধ্যে মাল্টিমিডিয়ার সুযোগ সুবিধে নিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে আই টি-র লম্বা হাত। দরকার হবে না টিভি কিম্বা টেলিফোন এমনকি সাউন্ড সিস্টেমের, অল ইন ওয়ান। নতুন থেকে নতুনতর প্রজন্মের রুচিও আস্তে আস্তে পরিবর্তন হচ্ছে। স্বাক্ষরতার চেয়ে বড় হয়ে উঠচে কম্পিউটার লিটারেসি। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা সুকুমার রায়, লুইস ক্যারল পড়েনি, পড়েনি ঠাকুমার ঝুলি কিম্বা সত্যজিত রায়। কিন্ত তারা কম্পিউটার লিটারেট। বিয়ে, জন্মদিন বা পরীক্ষা পাশের জন্য আজকাল বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ উঠে গিয়েছে। বলাই বাহুল্য বই এর কদর দিনে দিনে কিছুটা কমছে। তাই বলে কি লেখকরা কলম ধরবেন না! নাকি প্রকাশকরা প্রকাশনা বন্ধ করে দেবেন! আমার মনে হয় ধুন্ধুমার এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বই-কাগজের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যত বাঁচিয়ে রাখতে হলে লেখক ও প্রকাশকের অস্ত্রে এখন থেকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে শাণ দিতে শুরু কথা উচিত। সত্যিকারের বই পড়ুয়া মানুষের ভরসা এখনও একটুও কমেনি।
No comments:
Post a Comment