Monday, September 20, 2021

উপাচার্য উপাখ্যান প্রথম পর্ব

 উপাচার্য উপাখ্যান, আজ কাল পরশু/ যা দেখছি, যা দেখেছি, যা শুনেছি।


এই দেওয়াল লিখনটা তিন পর্বে ভাগ করে নিচ্ছি। কারণ এক খন্ডে প্রকাশ করলে অনেকটা বড় হয়ে গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে, অথচ অনেক কিছু তুলে ধরার আছে, বিশেষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের প্রজন্মের কাছে। ফেসবুকে দীর্ঘ লেখা পড়তে আমার ধৈর্য থাকে না। কাজেই এই কৌশল। 


আজকের পর্ব উপাচার্য উপাখ্যান - আজ, অর্থাৎ যা দেখছি।


 শিক্ষাঙ্গনের শিরোনামে এখন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, মাননীয় বিদ্যুত চক্রবর্তী মহাশয়। ৭ই অগাস্ট অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম সার্ধশতবর্ষ কেটে গেল (জন্ম ১৮৭১ সালের ঐ দিনটিতে)। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর শিল্পচর্চার আদিগুরু তথা এক সময়ের আচার্য। তাঁর সার্ধশতবর্ষ এমন মৌনতায় কাটবে, তা ভাবেননি ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর। উপাচার্য মহাশয়ের কোনও হেলদোল নেই। উনি বর্তমান আচার্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কিছুই করেন না। অনলাইনে যখন ক্লাস, মিটিং ইত্যাদি দিব্যি চলছে, তখন প্রতীকি অনুষ্ঠান হিসেবে কিছুই কি করার যেত না ? মাননীয় উপাচার্যের কানেই  হয়তো তিনি কথাটা তোলেননি, যদি চাকরি চলে যায়।

 অথচ, অমর্ত্য সেনের শান্তিনিকেতনের বাড়ির জমির কিছুটা বিশ্বভারতীর সম্পত্তির অংশ বলে দাবি করেছিলেন তিনি এবং নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বিদ্যুৎগতিতে আচার্যের নজরে আনেন। কারণ উনি জানতেন যে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে  অমর্ত্য সেনের সঙ্গে মোদীজীর সম্পর্ক আর যাই হোক মধুর নয়। অমর্ত্য বাবু বৈধ কাগজপত্র দাখিল করে প্রমাণ দিয়েছেন যে ওঁর বাড়ি প্রতিচীর চৌহদ্দি বহু বছরের ইজারায় নেওয়া হয়েছিল যার মেয়াদ শেষ হতে এখনও বহু বছর বাকি।


সাম্প্রতিক কালে বিদ্যুত বাবু অতি সক্রিয়তায় ছাত্র-ছাত্রী সমেত তিনজনকে বহিষ্কার করেছেন। ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে ওঁকে গৃহবন্দী করায় আঞ্চলিক পুলিশ প্রশাসনের নজরে এনেছেন। শেষমেষ উনি আচার্যের স্মরণাপন্ন হয়েছেন। কেবল ছাত্র বহিষ্কারে উনি থেমে থাকেননি। আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ যে সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের আটজনকে বরখাস্ত করেছেন, ঊনিশ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, আট জনের বেতন এবং অবসরকালীন প্রাপ্তি আটকানো ও তিরিশ জনের অধিক কর্মীকে শোকজ নোটিস ধরানো হয়েছে। একাধিক শিক্ষককে সর্বসমক্ষে অশালীন ভাষায় অপমান করারও অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। উপাচার্যকে যেখানে আমরা অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত,বিদ্যুত বাবুর আচরণ সেখানে স্বৈরতান্রিক শাসকের ভূমিকা পালন করছে। অত্যন্ত বেদনাদায়ক।


এবার আসি আরও এক উপাচার্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক সুরঞ্জন দাসের পূর্বসূরি, অভিজিত চক্রবর্তী মহাশয়ের আখ্যানে। কি আশ্চর্য, তিনিও ছিলেন চক্রবর্তী। উনি ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশ ডেকেছিলেন। এই সিদ্ধান্তে  শিক্ষককুলের একাংশের আপত্তিতে উনি কর্ণপাত করেননি। দীর্ঘ চার মাসের টানাপোড়েনে অচলাবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে অনশনরত ছাত্র-ছাত্রীদের অনশন ভঙ্গে অনুরোধ জানাতে প্রায় মাঝরাতে রাজ্যের  মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হয়। শোনা যায় অভিজিত বাবু ছিলেন তৃণমূল ঘেঁষা। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে ওঁকে পদত্যাগ করতে হয়। শিক্ষাঙ্গনে পুলিশের হস্তক্ষেপ শুধু লজ্জার নয়, তা প্রমাণ করে ধামাধরা উপাচার্যদের অক্ষমতাও বটে।


এরই মধ্যে রূপোলি রেখা হলেন বর্তমান উপাচার্য ইতিহাসবিদ, শ্রদ্ধেয় সুরঞ্জন দাস মহাশয়। আগে উনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। শুধু একটা ঘটনাই প্রমাণ করে যে আজকের দিনেও উনি কতটা ছাত্রদরদী। মাত্র বছর দুয়েকের আগের ঘটনা। ধনখড় সাহেব তখন সবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে চেয়ারে বসেছেন। সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী বাবুলসুপ্রিয় এবিভিপি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় অংশগ্রহণে  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। ওঁকে কালো পতাকা দেখানো ছাড়াও ছাত্রদের ওঁর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতেও লিপ্ত হতে দেখা গেছে। এই আচরণ আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়, বরং যথেষ্ট নিন্দনীয়। আচার্য, ধনখড় সাহেব রাজভবন থেকে পুলিশ নিয়ে এসে বাবুলসুপ্রিয়র উদ্ধার কাজে লেগে পড়লেন। মন্ত্রীমশাই উপাচার্যকে ডেকে পাঠালেন এবং উপাচার্য পদমর্যাদার একজনকে অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গীতে, কৈফিয়ত তলব করেন কেন উনি পুলিশ ডাকেননি। উপাচার্য বলেছিলেন, "পুলিশ ডাকার আগে আমি পদত্যাগ করব।" এগুলো শুধু কাগজের খবর নয়, স্বচক্ষে টিভির পর্দায় দেখা। আর একদিকে এবিভিপির নেতা-কর্মীরা ভাঙচুর চালালো। ভাঙচুরের তালিকায় আসবাব ছাড়াও ছিল কিছু শিল্পকর্ম। এরপর অগ্নি সংযোগে লিপ্ত হ'ল। মন্ত্রীমশাই এবং রাজ্যপাল সাহেব উপাচার্যের ওপর বিষোদ্গার করলেও, এবিভিপির নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে একটি কথাও খরচ করলেন না।


শুরু করেছিলাম বিদ্যুত বাবুর কথা দিয়ে। তাঁর  কথা দিয়েই এই পর্বের ইতি টানব। ইতিমধ্যে বহিষ্কৃত ছাত্ররা আইনি লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছিল। সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতিরা উপাচার্যের এই শাস্তি বিধানকে ভর্ৎসনা করে রায় দিয়েছেন, এটা লঘুপাপে গুরুদন্ড দেওয়া হয়েছে এবং ছাত্রদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ সমেত অবিলম্বে ক্লাসঘরে ফিরিয়ে নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়াও, উপাচার্য মহাশয়কে কোনও বিতর্কিত মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের তরফে বিনা পারিশ্রমিকে  আইনজীবী ছিলেন রাজ্যসভার সি পি এমের সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য।  যাইহোক, মোদ্দাকথা, টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোর্ট পর্যন্ত গড়ালো এবং যথারীতি বিদ্যুত বাবুর মুখও পুড়ল। প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে উপাচার্যের ভূমিকা যেখানে সর্বাধিক হবার কথা, সেখানে এটা কি প্রত্যাশিত! বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে এসে আচার্য, মাননীয় নরেন্দ্র মোদী রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে ,"ভয়শূন্য চিত্ত এবং মুক্ত জ্ঞানের কথা বলে গিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেই উনি আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখতে চান।" বদলে দেখা যাচ্ছে যে সেখানে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভয় আর বিশ্বাসহীনতার পরিস্থিতি। শিক্ষক, ছাত্র, কর্মী আশ্রমিক থেকে স্থানীয়দের একাংশ নানা কারণে উপাচার্যের বিরোধিতা করছেন। উনি একটি আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ে নির্দিষ্ট বিভাগের ফ্যাকাল্টিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, "তাঁদের আচরণ কুকুরের মতো।" বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে এই অপসংস্কৃতি আসলে শিক্ষাব্যবস্থার রাজনীতিকরণের ফল, যা সিপিএম সরকারের আমদানি, এবং শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের শুরুতে। সেই ট্র্যাডিসন সমানে চলেছে। আশার কথা, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মাননীয় ধর্মেন্দ্র  প্রধান বিশ্বভারতীর এই অচলাবস্থা কাটানোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছেন, সম্ভবত মোদীজীর পরামর্শে। প্রথম পর্বের আখ্যান এই পর্যন্ত। পরের পর্বগুলো এতটা দীর্ঘ নয় , কারণ সেগুলো আদৌ এরকম ঘটনাবহুল  নয়।

1 comment:

Unknown said...

বেশ ভালো লাগলো, কাকুমনি. The topicality of the decay of the institutes of higher learning cannot be more blatant under authoritarian dispensations. The necessity of dissent, especially from younger people, students, becomes all the more important here. I think university administrators' actions are stimulating those impulses. I appreciate this line of thinking. Keep on it.-Aparajita.