ও যেন আমাকে টাচ্ না করে
এই ছ'টি শব্দবন্ধ এখন থেকে পশ্চিম বাংলার তৃণমূলীদের ট্যাগ লাইন হয়ে গেল। আমরা সবাই জানি যে গতকাল পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নবান্ন অভিযান ছিল। রাজনৈতিক কথা আমার তরফ থেকে এখানেই শেষ। কারণ বেশ কিছু অর্ধশিক্ষিত মানুষ আছেন তাঁরা উন্নয়নের বুঁদে মজে গিয়ে সব কিছুতে রাজনীতির গন্ধ পান। উন্নয়নের মাপকাঠি তাঁদের কাছে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্পের অভাব। সেই নালিশ আমারও বটে। এজন্য শাসক দলই দায়ী, এটাও সত্যি। কিন্ত এর জন্য জায়গাটা জাহান্নামে গেছে, এই ভাবটা মেনে নিতে পারি না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের sense of humour is second to none. তারই একটা নিদর্শন গতকাল শুনলাম শাসক দলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষের মুখে।
কালকের নবান্ন অভিযানের key takeaways হ'ল এই লেখার শিরোনাম "ও যেন আমাকে টাচ্ না করে"। কালজয়ী এই ডায়ালগের জন্ম হয়েছিল ষাটের দশকের তৈরি সপ্তপদী সিনেমার নায়ক কৃষ্ণেন্দুর ( উত্তম কুমার) উদ্দেশ্যে নায়িকা রীনা ব্রাউনের (সুচিত্রা সেন) সর্ত আরোপের মধ্যে দিয়ে। ওই একই ডায়ালগের rerun দেখলাম কাল কুনাল ঘোষের মুখে।এবার একটু প্রেক্ষিতটা জেনে নেওয়া যাক।
...."কর্মী-সমর্থক বেষ্টিত হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি। আর তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে সামনে দাঁড়িয়ে কর্তব্যরত পুলিশ। ৫/৬ জন মহিলা পুলিশও ছিলেন। তাঁদেরই একজন নেতার হাতে মৃদু ঠেলা দিয়ে পুলিশ ভ্যানে ওঠবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। যাইহোক, এই 'তিনি' ভদ্রলোক হলেন এ রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এইরকম পরিস্থিতিতে উত্তেজিত বিরোধী নেতা বলে উঠলেন, 'don't touch my body.' I am male, জেন্টস পুলিশ ডাকুন'
আমার মতো বেকার মানুষ যাঁরা, তাঁরা কেউ কেউ এ বি পি আনন্দের সান্ধ্যকালীন "সঙ্গে সুমন" প্রোগ্রামের রাজনৈতিক তরজার আলোচ্য বিষয়গুলোর কাটাছেঁড়া কিভাবে হচ্ছে, সেগুলো দেখেন এবং সেখান থেকে অনেক ভাল-মন্দ খবর সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ হন। ফলে পরের দিনের আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় পাতা অর্থাৎ ৪ নং পাতা পড়লেই চলে যায়। আন্তর্জাতিক খবরের জন্য Statesman-এর ওপর ভরসা করতে হয়। আমি অন্তত তাই করি। গতকালের সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান রীতিমত উপভোগ করলাম। কুনাল ঘোষ, তাঁর নাটকীয় ভঙ্গিতে বলা সপ্তপদী সিনেমার ওই সংলাপকে প্রয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে রাজনীতির আঙিনাকে বেছে নিলেন এবং একাধিকবার ব্যবহার করে গেলেন। সঙ্গে কটাক্ষের সুরে জুড়ে দিলেন, "এ যেন সপ্তপদী রিভিজিটেড।" এর পরের মন্তব্য, "দেখলাম, তিনি পুরুষ তা ঘোষণা করে জানাচ্ছেন।" আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম এবং পাশাপাশি ভিডিও ক্লিপিংটাও দেখানো হচ্ছিল বলে বিশেষ কৌতুক বোধও করছিলাম। ডিজিটাল যুগেই এটা সম্ভব। নিজের অজান্তেই স্মৃতির সরণি বেয়ে কলকাতার পুরোনো দিনগুলোতে ফিরে গেছিলাম। কুনাল ঘোষের এই সংলাপে যে স্বতঃস্ফূর্ত স্বাচ্ছন্দ্য ছিল তাতে ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হ'ল কলকাতা তার পুরোনো ঐতিহ্য এখনও অনেকটাই ধরে রেখেছে। কলকাতা তথা বাংলার সব কিছু এখনও হারায়নি। দেশের অন্যান্য মেগা-মেট্রোগুলির তুলনায় কলকাতার জীবন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময়। অভাব-অনটনের মধ্যেও মানুষ রসবোধ হারিয়ে ফেলেনি। শহরটি উপমহাদেশের অন্যান্য মেট্রো শহরের তুলনায় সস্তা। রাজ্যে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ এখনও শক্তিশালী। দেশের সুশীল সমাজ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। বাংলার সমাজ এখনও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থাৎ inclusive, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চায়। মানুষ অনেক সহনশীল। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে এখনও রাজ্যের বিশিষ্টতা রয়েছে।
কিন্ত টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাজ্যবাসী হয়ে একটা অপরাধ বোধ কাজ করে যাচ্ছিল। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে মন্ত্রীর বান্ধবীর বাড়িতে বস্তা বস্তা টাকার কাঁড়ি, হিসেব বহির্ভূত অগুণতি অবৈধ সম্পত্তির মালিকানা, এগুলোও তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এসব ঘটনা দেশের অন্যান্য রাজ্যের কাছে আমাদের অনেকটাই খাটো করে দিয়েছে।
আমি একজন বরিষ্ঠ নাগরিক। এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমার করজোড়ে মিনতি, ম্যাডাম আপনি অনেক কিছু করেছেন, আবার বেশ কিছু জায়গায়, বিশেষত শিক্ষা ক্ষেত্রের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় আপনার তথাকথিত বিশ্বস্ত সৈনিকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে চোখ বুঝিয়ে থেকেছেন। দিনের শেষে কিন্ত দায়টা আপনারই। আপনি এমন কিছু একটা করুন যাতে বাংলা তার হৃতগৌরব ফিরে পায়। পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থায় ফিরিয়ে এনে যথার্থ এবং আদর্শ নেত্রীর দায়িত্ব পালন করুন। এটা আপনি পারেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আপনি ৩৪ বছরের শিকড় গেড়ে বসা বাম দুর্গে ফাটল ধরিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, যা কিনা ইংরেজদের ভারত থেকে বিতাড়নের মতোই দুর্ভেদ্য ছিল। তবে এ কথাও ঠিক যে বামেদের রাজত্বকাল কখনোই অর্থনৈতিক দুর্নীতির দোষে দুষ্ট নয়। এ কথা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও কেউ বলতে পারবে না। তবে সব রাজনৈতিক দলের আজ যত ঠ্যাঁঙাড়ের দল আছে তাদের আমদানির মূলে ছিল বামদুর্গ। ঠ্যাঁঙাড়ে সংস্কৃতি বামেদের অবদান বলেই আমার বিশ্বাস। যা লিখলাম সবটাই নিজের বিশ্বাস থেকে। কোনো বিতর্কে যাচ্ছি না।

No comments:
Post a Comment