Saturday, September 17, 2022

মাস্ক যখন কন্ঠহার

                           মাস্ক যখন কন্ঠহার


করোনার প্রভাব যখন প্রায় শিখর ছুঁয়ে ফেলেছে, বাজার যাবার পথে সব্জি বিক্রেতা এক মহিলাকে দেখলাম খদ্দেরের অপেক্ষায় নাক খোলা মুখ ঢাকা মাস্ক লাগিয়ে ফেসবুক চর্চায় ব্যস্ত। সোস্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণের ব্যাপক বিস্তৃতি দেখে মুগ্ধ হলাম, কারণ বুঝলাম যে এঁরাও  পড়তে পারেন। দু-একটা আনাজ কিনে জিজ্ঞেস করলাম, "দিদিভাই নাকটা ঢাকা দাওনি কেন !" চটজলদি উত্তর- 'দাদা, দম বন্ধ  হয়ে যায়। মুখ তো ঢেকে রেখেছি।' খানিক দূরে কেউ কেউ হয়তো থুতনির কাছে নামিয়ে বিড়ি টানছে (অবশ্যই পুরুষ মানুষ) যাইহোক, কথা বাড়ালাম না। কারণ, আগে বেশ কিছু অপেক্ষাকৃত উঁচু শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে এবিষয়ে মৃদু প্রতিবাদের অভিজ্ঞতা ভাল হয়নি। কিন্ত সব্জিদিদি আমাকে একটা জিনিস শেখালো যে খবরের কাগজের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও খুব সাধারণ মানুষজনও ফেসবুক করেন। কাজেই কোভিদের তৃতীয় ঢেউ আসার আগে, ন্যূনতম কোভিদ বিধি মানার পাঠটা মানুষের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেবার তাগিদ অনুভব করলাম ফেসবুকের মাধ্যমে।

কোভিদ পরীক্ষার জন্য তুলোর পুঁটলি লাগানো কাঠি নাকের ভেতর পর্যন্ত ঢুকিয়ে সাইনাসের (একটা ফুটো যেটা নাকের সঙ্গে মাথার খুলির সংযোগ স্থাপন করে) লালারস সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় যে, পরীক্ষিত মানুষটি সংক্রমিত কি না। কোভিদ সংক্রমিত, উপসর্গ হীন কোনো মানুষ  মুখ ঢেকে নাক খুলে আমার পাশে বসে একবার হাঁচি দিলেই আমি ছাড়াও ৬/৮ ফুটের মধ্যে যে কজন আছেন, সকলের সংক্রমিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। পক্ষান্তরে নাক ঢাকা না থাকার ফলে তাঁরও অন্যের দ্বারা সংক্রমিত হবার ঝুঁকি যথেষ্ট। বাজারে যে ছেলেটির থেকে কলা কিনি সে বহুদিন মাস্ক ব্যবহারই করতো না। তার যুক্তি, 'কাকু এসব শহুরে অসুখ আমাদের গ্রামের দিকে হয় না।'

 শহুরে মানুষেরা অনেক ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে।  গ্রামের মানুষেরা অতটা কাছাকাছি থাকে না। কোভিদের দ্বিতীয় ঢেউ আসার মাসখানেক পরে দেখি সেই কলা বিক্রেতা নাকমুখ ঢেকে বাজারে আসছে। তার মধ্যে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, 'কাকু আমাদের দিকেও এখন করোনা শুরু হয়ে গেছে।' তার জানা ছিল না যে, শহরের বহু মানুষকে যুদ্ধে হারিয়ে এবং অনেক বেশি মানুষের কাছে হেরে গিয়ে, ভাইরাস বারংবার নিজের  চেহারা পাল্টে এখন নতুন শিকার খুঁজছে। কারণ যাদের সঙ্গে লড়াইয়ে একবার হেরে গেছে, তাদের দ্বিতীয় বারের সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই কম। ঠিক সেই কারণেই এখন গ্রামাঞ্চলের মানুষ আক্রান্ত। পশ্চিম বাংলার তথ্য বিচার করলেই বোঝা যায় যে এই মুহূর্তে কলকাতার তুলনায় উত্তর ২৪ পরগণায় সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার অনেকটাই বেশি। 

যথাযথ মাস্ক পরার মতো সামান্য বিষয়টুকুও মানতে নারাজ রাজ্যবাসীর বড় অংশ। তাঁদের দমবন্ধ হয়ে যায়। এঁরাই হয়তো আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের ভেন্টিলেটরের মধ্যে দমবন্ধ অবস্থায় কাটিয়ে কপালজোরে বাড়ি ফিরে আসতে পারলে দুরকম দমবন্ধ হয়ে যাবার অভিজ্ঞতার তফাতটা বোঝাতে পারবেন। একটা জিনিস পরিষ্কার যে সংক্রমণের প্রথম এবং দ্বিতীয় ঢেউ থেকে দেশের  মানুষ কোনো শিক্ষাই নেয়নি। সামান্যতম কোভিদ বিধি এভাবে অগ্রাহ্য করা চলতে থাকলে তৃতীয় ঢেউয়ের আক্রমণ কেবল সময়ের অপেক্ষা। যতদিন না দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিষেধকের  আওতায় আসছেন ততদিন সংক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যাবে। কাজেই যথাযথ মাস্কের ব্যবহার এবং দুরত্ববিধি পালনই একমাত্র সামাজিক ভ্যাকসিন এবং সেটার জন্য কারো ওপর নির্ভর করতেও হবে না, সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে।

No comments: