Tuesday, October 11, 2022

অর্থনীতিতে 'K' অক্ষরের তাৎপর্য


       অর্থনীতি বিজ্ঞানে "K" অক্ষরের তাৎপর্য 

বিশ্ব অর্থনীতির আকাশে ফের দীর্ঘমেয়াদি কালো মেঘ। তাবড় অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তা, সকলেই এক বাক্যে মানছেন যে, বিশ্বব্যাপী আর্থিক সঙ্কট শুরু হয়ে গিয়েছে। মন্দার চোখরাঙানিতে সামনের বছরদেড়েক সেগুলো আরও বহু গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।....

তাবড় অর্থনীতিরা তথ্য নিয়ে দেখাচ্ছেন, কোভিদ-উত্তর অর্থনীতির পুনরুত্থানের রূপরেখা অনেকটা ইংরেজি "K" অক্ষরের মতো - ব্যক্তির ক্ষেত্রেও, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। "K" এর একটা হাত উর্ধমুখী, এক্ষেত্রে যা ধনীদের আরও সম্পদ বৃদ্ধির নির্দেশক।"K" এর নিম্নমুখী হাতটা নির্দেশ করে এক অতল গহ্বরের দিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ  দরিদ্ররা যেখানে তলিয়ে যাচ্ছে আরও। 

একটি ভিন্নতর প্রশ্নও অবশ্য ভারতকে উদ্বিগ্ন করবে। সম্প্রতি সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি নামক সংস্থার পরিসংখ্যানে প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০২০ সালে সাড়ে পাঁচ কোটির বেশি ভারতীয় অতিমারি ও তজ্জনিত আর্থিক সংকটের কারণে দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে গিয়েছেন। সংখ্যাটি তাৎপর্যপূর্ণ। অতিমারির সময়কাল প্রশ্নাতীত ভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভারতে আর্থিক সঙ্কটের ধাক্কা দরিদ্র মানুষের গায়ে লাগে অনেক বেশি। বর্তমান আর্থিক সঙ্কটটি আসছে অতিমারির সেই দগদগে ক্ষত শুকোনোর আগেই। ফলে,যাঁরা এমনিতেই বিপর্যস্ত, বর্তমান সঙ্কট তাঁদের আরও বেশি বিপন্ন করবে, এমন আশঙ্কা প্রবল। অতএব কেন্দ্রীয় সরকারই  হোক, বা ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, সব প্রতিষ্ঠানেরই কর্তব্য আর্থিক সঙ্কট বা মূল্যস্ফীতির লড়াইয়ের সময় এই মানুষগুলোর কথা বিশেষ ভাবে স্মরণে রাখা। অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্য বলতে যদি শুধুমাত্র গড় পরিসংখ্যানের কথা ভাবা হয়, তা হলে মস্ত ভুল হবে। "গড়" ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। দশ জনের মধ্যে শুধুমাত্র একজনের একটা বড়সড় অঙ্কের উপার্জন,বাকি ন'জন অনেক অনেক কম উপার্জনের মানুষের চরম অভাবকে ঢেকে দেবে, এবং রোজগারের অসাম্য বোঝার কোন অবকাশ থাকবে না।  একটা ছোট্ট উদাহরণ নেওয়া যাক: ধরা যাক ১০ জনের মধ্যে একজনের মাসিক বেতন ৫০০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা। বাকি ন'জনের মাস মাইনে ১০০০০ টাকা। তাহলে ১০ জনের মাসিক গড় বেতন দাঁড়াল ১৪০০০ টাকা। কাজেই আর্থিক অসাম্য বুঝতে হলে আর্থিক বন্টনের অন্য কোনও সূচকের সাহায্য নিতে হবে। হিসেবটা একটু অতি সরলীকরণ করে দেখানো হয়েছে বোঝার সুুবিধের জন্য। মনে হ'ল সবাই ১৪০০০ টাকা পাচ্ছেন, কিন্ত আদতে ব্যাপারটা কি তাই ? আর্থিক এই অসাম্য প্রকট হয়ে দেখা দেবে যখন আমরা দেখি যে দেশের ৮১ কোটি মানুষ সরকারি ভর্তুকির রেশন ব্যবস্থায় কালাতিপাত করছেন এবং মনোরেগা (MGNREGS) প্রকল্পে যোগদানের চাহিদা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। অথচ বিগত কয়েক বছরের মধ্যে বিলিয়োনেয়ারের সংখ্যা ১০২ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ২০৩ এ পৌঁছেছে। শুধু কি তাই! তাঁদের সম্পদের পরিমাণে বৃদ্ধি হয়েছে ২৩ লক্ষ কোটি থেকে ৬০ লক্ষ কোটি টাকা। সুতরাং সঙ্কটের সময়, যাঁরা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন তাঁদের কথা আলাদা ভাবে মাথায় রাখা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবশ্য কর্তব্য। সরকার মানুষের ক্ষোভ কমানোর কৌশলী চেষ্টা চালানোর কোনও ত্রুটি রাখছে না, তবু অর্থনীতির যে হাল তা যেন তলিয়ে যাবার কালের যাত্রার ধ্বনি 

একদিকে জ্বালানির বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে খাবার কেনার সঙ্গতি নেই, অন্য দিকে টান খাবারের জোগানের। আমাদের দেশের অবস্থাটা সম্ভবত এতটা খারাপ নয়।  ব্রিটেনের বরিস জনসন সরকারের পূর্ণ মেয়াদ সম্পূর্ণ করার আগেই পড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি যদিও ব্রিটেনের মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index) এবং ক্ষুধা সূচকের (Hunger Index) মান ভারতের তুলনায় অনেকটাই উন্নত, যতই প্রধানমন্ত্রী মোদীজি দাবি করুন যে ভারতের জিডিপি ব্রিটেনের জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে। "গড়" ব্যাপারটার মতো "জিডিপির" হিসেবটাও একটা ধাঁধা। এ বিষয়ে স্বল্প পরিসরে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছে আছে।

 ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে টানা ছ'মাস জাতীয় আয়ের পরিমাণই কমেছে। বৃদ্ধির হার নয়, জিডিপির পরিমাণই কমে গিয়েছে সরাসরি। তা-ও একনাগাড়ে ছ'মাস। স্বাধীনোত্তর ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম। অনেকে বলছেন, শুধু ২০২০-২১ সালে দারিদ্র্যসীমার নীচে নেমে গিয়েছেন বহু কোটি ভারতীয়। সঠিক সংখ্যাটা আগেই বলা হয়েছে। জেরবার অবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতি যখন সবে মুখ তোলার চেষ্টা করতে পারত, তখন আবার এই নতুন সঙ্কট। একে অর্থনীতির সমস্যা অঢেল। বৃদ্ধির গতি এখনও ঢিমে। বেসরকারি লগ্নির আগ্রহ সীমিত। বেকারত্বের হার চড়া। স্বাধীন বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, সাড়ে চার দশকে সর্বোচ্চ। 

ভারতের (মিডিয়ান এজ) ২৮/২৯ বছর। অর্থাৎ, ১৩০/১৩৫ কোটির দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যায় যুবক-যুবতীর এই বিপুল অনুপাত অবশ্যই সম্পদ, যাকে আমরা 'ডেমোগ্র্যাফিক ডিভিডেন্ড বলি। কিন্ত হাতে কাজ না পেলে, এই সম্পদেরই  বোঝা হয়ে উঠতে দেরি হয় না। Demographic dividend will turn into demographic disaster, rather demographic curse.


তথ্যসূত্র:

আনন্দবাজার এবং Statesman পত্রিকার বিগত কয়েক সপ্তাহের সম্পাদকীয় ছাড়াও বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদ ও সংখ্যাতত্ববিদের সুুপাঠ্য প্রবন্ধের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।



No comments: