এথিক্স বা নীতিশাস্ত্র
আজকের পৃথিবীর প্রায় সর্বক্ষেত্রেই, ব্যাপকভাবে নেতিবাচক কার্যকলাপে বিদীর্ণ: ব্যাপক দুর্নীতি, জালিয়াতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি থেক শুরু করে জাতীয় সম্পদের পাচার, মানব পাচার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস, বিশ্ব উষ্ণায়ন; ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই গ্রহের মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশের আজ সবচেয়ে বড় ধ্বংসকারী। মানুষের অস্তিত্ব, শান্তি এবং পরিশেষে বিশ্বের বেঁচে থাকা আজ নিজেই হুমকির মুখে।কেন এই সুন্দর পৃথিবীতে এটা ঘটানো হবে? গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, এসবের মূল কারণ হলো নৈতিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার সম্পূর্ণ ভাঙ্গন।
যেহেতু ভারতের মতো দেশের অর্থনৈতিক রূপরেখা বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ মাথায় রেখেই চূড়ান্ত করা হয়, কর্পোরেট দুনিয়ার হাতে গোনা গুটিকয়েক মানুষ, দেশের তথা সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কান্ডারীর ভূমিকা পালন করেন। বলাই বাহুল্য, কর্পোরেট দুর্নীতিই হ'ল এদেশের যাবতীয় অর্থনৈতিক দুর্নীতির উৎসস্থল। তাঁরা তাঁদের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য, রাজনৈতিক-পুলিশ-অপরাধী ~ এই ত্র্যহস্প্রশের কায়েমী স্বার্থের সম্পর্ক ব্যবহার করে, এবং রাজনীতিবিদ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের ক্রয় করে। এই ব্যবস্থা ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে, সব দেশের জন্য প্রযোজ্য, এমনকি এই গ্রহের ধনীতম দেশ আমেরিকার জন্যও। আমেরিকার একটা পরিসংখ্যান দিলেই ব্যাপারটা বুঝতে পারা যাবে। ওদেশে প্রতি ১০০ জন ষানুষের জন্য বরাদ্দ ১১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র। কারণ ঐ দেশটির কর্পোরেট জগতের কুশীলবরা হ'ল হয় মূলত অস্ত্র ব্যবসায়ী, নয় ওষুধ ব্যবসায়ী অথবা পেট্রপণ্য ব্যবসায়ী। তারাই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং এদের কায়েমী স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে গরীব দেশের মতো ওদেশের বা পশ্চিমী অন্যান্য দেশের মানুষজনের তো গরিব দেশের মানুষের মতো এমন দৈন্যদশা নয়! একেবারেই অকাট্য প্রশ্ন। তফাত এক জায়গাতেই, তা হল অর্থনৈতিক দুর্নীতি ওখানে ব্যাপক আকার ধারণ করেনি, কারণ নিয়ম কানুন খুবই আঁটোসাটো এবং সর্বস্তরেই প্রসাশনিক নিয়ন্ত্রণের স্বাধীন প্রভাব। ফলে দুর্নীতি করতে হলেও অনেক ছাঁকনির মধ্যে দিয়ে দুর্নীতির শিকড়কে গলে যেতে হবে। দুর্নীতির কারবারিদের এত দম নেই! তাঁরা Physics এর নিয়ম মেনে path of least action- এর পক্ষপাতি। আমাদের মতো দেশে সেই পথটা হ'ল সরাসরি ওপরের সারির ২/১ জনের শরণাপন্ন হওয়া।
এদেশে যখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন স্টেকহোল্ডার অর্থাত ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষরা নিজের স্বার্থেই পাল্লা দিয়ে আরও বেশি সচেতন হচ্ছে এবং ব্যবসার সমস্ত কিছুকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। এছাড়া ব্যবসাগুলোর নৈতিকতার দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করার জন্য শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ, দেশের শাসক, সরকারের বিরোধীগোষ্ঠী, এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা বেড়ে চলেছে।
এ ব্যাপারে বিখ্যাত কয়েকজনের উক্তি খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। পাঠকের কাছে সেগুলো তুলে ধরছি।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অন্যতম দার্শনিক, ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন যে এই বিশ্বে বা বাইরের জগতে 'বিশুদ্ধ শুভেচ্ছা' ছাড়া কোনও নীতিবোধ নেই যা ব্যক্তিগত নিঃশর্ত দায়িত্ববোধের বাধ্যতামূলক আচরণ থেকে আসে। কান্টের মতে, চার্চ বা ঈশ্বরের কাছে কোনটি তাঁর সঠিক, কোনটিই বা ভুল তা বলার প্রয়োজন নেই। মানবিক মর্যাদা, যৌক্তিকতার ধারাবাহিকতা, সার্বজনীনতা, কর্তব্য, নিঃশর্ত ভালবাসা এবং সদিচ্ছা কান্টিয়ান নীতিশাস্ত্রের বৈশিষ্ট্য।
নৈতিক মূল্যবোধগুলি যুক্তিযুক্ততা, বিনম্রতা এবং কৃতজ্ঞতার অনুভূতিকে সম্মান করে। যতক্ষণ না একজন ব্যক্তি, তাঁর নিজের ক্ষুদ্রতম সত্ত্বা উপলব্ধি করে এবং বুঝতে না পারে যে সে তার এইটুকু অস্তিত্বের জন্যও কীভাবে অন্যের কাছে ঋণী, সে নৈতিকতাকে জীবনের দর্শনে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় নম্রতা বিকাশ করতে পারে না।
আলবার্ট আইনস্টাইন, মহান বিজ্ঞানী-দার্শনিক, তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা বোধের স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন, দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ আই সি ইট (মূলত জার্মান ভাষায় লেখা), তাঁর লেখা বইটিতে, আইনস্টাইন লিখেছেন: "প্রতিদিন একশবার আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিই যে আমার অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের জীবন, জীবিত এবং মৃত অন্য পুরুষদের শ্রমের উপর নির্ভর করে এবং আমাকে অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে যাতে আমি যেভাবে পেয়েছি এবং এখনও পাচ্ছি সেই পরিমাপে ফিরিয়ে দিতে হবে। আমি সাধারণ জীবন যাপনের পক্ষপাতী এবং প্রায়ই এই অনুভূতি দ্বারা নিপীড়িত হই যে আমি আমার সহকর্মীদের শ্রমের অনেকখানি আত্মসাৎ করছি নিষ্প্রয়োজনে।"
আইনস্টাইন আমাদের অস্তিত্ব এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্যে বলেছেন: ~ পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব ক্ষণস্থায়ী এবং আশ্চর্য হয়েছিলেন এবং নিশ্চিত ছিলেন যে আমরা নিজেদের জন্য নয়, অন্যদের জন্য বিদ্যমান। তিনি লিখেছেন: কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে, গভীরে না গিয়ে, আমরা আমাদের সহপুরুষদের জন্য বিদ্যমান ~ প্রথম স্থানে যাঁদের হাসি এবং কল্যাণের উপর আমাদের সমস্ত সুখ নির্ভর করে এবং একই সঙ্গে তাঁদের জন্যও যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের কাছে অজানা; যাঁদের ভাগ্যের সঙ্গে আমরা সহানুভূতির বন্ধনে আবদ্ধ"। বিখ্যাত মানুষদের এই উক্তিগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে তাঁদের বিদ্রোহের ইঙ্গিত।
আব্রাহাম লিংকন একবার উল্লেখ করেছিলেন, পুঁজি হল শুধুমাত্র শ্রমের ফল, এবং শ্রম যদি প্রথম না থাকত তাহলে তা কখনোই থাকত না।
ডক্টর বি আর আম্বেদকর 25 নভেম্বর, 1949-এ তাঁর সমাপনী বক্তৃতায় সতর্ক করেছিলেন, "আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে কতদিন সমতাকে অস্বীকার করতে হবে? যদি আমরা এটি খুব বেশি সময় ধরে চালিয়ে যাই, তাহলে আমরা কেবল আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্রের মধ্যে রেখেই তা করব৷ আমাদের এই দ্বন্দ্বকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূর করতে হবে, অন্যথায় যাঁরা বৈষম্যের শিকার, তাঁরা একদিন এত পরিশ্রম করে গড়ে তোলা গণতন্ত্রের এই কাঠামোকে ধ্বংস করে দেবে।
নীতি ও নৈতিক মূল্যবোধের অনিয়ন্ত্রিত অবক্ষয়ের কারণে আমরা অহরহ আজ উদ্বেগের মধ্যে কটাচ্ছি। মানুষের দুর্বলতার আধিক্য প্রকাশ পেয়েছে। ভারতবর্ষের সাফল্যের তালিকাটা খুব খারাপ না হলেও ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে এই সাফল্যের শরীর জুড়ে অনেক ক্ষত। আমরাও যে ব্যক্তিগত ক্ষমতার স্বপ্নপূরণের অংশীদার হতে চেয়ে আত্মঅবলুপ্তির ইচ্ছা করতে থাকছি অহরহ, যাকে বলে one upmanship, প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংসারিক- যাই হোক না কেন, সেটা স্পষ্ট।
একটি বিষণ্ণ ছবি আঁকা কিছু অনৈতিক বিষয় এবং অনুশীলন যা ব্যবসা এবং কর্পোরেটকে কলঙ্কিত করে তা দিবারাত্র টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠছে আর তাই নিয়ে অপযুক্তি এবং তার উল্টো প্রত্যুত্তর প্রমাণ করে চলেছে যে আমরা এক লোভী এবং নিষ্ঠুর বিশ্বে বাস করছি। অবশ্য সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের লাভ হল যে এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আমরা সচেতন হচ্ছি যাতে ভবিষ্যতে প্রতারণার শিকার না হই। ভাল কর্পোরেট শাসনের জন্য সরকার আইন প্রণয়ন করেছে এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাঁরা তাঁদের কাজ যদি করে যান, তাহলে সাধারণ মানুষের হয়রানি হয় না।
কিন্তু সরকারই যদি নিজেদের "লাভের সর্বাধিকীকরণ"এর জন্য নিজের দেশের মানুষকে প্রতারণা করে চলে, তাহলে সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি অনিবার্য।
যে কোন কর্পোরেট বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেহেতু ব্যক্তির একটি সংস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়, তাই ব্যক্তির নৈতিকতা বা নৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্নটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি রাখে। একটি দেশের গৌরব পরিমাপ করা হয় জনসংখ্যার আকার দিয়ে নয়, তার গুণ বা চরিত্র দিয়ে। একটা পরিবারের জন্যও একই নিয়ম খাটে। যেমন একটা ছোট্ট পরিবারের বাবা মা ছেলে মেয়ে~ সবাই মস্ত পন্ডিত এবং রীতিমত স্বচ্ছল পরিবার, কিন্ত সবাই ভীষণভাবে অনৈতিক এবং পক্ষপাতদুষ্ট। এমনকি ছোট্ট পরিবারটির সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেও সব সময় একটা ঠান্ডা লড়াই চলছে। পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে আজ আমাদের অটুট নৈতিক সততার লোকদের প্রয়োজন। তার প্রথম ধাপটা শুরু হয় পরিবার থেকেই।
আধ্যাত্মিকতা ছাড়া জীবন সুখী ও শান্তিময় হতে পারে না। আমাদের বস্তুগত উন্নতির প্রয়োজন অনস্বীকার্য কিন্ত আধ্যাত্মিক উন্নতির পরিসরকে বাদ দিয়ে নয়; যার অর্থ মানুষের মধ্যে দেবত্বের উপলব্ধি। ভারত ঋষিদের দেশ, আধ্যাত্মিকতার দেশ; ত্যাগ, প্রেম, করুণা ও সেবার দেশ।আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে উচ্চ আদর্শ পেয়েছি। সেটা বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।

No comments:
Post a Comment