Tuesday, July 5, 2022

ডিজিটাল সাক্ষরতা

 


বয়স্কদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা

ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে সামাজিক পট পরিবর্তন হচ্ছে খুবই দ্রুত এবং এই পরিবর্তন সর্বব্যাপী। এ বিষয়ে কোনও  বিতর্কের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, সকলের হাতেই স্মার্টফোন। তা সত্ত্বেও, অনেক মানুষ, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার করতে খুব অনিচ্ছুক। তাঁদের মধ্যে কিছু শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপে আটকে আছেন। আমি তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি যে হোয়াটসঅ্যাপকে সত্যিকার অর্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলা যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়া হিসাবে এর ব্যবহারের সুযোগ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে বা বড়জোর কিছু কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটিতে অন্যান্য অনেক প্রকৃত সোশ্যাল মিডিয়াতে উপলব্ধ বৈশিষ্ট্যগুলির অভাব রয়েছে, যেমন ফেসবুক বা ইউটিউব-এ আছে। এই সোশ্যাল মিডিয়াগুলো ব্যবহার করলে ব্যবহারকারী উপলব্ধি করতে পারেন যে তাঁরা পাবলিক ডোমেইনে আছেন এবং যেন বিশ্বব্যাপী সংযোগ করতে সমর্থ হচ্ছেন। বেশিরভাগ মানুষ, সাধারণত, পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারেন না। এটা অবশ্যই তাঁদের রুচি। আমি শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই বলতে পারি। এই ছোট্ট প্রবন্ধটি আমি প্রথমে ইংরেজি ভাষায় লিখি। এরপর ঠিক করলাম যে এটা মাতৃভাষায় অনুবাদ করলে সমাজের আরও অনেক মানুষের কাছে, বরং বলব আমার মতো আরও লক্ষ লক্ষ ভেতো বাঙালির কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে এবং ফলে তাঁরা যথার্থ উপকৃত হবে, বিশেষত ষাটোর্ধ বৃদ্ধ মানুষজন। ভূমিকার কাজ এখানেই শেষ। এবারে আসি আসল কথায়।

প্রথমত, স্বীকার করতে বাধা নেই যে মুখোমুখি বসে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার আদৌ কোনও বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত আড্ডার পরিসরে টেকনোলজির কোনও জায়গা নেই। কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য একটি আশীর্বাদ হতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা একা থাকেন, তাঁদের সন্তান/নাতি-নাতনিদের থেকে দূরে থাকেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে  চলাফেরার সীমাবদ্ধতা নিত্য সঙ্গী, অথচ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চান - এঁদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া একটা মস্তবড় আশ্রয়ের জায়গা। এটা কেবল তাঁদের জীবনকে মসৃণ, আরামদায়ক এবং সহজ করে তোলে না বরং বলব তাঁদের সমাজের মূল স্রোতেও ফিরিয়ে আনে।

ডিজিটাল টেকনোলজির হাত ধরে প্রবীণ নাগরিকবৃন্দ নিজেদের জীবনকে একাধিক উপায়ে সমৃদ্ধ করতে পারেন। সময় থেমে থাকে না, কাজেই বয়স বাড়ে। ষাটোর্ধো বয়সের বহু মানুষের মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নিরাপত্তাহীনতা হাত ধরাধরি করে চলে। অথচ এই বয়সে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকাটা একটা জরুরি সর্ত। বয়স্কব্যক্তিরা, যাঁরা চান, তাঁদের কাছে ডিজিটাল প্রযুক্তির একটা বিশাল ভূমিকা আছে। সিনিয়র সিটিজেনদের প্রায় নিঃসঙ্গ জীবনে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার কোন জুড়ি নেই। সম্প্রতি খবরের কাগজে পড়লাম যে জাপানে শুধুমাত্র নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে ফি সপ্তাহে মৃত্যু বরণ করেন হাজার চারেক বৃদ্ধ মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে আমি অনুভব করেছি যে আধুনিক এই প্রযুক্তির ব্যবহারে আমি অনেক সুখে আছি এবং তার চেয়েও বড় কথা নিত্যদিনের চলার পথে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে মানিয়ে নিয়ে অনেক বেশি পরিপূর্ণ জীবনযাপন করছি।   ইচ্ছে হলে একেবারে স্বাধীনভাবে অনলাইনে দোকান-পাট করতেও পারি এবং সাহায্যের জন্য কদাচিৎ অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়। অবশ্যই, আমার জন্য, এই কাজগুলি আমার ছেলে এবং আমার পুত্রবধূকে আউটসোর্স করে দিয়েছি। তারা আমার থেকে এ ব্যাপারে অনেকটাই অভিজ্ঞ। শেয়ার মার্কেটের মতো অন-লাইন বাজারের দামের ওঠাপড়ার দিকে তারা সব সময় নজর রাখে এবং যথার্থ সময়ে সাগ্রহে পণ্যটি সংগ্রহ করে নেয়। বছর তিনেক আগে American political scientist, Samuel Huntington-এর লেখা একটা বই, "Clash of Civilization"- বইটা কেনার ইচ্ছে হ'ল। অ্যামাজন প্রথমে বইটার দাম ধার্য করে ৮০০ টাকা। কথাপ্রসঙ্গে ছেলেকে বলেছিলাম। ও বলল দু-প্তাহ অপেক্ষা করতে। শেষ পর্যন্ত বইটা ও আমাকে ২৪০ টাকায় আনিয়ে দিল।

সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর ব্যবহার প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। এইভাবে বয়স্কদের সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি এড়াতে সাহায্য করে যার ফলে তাঁরা নিজেদেরকে সমাজের বৃহত্তর স্তরে সংযুক্ত বোধ করেন। তবে  সামাজিক নেটওয়ার্কের উল্টো দিকটাও আছে। যেমন, একই বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে ম্যাসেজ চালাচালি করার দৃষ্টান্ত  দিনে দিনে সংখ্যায় বাড়ছে। আমাদের দেশে এটা একটু বাড়াবাড়িই বলব।

এবার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ে সামান্য আলোচনা করব। অনেক সামাজিক নেটওয়ার্ক রয়েছে তবে ফেসবুক এবং ইউটিউব, দুটি শীর্ষ প্ল্যাটফর্ম সব থেকে user friendly. 

 সামাজিক নেটওয়ার্ক ছাড়াও ইন্টারনেট আছে। ইন্টারনেটের ব্যবহার পৃথিবী নামক সমগ্র গ্রহটিকে আপনার বেডরুমে পৌঁছে দেবে। গৃহে আবদ্ধ মানুষদের জন্য, ইন্টারনেট বাইরের বিশ্বের সাথে সংযোগ স্থাপন করে নিজেদের পছন্দের এবং আগ্রহের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের স্তর অর্জন করতে সহায়তা করে। আমি তিন দশক ধরে ইন্টারনেট ব্যবহার করছি এবং অবশ্যই স্বীকার করব যে আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছি। তথ্যপ্রযুক্তির এটি একটি ধারালো অস্ত্র। সুদূর  সুইৎজারল্যান্ডের জেনিভায় "সার্ন গবেষণাগারের" বৈজ্ঞানিকরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিককুলের মধ্যে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের তাগিদে এটি সৃষ্টি হয়। মুখ্য স্থপতি হচ্ছেন ইংরেজ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, টিম বার্নার্স লি।  ১৯৮৯ সালে তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর গ্লোবাল হাইপারটেক্সট প্রজেক্ট। এরই হাত ধরে ওয়ার্ল্ড ওয়ার্ড ওয়েব বা www. ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক বিশ্ব www-র  বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যবহার করতে শুরু করে এবং আজ ইন্টারনেটের বাণিজ্যিক ব্যবহার তার বৈজ্ঞানিক ব্যবহারকে সম্পূর্ণরূপে ছাড়িয়ে গেছে। আমার ধারণা আজকে বাণিজ্য ও শিল্পে এর ব্যবহারের তুলনায় এই আধুনিক অস্ত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার হয়তো এক শতাংশেরও কম।

No comments: