রতন নভল টাটা
কিছুটা বংশ পরিচয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রিজমে আগে মানুষটিকে আমরা চিনে নিই। রতন নভল টাটা ছিলেন নেভাল টাটার (তলায় ডানদিকের ছবি) ছেলে, যাকে টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটার ছেলে রতনজি টাটা (তলায় বাঁ দিকের ছবি) দত্তক নিয়েছিলেন। তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ আর্কিটেকচার থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এবং ১৯৭৫ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল অ্যাডভান্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে যোগদান করেছিলেন।
একজন মানুষ যাঁর অন্তিম স্মশান যাত্রায় উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে যে তিনি যে কোনও জনপ্রিয় মহাতারকার চেয়েও জনপ্রিয় ছিলেন। শুধুমাত্র বিজনেস ম্যাগনেট হিসেবে এত জনপ্রিয় হওয়া যায় না। তিনি ছিলেন একেবারেই অন্য রকম । তিনি ১৯ বছর বয়সে এফ-১৬ ফাইটার জেট ও বোয়িং এফ-১৮ সুপার হরনেট চালিয়েছেন। তিনিই আবার ৬৯ বছর বয়সে সেই এফ-১৬ ফাইটার জেট চালিয়েছেন, যা ভারতে প্রথম।
আমি তাঁকে একজন দেশপ্রেমিক মনে করি। কারণ,আমাদের দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর গ্রামীণ ভারত নিয়ে তিনি যা চিন্তা করেছেন, তা এই মুহূর্তে ভারতের ধনীতমদের লজ্জায় ফেলবে। কর্পোরেট লেভেলে সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ টাটা গ্রুপের কাজের জন্যে তাঁকে 'নাইট গ্র্যান্ড ক্রস' পুরস্কার দেন। অস্ট্রেলিয়া সরকার তাঁকে সে দেশের সবচেয়ে বড় সিভিল পুরস্কার 'অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া' প্রদান করে।
এত পুরস্কারের পরেও তাঁর পা যে মাটিতে ছিল, তার প্রমাণ মধ্যবিত্তের আওতায় ন্যানো গাড়ি তৈরির কারখানার স্বপ্ন। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প শ্মশানটিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে শিল্পের ভবিষ্যত রচনার এবং এলাকার শিক্ষিত বেকারদের স্বপ্ন দেখানোর সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল ২০০৮ সালে এক রাজনৈতিক আন্দোলনে, যা বঙ্গবাসীর কাছে চিরদিন ইতিহাস হয়ে থাকবে। ২০১১ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও আজও বাংলার শিল্পের ভবিষ্যত পাল্টাল না।
ভারত তার সবচেয়ে মানব-হিতৈষী শিল্পপতিদের একজন, সত্যিকারের "অসাধারণ নেতা" রতন টাটাকে হারানোর জন্য শোক প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই যে রতন টাটার নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ উদারভাবে বিভিন্ন জনহিতকর কাজে অর্থায়ন করেছে এবং মৃত্যুর আগে তাঁর উদারতা এবং অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্বের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।
জেআরডি টাটা, যিনি অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ১৯৯১ সালে রতন টাটাকে তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে নামকরণ করেছিলেন। দায়িত্ব হাতে নিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে সংস্থার কিছু লোক নিজেদেরকে শক্তি কেন্দ্র হিসাবে অবস্থান নিয়েছিল যেটা তাঁর কাজের শৈলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে তিনি টাটা স্টিলের রুসি মোডি, টাটা কেমিক্যালসের দরবারী শেঠ এবং ইন্ডুয়ান হোটেলের অজিত কেলকারকে সরিয়ে দেন।
১৯৯১ সালে রতন টাটা, টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়ার প্রায় একই সময়ে, দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরিবর্তন দেখেছিল। এই অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে রতন টাটার যাত্রাকে আলাদা করা অসম্ভব। ১৯৯১ সালে যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন টাটা গ্রুপের রাজস্ব ছিল $৪ বিলিয়ন, এবং ২০১২ সালে তিনি অবসর নেওয়ার সময় এটি $১০০ বিলিয়ন হয়ে গিয়েছিল, যা বর্তমানে প্রায় $১৬৫ বিলিয়ন। বর্তমানে, টাটা গ্রুপ সম্মিলিতভাবে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে নিয়োগ করেছে। এবং রতন টাটা এই অগ্রগতির একটি বড় অংশ তদারকি করেছিলেন।
তাঁর দেশপ্রেমের তুলনা হয়তো তিনি নিজেই। তাঁর উত্তরাধিকারের একটি বিশেষ দিক যে তিনি বিপরীত উপনিবেশকারীর ভূমিকায় নিজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ঠিক এই জায়গা থেকে একটু প্রসঙ্গান্তরে যাব এটা বোঝার জন্য, যে বিপরীত উপনিবেশে মানুষ কি দেখেছে ?
