স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, আবুল কালাম আজাদ- দু'চার কথা।
"ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখায় ব্রতী আবুল কালামের নাম তেমন শোনা যায় না।" আজ রাজৈনতিক অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের ফলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা যখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে, সেখানে আবুল কালামের নামটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং আজাদের বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানোর তাগিদ অনুভব করছি।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের অবস্থান ছিল ঔপনিবেশিকতার ছত্রছায়ায়। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে আজাদ ঐ দেশগুলোতে যান এবং সেখানে ক্রীস্টান মৌলবাদী সমেত তুর্কী ও আরব জাতীয়তাবাদী যুবসম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আশ্বাস দেন যে ভারত কিভাবে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শরিক হতে পারে। ফিরে এসে ১৯১২ সালে স্বধীন রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে 'আল-হিলাল' নামে তিনি একটি পত্রিকার সৃত্রপাত করেন। দুবছরের মধ্যেই পত্রিকাটি এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে সংখ্যার নিরিখে সেটির প্রচার তিরিশ হাজারে পৌঁছে যায়। ফলে আজাদ ইংরেজ সরকারের চোখ রাঙানির শিকার হন এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত আইনের উপযুক্ত ধারায় আজাদকে গ্রেপ্তার করে রাঁচি কারাগারে পাঠানো হয়। পত্রিকা প্রচার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার ছাপাখানাটিও বাজেয়াপ্ত করে। রাঁচি কারাগারে তিনি অকথ্য অত্যাচারের শিকার হন। জেল থেকে মুক্তির পরেই তিনি শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করতে থাকেন। এই প্রবন্ধগুলোর সারাংশই আগে আল-হিলাল পত্রিকার বিভিন্ন সংস্করনের সম্পাদকীয় হিসেবে প্রকাশিত হতো।
আল-হিলাল পত্রিকার ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করার পরেও আজাদ থেমে থাকেননি। 'আল-বালাগ' নামে তিনি আরও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনায় ব্রতী হন। কিন্তু বেশিদিন চালানো সম্ভব হয়নি। ইংরেজ সরকারের কতৃত্ববাদের কদর্য হাত যে কতদূর প্রসারিত হতে পারে, সেটা আজাদ আন্দাজ করতে পারেননি। আজাদ গৃহবন্দী হন এবং খুব শিগগিরি দ্বিতীয় বারের জন্য কারাবরণ করেন । এবারে সুদীর্ঘ চার বছরের জন্য। ১৯২০ সালে, জেল থেকে বেরিয়ে উনি মহাত্মা গাঁধী এবং লোকমান্য তিলকের সাক্ষাৎ পান। এই সাক্ষাৎ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তাঁর চোখে কংগ্রেসের এই দুই নেতা ছিলেন হিমালয় সদৃশ।
ঊনিশশ সাতচল্লিশে দেশভাগের অব্যবহিত পরেই দিল্লীর হাজার হাজার মুষলিমের পাকিস্তানমুখি হবার আঁচ পেয়েই আজাদ জামা মসজিদের প্রাচীর ববাবর সুউচ্চ ঢিবি থেকে যে বক্তৃতা করেন তার জেরে আবেগতাড়িত মুষলমান সম্প্রদায় তল্পিতল্পা গুটিয়ে রাতারাতি ভারতমুখি হয়। এই বক্তৃতা ১৮৮৭ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ বক্তৃতার সঙ্গেই তুলনীয়। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি কতটা আন্তরিক ও দায়বদ্ধ হলে এমন একটা বক্তৃতার পরিকল্পনা করা যায়।
স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সাল থেকে আজাদ ব্রতী হন। প্রথমেই তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্ক মন্ত্রনা পরিষদ্ (ইন্ডিয়ান কাউনসিল অব কালচারাল রিলেশনস্)। ১৯৫৩-৫৪ সালে তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয় তিনটি জাতীয় অ্যাকাডেমি, সঙ্গীত-নাটক, সাহিত্য এবং ললিতকলা অ্যাকাডেমি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্দিষ্টি শিক্ষার মান বজায় রাখতে আর্থিক অনুদান বরাদ্দ করার উদ্দেশ্যে, ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, তাঁরই মস্তিষ্কপসূত।
সামাজিক অবস্থান নির্বশেষে ব্যক্তিগত স্তরে মানুষের প্রতি আবুল কালামের দায়বদ্ধতার একটা নজির দিচ্ছি। দেশ ভাগের সময় ভারতীয় রেলের আবদুর রহিম নামে এক খালাসী, পাকিস্তানে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় এই সর্তে, যে ছ-মাসের মধ্যে ভারতে ফিরলে তার চাকরি বহাল থাকবে। বলাই বাহুল্য যে পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেখে চার মাসের মধ্যেই তার পাকিস্তানে স্থায়ী বসবাস করার স্বপ্ন ভঙ্গ হয় এবং সে ভারতে ফিরে আসে। কিন্তু তার চাকরির সর্ত অস্বীকার করা হয়। সংস্লিষ্ট দপ্তরে বছরখানেক চিঠি চালাচালি করার পরেও সমস্যার কোনো সুরাহা না হওয়ায় আবদুর রহিম আজাদের দ্বরস্থ হন। কাল বিলম্ব না করে আজাদ, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে একটা চিঠি লেখেন এবং লাগাতার প্রয়াস চালিয়ে যান। বেশ কিছু বছর বাদে রহিম চাকরিতে বহাল হন।
অনাড়ম্বর জীবনদর্শনে বিশ্বাসী আজাদের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহারের দেরাজ খুলে উদ্ধার হয় কয়েকটি সূতির আচকান, গোটাকতক খাদির কুর্তা এবং পাজামা আর পায়ের দুজোড়া চপ্পল। আর পাওয়া যায় সারা জীবনের সংগ্রহ করা বিরল কয়েকশ বই, যেগুলো এখন জাতীয় সম্পত্তি হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
1 comment:
ওনার সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। আপনার লেখার মাধ্যমে জানতে পারলাম।
Post a Comment