এখানে কিস্যু হবে না
লেখার শিরোনাম দিয়েই শুরু করি। এই কথাটা শুনতে শুনতে এতটাই ক্লিসে হয়ে গেছে যে এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। মনে ভীষণ কষ্ট পাই। কিছু করার নেই, কারণ আমার মতাবলম্বি মানুষের সংখ্যা সেখানে শুধু সংখ্যালঘুই নয়, সংখ্যার নিরিখে এতটাই কম, যে কোনও হিসেবেই আসে না।
আগেই বলে রাখি যে আমি নিতান্তই ছা-পোষা একজন ভেতো বাঙালি। কাজেই পশ্চিম বাঙলাটাই আমার কাছে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দের জায়গা। স্বীকার করতে অসুবিধে নেই যে বহুদিন যাবত পশ্চিম বাংলায় কোনো বড় শিল্প শিকড় গেড়ে বসেনি। তবে এটাও ঠিক যে তথাকথিত শিল্পে টইটম্বুর রাজ্যের পড়াশোনার উচ্চতা মাপার শক্তি আমার নেই। পশ্চিম বাংলার শিক্ষার আজ বেহাল অবস্থা ঠিকই। কিন্ত এতটাই খারাপ নয়, যে অন্য রাজ্যের তুলনায় সেটা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে কথায় কথায় উঠে আসে এ বছরের শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার ঘোষণার প্রসঙ্গ। ভাটনগর পুরস্কার হ'ল মৌলিক বিজ্ঞানে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত মেধাবি ছাত্র/ছাত্রীদের নোবেল পুরস্কারের ভারতীয় সংস্করণ। পেশায় বিজ্ঞানী (অবসরপ্রাপ্ত)। বহু দশক কলকাতার বাইরে কাটিয়ে গত এক দশকের কিছুটা বেশি সময় সে এখন কলকাতাবাসী। প্রায়ই টেলিফোনে কথা হয়। আমার বাংলা তথা কলকাতা প্রীতি তার অজানা নয়। যাইহোক, ভাটনগর পুরস্কার প্রসঙ্গে আমি যখন তাকে বললাম যে, বন্ধু এবার তো ১২ জন পুরস্কারের তালিকায় ৪ জনই বাঙালি ! প্রত্যুত্তরে সে বলল তিনজনই তো কলকাতার বাইরের। এমনই একটা যুক্তি আশা করেছিলাম। সেজন্য আমি প্রস্তুতও ছিলাম। আমার প্রত্যুত্তর ছিল যে তাদের সবাইকার স্কুলশিক্ষা আদতে কলকাতাতেই, এবং তারা সবাই রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র। আসলে বুনিয়াদি শিক্ষার ভিতটা নড়েবড়ে না হলে তাদের পক্ষে পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় প্রতিষ্ঠা পাওয়াটা শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। এরপরের আলোচনায় পরস্পরের কেউই আর এগোতে দিইনি।
কিছুদিন আগে আনন্দবাজারের চার নম্বর পাতায় অর্থনীতিবিদ সুগত মার্জিত মহাশয়ের একটা প্রবন্ধ পড়ে আমি এই লেখাটার অনুপ্রেরণার রসদ খুঁজে পেলাম। লেখাটার একটা অবিকৃত অংশ তুলে ধরলাম:
"মনে পড়ে যায়, কিছু বছর আগে দেশের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তাদের একটি আলোচ্য বিষয় ছিল, যাঁরা গবেষণা করতে আসছেন, তাঁদের আঞ্চলিক পরিচিতির ব্যাপারটা। দেখা গেল যে, বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় অংশ আসছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে। মনে রাখতে হবে, এইসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণার সুযোগ পেতে গেলে মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় যে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়, সেই প্রতিযোগিতার ধারেকাছে পৃথিবীর শয়ে শয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আসতে পারে না। সেইসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ অর্জন করা গবেষকদের ছোটবেলা থেকে বড়বেলার ইতিহাসের পরতে পরতে একেবারেই অচেনা অখ্যাত স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবদান, এবং সর্বোপরি পড়াশোনাকে নিরন্তর সম্মান করা পরিবারের গঠিত আত্মত্যাগের কাহিনিও ফেলে দেবার মতো নয়।"
লেখার এই অংশটা পড়তে পড়তে তিরিশ বছর পেছনের দিকে নজর চলে গেছিল। আমাদেরই এক বরিষ্ঠ বন্ধুসহকর্মী, ডঃ ভি এস রামমূর্তি তখন ভারত সরকারের DST-র চেয়ারম্যান (DST - Department of Science &Technology) পেশায় ছিলেন তিনি একজন experimental Nuclear Physicist. আমাদের কলকাতার সল্টলেকের Cyclotron যন্ত্র (Particle Accelerator) ব্যবহার করে উনি অনেক experiment করে গেছেন। যাইহোক, কলকাতায় আসলেই উনি আমাদের সেন্টারের অতিথিশালায় থাকতেন এবং আমাদের অধিকর্তা সমেত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন সারতেন। এই রকম একটা আড্ডার পরিবেশে একবার আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দেশের Science technology-র অবস্থা। তাঁর কথাতেই উত্তরটা দিচ্ছি: "You see SK, nobody is interested in science-technology, I think Bengal is the main supplier of Science researchers in this country."
আরও কিছুটা সময় পিছিয়ে যাই। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, E C G Sudarshan একবার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের অডিটোরিয়ামে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। প্রেক্ষাগৃহ উপচে পড়েছিল। শ্রোতাদের মধ্যে আমিও ছিলাম, যদিও অকপটে স্বীকার করতে বাধা নেই যে, বক্তৃতার সবটাই আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্ত বিখ্যাত মানুষদের চোখে দেখার লোভ আমি কখনোই ছাড়তে পারিনা। পরবর্তীকালে সমর ঝা নামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ওঁর একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন যেটি Statesman পত্রিকার পাতায় আমি পড়ি। সেখানে সমর ঝা মহাশয় ওঁকে আমারই মত একটা প্রশ্ন করেন। উত্তরটা ছিল প্রায় ডঃ রামমূর্তির উত্তরের প্রতিধ্বনি। "You see Mr. Jha, In India, mainly Bengalee researchers and researchers from a few pockets of Kerala still believe that they find future and can make their career doing Science.
## শুধুমাত্র দক্ষিণ কলকাতায় আই এ সি এস, আই আই সি বি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্র/ছাত্রীরা পড়া শোনায় ব্রতি। এ ছাড়া, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, প্রেসিডেন্সির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি। আরও একটু বৃহত্তর পরিসরে আই আই টি খড়্গপুর, আই আই ই এস টি (আগে বি ই কলেজ নামে পরিচিত), বিশ্বভারতীর বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। পশ্চিম বঙ্গের শিক্ষায় কুৎসা যাঁরা করে বেড়াচ্ছেন, আমার ধারণা, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধ্যাপকের পড়াশোনার বহর কতটা দীর্ঘ, সে সম্বোধে আঁচ করতে গেলেও খানিকটা শিক্ষার প্রয়োজন হয়।

(1).jpeg)
No comments:
Post a Comment