এ বছর অর্থশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছেন তিন জন- ড্যারন আসেমগ্লু, সাইমন জনসন এবং জেমস রবিনসন। তাঁদের লেখায় তিনটে শব্দবন্ধ বারবার চোখে পড়বেই: 'ঔপনিবেশিক ইতিহাস ', 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা' আর 'অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি'। অবশ্য তাঁদের তত্ত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনও সাধারণ ভারতবাসীও জানেন যে, আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার পিছনে লুকিয়ে আছে প্রায় তিনশো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এক 'কোম্পানির' ইতিহাস, তাদের কার্যকলাপ। আজও শুধু স্বাধীন ভারতের নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর উপনিবেশ আর তাঁদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের ছাপ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার অগণিত দেশের অর্থব্যবস্থা-পরিকাঠামো উন্নয়নের কক্ষপথে রয়েছে।
উপনিবেশ আর অর্থনীতি শব্দ দুটো একসঙ্গে উচ্চারিত হলে ভারতবাসী হিসেবে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা আমাদের কি অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করতে পেরেছে? ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রায় আট দশক পার করেও আমরা গরিব, বড় জোর উন্নয়নশীল- এক দেশ। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হয়ে তা হলে আমাদের কী লাভ হল? নোবেল প্রাপকত্রয়ী অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করেছেন- গত শতাব্দীর শেষার্ধে ১৭৫ টি দেশের অর্থনৈতিক তথ্যের মাধ্যমে পরিসংখ্যান দিয়ে বিশ্লেষণে, প্রমাণ করেছেন যে, গণতন্ত্র ও আর্থিক বৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত। কোনও দেশে গণতন্ত্র কায়েম থাকলে, সেই দেশে দেরিতে হলেও সমৃদ্ধি আসে।
একটি দেশে যেটি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, রতন টাটা অসংখ্য বিদেশী কোম্পানি অর্জনের জন্য তার সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন, যার মধ্যে বেশিরভাগই ব্রিটিশ ছিল। এটা হয়তো আমার মতে, এই দেশের অনেক মানুষকে খুব গর্বিত করেছে। রতন টাটা তার চেয়ারম্যানের
২১ বছরে এই ধরনের ৬০ টিরও বেশি চুক্তি করেছেন।
টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান হওয়ার মাত্র তিন বছর পর তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা প্রস্তুতকারক সংস্থা টেটলিকে অধিগ্রহণ করেন। এটি ছিল ইতিহাস তৈরির ভারতীয় সমষ্টির দ্বারা একটি উল্লেখযোগ্য বিদেশী কোম্পানি অধিগ্রহণের প্রথম উদাহরণ।
সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধিগ্রহণ ঘটেছিল ২০০৭ সালে যখন তিনি ১৩ বিলিয়ন ডলারে অ্যাংলো-ডাচ ইস্পাত প্রস্তুতকারক এবং ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী কোরাসকে গ্রহণ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত, এটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অধিগ্রহণ। টাটার অন্যান্য সুপরিচিত অধিগ্রহণের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ সল্ট, টাইকো, ন্যাটস্টিল, ডেইউ, আট ওক্লক এবং সেন্ট জেমস কোর্ট। এবং অবশ্যই, ফোর্ডের যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গাড়ি ব্র্যান্ড, জাগুয়ার এবং ল্যান্ড রোভার ২০০৮ সালে। রতন টাটা বিদেশে ভারতের সেরা পরিচিত কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হিসাবে বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালের একটি ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের প্রোফাইলে তাকে "টাইটান" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা তাঁর পারিবারিক ব্যবসাকে একটি "গ্লোবাল পাওয়ার হাউসে" পরিণত করার কৃতিত্ব দেয়। "তিনি তার পরিবারের নাম বহনকারী গোষ্ঠীর ১%-এরও কম মালিক৷ কিন্তু তবুও তিনি একজন টাইটান: ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবসায়ী এবং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী।"
বিপরীত উপনিবেশে মানুষ কি দেখেছে? রতন টাটার মৃত্যুতে ভারত একজন নীতিবান ব্যবসায়ী এবং একজন দূরদর্শীকে হারালো। যদিও তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন, তবুও তিনি ব্যাপক জনসম্মান উপভোগ করতেন এবং টাটা পরিবার ও উত্তরাধিকারের ঐতিহ্যে তিনি তার সম্পদের একটি সিংহভাগ লোকহিতায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যবসা শুরু করার দিন থেকেই এন্টারপ্রাইজ এবং জনহিতকর কাজ টাটা এন্টারপ্রাইজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
রতন টাটা মহাশয়কে নিয়ে হয়তো একটা বই লিখে ফেলা যায়। তবে সেটা সময় সাপেক্ষ। শেষ করার আগে তাঁর জনহিতকর কাজের একটা মাইল ফলক উদাহরণ দিয়ে এই প্রসঙ্গে ইতি টানব।
রতন টাটা শুধুমাত্র ব্যবসায়িক জগতেই একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন না বরং ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে প্রভাবশালী পার্সি সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে ২০০৮ সালের মুম্বই সন্ত্রাসী হামলার সময় প্রধান লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি ছিল আইকনিক তাজমহল হোটেল, প্রচুর ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও এটি তিনি পুনর্নির্মাণ করার ব্যবস্থা করেন।
তিনি কখনই সেই কর্মচারীদের ভুলে যাননি যারা ভুক্তভোগী এবং ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত করেছেন যে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের যত্ন নেওয়া হয়েছে, মৃত কর্মচারীদের আত্মীয়দের আজীবন বেতন নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরোপকারের প্রতি তার নিবেদন আবার প্রদর্শিত হয়েছিল যখন কোভিড মহামারী সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং টাটা স্টিল ঘোষণা করেছিল যে তারা ভাইরাসে মারা যাওয়া ভারতীয় কর্মচারীদের পরিবারকে বেতন এবং চিকিৎসা সুবিধা প্রদান চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ না মৃত শ্রমিকের বয়স ৬০ হবে। অন্য কোনও ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি এই উদারতা বা সাহস দেখাতে পেরেছিলেন বলে আমার জানা নেই। ভারতের শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং জনহিতৈষীকর কাজে টাটা পরিবারের অবদান অপরিসীম যা টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।



3 comments:
সবিস্তারে এই মানুষটার সম্বন্ধে জেনে খুব ভাল লাগল
তথ্যসমৃদ্ধ লেখা, খুব সুন্দর, তবে সাহিত্যটা একটু কম পেলাম
সেটা আমারও মনে হয়েছে। তবে অবিবাহিত একজন শিল্পপতিকে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি একটু কঠিন। তাছাড়া ওঁর দেহান্তরের প্রায় মাসখানেক কাটতে চলল। কাজেই একটু তাড়া ছিল।
Post a Comment