কে তিনি ?
ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা ও তাঁর নাম বহুদিন আগেই সমার্থক হয়ে গিয়েছে। তিনি হলেন ভারতবর্ষের 'মিসাইল মেসায়া'। আবুল পাকির জয়নালাবদীন আবদুল কালাম। ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ছোট্টো টীকা লিখে তুলে ধরব কালাম সাহেবের কর্মব্যস্ত জীবনের বিক্ষিপ্ত কয়েক ঝলক।
ক্ষেপণাস্ত্রের সুবিধেটা হ'ল এই যে, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো জওয়ানকে পাঠানোর দরকার নেই। গোটাকতক বোতাম টিপেই অব্যর্থভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানা যাবে। এক মহাদেশ পার হয়ে আছড়ে পড়বে আরেক মহাদেশে। প্রথাগত বিষ্ফোরক বা পরমাণু অস্ত্র - দু-ধরনের ওয়ারহেডস্ই মজুত রাখা সম্ভব মিসাইলে। টেলিভিসনের দৌলতে আমরা অনেকেই দেখেছি পারস্য উপসাগর থেকে মিসাইলে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র কী ভাবে আছড়ে পড়েছিল অব্যর্থ লক্ষ্য, বাগদাদের তেল শোধনাগারে। কসোভার আকাশ আলোয় আলো হয়ে গিয়েছিল ক্ষেপণাস্ত্রের ছোটাছুটিতে।
পিতা, তিট্টাকুম্ভীর জয়নালাবদীন, পেশায় ছিলেন জেলে। ধনুষ্কোটি রামেশ্বরমের ঘাটে থাকতো তাঁর নৌকো। সেই নৌকো নিয়ে মাঝে মাঝে চলে যেতেন দূর দরিয়ায় মাছ ধরতে। মাঝে মাঝে বাবার পিছন পিছন জয়নালাবদীন-ও যেত আর তাকিয়ে থাকতো আকাশ আর সমুদ্র মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া দিগন্তে। সেখানে ছোটো ছোটো বিন্দুর মতো ভেসে থাকা পাখির দল স্বচ্ছন্দে উড়ে বেড়াতো । আর একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে ছোট্ট কালাম স্বপ্ন দেখতো যে সে-ও একদিন ওই পাখিদের মতো উড়ে বেড়াবে আকাশে।
আক্ষরিক অর্থে মাদ্রাজের ( এখনকার চেন্নাই ) এম আই টি থেকে পাশ করা তিনি একজন য়্যারনটিক্যাল এঞ্জিনিয়ার। নামী-দামী পুরস্কার-ও পাননি। অথচ পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্য সম্মানের মুকুট তাঁর মাথাব উপর শোভা পাচ্ছে। এ পি জে আবদুল কালাম উপমহাদেশের এক অতি পরিচিত নাম। তাই বা কি করে বলি ? পৃথিবীর নানান্ দেশের কর্ণধাররাও তাঁর নাম সমীহের দৃষ্টিতে স্মরণ করেন।
এয়ার ফোর্সের পাইলট হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এম আই টি থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। পোশাকি ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষার এখানেই ইতি। মনের ইচ্ছে, উড়েউড়ে ঘুরে বেড়াবেন দিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন নীল আকাশের বুকে। বাস্তব তাঁকে অন্য পথে চালিত করল। ভগবৎপ্রেমী কালাম বুঝতে পারলেন যে তাঁর জীবন-দেবতা তাঁকে জনারণ্যে হারিয়ে যেতে দেবেন না বলেই তাঁর স্বপ্নের এই পরিণতি হয়েছে। কিশোর কালামের পেশার জীবন শুরু হ'ল হিন্দুস্তান য়্যারনটিকস্ লিমিটেডের শিক্ষানবিশী হিসেবে। তারপর প্রতিরক্ষা দপ্তরের ডাইরেক্টরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভলপমেন্ট এস্টাবলিসমেন্টে (ADE)। অদম্য উড়ে বেড়াবার ইচ্ছা রূপান্তরিত হ'ল, সেই ওড়ার নেশাকে ঘিরেই। জন্ম হ'ল দেশি প্রযুক্তির ফসল 'নন্দী' হোভারক্রাফট্। সেই সময় মুম্বাইঅয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামন্টাল রিসার্চের (TIFR) তদানীন্তন অধিকর্তা, প্রফেসর এম জি কে মেনন ADE তে এসেছিলেন। তাঁকে যন্ত্রটির মধ্যে বসিয়ে মাটির উপর ভাসিয়ে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছিলেন কালাম। এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই ইন্ডিয়ান কমিশন ফর স্পেস রিসার্চ (INCOSPAR) থেকে রকেট এঞ্জিনিয়ার পদের ইন্টারভিউয়ের ডাক পেলেন। এটিই ছিল তাঁর বৃহত্তম জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করার প্রথম সিংহদুয়ার। INCOSPAR-য়ে যোগদানের অব্যবহিত পরেই তাঁকে ছ-মাসের ট্রেনিং-এ পাঠানো হ'ল স্পেস টেকনোলজির পীঠস্থান, আমেরিকার ন্যাশনাল য়্যারনটিকস্ য়্যান্ড স্পেস য়্যাডমিনিস্ট্রেসনের (NASA) গবেষণাগারে। ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হলেন ত্রিবান্দামের থুম্বায়। বাকিটা ভারতবর্ষের স্পেশ টেকনোলজির ইতিহাস। শুরু হ'ল একের পর এক রকেট ওড়ানোর পালা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছিল এবং এই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে একের পর এক মিসাইল- পৃথ্বী, ত্রিসুল, আকাশ, নাগ, অগ্নি। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা অসীম্মা, সেই সমুদ্র সৈকতেই দু-দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপন করে গিয়েছেন ছেলে। বিক্রম সারাভাই- এর স্বপ্নের স্পেস প্রোগ্রাম, পৃথিবীর স্পেস টেকনোলজির ইতিহাসে ভারতবর্ষকে পাকাপাকিভাবে স্থান করে দিয়েছে, মূলত তাঁরই হাত ধরে। শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারতবর্ষ বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।আজ দেশ স্বাধীনতার ঊনসত্তর বছর কেটে গেলেও, সাদা চামড়ার মানুষদের সিলমোহর না পাওয়া পর্যন্ত যেখানে সাফল্য স্বীকৃতি পায় না, আবদুল কালাম সেখানে এক নজিরবিহীন সাফল্যের প্রতীক। দেশজ প্রযুক্তির ফসলেই একটা দেশের আর্থিক অগ্রগতি হয়, স্বায়ত্ব সভ্যতার অগ্রগতি হয়। এই সরল বিশ্বাসে, আবদুল কালাম দেশজ প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে শাণিত করেছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন স্পেস প্রোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশাল কর্মযজ্ঞে। এমন আত্মসম্মানী, ধর্মনিরপেক্ষ ভরতীয়র নজির বড় একটা চোখে পড়ে না।
জীবনের শুরুতেই NASA-র গবেষনাগারে ছ-মাসের ট্রেনিংই ছিল কালামের চাকরিজীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা এবং শেষও বটে।আমেরিকাতে ঘাঁটি গেড়ে বসে পড়েননি, যেটা উনি আনায়াসেই পারতেন। ওঁনার সম্বন্ধে এত কথা পড়েছি এবং জেনেছি যে ওঁর একটা আলেক্ষ্যই মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে গেছে। তাঁর সারাজীবনের চালচলনের খতিয়ান বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে যে, জীবনশুরুর গোড়াতেই তিনি বুঝে গেছিলেন যে মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতাবোধ - এই একান্ত নিজস্ব বোধগুলোকে কেড়ে নেবার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তার মুখে টাকা ছুঁড়ে দেওয়া, তাকে এমন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে দেওয়া যা থেকে সে কোনো মতেই বেরিয়ে আসতে না পারে। এ সত্য পৃথিবীর সব প্রান্তের মালিকরা খুব ভালই বোঝেন। এই ব্যাপারগুলো তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। জীবনে কোনোরকম ফাঁদেই তিনি পা দেননি। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা মনে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা যাবতীয় সাফল্যের চাবিকাঠি, ওই ফাঁদ পাতার কৌশলে। সারা পৃথিবীর সাধারণ যোগ্যতার অভিবাসীরা, অর্থাৎ immigrants ( ব্যতিক্রমী অসাধরনের সংখ্যা শতকের হিসেবে প্রায় নগন্য) ওখানে ভিড় করেছে তাদের তৈরি করা পরিকল্পনার রূপায়ণে। মার্কিন মালিকরা বোঝেন, টাকার মতো আঠা আর নেই, সব ছ্যাঁদাই মেরামত হয়ে যায়। ফিরে যাব মূল আলোচনায়।
ভারতীয় স্পেস টেকনোলজির জনক, বিক্রম সারাভাই ছাড়াও, পেশার জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে সংস্পর্শে এসেছেন সতীস ধাওয়ান, ব্রম্ভপ্রকাশের মতো গুণীজনের। কিন্তু কর্মজীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে যে মানুষটির নীরব ভূমিকা ছিল, তিনি হলেন তাঁর পিতা, জয়নালাবদীন। সাফল্য, ব্যর্থতা, বিষাদ - সব পরিস্থিতিতেই তিনি অকপটে স্মরণ করেছেন পিতাকে।আদর্শবাদের যে উত্তরাধিকার ছোটোবেলায় এবং কৈশোরে তিনি পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, তার এতটুকু অমর্যাদা হতে দেননি। পিতার নির্দেশিত পথই যে তিনি বরাবর অনুসরণ করেছেন, তা তাঁর মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়। : ............., he adds, " I have throughout my life tried to emulate my father in my own world of science and technology. I have endeavoured to understand the fundamental truths revealed to me by my father, and feel convinced that there exists a divine power that can lift one from confusion, misery, melancholy and failure and guide one to one's place".
কর্মক্ষেত্রে, বিশেষত সরকারি কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারে লাল ফিতের গেরো ছাড়াও প্রধান প্রতিবন্ধক সহ কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত। বিজ্ঞানীদের মধ্যে রেষারেষি নতুন কিছু নয়। কালামের ঘরানাই অন্য ধাঁচের। প্রতিরক্ষা দপ্তরের গবেষনাগার, ডি আর ডি ও-র (DRDO) অধিকর্তা, কে সন্তনমের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে কালামের কোনোদিন মন কষাকষি হয়েছে, এমন অপবাদ শত্রুতেও দিতে পারবে না, অবশ্য যদি তাঁর শত্রু আদৌ কেউ থাকেন ! কালাম সাহেবের কর্মকুশলতা, বিশেষত দক্ষ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের গুণ, দেশের নামজাদা এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও জাতীয় গবেষণাগারের নবীন ও প্রবীন উজ্জ্বল তারকাদের চিন্তার ফসলকে একত্রিত করতে পেরেছে। নিট ফল - ভারতীয় স্পেস প্রোগ্রামের অভূতপূর্ব সাফল্য, স্পেস টেকনোলজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উল্লেখযোগ্য আরও একটি ঘটনার কথা মনে আসছে। ইসরোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক চুকিয়ে, হতাশা আর ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন কালাম, হায়দ্রাবাদের ডি আর ডি এল গবেষণাগারের ভার গ্রহণ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে এটি আরও একটি গবেষণাগার। পদমর্যাদার দৌলতে শহরতলির কাঞ্চনবাগে একটি সুবিশাল বাংলোয় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলো প্রত্যাখ্যান করে ল্যাবরেটরির মেসে আটখানা কামরার একটিতে তিনি শয্যা পাতলেন। ফৌজি কড়াকড়ির বদ্ধ বাতাস উধাও, বিজ্ঞানীমহলে চলে এল খোলামেলা কাজের পরিবেশ। পরের ঘটনাগুলো প্রায় রূপকথার মতো।
সফল নেতৃত্বের প্রাথমিক সর্ত হওয়া উচিৎ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার ত্বরিৎ রূপায়ণ। দ্বিধাগ্রস্থতা বা দীর্ঘসূত্রীতার কোনো স্থান নেই সেখানে। এই সহজ তত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন সহজ সরল মানুষটি। বাকপটুতায় অনভ্যস্থ কালাম, সব কর্মীদের সঙ্গে টেকনিক্যাল আলোচনায় শুধুমাত্র স্বচ্ছন্দ বোধই করতেন না, সমস্যার গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতার বলে বাদ-প্রতিবাদের জট খুব সহজে ছাড়াতে পারতেন। বই খাতা আর জ্ঞানের স্বচ্ছতাকেই তিনি মনে করতেন আত্মরক্ষার অস্ত্র ।আসলে ভাবনার দৌড়ে বরাবরই সময়ের থেকে এগিয়ে থেকেছেন তিনি। তিনি এটাও বুঝতেন যে বাকসর্বস্ব চতুর মানুষ দৃষ্টি আকর্ষণী ভাষার ব্যবহারে কী ভাবে অসার বক্তৃতার ফাঁকগুলো ভরাট করে আসল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। সেই সব তথাকথিত স্মার্ট মানুষদের সঙ্গ তিনি নিজের চারিত্রিক সরলতা ও ধৈর্যকে হাতিয়ার করে সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে পারতেন। আমলাদের সঙ্গে মতান্তরে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল চাঁচাছোলা। স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেয়িকল্, এস এল ভি প্রকল্পে কেনাকাটার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস, পায়ে পায়ে নিষেধের বেড়ি- প্রকল্পের কাজে বাধা সৃষ্টি করছিল। কালাম সাহেব নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি। ওপরওয়ালার সামনে নালিস জানিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে মনেও হয়েছিল, সাময়িক হঠকারিতায় মেজাজ হারানো ঠিক হ্য়নি। সারারাত্রি জেগে কাটিয়েছেন। মনকে প্রবোধ দিয়েছেন এই বলে যে " বিচারের শক্তি যাদের আছে, তাদের মধ্যে মতের ঐক্যই অনিয়ম, মতের ঐক্য ব্যতিক্রম "। আসলে তাঁর চিন্তা-ভাবনায় ছিল একটা অখন্ডনীয় যুক্তির স্বচ্ছতা। ঠিক সেই কারণেই তিনি আপসের পথ বেছে নেননি। উদ্যোগী নির্ভীক মানুষকে ঈশ্বর সাহায্য করেন। বলা বাহুল্য, এর পর থেকে এস এল ভি সংক্রান্ত কেনাকাটার ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা।
কুড়ি-বাইশ বছর বয়সে পেশার জীবন সুরু করে দৃষ্টি কেড়েছেন দেশের কর্ণধারদের। দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী ও আমলাদের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্তু কখনই তাঁদের সঙ্গে তিনি অনুচিৎভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি, সম্ভ্রমসূচক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা তাঁকে বিন্দুমাত্র আত্মঅহমিকাবোধে আচ্ছন্ন করতে পারেনি।একের পর এক সাফল্য এসেছে এবং পরিণত বয়সেও সেই সাফল্যকে তিনি সমান উদ্যমে ধরে রেখেছেন।কারণ আত্মতুষ্টির মৌতাতে তিনি কখনও মসগুল হয়ে ওঠেননি অথবা সংবাদ মাধ্যমকে খাতির করে ডেকে ফলাও করে জাহির করেননি। সর্বদাই সংযত থেকেছেন। উচ্চতার শিখরে পৌঁছেও চাল-চলন কথাবার্তায় তাঁর কখনও কতৃত্বের সুর প্রকাশ পায়নি। সাফল্য ধরে রাখার এই ক্ষমতাটাই তাঁকে ফারাক করে দিয়েছে গড়পড়তা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নায়কদের সঙ্গে।i
ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর প্রানের অনেক কাছের মানুষ এবং সব সময়েই তাদের তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সময়টা ঠিক স্মরণে নেই। তবে সেই একবারই, দর্শকের আসন থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের একটি অনুষ্ঠান বিড়লা সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।উনি এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসাবে। ছাত্রদের কৌতুহলী প্রশ্নবাণে তিনি মুগ্ধ। আবেগাপ্লুত কালাম নিরাপত্তা বেষ্টনীর তোয়াক্কা না করে মঞ্চ পরিত্যাগ করে হাজির হলেন ছাত্রদের মাঝখানে।তাঁর প্রচারবিমুখ স্বভাব ফটোগ্রাফারদের ক্যমেরাকে ম্লান করে দিয়েছিল। ছাত্রদের অন্য এক অনুষ্ঠানে কোনো একজন তাঁকে প্রশ্ন করে, " Define birthday " ওঁনার চটজলদি উত্তর, " The only day in your life when your mother smiled when you cried " -.ভাবনার স্বচ্ছতা আর উপস্থিত বুদ্ধির এক অভিনব মিশেল !
বাস্থবের মুখোমুখি হয়ে, নিজের ভূত-ভবিষ্যতের কথা ভেবে মূল্যবোধ কথাটির অর্থ এক একজনের কাছে এক একরকম। অতীতের মূল্যবোধ প্রায় লুপ্তপ্রায়। আজীবন কর্মব্যস্ত কালামসাহেবের মূল্যবোধে কখনও টান পড়েনি। কারণ তা তিনি সযত্নে লালিত করে এসেছেন। ব্যস্ততার চরম মুহূর্তেও তিনি মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মূল্যবোধের প্রভাবকে অস্বীকার করেননি, বরং সাদরে গ্রহণ করেছেন। ভাইঝির বিবাহ, ভগ্নীপতির মৃত্যু, পিতার মৃত্যুর খবর তাঁর দেহ-মনকে ছুটিয়ে এনেছে রামেশ্বরমের গ্রাম্য পরিবেশে। আসলে এমনই একটি পরিবার থেকে উনি ঊঠে এসেছিলেন, যেখানে নিম্নবিত্ত রক্ষণশীলতার গ্রামীন পরিমন্ডল আজও রয়ে গেছে এবং তিনি সব সময়ই সেটাকে সমীহ করে এসেছেন। সাংস্কৃতিক বন্ধন আর পারিবারিক যোগাযোগের মধ্যেই উনি খুঁজে পেয়েছিলেন আত্মিক উন্নতির মূলমন্ত্র। তিনি মনে করতেন যে সব গুরুস্থানীয় ব্যক্তির সস্নেহ ও সযত্ন শিক্ষা তাঁর অধীত জ্ঞানকে সমৃদ্ধি দান করেছে, তাঁরাই তাঁর জীবনে যা কিছু দৃষ্টির উৎস। আজীবন মনে রেখেছেন সেই সব গুরুস্থানীয় মানুষদের। মাদুরাইতে কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রনে সাড়া দিয়েছেন। সেখানে পোঁছেই খুঁজে বার করেছেন তাঁর শিক্ষক আয়াদুরাই সলোমনকে। অশীতিপর বৃদ্ধ সলোমনকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির করেছেন মঞ্চের উপরে। প্রতিরক্ষা গবেষণাগারের কাজের পরিবেশের মধ্যে তিনি এমনই একটি বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে কর্মদীপ্ত নবীনদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রবীনদের অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতাও বটে। আসলে মূল্যবোধকে তিনি মনে করতেন সমাজ ও জীবনচর্চ্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি মনে করতেন মূল্যবোধ আর কিছুই নয়, শুধুমাত্র কতগুলো অগ্রাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। মূল্যবোধ ছিল তাঁর কাছে সহানুভূতি আশ্রিত যেটা ক্রমশ গড়ে উঠেছিল আত্মীয়-স্বজন, গুরুস্থানীয় শিক্ষক এবং ভ্রাতৃবৎ সহকর্মীদের আশ্রয় করে এবং যা অবধারিতভাবে চারিয়ে গেছে তাঁর ভাবনা ও মননের গভীর থেকে আরও গভীরে। ধর্মের গোঁড়ামি তাঁকে কখনও স্পর্শ করেনি। গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন ভাগবত গীতা। কোরান শরিফও। আমার মনে হয় তাঁর ধর্মবোধ এবং পারিবারিক ও বৃহত্তর ক্ষেত্রে, সামাজিক মূল্যবোধের সমবায়েই গড়ে উঠেছে তাঁর দেশাত্মবোধ।
এই বিশাল দুনিয়ায় কতই না বিচিত্র আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে। মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য সম্পদ-সম্ভোগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। শিক্ষিত আধুনিক মানুষের প্রতি তাঁর আবেদন, অহেতুক ভোগবাদে বিরত থাকা। তাঁর মতে বস্তুবাদ আর সম্পদের প্রদর্শন কখনই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। যে কোনো অনুষ্ঠানের গতবাঁধা, নিয়মমাফিক উদ্বোধনী ভাষণের ক্ষেত্রবিশেষে নেতারাও তো বহুকাল যাবৎ এই কথা বলে আসছেন ! তফাৎটা ঠিক কোথায় ? আসলে তফাৎ ব্যক্তিত্বের। তিনি অসার বামপন্থী চিন্তাধারা আর দক্ষিণপন্থী জীবনধারার ভন্ডামিতে আদৌ বিশ্বাস করেননি। এ প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একজন প্রতিভাশালী কলামনিস্টের উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম : ...." As an Individual, he donated all of his earnings to Providing Urban amenities to Rural Areas, a scheme that is designed to contain migration to urban areas. He donated his salary as President to charity. In a country where parliamentarians shamelessly enjoy all kinds of concessions, including that of Lok Sabha canteens, here was a man who almost had a disdain for wealth." সাময়িক লাভালাভের প্রশ্নে তিনি কখনও প্রভাবিত হননি। নীতিগতভাবে যেটা সঠিক মনে করেছেন, সেটা অবলম্বন করেই অগ্রসর হয়েছেন। দেশের সর্বোচ্য সম্মানের মুকুট মাথায় নিয়েও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শে বিশ্বাসী অকৃতদার কালাম বহুকাল কাটিয়েছেন বারো ফুট বাই দশ ফুট একখানি ঘরে। সঙ্গী কিছু বই-কাগজ। দুখানি ইডলি আর ঘোলের সরবৎ সহযোগে সেরেছেন প্রাতরাশ।প্রকৃত অর্থে তিনি ধনী মানুষ নন। আসলে তাঁর ধন-দৌলতের ভান্ডার রয়েছে মনে প্রানে কর্মে আত্মায়।
অবচেতনে তিনি একজন কবিও বটে। তামিল ভাষায় লেখা তাঁর কবিতা এবং সায়েন্স ফিকসান তামিল ভাষীদের কাছে অজানা নয়। কবিতা আসলে মানুষের মন ও তার পারিপার্শ্বিকের ছন্ধবদ্ধতার যোগসূত্র ঘটায়। তাইতো সবার অলক্ষ্যে বারবারই সংবেদিত মনের শুদ্ধ অশ্রুবিন্দুর মতো কালাম সাহেবের হৃদয়ের নির্ঝর থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে কবিতা। ঊনিশশো ঊননব্বই সালের মে মাসে সম্পূর্ণ দেশী প্রযুক্তির ফসল অগ্নি উৎক্ষেপনের সাফল্যে আবেগঘন মুহূর্তে ডায়রিতে লিখে ফেললেন :
Do not look at Agni/ as an entity directed upward/ to deter the ominous/ or exhibit your might;/ It is fire/ in the heart of an Indian./ Do not even give it/ the form of a missile/ As it clings to the/ burning pride of this nation/ and thus is bright.
অনিশ্চয়তা আর আর্থিক উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে তাঁর শৈশব। যুদ্ধের সময় রামেশ্বরমে ট্রেন থামতো না। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা খবরের কাগজের বান্ডিল কুড়িয়ে হকারদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আট বছর বয়সের কালাম তার প্রথম পারিশ্রমিক উপার্জন করে।
একবেলা আধপেটা জেলে পরিবারের সন্তানের মাদ্রাজ এম আই টি তে ভর্তির হাজার টাকার ফি জুগিয়েছেন তারই সহোদর ভগিনী, সামান্য গয়না বিক্রী করে। রামেশ্বরমের পাঠশালা ঘুরে, রমানাথপুরের সোয়ার্জ স্কুল, ত্রিচির সেন্ট জোসেফ কলেজ, মাদ্রাজের এম আই টি- সঙ্কীর্ণ গন্ডী থেকে আস্তে আস্তে উঠে এসেছেন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর জীবনে, প্রানচঞ্চল কর্মব্যস্ত মানুষটি। ঈশ্বরপ্রেমী কালাম পিছনের দিকে তাকিয়ে তাঁর শৈশবের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে প্রান্তিক এবং পরিত্যক্ত জনের উদ্দেশ্যে লিখেছেন :
..........some poor child living in an obscure place, in an unprivileged social setting may find a little solace in the way my destiny has been shaped. It could perhaps liberate themselves from the bondage of their illusory backwardness and helplessness. Irrespective of where they are right now, they should be aware that God is with them and when He is with them, who can be against them ? "
এরই সারমর্ম করেছেন কাব্যে :
God has not promised/ skies always blue/ Flower-strewn pathways/ All our life through;/ God has not ptomised/ sun without rain,/ joy without sorrow,/ peace without pain./ But God has promised strength for the day,/ Rest for the labour/ Light for the way./
এস এল ভি নির্মানের সময় উর্দ্ধতন সহকর্মী প্রায়ই তাড়া লাগাতেন। অধৈর্য উর্দ্ধতনের কাছ থেকে মাঝেমাঝেই শুনতে হ'ত " কালাম তুমি যা চাও তাই পাবে, শুধুমাত্র সময় চেয়ো না "। হাসতে হাসতে কালাম ঊদ্ধৃতি দিয়েছেন ইলিয়ট থেকে - Between the conception/ And the creation/ Between the emotion/ And the response/ falls the shadow./
ক্ষেত্রবিশেষে এমন উদ্ধৃতি তিনি অনেকবারই করেছেন, কখনো নিজের সৃষ্টি থেকে, কখনো বা বিখ্যাত কবির সৃষ্টি থেকে ধার করে। পাঠক মনে করবেন না যেন আমি মোহগ্রস্থ হয়ে শ্রেষ্ঠ রকেট এঞ্জিনিয়ার কালামের উপর শ্রেষ্ঠ কবির শিরোপা আরোপ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমার কাছে অজানা এবং প্রকৃত অর্থে অদেখা। তাঁকে নিয়ে লেখা বই-কাগজ পড়ে এবং পেশার সূত্রে তাঁর কাছে আসা দু-একজন গুনীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তাঁর কবিসত্বার কথা জানতে পেরেছি। আমার ধারনা, কবিত্ব ব্যাপারটা তাঁর শুদ্ধ মনের আবেগ প্রকাশের একটা ভঙ্গিমা।
প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্যবোধও ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছিল পরিবেশ সচেতনতা। রকেট উৎক্ষেপনের পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য উড়িষ্যার বালেশ্বরের কাছে যে জায়গা সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল, সেখানে একটা বার্ড স্যাংচুয়ারি ছিল। সেটিকে বাঁচিয়েই তিনি লঞ্চিং প্যাড নির্মানের পরামর্শ দেন। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে পড়ছে। অগ্নি উৎক্ষেপনের আগের রাত্রে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, কে সি পন্থ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, " অগ্নি উৎক্ষেপনের সাফল্য আমরা কী ভাবে উদযাপন করব ? " অকপট, আদর্শবাদী কালামের সহজ সরল উত্তর ছিল, " সহস্রাধিক বৃক্ষ রোপনের মধ্যে দিয়েই আমরা আনন্দোৎসব পালন করতে পারি। " আবদুল কালাম আসলে দেশ, সমাজ, পরিবেশ- সব ব্যাপারেই আজীবন সজাগ ছিলেন।
প্রকৃতির ভারসাম্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের যে বিশাল ভূমিকা আছে, সে ব্যাপারে উনি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। দু-একটা ঘটনার উল্লেখ করছি। রাষ্ট্রপতি ভবনের ছ-বছর মেয়াদের মধ্যে সংযোজন হয়েছে একটি ভেষজ উদ্যান এবং একটি বায়োদাইভার্সিটি পার্ক। মোগল গার্ডেনের ফুল তাঁর কাছে যতটা প্রিয়, ততটাই প্রিয় পশু-পাখি। রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি হরিণ শাবকের পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। কালাম সাহেব নিজে টানা ন-মাস শাবকটিকে নিয়মিত ফিডিং বোতলে দুধ খাওয়াতেন। ভবন সীমানার মধ্যেই একটি পশু চিকিৎসার হাসপাতাল আছে। সেখানকার ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে পোষ্যদের খবর সংগ্রহ করতেন। পশু-পাখিদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে উনি এতটাই দায়বদ্ধ ছিলেন যে, মোগল গার্ডেনে একটি ময়ূরকে খোঁড়াতে দেখে খবর নিয়ে জানেন যে পাখিটির পায়ে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এবং সেজন্য একটি বিশেষ ট্রেতে পাখিটিকে শোয়াতে হবে। হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকায়, তাঁরই নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে সেটি বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা হয়। দিল্লীর চিড়িয়াখানা সূত্রে খবর পান যে সার্কাশ দলের একটি জলহস্তী চোখে ঝাপসা দেখছে। তৎপর আবদুল কালাম পশুটির ছানি কাটানোর ব্যবস্থা করেন। এই রকমই রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি ঘোড়ার ছানি কাটানো হয় তাঁরই আমলে। এই না হলে আবদুল কালাম !!
পদমর্যাদা নির্বিশেষে যে কোনো মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা আন্তরিক ছিল, সেটা কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। মৃত্যুর দিন, অর্থাৎ 27 জুলাই, 2015, কালাম সাহেবের শেষ ছ-বছরের ছায়াসঙ্গী এবং তিনটি বইয়ের সহলেখক সৃজনপালের কথাগুলো তুলে ধরছি। " গুয়াহাটি বিমান বন্দর থেকে সড়ক পথে আই আই এম শিলং যাওয়ার পথে কালামের চোখ পড়ছিল তাঁর গাড়ির সামনে 'এসকর্ট' জিপসিতে মেসিনগান নিয়ে দাঁড়ানো এক জওয়ানের দিকে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওয়্যারলেসে খবর পাঠিয়ে ওঁকে বসতে বলতে। নিয়মের ফাঁদে তা করা যায়নি। শিলং পৌঁছেই ওই নিরাপত্তারক্ষীকে তিনি ডেকে পাঠাতে বলেন। লম্বা, সুঠাম চেহারার কনস্টেবল্, এস এ লাপাং স্যরের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাবড়ে গেছিলেন। ওঁকে অবাক করে হাত সামনে এগিয়ে দিলেন স্যর। করমর্দনের পর বললেন- আমার জন্য আপনাকে এতটা পথ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে। আমার সঙ্গে বসে চা খেয়ে যান। অবাক হয়ে যান জওয়ান। কিন্তু ভ্যাবাচাকা ভাবটা কাটিয়ে লাপাং উত্তর দেন ' স্যর আপনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি '।"
আবদুল কালামের ছাত্র এবং এক সহকর্মী দেবাশিস পালের অভিজ্ঞতার কথায় আসি : " অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায়, এস এল ভি উৎক্ষেপনের কাজে সবাই ব্যস্ত। লঞ্চিংয়ের দিন এগিয়ে আসছে, একদিন ডক্টর কালাম আমাকে বললেন, ' পল, টুমরো ইউ হ্যাভ টু গো টু কার নিকোবর টু কন্ডাক্ট স্যাটেলাইট কমপ্যাটিবিলিটি টেস্ট। ' মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, ' রকেট লঞ্চিং ডেট ইজ নিয়ারিং, স্যর ! ' ওই সময়টাতে যদি থাকতে না পারলাম, তবে তার থ্রিলটা উপভোগ করব কী করে ! উনি শুধু বললেন, ' পল, আই শ্যাল সি দ্যাট ইউ আর ব্যাক বিফোর দ্য রকেট ইজ লঞ্চড্।' পর দিন বেরিয়ে পড়লাম কার নিকোবরের পথে। সব কাজ করলাম। যে দিন ফিরব, দেখি, আমাকে নিতে আসা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের প্লেনটায় আমিই একমাত্র যাত্রী। পাইলট বললেন, ' মিস্টার পল, ক্যান ইউ সি, ইউ আর দি ওনলি প্যাসেঞ্জার, আ ভিআইপি। ' বুঝলাম সবই হয়েছে ডক্টর কালামের নির্দেশে। অত ব্যস্ত একজন মানুষ, কনিষ্ঠ এক ইঞ্জিনিয়ারের আবদার রেখে উৎক্ষেপনের ঠিক একদিন আগে আমাকে শ্রীহরিকোটায় ফিরিয়েএনেছিলেন। দেখা হতে বললেন, ' সো ইউ আর ব্যাক ইন টাইম, এনজয় দ্য থ্রিল নাউ '।"
মূল্য বোধের মাত্রা যে কোন্ উচ্চতায় পৌঁছতে পারে, এই ঘটনা তার সাক্ষী। একত্রিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন, এক সময়ের সহকর্মী ডঃ সুবীর চৌধুরী, কালাম সাহেবের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর বস-এর স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন : " সালটা 2003। ভরদুপুরবেলা। ডঃ কালাম সদ্য রাষ্ট্রপতির আসন অলংকৃত করেছেন। হায়দরাবাদে এক মারাত্মক গাড়ি য়্যাক্সিডেন্টে আমি শয্যাশায়ী। হঠাৎ আমার কোয়ার্টারের বেল বাজলো। দরজা খুলে আমার স্ত্রী দেখে যে, সমস্ত কোয়ার্টারটা ঘিরে নিয়েছে ব্ল্যাক কমান্ডো। আর ওই দশাশই চেহারার মানুষগুলোর ফাঁক দিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন ছোটখাট চেহারার একটি মানুষ। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান, এ পি জে আবদুল কালাম। এর পর কমান্ডোদের বললেন, ' পার্সোনাল ব্যাপারে আলোচনা হবে, তোমরা বাইরে থাক '। বলাই বাহুল্য যে উনি আমার ভয়ংঙ্কর য়্যাক্সিডেন্টের কথা জেনে এতটাই বিচলিত বোধ করেছেন যে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন আমাকে দেখতে। " ভাবা যায় !!
দেশের নিরাপত্তার ব্যাপারে একই মানুষের অবস্থান একেবারে বিপরীত মেরুতে। তখনও উনি রাষ্ট্রপতি হননি। সংসদে নিউক্লিয়ার বিতর্কের সপ্তাহখানেক আগে ভূতপূর্ব সাংসদ শ্রীমতী কৃষ্ঞা বসু , কোন্ পক্ষ নেওয়া উচিৎ বা কি বলা উচিৎ প্রশ্ন করে কালাম সাহেবের পরামর্শ চান। ওঁনার খুব সহজ উত্তর ছিল " আপনার যা মত তাই বলবেন, শুধু মাথায় রাখবেন, যে শক্তিশালী সকলে তাকে সমীহ করে, দুর্বলকে কেউ পাত্তা দেয় না"। এরও কয়েক বছর আগে রাজস্থানের পোখরাণে, দ্বিতীয়বার পরমাণু পরীক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এক রিপোর্টারের প্রশ্নে শান্তিকামী কালাম যে জবাব দিয়েছিলেন, সেটা অবিকৃত তুলে ধরছি : " Abdul Kalam, a peace loving man, when led the team involved in India's second phase of nuclear explosion in 1998, was asked why he involved himself in the weapons of war. He answered coolly, ' I had no qualms in building such arsenal, I actually ensure peace of my country '."
প্রত্যেক মানুষের কথা বলার একটা ভঙ্গী আছে, কিছু মুদ্রাদোষ আছে, সময় যেটা কেড়ে নিতে পারে না। কালাম সাহেবেরও এমন একটি অভ্যাস ছিল। আবেগ অথবা মৃদু উত্তেজনার মুহূর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় উনি " funny guy ", এই ছোট্ট বাক্য বন্ধটি প্রায়ই ব্যবহার করতেন।
ভারতবর্ষের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কর্ণধারদের অনেকের ভাষণে, ভাষার অলঙ্কারে সজ্জিত বহু প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ পাওয়া যায়। বাস্তবে সেটা কতটা রূপায়িত হয়, তার হিসেব করা খুবই কঠিন। কালাম সাহেবের বহিরঙ্গে বা ব্যবহারে চকচকে পালিশ ছিল না। তবে বাস্তব জগতের কথা মাথায় রেখে তিনি তাঁর জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছিলেন কিছু অনুশাসনকে কেন্দ্র করে এবং স্বল্পায়তনে সেগুলো প্রকাশ করতেন ছাত্র এবং ছাত্রসম সহকর্মীদের কাছে। এর মধ্যে কিছু কিছু উক্তিতে দার্শনিক কালামকেও খুঁজে পাওয়া যায়। এমনই এক ডজন উক্তির দৃষ্টান্ত পাঠকের কেছে তুলে ধরছি।
• প্রথমবারের সাফল্যের পরও থেমে থেকো না কারণ, দ্বিতীয়বার তুমি ব্যর্থ হতেই পার। তখন কিন্তু সবাই অপেক্ষায় থাকবে। বলবে, প্রথমবারের বিজয় ছিল স্রেফ ভাগ্য।
• বৃষ্টির সময় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে প্রতিটি পাখি। কিন্তু ঈগল বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পাড়ি দেয় মেঘের উপরে।
• সাফল্যের সংজ্ঞা আমার কাছে যত বেশি দৃঢ় হবে, ব্যর্থতাকে ততই আমি পেছনে ফেলে যাব।
• সাফল্যের আনন্দ পেতেই মানুষের জীবনে কঠিন সময়ের প্রয়োজন।
• যদি তুমি সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে চাও, তাহলে নিজেকে আগে সূর্যের মতো দগ্ধ কর।
• কাউকে পরাজিত করা অত্যন্ত সহজ, কিন্তু কঠিন হল কাউকে জিতে নেওয়া।
• আমাদের সবার সমান প্রতিভা না থাকতে পারে। তবে প্রতিভার বিকাশ করার সমান সুযোগ আমাদের সকলের আছে।
• কাজকে ভালবাসো, সংস্থাকে নয়। কারণ, তুমি জানো না, তোমার সংস্থা কবে তোমার প্রতি ভালবাসা বন্ধ করে দেবে।
• কৃত্রিম আনন্দের পিছনে দৌড়ানোর চেয়ে প্রকৃত সাফল্য পাওয়ার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা ভাল।
• চিন্তাশক্তি সেরা সম্পদ। জীবনের সেই সব উত্থান-পতনকে পাত্তা দিও না, যা তুমি পেরিয়ে এসেছ।
• লেগে থাকা ছাড়া তোমার সাফল্য আসবে না। আর লেগে থাকলে ব্যর্থতা তোমাকে স্পর্শ করবে না।
• ঘুমিয়ে যেটা দেখ, সেটা স্বপ্ন নয়। যেটা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না সেটাই স্বপ্ন।
মৃত্যুর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ভিতরের মানুষটা আমজনতাকে যে কতখানি ছুঁয়ে গেছিল , সেটা প্রত্যক্ষ করলাম টেলিভিসনের পর্দায় যখন তাঁর মৃতদেহ দিল্লীতে এসে পৌঁছোলো। শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় অনেক রঙই মিশে গেছিল সেই আবেগভরা জমায়েতে। মনে রাখতে হবে যে পর পর দু-বছর এম টিভির সমীক্ষায় ইউথ আইকন নির্বাচিত হয়েছিলেন এই প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক। দিল্লীতে সেদিনের আবালবৃদ্ধবণিতার আবেগ উন্মাদনার জোয়ারে সেই ইতিহাস যেন প্রাসঙ্গিকতা পেল। প্রবীন রাজনীতিকরা বলেছেন যে মানুষের এই ঢল, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি, বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিনও মৃত্যুর পর জীবন নিয়ে এমন উদযাপন হয়েছিল।
বিখ্যাত ছাত্র, বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বিখ্যাত শিল্পপতি কোনো কিছুরই দাবিদার নন আবুল পাকির জয়নালাবদীন আবদুল কালাম। বাপ-ঠাকুর্দার নামকে জড়িয়ে এত বড়ই তাঁর নাম। নামের বিশালত্বের সঙ্গে তাঁর কর্মযজ্ঞের বিশালত্বের বিশাল মিল। আসলে তাঁর খ্যাতি প্রতিকী। কিশের প্রতীক ? তপোশ্চর্যার প্রতীক নৈতিকতার প্রতীক মূল্যবোধের প্রতীক দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করার প্রতীক কর্মকুশলতার প্রতীক স্বায়ত্ব প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রতীক ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতীক সততার প্রতীক এবং অবশ্যই সফল নেতৃত্বের প্রতীক।
শেষ করার আগে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। ঊনিশশো আটানব্বই সালের মে মাস। কেন্দ্রে বি জে পি সরকারের নেতৃত্বে অটল বিহারী বাজপেয়ী। ওই মাসের বারো তারিখে রাজস্থানে, পোখরানের মরুভূমিতে একের পর এক পাঁচটি পরমাণু বোমা বিষ্ফোরণের পরীক্ষা চালানো হয়। বিস্ফোরণস্থলে ভাবা পরমাণু কেন্দ্রের পরমাণু বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠীর সঙ্গে কালাম সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। এর পর থেকেই ওনার নামের সঙ্গে পরমাণু বিজ্ঞানীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে উনিও কখনও মুখ খোলেননি। পেশাগত জীবনে পরমাণু সংক্রান্ত বিষয় ওনার গবেষণার অঙ্গ ছিল বলে আমার জানা নেই। এটুকুই জানি যে বাজপেয়ী সরকারের অনুরোধে, পোখরান কর্মকান্ডে পরমাণু বিজ্ঞানী ও এঞ্জিনিয়ারের ওই বিশেষজ্ঞ দলটিকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থে আবদুল কালাম একজন সফল টেকনোক্র্যাট এবং ভারতবাসীর গর্ব।
তথ্যসূত্র ;
Wings of fire- An autobiography, APJ Abdul Kalam with Arun Tiwari
Weapons of peace- Raj Chengappa
গত পনেরো বছরে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠিত বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনের নির্বাচিত অংশ
No comments:
Post a Comment