স্বপনকুমার দে
' না চাহিলে যারে পাওয়া যায় '- সে যদি আচমকা এসে পড়ে ! বছর কয়েক আগে এমনটাই ঘটেছিল আমার জীবনে। চাকরিতে অবসর নেবার পর কম্পিউটার ব্যবহারের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল। চাকরি জীবনের সিংহভাগ সময়টা এই যন্ত্রটার সঙ্গে ঘর করার পর, তথ্যসমৃদ্ধ দুনিয়ায় এটাকে ব্যবহার করতে না পারাটা যখন সভ্যতার সঙ্কট বলে মনে হয়েছে, ফলে নিজের অস্তিত্বকে কিছুটা অকিঞ্চিৎকর বলেও মনে করতে শুরু করেছি, ঠিক তখনই এমন একটি যন্ত্র আমাকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছিল। একটা ট্যাব। এটা ছেঁটে ফেলা নাম। আসল নাম ট্যাবলেট , শক্তিশালী একটি কম্পিউটার। আমার ছেলে-বৌ এই উপহারটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। হাজারো অপ্রাপ্তির দুঃখবোধ আমাকে কখনও নাড়া দেয়নি। কিন্তু এই পাওয়াটার মধ্যে একটা অন্য স্বাদের আনন্দ অনুভব করেছিলাম। শরীরটা বেশ কিছুদিন ভাল যাচ্ছিল না। যন্ত্রটা হাতে পেয়ে ক্ষণিকের জন্য মনটা রঙ্গিন হয়ে উঠেছিল, হয়তো মুখাবয়বের কিছু ভাবান্তর ঘটেছিল, ভাঙাচোরা মুখের চেহারায় বোধহয় একটা তৃপ্ত খুসীর বলয় তৈরি হয়েছিল। কারণ পরক্ষণেই ছেলে বলল ' অনেকদিন বাদে তোমাকে আজ বেশ চাঙা লাগছে, এখন থেকে তুমি এটা ব্যবহার করবে।'
চাকরিতে অবসরের পর এমনিতেই একটা মুক্তির স্বাদ। সঙ্গে এমন একটা হাইটেক সঙ্গী। মনে হ'ল পৃথিবীই আমার ঘরে, বরং বলব আমার বিছানায়। চাকরির শেষ দশকে মন দিয়ে হাতে কাজ করার সুযোগ ছিল না। পদমর্যাদায় যাঁরা একটা জায়গায় পৌঁছে যান, তাঁদের কারুরই হয় না। যাইহোক, তখন ট্যাবের মত এত উন্নতমানের যন্ত্র ভারতের বাজারে আসেনি। আকৃতিতে অনেক গুণ বড় ছিল। তবে কার্যকারিতার দিক থেকে যন্ত্রগুলোর মৌলিক তফাৎ বিশেষ কিছু ছিল না। সহকর্মীদের কাঁধে ভর করে যন্ত্রটিকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নেওয়া যেত। কাজেই সময়ের অভাবে, বিশেষ করে মনোনিবেশ করার মতো সময়ের অভাবে হাত লাগিয়ে কাজ করার তাগিদও তেমন অনুভব করিনি। কম্পিউটারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সচেতনভাবে একটা অপরাধ বোধও ছিল। অথচ অবচেতনে একটা আকর্ষণও অনুভব করতাম।
অবসর নেবার পর ভেবেছিলাম কম্পিউটার সংক্রান্ত ব্যাপারে নিজেকে আর জড়াবো না। কিন্তু সময়ের চাহিদা আর পরিস্থিতি আমাকে আবার এই জগৎটার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলল। আমলাতান্ত্রিক বা কর্পোরেট কায়দার অনাবশ্যক এবং স্বল্পস্থায়ী উচ্চাভিলাষ না থাকার ফলে চাকরির জীবনটা আমার বেশ শান্তিতেই কেটেছে। সেই কারণেই হয়তো চুলগুলো আজও মাথা ছেড়ে বিদায় নেয়নি আর তাতে তেমন পাক-ও ধরেনি। যাইহোক, চাকরিতে যতটুকু দায়ীত্ব ছিল তার স্বীকৃতি পেয়েছি। চাকরি জীবনটা আমি রীতিমতো উপভোগ করেছি; সহকর্মীদের সান্নিধ্য আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। সাদামাটা আত্মতুষ্ট মধ্যবিত্ত জীবন কাটানোর মধ্যে হঠাৎ এই যন্ত্রটার আবির্ভাবে মনে হ'ল চাকরির জীবনটা আবার ফিরে পেলাম। সবে নাড়াচাড়া শুরু করেছি, তখনও চালু করা হয়নি। প্রশস্থ পর্দার ওপর নিজের মুখের আবছা ছায়াটা দেখে অতীতের দিকে পিছু হেঁটে চললাম। মনে হ'ল দু-দশক আগে আমার চাকরি জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখছি; যখন আমার মতো হাতে গোনা ভাগ্যবান কিছু মানুষের আওতায় এই সুবিধেটা ছিল।
দীর্ঘ তেত্রিশ বছর কম্পিউটার ব্যবহার করেছি। চাকরির জীবনে নানান্ আঙ্গীকে য্ন্ত্রটিকে দেখার এবং ব্যবহার করার সুযোগ হয়েছে। কিন্ত এত ছোট চেহারায় গ্যাজেটটি আমার কাছে আগে ধরা দেয়নি। এতটা নিজের মতো করেও কখনও পাইনি।, যেন একটা চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া, বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার এক অদ্ভুত মিশেল, যেন জীবন্ত মানুষ। ছেলে-বৌ এর দেওয়া অমূল্য এই উপহার আমাকে নতুন অধ্যায় শুরু করতে সাহায্য করেছিল। লাগামছাড়া বিশ্বায়নের সঙ্গে অন্তত কিছুটা তাল রাখতে যন্ত্রটা আজ সকালের চায়ের মতোই অপরিহার্য। শরীর আগের তুলনায় অ-শক্ত হয়ে পড়ার ফলে অনেকটা সময় ধরে বসে কী-বোর্ডের বোতামগুলো টিপতে ধৈর্যচ্যুতি হতো। ক্ষুদ্রাকৃতি যন্ত্রটা বিছানায় শুয়ে বই পড়ার ঢঙে ধরে আঙ্গুল বোলাতে আদৌ তেমন অসুবিধে ছিল না; প্রথমের দিকে সামান্য আড়ষ্টতা থাকলেও, ব্যবহারে অভ্যস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে কবে যে সচ্ছন্দে এসে গেল টেরই পেলাম না। আসলে বহু বছরের অনভ্যাসের আড়ষ্টতা কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে সময় তো লাগবেই, অন্তত এই বয়সে ! কাজেই শরীর যতদিন পুরোপুরি জবাব না দিচ্ছে, এটা একটা ভাল সঙ্গী হয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়ে যাবে বলে আশা করছি। আপাতত নেটের জানলা দিয়ে চলমান বর্তমানকে দেখতে শুধু ভালই লাগে না, বিছানায় বসেই বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেওয়া ছাড়াও আমার অনেক অফিসিয়াল এবং পছন্দের কাজ করে নিতে পারছি।
ইন্টারনেট- এক কথায় যার উপস্থিতি ভৌগোলিক পরিসরের সাবেকি ধারনাকে মানুষের মন থেকে মুছে দিতে পেরেছে। এ-ব্যাপারে সামান্য কিছু বলে নিতে চাই। প্রত্যেক সৃষ্টির পেছনে ধ্রুবতারার মতো একটা পথপ্রদর্শক থাকে। তাঁরা নেপথ্যেই থেকে যান। সুদূর জেনিভার সার্ন গবেষণাগারে সেই সময়ে কর্মরত, এই ইংরেজ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, টিম বার্নার্স লী এমনই একজন বিজ্ঞানী , 1989 সালে প্রকাশ করলেন তাঁর গ্লোবাল হাইপারটেক্সট প্রজেক্ট। এখান থেকেই শুরু হ'ল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা www । ওয়েবের হাত ধরে যাবতীয় গবেষণা এখন আর ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে নেই। শুধু তাই নয়, আজ ওয়েবের বানিজ্যিক ব্যবহার নিরানব্বই শতাংশের বেশি। এখানে একটা কথা বলে রাখা খুব জরুরি বলে মনে করছি। কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে এই গূঢ় তত্ত্বটি তলিয়ে দেখার সুযোগ নেই। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মৌলিক আবিষ্কারের ঘটনাগুলোকে অনুধাবন করলে বুঝতে পারা যায় যে, উন্নত টেকনোলজির যে সুবিধেগুলো, ক্ষেত্রনির্বিশেষে আজ আমরা ভোগ করছি, সেগুলো বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণার ফসল। পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীকুল এক লহমায় বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদান করেন ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে। লী সাহেবর মস্তিষ্কপ্রসূত হাইপারটেক্সট্ হ'ল, পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইউনিভার্সিটি এবং বিজ্ঞান গবেষণাগার গুলোর বৈজ্ঞানিকদের প্রাসঙ্গিক তথ্য আদান-প্রদানের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং তথ্য ভান্ডারের পারস্পরিক যৌথ প্রক্রিয়ার এক অভূতপূর্ব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। শুরুতে শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিকদের চাহিদা মেটাবার জন্য সৃষ্টি হলেও, ব্যবহারিক ক্ষেত্রের বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলতে বিশেষ সময় লাগেনি। টিম বার্নার্সের ভাবনার ফসলকে প্রযুক্তির মোড়কে ভরে হাইপারটেক্সটের ব্যবহার আজ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে যে কতটা প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা ইন্টারনেট ব্যবস্থার বাণিজ্যিকরণের সাফল্যে বুঝতে পারা যায়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জাল আজ সারা বিশ্বকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে হাইপারলিঙ্কের সূতো দিয়ে। হাইপারলিঙ্ক ! সেটা কি ?! হাইপারলিঙ্ক হ'ল একটা বড় টেক্সটের জায়গায় জায়গায় এক একটা শক্তিশালী গ্রন্থী যা চিহ্নিত করার জন্য অন্য বর্ণে রঞ্জিত করে রাখা হয়। এই রাঙা শব্দগুলোর ওপর মাউস ক্লিক করলে বা আঙুলের ডগা দিয়ে স্পর্শ করলে পৃথিবীর যে কোনো সার্ভারে রাখা প্রাসঙ্গিক তথ্যকে, তা টেক্সট্, গ্রাফিক্স, অডিও ভিডিও- যাই হোক না কেন, গেঁথে ফেলে গ্রাহকের কম্পিউটারে পৌঁছে দেয়। কাজেই রাশি রাশি খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার কাজটা অর্থাৎ, যে কোনো তথ্যের যাবতীয় প্রাসঙ্গিক অংশের হদিস পাওয়া আর শ্রমসাধ্য বা সময়সাপেক্ষ বলে মনে হবে না। শুধুমাত্র তথ্যের ব্যাপারে সচেতনতা দরকার। অর্থাৎ কি খুঁজছি, কেনই বা খুঁজছি সেটার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যবহারের অভ্যাসে সেই অভিজ্ঞতা অচিরেই হয়ে যাবে।
কিছুদিন আগেও ইন্টারনেট মানে ছিল কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন, মোডেম জাতীয় বিভিন্ন যন্ত্রের এক বিচিত্র রসায়ণ। কিন্তু আজ স্মার্টফোন আর ট্যাবের মধ্যে দিয়ে বাড়ির বৈঠকখানায় এসে হাজির হয়েছে এবং আগের তুলনায় নামমাত্র খরচে। তার মানে ওইগুলোর কি আজ প্রয়োজন নেই ! না ওই কাজগুলোই হয় না ? সবই হয়, ক্রমবর্ধমান উন্নততর টেকনোলজির ফলে ওই যন্ত্রাংশগুলোকে আর আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। হার্ডওয়্যার এত আঁটোসাটো হওয়ার ফলে হার্ডওয়্যারের বিশ্বস্ততাও এক লাফে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে জুড়ে থাকা হার্ডওয়্যারের প্রত্যেকটা জোড়, বিশ্বস্ততার দিক দিয়ে একেকটি দুর্বল লিঙ্ক। সোজা কথায়, জোড়া দেওয়া কোনো জিনিসই তেমন মজবুত হয় না।
প্রথম যুগের কম্পিউটার থাকতো ঘর জুড়ে। সেখান থেকে জায়গা করে নিল টেবিলে, পরবর্তী ধাপে টেবিল থেকে কোলে, আর আজ কোল থেকে হাতের মুঠোয় উঠে এসেছে। বিছানায় শুয়ে চা খেতে খেতেই দিব্যি কাজ সেরে নেওয়া যায়। আরামবিলাসি বাঙালিদের তো পোয়াবারো। একটা ছোট্ট গল্প মনে পড়ে গেল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এক ইংরেজ মহিলা বাঙলায় পৌঁছে বাঙালিদের ভাবগতি দেখে মন্তব্য করেছিলেন "এদের কাছে দাঁড়ানোর থেকে বসা ভাল, বসার পরেই মনে করে বরং শুয়ে পড়াই শ্রেয়" । কিন্তু বিশ্বনিন্দুকেরাও বাঙালির সৃজণশীলতার গুণকে অস্বীকার করেন না। কাজেই এই ব্যবস্থায় অলস বাঙালি নিশ্চিন্তে খাটে শুয়ে বা বসে চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে স্মার্টফোনের পর্দায় আঙুলের ডগা বুলিয়ে যার সঙ্গে খুসী দেদার আড্ডা জমাতে পারে বা নেট সার্ফ করে প্রয়োজনীয় তথ্যের অনুসন্ধান করতে পারে। কৃপণ বাঙালির সব সময় চেষ্টা, বাজারে গিয়ে সস্তায় কি করে সবচেয়ে ভাল জিনিসটা কিনে নেওয়া যায়। ইন্টারনেটের এই পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা বাঙালির কাছে আজ এক আদর্শ ব্যবস্থা। ইন্টারনেট ব্যবহারে খরচের অঙ্কটা এখন আর হাজার হাজার নয়, সাধারণ ব্যবহারের জন্য, আমার মতে যেটা যথেষ্টই কম ; কয়েক'শ টাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। কাজেই আজ এই ইঁদুর দৌড়ের যুগে ইন্টারনেটের ব্যবহার, সৃজণশীল অলস এবং আমার মতো কৃপণ বাঙালির কাছে প্রতিযোগিতার বাজারে টিঁকে থাকার একটা বাড়তি সুযোগ বইকি।
গ্লোবালাইজেসন কথাটা গত এক দশকে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। আমার মনে হয় আসল গ্লোবালাইজেসন হয়েছে একমাত্র তথ্যের আধিকারে, ইন্টারনেটের হাত ধরে। হাতের মুঠোয় কম্পিউটার আর অন্তরীক্ষে স্যাটেলাইটের সুবিধে নিয়ে ইন্টারনেটের জাল, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, সারা পৃথীবীকে আজ বেঁধে ফেলেছে। ফলে নেট আজ সবার নাগালে- গণতন্ত্রের এক আদর্শ উদাহরণ। এ গণতন্ত্র, সংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় (!) মানুসের জাত-ধর্ম বিচার করে এবং নিয়মগুলো বাঁকিয়ে চুরিয়ে নিজেদের সুবিধেমতো খোপে ভরে নেওয়া গণতন্ত্র নয়। এ হ'ল সত্যিকারের গণতন্ত্র- তথ্যের অধিকার, তথ্য পাবার গণতন্ত্র। শেষ পর্যন্ত এই পথেই যে মোক্ষলাভ হবে, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না, কারণ নেট ব্যবহারের সামাজিক কুফলের দিকটাও আজ বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে। পরে আলোচনায় আসছি। তবে নেটের গণতান্ত্রিক চরিত্রটা প্রশ্নাতীত।
যে কম্পিউটার যাত্রা শুরু হয়েছিল জটিল হিসেব নিকেশের সুবিধার জন্য, আজ যোগাযোগ, তথ্য বিনিময়, মনোরঞ্জন প্রভৃতি কাজেও এক অপরিহার্য মাধ্যম। এটা এখন আর শুধুমাত্র বিজ্ঞানী বা পেশাদারদের জন্য নয়, আমজনতার জন্যও বটে। আজকের প্রজন্মের কম্পিউটার সিস্টেমগুলো তাই প্রায় জনমুখী। এই প্রচেষ্টার একদিকে যেমন রয়েছে মাউস, টাচস্ক্রীন আর গ্রাফিক্স আইকনের সাহায্যে কী-বোর্ড ছাড়াই সার্ফ্ করার সুবিধে, অন্যদিকে সত্যিকারের জনমুখী করার তাগিদে ভাষা প্রযুক্তির প্রয়োগ। ফলে ইংরেজি ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে আজ। ইউনিভার্সাল কোড বা ইউনিকোড আজ প্রায় সারা পৃথিবী স্বীকৃত। এর আওতায় রয়েছে বাইশটি ভারতীয় বর্ণমালা সহ একশ তেইশটি বর্ণমালা সমেত প্রায় দেড় শতাধিক ভাষা। দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেলকোডও এরই অন্তর্ভুক্ত। এইসব ভাষার জন্য তৈরি হচ্ছে নানান্ ধরনের সাপোর্ট য়্যাপস্ । সেগুলোর সাহায্যে কম্পিউটার ছাড়াও ট্যাবলেট আর স্মার্টফোনেও মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগ খুলে যাচ্ছে অজস্র ব্যবহারকারীর সামনে। তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার তথ্যভান্ডার আর সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁকে নেবার জন্য শক্তশালী সার্চ ইঞ্জিন। তবে মাতৃভাষা ব্যবহার করার প্রযুক্তিগত সুবিধে যখন উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে, তখন শহুরে বা আধা শহুরে নতুন প্রজন্মের মনোভাবে সেটার প্রতিফলন আদৌ দেখা যাচ্ছে না। শুধু নতুন প্রজন্মই বা বলি কেন, আমার প্রজন্মের মানুষরাও কম যান না। কারণটা সহজেই অনুমেয়। প্রথমত, মাতৃভাষায় অক্ষরের সংখ্যা অনেক বেশি। এছাড়া যুক্তাক্ষরের কচকচানি, আ-কার, এ-কার, য-ফলা, রেফ্ ইত্যাদির নানাবিধ ঝামেলা। একটা সঠিক উচ্চারণের জন্য কী-বোর্ডের একাধিক বোতাম টেপা, ফলে ধৈর্যচ্যুতি ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব ঝামেলা মেনে নিলেও, মাতৃভাষায় বানান্ ভুল হবার সম্ভাবনাও প্রবল। আজকের অসহিষ্ণু পৃথিবীতে এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে ভাবার কারো এত সময় নেই। চুলোয় যাক ভাষা। ভাবটা হ'ল রোমান স্ক্রিপ্টে বেশ তো হচ্ছে। নাই বা হ'ল বাংলা বা জার্মানের মতো ফোনেটিক ভাষা। যাইহোক, এসব কারণে রোমান স্ক্রিপ্টে লেখা বাংলায় এক জগাখিচুড়ি শব্দভান্ডার তৈরি হয়েছে। জেন-ওয়াইদের মধ্যে এটা প্রায় একটা স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছে গেছে। একটা কথা বলে এই প্রসঙ্গে ইতি টানবো। আমাদের বাংলা ভাষা রীতিমতো গবেষণা করে তৈরি হয়েছিল বলেই ফোনেটিক। আর মাতৃভাষায় লেখার জন্য একটা প্যাশন থাকে, তাছাড়া মাতৃভাষা সম্বন্ধে গৌরববোধও প্যাশনের একটা অবশ্য সর্ত।
ইন্টারনেট ঘিরে হেনস্থার ঘটনা আজ আর কারো অজানা নয়। নতুন প্রজন্মের কাছে ফেসবুক বা অর্কুট খুবই জনপ্রিয়। এই সোস্যাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতি মানুষের সামাজিক জীবনে বিভীষিকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ পারলে এখন নিজেদের জাগ্রত মুহূর্ত ক্যামেরা বা ফেসবুক বা হোয়াটসয়্যাপ group -এ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আদিখ্যেতা আর কাকে বলে ! ছেলে-মেয়েরা তো বটেই, বুড়ো খোকা-খুকুরাও কম যায় না। সাধারণ মোবাইল, যা হয়তো দুদিন বাদে মিউজিয়ামের সেলফে থাকবে, সেগুলো ব্যবহার করে যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রেম প্রেম খেলা চলতো, এস এম এস বা মিসড্ কল চালাচালি করে। আজ সেটা আরও জীবন্তভাবে হচ্ছে ফেসবুক ব্যবহার করে। এই পর্যন্ত অন্যায়ের কিছু নেই। বরং বলব এটাই যৌবনের লক্ষণ। মুস্কিল হ'ল যখনই এই প্রেমালাপে তাল কেটে যাচ্ছে, তখনই শুরু হয়ে যাচ্ছে ব্ল্যাকমেল করার পালা। পুরুষ শাষিত সমাজে যা সাধারনত শুরু হয় ছেলেদের তরফ থেকে। মানুষ যতই আধুনিক হোক না কেন, পৃথিবী জুড়ে আজও মেয়েদের কালিমালিপ্ত করা অনেক সহজ। যাইহোক, সাধারণ হুমকির কায়দা হ'ল, দুর্বল মুহূর্তের কথোপকথন সোস্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া। পরের ধাপ আরও খানিকটা উগ্র, বিকৃত করা ছবি আপলোড করা। এখন তো আবার ফোনের ক্যামেরা চালু করে আত্মহত্যার ছবিও চালাচালি চলছে সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। এই ধরনের অসভ্যতাগুলোর পোষাকী নাম হ'ল ' সাইবার বুলিয়িং ' এবং এর শিকারের তালিকা দিনে দিনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পরিণতি, কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতীদের মধ্যে আত্মহত্যা ও মানসিক অবসাদের প্রবণতা। সোস্যাল মিডিয়া জন্ম দিচ্ছে হরেক রকমের কু-প্রবৃত্তি। মনে পড়ে যায় শতাধিক বছর আগে করা উইনস্টন চার্চিলের সেই মহামূল্যবান উক্তিটির।ইওরোপের শিল্প বিপ্লবের গতির অভিমুখ দেখে হয়তো তাঁর এমন একটা ধারণা হয়েছিল- " It would be a tragedy if the sunrise of technology were to be the sunset of mankind. " -《প্রযুক্তির বিষ্ফোরণ যদি একদিন মানবজাতির সভ্যতার সংকটের কারণ হয়, তাহলে তার থেকে পরিতাপের আর কিছু নেই》এর কয়েক বছর পরেই আইনস্টাইন প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন একটু অন্য ভঙ্গিমায়। It has become appalingly obvious that our technology has exceeded our humanity 《প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী ভয়াবহভাবে মনুষ্যতাকে গ্রাস করছে》. আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশে পৌঁছে বুঝতে পারা যাচ্ছে উক্তিগুলোর প্রাসঙ্গিকতা, যা পরিণতি পেয়েছে খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া সামাজিক পরিবেশে। কি অসামান্য অবক্ষয় সমাজের ! খবরের কাগজ আর টেলিভিসনের নিউজ চ্যানেল গুলোই তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। কাজেই স্মার্টফোনের ব্যবহারে আমরা যে খুব ভাল আছি তা বোধহয় নয়। আসলে বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্রমোন্নতি মানুষের মধ্যে কলকব্জার আনুগত্য অজান্তে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে নির্বিকারত্ব, আবেগহীনতা এমন কি নিজের প্রতি ভালবাসাহীনতার প্রকাশ ঘটেছে। ফল, চরম অবসাদের শিকার। স্মার্টফোন বাজারে আসার পর কমবেশি সকলেই, বিশেষ করে জেন ওয়াই গোষ্ঠী মোবাইল জ্বরে আক্রান্ত এবং ভাইরাসের মতো এটা একটা সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মোবাইল মগ্নতায় তারা ট্রামে বাসে লোকাল ট্রেনে, বোধহয় প্লেনেও, এমন কি ঘরে বসে সবাইকার সামনে নিঃশব্দে টাচস্ক্রিনে আঙুল ঠেলাঠেলি করে চলেছে। ফলে মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে অল্প বয়সীদের মধ্যে স্মৃতিশক্তির অভাব দেখা যাচ্ছে। স্মার্টফোনে প্রতিনিয়ত সংবাদ তথ্য রসিকতা অডিও ভিডিও এবং মন্ত্যব্যের ঝড় বোধহয় স্মৃতিশক্তিধারক মস্তিষ্ককোষগুলোকে ব্যস্ত রাখছে। ফলে একদিনের পুরোনো ঘটনাও আর মনে থাকছে না মানুষের। নামী প্রতিষ্ঠানের তৈরি য়্যাপসের বন্যা তাদের স্বপ্নের পণ্য তুলে দিচ্ছে গ্রাহকদের হাতে, যার সিংহভাগই জেন ওয়াই। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আর গুণমানের লাগাতার দৌড়ে পণ্যগুলো হয়ে উঠছে উন্নত থেকে উন্নততর। হোয়াটসয়্যাপ, ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় য়্যাপসগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাতদিন ফরোয়ার্ডেড ম্যাসেজের স্রোত- গুড মর্নিং গুড নাইট ছাড়াও অগণন রঙ্গ রসিকতা অডিও ভিডিও ইত্যাদি ইত্যাদি।
Netiquette - সোজা কথায়, নেট + এটিকেট , অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারে শিষ্টাচারের নিদান বা ইন্টারনেট ব্যবহারে যথেচ্ছাচার না করা। নেটিকেট কথাটা থেকে কিছুটা ধার নিয়ে নিজের মতো করে একজোড়া শব্দবন্ধ ব্যবহার করছি। এটাকে আমি মোবাইলফোন এটিকেট আখ্যা দিচ্ছি। এ ব্যাপারে দু-চার কথা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর পর যথেচ্ছাচারের ব্যাপারটায় আসব। মোবাইলফোন এবং এটিকেট , দুটোই ইংরেজি শব্দ। প্রথমটির অর্থ 'চলমান ফোন আর দ্বিতীয়টি হ'ল 'শিষ্টাচার'। যন্ত্রের তো আর হাত-পা নেই যে চলতে পারবে। কাজেই এটা ধরে নেওয়া আদৌ অসঙ্গত নয় যে ব্যবহারকারী নিজের সেল ফোনটি তাঁর নিজের কাছে বা কাছাকাছি রাখবেন যাতে বাজলে শুনতে পাওয়া যায়। আশ্চর্য লাগে যখন দেখি বহু মানুষ এ ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তাঁদের ফোন তাঁদের ধারেকাছে থাকে না বা ফোন বাজলেও তাঁরা ধরেন না। এটা এক ধরনের অশিষ্টাচার। আজকের যুগে শহুরে মানুষের প্রায় প্রত্যেকে গড়ে দেড়খানা মোবাইল ফোন রাখে।কিছুদিন আগে খবরের কাগজে পড়লাম ভারতে সেলফোনের সংখ্যা ষাট কোটি, জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। কিন্তু এদেশের চল্লিশ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে। এই তলার কুঠুরির মানুষগুলো , যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা , তাদের মোবাইল না থাকাই স্বভাবিক। দেড়খানা ফোনের হিসেবটা বোঝা গেল তো ? মোবাইল না ধরার কারণই হ'ল, সহজলভ্য যে কোনো জিনিসের শেষমেষ বিশেষ কদর থাকে না। এদিকে যোগাযোগ ব্যাপারটা সহজলভ্য হয়ে যাবার ফলে মানুষের প্রত্যাশাও এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। না হবার বিশেষ কারণ আছে কি ? উচ্চশিক্ষিত দুজন মানুষের মোবাইল বারংবার বেজে গেলেও তাতে গুরুত্ব না দেবার অভ্যেসটা নিজে চোখে দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি। ঘটনার প্রেক্ষিত না বলার লোভটা সম্বরণ করতে পারছি না। একজন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার বাড়ি গেছি। আড্ডা চলছে। দশ হাত দূরে পড়ার টেবিলে রাখা ফোন হঠাৎ বেজে উঠল। প্রায় বার কুড়ি বেজে থেমে গেল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ' ধরলে না? ' - 'এখন ভাল লাগছে না, পরে মিসড্ কলের লিস্ট দেখে কথা বলে নেব'। ' কিন্তু প্রয়োজনটা যদি জরুরি হয় ? বন্ধু কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেল। না শুনতে পেয়ে যাঁরা না ধরেন, তাঁরা ক্যাজুয়াল, তবে এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন নন্। কিন্তু এক্ষেত্রে এটা ছিল সামাজিক অপরাধ। আরও একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ভদ্রমহিলা আমার স্ত্রীর স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তাঁর তিনটি মোবাইল। তিনটিতেই বার কতক চেষ্টা চালিয়ে না পেয়ে হতাশ হলেন আমার স্ত্রী। প্রায় সপ্তাহধিককাল বাদে তিনি ওই মিসড্ কল লিস্ট দেখে, এতবার ফোন করার উদ্বেগে(!) আমাদের কুশল জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। উদ্বেগই বটে ! তাই না ? এই ধরনের ব্যাপারগুলো আমার মতো মানুষের কাছে যতটা বিরক্তিকর ততটাই ব্যাথার। ইচ্ছে সত্বেও, ফোন বাজার শব্দ না পেয়ে ফোন ধরতে না পারার ঘটনা স্মার্টফোনধারীদের অনেকাংশে বেশি। কারণ স্মার্টফোনের আওয়াজ ক্যাবলা ফোনের তুলনায় অনেকটাই ক্ষীণ। কারণটা বলে এই প্রসঙ্গে ইতি টানব।
সুবিধের দিক দিয়ে স্মার্টফোন বা ট্যাব আর সাধারণ মোবাইল ফোনের তফাৎ স্পষ্ট, বরং বলা ভাল কোনো তুলনাই চলে না। তবে শুধুমাত্র কথা বলা বা এস এম এস বা রিমাইন্ডার সেট করা- এইসব মামুলি কাজের জন্য সাধারণ সেলফোনের জুড়ি নেই, অন্ততপক্ষে দুটো কারণে। কথা বলার ব্যাপারে মোবাইলের নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি এবং ঘন ঘন চার্জ দিতে হয় না। একই রকম ব্যবহারের জন্য স্মার্টফোনের চার্জ খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। কারণ স্মার্টফোনে গুগল, ই-মেল, হোয়াটসয়্যাপ, অভিধান, ম্যাপ ইত্যাদি যাবতীয় য়্যাপসের সংখ্যা এত বেশি, যে সেগুলোকে সদাজাগ্রত রাখতে ব্যাটারি থেকে সর্বদাই শক্তিক্ষরণ হয়ে চলেছে। ব্যাটারির কোনো বিরাম নেই। এছাড়া মাঝে মাঝেই কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া বা ফোন কেটে যাওয়ার ঘটনাও খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, বিশেষ করে অ-নামী কোম্পানির সস্তার স্মার্টফোনগুলোতে। এর কারণ হ'ল অগুন্তি য়্যাপসের দিকে একসঙ্গে নজর দিতে গিয়ে যন্ত্রের সফটওয়্যার গুলিয়ে ফেলে। একে কম্পিউটারের পরিভাষায় বলা হয় সিস্টেম ক্র্যাস্।
টেকনোলজি নির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে, যুগপোযোগী করে তুলতে হলে, কম্পিউটারের যথোপযুক্ত ব্যবহার জানা অত্যন্ত জরুরি। আজকের দিনে এর হয়তো কোনো বিকল্প নেই, শহুরে মানুষের জন্য বটেই। ফিউচার ইজ ডিজিটাল- আধুনিকতার অন্যতম প্রধান শর্ত হল গতি। সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই যন্ত্রটিকে দিয়ে সাধারণ কাজ করিয়ে নেওয়া আদৌ এমন কিছু ব্যাপার নয়। শিক্ষিত সমাজের যাঁরা এটা পারেন না, তাঁদের নিজেদেরকে ব্রাত্য মনে করার কোনো কারণ নেই। সাধারণ কাজে ব্যবহারের জন্য মেধার ব্যাপারটা গৌণ; দক্ষতা অর্থাৎ স্কিল অর্জন করা অনেক বেশি জরুরি। অভ্যাসের বা অনুশীলনের ফলেই দক্ষতা তৈরি হয়। কিন্তু আমার প্রজন্মের বহু মানুষের সেই মাইন্ড সেট নেই, তাঁরা অনভ্যাসের আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতে পারেন না। ভাবখানা, কি হবে এ বয়সে, বেশ তো চলে যাচ্ছে গোছের। চাকরিতে অবসরের পর থেকে প্রাতর্ভ্রমন দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিগত চোদ্দ বছরে পদমর্যাদা নির্বিশেষে বহু মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। অবাক লাগে যখন দেখি অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, যাঁরা মুখেই মারিতং জগৎ- ইনিয়ে-বিনিয়ে চাকরি জীবনের পার্টি করা, ক্লাবে যাবার গল্প ফাঁদেন, তাঁদের কাছে কম্পিউটার ব্যবহার করাটা ভীষণ অস্বস্তির। তাঁরা কেউ কেউ মোটামুটি হোয়াটসয়্যাপে আটকে আছেন, বাকিরা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন স্রেফ কথা বলার জন্য, অনেকে সেটাও করছেন না। আসলে জানার ক্ষিদেটা আমার প্রজন্মের শিক্ষিত সমাজের থেকে মোটামুটি উবে গেছে। মনে রাখতে হবে সময় যতই এগোবে, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, (এ আই) সমেত আরও উন্নত মানের কম্পিউটার উন্নততর য়্যাপসের ডালি সাজিয়ে মানুষের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলবে; কারণ টেকনোলজি স্থবির নয়। অতএব নিজেকে তৈরি করুন বন্ধু। একটা খুব সহজ টিপস্ দিচ্ছি। বিশ্বায়ণ পরবর্তী আগ্রাসী চাহিদার বাজারে, যেখানে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের মেধা তালিকার শেষের দিকের ছাত্র-ছাত্রীরা পাড়ার প্রাইভেট কলেজ থেকে ডিগ্রী নিয়ে দিনরাত এক করে অনুভূতিহীন যান্ত্রিকতার সঙ্গে দেশ-বিদেশের ক্লায়েন্টদের চাহিদা মিটিয়ে চলেছে, সেখানে কি কোনো স্পেশাল এক্সপার্টাইজের প্রয়োজন আছে ! কিছুটা ইংরিজি ভাষা জানাই যথেষ্ট।
যে কোনো চিন্তা মাথায় এলেই একটা সার্চ করে দেখুন। প্রথমবারেই হয়তো নির্ভুল উত্তর পাওয়া গেল না, তবে কিছুটা এগোনো গেল তো বটেই।কারণ অসমাপ্ত উত্তরের মধ্যেই মোটামুটি পরের সার্চের ইঙ্গিত থাকবে। ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে অজানা অনেক জিনিস আঙুলের ডগায় এসে যাবে। কম্পিউটারের দামও যেমন কমে যাচ্ছে, ব্যবহারও দিনে দিনে তেমনই সহজ হয়ে উঠছে। প্রয়োজন শুধুমাত্র একটু জিজ্ঞাসু মনের। হোমরা-চোমরা বরিষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার যথেষ্ট সীমিত, পরিধি আরও ছোটো। এর প্রাথমিক কারণ কালচার শক্।নেট সার্ফিং-য়ে স্বচ্ছন্দ হলে চিন্তাভাবনাগুলো অনেক সচল থাকে। ফলে আজকের টেক-স্যাভিদের যুগে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে নিজেকে সবাক রাখা যায়। আজকের প্রজন্মের কাছে নিত্য নতুন অনেক কিছু জার্গন শুনি, যেগুলো সেই সময় পর্যন্ত আমার কাছে আপরিচিত। সময় করে পরে নেট ঘেঁটে সেগুলোর অর্থ নিজের মতো করে বুঝে নিতে পারি।
ব্যথার জায়গা অনেক। নীল-তিমির (blue whale) মত মারণ খেলা কচি-কাঁচাদের নাগালে। কোকেন ব্রাউন সুগারের নেশার মতো এই খেলা কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গুগলের সমীক্ষা জানাচ্ছে, নীল তিমির আসক্তিতে পৃথিবীর প্রথম পঞ্চাশটি শহরের তেত্রিশটিই ভারতবর্ষে। ভারতের মধ্যে পয়লা নম্বরে কোচি, এর পরেই কলকাতা। এ ব্যাপারে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে অসাড়তা তর্কাতীত। একমাত্র টেলিভিসনের পর্দায় সান্ধ্যকালীন তর্কপ্রতিতর্কের আসরেই এটা সীমাবদ্ধ। এদিকে নীল তিমি কামড়ানোর দগদগে ঘা মিলিয়ে যেতে না যেতেই এসে গিয়েছে মোমো চ্যালেঞ্জ, যেটার প্রতীক এক কিম্ভূতকিমাকার মুখ। চিন্তার বিষয়, কৈশোরে ছেলেমেয়েদের এতরকম দৈহিক এবং মানসিক পরিবর্তন হয়, যে তারা কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা নানান্ অন্তর্দ্বন্দে ভোগে এবং এগুলোই হ'ল মনস্তাত্বিক ফাঁকের যায়গা। এই ফাঁকের মধ্যে দিয়েই ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা চলে নীল-তিমি বা মোমো জাতীয় মনোবিকলনের খেলা, যার পরিণতি মৃত্যু। নিত্য নতুন য়্যাপস্, হাল আমলের যন্ত্রপ্রযুক্তি আর গতিশীল যোগাযোগ মাধ্যমকে ভর করে কাঁচা বয়সের ছেলেমেয়েদের হাতে চলে এসেছে। সোস্যাল মিডিয়াতে এ কিরকম চূড়ান্ত অসামাজিক এবং অশিষ্ট আচরণ ! অভিভাবকদের বন্ধুভাবাপন্ন এবং যুগপৎভাবে তীক্ষ্ণ নজরদারি ছাড়া এসব মারণ খেলা থেকে কিশোর-কিশোরীদের মুক্ত করা সম্ভব নয়।
সোস্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় সারাক্ষণ আমরা বসবাস করলেও নিজেদেরই অজান্তে ইন্টারনেটে ক্রমাগত ঘটে চলেছে এক মহাযুদ্ধ। বিস্ময়কর এই মহাজগতের এই সব থেকে সিক্রেট যুদ্ধের নাম ডক্সিং, এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। স্পাই, চোর, সন্ত্রাসবাদী, পারস্পরিক শত্রুরাষ্ট্র, হ্যাকার- এরকম হাজারো চরিত্র এই ডক্সিং মহারণের যোদ্ধা। যখনই কোনো প্রতিপক্ষের গোপন তথ্য, বিশেষ প্রযুক্তি আর হ্যাকিং-য়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁস করে তাকে বিপদে ফেলা হয়, অথবা প্রকৃত পরিচয় কিংবা গোপন কাজকর্ম ফাঁস করে দিয়ে চরম বেইজ্জতি করার কাজে সাফল্য পাওয়া যায়, তাকেই বলা হয় ডক্সিং। সাইবার দুনিয়া জুড়ে দেখা যাবে ছদ্মনাম, ছদ্ম পরিচয়, ছদ্ম য়্যাকাউন্ট ইমপার্সোনেশন ইত্যাদি। ডক্সিং হ'ল বিশ্বের ত্রাস, সন্ত্রাসবাদী সঃস্থা আই এস আই এসের সবথেকে আধুনিক অস্ত্র।
অনেকটা বলা হ'ল। অনেক ফাঁকফোঁকরও থেকে গেল; কারণ ইনফর্মেশন টেকনোলজি ঘিরে পরিবর্তন অব্যাহত। এখানে বাজারের একটা বিশাল ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজ বাজার যেটা গোগ্রাসে গিলছে, কাল বা পরশু সেটা প্রত্যাখ্যান করতেই পারে। এই ধারাতেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প গত দুদশক ধরে শ্রীবৃদ্ধি করে চলেছে, মানুষের উপকারে আবার অপকারেও। রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন- "To every man is given the key to the gates of heaven. The same key opens the gates of the hell" 《ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে স্বর্গের দুয়ার খোলার জন্য একটি চাবি দিয়েছেন। ঐ একই চাবি নরকের দরজাও উন্মুক্ত করে》। সম্ভবত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে 'ম্যানহাটন য়্যাটম বোমা প্রকল্পে' তিনি ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু জাপানের হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার বিধ্বংসী নারকীয় লীলায় ব্যথিত হন। কারণ মৌলিক বিজ্ঞানের ওই একই আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রিত ফিসন প্রক্রিয়া পরমাণু চুল্লিতে বিপুল শক্তি উৎপাদন করে, যা মানব সভ্যতার অগ্রগতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। মনে রাখতে হবে একটা দেশের উন্নতির প্রধান সূচকটি হ'ল সেই দেশ মাথাপিছু কতটা শক্তি খরচ করে।
আসলে কোনো কিছুরই বেলাগাম ব্যবহার আদৌ ঠিক নয়। যে স্মার্টফোন নীল তিমির মতো মারণ খেলার উৎস, সেটা ব্যবহার করেই স্কুলের শিক্ষকদের হাজিরা খাতা দৈনিক নিমেষে প্রশাসনের নজরে আনা হচ্ছে। ওই একই স্মার্টফোন আবার বাড়ির বিভিন্ন কলকব্জা বা ব্যবহারযোগ্য গ্যাজেট, যেমন ফ্রিজ, এসি, দরজার ইলেকট্রিক লক, হিটার ইত্যাদি ইন্টারনেটের গেরোয় বেঁধে পরিচালনা করছে। ইন্টারনেট শুধুমাত্র তথ্য আদান-প্রদানেরই বাহন নয়, তা ব্যবহার হচ্ছে জড় বস্তুর নিয়ন্ত্রনের কাজে। দুটো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়ে এ প্রশঙ্গ শেষ করব। প্রচন্ড গরমের দিনে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথেই শোবার বা বসার ঘরের এসি চালু থাকলে মন্দ হয় না। এই ব্যবস্থা আজকে ইন্টারনেট টেকনোলজির আওতায় এবং রীতিমতো বাস্তব। নিউক্লিয়ার পরিবারের যুগে কর্তা-গিন্নি দুজনেই চাকরি করতে বেরোচ্ছেন। তাড়াহুড়োতে বাড়ি থেকে অফিসের পথে বেরোনোর পর মনে হ'ল দরজার ইলেকট্রনিক লকটা হয়তো পড়েনি। কুছ পরোয়া নেই। স্মার্টফোনে ডাউনলোড করা উপযুক্ত য়্যাপস ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে কাজটা তৎক্ষনাৎ সেরে ফেললেন। য়্যালঝাইমার রোগীর সঃখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এমন রোগী বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন, তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। যদি তাঁর দেহের কোথাও একটা জি পি এস সেন্সর লাগানো থাকে এবং ওই যন্ত্রটিকে ইন্টারনেটের অদৃশ্য সূতোর গাঁটছড়ায় বেঁধে দেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজনে মানুষটির নির্ভুল ভৌগোলিক অবস্থান জানা আদৌ অসম্ভব নয়।
ইন্টারনেট টেকনোলজির শুরু থেকেই কম্পিউটার ব্যবহার করে বাঁদরামি শুরু হয়েছে। গোড়ার দিকে সেটা সীমিত ছিল শুধুমাত্র হ্যাকিং-য়ের মধ্যে। অবশ্য এ- ব্যাপারে মানুষের জ্ঞানও ছিল সীমিত। ক্রমে মাত্রা বেড়েছে। আজ নীল তিমির মতো মারাত্মক ঘটনা মানুষকে একটা ঝাঁকুনি দিয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক ছন্দ যে ভাবে ধাক্কা খাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভাবনায় দীর্ঘ ছায়া ফেলছে।
মানুষের সঙ্গে মানুষের খোলামেলা কথাবার্তা, যাকে বলে জমিয়ে আড্ডা- ওই দিনগুলো আজ অতীত। বিশ-পঁচিশ বছর আগেও সস্তার চা-কফির দোকানে বসে সব গোষ্ঠীর সমবয়সীরা আড্ডায় মসগুল থাকতো। নানান্ আলোচনার মধ্যে খবরা-খবর আদান-প্রদান হ'ত। চায়ের দোকানই ছিল সেদিনকার ইন্টারনেট। আজ ফেসবুক টুইটার জাতীয় সোস্যাল মিডিয়া যুবক-যুবতীদের এক ধরনের মনের সাপোর্ট সিস্টেম। ফেসবুকে আলাপ প্রেমালাপে পৌঁছে যাচ্ছে; ফলে অনেক ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাচ্ছে। এইসব মিডিয়া জনপ্রিয় হবার ফলে মানুষের সঙ্গে দুরত্ব বাড়ছে। এটা হামেশাই দেখা যাচ্ছে যে একই বাড়িতে দু-তিন জন ভাইবোন থাকা সত্বেও পারস্পরিক মানসিক সাহচর্যের অভাব। একজন নেট সার্ফ করছে তো, অন্যজন ই-মেল করতে ব্যস্ত আর তৃতীয় ব্যক্তি ফেসবুকে নিজের গোষ্ঠীর সঙ্গে খবর চালাচালি করছে।
এখন ভারতবর্ষে চালু মোবাইল ফোনের সংখ্যা পঞ্চাশ কোটির কাছাকাছি। বিখ্যাত তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থা, সিসকোর (CISCO) ভবিষ্যদ্বাণী বলছে যে দুহাজার ঊনিশ সালের মধ্যে এই সংখ্যাটা ছুঁয়ে ফেলবে সত্তর কোটি। এটাকে ঘিরে ইউ কে পোস্ট একটা নতুন শব্দ আমদানি করেছে, 'নোমোফোবিয়া', ( NoMophobia = No Mobile Phone phobia), অর্থাৎ মোবাইল ফোন না থাকার ভীতি। আজকের প্রজন্ম, যাদের বলা যেতে পারে নেট প্রজন্ম, তারা এই মাধ্যমটিকে ব্যবহার করে অনেক কিছু করছে, ভাল এবং খারাপ। একটা মাউসের ক্লিক বা আঙুলের স্পর্শেই পৃথিবী হাতের মুঠোয়। অল্প বয়সীদের পক্ষে এটা মারাত্মক। এমনিতেই আজকাল মানুষের ধৈর্য কম, কুচোকাঁচাদের আরও কম। কাজেই যন্ত্রটি খারাপ হলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে তাদের পক্ষে খুবই অস্বস্থিকর ব্যাপার। আসলে মুখোমুখি বসে কথা বলার ব্যাপারটাতে মানুষ আর মোটেই স্বচ্ছন্দ নয়।
মোবাইল, স্মার্টফোন, ট্যাব- অর্থাৎ কম্পিউটার চিপ নির্ভর এই গ্যাজেটগুলোকে আমরা সমার্থক বলেই মনে করব। যন্ত্রনির্ভর জীবনযাত্রায় আমরা কেমন যেন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের সময় এখন এমনিতেই কম। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেই আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে চাক্ষুষ যোগাযোগের সুযোগ বা দুটো কথা বলার অবকাশ। কিন্তু তার উপায় কোথায় ? সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত; শুধুমাত্র অনুষ্ঠানের কিছু খন্ডচিত্রের চিহ্ন রেখে দেওয়া যে অমুক অমুকদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।- "অমুকের সঙ্গে কথাবার্তা কি হ'ল ?"
- "কথা তো তেমন কিছু হয়নি।"
প্রাতর্ভ্রমনের এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একমাত্র কন্যাকে নিয়ে কর্তা-গিন্নি সিকিম বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে মেয়ের কলেজের দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা। বাবা-মা নিশ্চিন্ত যে মেয়ে ঘুরে ফিরে সব ভাল ভাল জায়গাগুলো দেখে ফিরে আসলে তার বিবরণের ভিত্তিতে ঠিক করবেন ওনারা কোন স্পটগুলো দেখতে যাবেন। সন্ধ্যের প্রাক্কালে কন্যা ফিরতে বাবা জিজ্ঞেস করলেন - 'কি কি দেখলি ?' বন্ধুদের সঙ্গে তোলা কিছু সেলফি দেখিয়ে দিল, পেছনে বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়া। চারদিক বেড়িয়ে ঘুরে দেখা এদের কাছে গৌণ। আসলে প্রকৃতিও এদের মনে দাগ কাটতে পারে না। ভ্রমণ মানে যে মনপ্রান ঢেলে প্রকৃতিকে উপভোগ করা, সেলফিতে ছবি বন্দী করে জায়গা দেখার প্রমান রেখে দেওয়া নয়, সেটা এরা বোঝেই না। আসলে এই ছবিগুলো ফেসবুক গোষ্ঠীতে ছড়িয়ে দেবে। ভাবখানা, দেখ কত জায়গা ঘুরে এলাম। যন্ত্রনির্ভর যুগে মানুষ নিজেকে নিয়ে বড়ই ব্যস্ত। ফেসবুকে লাইকস্ ব্যাপারটা খুবই জনপ্রিয়। আমার মনে হয় আজকের যুগের ডিজিটাল নেটিভরা বাস্তব জগতের প্রশংসা থেকে ভার্চুয়াল জগতের পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে সনাতন ধারায় হাতে লেখা চিঠিকে পেছনে ফেলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রথম পরিবর্তন এল ই-মেলের হাত ধরে। অর্থাৎ, কম্পিউটার ব্যবহার করে লেখা চিঠির বাহক ছিল টেলিফোন লাইনের তার। যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রথম আধুনিকীকরণ।ব্যবহার সীমিত ছিল শিক্ষিত মানুষের মধ্যে, যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ। সময়ের গতি এবং চাহিদায় কম্পিউটারের ব্যবহার যতই বাড়তে লাগল, ই-মেলের ব্যবহার ইন্টেলেকচুয়াল এলিট গোষ্ঠীর আঙিনা থেকে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ল আমজনতার মধ্যে। মোবাইল উত্তর যুগে শুরু হ'ল এস এম এস, সীমিত শব্দ ব্যবহার করে ছোটোখাটো খবরের আদান-প্রদান। যোগাযোগ ব্যবস্থায় জোয়ার আনল স্মার্টফোন। এস এম এসের জায়গা নিল হোয়াটসয়্যাপ। ম্যাসেজের দৈর্ঘ্য আদৌ আঁটোসাটো নয়। হোয়াটসয়্যাপ আসলে এস এম এস, তবে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হ'ল ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের গতি অস্বাভাবিক বেশি হবার ফলে, হোয়াটসয়্যাপ ব্যবহারের খরচ অনেকটাই কম। এরপর ফেসবুক, টুইটার, না জানি আরও কত কিছু। এগুলো হ'ল পরিবর্তনের পরিবর্তন।
ট্যাব বা স্মার্টফোনে য়্যাপস্-এর জোয়ার, বিশেষ করে যোগাযোগের কাজে; কোনটা ছেড়ে কোনটা ব্যবহার করব। ই-মেল বা হোয়াটসয়্যাপের ব্যবহার অনেক সহজ, প্রায় হাতে চিঠি লেখার মতো, বেশ কাছাকাছি। এগুলোর মধ্যে কেমন যেন একটা শান্ত, নিরীহ, নির্ভরযোগ্য ভদ্র ব্যাপার আছে। এই বিশেষণগুলো ব্যবহার করলাম একটাই কারণে। আজকাল ফেসবুক বা টুইটারের ব্যবহার দেখে এবং শুনে মনে হয়েছে যে এসব প্যাকেজের ব্যবহারে কোনো ব্যক্তিগত এবং গোপনীয়তার জায়গা নেই। এগুলো সবই দরকার আছে, কিন্তু করুণভাবে যান্ত্রিক, নির্মম পুনরাবৃত্তি। মন বা মানুষের ছোঁয়া, কোনোটাই নেই এগুলোতে। নিজেকে জাহির করার ব্যাপারে ব্যবহারকারীর অপরিমিত মনস্তত্ব কাজ করে। এতটাই করে যে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সেলেব্রেটি, এমন কি মন্ত্রীসান্ত্রীরা পর্যন্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। জানা নেই মানুষের ইতিহাসের কোন অদৃশ্য ধারায় উন্নত টেকনোলজির এমন সব ব্যবহার হচ্ছে।নিজস্বতার অভাব যতই লক্ষিত হচ্ছে, সেলফির, বা নিজস্বীর প্রবণতা ততই বাড়ছে। বিপদও তো কম নয়। বিগত দুবছরের মধ্যে প্রায় জনা কুড়ি তরতাজা যুবক যুবতী শুধুমাত্র এদেশেই মারা গেছে, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সেলফি তুলতে গিয়ে। কি উদগ্র সেলফিবাসনা ! কেউ কেউ আবার নিজেই নিজের সেলফি তুলছে ; নারসিসাস্ কমপ্লেক্স (Narcissus complex) । যখন তখন, যত্রতত্র কোথায় পাবে আয়না ? আরে বাবা ভাল ব্যবহারও তো নেহাত কম নয়। বিহারের স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সময়ে উপস্থিত নিশ্চিত করতে বিহার সরকারের তরফ থেকে নোটিস জারি করা হয়েছিল যে, প্রতিদিন সকালে এসে এবং ছুটির ঘন্টায় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে সেলফি তুলে শিক্ষা দপ্তরে পাঠাতে হবে। আসলে সব জিনিস ব্যবহারের সুফল এবং কুফল আছে, ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে তার কার্যকারীতা।
তথ্য-প্রযুক্তি টেকনোলজিতে সত্যিকারের পরিবর্তন এল 'গুগল্'-য়ের হাত ধরে। গুগল্ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন। ইন্টারনেটের ক্ষমতার উৎসই হ'ল এই গুগল্। গূগল্ অনেকটা পাড়ার গেজেটের মত, সব পরিবারের খবর জানে। এটির জন্ম দুটি মানুষের হাত ধরে। এঁরা হলেন ল্যারি পেইজ ও সের্গেই ব্রিন। গুগলের মূলমন্ত্র হ'ল, বিশ্বের প্রায় যাবতীয় সার্ভারের তথ্য সন্নিবেশিত করে তাকে সবার জন্য সহজলভ্য করে দেওয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন তথ্যাগারে অন্তত এক মিলিয়ন বা দশ লক্ষাধিক সার্ভার চলে এবং ঐগুলোতে দৈনিক এক বিলিয়ন বা একশ মিলিয়নের উপর সার্চের অনুরোধ ও প্রায় চব্বিশ পেটাবাইট তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হয় (**)। এবার দেখা যেতে পারে গুগলের সার্চ ঠিক কিভাবে কাজ করে। প্রাথমিক কাজ হ'ল ওয়ার্লড ওয়াইড ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বের সব ধরনের ওয়েব পেজ পরিদর্শন করা, অবশ্যই যে সাইটগুলো খোলা আছে। প্রত্যেকটি সার্চ ইঞ্জিনের আওতায় বিশাল বিশাল তথ্যসমৃদ্ধ হার্ড-ডিস্কের সমন্বয়ে তৈরি করা সার্ভার আছে। ইন্টারনেটের সব তথ্য ওই হার্ড ডিস্কগুলোতে মজুদ থাকে। এবং সার্চ ইঞ্জিন প্রয়োজন মতো ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। এই কাজ করার জন্য প্রত্যেক সার্চ ইঞ্জিনের বিশেষ সফটওয়্যার রোবট আছে যার পোষাকী নাম ওয়েব ক্রলার। এই ক্রলার সফটওয়্যার তীব্র গতিতে ওয়েবে ঘুরে বেড়িয়ে সব তথ্য লিপিবদ্ধ করে নিয়ে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। মনে রাখা দরকার যে গুগল্ ছাড়াও আরও কয়েকটি সার্চ ইঞ্জিন আছে, যেমন ইয়াহু ডাকডাকগো ইত্যাদি। এগুলো হয়তো স্বকীয়তার জন্য জনপ্রিয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা এবং কার্যকারিতার দিক থেকে গুগলের তুলনা নেই। গুগল্ এতটাই জনপ্রিয় যে, তা অভিধানে জায়গা করে নিয়েছে।
(**) এক পেটাবাইট তথ্য ঠিক কতটা , তার একটা ইঙ্গিত দেওয়া যেতে পারে । তথ্যের মাপের একক হ'ল বাইট। নির্দিষ্ট আকৃতির কাগজে লেখা পাঁচশ পৃষ্ঠার বইকে মাপকাঠি ধরে নিলে এক পেটাবাইটের মাপ কল্পনা করতে সুবিধে হবে।
এক কিলোবাইট (কে বি) ~ 1000 বাইট , 1000 (কে বি) ~ এক মেগাবাইট (এম বি) ,1000 এম বি ~ এক গিগা বাইট (জি বি) , 1000 জি বি ~ এক টেরাবাইট (টি বি) , 1000 টি বি ~ এক পেটাবাইট (পি বি) । আরও একটা হিসেব জানলে ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যাবে। একখানা A4 মাপের কাগজে মোটামুটি দুই কে বি তথ্য এঁটে যাবে। কাজেই A4 মাপের কাগজে বাঁধানো একটা পাঁচশ পৃষ্ঠার বইয়ের জন্য জায়গা লাগবে এক এম বি। এবারে , এম বি থেকে শুরু করে জি বি , টি বি হয়ে পি বি তে পৌঁছোনোর হিসেবের নিয়মটা খাটালে সহজেই বেরিয়ে আসবে যে , এক পেটাবাইট ~ একশ কোটি বইয়ের তথ্য ( প্রত্যেক বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা পাঁচশ )। কম্পিউটার সংক্রান্ত হিসেবনিকেসে এক কিলোর সঠিক মাপ হ'ল 1024 ; ঠিক সেই কারণেই সমান সমান (=) চিহ্নের বদলে ওই ঢেউ খেলানো প্রতীক (~) ব্যবহার করা হয়েছে।
ইন্টারনেট প্রাঙ্গনের বেশিরভাগটাই সৌন্দর্যের ডালি দিয়ে ভরা। আপত্তিকর য়্যাপসগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঞ্জালের মতো। এগুলো নেহাতই সাময়িক এবং অবশ্যই স্বল্পস্থায়ী । আমি আশাবাদী এবং নিশ্চিত যে, এগুলো কাটিয়ে উঠে মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তবে ইন্টারনেট প্রশাসকরা যদি নিয়ম করে এবং অপরাধীদের দৃষ্টামূলক শাস্তির ভয় দেখিয়ে এই বিকৃত ব্যবহার বন্ধ করতে পারে তাহলে সমাজের মঙ্গল। একই সঙ্গে অভিভাবকদের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর সমাজেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
স্বপনকুমার দে
০৬/১০/১৮
No comments:
Post a Comment