মারণরোগ করোনা ভাইরাসকে ঘিরে দু-চার কথা
সচেতন মানুষের কাছে এই লেখা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ
স্বপনকুমার দে
ভূমিকা
এই প্রবন্ধের নায়ক ডঃ ম্যাথু ভার্গিস, দিল্লির সেন্ট স্টিফেন হাসপাতালে কর্মরত একজন অস্থিশল্য চিকৎষক, অর্থোপেডিক সার্জন। মারণব্যাধি করোনার থাবা যখন এই গ্রহকে গ্রাস করেছে, ইতিমধ্যে কেড়ে নিয়েছে তিরিশ লক্ষাধিক প্রাণ, মানুষ তখন তটস্থ। সামান্য জ্বর আসলেও বিভ্রান্ত মানুষ মনে করছেন করোনাতে আক্রান্ত। মানুষের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। মৃত্যুমিছিলে চতুর্দিকে একটা আতঙ্কের পরিবেশ । মানসিক এই গুমোট আবহাওয়ায় অনেকটা আশার আলো জুগিয়েছে, বিশ্বাস যোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এবং অভিজ্ঞতার মিশেলে, ডাক্তারবাবুর মিনিটকুড়ির একটা ভাষণে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ধর্মগুরুরা হোমিওপ্যাথি আর আয়ুর্বেদকে অবলম্বন করে, পাশ করা অ্যালোপ্যাথ ডাক্তারদের গাল পাড়ছে। অপবিজ্ঞানের জঞ্জালের পাঁকে ডোবা হাতুড়েরা গোমূত্রে করোনানাশের তত্ব খাড়া করছেন। খবরের কাগজের প্রতিবেদনে পড়লাম, যে দেশে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের জনৈক খাটালে ডজনখানেক মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা সারা শরীরে গোবর মেখে বসে থাকার পর খাঁটি দুধে স্নান করছে, করোনা থেকে বাঁচতে। দেশের মন্ত্রীসান্ত্রীরা এক সময় ঘোষণাও করে দিলেন যে ভারত থেকে করোনা বিদায় নিয়েছে।
অ্যালোপ্যাথি ডাক্তারবাবুরা রেমডেসিভিরের নিদান হাঁকছেন, ভায়াল পিছু যার বাজার দর চার-পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে কালোবাজারির হাতে পড়ে বিক্রি হচ্ছে পঁচিশ থেকে তিরিশ হাজার টাকায়।
এক দিকে বিজ্ঞানীরা দিশাহারা। আজকের দেওয়া বিধান, কাল বাতিল। রূপ বদলানো ভাইরাসের সঙ্গে মারণ হুল্লোড়ে মেতেছে নানা রঙের ফাঙ্গাস। তথ্যের অস্পষ্টতা। দূরদৃষ্টি আর মানবিকতার নিরিখে সারা দেশের বৃহত্তর পরিসরে অবৈজ্ঞানিক মনস্ক জনপ্রতিনিধিদের এবং নীতি-নির্ধারকদের ঔদাসীন্যের ফলে প্রতিষেধকের অপ্রতুলতা, এমনকি যে দেশ এই তুমুল অতিমারির মধ্যেই ১০০০০ মেট্রিক টন অক্সিজেন রফতানি করেছে, সেখানে অক্সিজেনের বাড়ন্ত, মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। । এই লেখা যখন শেষ করলাম তখন দেশের চার-শতাংশ মানুষেরও সম্পূর্ণ দুটো ডোজের টিকাকরণ হয়ে ওঠেনি। ব্রাজিল, যে দেশটির রাষ্ট্রনায়ক চরম দক্ষিণপন্থী পোস্টার বয়ের আখ্যায় ভূষিত, সেখানেও ১০ শতাংশের বেশি মানুষের সম্পূর্ণ টীকাকারণ হয়ে গেছে বিনামূল্যে । এই অবস্থায় জানা নেই আবার কবে “ওল্ড নর্মাল” ফিরে আসবে। বা আদৌ আসবে কি না !
কাজেই বুঝতে অসুবিধে নেই যে বিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান রাজনীতির পরতে পরতে জটিলতা, মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ফলে মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে আর তাঁরা যখন ঝুঁকছেন তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির দিকে, সেখানে বিজ্ঞানমনস্ক ডাক্তারবাবুর মিনিটকুড়ির একটা মনকাড়া ভাষণ দমবন্ধ করা এই গুমোটের মধ্যে এক ঝলক আশার আলো জুগিয়েছে। এই লেখার মুখবন্ধ হিসেবে এটুকুই আমার অবদান। বাকিটা ডাক্তারবাবুর ভাষণ বুঝে, নিজের মতো করে লেখা অনুলিখন এবং অনুবাদ মাত্র। সামান্য দু-এক জায়গায় যথাযথ ব্যাখ্যার প্রয়োজনে সংযোজন করতে হয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার বিবেক দংশন আমাকে বাধ্য করেছে এইটুকু লেখার জন্য। ডাক্তারবাবুর বক্তৃতা ইংরেজিতে, আঠারো লক্ষাধিক মানুষ সেটা পড়েছেন, এবং হিন্দি ভাষাতেও এর অনুবাদ হয়েছে। আমবাঙালির বহু মানুষ, এবং আমি নিজেও, নিজের ভাষায় পড়তে বা লিখতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। এই লেখা তাঁদের কথা মাথায় রেখেই যাতে বৃহত্তর জনসমাজে এটা পৌঁছতে পারে।
করোনা ভাইরাস মারণব্যাধির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সময়ের সঙ্গে তাল রেখে সুপরিকল্পিত এবং ভরসা যোগ্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
বিগত দেড় বছর হল অতিমারি রোগ করোনা ভাইরাস সারা পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল চিকিৎসা হাতের বাইরে চলে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা এ ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে গেছি এবং অনেকটাই ওয়াকিবহাল হয়েছি, যে এই রোগের সংক্রমণের ফলে মানুষের শরীরে ঠিক কী প্রভাব পড়ে। ফলে এতটা নিরাস হবার কারণ নেই। তার ওপর বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক সমাজের নিরলস গবেষণায় বাজারে অনেক ধরনের প্রতিষেধক এসে গেছে। তবুও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। যেখানে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ যেভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে এবং নির্মম ভাবে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, সেখানে মারাত্মক এই সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে, সচেতন মানুষের পক্ষে রোগের প্রাথমিক উপসর্গের সঙ্গে চিকিৎসা পদ্ধতি জেনে রাখা ভাল। দিল্লির সেন্ট স্টিফেন মেডিক্যাল কলেজের ডঃ ম্যাথু ভার্গিস তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টার উপর আলোকপাত করেছেন।
ডঃ ভার্গিসের বক্তৃতার মূল কথায় আসা যাক। করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে পছন্দের বাসযোগ্য জায়গা হল শ্বাস-নালি ও খাদ্য-নালির মিলনস্থল, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলা হয় ল্যারিঙ্ক্স। ল্যারিঙ্ক্স কোষ সমূহের রাসায়ণিক প্রক্রিয়া, অর্থাৎ মেটাবলিজমকে সুবিধাজনক ভাবে কাজে লাগিয়ে ভাইরাসগুলো ল্যারিঙ্ক্স কোষগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে বংশ বিস্তারের কাজে লেগে যায়। কাজেই এক-দুদিনের মধ্যে লক্ষাধিক ভাইরাস দেহে বাসা বাঁধে। এদিকে দেহের অর্জিত স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, ইম্যুনিটি সিস্টেম, অচেনা শত্রুর আক্রমণ চিনে ফেলে এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করে শত্রুর মোকাবিলায় লেগে পড়ে । এই যুদ্ধ জারি থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত ভাইরাসের মৃত্যু হয়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বর বা চেনা যে কোনো ভাইরাসের আক্রমণ থেকে ওষুধ ছাড়াই মানুষকে মুক্তি দেয়। এগুলো সবই ভাইরাস আক্রমণের চেনা উপসর্গ। ধরা যাক দিনচারেক পরেও উপসর্গের কোনো উপসম হতে দেখা গেল না। এদিকে অ্যান্টিবডি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু ভাইরাসও পাল্লা দিয়ে বংশ বিস্তার করে চলেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে এক ধরনের রাসায়নিকের নিষ্ক্রমণ হয়, যাকে বলে সাইটোকাইন, তা রক্তের স্রোতে মিশতে থাকে। ফলে জ্বর বাড়ে, শরীর মাথায় যন্ত্রনা উপলব্ধ হয় এবং গলার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে ঘন ঘন কাশির উদ্রেক হয়। কারণ ভাইরাস প্রাথমিক ভাবে গলাতেই বাসা বেঁধেছিল।
এখন ইনক্যুবেশন পিরিয়ড অর্থাৎ রোগজীবানুর উন্মেষপর্বের সঠিক সময় জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। এটা হল সংক্রমণের প্রথম দিন থেকে উপসর্গের সময়টা। এটা সাধারণত গড়ে পাঁচ দিন। প্রথম লকডাউনের সময় মানুষ জানতো কবে এবং কোথা থেকে তিনি ভাইরাস বহন করে এনেছেন। কারণ তাঁর জানা আছে বিয়ে বাড়ি, জন্মদিন জাতীয় বড় জনসমাবেশে কবে তিনি গেছিলেন। কিন্তু এবারে, যখন লকডাউন শিথিল করা হয়েছিল তখন মানুষ বাজার-দোকান, অফিস-কাছারি যাবতীয় কাজ করেছেন গণ পরিসরে এবং গণপরিবহন ব্যবহার করে। কাজেই শরীরে ভাইরাস প্রবেশের সঠিক দিন জেনে নেওয়া সহজ নয়। তাহলে উপায় কী ! উপায় হ’ল উপসর্গের প্রথম দিনকে চিহ্নিত করা। উপসর্গ গুলো আর একবার স্মরণ করে নেওয়া যাক। গলা খুসখুস, কাশি, জ্বর, গায়ে বা মাথায় ব্যথা, এমনকি সাময়িক পেট খারাপ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এর মধ্যে কোনো একটা বা একাধিক একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। রোগীকে মনে করবার চেষ্টা করতে হবে উপসর্গ গুলোর কোনটা তার সবচেয়ে অস্বস্তিকর মনে হয়েছে এবং সেটা কবে। সেই নির্দিষ্ট দিনকেই ধরে নিতে হবে ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম দিন। এই দিনটা সঠিক জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। দু-এক দিনের এদিক-ওদিকে রোগের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে। বলে দেবে রোগী শিগগির ঠিক হয়ে ঘুরেফিরে বেড়াতে পারবেন না তার জায়গা হবে হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের আশ্রয়ে। সংক্রমণের প্রথম দিনের পর দুরকম অভিজ্ঞতা হতে পারে। এক, জ্বর কমে গেল এবং তার সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ গুলোও আস্তে আস্তে বিদায় নিল। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে এবং রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। দুই, ১০, ১৫, বা ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগ ভয়ঙ্কর দিকে বাঁক নেবার ইঙ্গিত দেয়।
চার দিন বাদে জ্বর ছেড়ে গেল। দু-এক দিন পরে জ্বর আবার যখন আসল তখন তাপমাত্রা একটু বেশিই, সঙ্গে সর্দি এবং বেশ ঝাঁকুনি দেওয়া শুকনো কাশির প্রকোপ। সামান্য শ্বাস-প্রশ্বাসের অস্বস্তিও অস্বাভাবিক নয়। শ্বাস কষ্ট উত্তরোত্তর বাড়তে বাড়তে একটা অবস্থায় মনে হবে শুয়ে থাকলেও অসুবিধে থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ কিছু মাস আগে পর্যন্তও ডাক্তারবাবুরা জানতেন না যে এই অবস্থার জন্য ভাইরাসের কোনো ভূমিকা নেই। বেশিরভাগ মানুষই ভুল করে মনে করেন যে ভাইরাসের কারণে রোগী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে কারণ এক্সরের সাদা-কালো ছবিতে সেরকমই ঠাহর হয়। ইটালিতে করোনা আক্রান্ত এক মৃত ব্যক্তির শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার পর এই রহস্যের উদ্ঘাটন হয়। যা নিউমোনিয়া বলে মনে হচ্ছিল সেটা ছিল আসলে ফুসফুসের রক্তবাহী নালীতে রক্তের জমাট বাঁধা। ফুসফুসের স্বাস্থ্যকর বা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে এই বিচ্যুতির ফলেই এমনটা ঘটেছে। গবেষণালব্ধ এই ফলাফলে চিকিৎসা পদ্ধতির মোড় পাল্টে গেল। এখন প্রশ্ন হ’ল কীভাবে ঘটনাটা সংগঠিত হ’ল ? শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সদাজাগ্রত অ্যান্টিবডি ভাইরাসের উপরিতলে কাঁটায় ভরা প্রোটিন দেখেই বুঝে ফেলেছে যে এটা তার কাছে অচেনা বাইরের শত্রু। মানুষের শরীর প্রয়োজনের তাগিদে লক্ষ-কোটি অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম এবং প্রতিটির চরিত্র প্রত্যেক মানুষের জন্য একেবারে নির্দিষ্ট। ঘটনা হ’ল ফুসফুসের রক্তবাহী নালীর কিছু কোষের চেহারা এবং গঠনের সঙ্গে ভাইরাসের কাঁটাযুক্ত প্রোটিনের হুবহু মিল আছে। এই জাতীয় কোষ লিভার, কিডনি এবং ক্ষুদ্রান্তেও দেখতে পাওয়া যায়, যে কারণে কিছু করোনা রোগীর মধ্যে পেট খারাপের প্রবণতা দেখা যায়। যাইহোক অ্যান্টিবডি সুস্থ এবং স্বাভাবিক কোষের হুবহু এই চেহারাকে চিনতে না পেরে শত্রু মনে করে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করতে থাকে। এর প্রভাবে ফুসফুসের রক্তবাহী নালীর ভিতরের দেওয়ালের স্বাভাবিক মসৃণতা নষ্ট হয়ে রক্তস্রোতে বাধা সৃষ্টি করে ক্রমশ রক্ত জমাট প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। এক সময় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রক্তের সঙ্গে প্রকৃতির বায়ু বাহিত অক্সিজেনের আদান-প্রদান যা ফুসফুসের মধ্যে অগুনতি অতিশয় ক্ষুদ্রাকৃতি অক্সিজেন সংপৃক্ত থলির মাধ্যমে হয়, সেটা স্তব্ধ হয়ে গিয়ে রক্তে অক্সিজেন স্যাচ্যুরেসন মাত্রা কমাতে থাকে। রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট ক্রমশ বাড়তে থাকে। প্রসঙ্গত, এই থলিগুলো ডাক্তারবাবুদের কাছে য়্যালভিওলাই নামে পরিচিত। কাজেই বোঝা গেল যে রক্ত জমাটবঁধায় ভাইরাসের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। শরীরের অ্যান্টিবডি কিছু স্বাভাবিক সুস্থ কোষের উপরি তলের কাঁটাকে ভাইরাস মনে করে ধ্বংসের ফলে এমনটা ঘটে। আসলে সুস্থ কোষের উপরিতলের কাঁটাগুলো এক একটি অণু যাদের কাজ হল নির্দিষ্ট প্রোটিন বা হরমোনকে স্বাগত জানানো।
এই অটো-অ্যান্টিবডি অ্যান্টিবডি লড়াই প্রলম্বিত করা খুবই ক্ষতিকারক ইঙ্গিত বহন করে। এর ফলে আরও বেশি রক্ত নালী অকেজো হয়ে এমন একটা সময় আসবে যখন শুধুমাত্র মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সচল রাখার জন্য বাইরে থেকে অক্সিজেন দেবার প্রয়োজন হবে এবং অক্সিজেন চাহিদার মাত্রা মিনিটে ২-৩ লিটার থেকে বাড়তে বাড়তে একসময় ৬০ লিটার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়াও অসম্ভব নয়। এর পরের ধাপ বাইপ্যাপ, সিপ্যাপ এবং শেষ অবলম্বন ভেন্টিলেটর। কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর চেহারা নেয়। এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি যে এমনটা ঘটে কেন শুধুমাত্র কিছু রোগীর ক্ষেত্রে। হতে পারে হয়তো বাবা-মায়ের থেকে অর্জিত জিনগত কারণে। অন্য কোনো অজানা কারণও থাকতে পারে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই অবস্থা থেকে যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে অটো-অ্যান্টিবডি হল সেই অ্যান্টিবডিসমূহ যারা নিজস্ব সীমিত কিছু স্বাভাবিক কোষকে ভাইরাস ভেবে গুলিয়ে ফেলে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে। ফিরে আসা যাক প্রসঙ্গে।
চার বা পাঁচ দিনের মাথায় সংক্রমণের উপসর্গ যখন দ্বিতীয় বার কিছুটা অন্য চেহারায় ফিরে আসে, সেটা রক্তস্রোতে সাইটোইন ঝড়ের পূর্বাভাস বলে ধরে নিয়ে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসা পদ্ধতিতে বদল আনতে হবে। অধিক মাত্রায় সাইটোকাইন রক্তস্রোতে মেসার আগেই অতি পরিচিত এবং সস্তার ওষুধ, স্টেরয়েড জরুরী ভিত্তিতে রোগীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। শুধুমাত্র স্টেরয়েড রক্ত জমাট বন্ধ করবে না। একই সঙ্গে রোগীর প্রয়োজন “অ্যান্টিকোয়াগলেন্ট”, যা রক্ত জমাট প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করবে। এই সময়ের এই দুটিই হল আসল ওষুধ। তবে অবশ্যই কোনো ডাক্তারের পরামর্শ মতোই এগুলো করতে হবে। প্রশ্ন জাগতে পারে নতুন করে ডাক্তারের পরামর্শের দরকার কেন ! এই রোগে স্টেরয়েড নেবার সময়ের, অর্থাৎ রোগের কোন অবস্থায় স্টেরয়েড পড়বে- সেই নির্দিষ্ট সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসর্গের প্রথম চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত অ্যান্টিবডির সঙ্গে লড়াই চালু থাকলেও ভাইরাস তার প্রতিলিপির বংশ বৃদ্ধি করে চলেছে। উপসর্গের প্রথম দিন থেকেই স্টেরয়েড চালু করলে বংশ বৃদ্ধির সময় প্রলম্বিত হবে। ভাইরিমিয়া অবস্থার প্রকোপ থেকে না বেরিয়ে আসা পর্যন্ত স্টেরয়েড দেওয়া যাবে না। ভাইরিমিয়া অবস্থার শুরু হয়, যখন সংক্রমিত প্রথম কোষটি থেকে ভাইরাস রক্তস্রোতে মিশতে থাকে এবং বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে। এই সময়টা পাঁচ দিন। কাজেই পাঁচ দিনের আগে অর্থাৎ অ্যাভন্টিবডি অটো-অ্যান্টিবডি প্রক্রিয়া শুরুর আগে পর্যন্ত স্টেরয়েডের প্রয়োগ আদৌ নয়। অনেকে মনে করতে পারেন যে অ্যান্টিকোয়াগুলেন্টের বদলে অ্যাসপিরিন নয় কেন। ওই ওষুধ তো রক্তের তারল্য বজায় রাখে। ঠিকই। কিন্তু রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেছে, যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে রক্তে প্লেটলেট কাউন্ট ভীষণ ভাবে কমে যায়। সংখ্যাটা দাঁড়াতে পারে ৪০০০০, বা ৩০০০০, এমনকি ২৫০০০ পর্যন্ত নেমে আসাও সম্ভব। এই অবস্থায় রক্ত জমাট প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না। স্টেরয়েড চলবে দশ দিন এবং অ্যান্টিকোয়াগলেন্ট তিন সপ্তাহ। কারণ রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা ওই সময় পর্যন্ত থাকে।
সাইটোকাইন ঝঞ্ঝার হাত থেকে রেহাই পেয়ে বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু কতিপয় কিছু রোগীর ক্ষেত্রে, স্থান কাল নির্বিশেষে, পৃথিবীর উন্নত দেশের ডাক্তারদেরও, চিকিৎসা পদ্ধতির সিদ্ধান্তে ভুল হয়। মানুষের দৈহিক গঠনে প্রকৃতি কিছু কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দিয়েছে। যেমন দুটো কিডনির একটা না থাকলেও কাজ চলে যায়। সেইরকম দুটো ফুসফুসের একটা কোনো কারণে অকেজো হয়ে গেলে সেটাকে বাদ দেওয়া যায় অথচ রক্তে ১০০ শতাংশ বা নিরাপদ মাত্রায় অক্সিজেন স্যাচ্যুরেসন থাকে। তবে অসুবিধে আছে। মানুষটি দৌড়-ঝাঁপ করলে বা অযথা সিঁড়ি ভাঙলে হাঁপিয়ে উঠতে পারেন। স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের ফুসফুসের প্রত্যেকটির দুই তৃতীয়াংশ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থাৎ রিজার্ভ। ওই এক তৃতীয়াংশ সচল থাকলেও রক্তে স্যাচ্যুরেসন মাত্রা একশোর কাছাকাছি দেখাবে। অথচ রোগীর অস্বস্তি বেড়ে চলেছে। তখন জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল মিটার একশো ভাগ স্যাচ্যুরেসন দেখালেও ইতিমধ্যে ফুসফুসের কার্যক্ষমতার দুই তৃতীয়াংশের ক্ষতি হয়ে গেছে। রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন, হয়তো ভেন্টিলেটরেও রাখতে হতে পারে। ডিজিটাল পালস্ অক্সিমিটার এখন দরকার রক্তে স্যাচ্যুরেসন মাত্রায় লক্ষ্য রাখতে। কাজেই ডিজিটাল মিটারে স্যাচ্যুরেসন নিরাপদ মাত্রায় দেখালেও, রোগীর অস্বস্তি থাকলে বাড়িতে বসে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ একদমই ঠিক নয়। স্টেরয়েড, প্রয়োজনে জীবনদায়ী ওষুধ। কিন্তু এটার প্রয়োগে উল্টো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকটাও অবহেলা করা যাবে না। ইতিমধ্যে আমরা বলেছি যে পাঁচ-ছদিনের মধ্যে অসুস্থতা না কাটলে স্টেরয়েড দিতে হবে, সঙ্গে অবশ্যই অ্যান্টিকোয়াগলেন্ট। বেশ, শুরু হল ওই দুই ওষুধের যুগলবন্দি। একেবারে হাতেনাতে ফল। রোগী প্রায় স্বাভাবিকের পথে। বিশেষ করে সেই সব রোগী যাঁরা বয়স্ক, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। কিন্তু দেখা গেল স্টেরয়েড নেবার চারদিন পরেই আবার জ্বর এসেছে। তাহলে কি আবার আক্রমণ ভাইরাসের ? সম্ভবত না, এটা ভাইরাসের আক্রমণ নয়। স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেহের ইম্যুনিটি কমিয়ে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের পথ সুগম করে দিয়েছে। ফলে ফুসফুসে উপস্থিত স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়া গুলো সক্রিয় হয়ে রোগীকে নিউমোনিয়ায় কাবু করে ফেলেছে। এটা ব্যাকটেরিয়া সংগঠিত নিউমোনিয়া যার একমাত্র প্রতিষেধক অ্যান্টিবায়োটিক। তাহলে প্রথম থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক নয় কেন ? কারণ, ওই সময় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ ব্যাকটেরিয়া রেসিস্টেনস বাড়িয়ে দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবকে দুর্বল করে দেবে। কাজেই ওই সময় অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা আদৌ নেই। কাজেই ওষুধ প্রয়োগের সময় সূচি খেয়াল থাকা অত্যন্ত জরুরী। স্টেরয়েডের আরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এটা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যাঁদের ডায়াবেটিস ছিল না তাদের শর্করার মাত্রা হয়ে দাঁড়াল হয়তো ২৫০। আর যাঁরা ইতিমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাঁদের এই সংখ্যাটা হয়তো পৌঁছে যেতে পারে ৫০০। নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষজ্ঞর মতামত নেওয়াটা খুবই জরুরি। সে কারণেই দেখা যায় যেসব রোগীরা ইতিমধ্যে অন্যান্য অসুস্থতায় ভুগছেন অর্থাৎ যাঁদের কোমর্বিডিটি আছে, তাঁদের কাছে সময় সূচির দ্বিতীয় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হয় না এবং তাঁদের অনেকেরই কিডনি সংক্রমিত হয়, ফলে শরীরে ফ্লুয়িড এবং সোডিয়াম পটাসিয়াম ভারসাম্যে বাধা সৃষ্টি করে। কাজেই স্টেরয়েড অবশ্যই জীবনদায়ী ওষুধ, কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতির কথাটাও নজরে থাকা দরকার।
সারমর্ম
ডাক্তারবাবুর বক্তৃতা ছিল প্রায় কুড়ি মিনিটের। কারণ তিনি অনেক অজানা ব্যাপারের যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা করেছেন। সে কারণে শেষের দু-আড়াই মিনিটের ভাষণে বক্তব্যের সারাংশ হিসেবে ব্যক্ত করেছেন।
এই কোভিদ কালে কোনো উপসর্গ দেখা দিলেই, পরীক্ষার অপেক্ষায় না থেকে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রথম পাঁচদিনের মধ্যে যদি আর কোনো উপসর্গ না থাকে, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই এবং আপনার না ভাবার কোনো কারণ নেই যে আপনি একজন সফল কোভিদ যোদ্ধা। এই পাঁচদিনে ওষুধ হিসেবে ডাক্তারের পরামর্শে কিছু ভিটামিন সাপ্লিমেন্টই যথেষ্ট। দ্বিতীয় পাঁচদিনের মধ্যে অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে বুঝতে হবে যে রোগ খারাপ দিকে মোড় নিচ্ছে এবং রক্তস্রোতে সাইটোকাইনের ঝড়ের সূত্রপাত হয়েছে। কাল বিলম্ব না করে ডাক্তারবাবুর পরামর্শে স্টেরয়েড এবং অ্যান্টিকোয়াগলেন্ট চালু করা প্রয়োজন, প্রথমটি দশ দিন এবং দ্বিতীয়টি তিন সপ্তাহ। দ্বিতীয় পাঁচদিনের মধ্যে আশি শতাংশ রোগীর মধ্যে সুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। তা না হয়ে যদি শেষ দিকে আবার জ্বর দেখা দিল, সঙ্গে শ্বাস কষ্ট, শুকনো কাশির প্রকোপ, তাহলে বুঝতে হবে রোগ দ্বিতীয় বার মারাত্মক মোড় নিচ্ছে। এই বারের ওষুধ হল অ্যান্টিবায়োটিক এবং মনে রাখতে হবে সেটা চালু করতে হবে দ্বিতীয় পাঁচদিনের শেষ পর্বে। রেমডেসিভির, আইভারমেকটিন বা প্লাজমা থেরাপি, কোনোটার প্রয়োজন নেই। কারণ এগুলো প্রয়োগের সুফল আছেই, তেমন কোন প্রমাণ এখনও পর্যন্ত অধরা। সময়ের এই নিয়ম মেনে এবং কোনো একজন পাশ করা ডাক্তারবাবুর তত্বাবধানে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে গেলে অক্সিজেন বা তার পরের ধাপের অবশ্য করণীয়, ভেন্টিলেটর ইত্যাদির প্রয়োজন ছাড়াই বাড়িতে বসে সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। ডঃ ম্যাথু ভার্গিসের নিজের তেমনই অভিজ্ঞতা। হাসপাতালে ভর্তি হবার প্রয়োজন তখনই হবে, যখন সংক্রমণের চোখ রাঙানিকে রোগী উপেক্ষা করেছেন, অর্থাৎ যখন অটোঅ্যান্টিবডি ফুসফুসের রক্ত নালীর সুস্থ কোষকে ভাইরাস ভেবে গুলিয়ে ফেলে তাদের ধ্বংসলীলায় নেমে পড়েছে।
ডঃ ম্যাথুর সম্বন্ধে দু-একটা কথা বলে এই প্রবন্ধে ইতি টানব। উনি একজন অভিজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠিত অর্থোপেডিক সার্জন এবং অন্যান্য নানাবিধ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত। অথচ কোভিদের চিকিৎসায় খুবই সফল। কি করে সম্ভব হল ? এই প্রবন্ধে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লেখবার সুযোগ নেই। যাঁরা উৎসাহী তাঁদের অনুরোধ করব CNBC TV18 চ্যানেলে ডঃ ম্যাথুর সঙ্গে সেরিন ভান-য়ের ২৮ মিনিটের একটি ইন্টারভিউ শুনে নেবার জন্য। ধারাভাষ্যের প্রথম দু-মিনিটের কথোপকথনে
আপ্লুত হয়ে এই প্রবন্ধ লেখায় উৎসাহিত বোধ করলাম। মিস সেরিনের প্রথম প্রশ্ন ছিল, তিনি তো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কোভিদের চিকিৎসা কি করে জানলেন ! ওনার অকপট জবাব, “এই নতুন ভাইরাসের সঙ্গে তো কারোরই পরিচয় নেই”। বাকিটার জন্য ইন্টারভিউটা শুনে নেবার অনুরোধ জানাবো।
তথ্যসূত্র:
https://youtu.be/ffqYYWY06rs
No comments:
Post a Comment