প্রতিবছর জন্মদিনে আমার ছেলে-বৌ আমার পছন্দমতো একটা উপহার দেয়। বই পড়াটা আমার কাছে একটা অন্যতম পছন্দের জায়গা। বইয়ের মধ্যে আবার প্রথম পছন্দ হ'ল বিশিষ্ট মানুষদের জীবনালেখ্য। আর সেই কাহিনী যদি বিজ্ঞানীর জীবন ঘিরে হয়, তা হলে তো আর কথাই নেই। কোন লেখকদের লেখা বই আমার পছন্দের তালিকায়, সে ব্যাপারে আমার ছেলে-বৌ এর সম্যক ধারণা আছে। যাইহোক, এ বছর যে বইটা আমার হাতে এল, সেই লেখকের লেখা প্রায় সব বই আমার সঙ্কলনে আছে বলেই আমি জানতাম। কিন্ত বইটা হাতে পাওয়ার পরে মনে হ'ল এটা আমার পড়া নয়।
৮০ বছর বয়সের উপহার পাওয়া বইখানা
তার মানে এঁর লেখা বই এখনও বাজারে রীতিমত বেস্ট সেলারের তালিকায় আছে এবং সেটা আমার পুত্র জানতো। বইখানা হাতে পেয়ে মনে মনে ভীষণ খুশী হয়েছিলাম। মলাট উল্টোতেই দেখলাম জন্মদিনের বয়স, হস্তাক্ষরে উল্লেখ করে তারিখ বসানো আছে। ওই লেখাটা দেখেই আমি একটু ধন্ধে পড়ে গেলাম। হ্যাঁ, ভাল কথা এ বছর আমি ৮০ পার করলাম। সেটাই কায়দা করে লেখা। হস্তাক্ষরের বক্তব্য বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না, আবার কেমন যেন একটা লাগছে ! আমার নাতিভাই আমার বিভ্রান্তি দূর করে দিয়ে বলল, "দাদাই আসলে লেখাটা লেখা হয়েছে Calligraphically - তুমি সেই ভেবে পড়বার চেষ্টা কর, তাহলে বুঝে যাবে।"
Calligraphy কথাটা আমার চেনা কথা, কিন্ত তার মানেটা আমার আদৌ জানা ছিল না। যাইহোক, নাতিবাবু বলার পর গুগল অভিধান ঘাটাঘাটি করে কথাটার epistemological meaning, অর্থাত শব্দটার সারসত্তা উদ্ধার করে ফেললাম।
ক্যালিগ্রাফি হ'ল একটি ইচ্ছাকৃত এবং শিল্পশৈলীতে লেখার অভ্যাস যেখানে একটা নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে হ'ল নানান শব্দবিন্যাসে তৈরি বেশ কিছু বাক্য বন্ধের মধ্যেও ক্যালিগ্রাফি জাতীয় ব্যাপার আছে অর্থাত বাক্যের অর্থ অটুট রেখেও তার সৌন্দর্যায়নে সাহায্য করে।
চিত্র ৩. বাংলা অক্ষরে লেখা Calligraphy- র নমুনা
অনেক বাক্যের নির্মাণ শৈলীতে একটা ঘটনাকে বেশ উপভোগ্য করে পাঠকের কাছে তুলে ধরা যায়। বাঙালি আটপৌরে জীবনেই মিশে আছে শিল্প ও নান্দনিকতা। শিল্পকলার এক বিশাল ঐশ্বর্য ছড়িয়ে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনের নানান কথার পরিসরে। পরের উদাহরণ গুলোকে আমি কথার calligraphy আখ্যা দিলাম, মানে মূল calligraphy কথাটার একটা সমান্তরাল ব্যবস্থা। সমাজ মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা কয়েকটা চমৎকার বাক্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছি :
১. সদ্য সমাপ্ত ICC World Cup প্রতিযোগিতায় ভারতের হারের পরে এমনই একটা "আমরা ভারতীয়রা প্লেটে চা খেতে পারি, কাপ তোরা রেখে দে।"
২. আজ ধনতেরাসে আমি তিনটে সোনা কিনলাম, Amul gold, Marie gold আর Tata tea gold.
৩. একদিন ক্লাস টিচার প্রশ্ন করলেন, যারা নিজেদেরকে বোকা ভাবিস, তারা উঠে দাঁড়া। কেউই উঠে দাঁড়াল না। কিছুক্ষণ পরে মুখে একটা শয়তানি হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়াল ক্লাসের সবচেয়ে পাজি ছাত্র বল্টু !!
শিক্ষক: আচ্ছা তাহলে তুই নিজেকে বোকা ভাবিস ?
বল্টু: স্যার ঠিক তা নয় ; আসলে আপনি একাই শুধু দাঁড়িয়ে আছেন, ব্যাপারটা কেমন দেখাচ্ছে না !! তাই আমিও....
এরকম আরও অনেক কথা আছে যেগুলো রঙ্গ-রসিকতার ছলে অনায়াসে তৈরি হয়ে যায় এবং এটাও এক ধরনের শিল্পচর্চা।
বলাই বাহুল্য, উদাহরণ গুলো সবই সমাজ মাধ্যম থেকে ধার করা।
নাতি-নাতনির জায়গা অনেকের মতো আমাদের কাছেও একটা ব্যতিক্রমী অবস্থান। নাতিবাবুর জন্য তার সঙ্গে জুড়ল একটু বাড়তি ভালবাসা। ওর কাছে কথাটা শুনেই এই লেখাটার ভাবনা-চিন্তার প্রেরণা পেলাম। সামান্য একটা গবেষণা করে ফেললাম যে কথাটা অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় কি না। জানিনা গবেষণাটা ঠিকঠাক হ'ল কি না। পাঠককুলের কাছে বিনীত অনুরোধ রইল পড়ে দেখার জন্য। পারলে গঠনমূলক সমালোচনা করতে পিছিয়ে যাবেন না।




No comments:
Post a Comment