ডাক বাক্স থেকে চুরির এক অভিনব উপায়
যে কোনও দেশের শহরে বা জেলায় চিঠি পোস্ট করার ডাকবাক্সগুলো সাধারণত ফুটপাথের উপর বসানো থাকে। মার্কিন দেশও পোস্টবক্স স্থাপনের স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে একই নিয়ম অনুসরণ করে। তবে ডাকবাক্সগুলোর চেহারায় কিছুটা ব্যতিক্রম চোখে পড়ে। এগুলোর চেহারার সঙ্গে ট্র্যাশ বিন বা ময়লা ফেলার জায়গার বিস্তর মিল। বড় ঢাকনা সমেত বিশাল একটা খোলা জায়গা আছে। ঢাকনাটাকে একটা ট্রে হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। জনসাধারণ ট্রেতে চিঠি, প্যাকেট ইত্যাদি রেখে আবার ঢাকা দিয়ে দেয়। আমেরিকানদের সব কিছুর বিশালত্বের সঙ্গে ডাকবাক্স গুলোর খোলা মুখও যথেষ্ট বড়, কারণ মার্কিনীদের প্রেরিত প্যাকেট বা পার্সেলগুলো তাদের চেহারার মতো হৃষ্টপুষ্ট। ফলে মেলবক্সগুলোতে এমন নাদুস-নুদুস প্যাকেট ঢোকার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয় (ছবিতে যেমন দেখানো আছে)। অথচ সারা আমেরিকা জুড়ে পুরোনো এই ডাকবাক্সগুলো বাতিল করে নতুন ডিজাইনের বাক্স বসানোর কাজ চলছে।
মার্কিন মুলুকে ফুটপাথের ধারে মেলবক্সপুরোনো লেটার বক্স প্রতিস্থাপনের প্রধান কারণ হল মার্কিন ডাক পরিষেবা "মেলবক্স ফিশিং" নামে একটি নতুন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের জনৈক একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে এমনই একটি খবর ছাপা হয়েছে। আমেরিকার ডাক পরিষেবা কর্মীদের একটা অংশ লক্ষ্য করেছেন যে রাস্তার পাশের মেইল বক্সগুলোতে চিঠি বা পার্সেলের প্রবেশ দ্বারের চতুর্দিকে আঠালো পদার্থে মাখামাখি হয়ে আছে। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে তথ্য উঠে আসে তা এরকম - মার্কিন মেইল বক্সের প্রবেশ পথের নকশা, অপরাধীদের চেক এবং মূল্যবান জিনিসপত্র বহনকারী প্যাকেটের মতো নথি সম্বলিত খাম বের করতে সাহায্য করে। পদ্ধতিটি সহজ : একটি খালি কাঁচের বোতল বা জুসের বোতলের মতো ভারী কিছুর সারা গায়ে আঠার প্রলেপ মাখিয়ে একটি দীর্ঘ দড়ি দিয়ে বেঁধে মেইলবক্সে প্রবেশ করিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বাক্সের ভিতর হাতড়ানো হয় এবং তারপরে এটি টেনে বের করা হয়। ভাগ্য প্রসন্ন হলে আঠা লাগানো শিশির গায়ে একটি খাম বা একটি ছোট প্যাকেট বা দুটোই আটকে থাকবে। খামের মধ্যে একটি চেক থাকার সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না কারণ চিঠি চালাচালির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় এখন একাধিক সোস্যাল মিডিয়া, ই-মেল থেকে শুরু করে হোয়াট্সঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম আরও কত কিছু। আর যদি প্যাকেট উঠে আসে, তার মধ্যে থাকতে পারে একটি দামী পারফিউম, একটি ঘড়ি বা এই জাতীয় অন্যান্য আকর্ষণীয় পণ্যসামগ্রী। চেক ভাঙানো যথেষ্ট ঝামেলাসাপেক্ষ। কারণ এজন্য উপযুক্ত সফ্টওয়্যার ব্যবহারে দক্ষতা ছাড়াও ব্যাঙ্কিং প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ। ছিঁচকে চোরের এত ঝামেলা নেওয়া পড়তায় পোষাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু অন্য যে কোনো পণ্য, উদাহরণে যেগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর যথেষ্ট কদর আছে। না হলে মাথা খাটিয়ে এমন অভিনব চুরির ফন্দি আসে !!
'মেইলবক্স ফিশিং' রোধ করতে, মার্কিন ডাক পরিষেবা এখন পুরানো ডাক বাক্সগুলোকে নতুন দিয়ে প্রতিস্থাপন করছে। চেহারায় এগুলো পুরানোগুলোর মতই। শুধুমাত্র প্রবেশ দ্বারের বিশাল খোলা পথের জায়গার পরিবর্তন করে, তা প্রতিস্থাপিত হয়েছে আয়তকার একটা সরু ফালি দিয়ে।
অ্যারিস্টটল একবার বলেছিলেন, "দারিদ্র্যই অপরাধের জনক"। অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান (anthropology) ইত্যাদির মতো একাধিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ শাখা ইঙ্গিত করেছে যে দারিদ্র্য এবং অপরাধ হাত ধরাধরি করে চলে। হতাশা এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি থেকে অপরাধের উৎপত্তি। দারিদ্র্যের দুটি প্রধান প্রকার রয়েছে। একটি হল পরম দারিদ্র্য যা বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম সংস্থানগুলির অনুপলব্ধতা থেকে উদ্ভূত হয়। অন্যটি হল আপেক্ষিক দারিদ্র্য যার মূলে রয়েছে আয়ের বৈষম্য। বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম সম্পদের অনুপলব্ধতার কারণে দারিদ্র্যের শিকার ব্যক্তিরা ডাকাতি, ছোটখাট চুরি ইত্যাদি অপরাধের কারণে জড়িয়ে পড়ে। কিন্ত আয়ের বৈষম্য থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিরা আরও আক্রমণাত্মক এবং সহিংস অপরাধে, যেমন খুন, নরহত্যা -এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এটা বেশ আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে একটি নিম্ন দারিদ্র্য সূচকের প্রতিনিধি আমেরিকার মতো দেশ, দারিদ্র্যের মাপকাঠিতে উচ্চ দারিদ্র্যযুক্ত দেশের অপরাধীদেরমতো আচরণ করছে ! শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে মার্কিন ডাক পরিষেবা বিভাগ মেলবক্সগুলি প্রতিস্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
সমস্ত ঘটনাটা কাটাছেঁড়া করে বিচার করলে যে ব্যাপারটা স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে তা হল অপরাধ সর্বজনীন এবং অপরাধীদের কোনো বিশেষ জাত-ধর্ম বা ভৌগলিক সীমারেখা থাকে না। সুযোগ থাকলে মানুষ যে কোনো জায়গায় একই আচরণ করবে। অপরাধী অপরাধ প্রবণতার তাগিদে অপরাধ সংঘটিত করে। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হল শৈশবস্থা থেকে মানুষের মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ গড়ে তুললে সমাজ তা অনুসরণ করবে, সেটা প্রাচ্যে বা পশ্চিমে যেখানেই হোক না কেন।

No comments:
Post a Comment