বেশ কিছুদিন হ'ল রমা খুকখুক করে কাশছে। সন্ধ্যের দিকে মাঝে মাঝে জ্বরও আসে। চেহারাটা এমনিতেই শীর্ণ। চোখের কোলে কালি পড়েছে। চেহারার মধ্যে কেমন যেন একটা ফ্যাকাশে ভাব। পাড়ার নবীন ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন। নাম যাইহোক, বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় ডাক্তারবাবু বেশ প্রবীন। চেনা মক্কেলদের অভিভাবকও তিনি- ‘হাওয়া বদলের দরকার বউমার বিশ্রামেরও প্রয়োজন। বেশি দেরি না করাই ভাল।‘
ওকালতিতে শশাঙ্কর তেমন পসার নেই। রাশভারি চেহারা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কোট-প্যান্ট-টাই চড়িয়ে রোজই কোর্টে বেরোয়। বড় মক্কেল তো দূরের কথা, মাঝারি কোনো কিছুই জোটেনি কোনদিন। তবে সৎ মানুষ। খেটেখুটে রোজগারের পথেই বিশ্বাসী। অ্যাফিডেভিট, জমি-বাড়ি রেজিষ্ট্র্রি- এ সব খুচরো কাজ রোজই কিছু না কিছু থাকে, দু'পয়সা রোজগার হয়। মিতব্যয়ী মানুষ, সংযমীও বটে। স্বচ্ছলতা না থাকলেও অভাবের সংসার বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা নয়। মোটামুটি চলে যায়। মাসের শেষে হাজার খানেক টাকা ব্যাঙ্কেও জমা পড়ে। বছরের কোনো বিশেষ সময়ে বড় উকিল বাবুদের বেশ কিছু খুচরো মক্কেলের ঝক্কি সামলে বাড়তি দুটো পয়সা উপার্জন হয়। সেই মাসগুলোতে ব্যাঙ্কের গর্ভেও বেশি কিছু ঢোকে। বাঘা যতীনে দু-কামরা ঘরে থাকেন। পুরোনো ভাড়াটে, তাই ভাড়াও কম। একমাত্র ছেলে, বাপি যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে।
রমার শরীরের ব্যাপারে শশাঙ্ক বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল। বয়সের সঙ্গে দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পারস্পরিক আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কোর্ট থেকে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শশাঙ্ক বললো হ্যাঁগো নবীন ডাক্তার যা বললেন, শুনলে তো ?’
-‘ডাক্তারবাবু যা খুসী বললেই হ'ল ? উনি বললেন আর আমি ড্যাং ড্যাং করে বেড়াতে বেরিয়ে পড়লাম! বলি ছেলের ইস্কুল তো আর ছুটি দেবে না। তাছাড়া হাওয়া বদলের খরচও তো আছে। দুদিন হাওয়া বদলের জন্য পরে আবার মাসের পর মাস হাওয়া খেয়ে থাকতে হবে না তো ?’
নিজের আর্থিক অক্ষমতার কথা ভেবে রমার কথায় শশাঙ্ক আঘাত পেয়েছিল ঠিকই, কিন্ত ওর অভিমানকে ও খাটো করে দেখেনি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, - ‘খরচের জন্য তুমি চিন্তা করো না গিন্নী। সে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে ছেলেটার ইস্কুলের ব্যাপারটাতো আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বড় দিনের ছুটি পড়তে এখনও হপ্তা দুয়েক বাকি। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও তো আর খুঁজে পাচ্ছি না।‘
বিয়ে হবার পর থেকে সেই যে হেঁসেলে ঢুকেছে, আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি রমার। শরীর খারাপ থাকায় বৈচিত্র্যহীন একঘেঁয়ে জীবনে কিছুটা বিরক্তিও এসেছে। তাই বেড়াতে যাবার নামে মনটা ভরে উঠল। স্বামীকে দু'কথা শুনিয়ে দেবার জন্য মনে মনে একটু কষ্টও পেল। আহ্লাদের সুরে স্বামীকে জিজ্ঞেস করল রমা,- ‘কোথায় বেড়াতে যাব গো আমরা বড়দিনের ছুটিতে ?’
‘হ্যাঁ, সেটাই ভাবছি। কাছে পিঠেই কোথাও যেতে হবে। সাত দিনের ছুটিতে যাতায়াতেই যেন সময় না চলে যায়। আমি বলছিলাম শিমুলতলা জায়গাটা বেশ স্বাস্থ্যকর। কলকাতা থেকে মাত্র ঘন্টা ছয়-সাতের পথ। শুনেছি পাঁচ-সাত দিনের জন্য সস্তায় বাড়ি ভাড়াও পাওয়া যায়। স্টেশনে নেবে স্টেশন মাস্টারের অফিসে খোঁজ করলেই সব জানতে পারা যায়।‘
বেড়াতে যাবার খুসীতে মনে মনে রমা এতটাই ডগমগ যে বলে ওঠে,- ‘কেওড়াতলা নিমতলা বাদে যে তলাতেই তুমি নিয়ে যাবে, সেখানেই যাব।‘ শশাঙ্ক হাঁ হাঁ করে উঠে বলে,- ‘বালাই-ষাট, এমন কথা মুখে আনতে আছে ?’ মা-বাবার আলাপচারিতায় বাড়ির মধ্যে একটা হাল্কা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ছেলে বাপি বড় একটা রাশভারি বাবার কাছে ঘেঁষে না। সে-ও ছুট্টে এসে জিজ্ঞেস করল, -"মা আমরা বেড়াতে যাব” ?’
-'বাবাকে জিজ্ঞেস করো বাবা’- রমার গলার স্বরে বেশ কিছুটা প্রশ্রয়। অভিমান যে এত মধুর, এই স্বাদ শশাঙ্ক আজ জীবনে প্রথম উপলব্ধি করল। প্রায় বাষ্পরূদ্ধ কন্ঠে শশাঙ্ক বলে উঠল,-‘হ্যা বাপিবাবু, তোমার বড়দিনের ছুটি পড়লেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। খুসী তো ? মা-কে বলো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে। কথায় কথায় অনেকটা রাত হয়ে গেছে।‘ আজ বহুদিন বাদে বৈচিত্র্যহীন দাম্পত্য জীবনে হঠাৎই ফিরে এল ঘনিষ্ঠতার জোয়ার।
দু’সপ্তাহ হৈ হৈ করে কেটে গেল। মনের সঙ্গে দেহের যোগ যে কত নিবিড়, সেটা আজকের রমাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। আজ শিমুলতলা যাবার দিন। দশটা পঞ্চাশের গাড়ি। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রমা দুটো ভাতেভাত ফুটিয়ে নিয়েছিল। আজ ওর শরীরে কোনও ক্লান্তি বোধ নেই। নেই অফিস-ইস্কুলের ভাতের তাড়া। চটপট সবাই তৈরি হয়ে নিয়ে সময় থাকতে স্টেশনে পৌঁছে গাড়িতে উঠে বসল। কাঁটায় কাঁটায় দশটা পঞ্চাশে ট্রেন ছেড়ে দিল। প্যাসেঞ্জার ট্রেন। গতি তার ধিকিধিকি। খারাপ লাগে না ওদের। আজ ওরা সবাই নিয়মছাড়া। ঘন্টা দুয়েক মাত্র কেটেছে। দু’বার চা খাওয়া হয়ে গেছে। শেষবারে মোচার চপও জুটেছিল। যে বাপি বাড়িতে কোনদিন চা ছোয়নি, সে-ই আজ মায়ের চা-তে ভাগ বসিয়েছে। নিষিদ্ধ জিনিসগুলোর প্রতি সব মানুষেরই আকর্ষণ বেশি, শুধুমাত্র সুযোগের অপেক্ষা। চায়ে চুমুক দিয়ে বাপির মনে হচ্ছে সে যেন এক লাফে বড় হয়ে গেছে। সবাই যেন পালন করে চলেছে নিয়ম ভাঙার নিয়ম। কে যেন হঠাৎ চীৎকার করে বলে উঠল,- ‘দেব নাকি দাদারা ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে ?’ কামরাসুদ্ধ লোক হো হো করে হেসে উঠল। শশা ওলা ঝুড়িভর্তি কচি শশা নিয়ে উঠেছে। চাইলেই ছুরি দিয়ে ছাড়িয়ে ঝালনুন মাখিয়ে দেবে। শশা ওলার সেলসম্যানশিপে সবাই মজা পায়। রমা মনে মনে ভাবে বহু সংসারই হকারদের সপ্রতিভ বিচিত্র সেলসম্যানশিপের ওপর নির্ভরশীল।
সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা নাগাদ গাড়ি শিমুলতলা পৌঁছল। বাইরে বেশ কনকনে ঠান্ডা। ট্রেন থেকে নেমে সামনেই এক টিটি ভদ্রলোককে শশাঙ্ক জিজ্ঞেস করল,- ‘গাড়ি কি লেট আছে ?’
- ‘ও তেমন কিছু নয়, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট হবে।‘
- ‘বাঃ বাঃ এতটা সময় লেট, আর আপনি বলছেন কিনা তেমন কিছুই নয়।‘
- টিটি সাহেব নস্যি নিচ্ছিলেন। রুমাল দিয়ে নাক মুছে নিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন, - ‘আরে মশাই গোটা দেশটাই কয়েক দশক লেট চলছে, আর ট্রেন চল্লিশ মিনিট দেরিতে চললেই যত বিপত্তি !’
শশাঙ্ক অহেতুক আর কথা না বাড়িয়ে স্টেশন মাস্টারের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। ঘরের ঠিক বাইরে কুলির মাথা থেকে মালপত্তর নামিয়ে ভাড়া চুকিয়ে দিল শশাঙ্ক। ঘরের সুইং দরজা ফাঁক করে শশাঙ্ক বিনীত ভাবে ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইল,- ‘আসতে পারি?’ – ‘বলুন।‘ কোট-প্যান্ট-টাই পরা মাঝবয়সী স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোক মুখ গুঁজে কেঠো চেয়ার-টেবিলে বসে জাবদা খাতায় লিখে চলেছেন। টেবিলের ওপর ভিড় করে আছে বেশ কিছু পেপারওয়েট আর টেলিফোন। শশাঙ্ক নমস্কার জানালো। প্রত্যুত্তরে ভদ্রলোক দায়সারা একটা নমস্কার জানিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, - ‘কাজের কথা বলুন।‘
- ‘আচ্ছা এখানে ধারে কাছে দু-চারদিনের জন্য ঘর ভাড়া পাওয়া যাবে ?’ অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার, পরেশবাবু এতক্ষণে খাতা থেকে চোখ তুললেন। শশাঙ্ককে দেখে তাঁর গলার স্বর অনেকটাই নরম হ'ল। চোখের চাহনিতেও কিছুটা জৌলুস দেখা গেল। শশাঙ্কর চেহারা আর সাজ-পোষাকে পরেশবাবুর সন্দেহ থাকল না যে, এ-ই সেই লোক। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,- ‘আপনি এসে গেছেন স্যর ?’
- ‘মানে ?’
- ‘আপনিই চৌধুরী সাহেব তো ?’
- ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি…………’
- ‘দেখুন স্যর দেখেই বুঝতে পেরেছি। মাস্টার মশাই মায়ের অসুখ শুনে হঠাৎই কলকাতা চলে গেছেন কাল। আমাকে সব বলে গেছেন।‘
- দেরি দেখে ইতিমধ্যে রমা আর বাপি আপিস ঘরে ঢুকে এসেছে। ওদের দেখে এ এস এম বাবু জিভ কেটে বললেন-'ছিঃ ছিঃ স্যর, বৌদি-খোকন কে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আপনি, আর বলছেন কিনা আপনি ভাড়া ঘরে থাকবেন !’ শশাঙ্কর বুঝতে অসুবিধে হয় না, যে উনি, মাস্টারমশাই ছুটির থাকার সময়টা, বদলি স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে শশাঙ্ককে গুলিয়ে ফেলেছেন। কিছুটা হতচকিত হয়ে বলে ওঠে,- 'শুনুন মশাই ……।‘
- ‘কিছু শোনার নেই স্যর; অনেকটা জার্নি করে এসেছেন, গাড়িও লেট ছিল, বেশ ঠান্ডাও পড়েছে। ওরে মিন্টু চৌধুরী সাহেবের মালপত্তরগুলো এক নম্বর ঘরে পৌঁছে দে। আপনি যান স্যর ওর সঙ্গে। আমি আপনাদের চা পাঠাগার ব্যবস্থা করছি।‘
বিরক্তির সুরে শশাঙ্ক বলে ওঠে,- ‘কিছু করতে হবে না আপনাকে, শুধু ঘরের চাবিটা দিন আমাকে।‘ শশাঙ্ক মন্টুর পেছন পেছন হন্ হন্ করে হাঁটা দিল। ঘরের সামনে এসে মন্টু শশাঙ্কর হাত থেকে চাবি নিয়ে এক নম্বর রিটায়ারিং রুম খুলে মালপত্তর নামিয়ে রাখল।
মনে মনে শশাঙ্ক ভাবে- কি ফ্যাসাদেই পড়লাম রে বাবা। নিশ্চয়ই অন্য কারুর সঙ্গে লোকটা গুলিয়ে ফেলেছে। আবার এ-ও ভাবে, দিনকাল খারাপ। কোনও মতলোব নেই তো। যাকগে, রাতটা রাতটা তো কাটানো যাক। কাল সকালে দেখা যাবে। সকালেই ঘুম থেকে উঠে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে রমার মতামত জানতে চাইল শশাঙ্ক। রমা বলল,- 'থাকবো তো দু-চারটে দিন, ঘরটা বেশ ছিমছাম। এর মধ্যে স্টেশন মাস্টার ফিরলে ভাল; নয়তো যাবার সময় ভাড়া মিটিয়ে গেলেই হবে। আর তাছাড়া ট্রেনে সঙ্গী ভদ্রলোক, যিনি আমাদের সঙ্গে এখানেই নাহলেন, উনি তো বলছিলেনই যে এখানকার মানুষজন বেশ সাদামাটা। এত ভাববার কিছু নেই। চলো, বরং আশপাশটা বেড়িয়ে আসি।‘
- 'বেশ তাই চলো।‘
মানুষ যখন নতুন পরিবেশে যায়, তখন প্রথমেই সে আকৃষ্ট হয় যা তার পূর্বতন অভিজ্ঞতালব্ধ নয়।, সেই সব দৃশ্যের প্রতি। স্টেশনের ধারেই গড়ে ওঠা স্বাস্থ্য নিকেতনগুলো চোখে পড়ার মতো। শান্ত নির্জন পরিবেশে রোজই ভোরবেলা শশাঙ্ক তার ছোট্ট পরিবারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। লালমাটির পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো টিলাগুলো। রমা যেন রাতারাতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। গেরস্তের সংসারে এমন স্বাধীনতা আর কোথায়! আপিসের ভাতের তাড়া নেই। নেই ছেলেকে ইস্কুলে পাঠাবার তাড়া। রোজই বেড়িয়ে ফেরার পথে একটা মিষ্টির দোকানে ওরা সিঙাড়া-জিলিপি আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট সারে। স্বাস্থ্যকর জায়গা শিমুলতলার প্রধান লাট্টু পাহাড়ের কথা শশাঙ্কর অজানা নয়। ছেলে-বৌয়ের উৎসাহ দেখে একদিন ওরা চলে গেল লাট্টু পাহাড় দেখতে। রুগ্ন শরীর রমার ক্লান্তি কে যেন কেড়ে নিয়েছে। দিব্যি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে সে। অটোয় চড়ে দূরের হলদি ফলস্ আর লীলাবরণ ফলস্ দেখাও বাকি রইল না। আর তাছাড়া পাহাড় আর শাল-মহুয়ার অরণ্যে ঘেরা মনোরম পরিবেশ, পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখ তুললেই দেখা যায়।
বাড়ি ফেরার দিন চলে এল। ‘নিজের বাড়িটাই ভাল'- রমা মনে মনে আওড়ে চলে। আবার এটাও মনে হয় যে সংসারের নিত্য একঘেঁয়েমির মাঝখানে এরকম অনিয়মেরও একটা আলাদা স্বাদ আছে বৈকি। বাড়তি পড়ার চাপ থেকে ক'দিন রেহাই পাওয়ায় ছেলেটাও আনন্দে ডগমগ ছিল। কিন্ত বাবাই, জিৎ, সানিদের পাবে কোথায় এখানে! বন্ধুদের জন্য মন কেমন করছে ওর বোধহয়। আজ সকালেই জিজ্ঞেস করছিল,- 'মা আমরা বাড়ি যাব কবে ?’ যাইহোক, রাত পোহালে বাড়ি যাবার কথায় সকলের মধ্যেই একটা আনন্দ-বিষাদ মেশানো ভাব লক্ষ্য করা গেল।
সন্ধ্যের চা সেরে শশাঙ্কমোহন ঘরভাড়া মেটাতে বেরুল। পরেশবাবুর সহাস্য অভ্যর্থনা- 'আসুন স্যর, বসুন; কেমন লাগল আমাদের জায়গা ?’
- ‘ভালই, পাঁচদিনই যথেষ্ট। কালই রওনা হব। বলুন আপনার ভাড়া কত হ'ল?’
এ এস এম বাবু জিভ কেটে বললেন- ‘ভাড়া কিসের স্যর? আচ্ছা বেশ, আপনি বরং কেয়ার টেকার বাবুকে আপনার যা খুসী দু-দশ টাকা জলপানি হিসেবে দিয়ে দিন স্যর, তাহলেই হবে।‘
বিরক্ত হয়ে শশাঙ্ক ঘরে ফিরে এল। রমাকে বলল,- ‘লোকটা নির্ঘাত আমার সঙ্গে রেল কোম্পানির কোনও হোমরাচোমরা কাউকে গুলিয়ে ফেলেছে। অথচ কিছুতেই শোধরাবার সুযোগ দেবে না।‘
- ‘মরুকগে, তুমি তো সাধাসাধি করেছ ভাড়ার জন্য। না যদি নেয় তো তুমি কি করবে!’
পরের দিন সকাল ন’টা আটচল্লিশের গাড়িতে শশাঙ্ক কলকাতা রওনা হ'ল। গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্ত তা হবার নয়। কারণ, শশাঙ্ক কি জানতে পেরেছিল, শিমুলতলায় তার ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পাবার কারণ ? পারেনি। আমি জেনেছিলাম। সেটা বলা যাক। ওই সময় শিমুলতলার স্টেশন মাস্টার ছিল আমার এক সময়ের সহপাঠী, রবীন সরকার। রিটায়ার করে ঘটনাচক্রে আমরা দুজনেই আজ একই কো-অপারেটিভের বাসিন্দা, পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকি। রোজই বিকেলে একসঙ্গে দুজনে কিছুটা সময় কাটাই। নানান্ গল্পের মাঝখানে পেশাগত জীবনের পারস্পরিক অভিজ্ঞতার ঘটনা নিয়েও দু-চার কথা হয়। সেই সূত্র ধরেই রবীন আমাকে এই ঘটনাটা বলেছিল। অনেক দিনের কথা, স্মৃতিতে কিছুটা পলি পড়েছে। যতটুকু মনে আছে, সেটাই বলছি।
শশাঙ্ক ফিরে যাবার পরের দিনই রবীন শিমুলতলা পৌঁছোলো। ডিউটিতে আসা মাত্রই পরেশবাবু এক গাল হেসে বললেন- ‘স্যর আপনার অতিথি কালই ফিরে গেলেন। দিল দরিয়া মেজাজ। ভাড়া মেটানোর জন্য ঝুলোঝুলি। দেখুন না স্যর, কেয়ারটেকার বাবুকে এক্কেবারে ১০০ টাকা বখসিস্ দিয়ে গেছেন। রেলের লোক বলে মনেই হয় না।‘
অনেক দিন কামাই-এর পর রবীন লগ বুক খতিয়ে দেখছিল।পরেশ বলে চলে- ‘ঘর ভাড়া না নিতে উনি একটু ক্ষুন্ন মনে হ'ল স্যর।‘ রবীন, পরেশবাবুর স্বভাব ভাল করেই জানে। সাদা মনের মানুষ, বকবক করতে ভালবাসে। সিগারেটের প্যাকেটটা পরেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে রবীন আবার খাতার দিকে নজর দিল। পরেশ থামবার পাত্র নয়। সিগারেটটা ধরিয়ে আবার শুরু করে- ‘বলুন স্যর উনি এস এম, তাছাড়া আপনার বন্ধু। দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছেন। সঙ্গে পরিবার…..’
- দাঁড়াও দাঁড়াও, কি বললে?’ লগবুক থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো, - ‘পরিবার মানে?’
- ‘আজ্ঞে স্যর ওঁর স্ত্রী আর ন-দশ বছরের ছেলে।‘
- ‘বল কি হে!’ – রবীন প্রায় আঁতকে উঠলো। ‘চৌধুরী মশাই তো বিয়েই করেন নি। অন্তত বছর দুয়েক আগে গয়া থেকে মোগলসরাই-এ বদলি হবার আগে ওঁর তো বিয়ে হয়েছে বলে শুনিনি। আর তুমি বলছ কিনা ন-দশ বছরের ছেলে আছে ! না পরেশ, তুমি বকবক করতে করতে আবার কিছু গোল পাকিয়েছ। কতদিন তোমাকে বলেছি, একটু দেখেশুনে কাজ করতে । ওরে মিন্টু, রেজিস্ট্রি বইটা নিয়ে আয় তো বাবা চট্ করে।‘ মিন্টু রেজিস্ট্রি বই নিয়ে আসার অবসরে পরেশ বলল,- ‘আজ্ঞে স্যর আপনি তো এত কথা বলে যাননি। নাম জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন, এস এম চৌধুরী। ব্যস আমিও আপনার কথা মতো কাজ করেছি।‘
- মিন্টু খাতা আনতেই রবীন একরকম ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে খাতাটা ছিনিয়ে নিল। খাতার পাতা খুলে গলার স্বর সামান্য একটু চড়িয়ে বলল- ‘এই দ্যাখো, যা বলেছি ঠিক তাই। উনি তো ওঁর নাম ঠিকই বলেছেন। আরে বাবা, মোগলসরাই-এর স্টেশন মাস্টার, মানে এস এম হ'ল সলিল মোহন চৌধুরী। আর উনি হলেন এস এম দত্ত চৌধুরী। চোখ খুলে দ্যাখো ফুল নেম অ্যান্ড অ্যাড্রেসের কলমে পরিস্কার লিখেছেন শশাঙ্ক মোহন দত্ত চৌধুরী। বুঝলে কিছু ?’
1 comment:
দারুন, শুধু কিছু বানানে গণ্ডগোল হয়ে গেছে!!
Post a Comment