সরকারি চিকিৎসকদের অবসরের বয়স সীমা বৃদ্ধির সুপারিশ
দিনটা অগাস্ট ৯, ২০২৪। আর জি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসক-পড়ুয়া টানা ৩৬ ঘন্টা কাজে থাকার পরে কিছুটা বিশ্রামের জন্য সেমিনার ঘরটি বেছে নেন। পরের ঘটনাক্রম প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া মারফত ইতিমধ্যেই আমরা বিস্তারিত জেনেছি। এককথায়, মেয়েটির উপর অকথ্য অশালীন ব্যবহারের পরে তাকে খুন করা হয়।
এই ঘটনার পর থেকে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কোনও মানুষই খুব একটা স্বস্তিতে নেই। কিছু মানুষ আবার সমাজ মাধ্যমে ট্রোল করে এবং মিম ছড়িয়ে এমন একটা স্পর্শকাতর ঘটনাকে নিয়ে বেশ মস্করায় মজে উঠেছেন। আজকের দিনে স্কুল পড়ুয়া শিশু থেকে আমার মতো অশীতিপর বৃদ্ধরাও বুঝতে পারে যে রাজ্যের বা দেশের শাসক গোষ্ঠী ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ মদত ছাড়া এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। ফলে রাজ্যের শাসকের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর তাঁদের বিষোদ্গার উগরে দেন। সমাজ মাধ্যমে ট্রোল বা মিম যাঁরা করছেন তাঁদের কিছু কিছু মানুষের রুচির উপর ব্যক্তিগত ভাবে আমিও বেশ হতাশ। কেউ কিন্ত এমন কোনও সুপরামর্শ দিচ্ছেন না যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কমানো সম্ভব হয়। অতিসাম্প্রতিক অতীতে স্টেটশম্যান পত্রিকায় তথ্যবহুল একটি প্রবন্ধ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে এই লেখাটি লিখলাম। স্টেটসম্যান বা অন্যান্য ইংরেজি দৈনিকের গ্রাহকের সংখ্যা খুবই সীমিত। ফেসবুক একটি জনপ্রিয় সমাজ মাধ্যম। অনেকের চোখ লেখাটার ওপর পড়বে বলেই আশা করছি। এবার পরামর্শগুলো তুলে ধরছি।
প্রথমত, মৃতা মেয়েটিকে টানা ৩৬ ঘন্টা কাজের মধ্যে থাকতে হয়। এই তথ্য হাসপাতাল গুলোতে শিক্ষাপ্রাপ্ত ডাক্তারদের এবং সরাসরি যুক্ত অন্যান্য স্তরের স্বাস্থ্য কর্মীদের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুলতার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক দশকগুলিতে, ভারত স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৫০ সালে ভারতীয় নাগরিকের গড় আয়ু ছিল ৩৭ বছর। সেটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ এর কাছাকাছি। কিন্ত চিকিৎসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্বাস্থ্য কর্মীদের, বিশেষত ডাক্তার বাবুদের অবসরের বয়স এই পরিবর্তনের সঙ্গে আদৌ তাল মিলিয়ে চলেনি। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলোতে নিযুক্ত ডাক্তারদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে ভারত তার নাগরিকদের কল্যাণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারে।
ডাঃ আর কে ক্যারোলি,যিনি পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর চিকিত্সক ছিলেন, তিনি রাজধানীর রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের সাথে যুক্ত একজন কার্ডিওলজিস্ট, এবং ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘন্টা রোগীদের দেখতেন।
মুম্বাইতে, প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বি কে গোয়েল ৮০ টিরও বেশি বসন্ত পার করার পরেও সক্রিয় ছিলেন। এরকম অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে।
ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে সরকারি ডাক্তারদের অবসরের বয়স ৭০-এ উন্নীত করা শুধুমাত্র অভিজ্ঞ ডাক্তারের ঘাটতি দূর করবে না, তাঁদের উপস্থিতি তরুণ ডাক্তারদের নির্দেশনার প্রয়োজনেও উদ্বুদ্ধ করবে। আসলে, অভিজ্ঞতা চিকিৎসার জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ সিনিয়র ডাক্তার এবং পেশায় আসা নতুন ডাক্তাররা একসাথে কাজ করে রোগীদের আরও ভাল চিকিৎসা দিতে সক্ষম হবেন। কাজেই সরকারি চিকিৎসকদের অবসরের বয়স বাড়ানো একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলেই মনে হয়। ডাক্তারবাবুরা সাধারণত স্বাস্থ্য সচেতন এবং নিয়ম নিষ্ঠতায় অনড়। ফলে অনেকেই ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করার জন্য পুরোপুরি তৈরি থাকেন।
দেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। প্রত্যন্ত রাজ্য থেকে গ্রামীণ ভারতের লোকেরা চিকিৎসার জন্য জাতীয় রাজধানীর AIIMS, রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল ইত্যাদিতে যান। এটা খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। অবসরের বয়স বাড়ানো হলে অভিজ্ঞ ডাক্তারবাবুদের সেখানে স্থানান্তরিত করে সমাজ সেবার পরিসরকে অনেকটাই বাড়ানো যায়।
ডাক্তারদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর ফলে গ্রামে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব পূরণ হবে। সিনিয়র চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য পরিষেবায় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাঁদের অবসরের বয়স বাড়ালে তাঁদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নীতি গঠন এবং একই সঙ্গে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নতিতে অনেকটাই সক্ষম হবেন। ব্যবস্থাপনায় কর্পোরেট পেশাদারিত্বের দুয়েক জন থাকলে তো আর কথাই নেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে, গবেষণার সাথে জড়িত ডাক্তারবাবুদের অবসরের কোনও নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। তাঁরা আজীবন চাকরিতে থাকতে পারেন। এই ব্যবস্থা যখন অন্য দেশে কাজ করতে পারে, ভারতে কেন নয়? ভারতবর্ষ, যেখানে চিকিৎসকের অনেকটাই অভাব, সেখানে ডাক্তারদের অবসরের বয়সের উর্দ্ধসীমা পর্যালোচনা করার এটাই বোধহয় উপযুক্ত সময়।
বেসরকারী হাসপাতালগুলি অস্বাভাবিক ব্যয়বহুল। ফলে সিংহভাগ নাগরিকের নাগালের বাইরে। নিজেদের নিয়মনীতি তৈরি করে, বেশি উপার্জনের এই হাসপাতালগুলি অতিরিক্ত এবং ব্যয়বহুল পরীক্ষা এবং পদ্ধতিগুলি করায়। আমি নিজেই এই পদ্ধতির শিকার। এই হাসপাতালগলিতে রোগীর এক সপ্তাহের ভর্তি থাকার খরচের সামাল দিতে হয় কয়েক বছরের জন্য যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে ভাল রকমই প্রভাব ফেলে। সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ভরসার জায়গা সেই সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
বিবেক শুক্লার লেখা ০৩/১০/২৪ তারিখে Statesman, ইংরেজি দৈনিকে লেখা একটি তথ্য বহুল প্রবন্ধ।

No comments:
Post a Comment