ক্রিটিক্যাল সাইজ ও অ্যাটম বোমা
অ্যাটম বোমাপৃথিবীতে বহু ছোটখাট ঘটনা চোখে পড়ে যা হয়তো আমরা প্রায় সকলেই প্রকৃতির নিয়ম বলে উড়িয়ে দিই, হাতির কান কেন কুলোর মতো বড় বা জিরাফের গলা লম্বা না হলে কী হ'ত, বা মানুষের চেহারাই বা ওইরকম হ'ল কেন - এইসব প্রশ্ন বোধহয় আমরা কখনই তলিয়ে দেখি না। অথচ সমগ্র প্রাণীজগতের বিচিত্র আকৃতির জন্য একটা যুতসই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষ বা যে কোনও প্রাণীই এক একটি শক্তি রূপান্তরকারী যন্ত্রবিশেষ। আসলে সব শক্তি রূপান্তরকারী বস্তুর - তা প্রাণীই হোক বা নিষ্প্রাণ অ্যাটম বোমাই হোক, এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ওজন ও আকৃতির সঙ্গে শক্তি রূপান্তরের একটা গূঢ় সম্পর্ক আছে।
শুরু করা যাক প্রাণী জগতের কথা দিয়ে। মানুষ বা প্রাণী জগতের যে কোনও জীবের দেহের একটা স্বাভাবিক তাপমাত্রা আছে। দেহের অভ্যন্তরস্থ সেই তাপ তৈরি হয় প্রধানত দেহমধ্যস্থ সজীব উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে, যার বৈজ্ঞানিক পরিভাষা হ'ল মেটাবলিজম্ বা বিপাক। দেহমধ্যস্থ এই তাপের ক্ষয়ও আবার প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে দেহের উপরিভাগ থেকে। যে হারে তাপ উৎপন্ন হয়, তার ক্ষয়ও হয় আনুপাতিক হারেই; নতুবা দেহের উষ্ণতা ক্রমশ বাড়তে থাকবে । পক্ষান্তরে, ক্ষয়ের হার যদি দ্রুত হয়, তাহলে দেহ ক্রমশ ঠান্ডা হতে থাকবে। উভয়ের পরিণতিই ভাল নয়। কোন্ কৌশলে এই সমতা বজায় থাকে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটাই একটু তলিয়ে দেখা যাক।
বিপাকের হার মোটামুটিভাবে নির্ভর করে দেহের ওজন বা আয়তনের ওপর; কারণ প্রাণীদেহের টিস্যুর ঘনত্ব অর্থাৎ প্রতি ঘন সেন্টিমিটারের ভর সাধারনত এক গ্রামের কাছাকাছি। তাপ ক্ষয়ের হারের পরিমাণ আবার দেহের উপরিভাগের ব্যাপ্তির উপর নির্ভরশীল। এই ঘটনাটা প্রায় সব বস্তুর পক্ষেই সত্যি। গরম চা ঠান্ডা করার জন্য আমরা প্লেটে ঢালি। কারণ প্লেটে চা অনেকটা ছড়ানো জায়গায় থাকে, সুতরাং চায়ের ঠান্ডা হওয়ার হার বাড়ে অর্থাৎ চা দ্রুত ঠান্ডা হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে দেহের উপরিভাগের ক্ষেত্রফল ও দেহের আয়তন - এই দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আসলে ওই ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাতের উপর নির্ভর করে কোন্ প্রাণীর কী হারে বিপাকের প্রয়োজনীয়তা আছে, যাতে দেহের তাপমাত্রায় ভারসাম্য বজায় থাকে। এই অনুপাতের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা হ'ল ক্রিটিক্যাল সাইজ। কিছু কিছু উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করা যাবে।
হামিংবার্ড নামে এক ধরনের খুব ছোট পাখি আছে যাদের দেহের পরিসর ওজনের তুলনায় অনেকটাই বেশি। কাজেই এইসব পাখির বিপাকের হার খুবই দ্রুত। তুলনামূলকভাবে বলা যেতে পারে যে একটা হেলিকপ্টারের প্রতি একক ওজনের যে শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা আছে, এইসব পাখির বিপাকের হার প্রায় তার কাছাকাছি। ছোটখাট এমন সব পোকা মাকড় আছে যাদের দেহের পরিসর, ওজনের তুলনায় এতই বেশি যে দ্রুত বিপাকের প্রয়োজন এবং সারাদিনে তাদের নিজের ওজনের বেশি খাবার সংগ্রহ করতে হয়। পক্ষান্তরে হাতির মতো প্রকান্ড জানোয়ারের বিপাকের হার খুবই কম। কারণ হাতির আকার প্রকান্ড এবং কুলোর মতো দুটো কান থাকা সত্বেও, দেহের বহির্ভাগের পরিসর ওজনের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ হাতির "ক্রিটিক্যাল সাইজ " কম। পাঁচ টন ওজনের হাতি সারাদিনে হয়তো পঞ্চাশ কেজি খাবার খায না। সমস্ত ব্যাপারটা লেখচিত্রের সাহায্যে অতি সহজেই বোঝা যেতে পারে। সাধারণভাবে বলা যেতে পারে যে প্রাণী জগতে, আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিপাকের হার কমে। কারণ, ঘুরে ফিরে সেই ক্রিটিক্যাল সাইজ।

অনুভুমিক অক্ষ নির্দেশ করছে ওজন (গ্রাম) এবং উলম্ব অক্ষে নির্দেশিত হয়েছে ক্যালরি অর্থাৎ প্রতি গ্রাম পিছু প্রতি ঘন্টায় উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ (মেটাবলিজম্ হার)আসা যাক বস্তু জগতের কথায়। অ্যাটম বোমা বিস্ফোরণের দানবীয় রহসও লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়াম খন্ডের ক্রিটিক্যাল সাইজের মধ্যেই। প্রক্রিয়াটা একটু সহজ করে আলোচনা করা যেতে পারে। ধীরগতিসম্পন্ন নিউট্রন দিয়ে ইউরেনিয়াম ২৩৫ কে আঘাত করলে ইউরেনিয়াম ২৩৫ নিউক্লিয়াস ভেঙে গিয়ে মাঝামাঝি ভরের দুটো মৌলিক পদার্থের সৃষ্টি হয়। আর যা তৈরি হয় তা হ'ল একাধিক নিউট্রন ও প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইলেকট্রনভোল্ট শক্তি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে প্রকৃতিতে সঞ্চিত ইউরেনিয়ামের মাত্র ০.৭ শতাংশ ইউরেনিয়াম ২৩৫, বাকিটা ইউরেনিয়াম ২৩৮। এই আলোচনায় যেখানেই ইউরেনিয়ামের উল্লেখ আছে, সেখানেই ইউরেনিয়াম ২৩৫ বা ইউ-২৩৫ বলে ধরে নিতে হবে।
এখন প্রশ্ন হ'ল একখণ্ড ইউ-২৩৫ আর কিছু নিউট্রন রেখে দিলেই কি বোমার আকার ধারণ করবে ? আসলে ইউ-২৩৫ তেজস্ক্রিয় পদার্থ হওয়াতে নাড়াচাড়া করার জন্য যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। সুতরাং প্রযুক্তিগতভাবে বোমা তৈরির সমস্যা হয়তো ভীষণভাবেই জটিল। কিন্ত প্রাথমিক যা প্রয়োজন তা হ'ল যে ইউরেনিয়াম খন্ডটি অন্তত একটি নির্দিষ্ট আকৃতির হওয়া। কারণটা আলোচনা করা যেতে পারে। ধরা যাক একটি নিউট্রন ইউ-২৩৫ খন্ডটির একটি নিউক্লিয়াসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সৃষ্টি করল এক বা একাধিক নিউট্রন ও ২০০ মিলিয়ন ইলেকট্রনভোল্ট শক্তি, যার ক্ষমতা আদৌ মারাত্মক কিছু নয়। এখন যদি ঘটনাটা এমন হয় যে প্রায় একই সময়ের মধ্যে ইউ-২৩৫ খন্ডটির সমস্ত নিউক্লিয়াসগুলো নিউট্রনের আঘাতে বিভাজিত হয়, তাহলে সম্মিলিত শক্তির পরিমাণ সত্যিই মারাত্মক।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে এক গ্রাম ইউ-২৩৫ এর মধ্যে যতগুলো নিউক্লিয়াস আছে, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে, তা যদি একসঙ্গে বিভাজিত হয়, তা হলে উদ্ভূত তাপশক্তি যা হবে তাতে প্রায় ৪৫ টন জলকে সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত করা সম্ভব। বুঝে দেখুন কী সাংঘাতিক ক্ষমতা শুধুমাত্র এক গ্রাম "ইউ-২৩৫" বিভাজনের ফলে। অ্যাটম বোমা তৈরি করতে কয়েক কিলোগ্রাম ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হলেও তার খুব সামান্য অংশই ফিশন প্রক্রিয়া, অর্থাৎ শক্তি উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে পারে। সুতরাং ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এইরকম যে বিক্রিয়ায় উদ্ভূত নিউট্রনকে হারাবার সুযোগ না দিয়ে বিক্রিয়া টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রথম বিক্রিয়ার নিউট্রনগুলো, খন্ডটির সংলগ্ন অন্যান্য নিউক্লিয়াসের সঙ্গে বিক্রিয়া করা প্রয়োজন ও আরও নিউট্রন ও শক্তির উদ্ভব করা এবং এই ঘটনা চলা উচিত যতক্ষণ পর্যন্ত ইউ-২৩৫ খন্ডটির সমস্তটা বিভাজিত না হয়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় চেন রিয়্যাকসন (chain reaction)। এখন কথা হ'ল নিউট্রন হারিয়ে যাবার প্রশ্ন আসছে কেন ?হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন আসছে এইজন্য যে যদি ইউ-২৩৫ গোলাটির আকৃতি এমন হয় যে খন্ডটির বহির্দেশের ক্ষেত্রফল, খন্ডটির ওজনের তুলনায় যথেষ্ট বেশি, তাহলে বিক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত নিউট্রন, খন্ডটির বহির্দেশ থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে এবং আর কোনও বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সুতরাং এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যার ফলে নিউট্রন উৎপাদনের হার, ক্ষয়ের হারের তুলনায় বেশি হয়। আমরা জানি যে নির্দিষ্ট ওজনের যে কোনও জিনিসকে বিভিন্ন আকার দেওয়া যায়। সুতরাং আকার এমন হওয়া উচিত, যে বহির্দেশের তলের ক্ষেত্রফল যতদূর সম্ভব কম হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে বোমা গঠনের ব্যাপারে দুটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক, খন্ডটির ওজন যার ওপর নির্ভর করবে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের সংখ্যা এবং দুই, খন্ডটির বহির্দেশের ক্ষেত্রফল যার উপর নির্ভর করবে উদ্ভূত নিউট্রনের হারিয়ে যাবার হার। জেনে রাখা প্রয়োজন যে বহির্দেশের ক্ষেত্রফল ও ওজনের অনুপাত একটা নির্দিষ্ট মানের না হলে চেন রিয়্যাকসন অব্যাহত থাকে না। ইউ-২৩৫ খন্ডটির যে আকৃতির জন্য এই নির্দিষ্ট মান সম্ভব হয়, অ্যাটম বোমার ক্ষেত্রে সেই আকারকে বলা হয় "ক্রিটিক্যাল সাইজ " (critical size) এবং ওই সাইজের জন্য যে ওজনের ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাকে বলা হয় "ক্রিটিক্যাল মাস" (critical mass)
জৈব জগত বা প্রাণী জগতের ক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য প্রকৃতিই দেহের কলকব্জার মধ্যে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে রেখেছে। কিন্ত অ্যাটম বোমার ক্ষেত্রে সেই ভারসাম্যের দরকার নেই, মানুষ চায় সেটা অনিয়ন্ত্রিত থাকুক। যাতে তার বিধ্বংসী শক্তি ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর পেশী আস্ফালনের নজির আমরা সব সময়ই দেখতে পাচ্ছি। কিন্ত নিউক্লিয়ার ফিশনের এই অনিয়ন্ত্রিত শক্তিকে লাগাম দিয়েই নিউক্লিয়ার রিয়্যাকটার বা পারমাণবিক চুল্লি থেকে সৃষ্টি হয় পরিবেশবান্ধব নিউক্লিয়ার শক্তি। কিন্ত সেটা করা হয় কৃত্রিম উপায়ে। এখানেই জড় পদার্থ আর জীবনের মধ্যে তফাত।
তথ্যঋণ: Foundation and frontiers of physics by Gamow & Cleveland
3 comments:
খুব ভালো লাগলো।
খুবই সুন্দর হয়েছে লেখাটা। আমার মনে হয় এত শক্ত বিষয়টা অনেকটাই সহজ কোরে লিখেছো
Thank you Samaresh.
Post a Comment