Thursday, March 9, 2023

নতুন আঙ্গিকে ফটো অ্যালবাম

                   অভিনব ভাবনার ফটো অ্যালবাম 


এ বারের দোলের দিনটা, বিগত ৫১ বছরের দোল পূর্ণিমার থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। দিনটা ছিল ৭ই মার্চ, আমাদের বিবাহের দিন। গত বছর আজকের দিনের রেশটা মিলিয়ে যাবার আগেই উচ্ছ্বাস আবার আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল। নাতনির পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে, নাতির অ্যানুয়াল পরীক্ষা চলছে। সেই ভেবে ছেলে-বৌকে বলেছিলাম যে সন্ধ্যেবেলা এ-বাড়িতে মানে ছায়ানীড়-এ চলে আসবি; চা-টা খেয়ে একেবারে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে যাবি। নাতিবাবুও  একটু relaxed mood-এ থাকবে। সেই মতো ঠিকঠাক ছিল। ওমা! প্রতি বছরের মতো সকাল সাড়ে দশটায় এবারও সদলবলেই  হাজির, সঙ্গে দু'জনের হাতে দু'রঙের আবিরের প্যাকেট। যথারীতি বাবা-মা'র পায়ে আবির ছুঁয়ে প্রণাম সেরে, বলল, "Happy Anniversary Ma-Baba"; পরক্ষণেই নাতি-নাতনির সংযোজন, "Happy Anniversary Dadai-Amma". পরের মুহূর্তটার জন্য ঠিক মানসিক প্রস্তুতি ছিল না " তোমাদের দু'জনের ৭ই মার্চের উপহার। আমি একটা কপট বিরক্তির সুরে বললাম, "এ-বয়সে এত বড় একটা ব্যাগ কোন কাজে লাগবে !" ওরা সমস্বরে বলল, "খুলেই দেখনা"।

প্রথমেই বলে রাখি যে আমার মতাদর্শের মানুষের প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়ার মধ্যেই। অথচ প্রায় সব মানুষের মধ্যেই সব কিছু পাওয়ার জন্য কী প্রচন্ড ছুটোছুটি। সে কারণে আজকের সমাজের সঙ্গে নিজস্ব কল্পিত সমাজকে ঠিক মেলাতে পারিনা। অনেক দামি উপহার নিয়ে খুসী থাকা আমার একেবারেই অপছন্দ। যথার্থ কারণেই একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে গিয়ে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির জন্ম হয়েছে। ভাল কথা। কিন্ত ছোট ইউনিটের প্রত্যেকটি, মূল পরিবারের নিয়মগুলোকেও এমনভাবে পরিবর্তন করে ফেলেছে যে মনে হয় আজকের সমাজের কোনো গোটা চেহারা নেই, সে খন্ড, ছিন্ন, টুকরো টুকরো।পারস্পরিক মূল্যবোধ তলানিতে এসে ঠেকেছে। আমি ওই টুকরোগুলোর একটা ভগ্নাংশমাত্র। এটুকুই বলতে পারি এ সমাজ হালভাঙা, খাপছাড়া।

আত্মীয় পরিজন সবাইকার সাথে আমার সামাজিক আদান-প্রদান আছে। কিন্ত তবুও কে জানে কোথাও একটা দূরত্ব আছে। কোথাও একটা অনন্ত ব্যবধান। সেটাই ধরা পড়ে যায় সামাজিক অনুষ্ঠানে। আসলে একমাত্রিক পরিচয় আমাদের বড়ই প্রিয়। কিন্ত মূর্খ মানুষগুলো জানে না যে সেই পরিচয়ের ব্যাপ্তি কোনোদিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আজকাল যে কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে, বিশেষ করে তথাকথিত আত্মীয়স্বজনের অনুষ্ঠানে যাওয়া মানে একটা বিড়ম্বনা। নিমন্ত্রণ করার ধরন, নিমন্ত্রণ পত্রের চাকচিক্য থেকে শুরু করে ভূরিভোজের আয়োজন পর্যন্ত একেবারে ত্রুটিহীন, বরং একটু বাড়াবাড়ি রকমের ত্রুটিহীন। ত্রুটি শুধুমাত্র আপ্যায়নের জায়গায়। অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি তো দূরের কথা, বৃহত্তর পরিবারের বৃত্তে অগ্রজ বলে যাঁরা র্স্বীকৃতি পেয়েছেন, নিমন্ত্রণপত্র পত্র পাবার আগে পর্যন্ত, অনুষ্ঠানের আসরে পৌঁছেই তাঁরা বুঝতে পারেন তাঁদের গুরুত্ব ওই আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণপত্র পাওয়া পর্যন্তই। অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তি কেবল নিজেদের ছোট্ট গন্ডীর সস্যদের মধ্যেই। অন্তত আজকের আধুনিক যুগের মোবাইল ক্যামেরার ঝলকানি যখন সব কিছুই বন্দি করে রাখতে সক্ষম, আর সেই ক্যামেরার ছবিগুলো যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় তার সাক্ষী বয়ে় বেড়ায় তখন আন্তরিকতার নিরিখে নিজের অবস্থান বুঝতে অসুবিধে হয় না।  আর সেখানেই আলাদা আমাদের ছেলে-বৌ। নিজেদের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিদের সর্বদা তাদের তীক্ষ্ণ নজর। কারণ খাওয়া-দাওয়া ছাড়াও অতিথিদের সবাই যে ওই অনুষ্ঠানের  অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ- সেই অন্তর্ভুক্তির উপলব্ধি, যাকে বলে sense of inclusivity, সেটা তাদের মধ্যে সব সময় কাজ করে চলে। এটা ওদের আমরা কোনোদিন শিখিয়ে দিইনি, শৈশব থেকে  বড় হয়ে ওঠার পরিবেশ থেকে সেগুলো ওরা সংগ্রহ করে নিয়েছ এটাই দস্তুর হওয়া উচিত বলেই আমার মনে হয়। আসলে এটাকেই বলে পরম্পরা।


অ্যালবামটা হাতে পেয়ে মিঞা-বিবি, দু'জনে মিলে মনের আনন্দে  বেশ কয়েকবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে  মনে হল ভেতরের ছবিগুলোর বিন্যাসের ব্যবস্থা, অনেক পরিশ্রম এবং ভাবনা চিন্তার ফসলে পরিপুষ্ট। পরে জিজ্ঞেস করে জেনেছি যে ওরা দু'জন ছাড়াও নাতিবাবু, পরীক্ষার পড়া করার ফাঁকে ফাঁকে এ ব্যাপারে মা-বাবাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমন্ত্রিত অতিথিদের সংখ্যা ছিল কম-বেশি ২০০ জন। প্রত্যেকটি ছবিতে যে মুখগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মনে হবে তাঁদের উদ্দেশ্যেই অর্থাত তাঁদের গুরুত্ব দিয়েই ছবিগুলো তোলা হয়েছে। কারণ ফোকাসে একমাত্র তাঁদেরই উপস্থিতি, বিক্ষিপ্ত দূরে কেউ দাঁড়িয়ে বা বসে আছেন, তেমন নয়। কাজেই বুঝতে অসুবিধে হয় না যে অতিথি আপ্যায়নে ওরা কোনো ত্রুটি রেখেছিল। এমনটাই তো হওয়া উচিত। এই লেখাটা ওদের উৎসর্গ করেই লেখা এবং একই সঙ্গে আমাদের দু'জনের তরফ থেকে চমৎকার একটা উপহার গ্রহণের স্বীকৃতির দলিল। বাড়িতে ভবিষ্যতে যাঁরা আসবেন, তাঁদের সবাইকে উপযাচক হয়ে অ্যালবামটি দেখিয়ে মুখ মিষ্টি করিয়ে বিদায় জানাবো। বলাই বাহুল্য, ছেলে-বৌ এর নামে প্রশংসা কুড়োবার অভিপ্রায়ে নয়। এই অ্যালবামটা আসলে আমাদের কাছে একটা অমূল্য অলঙ্কার। 

No comments: