Wednesday, August 4, 2021

সারপ্রাইজ

                     


ঘড়ির কাঁটা বেলা ন’টার দিকে গড়িয়ে চলেছে। রান্নাঘর থেকে দালানের দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িতে চোখ পড়তেই কাঞ্চনের খেয়াল হ'ল যে শোবার ঘরে তার ঠাকুর সিংহাসনে রোদ এসে পড়েছে। ফ্ল্যাট বাড়ি। আলাদা ঠাকুর ঘর বলে কিছু নেই। পুবের শোবার ঘরে একটা নিরাপদ জায়গা বেছে নিয়ে কাঞ্চন সেখানেই তার ঠাকুর সিংহাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। সকাল-সন্ধ্যে জল-বাতাসা দিয়ে সে নমস্কার সারে। সকালে স্নান সেরে ঠাকুর নমস্কার করে হেঁসেলে ঢোকার আগে সে রোজই জানলাটা বন্ধ করে আসে। আজ অজয়ের একটু আগে আগেই অফিস বেরোনোর তাড়া ছিল। সময়মতো রান্না শেষ করার তাড়ায় জানলা বন্ধ করার কথা বেমালুম ভুলে গেছে।

গ্যাস নিভিয়ে ঘরে এসে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে কাঞ্চন একটু থতমত খেয়ে গেল। তুষারদা ওদের বিল্ডিং-এর গেটের লাগোয়া রাস্তা দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলেছে। এতটাই অবাক হ'ল কাঞ্চন যে ‘তুষারদা’ বলে ডাকার আগেই তার তুষারদা রাস্তার বাঁকের আড়ালে চলে গেছে। কাঞ্চন মনে মনে ভাবে – ‘আজ তো ছুটির দিন নয়। তার মানে তুষারদা অফিস ছুটি নিয়েছে। মনে সংশয় হ'ল, তাহলে কি আমাদের বাড়িতেই এসেছিলেন উনি? সপ্তাহখানেক ধরে কলিং বেলটা খারাপ হয়েছে। সুখেন ইলেকট্রিসিয়ানকে খবর দিয়েছি। তা-ও দিন তিনেক কেটে গেল। সুখেনের পাত্তাই নেই। পুরোনো লোক হলে হবে কি, আজকাল আর খুচরো কাজ কেউ করতে চায় না। আসলে পড়তায় পোষায় না। তাহলে কি কলিং বেলের সুইচ কয়েকবার টিপে সাড়া না পেয়ে চলে গেল তুষারদা!’ বাইরে ঘরের চেয়ারে বসে খবরের কাগজে চোখ বুলোচ্ছিলেন অভয়বাবু, কাঞ্চনের শ্বশুরমশাই। কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল-'বাবা কেউ কি দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল?’

শ্বশুরমশাইয়ের সবিনয় উত্তর-'কই, না তো মা, তবে মনে হ'ল কে যেন পাশের ফ্ল্যাটের বেল বেশ ক’বার বাজিয়ে দুমদুম করে সিঁড়ি দিয়ে নেবে গেল।‘ পাশের ফ্ল্যাটের মণিকা ছেলেকে স্কুলে দিতে গেছে। ওর তো এখন থাকার কথাও নয়! 

ক'দিন আগেই সন্ধ্যেবেলা বেড়িয়ে ফিরে বাবা বলেছিলেন-'বৌমা, তোমার জামাইবাবুকে দেখলাম মোড়ের রিক্সাস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে। ও এখানে এসেছিল নিশ্চয়ই। তা চা-জলখাবার দিয়েছিলে তো?’

- ‘কই তুষারদা তো আসেনি বাবা!’ 

-'ওঃ, তাহলে আশেপাশে কোন কাজে এসেছিল হয়তো, তাড়া ছিল, তাই বোধহয় আসতে পারেনি।

মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগল কাঞ্চনের। এতটা ভাবতো না সে, যদি না সেদিন ভোর হতে না হতেই ও তুষারদাকে ওদের বিল্ডিং-এর গেট খুলে বেরিয়ে যেতে দেখতো। শুধু কি তাই। পাশের ফ্ল্যাটের ওই ডাইনিটাও তখন বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। ওর কর্তা এবার ছুটি কাটিয়ে যাবার পর থেকেই কাঞ্চন, মণিকার মধ্যে কেমন যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে একলা ছেলে নিয়ে থাকে। কর্তার বদলির চাকরি। আড়াই-তিন মাস অন্তর সপ্তাহখানেকের জন্য আসে। আবার চলে যায়। দিনে অন্তত একবার মণি-কাঞ্চন যোগ হতো। আজকাল মণিকা ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে প্রায় দিনই বেরোয়। কেমন যেন আড়ষ্ট ভাব। মুখ চোখের চেহারায় কাঞ্চন আগের মণিকাকে খুঁজে পায় না। সেদিন টুম্পাকে স্কুলে পৌঁছে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে কাঞ্চন দেখল যে মণিকার দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটি ছেলের সঙ্গে ও কথা বলছে। চোখের ইঙ্গিতে কাঞ্চন জিজ্ঞেস করেছিল – ‘কে রে ?’ 

- ‘আমার পিসতুতো ভাই, চটজলদি উত্তর মণিকার। দ্যাখ না, কাল রাতে এসেছিল। থেকে যেতে বললাম। বাড়িতে ফোন করে দিতে বললাম যাতে চিন্তা না করে। থেকে গেল। অনেক রাত্তির পর্যন্ত গল্প করেছি। উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল। দ্যাখ না, চা না খেয়ে চলে যাচ্ছে।‘

ছেলেটি আর বিলম্ব না করে, চলি, বলে নেবে গেল। আরও একদিনের কথা মনে পড়ল কাঞ্চনের। অজয় অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে বলেছিল-'জানো বাস স্টপে মণিকার সঙ্গে দেখা হ'ল। ওর মামাতো দাদা এসেছিলেন, নতুন জায়গা। আলাপ করিয়ে দিল। বলল, ওঁকে বাসে তুলে দিয়ে বাবলুকে আঁকার স্কুল থেকে নিয়ে ফিরবে। -'তিন-চার বছর পাশাপাশি থাকি, মিঃ দাসের তো তিনকুলে কেউ আছে বলে শুনিনি। এ বাড়িতে অ্যাদ্দিনে কাউকে আসতে দেখেছি বলেও তো মনে হয় না। মণিকার বিধবা মা, দাদার কাছে দুর্গাপুরে থাকেন। নাতির গরমের ছুটিতে বছরে একবার মেয়ের বাড়িতে আসেন। এই ক’বছর তো এই রুটিনই দেখেছি। রাতারাতি পিসতুতো-মামাতো ভাই-দাদারা গজিয়ে উঠল কোত্থেকে, তা তো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। একান্নবর্তী পরিবারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তুতো সম্পর্কগুলো তো এমনিতেই উঠে গেছে। মণিকার মতিগতি মোটেই ভাল বুঝছি না। ছিঃ ছিঃ এটা কি করছে মণিকা।‘

কিন্ত কী করে এটা সম্ভব, কাঞ্চন ভেবে পায় না। গত বছর সুপ্রকাশবাবুর টাইফয়েডের সময় ওর পতিপ্রাণা চেহারাটা তো কাঞ্চনের অজানা নয়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কী সেবাটাই না করেছিল বরের। আবার মণিকার অতীতটাও তো খুব মসৃণ নয়। মণিকা-ই বলেছিল। মণিকা মুখার্জি কুমারী জীবনে বেশ কয়েকবারই দুর্বলতার  প্রশ্রয় দিয়েছিল। শেষ বারে মা-দাদার আপত্তি সত্ত্বেও সুপ্রকাশ দাসকে ও নিজেই পছন্দ করেছে। কুমারী মুখার্জি তো অনেকদিনই হ'ল মারা গেছে। না-কি মণিকা দাসের মধ্যে আবার সে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘এরা সব পারে। কিন্ত তা বলে আমার তুষারদাকে নিয়ে পড়লি কেন বাবা- কাঞ্চনের খেদোক্তি। মণিকার সঙ্গে তুষারদার ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও বেশ ভালই পরিচয় আছে, আমার বাড়িতে যাতায়াতের সূত্রেই তা হয়েছে। দুজনেই কথায় বেশ ওস্তাদ। আর তাছাড়া তুষারদা যা লোক, তাতে যে কোনও মানুষের সঙ্গে অপরিচয়ের বাধা খুব সহজেই ডিঙিয়ে যেতে পারে। কিন্ত তা বলে এতখানি।‘

মণিকা যথার্থ সুন্দরী না হলেও বয়সের ধার এখনও ভোঁতা হয়ে যায়নি। এমনিতেই চেহারাতে একটা ঢলানি ভাব তো আছেই।  

কাঞ্চন নিজের মনেই বলে চলে-'ওর বাড়ি অচেনা লোক যাতায়াতের কথা দিদিকে আমি বলেছিলাম। দিদি হয়তো তুষারদাকে বলেছে। জীবনে চলার পথে কত যে চোরা পথের বাঁক আসে তা তো আগে থেকে জানা থাকে না। নিজের অজান্তেই মানুষ কত কিছুই না করে ফেলে। আর সুযোগ সন্ধানী পুরুষরা তো সুযোগের সন্ধানেই থাকে। তুষারদা সম্পর্কে এ কথা যেন ভাবতেও পারছি না। অনেক ব্যাপার মনে নিতে পারি না, কিন্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেনে নিতে হয়।‘

জানিনা বাবা, কি সম্ভব,  আর কিই বা অসম্ভব। রেডিওর এফ এম চ্যানেলে চব্বিশ ঘন্টা কত বিষয়েই আলোচনা হচ্ছে। এই তো সেদিনই বৈকালিক বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল -"মাঝবয়স"। বক্তা ও শ্রোতাদের কথোপকথনে আজকের সমাজের চালচিত্রটা আন্দাজ করতে পারলাম। ব্যাপারটা তখন পাত্তাই দিই নি। অথচ আমার বর্তমান মানসিক অবস্থার সঙ্গে সেই চালচিত্রের অনেক সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছি মনে হচ্ছে। মাঝবয়সে, বিশেষ করে পুরুষদের মাঝবয়সে যৌবনের দুষ্টুমিগুলো নাকি আরেকবার মাথা চওড়া দেয়। কথায় কথায় সেদিনই দিদি বলছিল, “তোর তুষারদার সবই উল্টো। মানুষের দেখনাই সুন্দর থাকে অল্প বয়সে। ও আবার বয়সে সুন্দর।“

-"আর ভাবতে পারছি না। আর অপেক্ষা করাও চলে না। আজ-কালের মধ্যেই দিদিকে জানাতে হবে। দিদি কি ভাববে জানি না। কিন্ত আমারই বা উপায় কি! এমন জ্বালা হয়েছে যে টেলিফোনেও কথা বলতে পারছি না। কাল থেকে এই এলাকার টেলিফোনের তার পাল্টানোর কাজ শুরু হয়েছে। অন্তত দু’সপ্তাহ লাগবে টেলিফোন ঠিক হতে।‘

-‘দেখে শুনে গ্যাসটাও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। হঠাৎই শেষ হয়ে গেল। কালকে হলেই তো পারতিস বাবা, অর্ডারটা টেলিফোনে দিতে পারতাম। তাই বা জোর করে বলি কি করে। টেলিফোনে অর্ডার দেবার তো আবার নানান্ ফ্যাকড়া - দু'টো থেকে চারটের মধ্যে ফোন করতে হবে। অনেক সময়ই বেজে যায়, কেউ ফোন তোলেও না। যাকগে, সময়মতো গেলেই হবে। যেটা লাগালাম সেটা তো অন্তত মাসখানেক চলবে।‘

-‘এই দেখ, যে কাজে এসে এত বিপত্তি, আগড়ম বাগড়ম ভাবতে ভাবতে সেটাই করা হ'ল না। ঠাকুর আমার রোদে পুড়ে খাক হয়ে গেল।‘

জানলার ছিটকিনি তুলে কাঞ্চন আবার রান্নায় মন দিল। কিন্ত মন সে পুরোপুরি দিতে পারছে কোথায়। খুন্তি নেড়ে চলেছে; কিন্ত গ্যাস জ্বালাবার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। একটা প্রচন্ড মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছে ও। যেটা ভেবে এত উদ্বেগ, কার সঙ্গেই বা আলোচনা করে একটু হাল্কা হবে সে। অজয়ের এমনিতেই সন্দেহ বাতিক। তারপর কি কথা থেকে কি এসে পড়বে। দরকার নেই বাবা। কাঞ্চনের ভয় হয়। যদি অজয় কোনদিন দেখে ফেলে। তুষারদা সম্পর্কে উচু ধারণা থাকলেও মনে মনে হিংসের একটা চোরাস্রোত তো আছেই। কারণ উনি যে যথেষ্ট গুণী মানুষ, ক্ষুদ্র সামাজিক গন্ডীর বাইরেও যে ওঁর একটা মানব দরদী মন আছে তা কারোরই অজানা নয়। নাঃ, দেরি করা আর একেবারেই চলবে না। ঠিক আছে, কাল অজয়ের বোর্ড মিটিং, বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। কালই আমি দিদির কাছে গিয়ে সব বলব। কোনও লুকোছাপা নয়। দিদি যা ভাবে ভাবুক।

অসময়ে কে আবার বেল বাজায় ? হয়তো খবরের কাগজের দাম নিতে এসেছে। কতবার ছেলেটিকে বলেছি যে রোববার তোমার দাদা থাকে, সেদিন এস। কিছুতেই কথা শোনে না। আজ খুব বকুনি দেব।‘ কাঞ্চনের মনটা আজ বিরক্তিতে ভরে উঠেছে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কাঞ্চন সদর দরজা খুলতে যায়।

-কি রে তুই !

-অবাক হবার কি আছে ? মনে হচ্ছে যেন আমাকে চিনিসই না ?

-কত্তা তো এখানে নেই, তা সত্ত্বেও তোর টিকিটিও দেখা যায় না। আর যখন দেখা যায়, তখন তুই তুতোদের নিয়ে ব্যস্ত থাকিস।‘ কাঞ্চনের কথায় বেশ একটা ব্যঙ্গের সুর, কিছুটা খোঁচাও। বেশ ক’সপ্তাই কথাবার্তা না হওয়ায় দুজনের মধ্যেই অভিমান জমেছে। সেটা ভেবেই মণিকা বলে ওঠে, -'অ্যাদ্দিন বাদে গল্প করতে এলাম। ঝগড়া করবি না ঘরে ঢুকতে দিবি?’

- আয় আয় বোস্। দাঁড়া, আমি গ্যাস থেকে কড়াটা নামিয়ে আসছি।‘

গ্যাস বন্ধ করে কাঞ্চন মণিকার কাছে এসে বসে। ওর মনে হয় মণিকা আজ কেমন যেন অন্যমনস্ক। কি ভাবে গল্প শুরু করবে, দুজনেই ভাবছে। যাদের উঠতে বসতে দেখা হ'ত, দু’সপ্তাহের অসাক্ষাৎ, তাদের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছে। গুমোটের হাওয়া কাটিয়ে মণিকা-ই শুরু করল। - ‘হ্যাঁরে, তোর দিদি-জামাইবাবু মানে তুষার দা, অনেক দিন আসেনি, তাই না?’ মনে মনে প্রচন্ড রাগ হয়ে গেল কাঞ্চনের। মনে হ'ল কথার মধ্যে যেন একটা সাফাই-এর সুর আছে। কোথায় নিজেদের ভালোমন্দ দু’চার কথা বলবে। ঢং করে তুষারদার খবর নিচ্ছে ও। ন্যাকা, যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। ওর মুখের ওপর কাঞ্চন যেন একটা অপরাধ বোধের ছাপ লক্ষ করলো। কাঞ্চনের আর বুঝতে বাকি রইল না যে তুষার দা ওর ফাঁদে পড়েছে। মাথায় রক্ত চড়ে গেল কাঞ্চনের। বলতে যাচ্ছিল, -ন্যাকামি আর করিস্ না।‘ – না, পরক্ষণেই ভেবে দেখল যে, সাময়িক ভাল না লাগলে মার্জিত অবহেলার সঙ্গেই সহ্য করতে হয়। কাঞ্চনের মনোভাব বুঝতে মণিকার অসুবিধে হয়নি। মনটা এমনিতেই খারাপ। প্রচন্ড অভিমান হ'ল। কাল বিলম্ব না করে, গ্যাসে ভাত বসানো আছে, এই অজুহাতে মণিকা চলে গেল। কাঞ্চন মনে মনে বলল-'আপদ বিদেয় হ'ল।‘ ঘরে ফিরে এসে মণিকা ভেবে পায় না, কি এমন হ'ল যে কাঞ্চন এমন মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল। ওর স্বগোতোক্তি-'সময়টাই আমার বেশ কিছুদিন ধরে খারাপ চলেছে। জানিনা মেঘ কবে কাটবে।‘

দিনটা কোনও রকমে কেটে গেল কাঞ্চনের। ও আজ এতটাই চিন্তামগ্ন যে, অজয় খেতে চাওয়ার আগে ওর মনে পড়লো রাতের ভাত করা হয়নি। সময় কেনার আশায় অজয়কে জিজ্ঞেস করল,- একটু চা খেতে ইচ্ছে করছিল, তুমি যদি খাও তবে করব।‘

গিন্নির এইটুকু ছোটখাটো আব্দার স্বামীরা রেখেই থাকে। তাছাড়া, নিয়মছাড়া কিছু ব্যতিক্রম ভালই লাগে মাঝে মাঝে। নিয়মের মানুষ অজয়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,-'সাড়ে আটটা বাজে, ও কে, হাফ কাপ চলতে পারে। কালকে তো আর তোমার সান্ধ্য চায়ে যোগ দিতে পারব না, বোর্ড মিটিং আছে, দেরি হবে বাড়ি ফিরতে। কালকে তোমার সঙ্গে          সন্ধ্যের কোম্পানিটা অ্যাডভান্স পূরণ করে দি। ডিনার না হয় ঘন্টাখানেক বাদেই খাওয়া যাবে।‘

রাতে কাঞ্চনের ঘুম হ'ল না। দিদির সঙ্গে কথা না সারা পর্যন্ত ও ঠিক স্বস্তিতে থাকতে পারছে না। ভোরে তাড়াতাড়ি উঠে ও সংসারের কাজকম্ম সব সেরে ফেলল। অজয় অফিস বেরিয়ে গেল, টুম্পাও স্কুলে চলে গেছে। দুপুরের খাবার পালা মিটিয়ে ভাতঘুম দিয়ে একটু তাড়াতাড়িই আজ উঠে পড়েছে কাঞ্চন। পাঁচটায় মেয়ে স্কুল থেকে ফিরলে ওকে জলখাবার খাইয়ে ছ'টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়বে। চা ও দিদির বাড়িতেই সেরে নেবে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে কাঞ্চন চুল বাঁধছে। ‘দেখি কে আবার কলি বেল বাজায়, এমনিতেই বেরোনোর তাড়া আছে।‘

-‘আরে দিদি! এই অসময়ে! তুই ভাল আছিস।?’

মণিমালা, কাঞ্চনের আদরের দিদি বলল-'তোর কোন কথার উত্তর আগে দেব বলতো ? এত উত্তেজিত কেন? অনেক দিন টেলিফোনে কথা হয়নি। তোর তুষারদা-ও এসেছে। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে উঠছে। ওই তো এসে পড়েছে।‘

-'আমিই তো তোর বাড়ি যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম।‘

-'সত্যি?’

-'সত্যি মানে, দেখছিস না চুল বাঁধছিলাম। টুম্পা স্কুল থেকে ফিরলেই বেরিয়ে পড়তাম। যাক, ভালই হয়েছে, তোর সঙ্গে অনেক জরুরি কথা আছে।‘

-‘আমাদেরও অনেক কথা আছে। তোমার দিদির কাছেই শুনো শালীবাবু। আগে চা খাওয়াও, পরে কথা, কাঞ্চনের তুষারদা বলে উঠল।‘

কাঞ্চন তুষারদার কথায় বিশেষ পাত্তা দিলাম না। এমনিতেই মন ববিরক্তিতে ভরে আছে। তার ওপর আদিখ্যেতা করছে। যাইহোক, খবরের কাগজ আর দু'একটা ম্যাগাজিন বাইরে ঘরে দায়সারা ভাবে রেখে, কাঞ্চন তার দিদিকে নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল।

-'উঃ এই কলিং বেলটাও হয়েছে। আবার কে বেল বাজালো!’ ঘড়ির দিকে তাকাতে মনে হ'ল বোধহয় টুম্পা স্কুল থেকে ফিরল। আজ স্কুল বাসটা একটু আগেই চলে এসেছে। তার মানে আজ গড়িয়াহাটে হকার আন্দোলন হয়নি।‘

দিদি বলল-'তুই বোস না, ও তো বাইরে ঘরেই আছে। এই শুনছো দরজাটা খুলে দাও তো, টুম্পা এসেছে।‘

-'আরে মণিকা যে! কি খবর?’

-'ভাল আছেন তুষারদা,  অনেকদিন বাদে আপনার সঙ্গে দেখা হ'ল। দিদি ভাল আছে তো?’

-'আরে এস এস ম্যাডাম। দুই বোনে আমাকে কাগজ ধরিয়ে একা ফেলে ভেতরের ঘরে ঢুকে কেমন গল্প জুড়ে দিয়েছে। তুমি বরং আমার এখানে বস।‘

-'নাঃ, টুম্পা তো নয়, তুষারদা যেন মনে হচ্ছে কার সঙ্গে কথা বলছেরে দিদি; ঘরের ভেতর থেকেই কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল-'তুষারদা কে এল?’

-'দ্যাখো না কে এসেছে, নিজেদের চোখেই দেখে যাও। ‘উঠে এসে মণিকাকে তুষারদার সামনে বসে থাকতে দেখে মনে মনে কাঞ্চন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল।

-'কি রে, তুই কি তুষারদার গন্ধে গন্ধে চলে এলি?’

মণিকা বলে-'এত উত্তেজিত কেন রে, চল ঘরে চল, দিদির সঙ্গে দেখা করি, তারপর সুখবরটা দেব।‘ অনেক দিন বাদে আজ মণিকার চোখে মুখের চেহারায় উচ্ছলতা। ঘরে ঢুকেই বলল-'আরে দিদি, অনেকদিন পরে তোমরা এ বাড়িতে এলে। আজ আমাদের বাড়িতেই তোমাদের চা খাওয়াব।‘

কাঞ্চন অধৈর্য হয়ে উঠে বলে-'ন্যাকামি করিস না মণিকা, কি ধান্ধা বল তো তোর?’

মণিকা বেশ অভিমানের সুরে বলে,-'দ্যাখো না দিদি, কাঞ্চনটা আজকাল আমায় সবসময় কেমন যেন ঠেস দিয়ে কথা বলে। আমার যে কি ভাবে কেটেছে, ভগবানই জানেন। সুখবরটা ওকেই আগে জানাতে এলাম। আর ও কি না আমাকে বলছে ন্যাকামি করিস না। দিদি কাঞ্চনকে কপট শাসন করে থামিয়ে দিয়ে মণিকার কাছে তার সুখবর জানতে চায়।

মণিকা বলে,-'প্রায় একমাস বাদে আজ ওর চিঠি পেলাম। প্রমোশন নিয়ে তিন বছরের জন্য কলকাতায় বদলি হয়ে আসছে। আসলে এবার ফিরে যাবার আগে ছেলের লেখাপড়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে বেশ মন কষাকষি হয়েছিল। ফিরে গিয়ে না চিঠি, না ফোন। কিছুই ভাল লাগত না। কাকেই বা বলব, কাঞ্চনও কেমন যেন হয়ে গেছে আজকাল। ‘

দিদি বলে ওঠে,-‘ও-মা, কাঞ্চনের কাছেই শুনেছি যে সুপ্রকাশ বেশ দায়িত্ববান ছেলে। ছেলে-বৌয়ের ব্যাপারে সব সময়ই চিন্তা করে।‘

-'সে দায়িত্ ও পালন করেছে বৈকি দিদি। চিঠি লিখে ওর পিসতুতো ভাই আর আমার মামাতো দাদাকে পাঠিয়ে আমাদের খবর রেখে গেছে। চিঠি পড়ে ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। ওদের চিঠিতে সুপ্রকাশ আরও জানিয়েছিল যে আমি বা অন্য কেউ যেন সুপ্রকাশের এই পরিকল্পনার কথা জানতে না পারে। কলকাতায় এসে ও ব্যাপারটা খোলসা করবে। ও ভেবেছিল যে একটু রাগের ভাব দেখালে আমি বেশি করে ছেলের দিকে নজর দেব। চিঠিটা পেয়ে আজ শান্তি পেলাম। ও লিখেছে যে এবার থেকে ও নিজেই ছেলেকে দেখবে।‘ কাঞ্চন নির্বাক,  হাঁ করে এক নিঃশ্বাসে বলা মণিকার কথাগুলো শোনে।

 দিদি বলে,-'বিকেলটা আজ কাঞ্চনের সুখবর শোনার বিকেল। আমাদেরও একটা সুখবর নিয়ে কাঞ্চনের কাছেই এসেছি। তোমাদের তুষার দা আর ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতে চাইছে না। বহুদিন ধরে একটা জমির খোঁজ করছিল। সন্তোষপুর বাস স্টপের কাছেই আড়াই কাঠার একটা ছোট্ট কর্ণার প্লট। আজই পাকা কথা হয়ে গেল। জমির মালিক তো তোমাদের পাঁচ’ছ খানা বাড়ির পরেই থাকেন। তোমাদের তুষারদা তো প্রায় একমাস ধরেই এ-পাড়ায় যাতায়াত করছে। দর কষাকষি চলছিল। ও আমাকে প্রায়ই বলে,-'জান তো কাঞ্চনের বাড়ির ওপর দিয়ে পরেশ বাবুর বাড়ি যেতে হয়।‘

দিদি বলে চলে,-'একদিন তো তোমাদের বাড়িতে ঢুকেও পড়েছিল, শালীর হাতে চা খেয়ে যাবে বলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘুম থেকে ওঠেনি ভেবে ঢুকেও বেরিয়ে এসেছে। তাছাড়া অফিস যাবারও তাড়া ছিল।‘

-'কি কান্ড বল দিকিনি দিদি'-মণিকা বলে ওঠে। আমিও তো সেদিন তুষারদাকে আমাদের গেট লাগিয়ে বেরোতে দেখলাম। আমি আবার ভাবলাম, ভোরে ওঠেন, মর্নিং ওয়াক করতে করতে শালীর বাড়ি চলে এসেছে। যা মিশুকে মানুষ।‘

-'কিন্তু যাই বল ভাই, একপক্ষে সেদিন দেখা না হয়ে ভালই হয়েছে। দেখা হলে তো আর সারপ্রাইজ দেওয়া যেত না। কি রে কাঞ্চন তুই তো কোনও কথাই বলছিস না!’

কাঞ্চন মনে মনে এতক্ষণ নিজেকে শাসন করে চলেছে। অস্পষ্ট স্বরে বলে,- ‘হ্যাঁ, সারপ্রাইজই বটে।‘ আদরের ভঙ্গীতে মণিকার চিবুকটা নেড়ে বলে,-'তুই দিদির সঙ্গে গল্প কর। আমি চায়ের জল বসাই। চলে যাস না কিন্তু।‘

চা বসিয়ে কাঞ্চনের মনে হ'ল যে বছরের প্রতিটি দিনই বোধহয় কোনো না কোনো ঘটনার জন্মদিন। আজ যেমন তার নিজের আত্মশুদ্ধির জন্মদিন।  আগড়ম বাগড়ম ভেবেই না মরেছি এই ক'টাদিন !


No comments: