Friday, July 30, 2021

লেক বিহার

                            লেক বিহার 

          ভোরের আলো ফুটতেই লেকে ঢুকে পড়লাম 

ভোরের মধুর স্বপ্নটা যখন ভাঙলো,  বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করতে করতে স্বপ্নের স্মৃতিটাকে কিছুটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম। ক্যালেন্ডারের তারিখের পিঠে চেপে আরও একটা নতুন ভোরের সূচনা হ'ল। বরাবরই ভোরে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। এই সময়টা আমার কাছে সব সময়ই মধুর, ঋতু নির্বিশেষে বড্ড তাজা। কৈশোর পার করে যৌবনের ভোরটা কেটেছে বম্বেতে; জীবনযুদ্ধের নানা টানাপোড়েনে। অভাবের সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্ত তার মধ্যেও আশা-আকাঙ্খা, কলকাতা ফেরার ভবিষ্যত ভাবনা- সব মিলিয়ে একটা অন্য রকমের আত্মপ্রত্যয়; অন্য স্বাদ ছিল জীবনের সেই ভোরের দিনগুলোর। যাইহোক,  মনে হ'ল দিনটা আজ অন্যভাবে শুরু হোক। অবসর জীবনে প্রাতর্ভ্রমণের আকর্ষণকে বাদ দিয়ে কী  ভাবেই বা আর দিন শুরু করা যায়! কাজেই শুরুটা প্রাতর্ভ্রমণ দিয়েই হোক। জায়গা পরিবর্তন করা যাক বরং। বাড়ির অনতিদূরে ঢাকুরিয়া লেকে চলে গেলাম। জায়গাটা যে বাড়ির এত কাছে, সেই আন্দাজ ছিল না। ও-পাশে শিয়ালদা-বজবজগামী ট্রেন লাইন, আর এ-পাশে সাদার্ন অ্যাভিনিউ।  মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলাধারের দুপাশে সবুজেভরা চর- গোলপার্ক থেকে শুরু হয়ে এঁকেবেঁকে লেক ক্লাবকে পিছনে ফেলে টালিগঞ্জের রেল ব্রিজ পর্যন্ত চলে গিয়েছে। এটাই ঢাকুরিয়া লেক। এই জায়গাটাই সকালে হাতছানি দিয়ে ডাকাডাকি করে। ঢাকুরিয়া ব্রিজের মাঝখানে পৌঁছে পশ্চিম দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেই ঘন্টার আওয়াজ শোনা যাবে- ঢং ঢং ঢং……., বুদ্ধ মন্দিরের ঘন্টা অনুসরণ করে মিনিট দু'তিন হাঁটলেই পাওয়া যাবে লেকে ঢোকার লোহার গেট। পুরো গেট আদৌ খোলা নয়। মানুষ গলার মতো একটা জায়গা ফাঁক করা আছে। মুখ্যতঃ পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ মানুষেরা ঢুকে পড়ছেন সেই ফাঁক গলে। সংখ্যায় কম হলেও মাঝবয়সী অনেক মানুষজনও আছেন ওই দলে, উদ্দেশ্য প্রাতর্ভ্রমণ। বিস্তীর্ণ জলাধারের দুপাশে মনোমুগ্ধকর শ্যামলিমা পরিবেশ। হাঁটাচলা আর শরীরচর্চার এক আদর্শ আবহ। পথচলতি মানুষজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জেনেছি লেকে আঞ্চলিক মানুষ ছাড়াও দূর থেকেও অনেকে আসেন। লেকে ঢোকার মুখে গাড়ি আর দ্বিচক্রযানের ভিড় দেখেও সেটা বোঝা যায়। এক ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে জানলাম তিনি আসছেন পার্ক সার্কাস থেকে।

শরীর পরিচালনার কত রকম পদ্ধতি। বয়সের ধর্মানুযায়ী শরীর পরিচালনা চলছে। নানান বয়সের নানান ঢং। চরিত্রগুলো যেমন যেমন দেখেছি তেমন ভাবেই আঁকবার চেষ্টা করেছি। স্বাস্থাণ্বেষীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে, গাছগাছালি বেষ্টিত জলাধারের বাতাস থেকে ফুসফুস ভর্তি করে অক্সিজেন নিচ্ছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধ মানুষজনের শরীর পরিচালনার তাগিদ আছে। হাঁটাহাঁটিতে তাঁরা অপারগ। স্বাস্থ্যের উপর বয়সের থাবার চিহ্ন স্পষ্ট। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর সখ্যতাও ঘনীভূত হয়েছে; কাজেই শরীর পরিচালনার কায়দা মাথা খাটিয়ে তাঁরা এমনভাবে বেছে নিয়েছেন যাতে বয়সোপযোগী শরীর অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গেই চলতে পারে ঈশ্বর আরাধনা। অবাঙালি একদল অশীতিপর বৃদ্ধের মধ্যেই সেটা লক্ষ্য করা গেল। দলে যে সবাই অশীতিপর, এমন বলা যাবে না। যাইহোক, লাল সিমেন্টের শান বাধানো বেঞ্চির উপর বসে হাত দুখানি বুকের উচ্চতায় রেখে তালে তালে তালি মেরে চলেছেন আর সেই তালির সঙ্গী হ'ল রামনাম। আমার কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জেগেছিল এই রামনাম জপ কতক্ষণ চলে ? সোজা রাস্তায় হেঁটে বেঞ্চি পার হওয়ার সময় মনে হয়েছিল ওঁরা সমস্বরে রামরাম……………,রামরাম………. করেন। অর্থাৎ, রামরাম কথাটার পরেও কিছু একটা দুর্বোধ্য শব্দ যেন তাঁরা উচ্চারণ করছেন। হেঁটে পার হয়ে গেলাম। মিনিট কুড়ি বাদে একই পথে ফেরার সময় দেখলাম সবাই চুপ করে মুখ বুঝে বসে আছেন। পরের দিন প্রায় একই সময়ে ওই বেঞ্চির কাছাকাছি এসে গতি মন্থর করলাম, শুধুমাত্র শোনার জন্য দুর্বোধ্য শব্দটা কি ? কান দুটো খাড়া ছিল। কানে এল যেন ওঁরা বলছেন রামরাম সাতাশি, রামরাম আটাশি, রামরাম নওআশি……। এদের মধ্যে কয়েকজনের কন্ঠে শানানো সুর। আর বারবার উচ্চারণ করে চলেছেন। কাজেই সবটাই ক্রমশ কর্ণগোচর থেকে মর্মগোচর হয়ে গেল। বুঝলাম ওনারা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায়, হয়তো বা একশ বার রামনাম নেবার পর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি করেন। এই বয়সে ঈশ্বরের নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর নাড়াচাড়ার ব্যাপারটা আমাকে চমৎকৃত করেছিল।

ভোরের প্রথম সাক্ষাতের কুশল বিনিময়ের অভিনব পদ্ধতিগুলোও দেখার মতো। কত রকমের সংস্কার মানুষের।  গুড মর্নিং, সুপ্রভাত, নমস্কার, প্রাতঃপ্রনাম, মর্নিং, রামরাম, জয় গুরু, জয় মা তারা, হাই-হ্যালো- এ তো গেল বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের সংস্কার মতো দেশি-বিদেশি কায়দায় কুশল বিনিময়। প্রতুত্তরও ওই একই। তালিকাটা সম্পূর্ণ হ'ল কিনা জানা নেই। যেগুলো কানে আসে সেগুলোই লিখলাম। কিছু মানুষ নিরুচ্চারে হাত উঠিয়ে বা ঘাড় দুলিয়ে চোখের ভাষায় কুশল বিনিময় করছেন; চোখে স্মিত হাসি। সম্পর্কগুলোও হয়তো ওই হাই-হ্যালো জাতীয় সম্বোধনের মধ্যেই শেষ। ব্যতিক্রম একজন। হ্যাঁ, ওই হাজারো মানুষের মধ্যে শুধুই একজন। উনি ওই পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে জগিং-য়ের কায়দায় ছুটতে ছুটতে চলেছেন আর মিনিট খানেক বাদে বাদেই হাঁক পেড়ে চলেছেন, “বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ।" প্রতুত্তরে তাঁর পরিচিত কিছু মানুষ ওই একই বাণী ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কী জানি কৈশোরে হয়তো স্বদেশী করতেন। হয়তো বা ষাট বছরের স্বাধীনতা পাওয়া দেশের মানুষের চালচলনে বিকৃত সাহেবিয়ানা আবার শিগগিরই পরাধীনতার শিকলে বেঁধে না ফেলে, সেই আশঙ্কায় স্বাধীনতার মন্ত্রোচ্চারণ করে মানুষের মনে অগ্রিম সাড়া জাগাচ্ছেন। লেকে প্রাতর্ভ্রমণে যান, অথচ তাঁর ওই “বন্দে মাতরম" ধ্বনি শোনেননি, এমন লেক-ভ্রমণকারী মানুষ খুঁজে পাওয়া শক্ত। আমি অবশ্য লেকের ঢাকুরিয়া দিকটার কথা বলছি।

অশীতিপর আরও একজন ব্যতিক্রমী মানুষের সন্ধান পেলাম। তিনি শুধু বসেই থাকেন। তাঁকে কখনও বেড়াতে দেখিনি।। ভদ্রলোক বাঙালি না অবাঙালি তাও বুঝতে পারিনি। কারণ হিন্দী এবং বাংলায় কথা আদান-প্রদানে সমান স্বচ্ছন্দ। একটা হজমীর কৌটো হাতে ধরে বসে আছেন। কুশল বিনিময়কারী সবাইকেই দুটি করে হজমীগুলি বিতরণ করছেন। শুধুমাত্র ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমিও একদিন নমস্কার জানিয়ে পাশে বসলাম। বলা বাহুল্য ওঁর প্রসাদে বঞ্চিত হইনি। তখনই  আবিষ্কার করলাম ওগুলো হজমীগুলি। অনেকদিন আগে কোনো এক সোমবারের আনন্দবাজারের কলকাতা কড়চায় পড়া একটি মানুষের কথা মনে পড়ে গেল। উনি প্রাতর্ভ্রমণে আসা সাক্ষাৎকারী সবাইকে এক মুঠো ভিজোনো ছোলা বিতরণ করেন। এটাই নাকি ওনার কাছে ঈশ্বর সেবা। লেকের দেখা বৃদ্ধ মানুষটির চিন্তাতেও হয়তো ওই একই দর্শণ কাজ করে।

লেকের দক্ষিণ পাড় বরাবর পূব থেকে পশ্চিমে ফুট পাঁচ-ছয় চওড়া বাঁধানো রাস্তা। সম্প্রতি কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট  (কে আই টি) লেক-সংস্কার কাজে হাত লাগানোর ফলে পুরো পরিবেশটা অনেকটাই সেজে উঠেছে। টালি বাঁধানো রাস্তা বরাবর কুড়ি-বাইস হাত বাদে বাদেই আছে বেঞ্চির আদলে তৈরি শান বাঁধানো বসার জায়গা। কিছু কিছু বেঞ্চিতে আবার ঠেস দেবার ব্যবস্থাও আছে। শুধু তাই নয়, বেঞ্চিগুলো ও রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য বাঁশের লাঠির ডগায় বাঁধা ঝাঁটা, টুকরো কাপড় আর বোতলে জল নিয়ে, কে আই টি নিয়োজিত চার-পাঁচ জন মহিলা কর্মী এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত তদারকি করে চলেছেন। দু'তিন জন পুরুষ কর্মীকেও দেখেছি লেকের জল পরিষ্কার রাখার জন্য লগি দিয়ে জলে ভাসা প্লাস্টিকের বোতল বা ব্যাগ তুলতে। যাইহোক, টালি বাঁধানো রাস্তাটা প্রস্থে প্রায় সাত-আট ফুট। একেবারে শেষে বেশ চওড়া পিচের রাস্তা, যেটা শেষ হয়েছে মিনি লেকের সীমানা-পাঁচিলের গা ঘেঁষে একটা শীর্ণ ফুটপাতে। ওই শীর্ণ ফুটপাত বরাবর পাঁচিলে পিঠ লাগিয়ে লাইন দিয়ে বসে আছে শীর্ণতর কিছু নারী-পুরুষ, পেশায় ভিক্ষাবৃত্তি। ছন্নছাড়া আয়ের মতো জীবনও এদের ছন্নছাড়া। ঘর-বার বলে কিছুই নেই, কোনো বাঁধা আয় নেই অথচ বাঁধা আছে পেট। লেকে হাজার হাজার ধর্মভীরু মানুষের সমাগম। ভিক্ষুক মানুষগুলোর আশা, লেকের জলের মাছের মতো তাদেরও কিছু জুটে যেতে পারে। জীবনভোর পরের হাতের চাকার মতো এরা গড়িয়ে চলে। টালি বাঁধানো আর পিচের রাস্তার মাঝখানটা অনেক চওড়া। সেখানে শুধুই গাছগাছালি।

শরীর চর্চার আরও এক কৌতুহলোদ্দীপক ভাষার সাক্ষী হয়ে বেশ মজা লাগল। কৃত্রিম হাসি যে শরীর চর্চার অঙ্গ, সেটা কাগজ বা পত্রিকা মারফত জানা ছিল। এই জানা ব্যাপারটার জলজ্যান্ত মহড়া দেখলাম লেকের লাফিং-ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে। দশ-বারো জন দু'টো ভাগে ভাগ হয়ে মুখোমুখি দুটো লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এর পর দু-হাত সামনে প্রসারিত করে সমস্বরে উচ্চারিত হ'ল ‘হাঃ হাঃ, পরক্ষণেই উচ্চারিত হ'ল হোঃ হোঃ'। ছন্দে ছন্দে এই হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ মিনিট দুয়েক চলার পর শুরু হ'ল হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ………। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ……… যেন অট্টহাসি।

শরীরচর্চায় ব্যস্ত আরও একজন মানুষের প্রতি নজর কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তাঁর বয়স যৌবনের সীমানাকে পেছনে ফেলে এসেছে, কিন্ত পরিণত প্রৌঢ়ত্বে প্রবেশ করতে অনেক দেরি। মুখের গঠনের সঙ্গে মানানসই গালপাট্টা গোঁফের দু-প্রান্ত মেহেন্দি করা। কাজেই বোঝা যায় যে যৌবনদৃপ্ততা আদৌ মুছে যায় নি। হাতকাটা কালো গেঞ্জি, কালো ট্রাউজার আর স্নিকার পায়ে শোভা পাচ্ছে। সঙ্গে স্ত্রী আছেন, রয়েছে বুলডগ জাতীয় একটি পোষ্য। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শরীর পরিচালনা করছেন, যাকে বলে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ। শরীরের গঠন দেখলে বোঝা যায় চর্চিত অবয়ব। দেহ সৌধটির ব্যাপারে খুবই সচেতন। পোশাকের রকমভেদ এখানে এলেই বোঝা যায়। বিস্তারিত বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। তবে এক জায়গায় সবাই প্রায় সমান। হ্যাঁ, জুতোর ব্যাপারে প্রত্যেকেই ব্যবহার করছেন স্নিকার। যে কোনও জুতোর দোকানে শো-কেসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, দামের রকমভেদে স্নিকার জাতীয় দিয়েই শো-কেস ভরে আছে। এই জুতোগুলো আসলে পথ চলার পক্ষে খুবই আরামদায়ক। নিজে ব্যবহার করেও দেখছি যে প্রাতর্ভ্রমণে পোশাক বা জুতোজোড়ায় একটা বৈশিষ্ট্য না থাকলে শরীরে স্বচ্ছন্দ ভাবটা জেগে উঠতো না।

যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মানুষও যে যন্ত্র হয়ে গিয়েছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। সময় সঙ্কোচনের নতুন নতুন ভাবনায় মানুষ সর্বদাই সজাগ। সময় সঙ্কোচনের অর্থ হ'ল একই সময়ে একাধিক কাজ কিভাবে করা যায়। এ-ও কি আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্বের প্রয়োগ? কে জানে ! যাইহোক, প্রতিযোগিতার বাজারে সকলেই একটু বেশি ব্যস্ত। কিন্ত এর মধ্যেও সত্যিকারের ব্যস্ত মানুষ স্বাস্থ্য সচেতনতার ভাবনাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। চলা-বলার ঢং, স্বাস্থ্যের উজ্জ্বলতা, ব্যক্তিত্বের ভার দেখে তাঁদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ জাগে না। হাতে গোনা এমন দু-একজনকে দেখেছি। তাঁরা সময় সঙ্কোচনের জন্য হাঁটার সাথে সাথে হাতের দুই তালুর মাঝখানে অ্যাকুপ্রেসারের ছুঁচলো কাঠি গড়িয়ে চলেছেন। ভদ্রলোক সম্বন্ধে আমার অনুমান পরখ করে নেবার জন্য কিছুদিন বাদে ওঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় নামলাম। আলাপের গরজটা অবশ্যই আমার তরফ থেকে শুরু হ'ল। জানলাম তিনি ব্যবসায়ী এবং সারা দিন-রাতের ঐটুকু সময় তাঁর নিজস্ব এবং ভোরের লেকের পরিবেশের মুগ্ধতায় যতটুকু শরীরচর্চা উনি করেন সেটা ঐ সময়। ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও দু-একটা কথা বলার ইচ্ছে ছিল, কিন্ত ওনার ব্যস্ততা অনুমান করে মনে হ'ল না, আমি ওঁর বিরাগভাজন হই। প্রাতর্ভ্রমণের সদস্যদের বেশিরভাগকে দেখলেই মনে হয় তাঁদের জীবনযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত কড়া আইনের শক্ত শৃঙ্খলে বাঁধা। তাঁদের অশন, বসন, চলন, কথন, কর্ম, অবসর- সবটা জুড়ে ডিসিপ্লিন নামক বস্তুটির বিস্তৃত অধিকার। 

প্রাতর্ভমণে রঙ্গপ্রিয় মানুষেরও অভাব নেই। দু'একটা নমুনা দিলেই বুঝতে পারা যাবে। শরীরচর্চার পর বুড়োদের আড্ডা-তামাশার আসর বসে। ফুট দশেক দূরে পাশের বেঞ্চিতে বসেছিলাম বলে কথাগুলো কানে পৌঁছোলো। কথ্য ভাষাগুলো অনুচিৎভাবে অশ্লীল মনে হয়নি বলেই তুলে ধরতে পারছি। পরিচিত সমবয়সীদের মধ্যে এইটুকু হয়তো চলতেই পারে। ওঁদের আড্ডার মধ্যে অন্য ধাঁচের আনন্দের খোরাক পাওয়া গেল। মনে হ'ল অন্তরঙ্গ রসিকতা কিছুটা স্থূল হলেও তার মাধুর্য ভিন্ন। নমুনা: (১)……তোদের একটা সুখবর দিই। সুখবরটা উনি যাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তাঁদেরই একজন প্রত্যুত্তরে বললেন- খাওয়াটা তাহলে পাওনা রইল। - ‘তাই বুঝি ! তাহলে পেছন ফেরো।‘ (২)…. অশীতিপর এক বৃদ্ধ বলে উঠলেন ব্রহ্মান্ড মানে কি, জানেন কেউ ? কেউ জানেন না ! তাহলে শুনুন, ব্রহ্মান্ড হল ব্রহ্মার অন্ড। (৩)…..এক-জোড়া কিশোর-কিশোরী একটু ঘনিষ্ঠভাবে ঘোরাঘুরি করছে। ঠিক প্রাতর্ভ্রমণের ঢঙে নয়। ভোরের লেকে সাধারনত বিরল নজির। একজন মন্তব্য করলেন,- ‘বিয়ে-সাদি করে ফেললেই পারে, বছর ঘুরতে না ঘুরতে এক-আধজন ভারতীয় নাগরিক বেড়ে যাবে।‘ কথাগুলো শুনে বুঝলাম যে, দেহ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও, মনে রস এখনও টইটম্বুর। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কৈশোরের সময়টাকে কী গভীর আবেগে না ধরে রেখেছেন, বিন্দুমাত্র মালিন্য নেই। মনে হ'ল মানুষটির উপস্থিতি এক ঝলক আলোর মতো। কাছে এলে একরাশ গুমোটও আড়ালে সেঁধোয়। বয়স হলেও ভেতরে ভেতরে মানুষটা কোথাও একটু কাঁচা একটু সবুজ রয়ে গেছে। চোখের দিকে ভাল করে তাকালে বোঝা যায় বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার সঙ্গে সেখানে হাসি আর কৌতুক যেন মেশামেশি করে আছে।

বেশ কিছুদিন লক্ষ্য করার পর আরও এক মজার চরিত্রের মানুষের সঙ্গে আলাপ জমালাম। তিনি যোগেন বাবু, (আজও জানা নেই ভদ্রলোকের আসল নামট) বেড়ানো শেষ করে একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে উনি কয়েকটা যোগ ব্যায়াম করেন। বয়স সত্তরোর্ধ বলেই মনে হয়। দেহের গড়ন যথেষ্ট শক্তপোক্ত। চাল-চলনেও বয়সের ছাপের কোনো ইঙ্গিত নেই, একটু বেশি রকমের চটপটে। যোগ ব্যায়ামের গুণেই হয়তো এমন ছটপটে চাঙ্গা ভাব। মাথায় তেলা টাকের শ্রীবৃদ্ধি করেছে এক কানের পাশ থেকে শাড়ির চওড়া পাড়ের মতো পাকা চুলের পটি। বিক্ষিপ্তভাবে গোটাকতক আধপাকা চুল পটির মধ্যে থেকে উঁকি মারছে। বেশ শৌখিন বলেই মনে হ'ল ভদ্রলোককে। ধারনাটা স্পষ্ট হ'ল যখন একদিন দেখলাম যোগেনবাবু (আসলে যোগ ব্যায়াম করা অবস্থায় বেশিরভাগ সময় দেখেছি বলেই, ছাত্রাবস্থার ছেলেমানুষী বা দুষ্টুমি, যাই বলি না কেন, মনকে উস্কে দিয়ে জানালো ওঁর নাম যোগেন হওয়া উচিৎ) পকেট থেকে একখানা চিরুনি সযত্নে বার করে চকচকে টাকে বোলাচ্ছেন। ব্যাপারখানা বেশ মজার ঠেকলো। চুলবিহীন টাকে চিরুনি বোলানোর রহস্যটা জানার কৌতুহল চাপতে পারলাম না। কলেজ জীবনের দুষ্টুমি আরও একবার মনকে নাড়া দিল। উপায় বার করতে হবে। বেশ কিছুদিন ওই একই বেঞ্চিতে বসে মাঝেমধ্যেই দু'একটা মামুলি কথা বলে অপরিচয়ের বাধাটা কাটিয়ে ফেললাম। কথা বলে বুঝলাম ভদ্রলোকের স্বভাবে অসঙ্গত লজ্জা বা অতিরিক্ত সঙ্কোচ নেই। অতএব রসিকতা করার ঝুঁকি নেওয়াই যায়। একদিন জিজ্ঞাসা করে বসলাম,- ‘দাদা আপনার চিরুনি ব্যবহারের রহস্যটা একটু বলবেন ?’ ভদ্রলোক হাঃ হাঃ….. করে  প্রানখোলা হাসিতে আমার প্রশ্নের তারিফ করে বললেন, ‘আরে ভাই জোয়ান বয়সে মাথাভর্তি শুধু ঘন কুচকুচে কালো চুল যে ছিল তাই নয়, রীতিমত কোঁকড়ানো বাহারি চুল ছিল। তখন থেকেই পকেটে চিরুনি রাখার অভ্যেস। সেটা আজও ছাড়তে পারিনি ; অবচেতনে পকেটে হাত চলে যায়।‘ চরিত্রের নিঃসঙ্কোচ ভাবটা ঠাহর করে আমি ওঁকে টাক সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের একটা সরস উদ্ধৃতি গল্পচ্ছলে বললাম। যাঁদের শোনা নেই তাঁদের জন্য  বলছি : এক সময় এক কেশ তৈল প্রস্তুতকারক সংস্থার তরফ থেকে রবি ঠাকুরের কাছে একটি শংসাপত্রের আবেদন আসে, তাঁদের উৎপাদিত বস্তুটির অর্থাৎ তেলের বিপণনের সুবিধার্থে। ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও সংস্থা কর্তাদের বারংবার অনুরোধ গুরুদেব প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে এমন একটি শংসাপত্র লেখেন। মূল বয়ানটা ঠিক মনে নেই, তবে ভাবটা অনেকটাই এরকম : ‘অমুক সংস্থার তেল ব্যবহারের পূর্বে আমার মাথার তালুর দুটি জায়গায় ছোট্ট ছোট্ট দুটি টাকের সম্ভাবনার সন্ধান মিলিয়াছিল। এঁদের কেশতৈলের গুণে ছোট্ট ছোট্ট ওই দুটি টাক একত্রিত হইয়া একটিতে রূপান্তরিত হইয়াছে। সুতরাং অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে টাকের সংখ্যা কমাইতে হইলে এমন তেলের জুড়ি মেলা নিঃসন্দেহে কঠিন।‘ জানা নেই প্রস্তুতকারক সংস্থাটি শংসাপত্রখানি কাজে লাগিয়েছিল কিনা। যাইহোক,  যোগেনবাবু গল্পটা উপভোগ করেছিলেন। 

         পশ্চিম আকাশের  কোলে মেঘের চোখরাঙানি

অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও এক দিনের ঘটনা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। এক ধর্মপ্রাণ মানুষের সংস্কারবোধ। হিসেব মতো বর্ষা তখনও আসেনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনে হ'ল চারিদিকে আবহাওয়া কেমন যেন গম্ভীর। পশ্চিম আকাশে এক ফালি কুচকুচে মেঘ চোখে পড়লো। বৃষ্টি হবে কি হবেনা, এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়েই চলে গেলাম লেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাল্কা বাতাস বইতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম ঘন মেঘের ফালিটা নিজেকে হাল্কা করে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিম থেকে দক্ষিণ পুবে, প্রায় সারা আকাশটাতেই। অহেতুক ঝুঁকি না নিয়ে আমি বাড়িমুখো হলাম। ফিরতে ফিরতে মনে হ'ল এই সাতসকালে মেঘে মেঘে যেন সন্ধ্যে নেমে এল। হঠাৎই আকাশ চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি। লেক থেকে বেরোবার গেটের মুখে প্রায় চলে এসেছি। কানে এল খোলা গলায় সূর্য প্রণাম মন্ত্র-

ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্,

ধন্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পূব আকাশ মুখো হয়ে গাছতলায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোক সূর্য প্রণাম সারছেন। সূর্যদেবকে মেঘ গ্রাস করেছে ঠিকই, কিন্ত মেঘের চূড়ায় চূড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে তার সোনালি স্বাক্ষর। সূর্য প্রণাম বহুশ্রুত। কিন্ত এই পরিবেশে আগে কখনও এমন সুযোগ আসেনি। আপনা হতেই যতি পড়ল আমার গতিছন্দে। আবৃত্তি যে এত মধুর, এমন স্বচ্ছন্দ সুরময়, তার আবেদন যে এত অনায়াসে অন্তরকে স্পর্শ করে, তা জানার সুযোগ এর আগে আর হয়নি। সেই মুহূর্তের পরিবেশ হয়তো আমাকে প্রভাবিত করেছিল। যাইহোক, ভদ্র লোকের বয়সোচিত সংস্কারকে মনে মনে কুর্নিশ জানালাম। এতদিন মনে হতো শুধুমাত্র শরীরচর্চার উদ্দেশ্যেই, শরীর-মন সতেজ রাখার জন্যই প্রাতর্ভ্রমণ। এখন বুঝলাম যে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়ার মধ্যে যে সার্থকতা আছে, তার গুরুত্ব কিছু কম না।

কিছু মানুষ মাছের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। আটার রুটি, পাঁউরুটি, বিস্কুট, মুড়ি, মাখা আটা। লেকের পরিস্কার জলে ভেসে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে মাছের দল। মাছ খাওয়ানোর দৃশ্যটা দেখার মতো। ছোট্ট পরিসরের জায়গাটায় কিছুক্ষণের জন্য যেন একটা উৎসবের উল্লাস জমাট বেঁধে ওঠে। পাড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে লোকে খাবার দিচ্ছে। একটি সারমেয় মুখ তুলে লোলুপ দৃষ্টিতে দূরে বসে আছে, কিছু জুটে যাবার আশায়। আশাহত হয় না সে। মাছ খাওয়াতে খাওয়াতে এক আধ টুকরো ঐদিকেও ছুঁড়ে দেয় মানুষ। 

রাস্তার ওপাশে লেকের প্রায় গায়েই রয়েছে আরও একটি ছোট্ট লেক। নাম পদ্মপুকুর। অশীতিপর বৃদ্ধেরা যেখানে বসে হিসেব করে রাম নাম করছেন ঠিক তার উল্টোদিকের উদাসী বিজন সড়ক বরাবর মিনিট দুয়েক হাঁটলেই চোখে পড়বে পদ্মপুকুরে ঢোকার লোহার ফটক। জায়গাটা আমার কাছে বড় লেকের তুলনায় আদৌ আকর্ষণীয় মনে হয়নি। পুরো একটা পাক ঘুরে আসলে প্রায় আধ মাইল পথ হাঁটা হয়ে যায়। গাছগাছালি আছে, বসবার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চির ব্যবস্থাও আছে। তবে বড় লেকের মতো পরিবেশ জমজমাট নয়। প্রাতর্ভ্রমণের কুশল বিনিময় আদান প্রদানের কোনো বালাই নেই। অল্প সংখ্যায় কিছু মানুষ  যান্ত্রিক ভাবে মর্নিং-ওয়াকে ব্যস্ত। বড় লেকের বিশালত্বের পরিবেশে প্রানের স্ফূরণ অনেক স্বতঃস্ফূর্ত। আসলে বিশালত্বের সংস্পর্শে মানুষ অনেক উদারমনা হয়ে যায়, দেহ-মনে প্রশন্নতার সাড়া অনুভব করে। শুধু মানুষই বা বলছি কেন, নির্বাক গাছগুলোও শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মাথা নুইয়েছে লেকের জলের কোলে।

 পূব থেকে পশ্চিমমুখো চলতে চলতে লেক যেখানে প্রথম বাঁক নিয়েছে, যেখান থেকে বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরালে সাউথ সিটি কমপ্লেক্সের গগনচুম্বী ইমারত গুলো দেখা যায়, সেখান থেকে প্রায় দেড়শো মিটার পথে ধূসর রঙের আট-ইঞ্চি বর্গাকার টালি বসানো। এই দৈর্ঘ্যটুকুকে শুধু পথ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। এই জায়গাটায় পথ, বাগান, স্থাপত্য- সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা গাছের গোড়া ঘিরে তৈরি করা হয়েছে ঘাসের বেদি। ঘাসগুলো নিখুঁতভাবে ছাঁটা, মনে হয় ভেলভেটের কার্পেট। সেই কার্পেট, গাছের গোড়া থেকে ঢালু হয়ে নেমে এসে মিশেছে রাস্তার সঙ্গে।

কিছু গাছের গোড়া ঘিরে ভিড় করেছে ছোটো ছোটো পাতাবাহার গাছের জঙ্গল। জঙ্গল বলাটা হয়তো ঠিক হ'ল না। কারণ, জঙ্গল কথাটার সঙ্গে আলগাভাবে একটা বিশৃঙ্খলার ভাব জড়িয়ে আছে। বলা যায় এটা সেই জঙ্গল যেখানে দক্ষ মালীর হাতের যাদু আছে। স্বল্প পরিসরের ওই জায়গাটাতে নানা জাতের সবুজের মাখামাখি রঙের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে নীরবে। গাছে গাছে মিলে কী শোভা! ক্ষণিক আনন্দের ঝলক আমার মনেও রঙ ধরিয়ে দিয়েছিল। ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। ঘড়িতে চোখ পড়তেই সভয়ে প্রত্যাবর্তনের জন্য ছুটতে হ'ল, না হলে ওষুধ খাবার সময় পার হয়ে যাবে। বিচ্ছেদের বেদনা নিয়েই সেদিনের মত ফিরে এলাম। সবুজ যে কত রকমের হতে পারে, চোখে না দেখলে ঠিক ঠাহর করা যায় না। রঙ-বেরঙের সবুজের এই বাহার হয়তো কোনো শিল্পীও কল্পনা করতে পারেন না। আসলে বিধাতার মতো শিল্পী কি আর কেউ আছে! এক কথায় লেকের এই ছোট্ট অংশটুকু দেখে মনে হয় যেন রানির সাজে সেজেছে।

মাঝখানে কিছুদিন ভাটা পড়ল। হঠাৎ পর পর দুদিন রাত্রে বৃষ্টি হওয়ার ফলে ঠান্ডা লেগে জ্বর হয়ে গেছিল। ঝুঁকি নিয়ে বেশি দূরে যেতে ভয় লাগছিল। বাড়ির কাছাকাছি পুরনো জায়গা, যোধপুর পার্কের সীমানার মধ্যে  মিউনিসিপ্যালিটির ছোট্ট পার্কটাতে গিয়ে বসতাম। আসলে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা হচ্ছিল না। তাছাড়া সামান্য শরীর খারাপ হলেও একটু বেশি সচেতন হয়ে পড়ি। যাইহোক, সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর যথারীতি পুরনো রুটিনে ফিরে গেলাম। ইতিমধ্যে বর্ষা এসে গেল। ছাতা হাতে নিয়ে প্রাতর্ভ্রমণ ঠিক জমে না। যাইহোক, বর্ষার মধ্যেই আকাশ বুঝে আবার লেকে যাওয়া শুরু করেছি। গ্রীষ্মের যে দাবদাহ, অজস্র গাছগাছালির সংস্পর্শে না এলে ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। গ্রীষ্মের লেকে গাছগাছালিগুলো চোখে পড়তো ঠিকই, কিন্ত বর্ষায় সেগুলোর চেহারায় ধরা দিয়েছে সদ্যস্নাত নববধূর রূপ। অনন্ত তৃষ্ণা নিবারণের পর যেন নতুন জীবন পেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। লেকের জলের স্তর অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। জনসমাগম কমে গিয়েছে। লক্ষ্য করলাম মাত্র এক-আধজন মানুষ মাছ খাওয়াতে ব্যস্ত। মাসখানেক আগেও যেখানে মাছের ঝাঁক কিলবিল করতো, আর একই সঙ্গে ডজনখানেক মৎস্যপ্রেমিক মানুষের ছড়ানো খাবার এক লহমায় নিঃশেষ হয়ে যেত, সেখানে মাঝেমধ্যে দু'একটা মাছ দেখা যাচ্ছে আর জলে খাবার ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশের বেঞ্চিতে বসা ভদ্রলোককে কথাটা পাড়লাম- এত মাছ গেল কোথায় ? ওঁর লেকের সঙ্গে পরিচয় বিগত বিশ বছর যাবৎ। উনি বললেন, বছরের এই সময়ে একদল লোক ভোর চারটে বা তারও আগে এসে মাছ তুলে নিয়ে যায়। আমি অবাক হয়ে বললাম প্রাইভেট সিকিউরিটি ছাড়া সরকারী পুলিশও তো টহলে থাকে সারারাত ! 

- আরে মশাই বোঝেন না, পুলিসের সঙ্গে হিসেব আছে, গলার স্বরে স্পষ্ট বিরক্তির সুর।

- আপনি কি জাল ফেলে মাছ ধরতে দেখেছেন, না লোকমুখে শুনে বলছেন ? 

- আমি দেখেই বলছি।

- তা আপত্তি করলেন না ?

- অবশ্যই করেছিলাম। কিন্ত ওরা শুধু দলেই ভারি ছিল না, আমাকে গম্ভীরভাবে বলল, ‘নাক গলাবেন না, বেড়াতে এসেছেন, ঘুরে বেড়ান না ? আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন।‘ ভদ্রলোক আরও বললেন যে কথাগুলোর ঢঙে যথেষ্ট হুমকির গন্ধ ছিল এবং যেটা অগ্রাহ্য করা এ বয়সে সাহসে কুলোয়নি। আমি বললাম, আপনি ঠিকই করেছিলেন দাদা, আমি হলেও তাই করতাম। বাড়ি ফেরার পর খাবার টেবিলে পরিবারের সবাইকে জানালাম। আসলে সব শহরেই চিরকাল এক জাতের গুন্ডা-বদমায়েস বেকার ছেলেরা বাস করে। সম্ভবত চিরদিনই থাকবে, যতই সমাজতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন। সৎ উপায়ে খেটে খেতে সকলে চায় না। পরিশ্রমে সকলের রুচি থাকবে, তা বোধহয় আশাও করা যায় না।

লেকের উত্তর  দিকের পাড়টা ভালই সাজানো-গোছানো। সেই তুলনায় দক্ষিণে প্রায় হাত পড়েনি বললেই মনে হয়, শুধুমাত্র পায়ে হাঁটা রাস্তাটুকু ছাড়া। ছাই রঙ আর মেটে লাল রঙের ষড়ভূজাকৃতি টালি লাগিয়ে রাস্তাটা তৈরি হয়েছে; এক লাইন ছাই রঙ, পরের লাইন মেটে লাল রঙ। সমস্ত রাস্তাটা এরই পুনরাবৃত্তি। পূব থেকে পশ্চিমমুখো হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলে চোখে পড়বে প্রায় একশ মিটার মতো রাস্তার টালিগুলো বেশ কয়েক বছর আগে লাগানো হয়েছিল। কারণ কালের ঘায়ের কয়েক পোঁচ পলেস্তারা পড়েছে এই পথটুকুর ওপর। কিছুদূর এগুলি চোখে পড়বে অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য। হ্যাঁ, এইখানেই আমার দেখা হ'ল ইতিহাসের সঙ্গে। জলের ধারে ঝোপের মধ্যে একটা তিন-নলা কামান দেখলাম। ইতিহাস জানা নেই। কোনও এক সময়ে জায়গাটায় হয়তো ফৌজি ব্যারাক ছিল। দক্ষিণের সীমানা পাঁচিলের ধার ঘেঁষে দশ-পনেরো মিনিট অন্তর ভোঁ বাজিয়ে দৌড়ে চলেছে শেয়ালদা-বজবজ লাইনের লোকাল ট্রেন। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা বড় বড় গাছগুলোর পাতা এলোমেলোভাবে জড়াজড়ি করে যে জাল তৈরি করেছে, তার ভেতর দিয়ে ট্রেনের কামরার ওপরের অংশটা দেখা যায়। উত্তর-দক্ষিণ, দু’পাড়েই বিশাল বেশ কিছু গাছের গুঁড়ির ব্যাস আর শাখা প্রশাখা বিস্তারের ব্যাপ্তি দেখে মনে হয় ওগুলো যেন স্তব্ধতার মন্ত্রে মূক, এক একটা যেন কালের প্রহরী।

 নেই মোবাইলের উৎপাত। নিজে তেমন ব্যবহার না করলেও, আজকের ব্যস্ততার যুগে যন্ত্রটির প্রয়োজন কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্ত রাস্তাঘাটে, বাস-ট্রাম-ট্রেন, অটো, বাজার-দোকান – সর্বত্র যখন মানুষের ব্যক্তিগত কথার টুকরোগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তখন মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্তির উদ্রেক হয়। আর যন্ত্রটার অপব্যবহারের খবর মাঝে মধ্যেই সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনামে জায়গা করে নেয়। মোবাইল ব্যবহারকারী বেশ কিছু ব্যস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেও বুঝেছি যন্ত্রটা তাঁদের কাছেও উৎপাতের উৎস। তাঁরা আমার মতো ঘরে বসে থাকা বেকার কেউ নন। - ‘আরে মশাই অন্তত এই সকালটা মোবাইলের বিরক্ত ভাল লাগে না - প্রাতর্ভ্রমণকারী এক ভদ্রলোকের মন্তব্য। এই সময়টুকু একেবারেই নিজস্ব। একই বেঞ্চিতে আরও দু'একজন যাঁরা বসেছিলেন তাঁরাও সমস্বরে মন্তব্যটিতে সায় দিলেন।‘


শীত ঘোষণার হাল্কা হিমেল হাওয়া সবে বইতে শুরু করেছে। এমনই একটা দিন বিকেল থাকতে থাকতেই গেলাম লেকে। জায়গাটা প্রায় জনমানবশুন্য বললেই চলে। দেখলাম ঐ সময়ে লেকের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। সূর্য পশ্চিম দিগ্বলয়ে প্রায় হেলে পড়েছে। চোখের সামনে আকাশটা যেন সোনায় আর আবিরে মাখামাখি হয়ে গেল। মিষ্টি নরম রোদ গাছগাছালির লতায় পাতায় পিছল খেয়ে চলার পথে এক আলো-আঁধারির নক্সা তৈরি করেছে। আর সব রঙের সবুজ মিলেমিশে গিয়ে পরিবেশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক মনোরম সবুজাভা। ঝুপরিঝুপরি পাতার আড়াল দিয়ে পশ্চিমের সিঁদুরে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বিশাল এই সবুজের অঙ্গীভূত ঢেউ-য়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম। সারা লেক জুড়ে শান্ত এক ছায়া ক্রমশ গাঢ় হয়ে এল। সময় গড়াতে গড়াতে রোদের তেজ যখন আরো নরম হয়ে এসেছে, শেষ বিকেলের সেই আলোছায়ায় সবুজাভা গাঢ় হতে হতে কোন সময় সন্ধ্যের হাত ধরাধরি করে মিশে গেল। লেক ক্লাব থেকে বেরোনো দুটো নৌকোকে পাড়ের প্রায় ধার দিয়ে শান্ত জলে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ তুলে ফিরতে দেখলাম। শান্ত জলে কুলকুল করে ঢেউয়ের স্রোত পাড়ে এসে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে। আমার মনের অন্তঃস্রোতও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের সময়ের পুরু আবরণ ভেদ করে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল বেশ কয়েকটা বিকেলের এমন মনোমুগ্ধকর রাঙা অপরাহ্নের স্মৃতিতে। পাখিদের ঘরে ফেরার কিচির মিচির আওয়াজ আমাকে যেন জানান দিল, ‘ফিরে চলো ঘরে।' গেট থেকে বেরিয়ে পিছন ফিরে দেখি গাঢ় অন্ধকারে চরাচর ছেয়ে গেছে।

সুদূর অতীতের বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতির ভান্ডার হাতড়ে কিছুটা উদ্ধার করা গেল পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার এক বিকেলের স্মৃতি। অফিসের কাজে রাশিয়ার দুবনা নামের একটা জায়গায় মাসখানেক ছিলাম। যে জায়গায় থাকতাম, তার অনতিদূরে ভোলগা নদীর দু'ধার দিয়ে গাছের সারি আর বাঁধানো রাস্তার উপর কিছুদূর পরে পরেই বসার ব্যবস্থা করা। কাজের পর প্রায় রোজ বিকেলেই ওই জায়গাটায় বেড়াতাম। বহু দশক আগে দেখা ছোট্ট একটা বিদেশি গ্রামের এক টুকরো ছবি আর আমার দক্ষিণ কলকাতার এই লেকের পরিবেশ আমার অজান্তেই কখনই হঠাৎ মিলেমিশে এক হয়ে গেল। দুটোই ছবির মতো। তফাৎ এক জায়গাতে। ওটা ছিল নিশ্চল ছবি। আর আমার ঢাকুরিয়া লেক হ'ল প্রানৈশ্বর্যের কোলাজে সৃষ্ট এক সচল জীবনের রূপরেখা। যাঁরা পশ্চিমের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের বারবার ছোটো করেন, তাঁরা জেনে রাখুন যে, আমার দেশে, বিশেষ করে আমার এই কলকাতায় ষাটোর্ধো যে সব মানুষের মোটামুটি একটা অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আছে, তাঁরা বেশিরভাগই মানসিক সুখে আছেন। এটা ব্যক্তিগতভাবে একটা অহঙ্কারের জায়গা।

প্রায় শীতের শেষ। লেকে ঢুকলাম। কুয়াশার ওড়না দিয়ে যেন আত্মগোপন করে আছে লেক। আকাশে বর্ণহীন তারাগুলো বিষাদ ম্লান। হাঁটা শুরু করলাম। কুয়াশার আস্তরণ ছিঁড়ে লেক ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। মাঝখানে সবুজ জঙ্গলে ভরা ছোট্ট দ্বীপটার আবছাভাব আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগলো। বেড়াতে ইচ্ছে করছিল না। গা শিরশির করা হিমেল হাওয়া বইছিল। চুপ করে বসে শুনছিলাম গাছের কথা, হাওয়ার কথা, ঘরমুখো পাখিদের কথা। মনে হ'ল আমাদের শহুরে জীবনে গাছ নেই, পাখি নেই, ফুল নেই, নির্জনতা নেই বলেই মানুষ এত মেটেরিয়ালিস্টিক, এত লোভী। একটু বেলা বাড়তেই রোদের ঈষদুষ্ঞ উত্তাপ বন্ধু হয়ে যেন জড়িয়ে ধরল। শীতটা বেশ অন্য রকম আমেজে উপভোগ করলাম। 

খৈনিপ্রসাদ পাঠকের (এটাও কাল্পনিক নাম, পড়লেই বোঝা যাবে) গল্পটাই বা বাদ যায় কেন ? ফেরার সময় গেটের মুখে দরোয়ানজী গোছের একটি লোককে দেখি চায়ের দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের তালুতে রাখা খইনি ডলছেন আর দেশওয়ালি দু'একজনের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। সকালে সব মানুষ যখন স্বাস্থ্যচর্চায় ব্যস্ত, তখন ঐ মানুষটিকে দেখে মনে হয় ওই ব্যাপারে ওঁর কোনো হেলদোল নেই। যাইহোক, মিনিটখানেক বাদে খৈনিটা দু'হাতের এ-তালু ও-তালুতে বদলা-বদলি করে চূণের ধূলোটা উড়িয়ে দিয়ে তলার পাটির দাঁত আর ঠোঁটের মাঝে ফেলে দিয়ে থম মেরে বসে রইল। আসলে নেশার বস্তুর মৌতাতের টান না বোঝে সকাল-বিকেল, না বোঝে স্বাস্থ্য। 

লেক কি মানুষকে শুধুমাত্র আকর্ষণই করে ? লেকের গাছগাছালি, লেকের তিরতিরে জলে খেলে বেড়ানো মাছের ঝাঁক, লেকে ভাষাভাষি নির্বিশেষে সর্বধর্ম মানুষজনের মধ্যে সাক্ষাতের উষ্ণতা – এক কথায় লেকের পরিবেশের মুগ্ধতা কি মানুষকে শুধু আকর্ষণই করে, নাকি বিকর্ষণের উপকরণও কিছু আছে ? আছে, অবশ্যই আছে। সময়ের তারতম্যে চিত্রটা একেবারেই পাল্টে যায়। ভোরের আলোতে লেক মানুষের কাছে যতটা ধর্ম-কর্মের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, সন্ধ্যের পর ঠিক ততটাই বা তারও বেশি অধর্ম-অকর্মের আস্তাকুড়। সম্পূর্ণ অজান্তে অসতর্কে এই অভিজ্ঞতা একবারই হয়েছিল। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, কাজেই প্রায় আতঙ্কতাড়িত হয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবার পথ না পেয়ে সহায়-সম্বলহীন মনে হ'ল, নিজেকে দলিত মনে হ'ল। জায়গায় জায়গায় মানুষের প্রকৃতির স্থূলতম লালসার প্রতিযোগিতা চলছে, চলছে রুদ্ধ কামনা-বাসনার বিদ্রোহ। ন্যুনতম রুচিবোধও যাদের আছে, সেইসব মানুষের পক্ষেও ওই একবারই সাক্ষী হয়ে থাকাটাও, নিজের কাছে হলেও চূড়ান্ত অবমাননা। অন্তত আমাদের মতো মানুষের কাছে তো বটেই। একই দিনে সময়ের তারতম্যে এ এক অন্য লেকের ছবি। যাঁরা এড়িয়ে যেতে চান, তাঁরা বলেন ছেলেমেয়েরা নাকি রোমান্সে মসগুল। এটা রোমান্স? বিতর্কে যেতে চাই না। আমার মনে হয়েছে ইন্দ্রিয়জ ব্যাভিচারের ঢালাও পাসপোর্ট নিয়ে তারা এক অন্য দুনিয়ায়। এ তো রোমান্সকে খুন করা হচ্ছে। এটা রোমান্সের তলানি। এসব দেখলে এমন সব কথা মনে পড়ে যা সামনাসামনি বলা দুষ্কর, আবার লিখতে গেলেও কলম সরে না। পরিবারের নিকটতম মানুষটির সঙ্গে ভাগ করে মনের হতাশা দমন করি। অনেক কথা তাকেও বলতে রুচিতে বাধে, তাই নিজেকেই নিজে অনেক কথা বলে চলেছি নিরুচ্চারে। আর নীতিগতভাবে যা মেনে নিতে পারি না, তার দলিলগত প্রমাণ হিসেবে কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ করে রাখি। লেখার এই অংশটুকু তারই প্রতিফলন। আসলে আজকে সামাজিক, এমনকি পারিবারিক জীবন ধারনের মধ্যে ন্যুনতম রক্ষণশীলতার পরিমন্ডল আদৌ নেই। হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার, যেখানে সেই পরিবেশ আছে, সেখানে আজও ছেলেমেয়েদের মেলামেশাতে রয়েছে গোপনীয়তা। আর সেই গোপনীয়তার কারণেই সত্যিকারের আকর্ষণ। আমার মনে হয় রোমান্টিক প্রেমের সম্পর্ক সেখানে আজও তৈরি হয়। রোমান্স আর গোপনীয়তা সেখানে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। আসলে ভোগবাদের আজকের জীবনে, মোদ্দা কথা, সর্বক্ষেত্রে যা দেখি তা হ'ল একবার লজ্জার খোলসটা খুলে ফেললে, সেটাই নিয়ম হয়ে যায়। শুধু তাই নয় তখন চলতে থাকে নির্লজ্জতার প্রতিযোগিতা। সমাজের এতটা অবক্ষয় দেখে আমার শহুরে সভ্যতাগর্বী মন থমকে গেছিল। ভাবতে গিয়ে সমস্ত মনটা গভীর নৈরাস্যে ভরে উঠেছিল। লজ্জা, দুঃখ, অসম্মান- কী না নিহিত ছিল মনের সেই অবস্থার মধ্যে। মনে হয়েছিল কালস্রোত কী দুর্নিবার বেগে মানুষগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের জীবনধারা গতানুগতিক। চাকুরিজীবি, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বেকার, অবসরপ্রাপ্ত- যাঁরা আরও এক ধরনের বেকার, সবাই ওই একই শ্রেণীভুক্ত। ছকে বাঁধা জীবন। মাঝে মধ্যে যতটুকু বৈচিত্র্য আসে সেটা সারা জীবনের নিরিখে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। বৈচিত্র্য দীর্ঘস্থায়ী হবার কথাও নয়। কাজেই বৈচিত্র্যের রেশ খুব শিগগিরই মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গা নেয় একঘেঁয়েমি। শুধুমাত্র সৃষ্টিধর্মী মানুষজন এই ছকের ব্যতিক্রম। এটা আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত। অবসর জীবনের গতানুগতিকতাকে মানুষ নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। সেখানে সবচেয়ে সুবিধে হ'ল, অখন্ড স্বাধীনতার স্বাদ। আমার এক শুভাকাঙ্খী, আমার স্ত্রীর বন্ধুর বাবা, বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই। আমার কাছে উনি খুবই শ্রদ্ধেয়। চাকরি জীবনে উচ্চ পদাধিকারী ছিলেন। বছর তিরিশেক আগে উনি অবসর নিয়েছেন। আমি তখন যুবক। জিজ্ঞাসা করেছিলাম উনি কীভাবে সময় কাটান। তিনি যে উত্তরটা দিয়েছিলেন, মনে এতটাই ধরেছিল যে স্মৃতিতে আজও সতেজ। কাজেই ওঁর মুখের কথাতেই ব্যক্ত করলাম  -  “জীবনে নিজের ইচ্ছেমতো বিশেষ কিছু করে উঠতে পারিনি। শরীর সুস্থ থাকলে এখন সেগুলো করার চেষ্টা করার ইচ্ছে আছে।“ তাঁর ইচ্ছার খুঁটিনাটি ছকের ব্যাপারে কোনও কথা হয়নি। আজও জানিনা। তবে অবসর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে, সেই ছকের সর্বসম্মত একটা ইচ্ছে বোধহয় ভোরের বেড়ানো। সেটা গতানুগতিক হলেও সেই একঘেঁয়েমির মধ্যে এমন একটা চোরা সুখ আছে, এমন মাদকতা আছে, এমন অদৃশ্য হাতছানি আছে, যে সেই প্রত্যাশার প্রতিক্ষায় বাকি চব্বিশ ঘন্টা অনায়াসে কেটে যায়। আঞ্চলিক অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে দেখেছি তেমন মন ভরেনি। লেকে প্রাতর্ভ্রমণ ওই মাদকতার হাতছানি, সুখ, নেশা যাই বলি না কেন, সেই অনুভূতিতে অনেকগুলো বাড়তি মাত্রা যোগ করে। রোজ অনেকটা হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আসলে পরিবেশের প্রভাব পা-কে থামতে দেয় না। বাড়িতে ফিরে এসে রোজই প্রতিজ্ঞা করি কাল থেকে আর লেকমুখো হ’ব না, লোকালয়ের ছোট্ট পার্কে বেড়িয়ে আসব। খাওয়া-দাওয়ার পরে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পালা। শরীর চাঙা হয়ে ওঠে। কাজে কাজেই বিকেলের দিকে সেই প্রতিজ্ঞার কাঠিন্য কমে আসে, সন্ধ্যায় বিলুপ্ত হয়। অতএব পরের দিন থেকে চলতে থাকে একই রুটিন। এতে কোনও একঘেঁয়েমি বলে বোধ হয় না। লেকের প্রাতর্ভ্রমণ এমনভাবেই মন মজিয়ে ফেলেছে।


No comments: