পুস্তক পরিচয়
দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের, "তবু পেশাগত গবেষনার মধ্যে তাঁকে পাওয়া যাবে না" ০৯/০৯/১৯৯৫ তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। ভাইকিং প্রকাশিত সদ্য প্রয়াত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় বিজ্ঞানী, এস চন্দ্রশেখরের লেখা, "ট্রুথ অ্যান্ড বিউটি" বইটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে দীপঙ্করবাবু শেষের দিকে দু'একটি অনাবশ্যক বাক্য সংযোজন করেছেন, যার মধ্যে না আছে বিউটি না পুরোপুরি ট্রুথ। বইখানার চতুর্থ অধ্যায়ে নাকি বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ফরাসী গণিতজ্ঞ, পোঁয়াকারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, বিজ্ঞানী যে প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করেন সেটা এই কারণে নয় যে ব্যাপারটা মানুষের কাজে লাগে। বরং এই কারণে যে এতে তিনি আনন্দ পান। দীপঙ্কর বাবুর সংযোজন, "কথাটা মনে রাখার মতো। কারণ এদেশে ছেলে-বুড়ো, সকলের মুখেই আমরা ক্রমাগত বিজ্ঞানের উপকারিতা (অথবা অপকারিতার) কথা শুনে থাকি। ওগুলো আসলে ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্যবসায়ীদর কথা ('সাথে টু পাইস ভি আসবে'),বিজ্ঞানীর নয়।"
আসলে পোঁয়াকারে, চন্দ্রশেখর বা ঐ স্তরের বুদ্ধিজীবী মানুষদের গবেষণার ধারণাকে বলা হয় কিউরিওসিটি ড্রিভেন রিসার্চ, যে সব কিউরিওসিটি বা অনুসন্ধিৎসার শিকড় চারিয়ে গেছে মননশীলতার অনেক অনেক গভীরে। নিজস্ব প্রতিভা এবং ধারাবাহিক কঠোর অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে তাঁরা কিউরিওসিটিকে পোষ মানিয়েছেন। তাঁরা এটাও জানেন যে এই জাতের রিসার্চের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের নানান ধরনের বীজ যা দক্ষ হাতের লালনপালনে একদিন ফল দেবে এবং সেটা মানুষের উপকারে আসবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এভাবেই হাত ধরাধরি করে চলে। তাছাড়া ঐসব ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষেরা পেশাগত উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে তাঁদের উপলব্ধির কথা বলেছেন। সুতরাং তাঁদের আনন্দ ও উপলব্ধির মৌলিকতা আর যে কোনও দেশের রাম, শ্যাম, যদু বা দীপঙ্কর বাবুদের মতো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির স্বভাবসিদ্ধ স্বয়ম্ভু আত্মম্ভরি বিজ্ঞানীদের বাস্তববর্জিত বিজ্ঞান সাধনার আনন্দস্ফূর্তি এক জিনিস নয়। গুটিকয়েক ব্যতিক্রম বাদ দিলে শেষোক্ত শ্রেণীর সিংহভাগ বিজ্ঞানীর আনন্দ সীমিত থাকে প্রথম সারির মানুষদের সূত্র ধরে হিসেব-পত্র করা কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশনার মধ্যে। স্বপক্ষ যুক্তি হিসেবে পল ডিরাকের একটি সরস মন্তব্যের অবতারণা করছি : "....It was a good description to say that it was a good game, a very interesting game one could play. Whenever one solved one of the little problems, one could write a paper about it. It was very easy those days for any second-rate physicst to do first rate work...." কাজেই এটা খুবই পরিষ্কার যে, মননশীলতার রকমভেদে প্রকৃতি অধ্যয়নের আনন্দেরও রকমভেদ আছে। হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স আবিষ্কৃত হওয়ার অব্যবহিত পরেই সেটাকে ব্যবহার করে অনেক বিজ্ঞানী ছোটখাট বহু সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পান। আমার মনে হয় তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো নিজেকে হাইজেনবার্গ ভেবে বসেছিলেন । তাই বোধহয় ডিরাকের ওই সরস মন্তব্য। যাইহোক, এ দেশের কচিকাঁচা থেকে শুরু করে ছেলে-বুড়ো-সবাই ক্রমাগত বিজ্ঞানের উপকারিতার কথা যে যানতে চান, তার কারণ, বোধহয় তাঁরা আজীবন শুনে আসছেন, "বিজ্ঞানের সাধনার ফসল সাধারণ মানুষের জীবনের মানকে উন্নত করে। দেখে শুনে তাঁরা ধন্ধে পড়ে যান যে বিজ্ঞান সাধনার আনন্দে মশগুল বিজ্ঞান সাধকরা ঘনঘন দেশে-বিদেশে ঘুরে সেমিনার সভা এবং পকেট গরম করে নিজেদের বেশ রসেবশেই রেখেছেন, অথচ দেশের সাধারণ মানুষের সার্বিক হাল যেখানে ছিল, তার থেকে আরও অনেক নেমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্যানুযায়ী মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index) বলছে যে ১৭৪ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩৪।
আলোচনা করা যাক ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ীদর কথায়। টু-পাইসের জন্য ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসাদার হবার দরকার আছে কি ? ভাল নম্বর পাইয়ে দেবার প্রচেষ্টায় পাড়ায় পাড়ায় যে সব প্রাইভেট কোচিং সেন্টারগুলো গজিয়ে উঠেছে, সেগুলো কি নিঃস্বার্থ বিদ্যা বিতরণের জন্য ? যাইহোক, এর মধ্যে অন্যায়ের কিছু দেখছি না। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষ টু-পাইস করবে, এর মধ্যে বলার ই বা কী আছে ! আর তাছাড়া কমার্সিয়াল ওয়ার্ল্ডের ভোগবাদী অপন্ডিত মানুষরা যখন প্রকৃতি অধ্যয়নের গরিমময় সৌন্দর্য ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত, তখন তাঁদের একটা কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে। তাই শিল্প-বাণিজ্যের চাকা সচল রাখার দায়িত্ব তাঁরাই নিয়েছেন। কারণ সেটি না করলে এদেশের কাতারে কাতারে পন্ডিতদের বাস্তব বর্জিত মৌল বিজ্ঞান অধ্যয়নের আনন্দের খোরাক আসবে কোত্থেকে ? আসলে তথাকথিত বিজ্ঞান মনস্ক উচ্চশিক্ষিত এক ধরণের মানুষের মধ্যে দু'দুটো কাল্পনিক সত্ত্বা সহাবস্থান করে। উন্নততর সম্প্রদায়ভুক্ত মনে করে তাঁরা নিজেদের গুটিয়ে এনেছেন এমন একটা বৃত্তের মধ্যে যেখানে তাঁরা এক একজন মনে করেন আইনস্টাইন। আবার কর্পোরেট পৃথিবীর ব্যস্ততা আর গ্ল্যামারের মোহকেও উপেক্ষা করতে পারেন না। সেখানেও তাঁরা এক একজন রুশী মোদী। আমার মনে হয় এটা এক ধরনের বিকার যাকে বলা হয় অ্যালবার্ট-মোদী সিনড্রোম।
যাইহোক, একটা উঁচু জাতের ব্যবসার পথ আমার জানা আছে, যেটা একমাত্র বিজ্ঞানীরাই করতে পারেন। পৃথিবীর বিখ্যাত বেশ কিছু বিজ্ঞানীরা আজকাল পপ্যুলার সায়েন্সের বই লিখছেন, যেগুলো বেস্ট সেলার লিস্টের তালিকাভুক্ত থাকছে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর এবং তাদের কাটতিও হাজারে হাজারে। দুরূহ বিজ্ঞানকে চিন্তাশীল অবৈজ্ঞানিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য তাঁদের শতকোটি প্রণাম। বিজ্ঞানকে তাঁরা মনোপলি বলে ভাবেননি। তবে নিজেদের সৃষ্টির ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা তাঁরাও ভেবেছেন বৈকি। স্বপক্ষ যুক্তি হিসেবে Stephen Hawking-এর একটি মন্তব্য পাঠকের কাছে তুলে ধরছি। Hawking সাহেবের লেখা A brief history of time বইটির Acknowledgement-এ উনি মন্তব্য করেছেন, "....Someone told me that each equation I included in the book would halve the sales. I therefore resolved not to have any equation at all....." আমার প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে আন্তরিক অনুরোধ- আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা কেন এই ধরনের বই লিখছেন না ?? তা করলে সব দিক বজায় থাকবে। একাধারে তিনি বিজ্ঞানীও থাকবেন, আবার টু-পাইস করেও অনুন্নত এবং নির্বোধ গোষ্ঠীভুক্ত ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসাদারের বদনাম বহন করতে হবে না এবং প্রকৃতি বুঝতে পারার আনন্দের কিছুটা চিন্তাশীল ফসল অবৈজ্ঞানিক মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে পারবেন। হয়তো বা নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান অধ্যয়নে উদ্বুদ্ধ করতেও পারবেন যাতে তারা ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ারিং বা ব্যবসার পথ না মাড়ায়। অকারণ অনাবশ্যক মন্তব্য করার আগে আমার মনে হয় ভেবে দেখা উচিত, যে সেটা সিরিয়াস, রুচিসম্পন্ন এবং মাটির অনেক কাছাকাছি থাকা বিজ্ঞানীদের ভাবমূর্তি যাতে খাটো না করতে পারে, যদিও বাস্তবজগতে তাঁরা অন্যান্য পেশার মানুষের সামাজিক ভূমিকা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। তাঁরা এমন কথা বলেন না।

2 comments:
very apt comment which should have been published by ABP as the uncalled for insult to engineers and businessman should have been given a rightful, if not, required chance to be defended!! Of course, that would again mean acknowledging the unscientifically composed addition of the said author of the article to the scienticific quotation of Poincare related to research of nature in the most fundamental form. Personally, I will say that till the time literate beings will differentiate between engineering and science and their categorization further downstream and cannot look into the study of nature and applications of the study as a single discipline, this conflict will continue!! I have often observed that people defines engineering as applied science and science as a subject further abstract. But they have to simultaneously realize and appreciate abstraction in any engineering model and the applicability of scientific theories. Then only will they understand the need of any research, be it curiosity driven or driven towards a definite goal. The wise understands that engineering to advance scientific studies and scientifically crafting a technical wonder, both require both the disciplines. But the insecured will vainly justify the superiority of their chosen field over others for the sake of establishing themselves supreme, a primitive attitude that is supposed to be eradicated by virtue of education as we evolve culturally and refine socially।
Post a Comment