Monday, January 16, 2023

কেন লেখালেখি ?

                           কেন লেখালেখি

স্টাফ ক্লাবের ম্যাগাজিনে একটা লেখা দেবার জন্য সহকর্মী-বন্ধু সুপ্রিয় গাঙ্গুলী অনুরোধ জানালেন। আজকাল অবসর সময় কাটে নানা বিষয় পড়ে আর অল্প-বিস্তর লেখালেখি করে। সাধারণত বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে আশ্রয় করেই লেখার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ঠিক করি। তার একটা মুখ্য কারণ হ'ল এই যে আমরা এমন একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করি যে ক্যাম্পাসে শুধুমাত্র দু-দু'টো ভাল লাইব্রেরিই নেই, আছে বিজ্ঞান, মানে দুরূহ বিজ্ঞান আলোচনার জন্য একই ছাদের তলায় একাধিক বিশেষজ্ঞ। তবে এই লেখাতে আমি বিজ্ঞান-প্রযুক্তির হামলা করতে চাই না; বরং লিখতে চাই, সামান্য হলেও, লেখালেখির উৎসাহ আমার আসে কোথা থেকে।

শালীনতার অসম্মান না করে যে কোনও ব্যাপারে স্পষ্ট কথা বলা বা শোনা আমার পছন্দ। কিন্ত মুস্কিল হ'ল শতকরা ১০০ ভাগ স্পষ্ট কথা বলতে পারছি কোথায় ? যেটা পারি না বা অস্পষ্ট থেকে যায়, সেটা ঠারেঠোরে লেখার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করবার চেষ্টা করি যাতে মানসিক অশান্তির জ্বালা অন্তত কিছুটা প্রসমিত হয়। লেখার বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, সেখানে বাস্তব প্রসঙ্গ এসেই পড়ে। আর সেই প্রসঙ্গের খেই ধরেই নিজের পছন্দ-অপছন্দের কথাগুলো বলার সুযোগ হয়। প্রয়োজনবোধে আমি সমাজকে আমি অনেক জায়গায় আঘাত করি। অন্যায় এড়িয়ে যাওয়া ভীরুতা। সোচ্চার প্রতিবাদ করলে প্রতিক্রিয়া হয় বিরুদ্ধ চক্রান্তে। কাজেই কলম-ই হ'ল মতামত প্রকাশের একমাত্র হাতিয়ার। কেউ না কেউ তো পড়বেনই। ভূমিকা এখানেই শেষ। শুরু করা যাক মূল বক্তব্য, অর্থাত কিছু কিছু ব্যাপারে আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত।

স্বার্থ বড় অদ্ভুত জিনিস। স্বার্থের চরিত্র অনেকটাই ক্যালিডিওস্কোপের নক্সা বদলের মতো। সামান্য নড়াচড়াতেই যেমন ক্যালিডিওস্কোপের নক্সা বদলে যায়, পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্য চরিত্রও কেমন যেন রঙ বদলাতে থাকে। স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষকে অসংখ্যবার অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে দেখেছি। বহুদিনের পুরোনো সম্পর্ক একেবারে খানখান হয়ে না গেলেও তার পরিণতি হয়েছে শুধুমাত্র সৌজন্যবোধে। কোথাও বা সেটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে। কে ঠিক, কে-ই বা বেঠিক সে বিচার হয় না। কে করবে বিচার? সবাই তো জোট নিরপেক্ষ। আসলে হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে দেখা যায় সর্বক্ষেত্রেই ক্রমশ অভাব হয়ে উঠছে যুক্তিপরায়ণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি সচেতন নেতৃত্বের। সমাজে সর্বস্তরেই  আজ মিডিওক্রিটির শাসন। বেশ খারাপ লাগে যখন দেখি শিক্ষিত মানুষ কত সহজে মিথ্যাচার ও অশুভ আঁতাতের আশ্রয় নেয়। আসলে আরও একটু সুখে থাকার লোভে অনেক মানুষই নিজেদের গুটিয়ে এনেছেন পরিবার এবং বন্ধুবর্গের দলীয় বৃত্তের ক্ষুদ্রতম গন্ডীর মধ্যে ।

গ্রামবহুল এই দেশের মানুষের বিভিন্ন সংস্কারের প্রতি শহুরে বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষিত মানুষদের এক ধরনের ভ্রুকুঞ্চনের বা নাক সিঁটকানোর প্রবণতা অনেক সময় আমার কাছে আপত্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে আমার সামান্য কিছু বলার আছে। এটা ঠিকই যে আমাদের দেশের মাটি একটু বেশি পরিমাণে স্যাঁতস্যাঁতে, ফলে কুসংস্কারের ছত্রাক খুব তাড়াতাড়ি গজায়। কিন্ত সব কিছুকেই কুসংস্কার বলে যাঁরা ব্যাখ্যা করেন তাঁরাও কিন্ত তা থেকে মুক্ত নন্, অবচেতনেই সেই ধরনের সংস্কারের শিকার। পাশাপাশি দু'টো উদাহরণ রাখলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। ১৯৯৫ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন গ্রহণ দেখতে, তাঁদের মধ্যে ছিল পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে বিরল পরম মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারার উচ্ছ্বাস। পরিবেশের মধ্যে ছিল একটা পিকনিকের মেজাজ। অন্য দিকে বহু মানুষ গ্রহণ দেখেছেন পূর্ব পরিচিত সংস্কারের আচার পালন করে, অর্থাত গ্রহণ চলাকালীন তাঁরা কিছু খাননি, বাড়িতে রান্না বন্ধ ছিল। আমার মতে এটা অবশ্যই সংস্কার, তবে "কু" নয়। একজন মানুষও দেখিনি যিনি এই ধরনের সংস্কার মানেন না। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে খাওয়া-দাওয়ার রেওয়াজ কি উঠে গেছে ?অথচ মৃত্যু আর, ঘটা করে ভূরিভোজের আয়োজনের মধ্যে আমি কোনো মেলবন্ধন খুঁজে পাই না। আসলে সব কিছুই আনুষ্ঠানিক, কোনো কিছুই বিনা অনুষ্ঠানে সম্পন্ন হয় না। একটা অনুষ্ঠান, কিছু আচার-বিচারকে অবলম্বন করে মানুষ ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ হলে ক্ষতি কি ? তার মূল্য তো কম নয়।

আজকের দিনে অভিভাবক-সন্তানের সম্পর্কের মধ্যে বেশ বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করে থাকি। ছেলে-মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়াই আদর্শ বাবা-মা হয়ে ওঠার পরীক্ষা বলে মনে করেন অনেক অভিভাবক। তারা যা চায়, অনাবশ্যক হলেও, স্নেহবসে অভিভাবকরা তা তাদের হাতে তুলে দেন। ফলে না পাবার কষ্ট সহ্যের মানসিকতা শৈশব থেকেই গড়ে ওঠে না তাদের মধ্যে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদার রূপান্তর ঘটে, কিন্ত সংযমের অভ্যাস গড়ে ওঠে না। আমার মনে হয়, যে কোনও মানুষের জীবনে কিছুটা অভাববোধ, দুঃখ বা সমস্যা তাকে অনেক পরিণত করে, অনেক বুঝদার করে তোলে, অন্যের অসুবিধা বুঝতে শেখায়। আসলে বাচ্চাদের অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ার অসুবিধেটা এই যে তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বড্ড বেশি গুরুত্ব পেয়ে চরিত্রে আত্মকেন্দ্রিকতা এসে পড়ে। ফলে ভবিষ্যতে মানিয়ে নিতে শেখে না। ভাগ করে নেবার ব্যাপারটাই তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। এর কয়েকটা সামাজিক কুফল আমাকে প্রায়ই ভাবায়। এক, কিশোর অপরাধীর সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে ওঠা। সত্যি কথা বলতে কি কিশোর অপরাধের ঘটনা খবরের কাগজগুলোতে নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছে। দুই, বস্তুমুখী সমাজের রমরমা। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই যেন ভোগবাদের মধ্যেই সার্থকতা খুঁজে পায়। সামাজিক প্রতিষ্ঠা বলতে যেন ভোগবাদই বোঝায়। ফলে প্রতিষ্ঠার নেশায় মানুষ অসাধু প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। যে কোনও মূল্যে, এমনকি মান সম্ভ্রম বন্ধক রেখেও মানুষ ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বাদ পাওয়ার নেশায় মসগুল। তিন, ছেলে-মেয়েরা আজকাল যেন একটু বেশি সজাগ। কথাবার্তার মধ্যে কেমন যেন একটা অভিভাবকত্ব প্রকাশ পায়, যা বয়সের সঙ্গে আদৌ মানানসই নয়। তথাকথিত শিক্ষিত এবং সমাজের ওপরতলার অভিভাবকরা এই ধরনের আচরণকে ম্যাচিওরিটি আখ্যা দিয়ে থাকেন। যে যা খুশী বলতেই পারেন; আমার নস্টালজিয়া আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমাদের ছেলেবেলার-কিশোরবেলার স্মৃতি আজকের তুলনায় অনেক বেশি পবিত্র ছিল। তখন ছিল না সন্তান-অভিভাবক সম্পর্কের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা। 


আধুনিক উপন্যাস, সাহিত্য এবং কবিতার ব্যাপারে ব্যক্তিগত দু'একটা মতামত রাখতে চাই। এ ব্যাপারে জ্ঞান খুব সীমিত হ'লেও সাধারণ বুদ্ধিতে, যাকে বলে কমন সেন্সের ভিত্তিতে যতটুকু বুঝি, সেটাই প্রকাশ করতে চাই। বর্তমান সাহিত্য বা উপন্যাসের কথাই ধরা যাক। নারী-পুরুষের আকর্ষণ চিরন্তন। কিন্ত বর্তমানে সব কিছুই যেন বেশি স্থূল। হারিয়ে যেতে বসেছে সূক্ষ্মতা। সেই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে রুচিবিকৃতি; খুবই আশ্চর্য লাগে যখন দেখি নামী লেখকের বিশুদ্ধ সাহিত্যিকতা মিশে গেছে নির্ভেজাল অশ্লীলতার সঙ্গে এবং আরও আশ্চর্য লাগে যখন নামী সাহিত্যিকের সৃষ্ট অশ্লীলতা পাঠক-পাঠিকার কাছে সাহিত্য গুণমানে বিবেচিত হচ্ছে দেখে। 

কবিতার ব্যাপারে মতটা একটু অন্যরকম। আধুনিক কবিতার কথা বলছি। আমার প্রশ্ন, আধুনিক কবিতাকে কেন কবিতা আখ্যা দেওয়া হবে ? ছন্দবদ্ধ সুরেলা রচনাকেই তো আমরা কবিতা হিসেবে আমরা গ্রহণ করতে শিখেছি। একে ছন্দহীন, তার ওপর দুর্লঙ্ঘ্য শব্দসমষ্টি -এই দুই মিলিয়ে প্রায় সব আধুনিক কবিতা-ই আমার কাছে যেন গভীর থেকে গভীরে নেমে যাওয়া একটা রহস্য। কাজেই আধুনিক কবিতা পড়ার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কৌতুহল বা আকর্ষণ আদৌ অনুভব করিনা। এ ব্যাপারে একজন নামী লেখকের সঙ্গে মতামত আদান-প্রদান করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, "আমিও বুঝি না, তবে শুনেছি আধুনিক কবিতা পড়ার জন্য বিশেষ ধরনের অনুশীলনের প্রয়োজন।" ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন কি না জানি না। তবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একমত হয়ে মনে হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত, জীবনানন্দের কবিতা পড়ে মর্মোদ্ধার করার জন্য যদি বিশেষ অনুশীলনের প্রয়োজন না হয়, তবে আজকের আধুনিক কবিদের রচনা পড়ার জন্য তার প্রয়োজন কেন হবে ?

ইস্যু অসংখ্য। কাগজ ও কালির-ও অভাব নেই। তবে সবকিছু নিয়ে আলোচনার সময় এখনও আসেনি। কাজেই লেখালেখির স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহের একান্ত ব্যক্তিগত একটা কারণ জানিয়ে শেষ করব। জনসাধারণের ব্যবহারের উপযুক্ত পত্রিকার পাতায় ছাপার হরফে নিজের নামটা দেখার মধ্যে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি আছে, অবশ্যই নামটা যদি কোনো সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না থাকে; এছাড়া প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় লেখার একটা বাড়তি আকর্ষণ আছে - সেটা হ'ল রীতিমত একটা ভাল অঙ্কের পারিশ্রমিক। তবে সেটাকে ঠিক অর্থ উপার্জন হিসেবে ভাবতে আমার ভাল লাগে না। সেই অর্থকে বরং ভাবতে ভাল লাগে পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে। কারণ লেখা জমা দিলেই সেটা গ্রহণযোগ্য হবে এবং ছাপানো হবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলতে পারি যে আর্থিক লাভ আর আত্মিক লাভের মধ্যে ফারাক অনেক।

একটা লেখা জমা দিয়ে ছাপানোর আগে পর্যন্ত অপেক্ষার দিনগুলো বেশ একটা অতৃপ্তি অস্বস্তির মধ্যে কাটে। কখনও বা কয়েক সপ্তাহ,  হয়তো বা কয়েক মাস। অপেক্ষা করার সময় মনের ঘড়িটা বোধহয় থেমে থেমে চলে। তাই সময়টা বেশি বলে মনে হয়। লেখাটা ছাপানোর হরফে দেখলে বোঝা যায় যে লাভজনক প্রত্যাশার উদ্বেগের মধ্যে এক ধরণের আনন্দানুভূতি আছে। শুধু তাই নয়, কষ্টার্জিত, অপ্রত্যাশিত, অনিশ্চিত সাফল্যের মধ্যে যে মধুরতা আছে, তা রেখে চেপে বহুদিন উপভোগ করা যায়।



No comments: